All rights reserved][ মূল্য টা. ১০‘০০

অথর্ব্ববেদীয়া

মাণ্ডুক্যোপনিষৎ

- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

শ্রীমৎ-পরমহংস-পরিব্রাজকাচার্য্য-শঙ্করভগবৎ- কৃতপদভাষ্য-সমেতা

মূল, অন্বয়মুখী ব্যাখ্যা, মূলানুবাদ, গৌড়পাদীয় কারিকা- ভাষ্য, ভাষ্যানুবাদ ও টিপ্পনী সহিত

পণ্ডিত দুর্গাচরণ সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ

কর্ত্তৃক অনূদিত ও সম্পাদিত

প্রকাশক— শ্রীসুবোধচন্দ্র মজুমদার দেব সাহিত্য-কুটীর প্রাইভেট লিমিটেড ২১, ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা—৯

তৃতীয় সংস্করণ

জুলাই

১৯৭৭

ছেপেছেন— এস. সি. মজুমদার দেব প্রেস ২৪, ঝামাপুকুর লেন কলিকাতা—৯

আভাস

উপনিষৎ-পর্যায়ে ষষ্ঠ ও সপ্তম খণ্ডে গৌড়পাদীয় কারিকাসহ মাণ্ডুক্যোপনিষৎ সম্পূর্ণ প্রচারিত হইল। অন্যান্য উপনিষদের ন্যায় ইহাতেও সেই ব্রহ্মবিদ্যাই যথাযথভাবে মীমাংসিত হইয়াছে। তবে মাণ্ডুক্যোপনিষদের বিশেষত্ব এই যে, প্রায় অধিকাংশ উপনিষদেই যেরূপ প্রশ্নোত্তরচ্ছলে কিংবা কোন একটি আখ্যা- য়িকার প্রসঙ্গে ব্রহ্মবিদ্যার স্বরূপ, উপায় ও ফল নিরূপিত হইয়াছে, এবং সঙ্গে সঙ্গে অল্পাধিক পরিমাণে কর্মানুষ্ঠানেরও প্রসঙ্গ সন্নিবিষ্ট হইয়াছে, ইহাতে সেইরূপ রীতির অনুসরণ করা হয় নাই, সাক্ষাৎ সম্বন্ধেই ব্রহ্মবিদ্যার উপদেশ করা হইয়াছে। কোনও দুরধিগম তত্ত্ব বুঝাইতে হইলে, যেরূপ রীতির অবলম্বন করা আবশ্যক, ইহাতেও অতি উত্তমরূপে সেই রীতিরই গ্রহণ করা হইয়াছে। নির্বিশেষ তুরীয়(চতুর্থ) ব্রহ্মস্বরূপ প্রতিপাদন করাই ইহার প্রধান লক্ষ্য; কিন্তু প্রথমেই তাহা প্রতিপাদন করা এবং জিজ্ঞাসুগণের বুদ্ধিগম্য করা সম্ভবপর নহে; এইজন্য, বুদ্ধ্যারোহের সুবিধার জন্য প্রথমতঃ সবিশেষ অবস্থাত্রয় নিরূপণ করিয়া পশ্চাৎ সেই নির্বিশেষ তুরীয় তত্ত্বের অবতারণা করিয়াছেন। সাধারণতঃ চঞ্চল-স্বভাব মানবীয় মন কোন একটি চির-পরিচিত বস্তু না পাইলে চিন্তা করিতে কাতর বা অক্ষম হইয়া থাকে; ইহা প্রাকৃতিক নিয়ম। তাই জীবহিতৈষিণী শ্রুতি করুণাপরবশ হইয়া ‘প্রণব’ অবলম্বনে তুরীয় ব্রহ্মো- পদেশে প্রবৃত্ত হইলেন। অখণ্ড ব্রহ্মে সখণ্ডভাবের আরোপণপূর্ব্বক তাহাকে চারি পাদে বা অংশে স্থাপিত করিলেন। অনন্তর প্রণবে ব্রহ্মভাব সমারোপণ করিয়া প্রণবের এক একটি মাত্রা বা অংশকে ব্রহ্মের এক একটি পাদরূপে চিন্তা করিবার উপদেশ দিলেন। উপদিষ্ট সেই চারিটি পাদ যথাক্রমে বিশ্ব, বিশ্বানর, তৈজস ও প্রাজ্ঞ সংজ্ঞায় অভিহিত হইয়াছে। এই পাদত্রয়ের অতীত পাদই নির্বিশেষ তুরীয় পাদ। ব্রহ্মের ন্যায় প্রণবেরও চারটি মাত্রা বা অংশ আছে, যথা—‘অ’, ‘উ’, ‘ম’ এবং নাদবিন্দু। এই সাদৃশ্যমূলে প্রণবের এক একটি মাত্রাকে ব্রহ্মের প্রাগুক্ত এক একটি পাদরূপে গ্রহণ করা হইয়াছে। প্রণবের নাদবিন্দু যেরূপ পৃথকভাবে উচ্চারণযোগ্য বা বক্তব্য হয় না, ব্রহ্মের তুরীয় পাদও সেইরূপ; সুতরাং ‘ইহা

|০

অমুক নহে, ইহা অধুক নহে’ এইরূপে নিষেধমুখেই তাহার উপদেশ করা সম্ভবপর হয়; এইজন্য শ্রুতিও “নান্তঃপ্রজ্ঞং” প্রভৃতি নিষেধপ্রধান বাক্যে তাহার নির্দেশ করিয়াছেন।

প্রণবের যেমন অ, উ, ম এই তিনটি ভাগ আছে, জীবেরও তেমনি দৈনন্দিন তিন প্রকার অবস্থা আছে—(১) জাগরণ,(২) স্বপ্ন ও(৩) সুষুপ্তি। তন্মধ্যে যে অবস্থায় চক্ষুঃ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে শব্দস্পর্শাদি বিষয় অনুভব করা হয়, তাহার নাম জাগরণ। যে অবস্থায় চক্ষু প্রভৃতি বহিরিন্দ্রিয়-নিচয় নিষ্ক্রিয় থাকে, একমাত্র মনই কেবল জাগ্রৎকালীন অনুভবের বলে(জাগ্রৎকালীন সংস্কারানুসারে) নানাবিধ বিষয় প্রত্যক্ষবৎ উপলব্ধি করিয়া থাকে, সেই অবস্থার নাম স্বপ্ন। আর যে অবস্থায় মনও বৃত্তিশূন্য—নির্ব্যাপার হইয়া পড়ে, সেই অজ্ঞানের মধ্যেও বিজ্ঞানঘন আত্মার আনন্দময় স্বরূপটি অস্ফুট ভাবে প্রকাশ পাইতে থাকে, সেই অবস্থার নাম সুষুপ্তি। উক্ত স্থানত্রয় অনুসারে আবার—ব্রহ্মের সেই বিশ্ব, তৈজস ও প্রাজ্ঞ নামক পাদত্রয়কে জাগরণ, স্বপ্ন, সুষুপ্তি এ জীবাবস্থাত্রয়ের সহিত সংযোজিত করা হইয়াছে। আচার্য্য গৌড়পাদ অতি সংক্ষেপে অথচ স্পষ্ট কথায় ইহা বলিয়া দিয়াছেন—

“বহিঃ-প্রজ্ঞো বিভুর্বিশ্বো হ্যন্তঃপ্রজ্ঞস্তু তৈজসঃ।

ঘনপ্রজ্ঞ স্তথা প্রাজ্ঞ এক এব ত্রিধা স্থিতঃ ॥”

ফল কথা, ভক্তিমান্ পুত্র যেমন পরমারাধ্য ও শ্রদ্ধাস্পদ পরদেবতা পিতার বিবিধ বিধানে সেবা, সমাদর ও গুণকীর্ত্তন করিয়াও যথেষ্ট বোধ করিতে পারে না, শ্রুতির অবস্থাও তদ্রূপ; তাই পরম পিতা পরমাত্মা এক অখণ্ড নির্বিশেষ হইলেও, শ্রুতিভক্তি-ভরে বিহ্বল হইয়াই যেন তাঁহাকে নানা ভাবে নানা ছাঁচে ঢালিয়া ঐকান্তিক ভাবে আদর ও অর্চ্চনা করিয়াছেন। একদিকে যেমন আদরাতিশয় প্রদর্শন করিয়াছেন, অপর দিকে আবার জিজ্ঞাসুগণের বুদ্ধিপ্রবেশের পথও তেমনি সুগম করিয়াছেন। তাই গৌড়পাদ বলিয়াছেন—

“মূল্লোহ-বিস্ফুলিঙ্গাদ্যৈঃ সৃষ্টিয়া চোদিতা পুরা।

উপায়ঃ সোহবতারায় নাস্তি ভেদঃ কথঞ্চন ॥”

অর্থাৎ মৃত্তিকা ও লৌহাদি বিস্ফুলিঙ্গ দৃষ্টান্ত দ্বারা ইতঃপূর্ব্বে যে সৃষ্টিতত্ত্ব উপদিষ্ট হইয়াছে, তাহা কেবল ব্রহ্মবিষয়ে বুদ্ধি-প্রবেশের উপায় বা দ্বারমাত্র; পরতপক্ষে তাঁহাতে কিছুমাত্র ভেদ নাই।

না, অতি আগ্রহসহকারে ব্রহ্মকে লোকবুদ্ধির গোচর করিবার জন্য বিবিধ

1/.

বিধানে যত্ন করিলেও, অবাঙ্মনসগোচর ব্রহ্মের দুজ্ঞেয়ত্ব দূর হইবার নহে; সুতরাং শ্রুতির অভিপ্রেত গূঢ় রহস্য অধিকাংশ জিজ্ঞাসুরই হৃদয়ঙ্গম হওয়া সহজ নহে; সেইজন্য ঋষিকল্প অদ্বৈতাচার্য্য গৌড়পাদ এই সংক্ষিপ্ত শ্রুতিবাক্যের উপর দুই শত পনেরটি শ্লোক রচনা করিয়া শ্রুতির রহস্য উদ্ঘাটিত করিয়া দিয়াছেন।

সম্ভবতঃ কাহারো জিজ্ঞাসা উপস্থিত হইতে পারে যে, এই গৌড়পাদাচার্য্য লোকটি কে, এবং কিরূপ অবস্থাপন্ন; তাঁহার কথারই বা এত আদর কেন? তদুত্তরে এইমাত্র বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, এইরূপ প্রবাদ আছে যে, গৌড়- পাদাচার্য্য স্বয়ং শুকদেবের নিকট উপদেশ লাভ করেন; সুতরাং গৌড়পাদাচার্য্যের শ্রৌত জ্ঞান সম্বন্ধে সন্দিহান হইবার কোন কারণ নাই। স্বামী শঙ্করাচার্য্যের গুরু গোবিন্দপাদ এই গৌড়পাদেরই শিষ্য; তাই আচার্য্য স্বামী শঙ্কর পরম গুরু বলিয়া গৌড়পাদের বন্দনা করিয়াছেন।

গৌড়পাদ স্বীয় কারিকা-সমষ্টিকে চারি শ্রেণীতে বিভক্ত করিয়াছেন—প্রথম আগম প্রকরণ, দ্বিতীয় বৈতথ্য প্রকরণ, তৃতীয় অদ্বৈত প্রকরণ, চতুর্থ অলাভশান্তি প্রকরণ। আগম প্রকরণে প্রধানতঃ শাস্ত্রার্থ কথন, বৈতথ্য প্রকরণে জগতের মিথ্যাত্ব ব্যবস্থাপনা, অদ্বৈত প্রকরণে অদ্বিতীয় ব্রহ্মতত্ত্ব নিরূপণ এবং অলাতশান্তি প্রকরণে দ্বৈত-প্রতীতির ভ্রান্তিময়ত্ব প্রতিপাদন, অতি উত্তমরূপে ব্যবস্থাপিত হইয়াছে।

গৌড়পাদের শ্লোকসমূহ আকারে সংক্ষিপ্ত হইলেও অর্থগৌরবে গরীয়ান্ এবং রহস্য-মহিমায় আরও মহীয়ান্। মনে হয়, গৌড়পাদের এক একটি শ্লোক যেন উজ্জ্বল আলোকময় রহস্য-রত্নের বিশাল আকর-স্থান; এক একটি শ্লোকের ব্যাখ্যায় এক একটি পুস্তক রচিত হইতে পারে। অধিক কি, মাণ্ডুক্যোপনিষৎ ও গৌড়- পাদের কারিকা, ইহারা পরস্পরে পরস্পরের গৌরব ও শোভাসমৃদ্ধি বৃদ্ধি করিয়া রাখিয়াছে। কেবলই অনুবাদের সাহায্যে ইহার রহস্য হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভবপর হইবে কিনা, তাহা বলিতে পারি না; সুতরাং পাঠকবর্গকেও ইহার জন্য কিঞ্চিৎ শ্রম স্বীকার করিতে অনুরোধ করিতেছি।

সম্পাদক

শ্রীদুর্গাচরণ শর্ম্মা

বিষয়-সূচী

মাণ্ডূক্যোপনিষৎ ও গৌড়পাদীয় কারিকার নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ যথাক্রমে নিরূপিত হইয়াছে—

প্রথম—আগম প্রকরণ

বিষয় শ্লোক। পৃষ্ঠা
১। ওঁকারের সর্ব্বাত্মকতা প্রতিপাদন ... ১।৫
২। ব্রহ্মের সর্ব্বাত্মকতা, আত্মস্বরূপতা এবং পাক-চতুষ্টয় নিরূপণ ২।৭
৩। ব্রহ্মের বৈশ্বানর-সংজ্ঞক প্রথম পাদ নিরূপণ ৩।১০
৪। ব্রহ্মের তৈজস-সংজ্ঞক দ্বিতীয় পাদ কথন ৪।১৪
৫। ব্রহ্মের প্রাজ্ঞ-সংজ্ঞক তৃতীয় পাদ নিরূপণ এবং তাহারই সর্ব্বান্তর্য্যামিত্ব ও সর্ব্বকারণত্ব কথন
৫-৬।১৬-১৯
৬। কথিত বিশ্ব(বৈশ্বানর) তৈজস ও প্রাজ্ঞ, এই ব্রহ্মপাদত্রয়ের গৌড়- পাদীয় কারিকায়(জাগ্রৎ) স্বপ্ন, ও সুষুপ্তি প্রভৃতি অবস্থাভেদ বর্ণন এবং তদ্‌- বিষয়ক জ্ঞানফল নিরূপণ ১-৫।২০-২৯
৭। প্রাজ্ঞ ও প্রাণ-সংজ্ঞক তৃতীয় পাদ হইতে জগৎসৃষ্টি কথন এবং সৃষ্টিসম্বন্ধে বিভিন্ন মত বর্ণন কারিকা— ৬-৯।৩০-৩৫
৮। উক্ত পাদত্রয়াতীত তুরীয় ব্রহ্মস্বরূপ কথন(শ্রুতি)—৭।৩৬-৪৪
৯। তুরীয় ব্রহ্মস্বরূপ কথন এবং বিশ্বাদি পাদত্রয় হইতে তুরীয়ের প্রভেদ নিরূপণ(কারিকা)— ১০-১৪।৪৪-৪৯
১০। স্বপ্ন ও সুষুপ্তির স্বরূপ কথনপূর্ব্বক তুরীয়-পদ-প্রাপ্তি এবং অনাদি- মায়া-নিদ্রাত্যাগে জীবের ব্রহ্মত্বোপলব্ধি কথন— ১৫-১৬।৫০-৫৩
১১। দ্বৈত-প্রপঞ্চের মিথ্যাত্ব এবং অদ্বৈত তত্ত্বের পরমার্থ-সত্যতা প্রতি- পাদন— ১৭-১৮।৫৩-৫৫
১২। বৈশ্বানরাদি পাদত্রয়ের জাগ্রদাদি অবস্থাত্রয়ে যথাক্রমে অকারাদি মাত্রারূপত্ব কথন, এবং তদ্বিজ্ঞানের ফল কীর্ত্তন(শ্রুতি) ৮-১১।৫৫-৬০
১৩। জাগ্রদাদি স্থানত্রয়ানুসারে অকারাদি ক্রমে বিশ্ব প্রভৃতি পাদত্রয় নির্দেশ এবং তদধিগমের ফল কথন(কারিকা) ১৯-২৩ ৬০-৬৪

١٥٠

বিষয়

শ্লোক। পৃষ্ঠাঃ

১৪। উক্ত মাত্রাসম্বন্ধরহিত অদ্বৈত তুরীয়ব্রহ্মস্বরূপ নিরূপণ—(শ্রুতি) ১২।৬৪

১৫। বিশ্বাদি পাদ ও অকারাদি মাত্রার অভেদ কথন এবং পাদবিভাগভ্রমে ওঁকার-জ্ঞানে সর্ব্ব চিন্তা পরিত্যাগের উপদেশ(কারিকা)... ২৪।৬৬

১৬। প্রণবের(ওঁকারের) পরাপর ব্রহ্মরূপতা, তুরীয় ভাব কথন এবং প্রণবে চিত্তসমাধির উপদেশ ও তৎফল কথন(কারিকা) ২৫-২৯|৬৭-৭১

দ্বিতীয়—বৈতথ্য প্রকরণ( কারিকাংশ)

  1. ১৭। স্বপ্ন ও জাগ্রদবস্থায় যে সমস্ত বিষয় দৃশ্যমান হয়, তৎসমস্তই মনের
  2. কল্পনাপ্রসূত; সুতরাং অসৎ—মিথ্যা...... ১-১৫।৭২-৮৯
  3. ১৮। অজ্ঞান-সংস্কার ও জীব, এই উভয়ের পরস্পর কার্য্য-কারণ ভাব
  4. কথন, এবং রজ্জুজ্ঞানে সর্পভ্রান্তি নিরাসের ন্যায় আত্মজ্ঞানে দ্বৈতভ্রান্তি-নিবৃত্তি
  5. কথন......... ১৬-১৮।৮৯-৯৩
  6. ১৯। প্রাণাদি ভেদের মায়াময়ত্ব কথন, ভিন্ন ভিন্ন বাদীর মতে প্রাণ, ভূত
  7. ও গুণপ্রভৃতি বিভিন্ন পদার্থের পারমার্থিকত্ব কল্পনা, এবং আচার্য্যোপদেশের তত্ত্ব-
  8. নিরূপণের উপদেশ ও তদ্বিজ্ঞানের ফল কথন... ১৯-৩১।৯৩-১০৩
  9. ২০। পরমার্থদৃষ্টিতে সৃষ্টিস্থিতির অভাব সাক্ষাৎকারের জন্য নির্বিকল্প
  10. ব্রহ্মতত্ত্বে চিত্তনিবেশের উপদেশ এবং জ্ঞানীর অবস্থা নির্দেশ ৩২-৩৮।১০৩-১১৫

তৃতীয়—অদ্বৈত প্রকরণ

  1. ২১। ব্রহ্মানুভূতিরহিত উপাসনা-পরায়ণ জীবের কৃপণত্ব-কথন এবং তন্নি-
  2. বারণের উপায়-নির্দেশ—...... ১-২।১১৬-১১৯
  3. ২২। ঘটাকাশাদির ন্যায় আত্মারও জন্মমরণাদিব্যবহারের ঔপাধিকত্ব-
  4. নিরূপণ এবং উপাধিগত দোষগুণে উপহিতের অসংশ্পর্শ কথন ৩-৯।১১৯-১৩১
  5. ২৩। দেহের মায়িকত্ব এবং তন্মধ্যে আত্মার কোষাধ্যক্ষরূপে অবস্থিতি
  6. কথন—......... ১০-১২।১৩১-১৩৫
  7. ২৪। জীব ও পরমাত্মার একত্ব বা অভেদই বাস্তবিক, ভেদ কেবল মায়িক
  8. বা অবিদ্যাকল্পিত, ইহার সমর্থন—...... ১৩-১৪।১৩৫-১৩৯
  9. ২৫। সৃষ্টিপ্রকরণোক্ত মৃত্তিকা-লৌহাদি ভেদঘটিত দৃষ্টান্তের কাল্পনিকত্ব এবং
  10. হীন, মধ্যম ও উত্তম জ্ঞানদৃষ্টি অনুসারে আশ্রমের ত্রৈবিধ্য কথন—১৫-১৬।১৩৯-১৪৩

॥০

বিষয় শ্লোক। পৃষ্ঠা
২৬। আত্মার জন্ম-মরণাভাব উপপাদন এবং ভেদদৃষ্টির মায়িকত্ব নিরূপণ ও বিপক্ষে দোষ প্রদর্শন—...... ১৭-২৭।১৪৪-১৬১
২৭। অসদুৎপত্তির অসম্ভাবনা এবং দ্বৈতপ্রপঞ্চের ব্রহ্মবিবর্ত্ততা সংস্থাপন—......... ২৮-৩৩।১৬১-১৬৭
২৮। সুষুপ্তি ও নির্বিকল্প সমাধির প্রভেদ এবং নির্বিকল্পের স্বরূপ নির্দেশ ও ‘অস্পর্শযোগ’ কথন—...... ৩৪-৩৯।১৬৭-১৭৭
২৯। মনোনিগ্রহের উপায় কথন এবং মনোনিগ্রহে দুঃখনিবৃত্তি নিরূপণ—......... ৪০-৪৩।১৭৭-১৮১
৩০। মনের ‘লয় বিক্ষেপাদি’ অবস্থা চতুষ্টয় কথন এবং তন্নিবৃত্তির উপায় নির্দেশ—......... ৪৪-৪৮।১৮১-১৮৬

চতুর্থ—অলাতশান্তি প্রকরণ

৩১। সর্ব্বপুরুষোত্তম আচার্য্যের বন্দনা... ১-২।১৮৭-১৯১

৩২। সিদ্ধ ও অসিদ্ধ পদার্থের উৎপত্তিবাদিগণের পরস্পর মতবিরোধ প্রদর্শন পূর্ব্বক স্বমতে মিথ্যা জগতের অনুৎপত্তি সমর্থন—... ৩-২৪।১৯১-২১৭

৩৩। মনঃকল্পিত সংসার ও বাহ্য পদার্থের অসত্যতা এবং, তন্নিবন্ধন গ্রাহ্য- গ্রাহকভাবের অনুপপত্তি—...... ২৫-৩০|২১৭-২২৬

৩৪। সংসারের স্বপ্নতুল্যতা এবং স্বপ্নদৃশ্য পদার্থের অসত্যতা : সমর্থন—...... ৩১-৪১।২২৬-২৩৫

৩৫। প্রত্যক্ষাদি ব্যবহারানুসারে আত্মা ও জগতের জন্মস্থিতি প্রভৃতির সত্যতা শঙ্কা প্রদর্শন এবং মায়াহস্তী প্রভৃতি দৃষ্টান্তে ব্যবহারের মিথ্যাত্ব প্রতি- পাদন—......... ৪২-৪৬।২৩৬-২৪১

৩৬। যে কাষ্ঠখণ্ডের অগ্রভাগে অগ্নি জ্বলিতে থাকে, তাহাকে ‘অলাত’ ও ‘উল্কা’ বলা হয়। সেই অলাতকে ভ্রমণ করাইলে যেমন যথাসম্ভব সরল বক্রাদি ভাব পরিদৃষ্ট হয়, এবং অলাতের ভ্রমণ নিবৃত্তির সঙ্গে-সঙ্গে ঐ সমস্ত ভাবও নিবৃত্ত হইয়া যায়; তেমনি একমাত্র বিজ্ঞানেরই নানাকার স্পন্দনে গ্রাহ্যগ্রহণাদি ভাব উপস্থিত হয়, আর বিজ্ঞানের স্পন্দন-নিবৃত্তিতে ঐ গ্রাহ্যগ্রহণাদি ভাবও বিলুপ্ত হইয়া যায়। এই সিদ্ধান্তের বিস্তৃতভাবে সমর্থন—... ৪৭-৫৬।২৪১-২৫১

॥/०

বিষয় শ্লোক। পৃষ্ঠা
৩৭। স্বপ্নদৃষ্টান্তানুসারে জাগতিক জন্ম-মরণাদি ব্যবহারের মায়িকত্ব
নিরূপণ—......... ৫৭-৭৯.২৫১-২৭০
৩৮। চিত্তগত নানাবিধ কল্পনার বিরামে আত্মার সাম্য—স্বরূপে অবস্থান
কথন—......... ৮০-৮২.২৭০-২৭৩
৩৯। আত্মবিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বাদিগণের ‘অস্তি,’ ‘নাস্তি’ প্রভৃতি চতুর্বিধ বিকল্পনা এবং স্বসিদ্ধান্ত কথন... ৮৩-৯৯.২৭৩-২৯৫
৪০। আত্ম নমস্কার ১০০।২৯৫-২৯৮

সমাপ্ত

মাণ্ডূক্যোপনিষদীয় গৌড়পাদীয় কারিকার অকারাদি বর্ণ ক্রমে

পদ-সূচী

শ্লোক ক্রমিক সংখ্যা অকল্পকমজম্ ১০০ অকারো নয়তে ২৩ অজঃকল্পিতসংবৃত্ত্যা ১৮৯ অজমনিদ্রম্ ১০৩,১৯৬ অজাতেস্ত্রসতাং ১৫৮ অজাতস্যৈব ১২১ অজাতস্যৈব ভাবস্য... ৮৭ অজাতং জায়তে যস্মাৎ... ১৪৪ অজাদ বৈ জায়তে যস্য... ১২৮ অজেঘজমসংক্রান্তং... ২১১ অজে সাম্যে তু যে কেচিং ২১০ অণুমাত্রেইপি বৈধর্ম্মে... ২১২ অতো বক্ষ্যাম্যকার্পণ্যম্ ৬৯ অদ্বয়ং চ দ্বয়াভাসং... ৯৭ অদ্বয়ং চ দ্বয়াভাসং... ১৭৭ অদীর্ঘত্বাচ্চ কালস্য... ৩১ অদ্বৈতং পরমার্থো হি... ৮৫ অনাদিমায়য়া সুপ্তো... ১৬ অনাদেরন্তবত্ত্বং চ... ১৪৫ অনিমিত্তস্য চিত্তস্য ১৯২ অনিশ্চিতা যথা রজ্জুঃ... ৪৬

শ্লোক ক্রমিক সংখ্যা অন্তঃস্থানাত্তু ভেদানাং... ৩৩ অন্যথা গৃহ্নতঃ স্বপ্নো... ১৫ অপূর্ব্বং স্থানিধর্ম্মো হি... ৩৭ অভাবশ্চ রথাদীনাং... ৩২ অভূতাভিনিবেশাৎ ১৯৪ অভূতাভিনিবেশোহস্তি... ১৯০ অমাত্রোহনন্তমাত্রশ্চ... ২৯ অলব্ধাবরণাঃ সর্ব্বে... ২১১ অলাতে স্পন্দমানে বৈ... ১৬৪ অবস্তুমুপলম্ভৎ চ... ২০৩ অব্যক্তা এব যেহন্তস্তু... ৪৪ অশক্তিরপরিজ্ঞানং ১৩৪ অসজ্জাগরিতে দৃষ্টা... ১৫৪ অসতো মায়য়া জন্ম... ৯৫ অস্তিনাস্ত্যস্তি নাস্তীতি... ১৯৮ অস্পন্দমানমলাতম্ ১৬৩ অস্পর্শযোগো বৈ নাম... ১০৬,১১৯

আদাবন্তে চ যন্নাস্তি... ৩৫ আদাবন্তে চ যন্নাস্তি... ১৪৬ আদিবুদ্ধাঃ প্রকৃত্যৈব... ২০৭ আদিশান্তা হ্যনুৎপন্নাঃ... ২০৮

॥ ೮೦
শ্লোক ক্রমিক সংখ্যা শ্লোক ক্রমিক সংখ্যা
আত্মসত্যানুবোধেন ... ৯৯ কারণাদ যস্যনন্যত্বম্ ১২৭
আত্মা হ্যাকাশবজ্জীবৈঃ ... ৭০ কারণং যস্য ... ১২৬
আশ্রমাস্ত্রিবিধা ... ৮৩ কাল ইতি ৫৩
কো
ইচ্ছামাত্রং প্রভোঃ ... ৮ কোট্যশ্চতস্রঃ ... ১৯১
ক্র
উপলম্ভাৎ সমাচারাৎ ... ১৫৭ ক্র
উপলম্ভাৎ সমাচারাৎ ১৫৯ ক্রমতে েন হি ... ২১৪
উপায়েন নিগৃহীয়াৎ ১০৯ খ্যা
উপাসনাশ্রিতো ধর্ম্মো ৬৮ খ্যাপ্যমানামজাতিং ... ১২০
উৎপাদস্যাপ্রসিদ্ধত্বাৎ ... ১৫৩ গ্র
উভয়োরপি বৈতথ্যং ৪০ গ্র
উভে হন্যোন্যদৃশ্যে ১৮২ গ্রহণাজ্জাগরিতবৎ ১৫২
উৎসেক উদধেঃ ... ১০৮ গ্রহো ন তত্র ১০৫
ঋজু-বক্রাদিকা ... ১৬২ ঘটাদিষু প্রলীনেষু ৭১
এতৈরেষো ৫৯
এবং ন চিত্তজা ... ১৬৯ চরন্ জাগরিতে ১৮১
এবং ন জায়তে ... ১৬১ চি
ওঙ্কারং পাদশো ২৪ চিত্তকালা হি ৪৩
চিত্তং ন ১৪১
কল্পয়ত্যাত্মনা ৪১ চিত্তস্পন্দিতং ... ১৮৭
কা
কার্যকারণবন্ধৌ ১১ জরা মরণ ১২৫
শ্লোক ক্রমিক সংখ্যা শ্লোক ক্রমিক সংখ্যা
জা দ্র
জাগ্রচ্চিত্তেক্ষণীয়াঃ ১৮১ দ্রব্যং দ্রব্যস্য ... ১৬৮
জাগ্রদ্বৃত্তাবপি ... ৩৯ দ্ব
জাত্যাভাসং ১৬০ দ্বয়োর্ব্বয়ঃ ... ৭৯
জী দ্বৈ
জীবাত্মনোঃ পৃথত্ত্বং ৮১ দ্বৈতস্যাগ্রহণং ১৩
জীবাত্মনোরন্যত্বং ... ৮০
জীবং কল্পয়তে ... ৪৫ ধর্ম্মা য ইতি ১৭৩
জ্ঞা
জ্ঞানে চ ত্রিবিধে ... ২০৪ ন কশ্চিজ্জায়তে জীবঃ ... ১১৫
জ্ঞানেনাকাশকল্পেন ১১৬ ন কশ্চিৎ ... ১৮৬
ন নির্গতা ... ১৬৫
তত্ত্বমাধ্যাত্মিকং ... ৬৭ ন নির্গতাস্তে ... ১৬৭
তস্মাদেবংবিদিত্বেনং ... ৬৫ ন যুক্তং ... ১৪৯
তস্মান্ন জায়তে ... ১৪৩ ন নিরোধো ... ৬১
তৈ ন ভবত্যমৃতং
তৈজসসস্যোত্ববিজ্ঞানে ২০ ন ভবত্যনৃতং ... ১২২
ত্রি না
ত্রিষু ধামসু যদ্‌ভোজ্যৎ ... ৫ নাকাশস্য ... ৭৪
ত্রিষু ধামসু ... ২২ নাজেষু ১৭৫
নাত্মানং ... ১২
দক্ষিণাক্ষিমুখে ... ২ নাস্বাদয়েৎ
দু নাত্মভাবেন
দুঃখং সর্ব্বং ... ১১০ নাস্যন্ত ... ১৫৫
দুদ্দশমতি ... ২১৫ নিগৃহীতস্য ... ১০১
হ০

४०

শ্লোক ক্রমিক সংখ্যা শ্লোক ক্রমিক সংখ্যা
নিঃস্তুতিঃ ৬৬
নিমিত্তং ন সদা ১৪২ ফলাদুৎপদ্যমানঃ ১৩২
নিবৃত্তেঃ সর্ব্বদুঃখানাং ১০
নিবৃত্তস্যাপ্রবৃত্তস্য ১৯৫ বহিঃপ্রজ্ঞো
নিশ্চিতায়াং যথা ৪৭ বী
নে বীজাঙ্কুরাখ্য- ১৩৫
নেহ নানেতি ৯১ বু
বুদ্ধা নিমিত্ততাং ১৯৩
পঞ্চবিংশকঃ... ৫৫ ভা
পা ভাবৈরসভিঃ ৬২
পাদা ইতি ৫০ ভূ
পূ ভূততো ৯০
পূর্ব্বাপরাপরিজ্ঞানং ১৩৬ ভূতস্য জাতিং ১১৮
প্র ভূতং ন ১১৯
প্রকৃত্যাকাশবজ্‌জ্ঞেয়াঃ ২০৬ ভো
প্রণবং হি ২৮ ভোগার্থং
প্রভবঃ সর্ব্বভাবানাং
প্রণবো হ্যপরং ২৬ মকারভাবে ২১
প্রপঞ্চো যদি ১৭ মন ইতি ৫৪
প্রজ্ঞপ্তেঃ সনিমিত্তত্বং ১৩৯ মনসো ১০৭
প্রজ্ঞপ্তেঃ সনিমিত্তত্বং ১৪০ মনোদৃশ্যং ৯৮
প্রা মরণে ৭৬
প্রাণা ইতি... ৪৯ মা
প্রাণাদিভিঃ ৪৮
প্রাপ্য সর্ব্বজ্ঞতাং... ২০০ ৮৬

হজব

শ্লোক ক্রমিক সংখ্যা শ্লোক ক্রমিক সংখ্যা
মি রূ
মিত্রাদ্যৈঃ ১৫০ রূপ-কার্য্য-সমাখ্যাঃ ৭৩
মৃ
মূল্লোহ ৮২ লয়ে সংবোধয়েৎ ১১১
লী
যং ভাবং দর্শয়েৎ ৫৮ লীয়তে হি ১০২
যথা নিৰ্ম্মিতকো ১৮৫ লো
যথা ভবতি ... ৭5 লোকান্ লোকবিদঃ ... ৫৬
যথামায়াময়াদ ১৭৪ বি
যথা মায়াময়ো ... ১৮4 বিকরোত্যপরান্ ৪২
যথা স্বপ্নে ৯৬ বিকল্পো বিনি ১৮
যথা স্বপ্নময়ো ১৮৩ বিপর্য্যাসাদ্যথা ১৫৬
যথা স্বপ্নে ... ১৭6 বিপ্রাণাং বিনয়ো হি ২০১
যথৈকস্মিন্ ৭২ বিভূতিং প্রসবং ... ৭
যদা ন লভতে ১৯১ বিশ্বস্যাত্ব-বিরক্ষায়াম ১৯
যদি হেতোঃ ... ১৩3 বিশ্বো হি স্থূলভুক্
যা বিজ্ঞানে স্পন্দমানে ১৬৬
যাবদ্ধেতুফল ... ১৭0,১৭১ বী
যু বীতরাগ-ভয় ৬৪
যুঞ্জীত প্রণবে ২৫ বে
যো বেদ। ইতি বেদ ... ৫১
যোহস্তি কল্পিত ১৮8 বৈ
বৈতথ্যং সর্ব্বভাবানাৎ ৩০
রসাদয়ো হি যে ৭৮ বৈশারদ্যং তু বৈ ... ২০9

দলং

শ্লোক ক্রমিক সংখ্যা শ্লোক ক্রমিক সংখ্যা
স্থু
স এষ নেতি ৯৩ স্থূলং তর্পয়তে
সতো হি মায়য়া ... ৯৪ স্ব
সপ্রয়োজনতা ... ৩৬, ১৪৭
সর্ব্বস্য প্রণবো হি ২৭ স্বতো বা ১৩৭
সর্ব্বাভিলাপ ... ১০৪ স্বতো বা ... ১৩৭
সর্ব্বে ধৰ্ম্মা মৃষা ১৪৮ স্বপ্নদৃক্ ১৭৯
সবস্তু সোপলম্ভৎ ২০২ স্বপ্নদৃক্ প্রচরন্ ১৭৮
সং স্বপ্নজাগরিতে ৩৪
সংঘাতাঃ স্বপ্নবৎ ... ৭৭ স্বপ্ননিদ্রা ১৪
সংভবে হেতু ১৩১ স্বপ্ন-মায়ে ৬০
সংভূতেরপবাদাৎ ৯২ স্বপ্নবৃত্তাবপি ... ৩৮
সংবৃত্যা জায়তে ... ১৭২ স্বপ্নে চাবস্তুকঃ ... ১৫১
সাং স্বভাবেন ৮৯
সাংসিদ্ধিকী ১২৪ স্বভাবেন ১২৩
সু স্বসিদ্ধান্ত ৮৪
সুখমাব্রিয়তে ... ১৯৭ স্বস্থং শান্তং ১১৪
সু হে
সূক্ষ্ম ইতি ... ৫২ হেতুর্ন ... ১৩৮
সূ হেতোরাদিঃ ... ১২৯
সৃ হেতোরাদিঃ ... ১৩০
সৃষ্টিরিতি ৫৭ হেয়-জ্ঞেয়াপা-পাক্যানি ২০৫

উপনিষদ্

১।(ভূমিকা, মূল, অন্বয়মুখা ব্যাখ্যা, মূলানুবাদ, শাঙ্কর-ভাষ্য, ভাষ্যানুবাদ ও টিপ্পনী সমেত, ডিমাই বার পেজী, উৎকৃষ্ট কাগজ ও সুন্দর ছাপা) ঈশ, কেন, কঠ(একত্রে)......... ২১০ ২। বৃহদারণ্যক(চতুর্থ ভাগের সম্পূর্ণ, প্রতি ভাগের মূল্য) ৩৷০ ঐ সম্পূর্ণ মূল্য...... ১৪ ৩। ঐতরেয়......... ১ ৪। তৈত্তিরীয় ১ম খণ্ড......... ১০ ঐ ২য় খণ্ড......... ১ ৫। প্রশ্ন......... ২ ৬। মুণ্ডক......... ২ ৭। মাণ্ডুক্য......... ৪ ৮। ছান্দোগ্য(দুই ভাগে সম্পূর্ণ)...... ৮৷৷০ ৯। উপদেশ-সহস্রী......... ৪ ১০। সর্ববেদান্ত সিদ্ধান্ত সারসংগ্রহ...... ২॥০ ১১। শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতা(মূল, অন্বয়, মূলের অনুবাদ শাঙ্কর- ভাষ্য, আনন্দগিরি টীকা এবং ভাষ্যানুবাদ সমেত) (প্রমথনাথ তর্কভূষণ)... ৪৷৷০ ১২। বালানন্দ উপদেশাবলী...... ॥০ ১৩। রামকৃষ্ণ উপদেশামৃত...... ॥০ ১৪। বেদান্তদর্শনম্(ব্রহ্মসূত্রম্) চারিভাগে সম্পূর্ণ মূল্য (কালীবর বেদান্তবাগীশ সম্পাদিত) ১০ ১৫। কতকথায় রামায়ণের পুঁথি...... ৭

গৌড়পাদীয়-কারিকোপেতা অথর্ববেদীয়-

মাণ্ডুক্যোপনিষৎ

শাঙ্কর-ভাষ্যসমেতা

প্রথমম্—আগম-প্রকরণম্ —

॥ ওঁ ব্রহ্মণে নমঃ ॥

ভদ্রং কর্ণেভিঃ শৃণুয়াম দেবাঃ। ভদ্রং পশ্যেমাক্ষভির্যজত্রাঃ। স্থিরৈরঙ্গৈস্তুষ্টু বাৎসস্তনূভিঃ। ব্যশেম দেবহিতং যদায়ুঃ ॥ ওঁম্ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥

হে দেবগণ, আমরা কর্ণ দ্বারা যেন মঙ্গলময় শব্দ শ্রবণ করিতে পাই, চক্ষু দ্বারা যেন উত্তম রূপ দর্শন করিতে পাই, এবং স্থিরতর অঙ্গসম্পন্ন দেহে স্তোত্রপরায়ণ হইয়া দেবগণের হিতকর যে আয়ুঃ, তাহা যেন ভোগ করিতে পাই ॥ ১

শান্তি শান্তি শান্তি।

২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

মঙ্গলাচরণম্

প্রজ্ঞানাংশু প্রতানৈঃ স্থিরচরনিকরব্যাপিভির্ব্বাপ্য লোকান্ ভুক্ত্বা ভোগান্ স্থবিষ্ঠান্ পুনরপি ধিষণোদ্ভাসিতান্ কামজন্যান্। পীত্বা সর্ব্বান্ বিশেষান্ স্বপিতি মধুরভুঙ্ মায়য়া ভোজয়ন্ নো মায়াসঙ্খ্যাতুরীয়ং পরমমৃতমজং ব্রহ্ম যত্তন্নতোহস্মি ॥ ১ ॥

অনুবাদ

যিনি স্থাবর-জঙ্গমব্যাপী বিমল জ্ঞানরশ্মি বিস্তার দ্বারা সমস্তলোকে ব্যাপ্ত থাকিয়া[জাগ্রৎসময়ে] স্কুল বিষয়সমূহ উপভোগ করেন; পরে[স্বপ্নসময়ে] বুদ্ধিসমুদ্ভাসিত(বাসনাময়) সূক্ষ্ম বিষয়সমূহ পান করিয়া[সুষুপ্তিকালে] কেবল আনন্দভুক্ অবস্থায় অবস্থান করেন, এবং মায়া দ্বারা আমাদিগকেও (জীবগণকেও) ভোগ করান; সেই যে মায়িক সংখ্যানুসারে তুরীয়পদবাচ্য জন্মরহিত অমৃতস্বরূপ পরব্রহ্ম, তাঁহাকে নমস্কার করি ॥ ১

যো বিশ্বাত্মা বিবিধ বিষয়ান্ প্রাশ্য ভোগান্ স্থবিষ্ঠান্

পশ্চাচ্চান্যান্ স্বমতিবিভবান্ জ্যোতিষা যেন সূক্ষ্মান্। সর্ব্বানেতান্ পুনরপি শনৈঃ স্বাত্মনি স্থাপয়িত্বা

হিত্বা সর্ব্বান্ গতগুণগণঃ পাণ্ডবৌ নস্তুরীয়ঃ ॥ ২

অনুবাদ

সর্ব্বজগদাত্মক যিনি শুভাশুভ কৰ্ম্মজনিত বিবিধ স্থূল ভোগ[জাগ্রৎকালে] ভোগ করিয়া পশ্চাৎ(স্বপ্নের হেতুভূত কর্ম্মের অভিব্যক্তি হইলে পর) স্ববুদ্ধি- পরিকল্পিত অপরাপর সূক্ষ্ম বিষয়সমূহ আত্মজ্যোতিঃ দ্বারা ভোগ করিয়া থাকেন, পুনশ্চ[সুষুপ্তিদশায়] সেই সমস্ত বিষয়রাশি ক্রমে স্বীয় আত্মায় সংস্থাপন করিয়া, পরিশেষে সর্ব্বপ্রকার সবিশেষ ভাবসমূহ পরিত্যাগপূর্ব্বক নির্গুণস্বরূপ প্রাপ্ত হন, সেই তুরীয় পরমাত্মা আমাদিগকে রক্ষা করুন(১) ॥ ২

(১) তাৎপর্য্য—সাধারণতঃ জাগ্রৎ স্বপ্ন ও সুষুপ্তি, এই তিনটি অবস্থা প্রসিদ্ধ আছে। স্বয়ং ব্রহ্মই জীবভাবে স্বীয় শুভাশুভ কর্মফলে জাগ্রৎ অবস্থায় স্থূল বিষয়সমূহ ভোগ করেন। সেই ভোগানুকুল কর্ম্মের ক্ষয় হইলে স্বপ্নাবস্থায় উপস্থিত হন; তখন জাগ্রৎকালীন মানস-সংস্কারবলে সূক্ষ্ম বাসনাময় বিষয়রাশি ভোগ করেন। স্বপ্নজনক সেই কর্মরাশির ক্ষয় হইলে, সুষুপ্তি দশা উপস্থিত হয়; তখন কোন ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়া থাকে না; সমস্তই কারণে বিলীন হইয়া যায়। আত্মা যখন উক্ত অবস্থাত্রয়ের সহিত সম্বন্ধরহিত হয়, তখন তাহাকে ‘তুরীয়’ বলা হইয়া থাকে।

আগম-প্রকরণম্ ৩
* প্রতিপদানায়, ইতি বা পাঠঃ। † বিপক্ষভূতানি ইতি বা পাঠঃ।

ভাষ্যাবতরণিকা

ওঁমিত্যেতদক্ষরমিদং সর্ব্বম্ তস্যোপব্যাখ্যানম্। বেদান্তার্থসারসংগ্রহভূতমিদং প্রকরণচতুষ্টয়ম্ ওঁমিত্যেতদক্ষরমিত্যাদি আরভ্যতে। অতএব ন পৃথক্সম্বন্ধা- ভিধেয়-প্রয়োজনানি বক্তব্যানি। যান্যের তু বেদান্তে সম্বন্ধাভিধেয়-প্রয়োজনানি, তান্যের ইহাপি ভবিতুমর্হন্তি; তথাপি প্রকরণব্যাচিখ্যাসুনা সঙ্ক্ষেপতো বক্তব্যানি, ইতি মন্যন্তে ব্যাখ্যাতারঃ।

তত্র প্রয়োজনবৎসাধনাভিব্যঞ্জকত্বেন অভিধেয়সম্বন্ধং শাস্ত্রং পারম্পর্য্যেণ বিশিষ্ট- সম্বন্ধাভিধেয়প্রয়োজনবদ্ভবতি। কিং পুনস্তৎ প্রয়োজনমিতি? উচ্যতে-রোগার্ত্তস্যেব রোগনিবৃত্তৌ স্বস্থতা, তথা দুঃখাত্মকস্য আত্মনো দ্বৈতপ্রপঞ্চোপশমে স্বস্থতা- অদ্বৈতভাবঃ প্রয়োজনম্। দ্বৈতপ্রপঞ্চস্য চ অবিদ্যাকৃতত্বাদ বিদ্যয়া তদুপশমঃ স্যাৎ, ইতি ব্রহ্মবিদ্যা-প্রকাশনায় অস্যারম্ভঃ ক্রিয়তে। “যত্র হি দ্বৈতমিব ভবতি।” “যত্র বা অন্যদিব স্যাৎ, তত্রান্যোহন্যৎ পশ্যেদন্যোহন্যদ্বিজানীয়াৎ।” “যত্র ত্বস্য সর্ব্বমাত্মৈবাভূৎ, তৎ কেন কং পশ্যেৎ, তৎ কেন কং বিজানীয়াৎ” ইত্যাদি- শ্রুতিভ্যোহস্যার্থস্য সিদ্ধিঃ।

তত্র তাবদোঙ্কারনির্ণয়ায় প্রথমং প্রকরণম্ আগমপ্রধানম্ আত্মতত্ত্বপ্রতিপত্যু- পায়ভূতম্। যস্য দ্বৈতপ্রপঞ্চস্য উপশমে অদ্বৈতপ্রতিপত্তিঃ রজ্জামিব সর্পাদিবিকল্পো- পশমে রজ্জুতত্ত্বপ্রতিপত্তিঃ, তস্য দ্বৈতস্য হেতুতো বৈতথ্য-প্রতিপাদনায় দ্বিতীয়ং প্রকরণম্। তথা অদ্বৈতস্যাপি বৈতথ্যপ্রসঙ্গপ্রাপ্তৌ যুক্তিতস্তথাত্বদর্শনায় * তৃতীয়ৎ প্রকরণম্। অদ্বৈতস্য তথাত্বপ্রতিপত্তি-প্রতিপক্ষভূতানি † যানি বাদান্তরাণি অবৈদিকানি সন্তি, তেষামন্যোন্যবিরোধিত্বাদ্ অতথার্থত্বেন তদুপপত্তিভিরেব নিরা- করণায় চতুর্থং প্রকরণম্।

অনুবাদ

এই সমস্তই ‘ওম্’ এই অক্ষরাত্মক ইত্যাদি। অর্থাৎ বেদান্তশাস্ত্রের সার- সংগ্রহভূত ‘ওম্ ইত্যেতদ্ অক্ষরম্’ ইত্যাদি প্রকরণচতুষ্টয়াত্মক(পরিচ্ছেদ- চতুষ্টয়বিশিষ্ট) এই শাস্ত্র আরব্ধ হইতেছে। এজন্য ইহার বিষয়, সম্বন্ধ ও প্রয়োজন পৃথগভাবে বলা অনাবশ্যক। কারণ, বেদান্তশাস্ত্রে যে সমস্ত সম্বন্ধ, অভিধেয় (প্রতিপাদ্য) ও প্রয়োজন, এই গ্রন্থেও সেই সমস্তই থাকা উচিত;[সুতরাং যদিও সে সকলের নির্দেশ অনাবশ্যক,] তথাপি, ব্যাখ্যাতৃগণ মনে করেন যে,

৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

প্রকরণ-ব্যাখ্যাকারীর(*) পক্ষে ঐ সমস্ত বিষয়ও সংক্ষেপে বর্ণনা করা আবশ্যক।

তন্মধ্যে প্রয়োজনসিদ্ধির অনুকূল সাধন-সমূহ প্রকাশ করে বলিয়া প্রতিপাদ্য বিষয়ের সহিতও শাস্ত্রের সম্বন্ধ লাভ ঘটে; সুতরাং ঐরূপ পরম্পরাসম্বন্ধে প্রয়োজনীয় শাস্ত্রেরও বিশিষ্ট সম্বন্ধ, বিশিষ্ট প্রতিপাদ্য, এবং বিশিষ্ট প্রয়োজনবত্তা সিদ্ধ হইয়া থাকে।(+) ভাল, সেই প্রয়োজনটি কি? বলা হইতেছে— রোগার্তের যেমন রোগনিবৃত্তিতে স্বস্থতা হয়, তেমনি দুঃখাভিমানী আত্মারও যে, দ্বৈতপ্রপঞ্চ বা ভেদবুদ্ধি নিবৃত্তিতে স্বস্থভাব বা অদ্বৈতভাবে স্থিতি, সেই অদ্বৈতভাবই প্রয়োজন। দ্বৈতপ্রপঞ্চ যখন অবিদ্যাকৃত, তখন ব্রহ্মবিদ্যা দ্বারা তাহার নিবৃত্তি হওয়া সম্ভবপর; এইজন্য ব্রহ্ম-বিদ্যাপ্রকাশার্থ এই গ্রন্থের আরম্ভ করা হইতেছে। ‘যখন দ্বৈতের ন্যায় হয়।’ ‘যখন ভিন্নের মত হয়, তখনই অপরে অপরকে দর্শন করিয়া থাকে; অপরে অপরকে জানিয়া থাকে।’ ‘সমস্তই যখন ইহার(জ্ঞানীর) আত্মস্বরূপ হইয়া যায়, তখন কাহার দ্বারা কাহাকে দেখিবে ও জানিবে?’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতে উক্ত বিষয়টি প্রমাণিত হয়।

তন্মধ্যে প্রথমতঃ ওঁঙ্কারের স্বরূপ-নির্ণয়ার্থ আত্মতত্ত্ব-জ্ঞানের উপায়ীভূত আগমপ্রধান(শব্দপ্রমাণ-প্রধান) প্রথম প্রকরণ[আরব্ধ হইতেছে]। রজ্জুতে সর্পাদি-বিতর্ক নিবৃত্ত হইলে যেমন রজ্জুতত্ত্ব প্রতীতিগোচর হয়, তেমনি যে দ্বৈত- প্রপঞ্চের নিবৃত্তিতে অদ্বৈত-বোধ উপস্থিত হয়, সেই দ্বৈতপ্রপঞ্চ যে, স্বীয়

* তাৎপর্য্য—একপ্রকার গ্রন্থের নাম প্রকরণ। তাহার লক্ষণ এইরূপ— “শাস্ত্রৈকদেশসম্বন্ধং শাস্ত্রকার্য্যান্তরে স্থিতম্। আহুঃ ‘প্রকরণং’ নাম গ্রন্থভেদং বিপশ্চিতঃ। কোন একটি প্রসিদ্ধ শাস্ত্রের বিষয়-বিশেষ-প্রতিপাদক এবং প্রধান শাস্ত্রের যাহা মুখ্য উদ্দেশ্য, প্রকারান্তরে সেই উদ্দেশ্যেরই সাধক গ্রন্থ-বিশেষকে পণ্ডিতগণ ‘প্রকরণ’ বলেন। অর্থাৎ কোন একটি বৃহৎ শাস্ত্রে যে সমস্ত বিষয় জটিল তর্কযোগে সংস্থাপিত হইয়াছে, তৎসমস্তের কোন কোন অংশ লইয়া সহজে ও সংক্ষেপে প্রতিপাদনার্থ যে গ্রন্থ বিরচিত হয়, তাহাই প্রকরণ-গ্রন্থ। মূল শাস্ত্রের যাহা বিষয়(প্রতিপাদ্য), সেই প্রতিপাদ্য বিষয়ের সহিত শাস্ত্রের যেরূপ সম্বন্ধ, এবং সেই শাস্ত্রের যাহা প্রয়োজন, সেই শাস্ত্রীয় প্রকরণ-গ্রন্থেরও বিষয়, সম্বন্ধ ও প্রয়োজন তাহাই, পৃথক্ নহে; সুতরাং প্রকরণ-গ্রন্থের প্রারম্ভে প্রতিপাদ্য বিষয়, সম্বন্ধ ও প্রয়োজনের পৃথগভাবে উল্লেখ অনাবশ্যক।

† তাৎপর্য্য—এই গ্রন্থের সাক্ষাৎ প্রয়োজন—মোক্ষলাভ, ব্রহ্মাত্মৈকত্বজ্ঞান তাহার সাধন। যদিও সাক্ষাৎ সম্বন্ধে জ্ঞান ও প্রয়োজনের সহিত শাস্ত্রের সম্বন্ধ নাই

আগম-প্রকরণম্ ৫

কারণানুসারেও মিথ্যা, তৎপ্রতিপাদনার্থ দ্বিতীয় প্রকরণ। সেইরূপ অদ্বৈত ব্রহ্মেরও মিথ্যাত্ব সম্ভাবনা হইতে পারে, এই জন্য যুক্তি দ্বারা তাহার সত্যতা প্রতিপাদনার্থ তৃতীয় প্রকরণ; আর অদ্বৈততত্ত্বের প্রতিপক্ষভূত অপরাপর যে সমস্ত অবৈদিক (বেদবহির্ভূত) বাদ বা মতান্তর আছে, তৎসমুদয় পরস্পর-বিরুদ্ধ; সুতরাং যথার্থ নহে; অতএব তাহাদেরই যুক্তি দ্বারা তাহাদের মত-সমূহের খণ্ডনকরণার্থ চতুর্থ প্রকরণ আরব্ধ হইয়াছে।

( উপনিষদারম্ভ)

ওঁমিত্যেতদক্ষরমিদং, সর্ব্বং, তস্যোপব্যাখ্যানং—ভূতং ভবদ্ ভবিষ্যদিতি সর্ব্বমোঙ্কার এব। যচ্চান্যৎ ত্রিকালাতীতম্, তদপ্যোঙ্কার এব ॥ ১

প্রণম্য গুরুপাদাজং স্মৃতা শঙ্করসম্মতিম্। মাণ্ডূক্যোপনিষদব্যাখ্যা সরলাখ্যা বিতন্যতে॥

সরলার্থঃ

[অথ ওঁঙ্কারস্য পরাপরব্রহ্মপ্রতীকত্বমাবেদয়িতুং প্রথমং তস্য সর্বাত্মকত্বম উপদিশতি “ওঁম্ ইত্যেতৎ” ইত্যাদিনা।]—ইদং(দৃশ্যমানম্ অভিধেয়রূপং) সর্ব্বং(সকলং জগৎ) ‘ওঁম্’ ইত্যেতৎ(অভিধানাত্মকম্) অক্ষরং(প্রণবাত্মকং)। তস্য(পরাপরব্রহ্মবাচকস্য ওঁঙ্কারস্য) ইদং(বক্ষ্যমাণং) উপব্যাখ্যানং(ব্রহ্মা- ভিধায়কতয়া বিস্পষ্টং কথনং)[আরব্ধং জ্ঞাতব্যমিতি শেষঃ]। ভূতং (অতীতং), ভবৎ(বর্তমানং), ভবিষ্যৎ(অনাগতং চ) ইতি(এতৎ) সর্ব্বং ওঁঙ্কার এব(ওঙ্কারাদনতিরিক্তম্ এব)। অন্যৎ(অপরং) চ(অপি) যৎ(বস্তু) ত্রিকালাতীতং(কালত্রয়াতীতং), তৎ অপি ওঁঙ্কারঃ(ওঙ্কারাত্মকং) এব(নিশ্চয়ে)॥ ওঁঙ্কারই যে, পর ব্রহ্ম ও অপর ব্রহ্মের প্রতীক বা আলম্বন, ইহা জ্ঞাপনার্থ প্রথমতঃ ওঁঙ্কারের সর্ব্বাত্মকতা নির্দেশ করিতেছেন। এই দৃশ্যমান সমস্ত জগৎই ‘ওঁম্’ এই অক্ষরাত্মক। তাহার সুস্পষ্ট বিবরণ এই যে, ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান, এই সমস্ত বস্তুই ওঁঙ্কারাত্মক এবং কালত্রয়াতীত আরও যাহা কিছু আছে, তাহাও এই ওঁঙ্কারস্বরূপই ॥ ১

৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কথং পুনরোঙ্কারনির্ণয় আত্মতত্ত্বপ্রতিপত্যুপায়ত্বং প্রতিপদ্যত ইতি, উচ্যতে- “ওঁমিত্যেতৎ”, “এতদালম্বনম্”, “এতদ্বৈ সত্যকাম পরঞ্চাপরঞ্চ ব্রহ্ম যদোঙ্কারঃ। তস্মাদ্ বিদ্বানেতেনৈবায়তনেনৈকতরমন্বেতি।” “ওমিত্যাত্মানং যুঞ্জীত,” “ওমিতি ব্রহ্ম,” “ওঁঙ্কার এবেদং সর্ব্বম্” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ। রজ্জাদিরিব সর্পাদিবিকল্পস্য আস্পদম্ অদ্বয় আত্মা পরমার্থতঃ সন্ প্রাণাদিবিকল্পস্যাস্পদং যথা, তথা সর্ব্বোহপি বাক্প্রপঞ্চঃ প্রাণাদ্যাত্মবিকল্পবিষয় ওঁঙ্কার এব। স চাত্মস্বরূপমেব, তদভিধায়ক- ত্বাৎ। ওঁঙ্কারবিকারশব্দাভিধেয়শ্চ সর্ব্বঃ প্রাণাদিরাত্মবিকল্পঃ অভিধানব্যতিরেকেণ নাস্তি “বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়ম্”; “তদস্যেদং বাচা তন্ত্র্যা নামভির্দ্দামভিঃ সর্ব্বং সিতম্, সর্ব্বং হীদং নামনি” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ। অত আহ ওঁমিত্যেতদক্ষরমিদং সর্ব্বমিতি। যদিদম্ অর্থজাতম্ অভিধেয়ভূতং, তস্য অভি- ধানাব্যতিরেকাৎ, অভিধানভেদস্য চ ওঁঙ্কারাব্যতিরেকাৎ ওঁঙ্কার এবেদং সর্ব্বম্। পরঞ্চ ব্রহ্ম অভিধানাভিধেয়োপায়পূর্ব্বকমবগম্যত ইত্যোঙ্কার এব। তস্যৈতস্য পরা- পরব্রহ্মরূপস্য অক্ষরস্য ওঁমিত্যেতস্য উপব্যাখ্যানম্, ব্রহ্মপ্রতিপত্যুপায়ত্বাদ ব্রহ্মসমীপ- তয়া বিস্পষ্টং প্রকথনমুপব্যাখ্যানং প্রস্তুতং বেদিতব্যমিতি বাক্যশেষঃ। ভূতৎ ভবদ্ ভবিষ্যদিতি কালত্রয়পরিচ্ছেদ্যং যৎ, তদপি ওঁঙ্কার এব উক্তনায়তঃ। যচ্চ অন্যৎ ত্রিকালাতীতং কাৰ্য্যাধিগম্যং কালাপরিচ্ছেদ্যমব্যাকৃতাদি, তদপি ওঁঙ্কার এব ॥ ১

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, ওঁঙ্কারের তত্ত্বনির্ণয়ই যে, আত্মতত্ত্ববোধের উপায়, তাহা জানা যায় কিরূপে? হাঁ, বলা হইতেছে ‘এই ওঁঙ্কার,’ ‘ইহাই (ওঁঙ্কারই)[শ্রেষ্ঠ] আলম্বন(ধ্যেয়);’ ‘হে সত্যকাম, এই যে ওঁঙ্কার, ইহাই পর ও অপর ব্রহ্ম; সেইজন্য ওঁঙ্কারবিৎ পুরুষ এই ওঁঙ্কার আলম্বন দ্বারা[উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়নের মধ্যে] একটিকে প্রাপ্ত হন।’ “আত্মাকে ‘ওম্’ ইত্যাকারে চিন্তা করিবে।” ‘ওঁঙ্কারই ব্রহ্ম’। ‘ওঁঙ্কারই এই সমস্ত’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতে[তাহা জানা যায়]। ‘রজ্জু প্রভৃতি সত্য পদার্থ যেমন সর্পাদি-বিতর্কের আশ্রয়, তেমনি যথার্থ সত্য অদ্বিতীয় আত্মাই প্রাণাদি বিবিধ কল্পিত ভাবের আশ্রয়। উক্ত দৃষ্টান্তটি যেরূপ ঠিক, সেইরূপই আত্মাতে

আগম-প্রকরণম্ ৭

প্রাণাদি বিকল্পবুদ্ধির বিষয়ীভূত সমস্ত বাক্-প্রপঞ্চ বা শব্দরাশিও ওঁঙ্কারস্বরূপই; সেই ওঁঙ্কারও আবার নিশ্চয়ই আত্মস্বরূপ; কেন না, ওঁঙ্কারই আত্মার অভিধায়ক বা প্রতিপাদক। শব্দমাত্রই ওঁঙ্কার- বিকার(ওঁঙ্কার হইতে উৎপন্ন), সেই শব্দের অভিধেয় প্রাণাদি পদার্থমাত্রই আত্ম-বিকল্প(আত্মাতে কল্পিত); সুতরাং সে সকলের শব্দাতিরিক্ত সত্তাই নাই। ইহা—‘বিকারমাত্রই বাক্যারব্ধ— নামমাত্র।’ এই ব্রহ্মসম্বন্ধী এই সমস্ত জগৎই বাক্যরূপ দীর্ঘ-সূত্রময় নামরূপ রজ্জু দ্বারা আবদ্ধ।’ এই সমস্তই নামে[স্থিত]; ইত্যাদি শ্রুতি হইতে প্রমাণিত হয়। এজন্য বলিতেছেন—

এই যে অভিধেয়রূপ(বাক্যার্থ-স্বরূপ) বিষয়সমূহ, যেহেতু তাহা স্বীয় অভিধান বা বাচক শব্দ হইতে অতিরিক্ত নহে, এবং যেহেতু বাচকশব্দমাত্রই ওঁঙ্কার হইতে অনতিরিক্ত; অতএব ওঁঙ্কারই এই দৃশ্যমান সমস্ত পদার্থ। বাচ্য-বাচক সম্বন্ধ হইতেই পর ব্রহ্মের প্রতীতি হইয়া থাকে; সুতরাং তাহাও ‘ওঁকার-স্বরূপই বটে। পর ও অপর ব্রহ্মস্বরূপ সেই ‘ওঁম্’ এই অক্ষরের উপব্যাখ্যান, অর্থাৎ ইহাই ব্রহ্ম-প্রতীতির উপায়স্বরূপ; অতএব, ব্রহ্মসন্নিহিতরূপে স্পষ্টাক্ষরে প্রকৃষ্টরূপে কথনরূপ(বর্ণনাত্মক) ইহার উপব্যাখ্যান আরব্ধ হইতেছে, বুঝিতে হইবে।[বুঝিতে হইবে] এই অংশটি উক্ত বাক্যে শেষ বা অনুক্ত রহিয়াছে;[ভাষ্যকার তাহাই পূরণ করিয়া দিলেন]। পূর্ব্বোক্ত যুক্তি অনুসারে[বুঝিতে হইবে,] ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান, এই কালত্রয়বর্তী যে কোন বস্তু, তাহাও ওঁঙ্কারস্বরূপই। এতদতি- রিক্ত প্রকৃতি প্রভৃতি যে সমস্ত পদার্থ উক্ত কালত্রয় দ্বারা পরিচ্ছেদ- যোগ্য নহে, অথচ কার্য্য-গম্য-মাত্র(কার্য্য-দর্শনে অনুমেয়-মাত্র), তাহাও এই ওঁঙ্কার হইতে অতিরিক্ত নহে ॥ ১

সর্ব্বংহেতদ্ ব্রহ্মায়মাত্মা ব্রহ্ম, সোহয়মাত্মা চতুষ্পাৎ ॥ ২

৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

সরলার্থঃ

[ ওঁঙ্কারস্য ব্রহ্মণো নামধেয়ত্বাদিরূপতাং বক্তুমাহ—সর্ব্বমিত্যাদি।] এতৎ— (অনুভূয়মানং) সর্ব্বং(জগৎ) হি(নিশ্চয়ে) ব্রহ্ম(সত্যজ্ঞানাদিলক্ষণ-ব্রহ্ম- স্বরূপম্); অয়ম্(অনুভূয়মানঃ) আত্মা(অহং-প্রতীতিগোচরঃ ত্বংপদার্থঃ) [চ] ব্রহ্ম(পূর্ব্বোক্তলক্ষণং)। সঃ(উক্তলক্ষণঃ) অয়ং আত্মা(ওঁঙ্কারবাচ্যঃ) চতুষ্পাৎ(চত্বারঃ পাদাঃ অংশাঃ বক্ষ্যমাণাঃ যস্য, স চতুষ্পাৎ)॥

এই পরিদৃশ্যমান সমস্ত জগৎই ব্রহ্মস্বরূপ, এবং এই আত্মাও(জীবও) ব্রহ্ম- স্বরূপ; সেই এই আত্মা চতুষ্পাৎ অর্থাৎ চারিটি অংশযুক্ত ৷ ২

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

অভিধানাভিধেয়য়োরেকত্বেহপি অভিধানপ্রাধান্যেন নির্দেশঃ কৃতঃ “ওঁমিত্যে- তদক্ষরমিদং সর্ব্বম্” ইত্যাদি। অভিধানপ্রাধান্যেন নির্দিষ্টস্য পুনরভিধেয়-প্রাধান্যেন নির্দেশঃ অভিধানাভিধেয়য়োঃ একত্বপ্রতিপত্ত্যর্থঃ। ইতরথা হি অভিধানতন্ত্রা অভিধেয়-প্রতিপত্তিরিতি অভিধেয়স্য অভিধানত্বং গৌণমিত্যাশঙ্কা স্যাৎ। একত্বপ্রতিপত্তেশ প্রয়োজনমভিধানাভিধেয়য়োঃ একেনৈব প্রযত্নেন যুগপৎ প্রবিলা- পয়ন্ তদ্বিলক্ষণং ব্রহ্ম প্রতিপদ্যেতেতি। তথা চ বক্ষ্যতি—“পাদা মাত্রাঃ, মাত্রাশ্চ পাদাঃ” ইতি। তদাহ—

সর্ব্বং হ্যেতব্রহ্মেতি। সর্ব্বং যদুক্তমোঙ্কারমাত্রমিতি, তদেতদ্ ব্রহ্ম। তচ্চ ব্রহ্ম পরোক্ষাভিহিতং প্রত্যক্ষতো বিশেষেণ নিৰ্দ্দিশতি—‘অয়মাত্মা ব্রহ্ম’ ইতি। অয়মিতি চতুষ্পাত্বেন প্রবিভজ্যমানং প্রত্যগাত্মতয়া অভিনয়েন নিৰ্দ্দিশতি ‘অয়মাত্মা ব্রহ্ম’ ইতি। সোহয়ম্ আত্মা ওঁঙ্কারাভিধেয়ঃ পরাপরত্বেন ব্যবস্থিতঃ চতুষ্পাৎ কার্ষা- পণবৎ, ন গৌরিবেতি। ত্রয়াণাং বিশ্বাদীনাং পূর্ব্বপূর্ব্বপ্রবিলাপনেন তুরীয়স্য প্রতি- পত্তিরিতি করণসাধনঃ পাদশব্দঃ; তুরীয়স্য তু পদ্যত ইতি কৰ্ম্মসাধনঃ পাদশব্দঃ ॥ ২

ভাষ্যানুবাদ

বাচ্য ও বাচকের ভেদ না থাকিলেও “ওঁম্ ইত্যেদক্ষরং” ইত্যাদি মন্ত্রে অভিধান বা বাচক ওঁঙ্কারেরই প্রাধান্যানুসারে নির্দেশ করা হইয়াছে। অভিধায়ক ওঁঙ্কারের প্রাধান্যানুসারে যাহা নির্দিষ্ট হইয়াছে, তাহারই যে, আবার অভিধেয় বা বাচ্যার্থ-প্রাধান্যে নির্দেশ করা হইতেছে, তাহার উদ্দেশ্য—অভিধান ও অভিধেয়ের অর্থাৎ বাচক প্রণব ও তদ্বাচ্য অর্থের অভেদ-প্রতিপাদন। নচেৎ বাচ্যার্থের প্রতীতি যখন

আগম-প্রকরণম্ ৯

তদ্বাচক শব্দের অধীন, তখন অভিধেয়কে(বাচ্যার্থকে) যে অভি- ধানাত্মক বলিয়া কথন, তাহা গৌণ, এই আশঙ্কা দুর্নিবার হইতে পারিত।(অভিধান ও অভিধায়কের একত্বোক্তির প্রয়োজন এই যে, একই চেষ্টায় একই বারে অভিধান ও অভিধায়কের বিলাপন বা তিরোধান করিয়া অর্থাৎ তদুভয়ের প্রতীতি স্থগিত করিয়া, বাচ্য-বাচকভাব-বিলক্ষণ ব্রহ্মস্বরূপের উপলব্ধি করা।) সেইরূপ কথিতও হইবে যে, ‘পাদসমূহই মাত্রা’(তদ্বাচক ওঁঙ্কার-স্বরূপ, মাত্রাসমূহও আবার তদ্বাচ্য পাদসমূহস্বরূপ, অর্থাৎ পাদ ও মাত্র পৃথক্ পদার্থ নহে।) শ্রুতি তাহাই বলিতেছেন—

এই সমস্তই ব্রহ্মস্বরূপ, অর্থাৎ যে সমস্তকে ওঁঙ্কারাত্মক বলা হইয়াছে, সেই সমস্তই ব্রহ্মস্বরূপ। সেই ব্রহ্মকে ইতঃপূর্ব্বে পরোক্ষভাবে নির্দেশ করা হইয়াছে, এখন আবার সাক্ষাৎ সম্বন্ধে বিশেষ করিয়া নির্দেশ করিয়া বলিতেছেন যে, ‘এই আত্মা ব্রহ্ম- স্বরূপ‘। ‘অয়ম্ আত্মা’ এই বাক্যে ‘অয়ং’ শব্দ দ্বারা চতুষ্পাদবিশিষ্ট- রূপে যাহার বিভাগ করা হইতেছে, সেই আত্মাকে[ অঙ্গুলি নির্দেশের ন্যায়] অভিনয় করিয়া প্রত্যক্(জীব) আত্মা-রূপে নির্দেশ করিতেছেন *।(পরাপর ব্রহ্মভাবে অবস্থিত ওঁঙ্কার শব্দার্থ সেই এই আত্মা কার্যাপণের(কাহণের ন্যায়) চতুষ্পাৎ(চারি অংশবিশিষ্ট); কিন্তু গো‘র মত নহে +।) ‘বিশ্ব’ প্রভৃতি পাদত্রয়ের

১০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

মধ্যে পূর্ব্ব পূর্ব্ব পাদের বিলোপসাধন দ্বারা(অসত্যতা প্রতিপাদন দ্বারা) তুরীয় ব্রহ্মের উপলব্ধি হইয়া থাকে; এই জন্য ‘পাদ’ শব্দটি করণবাচ্যে নিষ্পন্ন করিতে হয়; কিন্তু ‘পাদ’ শব্দটি যখন তুরীয়ের বোধক হয়, তখন ‘যাহা প্রাপ্ত হওয়া যায়’ এই অর্থে উহা কর্ম্মবাচ্যে নিষ্পন্ন করিতে হয় * ॥ ২

জাগরিতস্থানো বহিঃপ্রজ্ঞঃ সপ্তাঙ্গ । একোনবিংশতিমুখঃ স্থূলভুগ্ বৈশ্বানরঃ প্রথমঃ পাদঃ ॥ ৩

সরলার্থঃ

[ইদানীমাত্মনঃ পাদচতুষ্টয়ং নির্ব্বক্তমুপক্রমতে জাগরিতেত্যাদিনা।]- জাগরিতস্থানঃ(জাগরিতং স্থানং যস্য, সঃ তথোক্তঃ), বহিঃপ্রজ্ঞঃ(বহিঃ- বাহ্য-বিষয়ে রূপাদৌ প্রজ্ঞা জ্ঞানং যস্য, সঃ তথোক্তঃ), সপ্তাঙ্গঃ(দ্যুসূর্য্য- বায়াকাশ-রয়ি পৃথিব্যাহবনীয়াখ সপ্ত মূর্দ্ধ-চক্ষুঃ-প্রাণ-শরীরান্তর্ভাগ-মুত্রাশয়- পাদ-মুখাখ্যানি সপ্ত অঙ্গানি যস্য, সঃ সপ্তাঙ্গঃ), একোনবিংশতিমুখঃ(পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়াণি, পঞ্চ কর্ম্মেন্দ্রিয়াণি, পঞ্চপ্রাণাঃ, চত্বারি অন্তঃকরণানি, এতানি একোনবিংশতিঃ মুখানি উপলব্ধিদ্বারাণি যস্য, স তথোক্তঃ), স্থূলভুক্,(স্কুলানি রূপাদিবিষয়ান্ ভুঙ্ক্তে ইতি স্থূলভুক্), বৈশ্বানরঃ(বিশ্বেষাৎ জগতাম্ অয়ং নরঃ, বিশ্বে বা নরা অস্য, বিশ্বশ্চাসৌ নরশ্চেতি বা বিশ্বানরঃ বিশ্বানর এব বৈশ্বানরঃ) [আত্মনঃ] প্রথমঃ পাদঃ,(প্রথমোপলব্ধিবিষয়ত্বাদস্য প্রথমত্বং জ্ঞেয়মিতিভাবঃ) ॥

জাগ্রদবস্থা যাহার স্থান বা ভোগক্ষেত্র, বাহ্যবিষয়ে যাহার প্রজ্ঞা বা অনুভূতি, সাতটি যাহার অঙ্গ, ঊনবিংশতিটি যাহার মুখ বা উপলব্ধিদ্বার, স্কুলবিষয়ভোজী সেই বৈশ্বানরই আত্মার প্রথমপাদ, সাধকের নিকট প্রথমেই প্রতীতির বিষয় হয় ॥ ৩

আগম-প্রকরণম্ ১১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কথং চতুষ্পাত্তমিত্যাহ-জাগরিতস্থান ইতি। জাগরিতং স্থানমস্যেতি জাগরিতস্থানঃ, বহিঃপ্রজ্ঞঃ স্বাত্মব্যতিরিক্তে বিষয়ে প্রজ্ঞা যস্য স বহিঃপ্রজ্ঞঃ; বহির্বিষয়া ইব প্রজ্ঞা যস্য অবিদ্যাকৃতা অবভাসত ইত্যর্থঃ। তথা সপ্ত অঙ্গান্যস্য; “তস্য হ বা এতস্যাত্মনো বৈশ্বানরস্য মূর্দ্ধৈব সুতেজাশ্চক্ষুর্বিশ্বরূপ: প্রাণঃ পৃথগ্- বর্ম্মাত্মা সন্দেহো বহুলো বস্তিরেব রয়িঃ, পৃথিব্যেব পাদৌ” ইত্যগ্নিহোত্রাহুতি- কল্পনাশেষত্বেন অগ্নিমুখত্বেনাহবনীয় উক্তঃ, ইত্যেবং সপ্ত অঙ্গানি যস্য, স সপ্তাঙ্গঃ। তথা একোনবিংশতিঃ মুখান্যস্য; বুদ্ধীন্দ্রিয়াণি কর্মেন্দ্রিয়াণি চ দশ, বায়বশ্চ প্রাণাদয়ঃ পঞ্চ, মনো বুদ্ধিরহঙ্কারশ্চিত্তমিতি মুখানীব মুখানি, তানি; উপলব্ধি- দ্বারাণীত্যর্থঃ। স এবংবিশিষ্টো বৈশ্বানরো যথোক্তৈদ্বারৈঃ শব্দাদীন্ স্থূলান্ বিষয়ান্ ভুক্ত ইতি স্কুলভুক্। বিশ্বেষাৎ নরাণামনেকধা সুখাদিনয়নাৎ বিশ্বানরঃ; যদ্বা, বিশ্বশ্চাসৌ নরশ্চেতি বিশ্বানরঃ, বিশ্বানর এব বৈশ্বানরঃ; সর্ব্বপিণ্ডাত্মানন্যত্বাৎ, স প্রথমঃ পাদঃ। এতৎপূর্ব্বকত্বাদুত্তরপাদাধিগমস্য প্রাথম্যমস্য। কথম, “অয়মাত্মা ব্রহ্ম” ইতি প্রত্যগাত্মনোহস্য চতুষ্পাত্বে প্রকৃতে দ্যুলোকা- দীনাং মূর্দ্ধাদ্যঙ্গত্বমিতি? নৈষ দোষঃ; সর্ব্বস্য সাধিদৈবিকস্য অনেনাত্মনা চতুষ্পাত্ত্বস্য বিবক্ষিতত্বাৎ। এবঞ্চ সতি সর্ব্বপ্রপঞ্চোপশমে অদ্বৈতসিদ্ধিঃ। সর্ব্ব- ভূতস্থশ্চ আত্মা একো দৃষ্টঃ স্যাৎ; সর্ব্বভূতানি চাত্মনি। ‘যস্ত সর্ব্বাণি ভূতানি’ ইত্যাদিশ্রুত্যর্থ শ্চৈবমুপসংহৃতঃ স্যাৎ; অন্যথা হি স্বদেহপরিচ্ছিন্ন এব প্রত্যগাত্মা সাংখ্যাদিভিরিব দৃষ্টঃ স্যাৎ; তথা চ সতি অদ্বৈতমিতি শ্রুতিকৃতো বিশেষো ন স্যাৎ, সাংখ্যাদিদর্শনেনাবিশেষাৎ। ইষ্যতে চ সর্ব্বোপনিষদাং সর্ব্বাত্মৈক্যপ্রতিপাদকত্বম্; অতো যুক্তমেবাস্য আধ্যাত্মিকস্য পিণ্ডাত্মনো দ্যুলোকাদ্যঙ্গত্বেন বিরাড়াত্মনা অধিদৈবিকেনৈকত্বম্, ইত্যভিপ্রেত্য সপ্তাঙ্গত্ববচনম্। “মূর্দ্ধা তে ব্যপতিষ্যৎ” ইত্যাদিলিঙ্গদর্শনাচ্চ। বিরাজৈকত্বমুপলক্ষণার্থং হিরণ্যগর্ভাব্যাক্বতাত্মনোঃ। উক্তঞ্চৈত মধুব্রাহ্মণে বটে, কিন্তু জ্ঞানসাধন নহে। আবার পাদ শব্দটি যদি ‘পদ্যতে’ যঃ, স পাদঃ (যাহা প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহাই পাদ), এইরূপ কৰ্ম্মবাচ্যে নিষ্পন্ন করা হয়, তাহা হইলে ‘পাদ’ শব্দে কেবল তুরীয়কেই বুঝাইতে পারে, বিশ্বতৈজসাদিকে আর বুঝাইতে পারে না; কারণ, বিশ্বাদিরা কেবলই জ্ঞান-সাধন, কিন্তু জ্ঞেয় নহে। তাই ভাষ্যকার বলিলেন যে, ‘পাদ’ শব্দটি বিশ্বাদি অর্থে করণসাধন, আর তুরীয়

১২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

—যশ্চায়মস্যাং পৃথিব্যাং তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষঃ, যশ্চায়মধ্যাত্মম্” ইত্যাদি। সুষুপ্তাব্যাক্বতয়োত্ত্বেকত্বং সিদ্ধমেব, নির্বিশেষত্বাৎ। এবঞ্চ সতি এতৎ সিদ্ধং ভবিষ্যতি—সর্ব্বদ্বৈতোপশমে চাদ্বৈতমিতি ॥৩

ভাষ্যানুবাদ

ব্রহ্ম চতুষ্পাদ কি প্রকারে? এই আকাঙ্ক্ষায় বলিতেছেন- “জাগরিতস্থানঃ” ইত্যাদি। জাগরিত(জাগরণ) যাহার স্থান অর্থাৎ কার্য্যভূমি, তিনি জাগরিতস্থান; বহিঃপ্রজ্ঞ অর্থ-স্বীয় আত্মাতিরিক্ত (শব্দাদি) বিষয়ে যাঁহার প্রজ্ঞা বা বুদ্ধিবৃত্তি, তিনিই বহিঃপ্রজ্ঞ। অভিপ্রায় এই যে, তাঁহার অবিদ্যাজনিত জ্ঞান বাহ্যবিষয়াবলম্বীর ন্যায় প্রতিভাত হয়। সেইরূপ সাতটি যাঁহার অঙ্গ, অর্থাৎ ‘সেই এই বৈশ্বানর-নামক আত্মার সম্বন্ধে এই সুতেজা(দ্যুলোকই) শীর্ষস্বরূপ, বিশ্বরূপ(সূর্য্য) তাঁহার চক্ষুঃ, পৃথগ্বত্মাত্মা(বায়ু) তাঁহার প্রাণ, বহুল(আকাশ) তাঁহার দেহ, রয়ি(অন্ন বা জল) তাঁহার বস্তি(মূত্রাশয়), এবং পৃথিবীই তাঁহার পাদ’, এই শ্রুতিতেই কল্পিত অগ্নিহোত্র যজ্ঞের অঙ্গরূপে অগ্নিকে মুখরূপ আহবনীয়(হোম- কুণ্ড) বলা হইয়াছে; উক্তপ্রকার সাতটি যাঁহার অঙ্গ, তিনি সপ্তাঙ্গ; সেইরূপ একোনবিংশতিটি(উনিশটি) যাঁহার মুখ, অর্থাৎ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয় দশ, প্রাণাদি পঞ্চ বায়ু, মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার ও চিত্ত, এই (উনিশটি) যাঁহার মুখ-মুখের ন্যায়, অর্থাৎ উপলব্ধির উপায়। এবংবিধ বিশেষণবিশিষ্ট বৈশ্বানর উক্ত দ্বারসমূহ দ্বারা স্কুল বিষয়- সমূহ ভোগ করেন বলিয়া ‘স্থূলভুক্’।[‘বৈশ্বানর’ নামের যোগার্থ এইরূপ]-সমস্ত নরগণের অনেক প্রকার সুখাদি সম্পাদন করেন বলিয়া ‘বিশ্বানর’, অথবা সর্ব্ব নরস্বরূপ বলিয়া তিনি বিশ্বানর; বিশ্বানরই বৈশ্বানর[স্বার্থে তদ্ধিত-প্রত্যয় হইয়াছে]। সমস্ত দেহ হইতে অপৃথক্ বা অভিন্ন বলিয়া তিনি প্রথম পাদ। পরবর্তী পাদত্রয়- জ্ঞানের পূর্ব্বেই ইঁহাকে জানিতে হয়; এইজন্য ইঁহার প্রাথমিকত্ব। ভাল, “অয়ম্ আত্মা” এই শ্রুতিপ্রতিপাদিত প্রত্যক্ আত্মার

আগম-প্রকরণম্ ১৩

পাদ-চতুষ্টয় প্রতিপাদন করাই এখানে প্রস্তুত বা বর্ণনীয় বিষয়; তবে দ্যুলোক প্রভৃতিকে মূর্দ্ধপ্রভৃতি অঙ্গরূপে বর্ণনা করা হইতেছে কেন? না—এ দোষ হয় না; কারণ,(আধিদৈবিকের সহিত সমস্ত- জগৎপ্রপঞ্চকে এই আত্মা দ্বারা চতুষ্পাদরূপে বর্ণনা করাই এখানে বিবক্ষিত। এইরূপ হইলেই সমস্ত জগৎপ্রপঞ্চের নিবৃত্তিতে অদ্বৈত- ভাব সিদ্ধ হইতে পারে এবং সর্বভূতস্থিত আত্মার একত্ব এবং আত্মাতেও সর্বভূতের অবস্থিতি সাক্ষাৎকৃত হইতে পারে; এরূপ হইলে, ‘যিনি সর্বভূতকে—’ ইত্যাদি শ্রুতির অর্থও সংগৃহীত হইতে পারে। ইহা না হইলে, সাংখ্যাদি দার্শনিকগণের ন্যায় নিজ নিজ দেহ পরিচ্ছিন্নরূপেই প্রত্যক্ আত্মার(জীবাত্মার) উপলব্ধি হইত। তাহা হইলে, শ্রুতি-প্রতিপাদিত ‘অদ্বৈতবাদ’-রূপ বিশেষোক্তি উৎপন্ন হইত না; কারণ, এইমতে সাংখ্যাদি দর্শনের সহিত ইহার কিছুমাত্র বিশেষ বা বৈলক্ষণ্য থাকে না, অর্থাৎ সাংখ্যাদি দর্শনে যে ভেদবাদ(দ্বৈতবাদ) প্রতিপাদিত হইয়াছে, উপনিষদেও যদি সেই দ্বৈতবাদই প্রতিপাদিত হয়, তাহা হইলে, আর উপনিষৎ শাস্ত্রের অদ্বৈত-ব্রহ্ম-প্রতিপাদনাত্মক বৈশিষ্ট্য রক্ষা পাইতে পারে না। অথচ, সমস্ত উপনিষদেরই সমস্ত আত্মার একত্ব প্রতিপাদকতা স্বীকার করা হইয়া থাকে। অতএব এই আধ্যাত্মিক দেহীর দ্যুলোকাদি অঙ্গসম্বন্ধ- নিবন্ধন যে, আধিদৈবিক বিরাট্স্বরূপেরও একত্ব-প্রতিপাদন এবং তদভিপ্রায়ে যে সপ্তাঙ্গত্ব-কথন, তাহা যুক্তিযুক্তই বটে। বিশেষতঃ ‘তোমার মস্তক পড়িয়া যাইত’ ইত্যাদি সর্বাত্মকতা-গ্রাহক বাক্যও ইহার অপর হেতু। *

১৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

এখানে যে,[অধ্যাত্ম ও অধিদৈবের সহিত] বিরাটের একত্ব বা অভেদ কথিত হইল, তাহা হিরণ্যগর্ভ এবং অব্যাকৃতাত্মা প্রাজ্ঞেরও উপলক্ষণার্থ বা তদুভয়ের বোধক। মধু-ব্রাহ্মণেও উক্ত আছে—‘এই পৃথিবীতে এই যে তেজোময় ও অমৃতময় পুরুষ, এবং এই যে অধ্যাত্ম পুরুষ’ ইত্যাদি। সুষুপ্ত ও অব্যাকৃত পুরুষের মধ্যে যখন কিছুমাত্র বিশেষ নাই, তখন তদুভয়ের একত্বও সিদ্ধই আছে। এইরূপ হইলেই সর্বদ্বৈতনিবৃত্তিতে যে অদ্বৈত সিদ্ধ, তাহাও উপপন্ন হইবে॥ ৩

স্বপ্নস্থানোহন্তঃপ্রজ্ঞঃ সপ্তাঙ্গ একোনবিংশতিমুখঃ প্রবিবিক্ত- ভুক্ তৈজসো দ্বিতীয়ঃ পাদঃ ॥ ৪

সরলার্থঃ

[ দ্বিতীয়ং পাদমাহ]—স্বপ্নস্থানঃ(ইন্দ্রিয়াণামুপরমে জাগ্রৎ-সংস্কারজঃ সবিষয়ঃ প্রত্যয়ঃ স্বপ্নঃ, স এব স্থানং যস্য সঃ তথোক্তঃ), অন্তঃপ্রজ্ঞঃ(অন্তঃ চক্ষুরাদ্যপেক্ষয়া অভ্যন্তরে মনোবিলাসমাত্রে প্রজ্ঞা বুদ্ধিঃ যস্য সঃ তথোক্তঃ), সপ্তাঙ্গঃ(পূর্ব্বোক্তানি সুতেজঃ প্রভৃতীনি সপ্ত অঙ্গানি যস্য, তথোক্তঃ) একোনবিংশতিমুখঃ(পূর্ব্ববৎ) প্রবিবিক্তভুক্(প্রবিবিক্তং বাসনামাত্রং ভুঙ্ক্তে ইতি প্রবিবিক্তভুক্) তৈজসঃ (তেজোময়ান্তঃকরণমাত্রোজ্জলিতত্বাৎ তৈজসঃ), দ্বিতীয়ঃ পাদঃ(জাগরিতস্য পশ্চাদ্ভাবিত্বেন অস্য দ্বিতীয়ত্বমিতি ভাঃ)।

আত্মার দ্বিতীয় পাদ কথিত হইতেছে—স্বপ্নদর্শন ইহার স্থান, অন্তরে( অবাহ্য বিষয়ে) ইহার জ্ঞান, সুতেজঃ প্রভৃতি পূর্ব্বোক্ত সাতটি ইহার অঙ্গ, এবং পূর্ব্বোক্ত জ্ঞানেন্দ্রিয়াদি উনিশটি ইহার মুখ, কেবল সংস্কারোপস্থাপিত বিষয়ভোগী এই তৈজস( তেজোময় অন্তঃকরণস্বামী)[ আত্মার] দ্বিতীয় পাদ ॥ ৪

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

স্বপ্নঃ স্থানমস্য তৈজসস্যেতি স্বপ্নস্থানঃ। জাগ্রৎপ্রজ্ঞা অনেকসাধনা বহির্বিষয়ে- র্বাবভাসমানা মনঃস্পন্দনমাত্রা সতী তথাভূতং সংস্কারং মনস্যাধত্তে; তন্মনস্তথা সংস্কৃতং চিত্রিত ইব পটো বাহ্যসাধনানপেক্ষিবিদ্যা-কাম-কর্মভিঃ প্রের্য্যমাণং জাগ্রদ্বৎ অবভাসতে। তথা চোক্তম্—“অস্য লোকস্য সর্ব্বাবতো মাত্রামপাদায়” ইত্যাদি। তথা “পরে দেবে মনস্যেকীভবতি” ইতি প্রস্তুত্য “অত্রৈষ দেবঃ স্বপ্নে মহিমান-

* তথাচেতি। অস্য লোকস্যেতি জাগরিতোক্তিঃ, তস্য বিশেষণং সর্ব্বাবদিতি। সর্ব্বা সাধনসম্পত্তিরস্মিন্ অস্তীতি সর্ব্ববান্, সর্ব্ববানেব সর্ব্বাবান্, তস্য মাত্রা—

আগম-প্রকরণম্ ১৫

মনুভবতি” ইত্যাথর্ব্বণে। ইন্দ্রিয়াপেক্ষয়া অন্তঃস্থত্বাৎ মনসস্তদ্বাসনারূপা চ স্বপ্নে প্রজ্ঞা যস্যেতি অন্তঃপ্রজ্ঞঃ বিষয়শূন্যায়াং প্রজ্ঞায়াং কেবলপ্রকাশস্বরূপায়াং বিষয়িত্বেন ভবতীতি তৈজসঃ। বিশ্বস্য সবিষয়ত্বেন প্রজ্ঞায়াঃ স্থূলায়াঃ ভোজ্যত্বম্; ইহ পুনঃ কেবলা বাসনামাত্রা প্রজ্ঞা ভোজ্যেতি প্রবিবিক্তো ভোগ ইতি। সমানমন্যৎ। দ্বিতীয়ঃ পাদস্তৈজসঃ ॥ ৪

ভাষ্যানুবাদ

স্বপ্নই এই তৈজসের স্থান, এইজন্য ইহাকে স্বপ্নস্থান বলা হইয়া থাকে; অনেকবিধ সাধন-সাধ্য জাগ্রৎকালীন জ্ঞান কেবল মনোব্যাপার হইলেও, যেন বাহ্য বিষয়-গত হইয়াই প্রতীত হইয়া মনেতে তাদৃশ সংস্কার সমুৎপাদন করে। চিত্রিত বস্ত্রের ন্যায় তথাবিধ সংস্কারসম্পন্ন সেই মনই অবিদ্যা, বাসনা ও তৎকৃত কৰ্ম্ম- প্রেরিত হইয়া বাহ্য সাধননিরপেক্ষভাবে জাগ্রৎ-অবস্থার ন্যায় প্রতিভাত হইয়া থাকে। অন্যত্রও ইহা উক্ত আছে:-‘সর্বাবৎ (সর্বপ্রকার সাধনসম্পন্ন) এই জাগরিত অবস্থার বাসনা গ্রহণ করিয়া[স্বপ্ন দর্শন করে]’ ইত্যাদি। সেইরূপ ‘অপরাপর ইন্দ্রিয়া- পেক্ষা শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশস্বভাব মনে[স্বপ্নকালে সমস্তই] একীভূত হইয়া থাকে।’ এইরূপ ভূমিকার পর আর্থবণশ্রুতিতে বলা হইয়াছে যে, ‘এই স্বপ্নাবস্থায় এই স্বপ্রকাশ দ্রষ্টা মহিমা-মনের বিভূতি অনুভব করিয়া থাকে।’ মন স্বভাবতঃই ইন্দ্রিয়াপেক্ষা অন্তঃস্থ; স্বপ্নাবস্থায় তাঁহার স্থান সেই মানস-বাসনাময় হয়, এই কারণে তিনি অন্তঃপ্রজ্ঞ; আর শব্দাদি বিষয়বিহীন-কেবলই প্রকাশময় প্রজ্ঞার(জ্ঞানের) বিষয়ী(অনুভবিতা) হয় বলিয়া, তাহার নাম তৈজস। পূর্বোক্ত ‘বিশ্ব’-সংজ্ঞক প্রথম পাদের শব্দাদি বাহ্য বিষয়ে ভোগ বিদ্যমান থাকে, এইজন্য স্থূল প্রজ্ঞা তাহার ভোজ্য; কিন্তু এই তৈজসের কেবল বাসনাময় প্রজ্ঞাই একমাত্র ভোগ্য, এইজন্য ইহার ভোগও

১৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

প্রবিবিক্ত(সূক্ষ্ম)। অপর সমস্তই পূর্ব্ব শ্রুতির সমান। এই তৈজসই আত্মার দ্বিতীয় পাদ ॥ ৪

যত্র সুপ্তো ন কঞ্চন কামং কাময়তে, ন কঞ্চন স্বপ্নং পশ্যতি; তৎ সুষুপ্তম্। সুষুপ্তস্থান একীভূতঃ প্রজ্ঞানঘন এবানন্দময়ো হ্যানন্দভুক্ চেতোমুখঃ প্রাজ্ঞস্তৃতীয়ঃ পাদঃ ॥ ৫

সরলার্থঃ

[ইদানীং তৃতীয়ং পাদমাহ—যত্রেত্যাদিনা]।—যত্র(যস্মিন্ স্থানে) সুপ্তঃ (উপরতকরণবর্গঃ পুরুষঃ) কঞ্চন(কমপি) কামং(পুত্র-দারাদিকং) ন কাময়তে (প্রার্থয়তে); কঞ্চন(কমপি) স্বপ্নং(প্রাগুক্তলক্ষণং মানসবিলাসং) পশ্যতি, তৎ সুষুপ্তং(গাঢ়নিদ্রাবিশেষঃ) সুষুপ্তস্থানঃ(সুষুপ্তং স্থানং যস্য স তথোক্তঃ) একীভূতঃ(সর্ব্ববিক্ষেপোপরমাৎ একতামিব গতঃ), প্রজ্ঞানঘন এব(বাহ্যান্তরবিষয়ো- পরমাৎ প্রজ্ঞানপিণ্ডিতমিব প্রাপ্তঃ)[এবশব্দঃ পূর্ব্বোক্তাবস্থাদ্বয়-বৈলক্ষণ্যসূচনার্থঃ]। আনন্দময়ঃ(বিক্ষেপবিরহাৎ আনন্দপ্রচুরঃ) হি(নিশ্চয়ে) আনন্দভুক্(স্বরূপম্ আনন্দং ভুঙ্ক্তে ইতি আনন্দভুক্), চেতোমুখঃ(চেতঃ চিৎস্বরূপং মুখং ভোগদ্বারং যস্য সঃ তথোক্তঃ), প্রাজ্ঞঃ(প্রকৃষ্টে স্বাত্মবিষয়ে জ্ঞা—জ্ঞানং যস্য, সঃ প্রজ্ঞঃ, প্রজ্ঞ এব প্রাজ্ঞঃ) তৃতীয়ঃ পাদঃ।

সুষুপ্ত পুরুষ যে স্থানে বা অবস্থায় কোনরূপ ভোগ্য-বিষয় প্রার্থনা করে না, কোনরূপ স্বপ্ন দর্শন করে না, তাহাই ‘সুষুপ্ত’; এই সুষুপ্ত যাহার স্থান, [ বাহ্য ও আন্তর সর্ব্বপ্রকার বিষয় বিজ্ঞান না থাকায়] যিনি একীভাবপ্রাপ্ত, যিনি কেবলই প্রকৃষ্ট জ্ঞানমূর্ত্তি, প্রচুর আনন্দপূর্ণ ও আত্মানন্দভোজী এবং স্বীয় বোধশক্তি যাঁহার মুখস্বরূপ, সেই প্রাজ্ঞ আত্মা ইহার তৃতীয় পাদ ॥ ৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

দর্শনাদর্শনবৃত্ত্যোঃ তত্ত্বাপ্রবোধলক্ষণস্য স্বাপস্য তুল্যত্বাৎ সুষুপ্তিগ্রহণার্থং ‘যত্র সুপ্তঃ’ ইত্যাদিবিশেষণম্। অথবা ত্রিঘপি স্থানেষু তত্ত্বাপ্রতিবোধলক্ষণঃ স্বাপোহবিশিষ্টঃ, ইতি পূর্ব্বাভ্যাং সুষুপ্তং বিভজতে-যত্র যস্মিন্ স্থানে কালে বা সুপ্তো ন কঞ্চন কামং কাময়তে, ন কঞ্চন স্বপ্নং পশ্যতি। ন হি সুষুপ্তে পূর্ব্বয়োরিবান্যথাগ্রহণলক্ষণং স্বপ্নদর্শনং কামো বা কশ্চন বিদ্যতে। তদেতৎ সুষুপ্তং স্থানমস্যেতি সুষুপ্তস্থানঃ। স্থানদ্বয়প্রবিভক্তং মনঃস্পন্দিতং দ্বৈতজাতম্। তথা

আগম-প্রকরণম্ ১৭

রূপাপরিত্যাগেন অবিবেকাপন্নং নৈশতমোগ্রস্তমিবাহঃ সপ্রপঞ্চকম্ একীভূত- মিত্যুচ্যতে। অতএব স্বপ্নজাগ্রন্মনঃস্পন্দনানি প্রজ্ঞানানি ঘনীভূতানীব; সেয়মবস্থা অবিবেকরূপত্বাৎ প্রজ্ঞানঘন উচ্যতে। যথা রাত্রৌ নৈশেন তমসা অবিভজ্যমানং সর্ব্বং ঘনমিব, তদ্বৎ প্রজ্ঞানঘন এব। এবশব্দাৎ ন জাত্যন্তরং প্রজ্ঞান- ব্যতিরেকেণাস্তীত্যর্থঃ। মনসো বিষয়বিষয্যাকারস্পন্দনায়াসদুঃখাভাবাৎ আনন্দ- ময় আনন্দপ্রায়ঃ; নানন্দ এব, অনাত্যন্তিকত্বাৎ। যথা লোকে নিরায়াসঃ স্থিতঃ সুখী আনন্দভুক্ উচ্যতে, অত্যন্তানায়াসরূপা হীয়ং স্থিতিঃ অনেনাত্মনা অনু- ভূয়ত ইত্যানন্দভুক্, “এষোহস্য পরম আনন্দঃ” ইতি শ্রুতেঃ। স্বপ্নাদিপ্রতিবোধং চেতঃ প্রতি দ্বারীভূতত্বাৎ চেতোমুখঃ; বোধলক্ষণং বা চেতো দ্বারং মুখমস্য স্বপ্নাদ্যা- গমনং প্রতীতি চেতোমুখঃ। ভূতভাবিষ্যজ্ঞাতৃত্বং সর্ব্ববিষয়জ্ঞাতৃত্বমস্যৈবেতি প্রাজ্ঞঃ। সুযুপ্তোহপি হি ভূতপূর্ব্বগত্যা প্রাজ্ঞ উচ্যতে। অথবা, প্রজ্ঞপ্তিমাত্রমস্যৈব অসাধারণং রূপমিত প্রাজ্ঞঃ; ইতরয়োব্বিশিষ্টমপি বিজ্ঞানমস্তীতি। সোহয়ং প্রাজ্ঞ- তৃতীয়ঃ পাদঃ ॥ ৫ ॥

ভাষ্যানুবাদ

দর্শনবৃত্তি অর্থ—জাগরিত স্থান, আর অদর্শনবৃত্তি অর্থ—স্বপ্নস্থান, সুষুপ্তাবস্থার ন্যায় ঐ অবস্থাদ্বয়েও তত্ত্বজ্ঞানের অভাবরূপ স্বপ্নের সাদৃশ্য রহিয়াছে,(কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য নাই); এইজন্য ঐ অবস্থাদ্বয় হইতে সুষুপ্তাবস্থার পার্থক্য-সাধনের উদ্দেশে “যত্র সুপ্তঃ” ইত্যাদি বিশেষণ প্রদত্ত হইয়াছে। অথবা, তত্ত্বজ্ঞানের অভাবাত্মক স্বপ্ন-ধর্মটি অবস্থা- ত্রয়েই অবশিষ্ট বা সমান; এই কারণে পূর্ববর্তী অবস্থাদ্বয় হইতে সুষুপ্ত্যবস্থাকে পৃথক্ করা হইতেছে—‘যত্র’ অর্থ—যে স্থানে বা যে কালে সুপ্ত পুরুষ কোনও কাম(ভোগ্যবিষয়) কামনা করে না, কোনও স্বপ্ন দর্শন করে না। কারণ, সুষুপ্ত সময়ে পূর্বাবস্থাদ্বয়ের ন্যায় অন্যথাদর্শনাত্মক স্বপ্নদর্শন কিংবা কোনপ্রকার ভোগস্পৃহা বর্ত্ত- মান থাকে না। সেই এই সুষুপ্তাবস্থা যাঁহার স্থান, তিনি সুষুপ্তস্থান; দিবস যেরূপ নৈশ তমোরাশি দ্বারা গ্রস্ত হয়, অর্থাৎ রাত্রিরূপে পরিণত হয়, তদ্রূপ জাগ্রৎ-স্বপ্ন স্থানদ্বয়ে বিভিন্নপ্রকার, মনঃকল্পিত সপ্রপঞ্চ

১৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

দ্বৈতসমূহ নিজ নিজ রূপ পরিত্যাগ না করিয়াও যেন অবিবেক বা ভেদ- বুদ্ধিতে বিপর্যয় প্রাপ্ত হয়; এই কারণেই ‘একীভূত’ বলা হইয়া থাকে। এই কারণেই স্বপ্ন ও জাগ্রৎকালীন মনোব্যাপারময় প্রজ্ঞানসমূহ যেন ঘনীভূতই হইয়া থাকে; সেই এই অবস্থাটি অবিবেকাত্মক বলিয়া ‘প্রজ্ঞানঘন’ নামে কথিত হইয়া থাকে। উদাহরণ—রাত্রিকালে নৈশ তমোরাশি দ্বারা সমাচ্ছন্ন, অতএব পৃথগভাবে অপ্রীত বস্তুনিচয় যেমন ঘনভাবই যেন প্রাপ্ত হয়, তদ্রূপ তাহাও তৎকালে যেন প্রজ্ঞান- ঘনই হয়। ‘এব’ শব্দ হইতে বুঝা যায় যে, তৎকালে প্রজ্ঞান ব্যতীত অন্যবিধ কিছু থাকে না। তৎকালে বিষয়-বিষয়ী আকারে বা গ্রাহ্য-গ্রাহক-ভাবে মানস-ব্যাপারময় কোন প্রকার আয়াস ও তজ্জনিত দুঃখ থাকে না; এই জন্য ‘আনন্দময়’ অর্থাৎ আনন্দ-বহুল হয়; কিন্তু কেবলই আনন্দ-স্বরূপ নহে; কেন না, ঐ আনন্দ আত্যন্তিক আনন্দ নহে। সংসারে নিরায়াসস্থিত সুখী ব্যক্তি যেমন[আয়াস ক্লেশরাহিত্য নিবন্ধন] আনন্দভোগী বলিয়া কথিত হয়, তেমনি আয়াসের অত্যন্তাভাবাত্মক এই সুখাবস্থা তিনি অনুভব করিয়া থাকেন; এই কারণে তিনি আনন্দভুক; যেহেতু শ্রুতি বলিয়াছেন যে, ‘ইহাই তাঁহার পরম আনন্দ।’ চেতঃ অর্থ—স্বপ্নাদি জ্ঞান, ইহা তাহার স্বরূপ বলিয়া চেতোমুখ; অথবা স্বপ্নাদি লাভে জ্ঞানরূপী চেতঃই ইহার মুখ বা দ্বারস্বরূপ, এই কারণে চেতোমুখ। ইনিই অতীত ও ভবিষ্যৎ বিষয়বিজ্ঞানের কর্তা; এই জন্য ‘প্রাজ্ঞ’[নামে অভিহিত]। জাগ্রৎ ও স্বপ্ন দশায় প্রাজ্ঞত্ব ছিল, এই কারণে[সুষুপ্তি-সময়ে জ্ঞাতৃত্ব না থাকিলেও] ‘ভূতপূর্ব গতি’ নিয়মানুসারে সুষুপ্তি-সময়ে ‘প্রাজ্ঞ’ বলিয়া কথিত হন। অথবা কেবলই যে, প্রজ্ঞপ্তি বা জ্ঞানরূপতা, তাহা ইহারই অসাধারণ(বিশেষ) ধৰ্ম্ম; এজন্য ইনি প্রাজ্ঞ, অপর অবস্থা- দ্বয়ে বিশেষ বিশেষ বিজ্ঞানও থাকে,[কিন্তু এই অবস্থায় কেবলই জ্ঞানরূপে থাকে] এই জন্য সেই এই প্রাজ্ঞ তৃতীয় পাদ[বলিয়া কথিত হন]॥৫॥

আগম-প্রকরণম্ ১৯

এষ সর্ব্বেশ্বর এষ সর্ব্বজ্ঞ এষোহন্তর্য্যাম্যেষ যোনিঃ; সর্ব্বস্য প্রভবাপ্যয়ৌ হি ভূতানাম্ ॥ ৬ ॥

এষঃ(উক্তরূপঃ প্রাজ্ঞঃ) সর্ব্বেশ্বরঃ(সর্ব্বেষাং ভেদানাম্ ঈশ্বরঃ প্রভুঃ) এষঃ (উক্তলক্ষণঃ) সর্বজ্ঞঃ(সর্ব্বং জানাতীতি তথা); এষঃ(প্রাজ্ঞঃ) অন্তর্যামী (অন্তঃস্থঃ সন্ সর্ব্বান্ যময়তি যথানিয়মং চালয়তি, স তথোক্তঃ); হি(যস্মাৎ) এষঃ(প্রাজ্ঞঃ) ভূতানাং(উৎপত্তি-ধ্বংসশীলানাং বস্তু নাং) প্রভবাপ্যয়ৌ(প্রভবঃ— উৎপত্তিস্থানং, অপ্যয়ঃ বিলয়স্থানং চ, তৌ)[ভবত ইতি শেষঃ]।[অতঃ] এষঃ(প্রাজ্ঞঃ) সর্ব্বস্য(জগতঃ) যোনিঃ(কারণম্) ॥ ৬॥

ইনি(প্রাজ্ঞ) সকলের ঈশ্বর, ইনি সর্ব্বজ্ঞ, ইনি অন্তর্যামী(যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া সকলকে নিয়মিত করেন), এবং যেহেতু ইনিই সমস্ত ভূতের উৎপত্তি ও বিলয় স্থান; অতএব ইনিই সর্ব্ব জগতের কারণ ॥ ৬ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

এষ হি স্বরূপাবস্থঃ সর্ব্বেশ্বরঃ সাধিদৈবিকস্য সর্ব্বস্য ঈশ্বরঃ ঈশিতা; নৈতস্মাৎ জাত্যন্তরভূতোহন্যেষামিব, “প্রাণবন্ধনং হি সোম্য মনঃ” ইতি শ্রুতেঃ। অয়মেব হি সর্ব্বস্য সর্ব্বভেদাবস্থো জ্ঞাতেতি এষ সর্ব্বজ্ঞঃ; অতএব এযোহন্তর্যামী অন্তরনু- প্রবিশ্য সর্ব্বেষাং ভূতানাং যময়িতা নিয়ন্তাহপ্যেষ এব। অতএব যথোক্তং সভেদং জগৎ প্রসূয়ত ইতি এষ যোনিঃ সর্ব্বস্য। যত এবং, প্রভবশ্চাপ্যয়শ্চ প্রভবাপ্যয়ৌ হি ভূতানামেষ এব ॥ ৬ ॥

ভাষ্যানুবাদ

উপাধির প্রাধান্য বিলুপ্ত হইয়া যখন কেবল চৈতন্যেরই প্রাধান্য হয়, তাহাই স্বরূপাবস্থা, সেই অবস্থাপন্ন এই প্রাজ্ঞই সর্বেশ্বর, অর্থাৎ আধিদৈবিকের সহিত সমস্ত কার্য্যজগতের ঈশ্বর—ঈশিতা অর্থাৎ শাসনকর্তা। ঈশ্বর পদার্থটি অপরাপরের ন্যায় ইহা হইতে পৃথক্ পদার্থ নহে(তৎস্বরূপই বটে)। ‘হে সোম্য, প্রাণশব্দাভিহিত ব্রহ্মই মনের অর্থাৎ মন-উপাধিক আত্মার বন্ধন বা পর্য্যবসান-স্থান।’ এই শ্রুতিও এই অর্থের গ্রাহক। সর্বপ্রকার বিভাগাপন্ন এই প্রাজ্ঞই সকলের জ্ঞাতা; এই কারণে সর্বজ্ঞ; ইনিই অন্তর্যামী, অর্থাৎ ইনিই সর্বভূতের অন্তরে প্রবেশপূর্ব্বক নিয়মনকারীও বটে; এবং যেহেতু

২০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ইনিই সমস্ত ভূতের উৎপত্তি ও বিলয়স্থান; অতএব, ইনিই বিভিন্ন প্রকার জগৎ প্রসব করেন; সেইজন্য সমস্ত জগতের যোনি বা উৎপত্তি-স্থানও ইনিই ॥ ৬ ॥

অট্রেতে শ্লোকা ভবন্তি—

[ গৌড়পাদীয়-কারিকারম্ভঃ]

বহিঃপ্রজ্ঞো বিভুর্বিশ্বো হ্যন্তঃপ্রজ্ঞস্ত তৈজসঃ। ঘনপ্রজ্ঞস্তথা প্রাজ্ঞ এক এব ত্রিধা স্থিতঃ * ॥ ১ ॥ অত্র এতস্মিন্ অর্থে উক্তার্থ-সংগ্রাহকা এতে বক্ষ্যমাণাঃ শ্লোকাঃ ভবন্তি (বিদ্যন্তে)—

সরলার্থঃ

বহিঃপ্রজ্ঞঃ(জাগরিতে বাহ্যবিষয়কজ্ঞানবান্) বিভুঃ(ব্যাপকঃ প্রথমঃ পাদঃ) বিশ্বঃ(বিশ্বসংজ্ঞকঃ); হি(নিশ্চয়ে) অন্তঃপ্রজ্ঞঃ(স্বপ্নে মানস-সংস্কারোপস্থাপিত-- বিষয়-বিজ্ঞাতা দ্বিতীয়ঃ পাদঃ) তু(পুনঃ) তৈজসঃ(তৈজস-সংজ্ঞকঃ)। তথা (তদ্বৎ) ঘনপ্রজ্ঞঃ(প্রজ্ঞানঘনঃ)[তৃতীয়ঃ পাদঃ] প্রাজ্ঞঃ(প্রাজ্ঞসংজ্ঞকঃ) [ভবতীতি সর্ব্বত্রান্বয়:]।[এবমৌপাধিক-ভেদসত্ত্বেহপি বস্তুতস্তু] এক এব (আত্মা) ত্রিধা(ত্রিভিঃ প্রকারৈঃ উপলক্ষিতঃ সন্) স্থিতঃ(অবস্থিতঃ) [ভবতীতিশেষঃ]।

বাহ্যবিষয়ক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যাপক[প্রথম পাদ] বিশ্বনামক; আর অন্তঃপ্রজ্ঞ অর্থাৎ মানস স্বপ্নদর্শী[দ্বিতীয় পাদটি] তৈজসনামক; সেইরূপ ঘনপ্রজ্ঞ বা প্রজ্ঞান- ঘন[তৃতীয় পাদটি] প্রাজ্ঞনামক হয়; বস্তুতঃ একই আত্মা কেবল ত্রিবিধ অবস্থায় অবস্থিত আছেন মাত্র ॥ ১ ॥

গৌড়পাদীয়-কারিকাসু শঙ্কর-ভাষ্যম্

অত্র এতস্মিন্ যথোক্তেহর্থে এতে শ্লোকা ভবন্তি। বহিঃপ্রজ্ঞ ইতি। পর্যায়েণ ত্রিস্থানত্বাৎ সোহহমিতি স্মৃত্যা প্রতিসন্ধানাচ্চ স্থানত্রয়ব্যতিরিক্তত্বমেকত্বং শুদ্ধত্বম- সঙ্গত্বঞ্চ সিদ্ধমিত্যভিপ্রায়ঃ, মহামৎস্যাদিদৃষ্টান্তশ্রুতেঃ ॥ ১ ॥

ভাষ্যানুবাদ

[শ্রুতিতে যে সমস্ত বিষয় কথিত হইয়াছে], তদ্বিষয়ে “বহিঃপ্রজ্ঞঃ”.

আগম-প্রকরণম্ ২১

ইত্যাদি নিম্নলিখিত শ্লোকসমূহ আছে—অভিপ্রায় এই যে, যে হেতু [ জাগ্রৎ, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি এই] স্থানত্রয়ে একই আত্মার পর পর সম্বন্ধ হইয়া থাকে, এবং যে হেতু[ সর্ব্বত্রই] ‘সেই আমি’ ইত্যাকার প্রতীতি বিদ্যমান থাকে, সেই হেতুতেই আত্মা যে স্থানত্রয় হইতে অতিরিক্ত বা পৃথক্ বস্তু, শুদ্ধ(নিত্যনির্দোষ) এবং অসঙ্গ, অর্থাৎ জাগ্রদাদি অবস্থাকৃত দোষে অসংস্পৃষ্ট; ইহা প্রমাণিত হইল; শ্রুতিতে বর্ণিত মহামৎস্যাদি দৃষ্টান্তও ইহার অপর হেতু * ॥ ১ ॥

দক্ষিণাক্ষিমুখে বিশ্বো মনস্যস্তু তৈজসঃ। আকাশে চ হৃদি প্রাজ্ঞস্ত্রিধা দেহে ব্যবস্থিতঃ॥ ২॥

সরলার্থঃ

[ জাগরিতাবস্থায়ামপি বিশ্বাদীনাং ত্রয়াণামৈক্যোপদেশার্থমাহ-দক্ষিণেত্যাদি] -বিশ্বঃ(তৎসংজ্ঞকঃ স্থূলদর্শী আত্মা) দক্ষিণাক্ষিমুখে(দক্ষিণং অক্ষি চক্ষুঃ[এব] মুখং দ্বারং তস্মিন্ প্রত্যক্ষকালে)[অনুভূয়তে ইতি শেষঃ]; অন্তঃ(অভ্যন্তরে) মনসি(অন্তঃকরণে) তৈজসঃ(স্বপ্নবৎ বাসমামাত্রোপস্থাপিতবিষয়দর্শী) তু(পুনঃ) [ অনুভূয়তে]। প্রাজ্ঞঃ(তৎসংজ্ঞকঃ প্রজ্ঞানঘনঃ) দি আকাশে(হৃদয়াকাশে) চ[সর্ব্বথা মনোব্যাপারনিবৃত্তৌ অনুভূয়তে]।[এবং এক এব আত্মা] ত্রিধা (ত্রিভিঃ প্রকারৈঃ) দেহে(শরীরে) ব্যবস্থিতঃ(অবস্থিতঃ)[ভবতীতিশেষঃ] ॥ ২ ॥ জাগ্রৎ অবস্থায়ও উক্ত ত্রৈবিধ্যানুভূতি প্রদর্শন করিতেছেন-দক্ষিণ চক্ষুরূপ দ্বারে[স্কুলবিষয়দর্শী] বিশ্বনামক আত্মা, অভ্যন্তরে মনোমধ্যে সংস্কারোপস্থাপিত বিষয়স্মর্তা তৈজস, আর হৃদয়াকাশে প্রজ্ঞানঘন প্রাজ্ঞ আত্মা অনুভূত হন। এইরূপে একই আত্মা তিনরূপে দেহমধ্যে অবস্থিত আছেন ৷ ২ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

জাগরিতাবস্থায়ামের বিশ্বাদীনাং ত্রয়াণামনুভবপ্রদর্শনার্থোহয়ং শ্লোকঃ—দক্ষিণা-

২২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ক্ষীতি। দক্ষিণমক্ষ্যের মুখং, তস্মিন্ প্রাধান্যেন দ্রষ্টা স্থূলানাং বিশ্বোহনুভূয়তে, “ইন্ধো হ বৈ নামৈষঃ, যোহয়ং দক্ষিণেহক্ষন্ পুরুষঃ” ইতি শ্রুতেঃ। ইন্ধো দীপ্তি- গুণো বৈশ্বানর আদিত্যান্তর্গতো বৈরাজ আত্মা চক্ষুষি চ দ্রষ্টা একঃ।

নন্বন্যো হিরণ্যগর্ভঃ, ক্ষেত্রজ্ঞো দক্ষিণেহক্ষিণি অক্ষোর্নিয়ন্তা দ্রষ্টা চান্যো দেহ- স্বামী; ন স্বতো ভেদানভ্যুপগমাৎ; “একো দেবঃ সর্ব্বভূতেষু গূঢ়ঃ” ইতি শ্রুতেঃ। “ক্ষেত্রজ্ঞঞ্চাপি মাং বিদ্ধি সর্ব্বক্ষেত্রেযু ভারত।” “অবিভক্তঞ্চ ভূতেষু বিভক্তমিব চ স্থিতম্” ইতি স্মৃতেশ্চ। সর্ব্বেযু করণেষু অবিশেষেঘপি দক্ষিণাক্ষিণ্যুপলব্ধিপাটব- দর্শনাৎ তত্র বিশেষেণ নির্দেশো বিশ্বস্য।

দক্ষিণাক্ষিগতো রূপং দৃষ্টা নিমীলিতাক্ষস্তদেব স্মরন্ মনস্যন্তঃ স্বপ্ন ইব তদেব বাসনারূপাভিব্যক্তং পশ্যতি। যথা তত্র, তথা স্বপ্নে; অতো মনসি অন্তস্ত তৈজ- সোহপি বিশ্ব এব। আকাশে চ হৃদি স্মরণাখ্যব্যাপারোপরমে প্রাজ্ঞ একীভূতো ঘনপ্রজ্ঞ এব ভবতি, মনোব্যাপারাভাবাৎ। দর্শন-স্মরণে এব হি মনঃস্পন্দিতম্; তদভাবে হৃদ্যেবাবিশেষেণ প্রাণাত্মনাবস্থানম্, “প্রাণো হ্যেবৈতান্ সর্ব্বান্ সংবৃঙক্তে” ইতি শ্রুতেঃ। তৈজসো হিরণ্যগর্ভো মনঃস্থত্বাৎ। ‘লিঙ্গং মনঃ’ “মনোময়োহয়ং পুরুষঃ” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ।

ননু ব্যাকৃতঃ প্রাণঃ সুষুপ্তে, তদাত্মকানি করণানি ভবন্তি; কথমব্যাকৃততা? নৈষ দোষঃ অব্যাকৃতস্য দেশকালবিশেষাভাবাৎ। যদ্যপি প্রাণাভিমানে সতি ব্যাকৃততৈব প্রাণস্য, তথাপি পিণ্ড-পরিচ্ছিন্নবিশেষাভিমাননিরোধঃ প্রাণে ভবতীতি অব্যাকৃত এব প্রাণঃ সুষুপ্তে পরিচ্ছিন্নাভিমানবতাম্। যথা প্রাণলয়ে পরিচ্ছিন্নাভি- মানিনাং প্রাণোহব্যাকৃতঃ, তথা প্রাণাভিমানিনোহপ্যবিশেষাপত্তাবব্যাকৃততা সমানা, প্রসববীজাত্মকত্বঞ্চ; তদধ্যক্ষশ্চেকোহব্যাকৃতাবস্থঃ। পরিচ্ছিন্নাভিমানিনা- মধ্যক্ষাণাঞ্চ তেনৈকত্বমিতি পূর্ব্বোক্তং বিশেষণম্—‘একীভূতঃ প্রজ্ঞানঘনঃ’ ইত্যা- দ্যুপপন্নম্। তস্মিন্নেতস্মিন্ উক্তহেতুসত্ত্বাচ্চ। কথং প্রাণশব্দত্বমব্যাকৃতস্য? “প্রাণ- বন্ধনং হি সোম্য মনঃ” ইতি শ্রুতেঃ।

ননু, তত্র “সদেব সোম্য” ইতি প্রকৃতং সদ্ ব্রহ্ম প্রাণশব্দবাচ্যম্। নৈষ দোষঃ; বীজাত্মকত্বাভ্যুপগমাৎ সতঃ। যদ্যপি সদ্ব্রহ্ম প্রাণশব্দবাচ্যং তত্র, তথাপি জীব- প্রসববীজাত্মকত্বমপরিত্যজ্যৈব প্রাণশব্দত্বং সতঃ সচ্ছব্দবাচ্যতা চ। যদি হি নির্ব্বীজ- রূপং বিবক্ষিতং ব্রহ্ম অভবিষ্যৎ, “নেতি নেতি” “যতো বাচো নিবর্তন্তে,” “অন্যদেব তদ্বিদিতাদথো অবিদিতাদধি” ইত্যবক্ষ্যৎ। “ন সৎ তৎ নাসদুচ্যতে” ইতি স্মৃতেঃ।

আগম-প্রকরণম্ ২৩

নিব্বীজতয়ৈব চেৎ, সতি লীনানাং সম্পন্নানাং সুষুপ্তিপ্রলয়য়োঃ পুনরুত্থানানুপপত্তিঃ স্যাৎ, মুক্তানাঞ্চ পুনরুৎপত্তিপ্রসঙ্গঃ, বীজাভাবাবিশেষাৎ। জ্ঞানদাহ-বীজাভাবে চ জ্ঞানানর্থক্য-প্রসঙ্গঃ। তস্মাৎ সবীজত্বাভ্যুপগমেনৈব সতঃ প্রাণত্বব্যপদেশঃ, সর্ব্ব- শ্রুতিযু চ কারণত্বব্যপদেশঃ। অত এব “অক্ষরাৎ পরতঃ পরঃ।” “সবাহ্যাভ্যন্তরো হ্যজঃ।” “যতো বাচো নিবর্তন্তে।” “নেতি নেতি” ইত্যাদিনা বীজত্বাপনয়নেন * ব্যপদেশঃ। তামবীজাবস্থাং তস্যৈব প্রাজ্ঞশব্দবাচ্যস্য তুরীয়ত্বেন দেহাদিসম্বন্ধ- জাগ্রদাদিরহিতাং পারমার্থিকীং পৃথগ বক্ষ্যতি। বীজাবস্থাপি ‘ন কিঞ্চিদবে- দিষম্’ ইত্যুত্থিতস্য প্রত্যয়দর্শনাদ্দেহে অনুভূয়ত এব, ইতি ত্রিধা দেহে ব্যবস্থিত ইত্যুচ্যতে ॥ ২॥

ভাষ্যানুবাদ

এক জাগরিত অবস্থায়ই বিশ্বাদি ত্রয়ের যেরূপে অনুভব হইয়া থাকে, তাহা প্রদর্শনার্থ “এই দক্ষিণাক্ষি” ইত্যাদি[শ্লোক হইতেছে]। দক্ষিণ অক্ষিই মুখ(উপলব্ধি-দ্বার), তাহাতেই প্রধানতঃ স্থূল বিষয়- দর্শী ‘বিশ্ব’ অনুভূত হইয়া থাকে; যেহেতু শ্রুতি বলিয়াছেন—এই যে, দক্ষিণ অক্ষিগত পুরুষ, ইনিই প্রসিদ্ধ ‘ইন্ধ’। ইন্ধ অর্থ—দীপ্তিগুণ- সম্পন্ন বৈশ্বানর আত্মা। আদিত্যমণ্ডলগত বৈরাজসংজ্ঞক আত্মা আর চক্ষুতে অবস্থিত দ্রষ্টা, উভয়ই এক।

প্রশ্ন হইতেছে যে, হিরণ্যগর্ভ একজন স্বতন্ত্র আর দক্ষিণ চক্ষুতে সন্নিহিত চক্ষুর্দ্ধয়ের নিয়ামক ও দর্শনকর্তা দেহস্বামী ক্ষেত্রজ্ঞও স্বতন্ত্র; [সুতরাং উভয়ের ঐক্য হয় কিরূপে?] না—এ প্রশ্ন হইতে পারে না; কারণ, উভয়ের স্বাভাবিক ভেদ স্বীকৃত হয় না, ‘একই প্রকাশশীল আত্মা সমস্ত ভূতে গূঢ়ভাবে অবস্থিত আছেন,’ এই শ্রুতিই তাহার প্রমাণ। ‘হে ভারত(অর্জুন), আমাকে সমস্ত দেহে ক্ষেত্রজ্ঞ(দেহস্বামী) বলিয়াও জানিবে।’ ‘[বস্তুতঃ আমি] বিভক্ত না হইয়াও ভূতসমূহে বিভক্তবৎ অবস্থিত।’ এই গীতাস্মৃতিও অপর প্রমাণ।[বিশ্ব- সংজ্ঞক আত্মার] সমস্ত ইন্দ্রিয়ে সম্বন্ধগত বৈশিষ্ট্য বা তারতম্য না

২৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

থাকিলেও প্রধানতঃ দক্ষিণ চক্ষুতে দর্শন-পটুতা দৃষ্ট হইয়া থাকে; এই কারণেই সেই স্থানে বিশ্বের বিশেষ নির্দেশ হইয়াছে।

দক্ষিণ চক্ষুঃস্থিত আত্মা[বাহ্য] রূপ দর্শন করিয়া স্বপ্ন-সময়ের ন্যায় নিমীলিত নেত্রে তাহাই মনোমধ্যে স্মরণ করিয়া সংস্কাররূপে অভিব্যক্ত ঐ রূপই দর্শন করিয়া থাকে। এখানে যেরূপ, ঠিক স্বপ্নেও তদ্রূপ; অতএব মনোমধ্যগত তৈজসও ফলতঃ বিশ্বই(তাহা হইতে পৃথক্ নহে)। স্মরণ-সংজ্ঞক মানস ব্যাপার নিবৃত্ত হইয়া গেলে, হৃদয়াকাশেও নিশ্চয় সেই প্রাজ্ঞই একীভূত প্রজ্ঞানঘন হন; কারণ, তৎকালে কোনরূপ মনোব্যাপার থাকে না। দর্শন ও স্মরণই মনের ব্যাপার বা কার্য্য; তাহার অভাব হইলে অবিশেষ ভাবে প্রাণরূপেই অবস্থিতি হইয়া থাকে। কারণ, শ্রুতি বলিয়াছেন যে,-‘প্রাণই এ সমস্ত বিষয়কে সংবৃত বা সংহৃত করিয়া থাকে।’ ‘মনে অধিষ্ঠিত বলিয়া হিরণ্যগর্ভই তৈজস।’ * ‘এই পুরুষ(জীব) মনোময়, অর্থাৎ মনঃ- প্রধান’; ইত্যাদি শ্রুতি হইতে প্রমাণিত হয় যে, মন অর্থ লিঙ্গ শরীর।

ভাল, সুষুপ্তি-সময়ে প্রাণ ত ব্যাকৃতাত্মক অর্থাৎ ব্যক্তীভূত থাকে, এবং ইন্দ্রিয়সমূহও তখন তন্ময় হইয়া থাকে; তবে আর অব্যাকৃততা হয় কিরূপে? না—এ দোষ হয় না; অব্যাকৃত পদার্থের দেশ ও কালকৃত বিশেষ বা বৈলক্ষণ্য হয় না; কারণ, যদিও প্রাণসংজ্ঞক হিরণ্যগর্ভের

আগম-প্রকরণম্ ২৫

প্রাণাভিমান-সমকালে ব্যাকৃত ভাবই অব্যাহত থাকে, তথাপি যাহারা পরিচ্ছিন্ন বলিয়া অভিমান করে, তাহাদের পক্ষেও সুষুপ্তি-সময়ে দেহ- পরিচ্ছিন্ন অর্থাৎ দেহানুগত যে অভিমান, সুষুপ্তি-সময়ে সেই প্রাণ- বিষয়ক[আমার প্রাণ, অমুকের প্রাণ ইত্যাদি] অভিমান অবশ্যই নিবৃত্ত হইয়া যায়। যাহারা প্রাণকে পরিচ্ছিন্ন বলিয়া মনে করে, প্রাণলয়ে-মৃত্যুসময়ে তাহাদেরও প্রাণ যেরূপ অব্যাকৃত, অর্থাৎ পরি- চ্ছেদাভিমানরহিত হইয়া থাকে, তদ্রূপ প্রাণাভিমানীর পক্ষেও নির্বি- শেষ-ভাবপ্রাপ্তি-সময়ে(সুষুপ্তিকালে) প্রাণের অব্যাকৃতভাব-প্রাপ্তি তুল্য এবং[অব্যাকৃত অবস্থা যেরূপ জগৎ-প্রসবের বীজ,] উক্ত প্রাণাখ্য সুষুপ্তিও তদ্রূপ[স্বপ্ন-জাগরিতাবস্থাদয়ের] উৎপত্তির কারণ। * বিশেষতঃ অব্যাকৃতাবস্থা ও সুসুপ্তি, এতদুভয়েরই অধ্যক্ষ বা অধিষ্ঠাতা এক-চৈতন্য; সুতরাং পরিচ্ছিন্নাভিমানী ও অধ্যক্ষসমূহেরও একত্ব সিদ্ধ হইতেছে; তাহার ফলে পূর্বকথিত ‘একীভূত ও প্রজ্ঞানঘন’ এই বিশেষণদ্বয়ও সুসঙ্গত হইল। বিশেষতঃ কথিত বিষয়ে পূর্বোক্ত [অধ্যাত্ম ও অধিদৈবের একত্বরূপ] হেতুও বিদ্যমান রহিয়াছে; [সুতরাং অব্যাকৃত প্রাণ-সম্বন্ধে প্রযুক্ত উক্ত বিশেষণ অসঙ্গত হইতে পারে না]।

২৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ভাল, অব্যাকৃত বস্তুটি ‘প্রাণ’ শব্দবাচ্য হয় কিরূপে?[উত্তর] ‘হে সোম্য, মনঃ এই প্রাণের অধীন’, এই শ্রুতিই তাহার হেতু। পুনশ্চ প্রশ্ন হইতেছে যে, সেখানেত ‘হে সোম্য! সৎ ব্রহ্মই’ এই প্রকরণপ্রাপ্ত সৎস্বরূপ ব্রহ্মই প্রাণ শব্দের অর্থ(অব্যাকৃত নহে)। না-ইহা দোষ নহে; কেননা সেখানে সৎপদার্থকে বীজস্বরূপই স্বীকার করা হইয়াছে। -যদিও সেখানে সৎ ব্রহ্মই প্রাণ- শব্দবাচ্য হউক, তথাপি সেই পদার্থটি জীবোৎপত্তি-বীজভাব ত্যাগ না করিয়াই অর্থাৎ সেই বীজভাবসহকারেই প্রাণশব্দের প্রতিপাদ্য এবং সৎ-পদবাচ্য হইয়াছেন। সেখানে যদি বীজভাবশূন্য ব্রহ্মই শ্রুতির অভিপ্রেত হইত, তাহা হইলে ‘ইহা নহে-ইহা নহে’, ‘যাঁহার নিকট হইতে বাক্যসমূহ ফিরিয়া আইসে’, ‘তিনি বিদিত হইতে অন্য এবং অবিদিত হইতেও পৃথক্’ এইরূপই নির্দেশ করিতেন। যেহেতু স্মৃতিও তাঁহাকে ‘সৎ ও অসৎ হইতে পৃথক্’ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। যদি নির্বীজভাবই বিবক্ষিত হইত, তাহা হইলে সতে (ব্রহ্মে) বিলীন-সৎস্বরূপসম্পন্ন জীবগণের আর সুষুপ্তি ও প্রলয়- কালে পুনরুত্থান সঙ্গত হইত না; পক্ষান্তরে মুক্ত পুরুষগণেরও পুনরুৎপত্তি হইতে পারিত; কারণ,[উৎপত্তির কারণীভূত] বীজের(অদৃষ্টের) অভাব উভয় স্থলেই সমান। *

আগম-প্রকরণম্ ২৭

কর্মবীজকে জ্ঞানদ্বারা দগ্ধ করিতে হয়;[ সুযুপ্তি ও প্রলয়কালে] সেই জ্ঞানদাহ্য বীজ যদি আপনা হইতেই নিবৃত্ত হইয়া যায়, তাহা হইলে তত্ত্ব-জ্ঞানের আর আবশ্যক থাকে না, উহা অনর্থক হইয়া পড়ে। অতএব সবীজভাব অঙ্গীকারপূর্ব্বকই সৎপদার্থের প্রাণত্ব- ব্যবহারও সমস্ত শ্রুতিতে কারণত্ব নির্দেশ করিয়া থাকে। এ সকল স্থলে সবীজভাবে নির্দেশ থাকাতেই ‘পর অক্ষর হইতেও পর’, ‘তিনি জন্মরহিত এবং বাহ্য ও আন্তর সহকৃত’ ‘যাঁহা হইতে বাক্যসমূহ’ নিবৃত্ত হয়।’ ‘ইহা[ব্রহ্ম] নহে—ইহা নহে’, ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যে আবার সেই সবীজভাব অপনয়নপূর্ব্বক[নির্বীজভাবের] উল্লেখ হইয়াছে। ‘প্রাজ্ঞ’-শব্দবাচ্য সেই সৎপদার্থেরই যে দেহাদি সম্বন্ধ ও জাগ্রদাদি অবস্থারহিত পারমার্থিক নির্বীজাবস্থা, তাহাও তুরীয়- ভাবে পৃথক করিয়া বলিবেন। আর সেই বীজাবস্থাটিও ‘আমি কিছুই জানিতে পারি নাই’ সুপ্তোত্থিত ব্যক্তির এইরূপ পরামর্শ বা স্মৃতি হইতেও এই দেহে সেই বীজাবস্থার অনুভূতি হইয়া থাকে; এই নিমিত্তই ‘দেহে তিন প্রকারে অবস্থিত’ বলা হইয়া থাকে ॥ ২ ॥

বিশ্বো হি স্থূলভুনিত্যং তৈজসঃ প্রবিবিক্তভুক্। আনন্দভুক্ তথা প্রাজ্ঞস্ত্রিধা ভোগং নিবোধত ॥ ৩ ॥

স্বপ্ন ও জাগরণ দশা দর্শন করিতে বাধ্য হয়; নচেৎ সৎসম্পন্ন ব্যক্তির পুনরুত্থান কখনই সম্ভবপর হইত না। আচার্য্যগণ অতি স্পষ্ট কথায় এই ভাবটি ব্যক্ত করিয়াছেন— “সুযুপ্তি-কালে সকলে বিলীনে তমোহিভিভূতঃ সুখরূপমেতি। পুনশ্চ জন্মান্তর-কর্ম্মযোগাৎ স এব জীবঃ স্বপিতি প্রবুদ্ধঃ॥”

অর্থাৎ সুষুপ্তি সময়ে যখন দেহেন্দ্রিয়াদি সমস্তই স্বকারণে বিলীন হইয়া যায়, তখন তমোগুণে সমাবৃত হইয়া আনন্দময়রূপ প্রাপ্ত হয়। কিন্তু জন্মান্তরাজ্জিত প্রারব্ধ কৰ্ম্ম সংশ্লিষ্ট থাকায় সৎরূপলাভ করিয়াও সেই জীবই আবার স্বপ্ন ও জাগ্রৎ দশাপ্রাপ্ত হইয়া থাকে। অতএব প্রলয় ও সুষুপ্তি-সময়ে জীব কখনই কর্ম্ম-বীজশূন্য হইয়া অব্যাকৃত ব্রহ্মভাব লাভ করে না; লাভ করিলেত আর অকারণ জন্ম হইত না; আর কারণ(বীজ) না থাকিলেও যদি জন্ম হইবার সম্ভব হইত, তাহা হইলে, যাঁহারা কর্ম্মবীজ ক্ষয় করিয়া মুক্তিলাভ করিয়াছেন, সেই মুক্ত পুরুষগণেরও

২৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

সরলার্থঃ

[ইদানীং বিশ্বাদিভেদেন ভোগমপি ত্রিধা বিভজতে “বিশ্ব” ইত্যাদিনা।]— বিশ্বঃ(পূর্ব্বোক্তঃ প্রথমপাদঃ) হি(নিশ্চয়ে) নিত্যৎ(সর্ব্বদা) স্থূলভুক্(স্থুলং জাগ্রদ্বিষয়ং ভুঙক্তে ইত্যর্থঃ)। তৈজসঃ(পূর্ব্বোক্তঃ দ্বিতীয়পাদরূপঃ) প্রবিবিক্তভুক্(প্রবিবিক্তং সূক্ষ্মং সংস্কারোপস্থাপিতং বিষয়ং ভুঙক্তে ইত্যর্থঃ)। তথা(তদ্বৎ) প্রাজ্ঞঃ(তৃতীয়-পাদরূপঃ) আনন্দভুক্(কারণশরীরগতম্ আনন্দং ভুঙক্তে ইত্যর্থঃ)।[ইখং] ভোগং(বিষয়োপলব্ধিং), ত্রিধা(ত্রিপ্রকারং) নিবোধত(জানীত)[হে শিষ্যাঃ, যূয়মিতি শেষঃ]।

এখন বিশ্বাদি পাদত্রয়ের ত্রিবিধ ভোগ নির্দেশ করিতেছেন—বিশ্ব সর্ব্বদা স্থূল বিষয়ই ভোগ করে; তৈজস সর্ব্বদা বাসনাময় সূক্ষ্ম বিষয়ই ভোগ করে; আর প্রাজ্ঞ সর্ব্বদা আনন্দমাত্র ভোগ করে। এই প্রকারে ভোগও তিনপ্রকার জানিবে ॥ ৩ ॥

স্থূলং তর্পয়তে বিশ্বং, প্রবিবিক্তন্ত তৈজসম্।

আনন্দশ্চ তথা প্রাজ্ঞং, ত্রিধা তৃপ্তিং নিবোধত ॥ ৪ ॥

সরলার্থঃ

[ ইদানীং তেষাং ভোগজ-তৃপ্তিমপি ত্রিধা বিভজতে “স্থূলম্” ইত্যাদিনা।]— স্থূলং(জাগ্রদ্বস্তু) বিশ্বং তর্পয়তে(প্রীণাতি); প্রবিবিক্তং(সূক্ষ্মং) তু (পুনঃ) তৈজসং[তর্পয়তে]। তথা আনন্দঃ(অজ্ঞানপ্রতিবিম্বিতঃ) প্রাজ্ঞং [তর্পয়তে]।[অতঃ তেষাং] তৃপ্তিং[অপি, ইত্থং] ত্রিধা(ত্রিপ্রকারাং) নিবোধত[পূর্ব্ববৎ]।

এখন তাহাদের ভোগজ তৃপ্তিও তিনপ্রকার নির্দেশ করিতেছেন—স্থূল বিষয় ‘বিশ্বে’র তৃপ্তি জন্মায়; সূক্ষ্ম বিষয় আবার ‘তৈজসের’ এবং আনন্দমাত্র ‘প্রাজ্ঞের’ তৃপ্তি সাধন করে; এইরূপে তাহাদের তৃপ্তিও তিনপ্রকার জানিবে ॥ ৪ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্ উক্তার্থৌ হি শ্লোকৌ ॥৩।৪৷৷ ভাষ্যানুবাদ এই শ্লোকদ্বয়ের অর্থ পূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে ॥৩।৪৷৷

আগম প্রকরণম্ ২৯

ত্রিযু ধামসু যদ্ভোজ্যং ভোক্তা যশ্চ প্রকীর্তিতঃ। বেদৈতদুভয়ং যস্তু সঃ ভুঞ্জানো ন লিপ্যতে ॥ ৫ ॥

সরলার্থঃ

[ইদানীং পূর্ব্বোক্তভোক্তৃ-ভোজ্য-জ্ঞানফলমাহ—“ত্রিষু” ইত্যাদিনা।— ত্রিষু ধামসু(জাগ্রৎ-স্বপ্ন-সুষুপ্তিস্থানেষু) যৎ ভোজ্যং(স্থূল-সূক্ষ্মানন্দরূপং), যশ্চ- (যোহপি) ভোক্তা(বিশ্ব-তৈজস-প্রাজ্ঞ-সংজ্ঞকঃ) প্রকীর্তিতঃ(কথিতঃ); যঃ (জনঃ) তু(পুনঃ) এতৎ(পূর্ব্বোক্তম্) উভয়ং(ভোজ্যং ভোক্তারং চ) বেদ- (জানাতি); সঃ(জনঃ) ভুঞ্জানঃ(ভোগং কুর্ব্বন্ অপি) ন লিপ্যতে(তত্র ন আসক্তো ভবতি), সর্ব্বত্র একভোক্তৃ-ভোজ্যত্ব-দর্শনাদিতি ভাবঃ]॥

এখন উক্ত ভোক্তৃ-ভোজ্য-জ্ঞানের ফল বলিতেছেন—জাগ্রৎ, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি, এই স্থানত্রয়ে যাহা ভোগাই এবং যিনি ভোক্তা বলিয়া কথিত হইলেন,—এই উভয়কে যিনি জানেন, তিনি বিষয়-সেবা করিয়াও তাহাতে লিপ্ত(আসক্ত) হন না॥ ৫॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ত্রিযু ধামসু জাগ্রদাদিষু স্থূল-প্রবিবিক্তানন্দাখ্যং যদ্ ভোজ্যমেকং ত্রিধাভুতম্; যশ্চ বিশ্ব-তৈজস প্রাজ্ঞাখ্যো ভোক্তৈকঃ ‘সোহহম্’ ইত্যেকত্বেন প্রতিসন্ধানাৎ দ্রষ্টৃত্বাবিশেষাচ্চ প্রকীর্তিতঃ; যো বেদ এতদুভয়ং ভোজ্যভোক্তৃতয়া অনেকধা ভিন্নং, স ভুঞ্জানো ন লিপ্যতে, ভোজ্যস্য সর্ব্বস্য একভোক্তৃভোজ্যত্বাৎ। ন হি যস্য যো বিষয়ঃ, স তেন হীয়তে বর্দ্ধতে বা। ন হ্যাগ্নিঃ স্ববিষয়ং দগ্ধ্বা কাষ্ঠাদি, তদ্বৎ ॥ ৫

ভাষ্যানুবাদ

জাগ্রৎ প্রভৃতি স্থানত্রয়ে স্থূল, প্রবিবিক্ত(সূক্ষম) ও আনন্দ নামক যে একই ভোজ্য(ভোগার্হ বিষয়) তিন প্রকারে বিভক্ত; আর ‘সেই আমি’ এইরূপে সর্বত্রই একত্বানুসন্ধান থাকায় এবং দ্রষ্টৃত্বাংশেও কিছুমাত্র বিশেষ না থাকায় বিশ্ব, তৈজস ও প্রাজ্ঞসংজ্ঞক একই ভোক্তা কথিত হইয়াছে। ভোজ্য ও ভোক্তরূপে অনেক প্রকারে বিভিন্ন এই উভয়কে(ভোজ্য ও ভোক্তার) যিনি জানেন, তিনি ভোগ করিয়াও লিপ্ত হন না; কেননা, সমস্ত ভোজ্যই একই

৩০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ভোক্তার ভোজ্য। কারণ, অগ্নি যেমন স্ববিষয়(নিজের দাহ্য) কাষ্ঠাদি দগ্ধ করিয়া[হানি বা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় না], তেমনি যাহার যাহা বিষয়(ভোগার্হ বস্তু), তাহা দ্বারা সে কখনই হানি বা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় না, অর্থাৎ সেই ভোগজনিত দোষে লিপ্ত হয় না ॥ ৫ ॥

প্রভবঃ সর্ব্বভাবানাং সতামিতি বিনিশ্চয়ঃ। সর্ব্বং জনয়তি প্রাণ শ্চেতোহঃশূন্ পুরুষঃ পৃথক্ ॥ ৬ ॥

সরলার্থঃ

[ “এষ যোনিঃ” ইত্যত্র প্রাপ্তং যৎ প্রাজ্ঞস্য কারণত্বং তচ্চ সৎকার্য্যং প্রত্যেব, ইত্যাহ]—সতাং(বিদ্যমানানাং) সর্ব্বভাবানাং(বিশ্ব-তৈজস-প্রাজ্ঞানাং) প্রভবঃ(উৎপত্তিঃ)[ভবতীতি শেষঃ]। প্রাণঃ(বীজাত্মা মায়োপাধিপ্রধানং ব্রহ্ম) সর্ব্বং(অচেতনং জগৎ) জনয়তি(উৎপাদয়তি)। পুরুষঃ(বিশ্বভূতঃ চিদাত্মা)[অংশুমান্ সূর্য্য ইব] চেতোহংশূন্[অংশূন্ ইব চিদাভাসান্ জীবান্] পৃথক্[জনয়তি]॥

সত্তাবান্(বিদ্যমান) ভাব-পদার্থ-সমূহের(বিশ্ব-তৈজস প্রভৃতিরই) উৎপত্তি হইয়া থাকে। তন্মধ্যে বীজাত্মক প্রাণ সমস্ত জড়জগৎ উৎপাদন করে এবং চিদাত্মা পুরুষ চৈতন্যাংশ-সমূহ সমুৎপাদন করিয়া থাকেন ॥ ৬ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

সতাং বিদ্যমানানাং স্বেন অবিদ্যাকৃত-নামরূপমায়াস্বরূপেণ সর্ব্বভাবানাং বিশ্ব-তৈজস-প্রাজ্ঞভেদানাং প্রভব উৎপত্তিঃ। বক্ষ্যতি চ-“বন্ধ্যাপুত্রো ন তত্ত্বেন মায়য়া বাপি জায়তে” ইতি। যদি হ্যসতামেব জন্ম স্যাৎ, ব্রহ্মণোহ- ব্যবহার্য্যস্য গ্রহণদ্বারাভাবাদসত্ত্বপ্রসঙ্গঃ। দৃষ্টঞ্চ রজ্জুসর্পাদীনামবিদ্যাকৃত-মায়া- বীজোৎপন্নানাং রজ্জ্বাদ্যাত্মনা সত্ত্বম্, ন হি নিরাস্পদা রজ্জুসর্প-মৃগতৃষ্ণিকাদয়ঃ কচিদুপলভ্যন্তে কেনচিৎ। যথা রজ্জাং প্রাক্ সর্পোৎপত্তেঃ রজ্জাত্মনা সর্পঃ সন্নেবাসীৎ, এবং সর্ব্বভাবানামুৎপত্তেঃ প্রাক্ প্রাণবীজাত্মনৈব সত্ত্বমিতি। শ্রুতিরপি “ব্রহ্মৈবেদম্” “আত্মৈবেদমগ্র আসীৎ” ইতি।

অতঃ সর্ব্বং জনয়তি প্রাণশ্চেতোহংশূন্ অংশব ইব রবেশ্চিদাত্মকস্য পুরুষস্য চেতোরূপা জলার্কসমাঃ প্রাজ্ঞতৈজস-বিশ্বভেদেন দেব-মনুষ্য-তির্য্যগাদিদেহভেদেযু বিভাব্যমানাশ্চেতোহংশবো যে, তান্ পুরুষঃ পৃথক্ সৃজতি—বিষয়ভাববিলক্ষণা-

আগম-প্রকরণম্ ৩১

নগ্নিবিস্ফুলিঙ্গবৎ সলক্ষণান্ জলার্কবচ্চ জীবলক্ষণাংস্তু ইতরান্ সর্ব্বভাবান্ প্রাণো বীজাত্মা জনয়তি, “যথোর্ণনাভিঃ” “যথাগ্নেঃ ক্ষুদ্রা বিস্ফুলিঙ্গা” ইত্যাদি শ্রুতেঃ ॥৬৷৷

ভাষ্যানুবাদ

সৎ অর্থ যাহারা অবিদ্যাকৃত নাম-রূপাত্মক স্বীয় মায়িকরূপে বিদ্যমান আছে, এবংবিধ সমুদয় ভাবপদার্থের বিভিন্নরূপ বিশ্ব, তৈজস ও প্রাজ্ঞের প্রভব—উৎপত্তি[ হইয়া থাকে]। নিজেও বলিবেন— ‘বাস্তবিক কিংবা মায়িক রূপেও বন্ধ্যার পুত্র জন্ম লাভ করে না।’ [ কারণ, বন্ধ্যার পুত্র সৎ পদার্থ নহে, অসৎ—অলীক]।

যদি অসৎ পদার্থেরই উৎপত্তি সম্ভব হইত, তাহা হইলে লোক- ব্যবহারাতীত ব্রহ্মেরও অভাব সম্ভাবিত হইয়া পড়িত। কারণ, তাঁহার অস্তিত্বগ্রহণের অন্য কোনও উপায় নাই *। দেখাও যায়, অবিদ্যাজনিত যে, মায়াবীজোৎপন্ন রজ্জু-সর্প প্রভৃতি, রজ্জুপ্রভৃতি- রূপেই সে সমুদয়ের অস্তিত্ব; কেননা রজ্জু-সর্প ও মৃগতৃষ্ণা প্রভৃতিকে কেহ কোথাও নিরাশ্রয় দেখিতে পায় না; অর্থাৎ কোনও একটি সত্য বস্তুকে অবলম্বন করিয়াই ঐ সকল মিথ্যা বস্তু প্রতিভাত হইয়া থাকে। রজ্জুতে সর্পোৎপত্তির পূর্ব্বে সর্প যেমন রজ্জুরূপে সৎ—বর্তমানই ছিল, তেমনি উৎপত্তির পূর্ব্বে সমস্ত ভাবপদার্থের প্রাণরূপ বীজভাবে নিশ্চয়ই অস্তিত্ব ছিল। শ্রুতিও ইহা বলিতেছেন—‘এই জগৎ ব্রহ্মই,’ ‘অগ্রে এই জগৎ আত্মস্বরূপেই ছিল’।

৩২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

অতএব, প্রাণই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করেন, অর্থাৎ সূর্য্যের কিরণরাশি যেরূপ অপর কিরণরাশি(জলসূর্য্যাদি) সমুৎপাদন করে, তদ্রূপ চিন্ময় পুরুষের(বিম্বভূত ব্রহ্মের) প্রাজ্ঞ, তৈজস ও বিশ্ব, এই বিভেদানু- সারে দেবতা, মনুষ্য ও তির্যক্ প্রভৃতি বিভিন্ন দেহে প্রতীয়মান যে, জল সূর্য্য সদৃশ-চেতনাত্মক অংশুসমূহ(চিদাভাস—জীবগণ), পুরুষ তাহাদিগকে পৃথগভাবে সৃষ্টি করেন; সেই জীবগণ অগ্নি ও তাহার স্ফুলিঙ্গের ন্যায় বিষয়ভাব-বিলক্ষণ, অর্থাৎ প্রকাশ্য-প্রকাশভাব- রহিত এবং জলপ্রতিবিম্বিত সূর্য্যের ন্যায় সলক্ষণ বা পুরুষেরই সমান- স্বভাব। বীজাত্মা(প্রলয়কালে জগদ্বীজ যাহাতে নিহিত থাকে, সেই) প্রাণ অপর সমস্ত পদার্থ সৃষ্টি করেন *। ঊর্ণনাভি(মাকড়শা) যেমন[সূত্র সৃষ্টি করে], এবং ‘অগ্নি হইতে যেমন ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গনিচয় [নির্গত হয়]’ ইত্যাদি শ্রুতি, এ বিষয়ে প্রমাণ ॥ ৬॥

বিভূতিং প্রসবন্ত্বন্যে মন্যন্তে সৃষ্টিচিন্তকাঃ। স্বপ্নমায়াসরূপেতি সৃষ্টিরন্যৈর্বিকল্পিতা॥ ৭ ॥

সরলার্থঃ

[সৃষ্টৌ মতান্তরমুপন্যস্যতি বিভূতিমিত্যাদিনা]—অন্যে সৃষ্টিচিন্তকাঃ(যে সৃষ্টিতত্ত্বমেব চিন্তয়ন্তি, ন পরমার্থতত্ত্বং, তে ইত্যর্থঃ) বিভূতিং(ঈশ্বরস্য ঐশ্বর্য্য- বিস্তারং) প্রসবং(সৃষ্টিং) মন্যন্তে। অন্যৈঃ(পরমার্থচিন্তকৈঃ) সৃষ্টিঃ স্বপ্নমায়া- সরূপা(স্বপ্নসমানরূপা, মায়াসমানরূপাচ) ইতি(ইথং) বিকল্পিতা(“শব্দজ্ঞানা- নুপাতী বস্তুশূন্যো বিকল্পঃ” ইত্যুক্ত লক্ষণা মিথ্যারূপা ইতি নিশ্চিতা)

* তাৎপর্য্য—সৃষ্টি দুই প্রকার—চেতন সৃষ্টি, আর অচেতন সৃষ্টি। তন্মধ্যে বিশেষ এই যে, অচেতন সৃষ্টির কর্তা—প্রাণ; আর বিশ্ব, তৈজসাদি সৃষ্টির কর্তা—পুরুষ। অনাদিকালপ্রবৃত্ত মায়ারূপ উপাধিটির যেখানে প্রাধান্য, এবং সৃষ্টির বীজশক্তি যাহাতে নিহিত, সেই চেতনের নাম ‘প্রাণ’; লূতা(মাকড়শা) যেমন স্বীয় চৈতন্যের সাহায্যে স্বদেহ হইতে সূত্র প্রসব করে, তেমনি উক্ত প্রাণও স্বীয় চেতনাপ্রভাবে দেহস্থানীয় স্বীয় মায়া হইতে অচেতন জগৎ প্রপঞ্চ সৃষ্টি করেন। আর সেই প্রাণেরও যিনি বিশ্বস্বরূপ—চিন্ময় ব্রহ্ম, তিনিই এখানে পুরুষ- পদবাচ্য; অগ্নি হইতে যেমন অগ্নির অনুরূপ স্ফুলিঙ্গরাশি নিঃসৃত হয়, এবং সৌর বিশ্ব হইতে যেমন তদনুরূপ অপর প্রতিবিম্ব জলাদিতে পতিত হয়, তেমনি এই পুরুষ হইতে তৎসমানস্বভাব অসংখ্য পুরুষ নির্গত হয়।

আগম-প্রকরণম্ ৩৩

এখন সৃষ্টি-বিষয়ে মতান্তর উল্লেখ করিতেছেন—যাঁহারা সৃষ্টিতত্ত্ব-চিন্তাপরায়ণ, তাঁহারা সৃষ্টিকে ঈশ্বরের বিভূতি বা ঐশ্বর্য্য-বিকাশ মনে করেন। অপর পরমার্থ- দশিগণ এই সৃষ্টিকে স্বপ্ন ও মায়াসদৃশ মিথ্যা বলিয়া কল্পনা করিয়াছেন ॥ ৭ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

বিভূতির্বিস্তার ঈশ্বরস্য সৃষ্টিরিতি সৃষ্টিচিন্তকা মন্যন্তে; ন তু পরমার্থ চিন্ত- কানাং সৃষ্টাবাদর ইত্যর্থঃ, “ইন্দ্রো মায়াভিঃ পুরুরূপ ঈয়তে” ইতি শ্রুতেঃ। নহি মায়াবিনং সূত্রমাকাশে নিঃক্ষিপ্য তেন সায়ুধমারুহ্য চক্ষুর্গোচরমতীত্য যুদ্ধেন খণ্ডশচ্ছিন্নং পতিতং পুনরুত্থিতঞ্চ পশ্যতাৎ তৎকৃতমায়াদি-সতত্ত্বচিন্তায়ামাদরো ভবতি। তথৈবায়ং মায়াবিনঃ সূত্রপ্রসারণসমঃ সুষুপ্ত-স্বপ্নাদিবিকাসঃ; তদারূঢ়- মায়াবি-সমশ্চ তৎস্থঃ প্রাজ্ঞ-তৈজসাদিঃ; সূত্র-তদারূঢ়াভ্যামন্যঃ পরমার্থমায়াবী। স এব ভূমিষ্ঠো মায়াচ্ছন্নোহদৃশ্যমান এব স্থিতো যথা, তথা তুরীয়াখ্যং পরমার্থ-তত্ত্বম্ অতস্তচ্চিন্তায়ামেবাদরো মুমুক্ষুণামার্য্যাণাং, ন নিষ্প্রয়োজনায়াং সৃষ্টাবাদরইতি। অতঃ সৃষ্টিচিন্তকানামেবৈতে বিকল্পা ইত্যাহ-স্বপ্ন-মায়াসরূপেতি, স্বপ্নসরূপা, মায়াসরূপা চেতি ॥ ৭ ॥

ভাষ্যানুবাদ

সৃষ্টিচিন্তকগণ সৃষ্টিকে ঈশ্বরের বিভূতি(ঐশ্বর্য্যবিস্তার) বলিয়া মনে করেন; বস্তুতঃ পরমার্থচিন্তাপরায়ণগণের সৃষ্টিচিন্তায় আদর বা আগ্রহ নাই; ‘ঈশ্বর মায়া দ্বারা বহুরূপে প্রকাশ পান’, এই শ্রুতিই তাহার প্রমাণ। দেখ, মায়াবী ব্যক্তি আকাশে সূত্র নিঃক্ষেপ করিয়া সেই সূত্র অবলম্বনে অস্ত্রসহকারে(আকাশে) আরোহণপূর্ব্বক চক্ষুর দৃষ্টি অতিক্রম করিয়া যুদ্ধে খণ্ড খণ্ড ভাবে ছিন্ন হইয়া অধঃপতিত হইল এবং পুনর্ব্বার উত্থিত হইল; ইহা যাহারা দর্শন করে, তাহাদের সেই মায়াবীর মায়া ও তদধীন কার্য্যের সত্যতা-চিন্তায় আদর হয় না। ঠিক সেইরূপ এই সুষুপ্তি ও স্বপ্নাদির বিকাশও মায়াবীর সূত্র- প্রসারণেরই সমান; সেই অবস্থান্বিত প্রাজ্ঞতৈজস প্রভৃতিও সূত্রারূঢ় মায়াবীর সমান। যথার্থ মায়াবী ব্যক্তি(যিনি এইরূপ মায়ার বিস্তার করিতেছেন, তিনি) যেমন সূত্র ও সূত্রারূঢ় মায়াবী হইতে পৃথক্, অথচ সেই পরমার্থ মায়াবীই যেমন ভূমিতে থাকিয়াও মায়া দ্বারা সমাচ্ছন্ন হইয়া অদৃশ্যমানভাবে অবস্থান করে, তুরীয়সংজ্ঞক পরমার্থ-

৩৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

তত্ত্বও ঠিক সেইরূপ। অতএব মুমুক্ষু আর্য্যগণের সেই পরমার্থ-তত্ত্বের চিন্তায়ই আদর বা আগ্রহ হইয়া থাকে; কিন্তু সৃষ্টি-চিন্তায় তাঁহাদের আগ্রহ হয় না; কারণ, উহা নিরর্থক। অতএব সৃষ্টি- চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গেরই এই সমস্ত বিকল্প(অন্যের নহে)। এই অভিপ্রায়েই বলিতেছেন, ‘স্বপ্ন-মায়াসরূপা’(এই সৃষ্টি) স্বপ্নের সমান এবং মায়ার সমান ॥ ৭ ॥

ইচ্ছামাত্রং প্রভোঃ সৃষ্টিরিতি সৃষ্টৌ বিনিশ্চিতাঃ। কালাৎ প্রসূতিং ভূতানাং মন্যন্তে কালচিন্তকাঃ॥ ৮॥

সরলার্থঃ

[ মতান্তরমাহ—ইচ্ছামাত্রমিতি।]—প্রভোঃ(সর্ব্বশক্তেঃ ঈশ্বরস্য) ইচ্ছামাত্রং (সংকল্পমাত্রং) সৃষ্টিঃ(জগৎ), ইতি সৃষ্টৌ(সৃষ্টিবিষয়ে) বিনিশ্চিতাঃ(নিশ্চিত- বুদ্ধয়ঃ)[মন্যন্তে ইতি শেষঃ]। কালচিন্তকাঃ(জ্যোতির্বিদঃ)[পুনঃ] ভূতানাং(উৎপন্ন-পদার্থানাং) কালাৎ(নিত্যস্বরূপাৎ) প্রসূতিং(উৎপত্তিং) মন্যন্তে;[কালাদেব সৃষ্টিরিতি তেষামাশয়ঃ] ॥

সৃষ্টি-বিষয়ে মতান্তর বলিতেছেন—সৃষ্টিবিষয়ে যাঁহাদের স্থিরমতি, তাঁহারা মনে করেন যে, সর্ব্বশক্তি ঈশ্বরের ইচ্ছাই এই সৃষ্টি; আর কালচিন্তাপরায়ণ জ্যোতির্বিদ্গণ মনে করেন, কাল হইতে সর্ব্বভূতের উৎপত্তি হইয়াছে ॥ ৮ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ইচ্ছামাত্রং প্রভোঃ সত্যসঙ্কল্পত্বাৎ সৃষ্টির্ঘটাদীনাং সঙ্কল্পনামাত্রং, ন সঙ্কল্পনাতি- রিক্তম্। কালাদেব সৃষ্টিরিতি কেচিৎ ॥ ৮ ॥

ভাষ্যানুবাদ

প্রভু(ঈশ্বর) সত্যসংকল্প; অতএব তাঁহার ইচ্ছাই—কেবল চিন্তাই—ঘটাদি পদার্থের সৃষ্টি, অর্থাৎ এই সৃষ্টি কেবল তাঁহার চিন্তারই বিকাশ মাত্র; বস্তুতঃ সংকল্পের অতিরিক্ত কিছু মাত্র নাই। কেহ কেহ বলেন—কাল হইতেই সৃষ্টি হইয়া থাকে ॥ ৮॥

ভোগার্থং সৃষ্টিরিত্যন্যে ক্রীড়ার্থমিতি চাপরে। দেবস্যৈব স্বভাবোহয়মাপ্তকামস্য কা স্পৃহা ॥ ৯ ॥ ইতি

আগম-প্রকরণম্ ৩৫

সরলার্থঃ

সৃষ্টিঃ ভোগার্থম্[আত্মন্ এব](ভোগায়) ইতি অন্যে(কেচিৎ) [মন্যন্তে]; ক্রীড়ার্থং(লীলার্থং) ইতি চ(এতদপি) অপরে[মন্যন্তে]। দেবস্য(ঈশ্বরস্য) অয়ং(অশোচ্যমানঃ) এষঃ(সৃষ্টি-ক্রিয়ালক্ষণঃ) স্বভাবঃ; [যতঃ] আপ্তকামস্য(পূর্ণকামস্য) স্পৃহা কা?[ন কাপি সম্ভবতীত্যাশয়ঃ]।

কেহ কেহ বলেন, ভোগের জন্য সৃষ্টি; অপর সকলে বলেন, ক্রীড়ার জন্য সৃষ্টি; [ স্বভাববাদী বলেন] ঈশ্বরের ইহাই স্বভাব; কারণ, পূর্ণকাম ঈশ্বরের আর স্পৃহা কি?[ অভিপ্রায় এই যে, যাহার কামনা আছে, তাহারই আকাঙ্ক্ষা হইতে পারে, সুতরাং পূর্ণকাম ঈশ্বরের আর স্পৃহা সম্ভব হয় না] ॥ ৯ ॥

শঙ্কর-ভাষ্যম্

অন্যে ভোগার্থং, ক্রীড়ার্থমিতি চ সৃষ্টিং মন্যন্তে। অনয়োঃ পক্ষয়োদূষণং দেবস্যৈষ স্বভাবোহয়মিতি। দেবস্য স্বভাবপক্ষমাশ্রিত্য, সর্ব্বেষাং বা পক্ষাণাম্— আপ্তকামস্য কা স্পৃহেতি। নহি রজ্জাদীনাম্ অবিদ্যাস্বভাব-ব্যতিরেকেণ সর্পাদ্য ভাসত্বে কারণং শক্যং বক্তুম্ ॥ ৯ ॥

ভাষ্যানুবাদ

অপর সকলে মনে করেন, এই সৃষ্টি কেবল ভোগের নিমিত্ত অথবা ক্রীড়ার নিমিত্ত[হইয়াছে]। ‘ইহাই দেব—ঈশ্বরের স্বভাব’ এই বাক্যে ঈশ্বরীয় স্বভাবপক্ষ অবলম্বনে উক্ত পক্ষদ্বয়ে দোষপ্রদর্শন [করা হইতেছে], অথবা ‘আপ্তকামের(যাহার কোন বিষয়ই অপ্রাপ্ত বা কাম্য নাই, তাহার) আর স্পৃহা কি?’ এই কথায় [পূর্ব্বোক্ত] সমস্ত পক্ষেরই দোষ প্রদর্শন[করা হইয়াছে]। কেন না, রজ্জুপ্রভৃতির যে, সর্পাদি আকারে প্রতিভাস(স্ফূর্ত্তি), রজ্জু- প্রভৃতির স্বভাবসিদ্ধ অবিদ্যা-সম্বন্ধ ব্যতীত আর কিছুই তাহার কারণ বলিতে পারা যায় না ॥ ৯

৩৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যাপনিষৎ

অথ শ্রুত্যারম্ভঃ

নান্তঃপ্রজ্ঞং না বহিঃপ্রজ্ঞং নোভয়তঃপ্রজ্ঞং নং প্রজ্ঞানঘনং নপ্রজ্ঞং নাপ্রজ্ঞম্। অদৃশ্যমব্যবহার্য্যমগ্রাহ্যমলক্ষণমচিন্ত্যমব্যপ- দেশ্যমেকাত্মপ্রত্যয়সারং প্রপঞ্চোপশমং শান্তং শিবমদ্বৈতং চতুর্থং মন্যন্তে, স আত্মা, স বিজ্ঞেয়ঃ ॥ ৭ ॥

সরলার্থঃ

[পারম্পর্য্যক্রমপ্রাপ্তং চতুর্থং পাদং বক্ত মুপক্রমতে “নান্তঃপ্রজ্ঞম্” ইত্যাদিনা] -অন্তঃপ্রজ্ঞং(বাসনাময়সূক্ষ্মভুক্) ন[এতেন তৈজসাৎ ব্যাবৃত্তিঃ]; বহিঃপ্রজ্ঞং (বাহ্যবিষয়ভুক্) ন[এতেন স্কুলভুগ-বিশ্বতো ব্যাবৃত্তিঃ]; উভয়তঃ প্রজ্ঞং (জাগ্রৎস্বপ্নয়োরন্তরালে প্রজ্ঞা যস্য, তৎ তথোক্তং, তথাবিধং) ন; প্রজ্ঞানঘনং (সুষুপ্তাবস্থং) ন[এতেন সুষুপ্তাবস্থাপন্ন-প্রাজ্ঞাৎ ব্যাবৃত্তিঃ]; প্রজ্ঞং(যুগপৎ সর্ব্ববিষয়জ্ঞাতৃ) ন; অপ্রজ্ঞং(অচৈতন্যং)[চ] ন।[অতঃপরং নির্বিশেষস্য জ্ঞানে- ন্দ্রিয়াবিষয়ত্বমাহ-অদৃশ্যমিত্যাদিনা।] অদৃশ্যং(চক্ষুরবিষয়ঃ),[অতএব] অব্যবহার্য্যং (ইদন্তয়া ব্যবহারাযোগ্যং); অগ্রাহ্যং(কর্মেন্দ্রিয়ৈঃ গ্রহীতুমশক্যৎ), অলক্ষণং (অলিঙ্গম্ অনুমানাগোচরং),[অতএব] অচিন্ত্যং(মনসোহপি অগম্যং),[অতএব] অব্যপদেশ্যং(শব্দৈঃ নির্দ্দিষ্টুমশক্যং), একাত্মপ্রত্যয়সারং(একঃ কেবলঃ যঃ আত্মপ্রত্যয়ঃ সর্ব্বাস্বপি অবস্থাসু ‘আত্মা’ ইতি অব্যভিচারী প্রত্যয়ঃ-জ্ঞানং, তৎসারং তেন অনুসরণীয় মিত্যর্থঃ; যদ্বা, একঃ আত্মপ্রত্যয়ঃ-‘অহম্’ ইতি জ্ঞানং সারং প্রমাণং যস্য অধিগমে, তৎ তথা), প্রপঞ্চোপশমং(জাগ্রদাদি-স্থান-সম্বন্ধ- শূন্যং),[অতঃ] শান্তং(নির্ব্যাপারং), শিবং(মঙ্গলময়ং), অদ্বৈতং(ভেদবিকল্প- য়হিতং) চতুর্থং(তুরীয়ং) মন্যন্তে[বিবেকিনঃ]। সঃ(তুরীয়ঃ) আত্মা(প্রত্যক্- স্বরূপঃ); সঃ[চ] বিজ্ঞেয়ঃ(তৎসাক্ষাৎকারাৎ পূর্ব্বমিতি ভাবঃ) ॥

বিবেকিগণ চতুর্থকে(তুরীয়কে) মনে করেন যে, তিনি অন্তঃপ্রজ্ঞ তৈজস নহেন; বহিঃপ্রজ্ঞ বিশ্ব নহেন; জাগ্রৎ ও স্বপ্নের মধ্যবর্তী জ্ঞানসম্পন্ন নহেন; প্রজ্ঞানঘন প্রাজ্ঞ নহেন; জ্ঞাতা নহেন; অচেতন নহেন; পরন্তু চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়ের অবিষয়, ‘ইহা অমুক’ ইত্যাকার ব্যবহারের অযোগ্য, কর্ম্মেন্দ্রিয়ের অগ্রাহ্য, [ অনুমানযোগ্য] কোনরূপ চিহ্নরহিত, মানস-চিন্তার অবিষয়, শব্দ দ্বারা নির্দেশের অযোগ্য; কেবল ‘আত্মা’ ইত্যাকার প্রতীতিগম্য, জাগ্রদাদি প্রপঞ্চের নিবৃত্তিস্থান,

আগম-প্রকরণম্ ৩৭

শান্ত(নির্বিকার), মঙ্গলময়, অদ্বৈত। তিনিই আত্মা; এবং তিনিই একমাত্র জ্ঞাতব্য পদার্থ ॥ ৭ ॥

শঙ্কর-ভাষ্যম্

চতুর্থঃ পাদঃ ক্রমপ্রাপ্তো বক্তব্য ইত্যাহ-নান্তঃপ্রজ্ঞমিত্যাদিনা। সর্ব্বশব্দ- প্রবৃত্তিনিমিত্তশূন্যত্বাৎ তস্য শব্দানভিধেয়ত্বমিতি বিশেষ-প্রতিষেধেনৈব তুরীয়ং নিদিদিক্ষতি। শূন্যমেব তর্হি; তন্ন, মিথ্যাবিকল্পস্য নির্নিমিত্তত্বানুপপত্তেঃ; ন হি রজত-সর্প-পুরুষ মৃগতৃষ্ণিকাদিবিকল্পাঃ শুক্তিকা-রজ্জ-স্থানুষরাদি-ব্যতিরেকেণ অবস্থাস্পদাঃ শক্যাঃ কল্পয়িতুম্।

এবং তর্হি প্রাণাদিসর্ববিকল্পাস্পদত্বাৎ তুরীয়স্য শব্দবাচ্যত্বম্ ইতি, ন প্রতি- যেধৈঃ প্রত্যায্যত্বম্ উদকাধারাদেরিব ঘটাদেঃ; ন, প্রাণাদিবিকল্পস্যসেত্ত্বাৎ শুক্তিকা- দিঘিব রজতাদেঃ; ন হি সদসতোঃ সম্বন্ধঃ শব্দপ্রবৃত্তি-নিমিত্ত-ভাক্, অবস্তুত্বাৎ; নাপি প্রমাণান্তরবিষয়ত্বং স্বরূপেণ গবাদিবৎ, আত্মনো নিরুপাধিকত্বাৎ; গবাদিবৎ নাপি জাতিমত্ত্বম্, অদ্বিতীয়ত্বেন সামান্য-বিশেষাভাবাৎ, নাপি ক্রিয়াবত্ত্বং পাচকা- দিবৎ, অবিক্রিয়ত্বাৎ; নাপি গুণবত্ত্বং নীলাদিবৎ, নির্গুণত্বাৎ; অতো নাভি- ধানেন নির্দেশমর্হতি।

শশ-বিষাণাদিসমত্বাৎ নিরর্থকত্বং তর্হি? ন, আত্মত্বাবগমে তুরীয়স্য অনাত্ম- তৃষ্ণাব্যাবৃত্তিহেতুত্বাৎ শুক্তিকাবগম ইব রজততৃষ্ণায়াঃ; ন হি তুরীয়স্যাত্মত্বাবগমে সতি অবিদ্যাতৃষ্ণাদিদোষাণাং সম্ভবোহস্তি। ন চ তুরীয়স্য আত্মত্বাবিগমে কারণ- মস্তি, সর্ব্বোপনিষদাং তাদর্থ্যেনোপক্ষয়াৎ—“তত্ত্বমসি”, “অয়মাত্মা ব্রহ্ম”, “তৎ সত্যম্, স আত্মা”, “যৎ সাক্ষাদপরোক্ষাদ্বহ্ম”, “স বাহ্যাভ্যন্তরো হ্যজঃ, “আত্মৈবেদং সর্ব্বম্” ইত্যাদীনাম্।

সোহয়মাত্মা পরমার্থাপরমার্থরূপশ্চতুষ্পাদিত্যুক্তঃ। তস্যাপরমার্থরূপমবিদ্যাকৃতং রজ্জুসর্পাদিসমমুক্তং পাদত্রয়লক্ষণং বীজাঙ্কুরস্থানীয়ম্। অথেদানীমবীজাত্মকং পরমার্থস্বরূপং রজ্জুস্থানীয়ং সর্পাদিস্থানয়োক্তস্থানত্রয়নিরাকরণেনাহ—নান্তঃপ্রজ্ঞ- মিত্যাদিনা।

ননু আত্মনশ্চতুষ্পাত্ত্বং প্রতিজ্ঞায় পাদত্রয়কথনেনৈব চতুর্থস্যান্তঃ-প্রজ্ঞাদি- ভ্যোহন্যত্বে সিদ্ধে “নান্তঃ প্রজ্ঞম্” ইত্যাদিপ্রতিষেধোহনর্থকঃ; ন, সর্পাদি-বিকল্প- প্রতিষেধেনৈব রজ্জুত্বরূপপ্রতিপত্তিবৎ এ্যাবস্থস্যৈব আত্মনস্তুরীয়ত্বেন প্রতিপিপাদয়ি-

৩৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ষিতত্বাৎ, “তত্ত্বমসি” ইতিবৎ। যদি হি এ্যবস্থাত্মবিলক্ষণং তুরীয়মন্যৎ, তৎপ্রতি- পত্তিদ্বারাভাবাৎ শাস্ত্রোপদেশানর্থক্যং শূন্যতাপত্তির্ব্বা। রজ্জুরিব সর্পাদিভির্বিকল্প্য- মানা স্থানত্রয়েহপি আত্মৈক এবান্তঃপ্রজ্ঞাদিত্বেন বিকল্পতে যদা, তদা অন্তঃ- প্রজ্ঞাদিত্ব-প্রতিষেধবিজ্ঞান প্রমাণসমকালমেব আত্মনি অনর্থপ্রপঞ্চনিবৃত্তিলক্ষণং ফলং পরিসমাপ্তম্ ইতি তুরীয়াধিগমে প্রমাণান্তরং সাধনান্তরং বা ন মৃগ্যম্; রজ্জু সর্প- বিবেকসমকাল ইব রজ্জাং সর্পনিবৃত্তিফলে সতি রজ্জধিগমস্য। যেষাং পুনস্তমোহপ- নয়নব্যতিরেকেণ ঘটাধিগমে প্রমাণং ব্যাপ্রিয়তে, তেষাং ছেদ্যাবয়বসম্বন্ধ-বিয়োগ- ব্যতিরেকেণ অন্যতরাবয়বেহপি চ্ছিদির্ব্যাপ্রিয়ত ইত্যুক্তং স্যাৎ। যদা পুনর্ঘট- তমসোর্বিবেককরণে প্রবৃত্তং প্রমাণমনুপাদিতসিততমোনিবৃত্তিফলাবসানং ছিদিরিব চ্ছেদ্যাবয়বসম্বন্ধ-বিবেককরণে প্রবৃত্তা তদবয়বদ্বৈধীভাবফলাবসানা, তদা নান্ত- রীয়কং ঘটবিজ্ঞানং, ন তৎ প্রমাণফলম্।

ন চ তদ্বদপি আত্মন্যধ্যারোপিতান্তঃপ্রজ্ঞত্বাদিবিবেককরণে প্রবৃত্তস্য প্রতি- ষেধবিজ্ঞানপ্রমাণস্য অনুপাদিৎসিতান্তঃপ্রজ্ঞত্বাদি-নিবৃত্তিব্যতিরেকেণ তুরীয়ে ব্যাপারোপপত্তিঃ, অন্তঃপ্রজ্ঞত্বাদিনিবৃত্তিসমকালমেব প্রমাতৃত্বাদিভেদনিবৃত্তেঃ। তথা চ বক্ষ্যতি—“জ্ঞাতেহদ্বৈতং ন বিদ্যতে” ইতি। জ্ঞানস্য দ্বৈতনিবৃত্তিলক্ষণব্যতি- রেকেণ ক্ষণান্তরানবস্থানাৎ, অবস্থানে বা অনবস্থাপ্রসঙ্গাৎ দ্বৈতানিবৃত্তিঃ; তস্মাৎ প্রতিষেধবিজ্ঞান-প্রমাণব্যাপারসমকাল এব আত্মনি অধ্যারোপিতান্তঃপ্রজ্ঞত্বাদ্য- নর্থনিবৃত্তিরিতি সিদ্ধম্।

নান্তঃপ্রজ্ঞমিতি তৈজসপ্রতিষেধঃ। ন বহিঃপ্রজ্ঞমিতি বিশ্বপ্রতিষেধঃ। নোভয়তঃপ্রজ্ঞমিতি জাগ্রৎ-স্বপ্নয়োরন্তরালাবস্থাপ্রতিষেধঃ। ন প্রজ্ঞানঘনমিতি সুষুপ্তাবস্থাপ্রতিষেধঃ, বীজ ভাবাবিবেকস্বরূপত্বাৎ। ন প্রজ্ঞমিতি যুগপৎ সর্ব্ববিষয়- জ্ঞাতৃত্বপ্রতিষেধঃ। নাপ্রজ্ঞমিতি অচৈতন্যপ্রতিষেধঃ।

কথং পুনরন্তঃ প্রজ্ঞত্বাদীনামাত্মনি গম্যমানানাং রজ্জাদৌ সর্পাদিবৎ প্রতিষেধাৎ অসত্ত্বং গম্যত ইতি? উচ্যতে জ্ঞস্বরূপবিশেষেহপি ইতরেতব্যভিচারাৎ অসত্যত্বং রজ্জাদাবিব সর্পধারাদিবিকল্পভেদবৎ; সর্ব্বাত্রাব্যভিচারাজ্জস্বরূপস্য সত্যত্বম্। সুষুপ্তে ব্যভিচরতীতি চেৎ, ন, সুষুপ্তস্যানুভূয়মানত্বাৎ, “ন হি বিজ্ঞাতুর্বিজ্ঞাতে- র্বিপরিলোপো বিদ্যুতে” ইতি শ্রুতেঃ; অত এবাদৃশ্যম্। যম্মাদদৃশ্যং, তস্মাদ- ব্যবহার্য্যম্। অগ্রাহ্যং কর্ম্মেন্দ্রিয়ৈঃ। অলক্ষণম্ অলিঙ্গমিত্যেতৎ, অননুমেয়মিত্যণ। অত এবাচিন্ত্যম্। অত এব অব্যপদেশ্যং শব্দৈঃ। একাত্মপ্রত্যয়সারং জাগ্রদাদি স্থানেষু এক এবায়মাত্মা ইত্যব্যভিচারী যঃ প্রত্যয়ঃ তেনানুসরণীয়ম্; অথবা এক

আগম-প্রকরণম্ ৩৯

আত্মপ্রত্যয়ঃ সারঃ প্রমাণং যস্য তুরীয়স্যাধিগমে, তৎ তুরীয়মেকাত্মপ্রত্যয়সারম্, “আত্মেত্যেবোপাসীত” ইতি শ্রুতেঃ। অতঃপ্রজ্ঞত্বাদিস্থানিধৰ্ম্মপ্রতিষেধঃ কৃতঃ, প্রপঞ্চোপশমমিতি জাগ্রদাদিস্থানধর্মাভাব উচ্যতে। অতএব শান্তম্ অবিক্রিয়ৎ, শিবং, যতোহদ্বৈতং ভেদবিকল্পরহিতং চতুর্থং তুরীয়ং মন্যন্তে, প্রতীয়মানপাদত্রয়রূপ- বৈলক্ষণ্যাৎ। স আত্মা, স বিজ্ঞেয়ইতি প্রতীয়মানসর্পদণ্ডগুচ্ছিদ্রাদিব্যতিরিক্তা যথা রজ্জুঃ, তথা “এত্ত্বমসি” ইত্যাদিবাক্যার্থঃ। আত্মা “অদৃষ্টো দ্রষ্টা”, “ন হি দ্রষ্টুদৃষ্টে- বিপরিলোপো বিদ্যতে” ইত্যাদিভিরুক্তো যঃ স বিজ্ঞেয় ইতি ভূতপূর্ব্বগত্যা। জ্ঞাতে দ্বৈতাভাবঃ ॥ ৭ ॥

ভাষ্যানুবাদ

পারম্পর্য্য-ক্রমানুসারে এখন চতুর্থ পাদটি বলা আবশ্যক; এই- জন্য “নান্তঃপ্রাজ্ঞং” ইত্যাদি বাক্যে তাহা বলিতেছেন। তদ্বিষয়ে কোন শব্দেই প্রবৃত্তি(প্রকাশনসামর্থ্য) নাই; সুতরাং তিনি শব্দ- বাচ্য নহেন; এই নিমিত্ত[লোকপ্রতীতির যোগ্য] বিশেষ ধর্ম্মের প্রতিষেধ দ্বারাই তাঁহাকে নির্দেশ করিতে ইচ্ছা করিতেছেন।

[ ভাল, তুরীয়ে যদি কোনরূপই বিশেষ ভাব না থাকে]; তাহা হইলে তাহা ত শূন্য হইয়া পড়ে? না-তাহা শূন্য নহে; কারণ, বিনা কারণে কখনই মিথ্যাময় কল্পনা হইতে পারে না; কেননা, শুক্তি, রজ্জু, স্থাণু(কাণ্ডশাখাদিবিহীন বৃক্ষাংশ) ও মরুভূমি প্রভৃতি আশ্রয় ব্যতিরেকে নিরাশ্রয়ভাবে কখনই[যথাক্রমে] রজত, সর্প, মনুষ্য, মৃগতৃষ্ণাদি ভ্রমপ্রতীতি কল্পনা করিতে পারা যায় না। তিনি যদি সর্বকল্পনার আশ্রয়স্থান হন, তাহা হইলে ঘটাদি পদার্থ যেরূপ জলা- ধারাদিরূপে শব্দ-বাচ্য হয়, সেইরূপ তুরীয়ও[ভ্রমাধিষ্ঠানরূপে] শব্দ- বাচ্য হইতে পারেন; সুতরাং নিষেধ দ্বারা তাঁহার প্রতীতি সম্পাদনের আবশ্যক হয় না। না-এ আপত্তি হইতে পারে না; কারণ, শুক্তিকা প্রভৃতিতে কল্পিত রজতাদির ন্যায় প্রাণাদির কল্পনাও অসৎ-অবস্তু; সৎ ও অসতের সম্বন্ধ কখনই শব্দজনিত বোধের বিষয় হইতে পারে না; কারণ, উহা অবস্তু-মিথ্যা। আর গবাদি সত্য পদার্থ যেরূপ

৪০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

স্বরূপতই প্রত্যক্ষাদি প্রমাণান্তরের বিষয় হয়, সেরূপও হইতে পারে না; কারণ, আত্মা বস্তুটি নিরুপাধিক। গবাদির ন্যায় জাতি- বিশিষ্টও নহে, কারণ, অদ্বিতীয় পদার্থের সামান্য বিশেষভাব নাই; আর পাচকাদির ন্যায় ক্রিয়াবত্ত্বও নাই, কারণ, অবিক্রিয়; নীলাদি দ্রব্যের ন্যায় গুণবত্তাও নাই, কারণ, তিনি নির্গুণ; কাজেই তিনি শব্দ দ্বারা নির্দেশযোগ্য হন না।

ভাল, তাহা হইলে ত শশবিষাণাদির ন্যায় আনর্থক্য দোষ ঘটে; না-শুক্তিকার জ্ঞান হইলে যেমন রজততৃষ্ণার নিবৃত্তি হইয়া যায়, তুরীয়কে আত্মা বলিয়া অবগত হইলেও তেমনি অনাত্ম-বিষয়ক তৃষ্ণার নিবৃত্তি হইয়া যায়; ঐ আত্মাবগমই তৃষ্ণানিবৃত্তির হেতু;[ সুতরাং তুরীয় বস্তুটি নিরর্থক নহে]। আর তুরীয়কে আত্মারূপে উপলব্ধি করিতে যে কোন প্রতিবন্ধক আছে, তাহাও নহে; কেননা, ঐ আত্ম- ত্বাবগতির উদ্দেশেই সমস্ত উপনিষৎ শাস্ত্র পরিসমাপ্ত হইয়াছে-‘তুমি তৎস্বরূপ,’ ‘এই আত্মা ব্রহ্মস্বরূপ’, ‘তিনিই সত্য, এবং তিনিই আত্মা’, ‘যাহা সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষস্বরূপ ব্রহ্ম’, ‘তিনিই বাহ্য, আভ্যন্তর ও জন্ম- রহিত(নিত্য)’, ‘এই সমস্তই আত্মস্বরূপ’ ইত্যাদি। সেই এই আত্মাই পরমার্থ ও অপরমার্থ পাদচতুষ্টয়-বিশিষ্ট বলিয়া উক্ত হইয়াছেন। বীজাস্কুর-স্থানপাতী যে তাঁহার পাদত্রয়, তাহা অবিদ্যা- কৃত-অপারমার্থিক; সুতরাং রজ্জু সর্পতুল্য কথিত হইয়াছে। তাহার পর এখন পূর্ব্বোক্ত সর্পাদিস্থানীয় স্থানত্রয় প্রতিষেধ দ্বারা অবীজা- ত্মক রজ্জুস্থানীয় পারমার্থিক স্বরূপ প্রতিপাদনার্থ বলিতেছেন- “নান্তঃপ্রজ্ঞং” ইত্যাদি।

ভাল, আত্মার চতুষ্পাদত্ব প্রতিজ্ঞার পর পাদত্রয়-নিরূপণেই ত ‘অন্তঃপ্রজ্ঞ’ প্রভৃতি হইতে চতুর্থ পাদের পার্থক্য সিদ্ধ হইতে পারে; সুতরাং “নান্তঃপ্রজ্ঞং” ইত্যাদি প্রতিষেধক বাক্য নিরর্থক বা অনা- বশ্যক। না—নিরর্থক হয় না; কারণ, কল্পিত সর্পাদি পদার্থের নিষেধ দ্বারাই যেমন রজ্জুর স্বরূপ পরিজ্ঞাত হয়, তেমনি অবস্থাত্রয়-বিশিষ্ট

আগম-প্রকরণম্ ৪১

আত্মারই এখানে[ঐ অবস্থাত্রয়ের প্রতিষেধ দ্বারা] তুরীয়ভাব প্রতি- পাদন করা অভিপ্রেত; যেমন “তৎ ত্বম্ অসি” ইত্যাদি বাক্যে হইয়াছে। অবস্থাত্রয়-বিশিষ্ট আত্ম-বিলক্ষণ তুরীয় যদি সেই অবস্থা- ত্রয়-সম্পন্ন আত্মা হইতে অন্য—অতিরিক্ত হইত, তাহা হইলে তদ্বিষয়ে জ্ঞানলাভের কোনরূপ উপায়ই থাকিত না; সুতরাং তদ্‌- বিষয়ক শাস্ত্রোপদেশেরও আনর্থক্য ঘটিতে পারিত; পক্ষান্তরে শূন্যবাদও আসিতে পড়িতে পারিত। বস্তুতঃ রজ্জু যেরূপ সর্পাদিরূপে কল্পিত হইয়া থাকে, তদ্রূপ একই আত্মা যখন পূর্ব্বোক্ত অবস্থাত্রয়ে অন্তঃ- প্রজ্ঞাদিরূপে কল্পিত হইতেছে, তখন অন্তঃপ্রজ্ঞত্ব প্রভৃতি অবস্থার প্রতিষেধসমকালেই আত্মাতে আরোপিত অনর্থরাশির নিবৃত্তিরূপ জ্ঞান ফল সমাপ্ত হইয়া যায়; এই কারণে তুরীয়-বিজ্ঞানের জন্য আর পৃথক্ সাধন বা প্রমাণের অনুসন্ধান করিবার আবশ্যক হয় না। রজ্জু সর্পের বিবেক-জ্ঞান উপস্থিত হইলেই যেরূপ রজ্জুতে সর্পনিবৃত্তিরূপ ফল সিদ্ধ হয়, রজ্জু-জ্ঞানের জন্য আর পৃথক্ প্রমাণের আবশ্যক হয় না, ইহাও তদ্রূপ।

তার যাহাদের মতে[ অন্ধকারস্থিত] ঘট জানিবার জন্য তত্রত্য অন্ধকারের অপনয় ছাড়া আরও প্রমাণের আবশ্যক হয়, তাহাদের মতে ছেদ্য বস্তুর অবয়ব সম্বন্ধ ধ্বংস করাই ছেদনক্রিয়ার ফল হইলেও অবয়ব সম্বন্ধ ধ্বংস ভিন্ন তদবয়বেও ছেদনক্রিয়ার অন্য কোনরূপ ব্যাপার বা কার্য্য হয়, ইহা স্বীকার করিতে হয় *। ছেদ্য বস্তুর অবয়বের

* তাৎপর্য্য—ভাষ্যকারের অভিপ্রায় এই যে, যে বিষয়ে জ্ঞান উপস্থিত হয়, সেই জ্ঞানই তদগত অজ্ঞান নিবৃত্তি করিয়া সেই বিষয়কে প্রকাশিত করিয়া দেয়, তদর্থে আর প্রমাণান্তরের আবশ্যক হয় না। এখন পরপক্ষ নিরাস দ্বারা সেই সিদ্ধান্তেরই সমর্থন করিতেছেন। অন্ধকারস্থ ঘটকে জানিতে হইলে দীপের সাহায্যে অন্ধকার নিবৃত্তি করা আবশ্যক হয়, ঐ অন্ধকার নিবৃত্তি-বিষয়েই দীপের ব্যাপার বা চেষ্টা হইয়া থাকে; অন্য বিষয়ে নহে। এখন যদি সেই দীপের অন্ধকার নিবৃত্তি ভিন্ন আরও কোন ব্যাপার স্বীকার করা হয়, তাহা হইলে ঠিক এইরূপ কথাই স্বীকার করা হয় যে, ছেদন একটি ক্রিয়া, তাহার কার্য্য ছেদ্যবস্তুর অবয়ব সম্বন্ধ ধ্বংস করিয়া দেওয়া; তদ্ভিন্ন অন্য বিষয়ে উহার কোনরূপ কার্য্য নাই; ইহা সর্ব্বসম্মত কথা। এখন যদি অন্ধকার নিবৃত্তি ভিন্ন অন্য বিষয়েও দীপের ব্যাপার স্বীকার করা যায়,

৪২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

সংযোগ-বিনাশে প্রবৃত্ত ছেদনক্রিয়া যেরূপ সেই অবয়বের দ্বৈধীভাব- মাত্র(দ্বিখণ্ডিত করণমাত্র) ফল সম্পাদন করিয়াই পরিসমাপ্ত হয়, ঠিক সেইরূপ ঘট ও অন্ধকারের বিশ্লেষণার্থ প্রবৃত্ত প্রমাণও যখন অনুপাদিৎসিত(যাহা গ্রহণ করিতে ইচ্ছা নাই, সেই) অন্ধকার নিবৃত্তিরূপ ফলসম্পাদনেই সমাপ্ত হইয়া যায়, তখন তাহারই আনু- ষঙ্গিক ঘটবিষয়ক জ্ঞান কখনই সেই প্রমাণের ফলস্বরূপ হইতে পারে না। সেইরূপ আত্মাতে আরোপিত অন্তঃপ্রজ্ঞত্বাদি ধর্ম্মের অপনয়নে প্রবৃত্ত নিষেধ-বোধক প্রমাণের(‘নান্তঃপ্রজ্ঞং’ ইত্যাদির) অনুপাদেয় অন্তঃপ্রজ্ঞত্বাদিধর্ম-নিবারণ ভিন্ন তুরীয়ব্রহ্মে অন্য কোনরূপ ব্যাপার উপপন্ন হয় না; কেননা, যেই মুহূর্তে অন্তঃপ্রজ্ঞত্বাদি ধর্ম্মের নিবৃত্তি হয়, তন্মুহূর্তেই[আত্মার] প্রমাতৃত্বাদি(জ্ঞাতৃত্বাদি) ভেদেরও নিবৃত্তি হইয়া যায়;[প্রমাণ-প্রমাতৃত্বাদিভাবগুলি ভেদসাপেক্ষ; সুতরাং তখন তাহাদের অস্তিত্ব থাকে না]। সেইরূপ বলাও হইবে যে, “তত্ত্বজ্ঞানোদয়ে দ্বৈত বা ভেদবুদ্ধি থাকে না।” কারণ, ঐ প্রমাণ জ্ঞান দ্বৈতনিবৃত্তিসময়ের পর আর ক্ষণমাত্রও থাকে না; আর যদি বল, তখনও থাকে, তাহা হইলে ত অনবস্থা দোষই উপস্থিত হইয়া পড়ে।* ফলে দ্বৈতনিবৃত্তিও হইতে পারে না। অতএব উক্ত নিষেধজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গেই যে, আত্মাতে অধ্যারোপিত অনর্থকর অন্তঃপ্রজ্ঞত্বাদি ধর্ম্মের নিবৃত্তি হইয়া যায়, ইহা প্রমাণিত হইল।

তাহা হইলে, ঐ ছেদনক্রিয়াটিও অবয়ব-সংযোগ ধ্বংস ছাড়া সেই অবয়বেও অন্য কোনরূপ কার্য্য উৎপাদন করিয়া থাকে, ইহা স্বীকার করিতে হয়; অথচ তাহা কেহই স্বীকার করে না। অতএব অজ্ঞান-নিবৃত্তি ভিন্ন অন্য বিষয়ে জ্ঞানের ব্যাপার কল্পনা সঙ্গত হইতে পারে না।

* তাৎপর্য্য—অদ্বৈততত্ত্ব বুঝিবার জন্য যে সকল প্রমাণের ব্যবহার হইয়া থাকে, সেগুলিও দ্বৈতপ্রপঞ্চান্তর্গত—অদ্বৈতের অন্তর্ভূত নহে। অতএব, ঐ সকল প্রমাণ দ্বারা যখন দ্বৈত-নিবৃত্তি হইয়া যায়, তৎসঙ্গে সেই দ্বৈত প্রমাণগুলিও অন্তর্হিত হইয়া পড়ে; নচেৎ সেই দ্বৈত-প্রমাণ নিবৃত্তির জন্যও আবার অপর একটি প্রমাণ গ্রহণ করিতে হয়, সেটিও দ্বৈতাত্মক; সুতরাং তন্নিবৃত্তির জন্যও আর একটি প্রমাণ এবং তন্নিবৃত্তির জন্যও আর একটি প্রমাণ গ্রহণের আবশ্যক হয়; এইরূপে প্রমাণ-কল্পনার অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ চলিতে থাকে; তাহার আর কুত্রাপি বিশ্রাম হইতে পারে না; এখানে এইরূপ ‘অনবস্থা’ দোষ উপস্থিত হইতে পারে।

আগম-প্রকরণম্ ৪৩

‘নান্তঃপ্রজ্ঞ’ এইটি ‘তৈজসের’ প্রতিষেধ; ‘ন বহিঃপ্রজ্ঞ’ এইটি ‘বিশ্বের প্রতিষেধ’; ‘নোভয়তঃপ্রজ্ঞ’ ইহা জাগ্রৎ ও স্বপ্ন, এতদুভয়ের মধ্যবর্তী অবস্থার প্রতিষেধ; ‘ন প্রজ্ঞানঘন’ এটি সুষুপ্তাবস্থার প্রতি- ষেধ; কারণ, উহার স্বরূপটি বীজভাবাপন্ন অবিবেকাত্মক; ‘ন প্রজ্ঞ’ এইটি এককালে সর্ববিষয়ক জ্ঞানের প্রতিষেধ; আর ‘ন অপ্রজ্ঞ’ এইটি অচৈতন্যের প্রতিষেধ[বুঝিতে হইবে]।

প্রশ্ন হইতেছে যে, অন্তঃপ্রজ্ঞত্বাদি ভাবগুলি যখন আত্মাতে প্রত্যক্ষ হইতেছে, তখন কেবল প্রতিষেধ-বলে রজ্জু প্রভৃতিতে সর্পাদির ন্যায় তাহাদের অসত্তা বা মিথ্যাত্ব বুঝা যায় কিরূপে?[উত্তর-] বলা হইতেছে-[ বিশ্ব-তৈজসাদির] স্বরূপগত চৈতন্যংশে কিছুমাত্র বিশেষ বা পার্থক্য না থাকিলেও উহাদের একটির অবস্থিতিকালে যখন অপরটি থাকে না, তখন উহারা ইতরেতর-ব্যভিচারী অর্থাৎ প্রত্যেকেই প্রত্যেককে ছাড়িয়া থাকে। এই কারণেই রজ্জুতে কল্পিত সর্প ও জলধারাদির ন্যায় উহারা অসত্য-মিথ্যা; আর আত্মার জ্ঞাতৃভাবটি কোথাও ব্যভিচারী হয় না,-সর্বত্রই অনুস্যূত থাকে; সুতরাং উহা সত্য। যদি বল, সুষুপ্তিকালে আত্মারও ত জ্ঞাতৃভাব থাকে না; সুতরাং উহাও ব্যভিচারী হইতে পারে? না; সে সময়েও[তাহার জ্ঞাতৃভাব] অনুভবগোচর হইয়া থাকে; কারণ, শ্রুতি বলিতেছেন যে, ‘বিজ্ঞাতা আত্মার জ্ঞান কখনই বিলুপ্ত হয় না’, আর এই কারণেই [তুরীয়] অদৃশ্য[দর্শনের অযোগ্য]। যেহেতু অদৃশ্য, সেই হেতুই অব্যবহার্য্য,[এবং] কর্মেন্দ্রিয়ের অগ্রাহ্য(গ্রহণযোগ্য নহে)। অলক্ষণ অর্থ-জ্ঞানোপযোগী লিঙ্গরহিত, অর্থাৎ অনুমানের অবিষয়; অচিন্তনীয় বলিয়াই শব্দ দ্বারা নির্দেশের যোগ্য নহে। ‘একাত্ম-প্রত্যয়- সার’ অর্থ-জাগ্রৎ, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি, এই স্থানত্রয়ে অনুভূয়মান আত্মা এক-অভিন্ন; এই প্রকার যে প্রতীতি, তাহা দ্বারা তাঁহার অনুসরণ বা অনুসন্ধান করিতে হয়; অথবা, আত্ম-প্রত্যয় অর্থ-‘আত্মা’ ইত্যাকার প্রতীতিই যাহার তুরীয়ের অনুভব-বিষয়ে একমাত্র প্রমাণ; সেই তুরীয় পদার্থ ‘একাত্ম-প্রত্যয়সার’ পদবাচ্য; কেননা,

৪৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যাপনিষৎ

‘তাঁহাকে কেবল ‘আত্মা’ বলিয়াই উপাসনা করিবে,’ এইরূপ শ্রুতি রহিয়াছে।

এ পর্যন্ত, জাগ্রদাদি স্থানবর্তী আত্মার অন্তঃপ্রজ্ঞত্বাদি ধর্ম্মের (স্থানিধর্মের) প্রতিষেধ কথিত হইয়াছে। এখন ‘প্রপঞ্চোপশম’ ইত্যাদি কথায়[আত্মাতে] জাগ্রৎ-স্বপ্নাদি স্থানধর্মেরও অভাব (প্রতিষেধ) কথিত হইতেছে।[যেহেতু প্রপঞ্চোপশম, অর্থাৎ জাগ্রদাদি সম্বন্ধশূন্য], অতএব, শান্ত অর্থাৎ নির্ব্বিকার ও শিব(মঙ্গল- ময়);(জ্ঞানিগণ) অদ্বৈত অর্থাৎ ভেদ-কল্পনারহিত চতুর্থ-তুরীয় বলিয়া মনে করেন; কেননা, পূর্ব্বোক্ত পাদত্রয়ের যাহা স্বরূপ, এই চতুর্থ তাহা হইতে বিলক্ষণ বা বিভিন্নপ্রকার। সেই তুরীয়ই[প্রকৃত] আত্মা, এবং তাহাই বিশেষরূপে জ্ঞেয়। রজ্জু যেমন প্রতীয়মান সর্প, দণ্ড ও ভূ-রেখা প্রভৃতি হইতে পৃথক্, তেমনি ‘তুমি তৎস্বরূপ’ ইত্যাদি বাক্য-প্রতিপাদ্য যে আত্মা—কেবলই ‘দ্রষ্টা, কিন্তু দৃষ্টির বিষয় নহে,’ এবং ‘দ্রষ্টার দৃষ্টির কখনই বিলোপ হয় না’ ইত্যাদি বাক্যে বর্ণিত হই- য়াছে; তাহাকেই জ্ঞাতব্য বলিয়া উপদেশ করা হইয়াছে। ‘জানিতে হইবে’ এই কথাটি ‘ভূতপূর্ব্ব-গতি’ নিয়মানুসারে কথিত হইয়াছে। * কেননা, জ্ঞানের পর আর দ্বৈত-প্রপঞ্চ থাকে না বা থাকিতে পারে না; সুতরাং তখন আর কিছুই বিজ্ঞেয় থাকিতে পারে না ॥ ৭

অট্রেতে শ্লোকা ভবন্তি—

নিবৃত্তেঃ সর্ব্বদুঃখানামীশানঃ প্রভুরব্যয়ঃ।

অদ্বৈতঃ সর্ব্বভাবানাং দেবস্তুর্য্যো বিভুঃ স্মৃতঃ ॥ ১০

সরলার্থঃ

[ ইদানীং “নান্তঃপ্রজ্ঞম্” ইত্যাদিশ্রুত্যুক্তে অর্থে শ্লোকান্ অবতারয়িতুমাহ—

* তাৎপর্য্য—অদ্বৈত আত্মজ্ঞান হইলে সমস্ত দ্বৈতপ্রপঞ্চ মিথ্যা হইয়া যায়; তখন জ্ঞাতৃজ্ঞেয়াদি বিভাগ থাকে না; বিশেষতঃ শ্রুতি এখানেও যখন তুরীয়কে ‘অব্যবহার্য্য’ বলিয়াছেন, তখন তাহাকেই আবার ‘বিজ্ঞেয়’ বলিয়া উপদেশ করিতেছেন কিরূপে? তদুত্তরে বলিতেছেন যে, ভূতপূর্ব্বগতি আশ্রয়ে, অর্থাৎ অবিদ্যাদশায় যে জ্ঞেয়ত্ব ছিল, সেই জ্ঞেয়ত্ব স্মরণ করিয়াই তুরীয়কেও বিজ্ঞেয় বলা হইয়াছে। বস্তুতঃ তুরীয় দশায় বিজ্ঞেয়ত্ব সম্বন্ধ নাই।

আগম-প্রকরণম্ ৪৫

অত্রেতি]।—অব্যয়ঃ(সর্ব্বপ্রকার-বিকার-বর্জিতঃ) ঈশানঃ(ঈশানাদি শক্তিমান্ তুরীয়ঃ) সর্বদুঃখানাং(প্রাজ্ঞ-তৈজস-বিশ্বাদিরূপাণাং) নিবৃত্তেঃ(প্রশমনস্য) প্রভুঃ(সমর্থঃ)[ভবতি]।[যতঃ] সর্ব্বভাবানাং(সর্ববস্তুনাং)[মিথ্যাত্বাৎ] অদ্বৈতঃ(অদ্বিতীয়ত্বলক্ষণঃ) দেবঃ(প্রকাশশীলঃ) তুর্য্যঃ(তুরীয়ঃ পরমেশ্বরঃ) প্রভুঃ(নিগ্রহানুগ্রহসমর্থঃ) স্মৃতঃ(কথিতঃ)[বিবেকিভিরিতি শেষঃ]।

সর্ব্বপ্রকার বিকার-বর্জিত ঈশান-পদবাচ্য তুরীয়ই প্রাজ্ঞ-তৈজসাদিভাবাত্মক সমস্ত দুঃখনিবৃত্তির প্রভু। কেননা,[মিথ্যাময়] সর্ব্ব বস্তুর সম্বন্ধে প্রকাশ-স্বভাব অদ্বৈত তুরীয়ই প্রভু বলিয়া কথিত হইয়াছেন ॥ ১০

শঙ্কর-ভাষ্যম্

অত্রৈতে শ্লোকা ভবন্তি। প্রাজ্ঞ তৈজস-বিশ্বলক্ষণানাং সর্ব্বদুঃখানাং নিবৃত্তেঃ ঈশানস্তুরীয় আত্মা। ঈশান ইত্যস্য পদস্য ব্যাখ্যানং প্রভুরিতি; দুঃখনিবৃত্তিং প্রতি প্রভুর্ভব্যতীত্যর্থঃ; তদ্বজ্ঞাননিমিত্তত্বাৎ দুঃখনিবৃত্তেঃ। অব্যয়ো ন-ব্যেতি স্বরূপাৎ ন ব্যভিচরতি ন চ্যবত ইত্যেতৎ। কুতঃ? যম্মাদদ্বৈতঃ, সর্বভাবানাং—সর্পাদীনাং রজ্জুরদ্বয়া সত্যা চ এবং তুরীয়ঃ, “নহি দ্রষ্টু দৃষ্টৈবিপরিলোপো বিদ্যতে” ইতি শ্রুতেঃ, অতো রজ্জুসর্পবৎ মৃষাত্বাৎ। স এষ দেবো দ্যোতনাৎ, তুর্য্যশ্চতুর্থঃ, বিভুর্ব্যাপী স্মৃতঃ ॥ ১০

ভাষ্যানুবাদ

ঈশান অর্থ—তুরীয় আত্মা; তিনিই প্রাজ্ঞ, তৈজস ও বিশ্বাদিরূপ সমস্ত দুঃখের নিবারণে প্রভু। ‘প্রভু’ কথাটি ‘ঈশান’ শব্দেরই অর্থ- প্রকাশক।[উহার অর্থ এই যে,] সর্ব্ব দুঃখ-নিবৃত্তির সম্বন্ধে প্রভু হন; কেননা, তদ্বিষয়ক জ্ঞানই দুঃখ-নিবৃত্তির একমাত্র কারণ। অব্যয় অর্থ—তিনি ব্যয়িত হন না—স্বরূপ হইতে প্রচ্যুত হন না, অর্থাৎ নিজের স্বরূপ কখনই পরিত্যাগ করেন না। ইহা কি কারণে হয়? যেহেতু তিনি অদ্বৈত ও সত্য; অন্য সমস্ত পদার্থই রজ্জু সর্পের ন্যায় মিথ্যা। অতএব দ্যুতিমান্ বলিয়া দেবপদবাচ্য সেই এই তুরীয়—চতুর্থ বিভু অর্থাৎ সর্ব্বব্যাপী বলিয়া অভিহিত হন ॥ ১০

কার্য্যকারণবদ্ধৌ তাবিষ্যেতে বিশ্ব-তৈজসৌ। প্রাজ্ঞঃ কারণবদ্ধস্তু দ্বৌ তৌ তুর্য্যে ন সিধ্যতঃ॥ ১

৪৩ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

সরলার্থঃ

[ বিশ্বাদীনামবাস্তব-স্বরূপ-নিরূপণেন তুরীয়মেব নির্দ্ধারয়তি কার্য্যেত্যাদিনা]। —তৌ(পূর্ব্বোক্তৌ) বিশ্ব-তৈজসৌ কার্য্য-কারণবদ্ধৌ(কার্য্যৎ ফলাবস্থা, কারণং বীজাবস্থা, তাভ্যাং পরিগৃহীতৌ) ইষ্যেতে(স্বীকৃতৌ)[জ্ঞানিভিঃ]। প্রাজ্ঞঃ তু(পুনঃ) কারণবন্ধঃ(কারণেন বীজভাবেন এব বদ্ধঃ)[ইষ্যতে]। তৌ দ্বৌ (পূর্ব্বোক্তৌ বীজভাব-ফলভাবৌ) তুর্য্যে(চতুর্থে) ন সিধ্যতঃ(ন বিদ্যেতে)। পূর্ব্বোক্ত বিশ্ব ও তৈজস, উভয়ই কার্য্য—ফলাবস্থা ও কারণ—বীজারস্থা দ্বারা আবদ্ধ বলিয়া স্বীকৃত হন; প্রাজ্ঞ কিন্তু কেবলই কারণস্বরূপ বীজভাব(তত্ত্ব- জ্ঞানের অভাব) দ্বারাই আবদ্ধ। তুরীয় আত্মায় ঐ দুইই সম্ভব হয় না॥ ১১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

বিশ্বাদীনাং সামান্যবিশেষভাবো নিরূপ্যতে তুর্য্যযাথাত্ম্যাবধারণার্থম্- কার্য্যং -ক্রিয়তে ইতি ফলভাবঃ, কারণং-করোতীতি বীজভাবঃ। তত্ত্বাগ্রহণান্যথা- গ্রহণাভ্যাং বীজফলভাবাভ্যাং তৌ যথোক্তৌ বিশ্ব-তৈজসৌ বদ্ধৌ সংগৃহীতৌ ইষ্যেতে। প্রাজ্ঞস্তু বীজভাবেনৈব বদ্ধঃ। তত্ত্বাপ্রতিবোধমাত্রমেব হি বীজং প্রাজ্ঞত্বে নিমিত্তম্। ততো দ্বৌ তৌ বীজফলভাবৌ তত্ত্বাগ্রহণান্যথাগ্রহণে তুরীয়ে ন সিধ্যতঃ ন বিদ্যেতে, ন সম্ভবত ইত্যর্থঃ ॥ ১১

ভাষ্যানুবাদ

তুরীয় আত্মার যথার্থ স্বরূপ নিরূপণার্থ বিশ্বাদির মধ্যে একটা সামান্য-বিশেষভাব(সাধারণ ও বিশেষ ধর্ম্মের সদ্ভাব) নিরূপণ করা হইতেছে—কার্য্য অর্থ—যাহা করা হয়, সেই ফলভাব বা ফলাবস্থা; কারণ অর্থ—কার্য্যের যাহা কারণ সেই বীজভাব; আত্মতত্ত্ব-বিষয়ে অজ্ঞান ও বিপরীত জ্ঞানরূপ বীজভাব ও ফলভাব দ্বারা যথোক্ত প্রকার সেই বিশ্ব ও তৈজস, উভয়কেই বদ্ধ অর্থাৎ বশীভূত বলিয়া ইচ্ছা করা হইয়া থাকে। প্রাজ্ঞ কিন্তু কেবলই বীজভাব দ্বারা বদ্ধ, অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞানের অভাবরূপ বীজভাবই প্রাজ্ঞত্বলাভের একমাত্র কারণ; অতএব তত্ত্বজ্ঞান ও বিপরীত জ্ঞানরূপ সেই বীজভাব ও ফলভাব দুইটি তুরীয়ে সিদ্ধ হয় না—বিদ্যমান নাই, অর্থাৎ সম্ভবপর হয়

না॥ ১১

আগম প্রকরণম্ ৪৭

নাত্মানং ন পরঞ্চৈব ন সত্যং নাপি চানৃতম্ প্রাজ্ঞঃ কিঞ্চন সংবেত্তি, তূর্য্যং তৎসর্ব্বদৃক্ সদা ॥ ১২

সরলার্থঃ

[ ইদানীং প্রাজ্ঞস্য কারণবদ্ধত্বং তুরীয়স্য চ তদভাবং সমর্থয়তে “নাত্মানম্” ইত্যাদিনা]। প্রাজ্ঞঃ(পূর্ব্বোক্তলক্ষণাঃ) আত্মানং(স্বস্বরূপং) ন, পরং (আত্ম-বিলক্ষণং বাহ্যং) চ(অপি) ন, সত্যং ন, অনৃতম্(অসত্যং) চ অপি— [কিং বহুনা], কিঞ্চন(কিমপি) নৈব সংবেত্তি(সম্যক্ জানাতি)। তুর্য্যং(চতুর্থং)[পুনঃ] সর্ব্বদা(সর্ব্বস্মিন্ এব কালে) তৎসর্ব্বদৃক্(পূর্ব্বোক্তং সর্ব্বং পশ্যতি, অলুপ্ত চৈতন্যস্বভাব ইত্যর্থঃ)।[ইতি তয়োবিশেষঃ বেদিতব্যঃ]।

পূর্ব্ব-কথিত প্রাজ্ঞ আত্মা আপনাকে জানে না, পরকেও জানে না;[ অধিক কি] সত্য, মিথ্যা কিছুমাত্র দর্শন করে না।[ কিন্তু] সেই তুরীয় আত্মা সর্ব্বদা সর্ব্ব বস্তু দর্শন করিয়া থাকে; তাহার জ্ঞান কখনই বিলুপ্ত হয় না ॥ ১২

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কথং পুনঃ কারণবদ্ধত্বং প্রাজ্ঞস্য, তুরীয়ে বা তত্ত্বাগ্রহণান্যথাগ্রহণলক্ষণৌ বন্ধৌ ন সিধ্যতঃ? ইতি। যস্মাৎ-আত্মানং, বিলক্ষণম্, অবিদ্যাবীজপ্রসূতং বেদ্যং বাহ্যং দ্বৈতম্-প্রাজ্ঞো ন কিঞ্চন সংবেত্তি, যথা বিশ্ব-তৈজসৌ; ততশ্চাসৌ তত্ত্বা- গ্রহণেন তমসা অন্যথাগ্রহণবীজভূতেন বদ্ধো ভবতি। যস্মাৎ তুর্য্যং তৎসর্ব্বদৃক্ সদা তুরীয়াদন্যস্যাভাবাৎ সর্ব্বদা সদৈব ভবতি, সর্ব্বঞ্চ তদ্ দৃচেতি সর্ব্বদৃক্, তস্মাৎ ন তত্ত্বাগ্রহণলক্ষণং বীজম্ তত্র, তৎপ্রসূতস্যান্যথাগ্রহণস্যাপি অতএবাভাবঃ ন হি সবিতরি সদা প্রকাশাত্মকে তদ্বিরুদ্ধমপ্রকাশনম্ অন্যথাপ্রকাশনং বা সম্ভবতি, “ন হি দ্রষ্টু দৃষ্টৈবিপরিলোপো বিদ্যতে” ইতি শ্রুতেঃ। অথবা, জাগ্রৎ- স্বপ্নয়োঃ সর্বভূতাবস্থঃ সর্ববস্তৃদ্গাভাসন্তরীয় এবেতি সর্ব্বদৃক সদা, “নান্যদতোহস্তি দ্রষ্ট” ইত্যাদিশ্রুতেঃ ॥ ১২

ভাষ্যানুবাদ

কেনই বা প্রাজ্ঞ আত্মা কারণবদ্ধ? এবং কেনই বা তুরীয় আত্মাতে তত্ত্বের অগ্রহণ ও বিপরীত গ্রহণাত্মক দ্বিবিধ বন্ধের সম্ভব হয় না?(উত্তর—)যেহেতু প্রাজ্ঞ আত্মা অন্য হইতে বিলক্ষণ স্বরূপ আত্মাকে(আপনাকে) কিংবা অবিদ্যারূপ বীজসম্ভূত বহিঃস্থিত বিজ্ঞেয় পদার্থ কিছুমাত্র সম্যক্ উপলব্ধি করিতে পারে না; অর্থাৎ বিশ্ব ও

৪৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

তৈজস যেরূপ অনুভব করিতে পারে, প্রাজ্ঞ সেরূপ পারে না; সেই কারণেই এই প্রাজ্ঞ আত্মা তত্ত্বজ্ঞানের অভাব ও বিপরীত জ্ঞানের সম্ভাবরূপ বন্ধনদ্বয়ে আবদ্ধও হইয়া থাকে। যেহেতু পূর্বকথিত তুরীয় আত্মা সর্ব্বদা সর্বদৃক্ অর্থাৎ তদ্ভিন্ন অন্য দ্বিতীয় পদার্থ না থাকায়, সর্বদাই তিনি সর্বাত্মক এবং দ্রষ্টা, অতএব সর্বদৃক্ থাকেন, এইজন্যই তত্ত্বজ্ঞানের অভাবাত্মক অবিদ্যা-বীজ তাহাতে থাকে না, এবং সেই বীজসম্ভূত বিপরীত জ্ঞানেরও সম্ভাবনা হয় না। কেন না, নিত্যপ্রকাশ- ময় সূর্য্যে কখনই অদ্বিরুদ্ধ অপ্রকাশ(অন্ধকার) কিংবা অন্যরূপে প্রকাশ পাওয়া সম্ভবপর হয় না; যেহেতু ‘দ্রষ্টার দৃষ্টি কখনই বিলুপ্ত হইতে দেখা যায় না’ ইত্যাদি শ্রুতি প্রমাণ রহিয়াছে। অথবা, ‘ইহা ভিন্ন অপর দ্রষ্টা নাই’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতে[জানা যায় যে,] জাগ্রৎ ও স্বপ্ন সময়ে সর্বভূতে অবস্থিত তুরীয়ই সর্ববস্তুদ্রষ্টার ন্যায় প্রতিভাসমান হইয়া সর্বদা সর্বদর্শী হইয়া থাকেন ॥ ১২

দ্বৈতস্যাগ্রহণং তুল্যমুভয়োঃ প্রাজ্ঞ-তুর্য্যয়োঃ।

বীজ-নিদ্রাযুতঃ প্রাজ্ঞঃ, সা চ তুর্য্যে ন বিদ্যতে ॥ ১৩

সরলার্থঃ

[তুরীয়ে বীজাভাব-শূন্যতামাহ দ্বৈতেত্যাদি]।—প্রাজ্ঞ-তুর্য্যয়োঃ(প্রাজ্ঞস্য তুরীয়স্য চ) উভয়োঃ[এব] দৈতস্য(জগৎপ্রপঞ্চস্য) অগ্রহণং(অনুভবাভাবঃ) তুল্যং(সমানং)[তত্র তু অয়মের বিশেষঃ, যৎ] প্রাজ্ঞঃ বীজ-নিদ্রাযুতঃ(তত্ত্বা- গ্রহণলক্ষণয়া নিদ্রয়া সম্বদ্ধঃ); সা চ(নিদ্রা) তুর্য্যে(তুরীয়ে আত্মনি) ন বিদ্যতে (নাস্তীত্যর্থঃ);[অতঃ তয়োবিশেষ ইতি ভাবঃ]॥

প্রাজ্ঞ এবং তুরীয় উভয়ের পক্ষেই দ্বৈত-বিজ্ঞানের অভাব তুল্য।[কিন্তু উভয়ের মধ্যে বিশেষ এই যে,] প্রাজ্ঞ আত্মা অবিদ্যা-বীজরূপ নিদ্রাযুক্ত; আর তুরীয়ে সেই নিদ্রার অভাব ॥ ১৩

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

নিমিত্তান্তরপ্রাপ্তাশঙ্কানিবৃত্ত্যর্থোহয়ং শ্লোকঃ—কথং দ্বৈতাগ্রহণস্য তুল্যত্বে কারণবদ্ধত্বং প্রাজ্ঞস্যৈব, ন তুরীয়স্যেতি প্রাপ্তা আশঙ্কা নিবর্ত্ততে। যস্মাদ বীজ- নিদ্রাযুতঃ, তত্ত্বাপ্রতিবোধো নিদ্রা; সৈব চ বিশেষপ্রতিবোধপ্রসবস্য বীজং, সা বীজনিদ্রা; তয়া যুতঃ প্রাজ্ঞঃ সদা সর্ব্বদৃক্‌স্বভাবত্বাৎ, তত্ত্বাপ্রতিবোধলক্ষণা বীজনিদ্রা তুর্য্যে ন বিদ্যতে; অতো ন কারণবন্ধস্তস্মিন্ ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥১৩

আগম-প্রকরণম্ ৪৯

ভাষ্যানুবাদ

কারণান্তরবশতঃ উপস্থিত আশঙ্কা-নিবৃত্তির জন্য এত শ্লোক[আরব্ধ হইতেছে]—অভিপ্রায় এই যে, দ্বৈত জগৎকে উপলব্ধি না করা যখন [ উভয়েরই] তুল্য, তখন কেবল প্রাজ্ঞেরই কারণ-বন্ধন হয়, তুরীয়ের হয় না কেন? এইরূপে যে আশঙ্কা উপস্থিত হইয়াছিল,[এই শ্লোকে] তাহা নিবারণ করা হইতেছে। যেহেতু বীজ-নিদ্রাযুক্ত,[ইহার অর্থ এই যে,] এখানে নিদ্রা অর্থ বস্তুতত্ত্ব বোধের অভাব, তাহাই আবার [বস্তুবিষয়ক] বিশেষ বিশেষ জ্ঞানোৎপত্তির বীজ; প্রাজ্ঞ সেই বীজ- নিদ্রা দ্বারা সংযুক্ত। তুরীয় সর্বদাই সর্ব্বদৃক্-স্বভাব; এই কারণে তত্ত্ব- বোধের অভাবাত্মক বীজ-নিদ্রা তাহাতে নাই। অভিপ্রায় এই যে, এই কারণেই তুরীয়ে উক্ত কারণ বন্ধের সম্ভব হয় না ॥ ১৩

স্বপ্ননিদ্রাযুতাবাদ্যৌ প্রাজ্ঞস্ত্বস্বপ্ননিদ্রয়া।

ন নিদ্রাং নৈব চ স্বপ্নং তুর্য্যে পশ্যন্তি নিশ্চিতাঃ ॥ ১৪ সরলার্থঃ

আদ্যৌ(বিশ্বতৈজসৌ) স্বপ্ন-নিদ্রাযুতৌ(স্বপ্নঃ—অন্যথাগ্রহণং, নিদ্রা তু উক্তলক্ষণম্ অজ্ঞানং, তাভ্যাং সংবদ্ধৌ), প্রাজ্ঞঃ তু(পুনঃ) অস্বপ্ন-নিদ্রয়া(স্বপ্ন- রহিতয়া কেবলয়ৈব নিদ্রয়া)[যুক্তঃ]। নিশ্চিতাঃ(স্থিরবুদ্ধয়ঃ ব্রহ্মবিদঃ) তুর্য্যে (তুরীয়ে) নিদ্রাং ন, স্বপ্নং চ ন এব পশ্যন্তি।[অত এতত্রিতয়-বিলক্ষণং তুরীয়মিতি ভাবঃ]। প্রথমোক্ত বিশ্ব ও তৈজস স্বপ্ন ও নিদ্রাযুক্ত; প্রাজ্ঞ কিন্তু স্বপ্নরহিত কেবলই নিদ্রাযুক্ত। স্থিরবুদ্ধি ব্রহ্মবিদ্গণ তুরীয়ে নিদ্রা ও স্বপ্ন কখনই দর্শন করেন না ৷ ১৪

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

স্বপ্নঃ অন্যথাগ্রহণং সর্প ইব রজ্জাং, নিদ্রা উক্তা তত্ত্বাপ্রতিবোধলক্ষণং তম ইতি। তাভ্যাং স্বপ্ন-নিদ্রাভ্যাং যুতৌ বিশ্ব-তৈজসৌ; অতস্তৌ কার্য্যকারণ- বদ্ধাবিত্যুক্তৌ। প্রাজ্ঞস্তু স্বপ্নবর্জিতয়া কেবলয়ৈব নিদ্রয়া যুত ইতি কারণবদ্ধ ইত্যুক্তম্। নোভয়ং পশ্যন্তি তুরীয়ে নিশ্চিতা ব্রহ্মবিদ ইত্যর্থঃ, বিরুদ্ধত্বাৎ সবিতরীব তমঃ; অতো ন কার্য্য-কারণবদ্ধ ইত্যুক্তস্তুরীয়ঃ ॥ ১৪

ভাষ্যানুবাদ

রজ্জুতে সর্পদর্শনের ন্যায়[এক বস্তুকে] অন্যপ্রকার দর্শনের

8

৫০ কারিকোপেত মাণ্ডুক্যোপনিষৎ

নাম স্বপ্ন; নিদ্রা পূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে—বস্তুতত্ত্ব উপলব্ধির অভাবা- ত্মক তমঃ(অজ্ঞান), বিশ্ব ও তৈজস সেই স্বপ্ন ও নিদ্রাযুক্ত; এই- জন্যই তাহাদিগকে কার্য্য ও কারণ দ্বারা বদ্ধ বলা হইয়াছে। কিন্তু প্রাজ্ঞ আত্মা স্বপ্নরহিত; এই কারণে তাহাকে কেবলই নিদ্রাযুক্ত— কারণবদ্ধ বলা হইয়াছে। নিশ্চিত অর্থাৎ ব্রহ্মবিদ্গণ সূর্য্যে অন্ধকার- সম্বন্ধের ন্যায় বিরুদ্ধ বলিয়া তুরীয়ে উক্ত উভয় অবস্থারই অভাব দর্শন করিয়া থাকেন; এই জন্য ‘তুরীয় কার্য্য-কারণবদ্ধ নহে’ এই কথা অভিহিত হইয়াছে॥ ১৪

অন্যথা গৃহৃতঃ স্বপ্নো নিদ্রা তত্ত্বমজানতঃ। বিপর্য্যাসে তয়োঃ ক্ষীণে তুরীয়ং পদমশ্নুতে॥ ১৫

সরলার্থঃ

[ ইদানীং তুরীয়পদপ্রাপ্তি প্রকারমাহ—অন্যথেত্যাদি]।—অন্যথা(যস্য যৎ স্বরূপং ন, তস্য তেন প্রকারেণ) গৃহ্নতঃ(জানতঃ) স্বপ্নঃ(স্বপ্নাখ্যা অবস্থা) [ভবতি]; তত্ত্বম্(বস্তুযাথার্থ্যম্) অজানতঃ(অপ্রতিপদ্যমানস্য) নিদ্রা(তদাখ্যা অবস্থা)[ভবতি]।[অথ] তয়োঃ বিপৰ্য্যাসে(তত্ত্বাগ্রহণ-বিপরীতগ্রহণরূপ- বিপর্যয়-জ্ঞানে) ক্ষীণে(ক্ষয়ং প্রাপ্তে সতি) তুরীয়ং পদম্(ব্রহ্মভাবম্) অশ্নুতে (ভুঙক্তে প্রাপ্নোতীত্যর্থঃ)।

এক বস্তুকে অন্যরূপে গ্রহণকারীর অবস্থার নাম স্বপ্ন; আর বস্তু বিষয়ে কোনরূপ জ্ঞান না থাকার নাম নিদ্রা। তাহাদের উক্তপ্রকার বিপর্যয়-বোধ ক্ষয়প্রাপ্ত হইলে[ জীব] তুরীয় পদ(ব্রহ্মভাব) উপলব্ধি করে ॥ ১৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কদা তুরীয়ে নিশ্চিতো ভবতীতি, উচ্যতে-স্বপ্নজাগরিতয়োঃ অন্যথা রজ্জাং সর্পবৎ গৃহ্নতঃ স্বপ্নো ভবতি; নিদ্রা তত্ত্বমজানতঃ তিসৃষু অবস্থাসু তুল্যা। স্বপ্ন- নিদ্রয়োস্তল্যত্বাদ বিশ্বতৈজসয়োঃ একরাশিত্বম্। অন্যথাগ্রহণপ্রাধান্যাচ্চ গুণভূতা নিদ্রেতি তস্মিন্ বিপর্য্যাসঃ স্বপ্নঃ। তৃতীয়ে তু স্থানে তত্ত্বাগ্রহণলক্ষণা নিদ্রৈব- কেবলা বিপর্য্যাসঃ। অতস্তয়োঃ কার্য্য-কারণস্থানয়োঃ অন্যথাগ্রহণ-তত্ত্বাগ্রহণলক্ষণ- বিপর্যাসে কার্য্য-কারণবন্ধরূপে পরমার্থতত্ত্বপ্রতিবোধতঃ ক্ষীণে তুরীয়ং পদম্ অশ্নুতে; তদা উভয়লক্ষণং বন্ধনং তত্রাপশ্যন্ তুরীয়ে নিশ্চিতো ভবতীত্যর্থঃ ॥ ১৫

আগম প্রকরণম্ ৫১

ভাষ্যানুবাদ

কোন্ সময়ে তুরীয় পদে প্রতিষ্ঠিত হয়? তাহা কথিত হইতেছে— স্বপ্ন ও জাগরণ-কালে রজ্জুতে সর্পের ন্যায় অন্যপ্রকারে বস্তুগ্রহণ- কারীর অবস্থাই স্বপ্ন; বস্তুতত্ত্ব গ্রহণ করিতে অক্ষমের অবস্থাই নিদ্রা; ইহা অবস্থাত্রয়েই একরূপ। স্বপ্ন ও নিদ্রাবস্থার তুল্যতা-নিবন্ধন, [ তদুভয়াবস্থাসম্পন্ন] বিশ্ব ও তৈজস এক শ্রেণীভুক্ত;[ এইজন্যই শ্লোকে দ্বিবচন দ্বারা বিশ্ব, তৈজস ও প্রাজ্ঞ, এই তিনেরই উক্তি হইয়াছে]।[ বিশ্ব ও তৈজসের পক্ষে] অন্যথা জ্ঞানেরই প্রাধান্য; নিদ্রার প্রাধান্য নাই; এইজন্য সে স্থলে স্বপ্নই একমাত্র বিপৰ্য্যাস। কিন্তু তৃতীয় স্থানে(সুষুপ্তিতে) তত্ত্বজ্ঞানের অভাবাত্মক নিদ্রাই একমাত্র বিপর্য্যাস। অতএব, কার্য্য-কারণ-ভাবাপন্ন উক্ত স্থানদ্বয়ের তত্ত্ব- বিষয়ক অন্যপ্রকার জ্ঞান ও বিপরীত জ্ঞান স্বরূপ কার্য্য-কারণাত্মক বিপর্য্যাস বা ভ্রম পরমার্থ তত্ত্বজ্ঞান-প্রভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হইলে, তুরীয় পদ ভোগ করিয়া থাকে; অর্থাৎ তখন উল্লিখিত উভয়প্রকার বন্ধ দর্শন না করায় তুরীয় ব্রহ্মভাবে স্থিরমতি হইয়া থাকে ॥১৫

অনাদিমায়য়া সুপ্তো যদা জীবঃ প্রবুধ্যতে। অজমনিদ্রমস্বপ্নমদ্বৈতং বুধ্যতে তদা॥১৬

সরলার্থঃ

[বিপর্য্যাসক্ষয়াবস্থাং বিশিষ্য দর্শয়তি অনাদীত্যাদিনা]।—অনাদিমায়য়া (অনাদিকাল-প্রবৃত্তয়া মায়য়া অহং-মমাদিভাবরূপয়া) সুপ্তঃ(স্বপ্নদর্শীব মোহ- নিদ্রাৎ গতঃ) জীবঃ(সংসারী আত্মা) যদা(যস্মিন্ কালে) প্রবুধ্যতে(আত্ম- বিষয়ে প্রবোধং লভতে),[সঃ জীবঃ] তদা(তস্মিন্ কালে) অজম্(জন্মাদি- বিকাররহিতম) অনিদ্রম্(সুষুপ্তিশূন্যম্) অস্বপ্নম্(স্বপ্নরহিতম্) অদ্বৈতং(সর্ব্ববিধ- ভেদবর্জিতম্)[আত্মতত্ত্বং] বুধ্যতে(সাক্ষাৎ করোতি),[ন ততঃ প্রাগি- ত্যভিপ্রায়ঃ]।

অনাদিকাল হইতে প্রবৃত্ত মায়া-নিদ্রায় সুপ্ত জীব যখন জাগরিত হয়(তত্ত্ব- জ্ঞান লাভ করে); সে তখন জন্মরহিত, নিদ্রা ও স্বপ্নাবস্থাবর্জিত অদ্বৈত আত্মতত্ত্ব বুঝিতে পারে ॥১৬

৫২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যোহয়ং সংসারী জীবঃ, স উভয়লক্ষণেন তত্ত্বাপ্রতিবোধরূপেণ বীজাত্মনা, অন্যথাগ্রহণলক্ষণেন চানাদিকালপ্রবৃত্তেন মায়ালক্ষণেন স্বপ্নেন মমায়ং পিতা পুত্রোহয়ং নপ্তা ক্ষেত্রং গৃহং পশবঃ অহমেষাৎ স্বামী সুখী দুঃখী, ক্ষয়িতোহহমনেন, বর্দ্ধিতশ্চানেন, ইত্যেবংপ্রকারান্ স্বপ্নান্ স্থানদ্বয়েহপি পশ্যন্ সুপ্তঃ যদা বেদান্তার্থ- তত্ত্বাভিজ্ঞেন পরমকারুণিকেন গুরুণা ‘নাস্যেবং ত্বং হেতুফলাত্মকঃ, কিন্তু তত্ত্বমসি,’ ইতি প্রতিবোধ্যমানঃ তদৈবং প্রতিবুধ্যতে। কথম্? নাস্মিন্ বাহ্যমাভ্যন্তরং বা জন্মাদিভাববিকারোহস্তি, অতঃ অজং “সবাহ্যাভ্যন্তরো হ্যজঃ” ইতি শ্রুতেঃ সর্ব্ব- ভাববিকারবজ্জিতমিত্যর্থঃ। যস্মাৎ জন্মাদিকারণভূতৎ নাস্মিন্ অবিদ্যা-তমোবীজং নিদ্রা বিদ্যত ইতি অনিদ্রম্; অনিদ্রং হি তত্তুরীয়ম্, অতএব অস্বপ্নম্, তন্নিমিত্ত- ত্বাৎ অন্যথাগ্রহণস্য। যসমাচ্চ অনিদ্রমস্বপ্নং, তস্মাদজমদ্বৈতং তুরীয়মাত্মানং বুধ্যতে তদা ॥১৬

ভাষ্যানুবাদ

এই যে, প্রসিদ্ধ সংসারী জীব, সেই জীব অনাদিকাল হইতে আরব্ধ, বীজাবস্থাত্মক, তত্ত্বজ্ঞানের অভাব ও অন্যপ্রকার জ্ঞানরূপ মায়াময় স্বপ্নবশে ‘ইনি আমার পিতা, অমুক আমার পুত্র, পৌত্র, ক্ষেত্র, গৃহ ও পশু; আমি ইহাদের প্রভু, সুখী, দুঃখী; আমি ইহা দ্বারা ক্ষয় প্রাপ্ত হইয়াছি, ইহা দ্বারা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছি’, সুপ্ত ব্যক্তি উভয়- স্থলেই এবংবিধ স্বপ্ন দর্শন করিয়া থাকে। সে যখন বেদান্ত-শাস্ত্রের তত্ত্বাভিজ্ঞ পরম দয়ালু গুরুকর্তৃক এইরূপে প্রবোধিত হয় যে, ‘তুমি উক্তপ্রকার কারণ ও তাহার ফলস্বরূপ(কার্য্য-কারণ-ভাবপূর্ণ) নহ, পরন্তু তুমি হইতেছ-সেই ব্রহ্মস্বরূপ,’ তখন সে উক্তরূপে প্রতিবুদ্ধ হয়(মায়া-নিদ্রা হইতে জাগরিত হয়, এবং প্রকৃত জ্ঞান লাভ করে)। কি প্রকারে?-‘এই আত্মাতে বাহিরে বা অভ্যন্তরে কোথাও ভাব বস্তুর নিত্যসহচর জন্মাদি বিকার নাই’; অতএব, ‘তিনি বাহ্য ও অভ্যন্তরবর্তী ও অজ,’ এই শ্রুতি হইতে(জানা যায় যে, তিনি) অজ, অর্থাৎ সর্বপ্রকার ভাব-বিকারবজ্জিত *। যেহেতু জন্মাদি বিকারের

আগম-প্রকরণম্ ৫৩

কারণীভূত অবিদ্যাত্মক নিদ্রা ইহাতে নাই; এই কারণেই অনিদ্র (নিদ্রাবস্থারহিত); সেই তুরীয় ব্রহ্ম নিশ্চয়ই নিদ্রারহিত, এই কারণেই স্বপ্ন; কেননা, অন্যথা জ্ঞানের ইহাই কারণ। বিশেষতঃ যেহেতু নিদ্রা ও স্বপ্নরহিত, সেই হেতুই তখন অজ অদ্বৈতস্বরূপ তুরীয় আত্মাকে বুঝিতে পারে ॥১৬

প্রপঞ্চো যদি বিদ্যেত নিবর্ত্ততে ন সংশয়ঃ। মায়ামাত্রমিদং দ্বৈতমদ্বৈতং পরমার্থতঃ॥১৭

সরলার্থঃ

[অনিবৃত্তে প্রপঞ্চে কথমদ্বৈতানুভূতিঃ? ইত্যাহ]—প্রপঞ্চঃ(দৃশ্যমানং জগৎ) যদি বিদ্যেত(যদি বস্তুভূতঃ সত্যঃ স্যাৎ);[তদা সঃ] নিবর্ত্তেত(নিবৃত্তিং লভেত)[অত্র] সংশয়ঃ ন[অস্তি]।[বস্তুতস্তু] ইদং(দৃশ্যমানং) দ্বৈতং (ভেদজাতং) মায়ামাত্রং(মিথ্যাভূতং); অদ্বৈতং(দ্বৈতহীনং তুরীয়ম্)[এব] পরমার্থতঃ(পারমার্থিকং সৎ)॥

জগৎপ্রপঞ্চ যদি বিদ্যমান থাকিত, অর্থাৎ সৎ হইত, তাহা হইলে অবশ্যই নিবৃত্ত হইত, ইহাতে সংশয় নাই।[ প্রকৃতপক্ষে কিন্তু] এই দ্বৈত( জগৎ) কেবলই মায়াময়( অসত্য), অদ্বৈত ব্রহ্মই একমাত্র পরমার্থ সত্য ॥১৭

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

প্রপঞ্চনিবৃত্ত্যা চেৎ প্রতিবুধ্যতে, অনিবৃত্তে প্রপঞ্চে কথমদ্বৈতমিতি। উচ্যতে— সত্যমেবং স্যাৎ প্রপঞ্চো যদি বিদ্যেত; রজ্জাং সর্প ইব কল্পিতত্বাৎ ন তু স বিদ্যতে। বিদ্যমানশ্চেৎ, নিবর্ত্তেত ন সংশয়ঃ। ন হি রজ্জাং ভ্রান্তিবুদ্ধ্যা কল্পিতঃ সর্পো বিদ্য- মানঃ সন্ বিবেকতো নিবৃত্তঃ; নৈব মায়া মায়াবিনা প্রযুক্তা তদ্দর্শিনাং চক্ষুর্বন্ধা- পগমে বিদ্যমানা সতী নিবৃত্তা; তবেদং প্রপঞ্চাখ্যং মায়ামাত্রং দ্বৈতং, রজ্জুবৎ মায়া- বিবচ্চ অদ্বৈতং পরমার্থতঃ; তস্মান্ন কশ্চিৎ প্রপঞ্চঃ প্রবৃত্তো নিবৃত্তো বাস্তীত্য- ভিপ্রায়ঃ ॥ ১৭

ভাষ্যানুবাদ

প্রপঞ্চ-নিবৃত্তিতে যদি প্রতিবোধ হয়, তবে প্রপঞ্চ-নিবৃত্তি না হইলে অদ্বৈত হয় কিরূপে?[উত্তর] বলা হইতেছে—নিশ্চয়ই এই- রূপ আপত্তি হইতে পারিত, প্রপঞ্চ যদি বিদ্যমান থাকিত, অর্থাৎ সত্য হইত; বাস্তবিক পক্ষে ইহা নাই—রজ্জুতে কল্পিত সর্পের ন্যায় ইহা

৫৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

অসৎ। আর যদি বিদ্যমানই থাকিত, তাহা হইলে নিশ্চয়ই নিবৃত্ত হইত, ইহাতেও সংশয় নাই।[দেখ] ভ্রমবশতঃ রজ্জুতে যে সর্প কল্পিত হয়, সেই সর্প কখনই সেখানে সত্তা লাভ করিয়া বিবেক জ্ঞানের সাহায্যে নিবৃত্ত হয় না; এবং মায়াবী-ঐন্দ্রজালিক কর্তৃক প্রযুক্ত মায়া[ভেল্কী] প্রথমে সত্তা লাভ করিয়া যে, দর্শকবৃন্দের চক্ষুর দোষ অপনীত হইলে নিবৃত্ত[অদৃশ্য] হইয়া যায়, তাহা নহে। [অভিপ্রায় এই যে, রজ্জুতে কস্মিন্ কালেও সর্প ছিল না, এবং ঐন্দ্র- জালিক-প্রদর্শিত দৃশ্যসমূহও কখনই বিদ্যমান ছিল না,-ঐ সমস্তই মায়ামাত্র; কাজেই প্রকৃত জ্ঞানোদয়ে আর সে সমুদায়ের নিবৃত্তি হইয়াছে বলা যাইতে পারে না;[যাহা আছে-সৎ, তাহারই নিবৃত্তি হইতে পারে, অসতের আর নিবৃত্তি কি?]। এই প্রপঞ্চ-নামক দ্বৈতও ঠিক তদ্রূপ কেবল মায়ামাত্র[অসৎ], আর উক্ত রজ্জু ও মায়াবীর ন্যায় অদ্বৈতই পরমার্থ সৎ। অভিপ্রায় এই যে, অতএব প্রপঞ্চ বলিয়া কোন পদার্থ প্রবৃত্ত বা নিবৃত্ত নাই ॥১৭

বিকল্পো বিনিবর্ত্তত কল্পিতো যদি কেনচিৎ। উপদেশাদয়ং বাদো জ্ঞাতে দ্বৈতং ন বিদ্যতে॥১৮

সরলার্থঃ

[গুরু-শিষ্যাদিবিকল্পোহপি এবমেব, ইত্যাহ—“বিকল্পঃ” ইত্যাদি।]—বিকল্পঃ (অয়ং গুরুঃ, অয়ং শিষ্যঃ, অয়ম্-উপদেশঃ ইত্যেবং বিতর্কঃ) যদি(সম্ভাবনায়াং) কেনচিৎ(কারণেন) কল্পিতঃ[স্যাৎ; তর্হি] নিবর্ত্তেত। উপদেশাৎ(উপ-, দেশার্থং কল্পিতঃ) অয়ং(গুরু-শিষ্যাদিরূপঃ) বাদঃ(বিকল্পঃ)[প্রবর্ত্ততে]। জ্ঞাতে(উপদেশকার্য্যে তত্ত্বজ্ঞানে জাতে সতি) দ্বৈতং(উক্তলক্ষণং) ন বিদ্যতে (বিলুপ্যতে)।[তত্ত্বজ্ঞানার্থং কল্পিতোহয়ং গুরুশিষ্যাদিবাদঃ তত্ত্বজ্ঞানোদয়াৎ বর্তমানোহপি তৎফলে তত্ত্বজ্ঞানে জাতে স্বয়মের নিবর্ত্ততে, ন তেন অদ্বৈতহানি- রিতিভাবঃ]।

গুরুশিষ্যাদিভাবরূপ বিকল্প যখন কোন কারণ-বিশেষে(তত্ত্বজ্ঞানের উদ্দেশে) কল্পিত হইয়াছে; তখন তাহা অবশ্যই নিবৃত্ত হইবে। উপদেশার্থই ঐ গুরু- শিষ্যাদি কল্পনা, আত্ম-তত্ত্বজ্ঞানের পর আর কোন দ্বৈতই থাকে না ॥১৮

আগম-প্রকরণম্ ৫৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ননু শাস্তা শাস্ত্রং শিষ্য ইতি বিকল্পঃ কথং নিবৃত্ত ইতি, উচ্যতে-বিকল্পো বিনিবর্ত্তেত যদি কেনচিৎ কল্পিতঃ স্যাৎ। যথা অয়ং প্রপঞ্চো মায়ারজ্জুসর্পবৎ, তথাহয়ং শিষ্যাদিভেদ-বিকল্পোহপি প্রাক্ প্রতিবোধাদেবোপদেশনিমিত্তঃ; অত উপদেশাদয়ং বাদঃ-শিষ্যঃ শাস্তা শাস্ত্রমিতি উপদেশকার্য্যে তু জ্ঞানে নির্ব্বৃত্তে জ্ঞাতে পরমার্থতত্ত্বে, দ্বৈতং ন বিদ্যতে ॥ ১৮

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, উপদেশকর্তা, শাস্ত্র ও শিষ্য, এই বিকল্প নিবৃত্ত হয় কিরূপে? বলা যাইতেছে—যদি কোন কারণে কল্পিত হইয়া থাকে, তবে উক্ত বিকল্প নিবৃত্ত হইতে পারে। এই জগৎ-প্রপঞ্চ যেমন মায়া ও রজ্জু-সর্পের ন্যায়, তেমনি এই গুরুশিষ্যাদি ভেদ-কল্পনাও তত্ত্বজ্ঞানোদয়ের পূর্ব পর্য্যন্তই কেবল উপদেশের নিমিত্ত[ ব্যবস্থিত হইয়াছে]; শিষ্য, শাসনকর্তা ও শাস্ত্র, এই কথা কেবল উপদেশের নিমিত্ত কল্পিত; কিন্তু উপদেশের ফল তত্ত্বজ্ঞান সম্পন্ন হইলে— পরমার্থতত্ত্ব পরিজ্ঞাত হইলে এই দ্বৈত আর বিদ্যমান থাকে না ॥১৮

পুনঃশ্রুতিরাভ্যতে

সোহয়মাত্মাধ্যক্ষরমোঙ্কারোহধিমাত্রং পাদা মাত্রাঃ, মাত্রাশ্চ পাদা—অকার উকারো মকার ইতি ॥ ৮

সরলার্থঃ

[ যোহয়ং ওঙ্কারশ্চতুষ্পাদ আত্মা কথিতঃ], সঃ(পূর্ব্বোক্তঃ) অয়ম্ আত্মা অধ্যক্ষরং(অক্ষরমধিকৃত্য) ওঙ্কারঃ(প্রণবাত্মকঃ), অধিমাত্রং(মাত্রাং পাদম্ অধিকৃত্য)[পাদরূপঃ];[যতঃ আত্মনঃ] পাদাঃ[এব] মাত্রাঃ,[তথা] অকারঃ, উকারঃ, মকার ইতি[এতাঃ] মাত্রাঃ চ(অপি) পাদাঃ,[পাদানাং মাত্রাণাং চ পরমার্থতঃ ভেদো নাস্তি, ইত্যভিপ্রায়ঃ]।

সেই এই আত্মা অক্ষরাধিকারে ওঙ্কারস্বরূপ; আর মাত্রাধিকারে পাদস্বরূপ। পাদও মাত্রাস্বরূপ, এবং মাত্রাও পাদস্বরূপ; অকার, উকার ও মকার, ইহারা ‘মাত্রা’ পদবাচ্য ॥ ৮

৫৬ কারিকোপেত মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

অভিধেয়প্রাধান্যেন ওঙ্কারশ্চতুষ্পাদাত্মেতি ব্যাখ্যাতো যঃ, সোহয়মাত্মা অধ্যক্ষরম্ অক্ষরমধিকৃত্য অভিধানপ্রাধান্যেন বর্ণ্যমানোহধ্যক্ষরম্। কিংপুনস্তদক্ষরমিত্যাহ —ওঁকারঃ। সোহয়মোঙ্কারঃ পাদশঃ প্রবিভজ্যমানঃ অধিমাত্রং মাত্রামধিকৃত্য বর্ত্তত ইত্যধিমাত্রম্। কথম্? আত্মনো যে পাদাঃ তে ওঙ্কারস্য মাত্রাঃ। কাস্তাঃ? অকার উকারো মকার ইতি ॥ ৮

ভাষ্যানুবাদ

ইতঃপূর্ব্বে অভিধেয়প্রধান[বাচ্যার্থ-প্রধান] ওঙ্কারস্বরূপে যাহাকে চতুষ্পাদ আত্মরূপে বর্ণনা করা হইয়াছে, সেই এই আত্মা অক্ষরাধিকারে বর্ণিত হন; এই কারণে অধ্যক্ষর; অর্থাৎ অক্ষর- স্বরূপও বটে। সেই অক্ষরটি কি? এইজন্য বলিতেছেন—[সেই অক্ষরটি—] ‘ওঙ্কার’। সেই ওঙ্কারও আবার পাদ বা অংশক্রমে বিভক্ত হইলে মাত্রাস্বরূপে অবস্থিত হয়; এই কারণে ‘অধিমাত্র’ হয়। কি প্রকারে? আত্মার যে সমস্ত পাদ, তৎসমস্তই আবার ওঙ্কারের মাত্রা। সেই মাত্রা কাহারা?[উত্তর]—অকার, উকার ও মকার। অর্থাৎ আত্মার পাদ ও ওঙ্কারের মাত্রা একই পদার্থ॥ ৮

জাগরিতস্থানো বৈশ্বানরোহকারঃ প্রথমা মাত্রাপ্তেরা- দিমত্ত্বাদ্বা, আপ্নোতি হ বৈ সর্ব্বান্ কামানাদিশ্চ ভবতি, য এবং বেদ ॥৯

সরলার্থঃ

[তত্রাপি বিশেষো নিরূপ্যতে ‘জাগরিতে’ ত্যাদিনা।]-জাগরিতস্থানঃ বৈশ্বা- নরঃ(পূর্ব্বোক্তলক্ষণঃ) অকারঃ প্রথমা মাত্রা(আদ্যঃ অংশঃ);[অত্র হেতু- মাহ], আপ্তেঃ(ব্যাপ্তত্বাৎ), আদিমত্ত্বাৎ(প্রাথমিকত্বাৎ) বা(চ)॥[বৈশ্বানরঃ যথা আদিমান্ সর্ব্বজগদ্ব্যাপী চ, অকারোহপি তথা অক্ষরেষু আদিমান্ ব্যাপকশ্চ; তস্মাদুভয়োঃ সাদৃশ্যমিত্যাশয়ঃ।] যঃ(উপাসকঃ) এবম্(উক্তলক্ষণং বৈশ্বানরঃ) বেদ(জানাতি), সঃ হ বৈ(প্রসিদ্ধাবধারণার্থৌ নিপাতৌ) সর্ব্বান্ কামান্ (কাম্যবিষয়ান্) আপ্নোতি(প্রাপ্নোতি) আদিঃ(সর্ব্বেযু প্রথমঃ) চ (অপি) ভবতি।

জাগরিতস্থান বৈশ্বানরই প্রথম মাত্রা অকারস্বরূপ; কেননা, উভয়ই ব্যাপক

আগম-প্রকরণম্ ৫৭

ও আদ্য। যে উপাসক এইরূপ জানে, সে সমস্ত কাম্য বিষয় লাভ করে এবং সকলের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে॥ ৯

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

তত্র বিশেষনিয়মঃ ক্রিয়তে—জাগরিতস্থানো বৈশ্বানরো যঃ, স ওঁকারস্য অকারঃ প্রথমা মাত্রা। কেন সামান্যেনেত্যাহ—আপ্তেঃ, আপ্তির্ব্ব্যাপ্তিঃ অকারেণ সর্ব্বা বাগব্যাপ্তা, “অকারো বৈ সর্ব্বা বাক্” ইতি শ্রুতেঃ। তথা বৈশ্বানরেণ জগৎ; “তস্য হ বা এতস্যাত্মনো বৈশ্বানরস্য মূর্দ্ধৈব সুতেজাঃ” ইত্যাদি শ্রুতেঃ। অভিধানাভি য়য়োরেকত্বঞ্চাবোচাম। আদিরস্য বিদ্যত ইত্যাদিমৎ; যথৈবাদিমদকারাখ্যমক্ষরং, তথৈব বৈশ্বানরঃ, তস্মাদ্বা সামান্যা- দকারত্বং বৈশ্বানরস্য। তদেকত্ববিদঃ ফলমাহ—আপ্নোতি হ বৈ সর্ব্বান্ কামান্ আদিঃ প্রথমশ্চ ভবতি মহতাং, য এবং বেদ—যথোক্তমেকত্বং বেদেত্যর্থঃ ॥ ৯

ভাষ্যানুবাদ

কথিত বিষয়ে বিশেষাবধারণ করা হইতেছে-জাগরিত-স্থানবর্তী যে বৈশ্বানর-নামক আত্মা, তাহাই ওঙ্কারের প্রথম মাত্রা অকার। [ উভয়ের মধ্যে] সাদৃশ্য কিরূপ, তাহা বলিতেছেন-যেহেতু আপ্তি (ব্যাপ্তিরূপ সাদৃশ্য রহিয়াছে); ‘আপ্তি’ অর্থ-ব্যাপ্তি(ব্যাপিয়া থাকা); কেননা, অকার দ্বারা সমস্ত বর্ণ ব্যাপ্ত রহিয়াছে; যেহেতু শ্রুতি আছে যে, ‘অকারই সমস্ত বাক্যস্বরূপ।’ বৈশ্বানর কর্তৃকও সেইরূপ সমস্ত জগৎ ব্যাপ্ত রহিয়াছে। ‘এই দ্যুলোকই সেই এই বৈশ্বানর আত্মার মস্তক,’ এই শ্রুতিই এ বিষয়ে প্রমাণ। আর বাচক ও বাচ্যার্থ যে এক-অভিন্ন, তাহা বলিয়াছি। যাহার আদি আছে, তাহা আদি- মান্; অকার নামক অক্ষরটি যেমন আদিমান্, বৈশ্বানরও ঠিক সেই- রূপই আদিমান্; এইরূপ সাদৃশ্যানুসারে বৈশ্বানরের অকার-স্বরূপত্ব সিদ্ধ হইল। তদুভয়ের একত্বজ্ঞের ফল বলিতেছেন-সমস্ত কাম্য ফল প্রাপ্ত হন এবং মহাজনগণের মধ্যেও প্রথম হন, যিনি এরূপ জানেন- উক্তপ্রকার একত্ব জানেন ॥ ৯

স্বপ্নস্থানস্তেজসঃ উকারো দ্বিতীয়া মাত্রোৎকর্ষাদুভয়-

৫৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ত্বাদ্বা; উৎকর্ষতি হ বৈ জ্ঞানসন্ততিং সমানশ্চ ভবতি, নাস্যা- ব্রহ্মবিৎ কুলে ভবতি, য এবং বেদ ॥ ১০

সরলার্থঃ

স্বপ্নস্থানঃ তৈজসঃ(আত্মা) দ্বিতীয়া মাত্রা উকারঃ(উকাররূপঃ), কুতঃ? উৎকর্ষাৎ(শ্রেষ্ঠত্বাৎ) উভয়ত্বাৎ(অকার-মকারয়োঃ মধ্যস্থত্বাৎ) বা (চ)। তদ্বিজ্ঞানফলমাহ—যঃ(উপাসকঃ) এবং(উক্তপ্রকারম্ একত্বং) বেদ(বিজানাতি),[সঃ] জ্ঞানসন্ততিম্(বিজ্ঞানপ্রবাহম্) উৎকর্ষতি(বর্দ্ধয়তি) [সতাং] সমানঃ(তুল্যঃ)[অপি] ভবতি। অস্য(বিদুষঃ) কুলে(বংশে) অব্রহ্মবিৎ(ব্রহ্মজ্ঞানরহিতঃ) ন ভবতি(ন জায়তে)॥ ১০

পূর্ব্বোক্ত স্বপ্নস্থানগত তৈজস আত্মাই[ওঙ্কারেব] দ্বিতীয়া মাত্রা উকারস্বরূপ; কেননা[উভয়েরই] উৎকর্ষ ও মধ্যবর্তিত্ব ধৰ্ম্ম তুল্য। যিনি এতদুভয়ের একত্ব জানেন; তিনি স্বীয় জ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন করেন, সাধুজনের সমান হন, এবং তাঁহার বংশে ব্রহ্মজ্ঞানহীন কেহ জন্মে না ॥ ১০

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

স্বপ্নস্থানঃ তৈজসঃ যঃ, স ওঙ্কারস্য উকারো দ্বিতীয়া মাত্রা। কেন সামান্যেন ইত্যাহ—উৎকর্ষাৎ; অকারাদুৎকৃষ্ট ইব হি উকারঃ, তথা তৈজসো বিশ্বাৎ। উভয়ত্বাদ্বা—অকার-মকারয়োর্মধ্যস্থ উকারঃ; তথা বিশ্ব-প্রাজ্ঞয়ো- ৰ্ম্মধ্যে তৈজসঃ; অত উভয়ভাক্তসামান্যাৎ। বিদ্বৎফলমুচ্যতে—উৎকর্ষতি হ বৈ জ্ঞানসন্ততিং, বিজ্ঞানসন্ততিং বর্দ্ধয়তীত্যর্থঃ; সমানস্তুল্যশ্চ, মিত্রপক্ষস্যেক শত্রুপক্ষাণামপি অপ্রদ্বেষ্যো ভবতি। অব্রহ্মবিচ্চ অস্য কুলে ন ভবতি, য এবং বেদ ॥ ১০

ভাষ্যানুবাদ

যিনি স্বপ্নস্থানবর্তী তৈজস-নামক আত্মা, তিনিই দ্বিতীয় মাত্রা উকারস্বরূপ। কোন্ সাদৃশ্যে? এইজন্য বলিতেছেন—উৎকর্ষ হেতু —যেহেতু অকার উকার অপেক্ষাও যেন উৎকৃষ্ট; তৈজসও সেইরূপ ‘বিশ্ব’ হইতে[যেন উৎকৃষ্ট]। অথবা, উভয়ত্বই হেতু, অর্থাৎ উকার অক্ষরটি[যেরূপ] অকার ও মকারের মধ্যবর্তী, সেইরূপ তৈজসও ‘বিশ্ব’ এবং ‘প্রাজ্ঞে’র মধ্যস্থিত; অতএব, উভয়ভাগিত্ব-রূপ সাদৃশ্য থাকায়[তৈজসের উকারত্ব সিদ্ধ হইল]। এতবিজ্ঞানের

আগম-প্রকরণম্ ৫৯

ফল বলিতেছেন—যিনি এইরূপ জানেন, তিনি বিজ্ঞান-প্রবাহের উৎকর্ষ সাধন করেন, এবং সমান—তুল্য হন, অর্থাৎ মিত্রপক্ষের ন্যায় শত্রুপক্ষেরও বিদ্বেষের পাত্র হন না। বিশেষতঃ ইঁহার বংশে কেহ অব্রহ্মজ্ঞ হন না ॥ ১০

সুষুপ্তস্থানঃ প্রাজ্ঞো মকারস্তৃতীয়া মাত্রা মিতেরপীতের্ব্বা; মিনোতি হ বা ইদণ্ড সর্বমপীতিশ্চ ভবতি; য এবং বেদ ॥ ১১

সরলার্থঃ

সুষুপ্তস্থানঃ প্রাজ্ঞঃ[ওঙ্কারস্য] তৃতীয়া মাত্রা মকারঃ(মকারস্বরূপঃ), কুতঃ? মিতেঃ(বিশ্ব তৈজসয়োঃ পরিমাপকত্বাৎ হেতোঃ), অপীতেঃ(বিলয়নাৎ অত্রৈব সর্ব্বেষাং একীভূতত্বাৎ হেতোঃ) বা।[এতবিজ্ঞানফলমাহ]-যঃ (উপাসকঃ) এবং(যথোক্তলক্ষণম্ একত্বং) বেদ(বিজানাতি),[সঃ] হ বৈ (প্রসিদ্ধ্যবধারণার্থকৌ নিপাতৌ) ইদং(দৃশ্যমানং) সর্ব্বং জগৎ মিনোতি (যাথাত্ম্যেন বিজানাতি); অপীতিঃ(প্রলয়স্থানং জগদাধার ইত্যর্থঃ) চ অপি ভবতি।

সুষুপ্তি-স্থানগত প্রাজ্ঞ আত্মাও ওঙ্কারের তৃতীয় পাদ—মকারস্বরূপ; কেননা [ প্রাজ্ঞ ও মকার, উভয়েই বিশ্ব ও তৈজসের এবং অকার ও উকারের] পরিমা- পক বা নির্গমস্থান, এবং অপীতি বা বিলয়স্থান। যিনি এইরূপ জানেন, তিনি এই সমস্ত জগৎ অবগত হন এবং সকলের আশ্রয়ীভূত হন ॥ ১১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

সুষুপ্তস্থানঃ প্রাজ্ঞো যঃ, স ওঙ্কারস্য মকারস্তৃতীয়া মাত্রা। কেন সামান্যেন ইত্যাহ-সামান্যমিদমত্র-মিতেঃ, মিতির্মানম্; মীয়েতে ইব হি বিশ্বতৈজসৌ প্রাজ্ঞেন প্রলয়োৎপত্ত্যোঃ প্রবেশ-নির্গমাভ্যাং প্রস্থেনেব যবাঃ। তথা ওঙ্কারসমাপ্তৌ পুনঃ প্রয়োগে চ প্রবিশ্য নির্গচ্ছত ইব অকারোকারৌ মকারে। অপীতের্ব্বা, অপীতিরপ্যয় একীভাবঃ। ওঁকারোচ্চারণে হি অন্ত্যেহক্ষরে একীভূতাবিব অকারো- কারৌ। তথা বিশ্ব-তৈজসৌ সুষুপ্তকালে প্রাজ্ঞে। অতো বা সামান্যাদেকত্বং প্রাজ্ঞ- মকারয়োঃ। বিদ্বৎফলমাহ-মিনোতি হ বৈ ইদং সর্ব্বং, জগদ্যাথাত্ম্যং জানাতীত্যর্থঃ। অপীতিশ্চ জগৎকারণাত্মা চ ভবতীত্যর্থঃ। অত্রাবান্তরফলবচনং প্রধানসাধনস্তুত্যর্থম ॥১১

৬০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ভাষ্যানুবাদ

যিনি সুষুপ্তিস্থানবর্তী প্রাজ্ঞ; তিনিই ওঙ্কারের তৃতীয় পাদ মকারস্বরূপ। কিরূপ সাদৃশ্য? তাহা বলিতেছেন, এখানে এইরূপ সাদৃশ্য-যেহেতু মিতি; ‘মিতি’ অর্থ-পরিমাণ; যবসমূহ যেরূপ ‘প্রস্থ’ দ্বারা পরিমিত করা হয়, প্রলয় ও উৎপত্তি সময়ে ঠিক সেইরূপ বিশ্ব-তৈজসও যেন এই প্রাজ্ঞ কর্তৃক পরিমিতই হয়, সেইরূপ ওঙ্কারের সমাপ্তি ও পুনঃপ্রয়োগ সময়ে অকার ও উকার মকারে প্রবিষ্ট হইয়াই যেন বহির্গত হইয়া থাকে। অথবা অপীতি হেতু[উভয়ের একত্ব]। অপীতি অর্থ-অপ্যয়-একীভাব-প্রাপ্তি; কেননা, ওঙ্কারের উচ্চারণ- কালে অকার ও উকার যেন অন্ত্য অক্ষরে(মকারে) একীভূতই হইয়া থাকে। সুষুপ্তি-সময়ে বিশ্ব এবং তৈজসও ঠিক সেইরূপ প্রাজ্ঞে[যেন একীভূত হইয়া থাকে]; অতএব এইরূপ সাদৃশ্য-নিবন্ধন বা প্রাজ্ঞ ও মকারের একত্ব[কথিত হইয়াছে]। বিজ্ঞানফল বলিতেছেন-[যিনি এইরূপ জানেন, তিনি] নিশ্চয়ই এই সমস্ত জগৎ প্রমিত করেন, অর্থাৎ জগতের প্রকৃত তত্ত্ব অবগত হন, এবং অপীতি-অর্থাৎ জগতের কারণস্বরূপও হন। প্রধান সাধনার প্রশংসার্থ এখানে অবান্তর [প্রাসঙ্গিক] ফলের উল্লেখ করা হইয়াছে ॥১১

অট্রেতে শ্লোকা ভবন্তি—

বিশ্বস্যাত্ম-বিবক্ষায়ামাদিসামান্যমুৎকটম্। মাত্রা-সম্প্রতিপত্তৌ স্যাদাপ্তিসামান্যমেব চ ॥ ১৯

সরলার্থঃ

[পাদানাং মাত্রাণাং চ শ্রুত্যুক্তমেকত্বং বিশদীকৃত্য বর্ণয়িতুমাহ]—বিশ্ব- স্যেত্যাদি। বিশ্বস্য(বিশ্বসংজ্ঞকস্য আত্মনঃ) অত্ব-বিবক্ষায়াং(অকাররূপত্ব- নিরূপণে) আদি-সামান্যম্(প্রাথমিকত্বরূপং সাদৃশ্যম্) উৎকটম্(প্রধানম্)। মাত্রাসম্প্রতিপত্তৌ(বিশ্বস্য মাত্রারূপত্বপ্রতিপাদনে) চ আপ্তিসামান্যং(ব্যাপকত্ব- রূপং সাধর্ম্যমেব)[উৎকটং] স্যাৎ(ভবেৎ)॥

শ্রুতিতে যে, পাদ ও মাত্রাসমূহের একত্ব কথিত হইয়াছে, এখন তাহা বিশদরূপে বর্ণনা করার অভিপ্রায়ে বলিতেছেন—পূর্ব্বোক্ত বিশ্বসংজ্ঞক প্রথম

আগম-প্রকরণম্ ৬১

পাদের অকাররূপত্ব-নির্ব্বাচনে প্রাথমিকত্বরূপ সামান্যই প্রধান কারণ; অর্থাৎ বিশ্বও প্রথম এবং অকার অক্ষরটিও প্রথম; এইজন্য উভয়েই এক। আর বিশ্বের মাত্রারূপে ভাবনায় ব্যাপকত্বরূপ সাদৃশ্যই প্রধান কারণ হইয়া থাকে। অর্থাৎ শ্রুতি অনুসারে জানা যায়, সমস্ত বর্ণই অকারব্যাপ্ত, অর্থাৎ অকার হইতে অপার্থগভাবে অবস্থিত; বিশ্বও সর্ব্ব জগৎ পরিব্যাপ্ত রহিয়াছেন; সুতরাং উভয়েই এক ॥ ১৯

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

অত্র এতে শ্লোকা—মন্ত্রা ভবন্তি। বিশ্বস্য অত্বমকারমাত্রত্বং যদা বিবক্ষ্যতে, তদা আদিত্বসামান্যম্ উক্তন্যায়েন উৎকটম্ উদ্ভুতং দৃশ্যত ইত্যর্থঃ। অত্ব-বিবক্ষায়া- মিত্যস্য ব্যাখ্যানম্—মাত্রাসম্প্রতিপত্তৌ ইতি; বিশ্বস্য অকারমাত্রত্বং যদা সম্প্রতি- পদ্যতে ইত্যর্থঃ। আপ্তিসামান্যমেব চ উৎকটমিত্যনুবর্ত্ততে, চ-শব্দাৎ ॥ ১৯

ভাষ্যানুবাদ

বিশ্বসংজ্ঞক প্রথম পাদের যখন ‘অ-ত্ব’ অর্থাৎ কেবলই অকার- বর্ণরূপত্ব বলা হয়; সে সময় ঐ কথিত নিয়মানুসারে ‘আদিত্ব’ (প্রথমত্ব) সাধর্ম্যই উৎকট-প্রধানরূপে প্রাদুর্ভূত দেখা যায়। “মাত্রা- সংপ্রতিপত্তৌ” কথাটি সেই অ-ত্ববিবক্ষা কথারই ব্যাখ্যাস্বরূপ। যে সময় বিশ্ব আত্মার কেবল অকাররূপত্ব গৃহীত হয়, সে সময় আপ্টি- সামান্য অর্থাৎ ব্যাপকত্বরূপ ধৰ্ম্মসাম্যই উৎকট হইয়া থাকে। ‘চ’ শব্দের সাহায্যে ‘উৎকট’ কথাটির পর পর অনুবৃত্তি হইয়াছে ৷ ১৯

তৈজসস্যোর্ব্বিজ্ঞানে উৎকর্ষো দৃশ্যতে স্ফুটম্।

মাত্রাসম্প্রতিপত্তৌ স্যাদুভয়ত্বং তথাবিধম্ ॥ ২০

সরলার্থঃ

তৈজসস্য(তন্নামক দ্বিতীয়পাদস্য) উ-ত্ববিজ্ঞানে(উকারস্বরূপত্ব- ভাবনায়াম্) উৎকর্ষঃ(প্রাধান্যং) স্ফুটং(স্পষ্টং) দৃশ্যতে।[তৈজসস্য] মাত্রা- সংপ্রতিপত্তৌ(মাত্রারূপত্ব-বিজ্ঞানে) উভয়ত্বং(উভয়মধ্যবর্ত্তিত্বং) তথাবিধং (স্ফুটং) স্যাৎ। তৈজসনামক দ্বিতীয় পাদের উকারত্ব-জ্ঞানেই উৎকর্ষ স্পষ্ট প্রতীত হইয়া থাকে। আর মাত্রারূপত্ব জ্ঞানে উভয়ত্বই পরিস্ফুট হইয়া থাকে ॥ ২০

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

তৈজসস্য উ-ত্ববিজ্ঞানে উকারত্ববিবক্ষায়াম্ উৎকর্ষো দৃশ্যতে স্ফুটং স্পষ্টমিত্যর্থঃ। উভয়ত্বঞ্চ স্ফুটমেবেতি। পূর্ব্ববৎ সর্ব্বম্ ॥ ২০

৬২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ভাষ্যানুবাদ

তৈজসের উ-ত্ববিজ্ঞানে অর্থাৎ উকারত্ব-বিবক্ষা-সময়ে সুস্পষ্টরূপে উৎকর্ষ দেখিতে পাওয়া যায়। আর উভয়ত্ব বা উভয়মধ্যবর্ত্তিত্ব ধৰ্ম্মত পরিস্ফুটই রহিয়াছে। অপর অংশের ব্যাখ্যা পূর্ববৎ ॥ ২০

মকারভাবে প্রাজ্ঞস্য মান-সামান্যমুৎকটম্। মাত্রাসম্প্রতিপত্তৌ তু লয়সামান্যমেব চ ॥ ২১

সরলার্থঃ

প্রাজ্ঞস্য(তন্নামক-তৃতীয়পাদস্য) মকারভাবে(মকারত্বে) মানসামান্যম্ (পরিমাণসাধর্ম্যম্) উৎকটং(প্রধানং)[ভবতি], মাত্রাসংপ্রতিপত্তৌ (মাত্রারূপ-জ্ঞানে) লয়সামান্যম্(লয়নাশ্রয়ত্বসাধর্ম্যম্) এব(অবধারণে) তু (উৎকটং স্যাদিতি শেষঃ)।

প্রাজ্ঞনামক তৃতীয় পাদের মকারত্ব-জ্ঞানে পরিমাপকত্বরূপ সাদৃশ্যই প্রধান; কিন্তু[ তাহারই] মাত্রাকার-বিজ্ঞানে লয়াশ্রয়ত্বরূপ সাদৃশ্যই প্রধান কারণ হইয়া থাকে ॥ ২১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

মকারত্বে প্রাজ্ঞস্য মিতি-নম্রাবুৎকৃষ্টে সামান্যে ইত্যর্থঃ ॥ ২১

ভাষ্যানুবাদ

প্রাজ্ঞের মকারত্ব-ভাবনায় পরিমাণ ও বিলয়ই উৎকৃষ্ট সামান্য বা সাদৃশ্য ॥ ২১

ত্রিযু ধামসু যৎ তুল্যং সামান্যং বেত্তি নিশ্চিতঃ। স পূজ্যঃ সর্বভূতানাং বন্দ্যশ্চৈব মহামুনিঃ ॥ ২২

সরলার্থঃ

যঃ(বিবেকী) নিশ্চিতঃ(স্থিরবুদ্ধিঃ সন্) ত্রিষু ধামসু(উক্তে স্থানত্রয়ে) সামান্যং তুল্যং বেত্তি(জানাতি); স(সমদর্শী) মহামুনিঃ(মনস্বিশ্রেষ্ঠঃ) সর্ব্বভূতানাং পূজ্যঃ(পূজার্হঃ) বন্দ্যঃ(স্তবনীয়ঃ) চ(অপি) এব(নিশ্চয়ে) [ভবতি] ॥

যে বিবেকী পুরুষ স্থিরবুদ্ধি হইয়া উক্ত স্থানত্রয়েই তুল্যভাবে সাদৃশ্য দেখেন, সেই সমদর্শী পুরুষ জগতে সর্ব্বভূতের পূজনীয় এবং স্তবনীয় হইয়া থাকেন ॥ ২২

আগম-প্রকরণম্ ৬৩

শঙ্কর-ভাষ্যম্

যথোক্তস্থানত্রয়ে যঃ তুল্যমুক্তং সামান্যং বেত্তি এবমেবৈতদিতি নিশ্চিতঃ সন্ সঃ পূজ্যো বন্দ্যশ্চ ব্রহ্মবিৎ লোকে ভবতি ॥ ২২

ভাষ্যানুবাদ

যিনি ‘ইহা এবম্প্রকারই’ এইরূপে স্থিরবুদ্ধি হইয়া পূর্ব্বোক্ত স্থান- ত্রয়ে তুল্যরূপে স্বাধর্ম্ম্য অবগত হন, তিনি ব্রহ্মজ্ঞ এবং জগতে পূজনীয় ও বন্দনীয় হইয়া থাকেন ॥ ২২

অকারো নয়তে বিশ্বমুকারশ্চাপি তৈজসম্। মকারশ্চ পুনঃ প্রাজ্ঞং নামাত্রে বিদ্যতে গতিঃ॥ ২৩

সরলার্থঃ

[ যথোক্তরীত্যা পাদশ ওঙ্কারধ্যানং কুর্ব্বতাং ফলবিভাগমাহ—“অকারঃ” ইত্যাদিনা।] অকারঃ(প্রথমঃ পাদঃ)[উপাস্যমানঃ সন্ উপাসকং] বিশ্বং নয়তে(প্রাপয়তি)[সঃ বিশ্বত্বং প্রতিপদ্যতে ইতি ভাবঃ]। উকারঃ(দ্বিতীয়ঃ পাদঃ) অপি চ(সমুচ্চয়ে) তৈজসং[নয়তে]; মকারঃ(তৃতীয়ঃ পাদঃ) চ (অপি) প্রাজ্ঞং[নয়তে]; অমাত্রে(মাত্রারহিতে তুরীয়ে) পুনঃ গতিঃ (ক্বচিৎ গমনং) ন বিদ্যতে[বীজভাবক্ষয়াদিতিভাবঃ]॥

প্রথম পাদ অকার উপাসিত হইলে[উপাসককে] বিশ্বত্ব প্রাপ্ত করায়; দ্বিতীয় পাদ উকারও তৈজসকে প্রাপ্ত করায়, এবং তৃতীয় পাদ মকারও প্রাজ্ঞকে প্রাপ্ত করায়; কিন্তু মাত্রারহিত চতুর্থের উপাসনায় আর কোথাও গমন হয় না ॥ ২৩

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যথোক্তৈঃ সামান্যৈঃ আত্মপাদানাং মাত্রাভিঃ সহ একত্বং কৃত্বা যথোক্তোঙ্কারং প্রতিপদ্যতে যো ধ্যায়ী, তম্ আকারো নয়তে বিশ্বং প্রাপয়তি। অকারালম্বন- মোঙ্কারং বিদ্বান্ বৈশ্বানরো ভবতীত্যর্থঃ। তথা উকারস্তৈজসম্। মকারশ্চাপি পুনঃ প্রাজ্ঞং, ‘চ’-শব্দাৎ নয়ত ইত্যনুবর্ত্ততে। ক্ষীনে তু মকারে বীজভাবক্ষয়াৎ অমাত্রে ওঙ্কারে গতিঃ ন বিদ্যতে কচিদিত্যর্থঃ ॥ ২৩

ভাষ্যানুবাদ

পূর্ব্বে যেরূপ সাধারণ ধর্ম্ম উক্ত হইয়াছে, সেই সাধারণ ধর্ম্ম লইয়া আত্মার পাদসমূহকে মাত্রাসমূহের সহিত একীকৃত করিয়া যে উপাসক

৬৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ওঙ্কারের উপাসনা করেন, সেই অকারই তাঁহাকে বিশ্বনামক আত্ম- পাদ প্রাপ্ত করায়; অর্থাৎ যে লোক অকারকে অবলম্বন করিয়া ওঙ্কারের উপাসনা করেন, তিনি বৈশ্বানরত্ব লাভ করেন। সেইরূপ উকার তৈজসকে এবং মকারও প্রাজ্ঞকে প্রাপ্ত করায়; শ্লোকে ‘চ’ শব্দ থাকায় “নয়তে” ক্রিয়াটির সর্বত্র সম্বন্ধ হইতেছে। কিন্তু মকারও ক্ষীণ হইলে অর্থাৎ মকারের ভাবনাও বিরত হইয়া গেলে, বীজভাব না থাকায়, অমাত্র(মাত্রারহিত) ওঙ্কারের উপাসনায় আর কোথাও গতি হয় না ॥ ২৩

অমাত্রশ্চতুর্থোহব্যবহার্য্যঃ প্রপঞ্চোপশমঃ শিবোহদ্বৈত এবমোঙ্কার আত্মৈব সংবিশত্যাত্মনাত্মানং য এবং বেদ য এবং বেদ ॥ ১২

ইতি মাণ্ডূক্যোপনিষদ্মূলমন্ত্রাঃ সমাপ্তাঃ ॥ *॥ ওঁ তৎসৎ হরিঃ ওঁ ॥*

[ ওঙ্কারস্য তুরীয়ত্ব-বিবক্ষয়া তদর্থং বিশদীকৃত্যাহ—“অমাত্রঃ” ইতি]—অমাত্রঃ (অকারাদিমাত্রারহিতঃ), অব্যবহার্য্যঃ(বাঙ্মনসয়োঃ অগোচরত্বাৎ ব্যবহর্তুম্ অশক্যঃ), প্রপঞ্চোপশমঃ(দ্বৈতবিজ্ঞানরহিতঃ), শিবঃ(কল্যাণময়ঃ) চতুর্থঃ (তুরীয়ঃ) এবং(যথোক্তজ্ঞানবতা প্রযুক্তঃ) ওঙ্কারঃ অদ্বৈতঃ(ভেদবর্জিতঃ) আত্মা এব,[ন ততোহতিরিচ্যতে ইতি ভাবঃ]। যঃ(উপাসকঃ) এবং(যথোক্ত- প্রকারং) বেদ(বিজানাতি),[সঃ] আত্মনা(স্বয়মেব) আত্মানং(পার- মার্থিকং রূপং) সংবিশতি(প্রবিশতি),[ন ততঃ পুনরাবর্ত্ততে ইতি ভাবঃ]॥

পূর্ব্বোক্ত মাত্রাশূন্য, অব্যবহার্য্য, জগৎপ্রপঞ্চের নিবৃত্তিস্থান, মঙ্গলময় এবং জ্ঞানিকর্তৃক পূর্ব্বোক্ত প্রকারে প্রযুক্ত চতুর্থ ওঙ্কার অদ্বৈত আত্মস্বরূপই বটে। যিনি এইরূপে জানেন, তিনি নিজেও আত্মাতে(পারমার্থিক আত্মভাবে) প্রবেশ করেন ॥ ১২

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

অমাত্রো মাত্রা যস্য নাস্তি সোহমাত্রঃ ওঙ্কারশ্চতুর্থস্তরীয় আত্মৈব কেবলঃ অভিধানাভিধেয়রূপয়োর্ব্বাত্মনসয়োঃ ক্ষীণত্বাদব্যবহার্য্যঃ; প্রপঞ্চোপশমঃ শিবঃ অদ্বৈতঃ সংবৃত্তঃ এবং যথোক্তবিজ্ঞানবতা প্রযুক্ত ওঙ্কারস্ত্রিমাত্রস্তিপাদঃ আত্মৈব;

আগম-প্রকরণম্ ৬৫

সংবিশতি আত্মনা স্বেনৈব স্বং পারমার্থিকমাত্মানং, যঃ এবং বেদ। পরমার্থদর্শনাৎ ব্রহ্মবিৎ তৃতীয়ং বীজভাবং দগ্ধা আত্মানং প্রবিষ্ট ইতি ন পুনর্জায়তে, তুরীয়স্যা বীজত্বাৎ। ন হি রজ্জুসর্পয়োর্বিবেকে রজ্জাং প্রবিষ্টঃ সর্পো বুদ্ধিসংস্কারাৎ পুনঃ পূর্ব্ববৎ তদ্বিবেকিনামুখাস্যতি। মন্দ-মধ্যমধিয়াস্তু প্রতিপন্নসাধকভাবানাং সন্মার্গগামিনাং সন্ন্যাসিনাং মাত্রাণাং পাদানাঞ্চ কপ্তসামান্যবিদাং যথাবদুপাস্যমান ওঙ্কারো ব্রহ্মপ্রতিপত্তয়ে আলম্বনীভবতি। তথা চ বক্ষ্যতি।-“আশ্রমাস্ত্রিবিধাঃ” ইত্যাদি ॥ ১২ ইতি শ্রীগোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদশিষ্য-পরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীশঙ্করভগবতঃ কৃতৌ মাণ্ডূক্যোপনিষদ্মূলমন্ত্রভাষ্যং

সমাপ্তম্ ॥ ভাষ্যানুবাদ

অমাত্র অর্থ—যাহার মাত্রা নাই; সেই অমাত্র নির্বিশেষ ওঙ্কার তুরীয় আত্মস্বরূপই বটে; অভিধান(বাচক) শব্দ ও অভিধেয় (তদ্বাচ্য) মন, এতদুভয়ই ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় অব্যবহার্য্য *; প্রপঞ্চোপশম(জগৎসম্বন্ধরহিত), শিব ও অদ্বৈতভাবসম্পন্ন, কথি- তানুরূপ জ্ঞানসম্পন্ন পুরুষপ্রযুক্ত, এই ত্রিমাত্র অর্থাৎ পাদত্রয়যুক্ত ওঙ্কার আত্মস্বরূপই বটে। যিনি এইরূপ জানেন, তিনি স্বয়ংই স্বীয় পারমার্থিক আত্মস্বরূপে প্রবেশ করেন, অর্থাৎ উক্ত ব্রহ্মবিৎ পুরুষ পরমার্থ-দর্শনের বলে তৃতীয় বীজভাব দগ্ধ করিয়া আত্মাতে প্রবিষ্ট হন; এই কারণে আর পুনর্জন্ম লাভ করেন না; কেননা, তুরীয়ে কোনরূপ জন্মাদিবীজ নিহিত নাই। কারণ, রজ্জু ও সর্পের বিবেক-জ্ঞান উপস্থিত হইলে, কল্পিত সর্পটি রজ্জুতে প্রবিষ্ট হইয়া(বিলীন হইয়া) পূর্বসংস্কারবশতঃ কখনই বিবেকিগণের নিকট পুনর্বার প্রাদুর্ভূত হয় না। কিন্তু যে সমস্ত মন্দবুদ্ধি(অল্পবুদ্ধি) ও মধ্যম-বুদ্ধিসম্পন্ন লোক

৫৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

সাধকভাব বা সাধনা অবলম্বন করিয়াছেন, নিয়ত সৎপথে চলিয়া থাকেন, সন্ন্যাস গ্রহণ করিয়াছেন এবং মাত্রা ও পদের পূর্বনিদ্দিষ্ট সামান্য ধৰ্ম্ম বা সাদৃশ্য অবগত আছেন, তাঁহাদের সম্বন্ধে এই ওঙ্কারই যথাযথভাবে উপাস্যমান হইয়া, ব্রহ্মাবগতির অবলম্বন বা সহায় হইয়া থাকে। ‘আশ্রম তিনপ্রকার’ ইত্যাদি স্থলে সেইরূপ কথিতও হইবে ॥১২

মাণ্ডূক্যাপনিষৎ-মন্ত্র-ভাষ্যানুবাদসমাপ্ত।

অটৈতে শ্লোকা ভবন্তি—

ওঙ্কারং পাদশো বিদ্যাৎ পাদা মাত্রা ন সংশয়ঃ। ওঙ্কারং পাদশো জ্ঞাত্বা ন কিঞ্চিদপি চিন্তয়েৎ ॥ ২৪

সরলার্থঃ

ওঙ্কারং পাদশঃ(পাদং পাদং) বিদ্যাৎ(জানীয়াৎ), পাদাঃ[এব] মাত্রাঃ; [অত্র] সংশয়ঃ ন[অস্তি]। ওঙ্কারং পাদশঃ(পাদক্রমেণ) জ্ঞাত্বা(সম্যক্ অনুভূয়) কিঞ্চিদপি(অন্যৎ কিমপি) ন চিন্তয়েৎ;[তাবতা এব কৃতার্থো ভবতীতিভাবঃ]।

ওঙ্কারকে এক এক পাদ করিয়া জানিবে; পাদ ও মাত্রা একই পদার্থ; ইহাতে সংশয় নাই। ওঙ্কারকে পাদক্রমে জানিয়া আর কিছুই চিন্তা করিবে না ॥২৪

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

পূর্ব্ববদত্রৈতে শ্লোকা ভবন্তি। যথোক্তৈঃ সামান্যৈঃ পাদা এব মাত্রা মাত্রাশ্চ পাদাঃ তস্মাৎ ওঙ্কারং পাদশো বিদ্যাৎ ইত্যর্থঃ। এবমোঙ্কারে জ্ঞাতে দৃষ্টার্থমদৃষ্টার্থং বা ন কিঞ্চিদপি প্রয়োজনং চিন্তয়েৎ, কৃতার্থত্বাদিত্যর্থঃ ॥২৪

ভাষ্যানুবাদ

পূর্ব্বের ন্যায় এখানেও এই সকল শ্লোক হইতেছে। পূর্ব্বে যেরূপ সামান্য বা সাদৃশ্য কথিত হইয়াছে, তদনুসারে[বুঝিতে হয় যে] পাদই মাত্রা এবং মাত্রাই পাদ;(উভয়ের মধ্যে ভেদ নাই); অতএব ওঙ্কারকে এক এক পাদ করিয়া জানিবে। এইরূপে ওঙ্কার

আগম প্রকরণম্ ৬৭

পরিজ্ঞাত হইলেই[সাধকের] কৃতার্থতা লাভ হয়, তখন দৃষ্টার্থ বা অদৃষ্টার্থ অর্থাৎ ঐহিক বা পারত্রিক কোনও প্রয়োজনে চিন্তা করিবে না ॥ ২৪

যুঞ্জীত প্রণবে চেতঃ প্রণবো ব্রহ্ম নির্ভয়ম্। প্রণবে নিত্যযুক্তস্য ন ভয়ং বিদ্যতে ক্বচিৎ ॥ ২৫

সরলার্থঃ

[ইদানীমোঙ্কারানুসন্ধানরহিতস্য ওঙ্কারধ্যানমুপদিশতি “যুঞ্জীত” ইত্যাদিনা।]— প্রণবে(ওঙ্কারে) চেতঃ(মনঃ) যুঞ্জীত(সমাহিতং কুৰ্য্যাৎ);[যতঃ] প্রণবঃ নির্ভয়ং(সংসারভয়বারকং) ব্রহ্ম(ব্রহ্মস্বরূপম্)। প্রণবে নিত্যযুক্তস্য(নিত্যং সমাহিতচিত্তস্য) ক্বচিৎ(কুত্রাপি) ভয়ং ন বিদ্যতে(নাস্তি)[“আনন্দং ব্রহ্মণো বিদ্বান্ ন বিভেতি কুতশ্চন” ইতি শ্রুতেঃ ॥]

প্রণবে(ওঙ্কারে) চিত্ত সমাহিত করিবে; কারণ প্রণবই অভয় ব্রহ্ম- স্বরূপ। যে লোক সর্ব্বদা প্রণবে সমাহিতচিত্ত, তাহার কুত্রাপি ভয় থাকে না ॥২৫

শঙ্কর-ভাষ্যম্

যুঞ্জীত সমাদধ্যাৎ যথাব্যাখ্যাতে পরমার্থরূপে প্রণবে চেতো মনঃ, যস্মাৎ- প্রণবো ব্রহ্ম নির্ভয়ম্। ন হি তত্র সদাযুক্তস্য ভয়ং বিদ্যতে ক্বচিৎ, “বিদ্বান্ন বিভেতি কুতশ্চন” ইতি শ্রুতেঃ ॥২৫

ভাষ্যানুবাদ

“যুঞ্জীত” অর্থ—সমাহিত করিবে। পূর্ব্বোক্ত প্রকারে বর্ণিত পরমার্থস্বরূপ প্রণবে চেতঃ(মনকে) সমাহিত করিবে; যেহেতু প্রণবই নির্ভয়(সংসারভয়রহিত) ব্রহ্মস্বরূপ; কেননা, তাঁহাতে সর্বদা সমাহিতচিত্ত ব্যক্তির কোথাও ভয় সম্ভাবিত হয় না; শ্রুতি বলিয়াছেন—“ব্রহ্মবিৎ পুরুষ কোথা হইতেও ভয়প্রাপ্ত হয় না” ॥২৫

প্রণবো হ্যপরং ব্রহ্ম প্রণবশ্চ পরং স্মৃতঃ। অপূর্ব্বোহনন্তরোহবাহ্যোহনপরঃ প্রণবোহব্যয়ঃ॥২৬

প্রণবঃ(ওঙ্কারঃ) হি(এব) অপরং ব্রহ্ম(কার্য্যোপাধিকব্রহ্মস্বরূপঃ) প্রণবঃ পরং(নিরুপাধিকং)[ব্রহ্ম] চ(অপি) স্মৃতঃ(চিন্তিতঃ)। প্রণবঃ অপূর্ব্বঃ(নাস্তি পূর্ব্বং কারণং যস্য, সঃ তথোক্তঃ), অনন্তরঃ(নাস্তি অন্তরং

৬৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

বিজাতীয়ং ভেদো বা যস্য, সঃ তথোক্তঃ), অবাহ্যঃ(নাস্তি বাহ্যং তদতিরিক্তৎ যস্য, সঃ তথোক্তঃ), অনপরঃ(নাস্তি অপরং—কার্য্যং যস্য, সঃ তথোক্তঃ),[তথা] অব্যয়ঃ(ন ব্যেতি বিশেষরূপং ন প্রাপ্নোতি, ইতি অব্যয়ঃ)[চ]।[মন্দ- মধ্যমাধিকারিণোঃ ধ্যেয়রূপং পূর্ব্বাদ্ধে উক্তম্; উত্তমাধিকারিণস্তু নিব্বিশেষ- ব্রহ্মরূপতয়া ধ্যেয়রূপম্ উত্তরার্দ্ধে উক্তমিতি বিবেকঃ] ॥

প্রণবই অপর ব্রহ্ম এবং প্রণবই পর ব্রহ্ম বলিয়া কথিত হন। এই প্রণবের পূর্ব্ববর্তী কারণ নাই, কার্য্য নাই, অন্তর নাই, বহির্ভাব নাই, ইহা অব্যয়— নির্বিকার-স্বভাব ॥২৬

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

পরাপরে ব্রহ্মণী প্রণবঃ; পরমার্থতঃ ক্ষীণেষু মাত্রা-পাদেষু পর এবাত্মা ব্রহ্মেতি; ন পূর্ব্বং কারণমস্য বিদ্যত ইত্যপূর্ব্বঃ; নাস্য অন্তরং ভিন্নজাতীয়ং কিঞ্চিবিদ্যুত- ইত্যনন্তরঃ; তথা বাহ্যমন্যৎ ন বিদ্যত ইত্যবাহ্যঃ; অপরং কার্য্যমস্য ন বিদ্যত ইত্যনপরঃ, “স বাহ্যাভ্যন্তরো হ্যজঃ” সৈন্ধবঘনবৎ প্রজ্ঞানঘন ইত্যর্থঃ ॥ ২৬

ভাষ্যানুবাদ

প্রণবই পর ও অপর ব্রহ্মস্বরূপ, প্রকৃতপক্ষে পাদ ও মাত্রাবুদ্ধি ক্ষয়প্রাপ্ত হইলে[এই প্রণবই] পরমাত্মা পরব্রহ্মস্বরূপ হন; এই নিমিত্তই পূর্ববর্তী কারণ না থাকায় অপূর্ব্ব; ইঁহা হইতে অন্তর ভিন্নজাতীয় কিছু নাই, এইজন্য অনন্তর; সেইরূপ ইঁহার বাহিরেও কিছু নাই, এইজন্য অবাহ্য; ইঁহার অপর অর্থাৎ কোনও কার্য্য নাই, এই কারণে অনপর। সৈন্ধবখণ্ডের ন্যায় ইনি বাহিরে ও অন্তরে বিদ্যমান এবং জন্মরহিত ॥২৬

সর্ব্বস্য প্রণবো হ্যাদির্ম্মধ্যমন্তস্তথৈব চ। এবং হি প্রণবং জ্ঞাত্বা ব্যশ্নুতে তদনন্তরম্ ॥২৭

সরলার্থঃ

[অথ প্রণবস্য সর্ব্বাত্মতামুপদিশতি—‘সর্ব্বস্য’ ইতি।]—প্রণবঃ(ওঙ্কারঃ) হি(নিশ্চয়ে) সর্ব্বস্য(জগতঃ) আদিঃ(উৎপত্তিঃ), মধ্যং(স্থিতিঃ) তথৈব (তদ্বদেব) অন্তঃ(প্রলয়ঃ) চ(অপি)। এবং(উক্তেন রূপেণ) প্রণবং জ্ঞাত্বা(আত্মস্বরূপতয়া অনুভূয়) অনন্তরং(তৎক্ষণাদেব) তৎ(“অপূর্ব্বঃ” ইত্যাদিবিশেষণং ব্রহ্ম) ব্যশ্নতে(বিশেষেণ প্রতিপদ্যতে) ॥

আগম-প্রকরণম্ ৬৯

প্রণবই সকলের আদি, মধ্য ও অন্তস্বরূপ। এইরূপে প্রণবকে জানিয়া তৎক্ষণাৎ সেই ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হয় ॥ ২৭

শঙ্কর-ভাষ্যম্

আদিমধ্যান্তা উৎপত্তি-স্থিতি-প্রলয়াঃ সর্ব্বস্য প্রণব এব। মায়াহস্তি-রজ্জু-সর্প- মৃগতৃষ্ণিকা-স্বপ্নাদিবদুৎপদ্যমানস্য বিয়দাদিপ্রপঞ্চস্য যথা মায়াব্যাদয়ঃ, এবং হি প্রণবমাত্মানং মায়াব্যাদিস্থানীয়ং জ্ঞাত্বা তৎক্ষণাদেব তদাত্মভাবং ব্যশ্নুতে ইত্যর্থঃ ॥ ২৭

ভাষ্যানুবাদ

প্রণবই সকলের আদি, মধ্য ও অন্তস্বরূপ, অর্থাৎ উৎপত্তি, স্থিতি ও প্রলয়স্বরূপ। মায়াময় হস্তী, রজ্জু-সর্প, মৃগতৃষ্ণা ও স্বপ্নাদির ন্যায় উৎপদ্যমান আকাশাদি প্রপঞ্চের পক্ষে, মায়াবিপ্রভৃতি যেরূপ [অবিকারী কারণ,] ঠিক তদ্রূপ মায়াবিস্থানীয় প্রণবরূপী আত্মাকে কারণরূপে জানিয়া তৎক্ষণাৎই সেই আত্মভাব প্রাপ্ত হয় ॥ ২৭

প্রণবং হীশ্বরং বিদ্যাৎ সর্ব্বস্য হৃদি সংস্থিতম্। সর্ব্বব্যাপিনমোঙ্কারং মত্বা ধীরো ন শোচতি॥২৮

সরলার্থঃ

প্রণবং(ওঙ্কারং) হি(নিশ্চয়ে) সর্ব্বস্য(প্রাণিনঃ) হৃদি(বুদ্ধৌ) সংস্থিতম্(অন্তর্য্যামিতয়া স্থিতম্) ঈশ্বরং(ঈশ্বরাভিন্নং) বিদ্যাৎ(জানীয়াৎ)। ধীরঃ(বিবেকী) সর্ব্বব্যাপিনং(ব্যোমবৎ সর্ব্বতঃ স্থিতং) ওঙ্কারং মত্বা(জ্ঞাত্বা) ন শোচতি(ন শোকং করোতি),[“তরতি শোকমাত্মবিৎ” ইতি শ্রুতেঃ]।

প্রণবকেই সর্ব্ববুদ্ধিসন্নিহিত ঈশ্বর বলিয়া জানিবে। ধীর পুরুষ সর্ব্বব্যাপী প্রণবকে অবগত হইয়া আর শোক করেন না; অর্থাৎ শোকোত্তীর্ণ হন ॥২৮

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

সর্ব্বস্য প্রাণিজাতস্য স্মৃতিপ্রত্যয়াস্পদে হৃদয়ে স্থিতমীশ্বরং প্রণবং বিদ্যাৎ। সর্ব্ব- ব্যাপিনং ব্যোমবৎ ওঙ্কারমাত্মানমসংসারিণং ধীরো বুদ্ধিমান্ মত্বা ন শোচতি শোক- নিমিত্তানুপপত্তেঃ, “তরতি শোকমাত্মবিৎ” ইত্যাদি শ্রুতিভ্যঃ ॥২৮

ভাষ্যানুবাদ

প্রণবকেই সমস্ত প্রাণীর স্মৃতি-জ্ঞানাশ্রয় হৃদয়দেশে অবস্থিত ঈশ্বর বলিয়া জ্ঞান করিবে। ধীর অর্থাৎ বুদ্ধিমান্ পুরুষ ওঙ্কারকেই

৭০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যাপনিষৎ

আকাশবৎ সর্বব্যাপী ও অসংসারী আত্মস্বরূপ জানিয়া আর শোক করেন না; কারণ, তখন আর শোকের কোনই কারণ থাকে না, ‘আত্মজ্ঞ পুরুষ শোক অতিক্রম করে’ ইত্যাদি শ্রুতি এ বিষয়ে প্রমাণ ॥ ২৮

অমাত্রোহনন্তমাত্রশ্চ দ্বৈতস্যোপশমঃ শিবঃ। ওঙ্কারো বিদিতো যেন স মুনিনেতরো জনঃ। ২৯ ইতি মাণ্ডূক্যোপনিষদর্থাবিষ্করণপরাসু গৌড়পাদীয়- কারিকাসু প্রথমমাগমপ্রকরণম্ ॥১

[প্রকরণার্থমুপসংহরতি অমাত্রেতি।]-যেন(সাধকেন) অমাত্রঃ(মাত্রাদি- বিভাগরহিতঃ) অনন্তমাত্রঃ(অনন্তা মাত্রা-পরিমাণং যস্য, স তথোক্তঃ), চ (অপি) দ্বৈতস্যোপশমঃ(দ্বৈতবিশ্রান্তস্থানং)[অতএব] শিবঃ(কল্যাণময়ঃ) ওঙ্কারঃ(প্রণবঃ) বিদিতঃ(জ্ঞাতঃ);[সঃ] জনঃ[এব] মুনিঃ(যথার্থমনন- শীলঃ), ইতরঃ(অনেবংবিৎ জনঃ) ন[মুনিরিত্যর্থঃ]।

যে জন, অমাত্র(মাত্রাবিভাগশূন্য) অথচ অনন্তমাত্র(অসীম), দ্বৈতবিশ্রান্তভূমি, মঙ্গলময় ওঙ্কারকে জানিয়াছেন; তিনিই যথার্থ মুনি, অপরে নহে ॥২৯

শঙ্কর-ভাষ্যম্

অমাত্রস্তুরীয় ওঙ্কারঃ, মীয়তেহনয়েতি মাত্রা পরিচ্ছিত্তিঃ, সা অনন্তা যস্য, সোহনন্তমাত্রঃ; নৈতাবত্ত্বমস্য পারচ্ছেত্তুং শক্যত ইত্যর্থঃ। সর্ব্বদ্বৈতোপশমত্বাদেব শিবঃ; ওঙ্কারো যথাব্যাখ্যাতো বিদিতো যেন, স এব পরমার্থতত্ত্বস্য মননাৎ মুনিঃ নেতরো জনঃ শাস্ত্রবিদপীত্যর্থঃ ॥ ২৯

ইতি শ্রীগোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদশিষ্যস্য পরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্যস্য শঙ্কর- ভগবতঃ কৃতাবাগমশাস্ত্রবিবরণে গৌড়পাদীয়কারিকাসহিত মাণ্ডূক্যোপনিষদ্ভাষ্যে প্রথমমাগমপ্রকরণং সম্পূর্ণম্ ॥ ১

ভাষ্যানুবাদ

অমাত্র অর্থ—[ মাত্রাশূন্য] তুরীয় ওঙ্কার; যাহা দ্বারা[ কোন বস্তুকে] পরিমিত করা যায়, তাহা মাত্রা, অর্থাৎ পরিচ্ছেদ বা পরিমাণ; সেই পরিমাণ যাহার অনন্ত, তাহা অনন্তমাত্র। অভিপ্রায় এই যে, ইহার পরিমাণ ইয়ত্তা দ্বারা পরিচ্ছিন্ন করিতে পারা যায় না।

আগম-প্রকরণম্ ৭১

সর্বপ্রকার দ্বৈত-বিশ্রান্তি-স্থান বলিয়াই শিব অর্থাৎ মঙ্গলময় ওঙ্কারকে যে লোক বর্ণিতপ্রকারে অবগত হইয়াছেন; পরমার্থ সত্য বস্তুর মনন করায়—চিন্তা করায় তিনি মুনি; অপর লোক(যিনি এবং- বিধ নহেন, তিনি) শাস্ত্রজ্ঞ হইলেও নহে, অর্থাৎ মুনিপদবাচ্য নহেন ॥ ২৯

আগমপ্রকরণীয় ভাষ্যানুবাদ সমাপ্ত।

গৌড়পাদীয় কারিকাসু বৈতথ্যাখ্যং দ্বিতীয়ং প্রকরণম্

বৈতথ্যং সর্ব্বভাবানাং স্বপ্ন আহুর্ম্মনীষিণঃ। অন্তঃস্থানাত্তু ভাবানাং সংবৃতত্বেন হতুনা॥ ৩০॥ ১

সরলার্থঃ

[ পূর্ব্বম্ আগমপ্রাধান্যেন দ্বৈতমিথ্যাত্বং প্রতিপাদ্য ইদানীং যুক্তিতোহপি তৎ সমর্থয়িতুং দ্বিতীয়ং বৈতথ্যনামকং প্রকরণমারভ্যতে—তত্র প্রথমং স্বপ্নমিথ্যাত্বং সাধয়তি—বৈতথ্যমিত্যাদিনা।]

মনীষিণঃ(বিচারকুশলাঃ) স্বপ্নে[দৃশ্যমানানাং] ভাবানাম্(পদার্থানাং হয়- হস্তি-প্রভৃতীনাম্) অন্তঃ(শরীরমধ্যে অন্তঃকরণে ইতি যাবৎ), স্থানাৎ (অবস্থিতেঃ) সংবৃতত্বেন(তৎস্থানস্য সূক্ষ্মত্বেন) হেতুনা(কারণেন)[অনুপ- যুক্ত-দেশবর্ত্তিনাং স্বাপ্নানাং] সর্ব্বভাবানাং(বস্তুত্বেন প্রতীয়মানানাং) বৈতথ্যং (বিতথস্য ভাবঃ বৈতথ্যং মিথ্যাত্বমিত্যর্থঃ) আহুঃ(কথয়ন্তি)।[ন হি সূক্ষ্মে দেহমধ্যে প্রতীয়মানানাং বিপুলবপুষাং হয়হস্ত্যাদীনাং সত্যত্বমুপপদ্যতে ইতি ভাবঃ ॥

মনীষিগণ স্বপ্নদৃশ্য সমস্ত পদার্থেরই মিথ্যাত্ব বলিয়া থাকেন। তাহার কারণ এই যে, স্বাপ্নপদার্থসমূহ দেহমধ্যে অবস্থিতি করে; অথচ সেই স্থানটি সংবৃত অর্থাৎ অতি সূক্ষ্ম। অভিপ্রায় এই যে, ঐরূপ অল্প-পরিমাণ দেহমধ্যে কখনই হস্তী ও পর্ব্বতাদি বিপুলকায় পদার্থ স্থান পাইতে পারে না; অতএব স্বপ্নদৃশ্যমাত্রই অসত্য—মিথ্যা ॥ ৩০ ॥ ১

শাঙ্কর-ভাষ্যম

‘জ্ঞাতে দ্বৈতং ন বিদ্যতে’ ইত্যুক্তম্, “একমেবাদ্বিতীয়ম্” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ। আগমমাত্রং তৎ; তত্রোপপত্যাপি দ্বৈতস্য বৈতথ্যং শক্যতেহবধায়িতুমিতি দ্বিতীয়ং প্রকরণমারভ্যতে—বৈতথ্যমিত্যাদিনা।

বিতথস্য ভাবো বৈতথ্যং অসত্যত্বমিত্যর্থঃ। কস্য? সর্ব্বেষাং বাহ্যাধ্যাত্মি- কানাং ভাবানাং পদার্থানাং স্বপ্নে উপলভ্যমানানাম্ আহুঃ কথয়ন্তি মনীষিণঃ প্রমাণকুশলাঃ। বৈতথ্যে হেতুমাহ—অন্তঃস্থানাৎ, অন্তঃ শরীরস্য মধ্যে স্থানং

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ৭৩

যেষাম্; তত্র হি ভাবা উপলভ্যন্তে পর্ব্বতহস্ত্যাদয়ঃ, ন বহিঃ শরীরাৎ; তস্মাৎ তে বিতথা ভবিতুমর্হন্তি।

ননু অপাবরকাদ্যন্তরুপলভ্যমানৈর্ঘটাদিভিরনৈকান্তিকো হেতুরিত্যাশঙ্ক্যাহ— সংবৃতত্বেন হেতুনেতি। অন্তঃ সংবৃতস্থানাদিত্যর্থঃ। ন হ্যন্তঃ সংবৃতে দেহান্ত- নাড়ীযু পর্ব্বতহস্ত্যাদীনাং ভাবোহস্তি; নহি দেহে পর্ব্বতোহস্তি ॥ ৩০ ॥ ১

ভাষ্যানুবাদ

“একম্ এব অদ্বিতীয়ম্” ইত্যাদি শ্রুতি অনুসারে কথিত হইয়াছে যে, তত্ত্বজ্ঞানোদয়ে আর দ্বৈতসত্তা থাকে না। তাহা কেবল শাস্ত্র- প্রমাণ মাত্র; যুক্তি দ্বারাও যে দ্বৈতমিথ্যাত্ব সাধন করিতে পারা যায়, তদুদ্দেশ্যে “বৈতথ্যং” ইত্যাদি বাক্যে এই দ্বিতীয় প্রকরণ আরব্ধ হইতেছে—

বৈতথ্য অর্থ বিতথের(যাহা একরূপে থাকে না—মিথ্যা, তাহার) ভাব বা ধৰ্ম্ম, অর্থাৎ অসত্যতা।[বৈতথ্য] কাহার? স্বপ্নে বাহ্য (ঘটপটাদি) আধ্যাত্মক(সুখদুঃখাদি যে সমুদয় পদার্থ প্রত্যক্ষ হয়, সেই সমুদয় ভাবের অর্থাৎ পদার্থের[বৈতথ্য * মনীষিগণ বলিয়া থাকেন; মনীষী অর্থ—প্রমাণ-প্রয়োগে কুশল। বৈতথ্যে হেতু বলিতেছেন—অন্তরে(দেহমধ্যে) অবস্থিতি, শরীরের অভ্যন্তরে যে সমুদয়ের স্থান,[সেই সমুদয় পদার্থই বিতথ]। কেন না, পর্বত- হস্তি-প্রভৃতি পদার্থ-সমুদয় সেই শরীরাভ্যন্তরেই অনুভূত হইয়া থাকে, কিন্তু শরীরের বাহিরে[অনুভূত হয়] না; এই কারণে সেই পদার্থসমূহ বিতথ(মিথ্যা) হইবার যোগ্য।

প্রশ্ন হইতেছে যে, বস্ত্রাদি আবরণের অভ্যন্তরে অনুভূয়মান ঘটাদি পদার্থ যখন মিথ্যা হয় না, তখন উক্ত হেতুটি ত ঐকান্তিক বা

৭৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

অব্যভিচারী * হইতে পারে না, অনৈকান্তিক হয়; এই আশঙ্কায় সংবৃতত্ব হেতুর উল্লেখ করিতেছেন। যেহেতু ঐ অন্তর স্থানটি সংবৃত বা সঙ্কুচিত। দেহাভ্যন্তরবর্তী অল্প-পরিমাণ নাড়ী-মধ্যে কখনই পর্বত ও হস্তী প্রভৃতি পদার্থের অবস্থিতি সম্ভবপর হইতে পারে না; কারণ, দেহের মধ্যে ত আর পর্বত নাই?[সুতরাং স্বপ্নে দৃশ্য সমুদয়ই অসত্য] ॥ ৩০ ॥ ১

অদীর্ঘত্বাচ্চ কালস্য গত্বা দেহান্ন পশ্যতি। প্রতিবুদ্ধশ্চ বৈ সর্ব্বস্তস্মিন্ দেশে ন বিদ্যতে ॥ ৩১ ॥২

সরলার্থঃ

[স্বপ্নদৃশ্যানাং মিথ্যাত্বে হেত্বন্তরমুপন্যস্যতি-“অদীর্ঘত্বাৎ” ইত্যাদি। - কালস্য (স্বপ্নকালস্য) অদীর্ঘত্বাৎ(স্বল্পত্বাৎ) চ(অপি)[হেতোঃ] দেহাৎ(স্বশরীরাৎ) গত্বা(বহির্নির্গম্য)[দিন-মাসাদিগম্যেষু বহুযোজনান্তরেষু দেশেযু] গত্বা স্বপ্নান্(স্বপ্নদৃশ্যান্ পদার্থান্) ন পশ্যতি[স্বপ্নদর্শী ইতি শেষঃ]। সর্ব্বঃ (স্বপ্নদর্শী) প্রতিবুদ্ধঃ(জাগরিতঃ) চ(অপি)[সন্] তস্মিন্(স্বপ্নানুভূতে) দেশে(স্থানে) ন বৈ(নৈব) বিদ্যতে(তিষ্ঠতি)।[স্বপ্নদর্শী যদি স্বদেহাৎ বহির্নির্গম্য তত্তদ্দেশেষু গত্বৈব স্বাপ্মান্ বিষয়ান্ পশ্যেৎ, তর্হি ক্ষণমাত্রাৎ জাগরিতঃ সন্ তস্মিন্নেব দূরবর্তিনি দেশে স্থিতো ভবেৎ; নচৈবম্; অতো দেহ- মধ্যে এব স্বপ্নদর্শনং যুক্তমিত্যাশয়ঃ] ॥

স্বপ্নদর্শী পুরুষ যে, দেহ হইতে নির্গত হইয়া(উপযুক্ত স্থানে যাইয়া) স্বপ্ন দর্শন করে, তাহা নহে; কারণ ঐ সময় দীর্ঘ নহে, অর্থাৎ ঐরূপ দূর দেশে গমনাগমনের উপযুক্ত নহে। বিশেষতঃ কোন স্বপ্নদর্শীই জাগরিত হইয়া ত আর সেইদেশে(যেখানে স্বপ্ন দেখিয়াছিল, সেই স্থানে) বর্তমান থাকে না, [ পরন্তু নিজের শয়ন-কক্ষেই থাকে] ॥ ৩১ ॥ ২

* কোন একটি বিষয়ের অনুমান করিতে হইলেই এরূপ একটি হেতু দিতে হয়, যাহা কস্মিন্কালেও ব্যভিচার বলা হয় না। সেই হেতু-সত্ত্বেও যদি সেই নিয়মানুসারে কোন স্থলে সেই জাতীয় বিষয় প্রমাণ করিতে পারা না যায়, তাহা হইলে সেই হেতুটি ‘অনৈকান্তিক’ হইয়া পড়ে। অনৈকান্তিক হেতু দ্বারা কোন বিষয় প্রমাণিত হয় না। আলোচ্য স্থলেও শঙ্কা হইতেছে যে, কোন দৃশ্য পদার্থকে অপর কোন পদার্থের মধ্যে দেখিলেই যদি সেই পদার্থটি মিথ্যা হয়, তাহা হইলে বস্ত্রাচ্ছাদিত ঘটাদিও মিথ্যা হইতে পারিত; অথচ ঘটাদি ত মিথ্যা নহে; অতএব অন্তরে স্থিতিরূপ হেতুটি অনৈকান্তিকত্ব দোষে দূষিত হইতেছে।

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ৭৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

স্বপ্নদৃশ্যানাং ভাবানামন্তঃ সংবৃতস্থানমিত্যেতদসিদ্ধম্; যস্মাৎ প্রাচ্যেষু সুপ্ত উদক্ষু স্বপ্নান্ পশ্যন্নিব দৃশ্যতে, ইত্যেতদাশঙ্ক্যাহ-ন দেহাৎ বহিৰ্দ্দেশান্তরং গত্বা স্বপ্নান্ পশ্যতি। যস্মাৎ সুপ্তমাত্র এব দেহদেশাদযোজনশতান্তরে মাসমাত্রপ্রাপ্যে দেশে স্বপ্নান্ পশ্যন্নিব দৃশ্যতে। ন চ তদ্দেশপ্রাপ্তেরাগমনস্য চ দীর্ঘঃ কালোহস্তি। অতঃ অদীর্ঘত্বাচ্চ কালস্য ন স্বপ্নদৃক্ দেশান্তরং গচ্ছতি। কিঞ্চ, প্রতিবুদ্ধশ্চ বৈ সর্ব্বঃ স্বপ্নদৃক্ স্বপ্নদর্শনদেশে ন বিদ্যতে। যদি চ স্বপ্নে দেশান্তরং গচ্ছেৎ, যস্মিন্ দেশে স্বপ্নান্ পশ্যেৎ, তত্রৈব প্রতিবুধ্যতে। নচৈতদন্তি; রাত্রৌ সুপ্তোহহনি ইব ভাবান্ পশ্যতি, বহুভিঃ সঙ্গতো ভবতি; যৈশ্চ সঙ্গতঃ, স তৈগৃহ্যেত, নচ গৃহ্যতে। গৃহীতশ্চেৎ ‘ত্বামদ্য তত্রোপলব্ধবস্তো বয়ম্’ ইতি ক্রয়ুঃ; নচৈতদন্তি। তস্মান্ন দেশান্তরং গচ্ছতি স্বপ্নে ॥ ৩১ ॥ ২

ভাষ্যানুবাদ

স্বপ্নদৃশ্য পদার্থগুলির যে, শরীরমধ্যে অল্পস্থানস্থিতি বলা হইয়াছে, তাহা প্রমাণসিদ্ধ নহে; যেহেতু দেখিতে পাওয়া যায়, পূর্বদিকে শয়ান ব্যক্তিও যেন উত্তর দিকেই স্বপ্ন দর্শন করিতেছে,[ ইহা ত দেহমধ্যে থাকিলে হইতে পারে না।] এইরূপ আশঙ্কা করিয়া বলিতেছেন যে, দেহ হইতে বাহিরে-দেশান্তরে যাইয়া স্বপ্ন দর্শন করে না; কেন না, যেহেতু নিদ্রিত হইলে তন্মুহূর্তেই দেহ হইতে শত-যোজন-ব্যবহিত -মাসগম্য স্থানেই যেন স্বপ্ন দর্শন করিতেছে, এইরূপ দেখিতে পাওয়া যায়; অথচ ঐরূপ দূর দেশে গমন এবং সেখান হইতে প্রত্যাগমনের উপযুক্ত দীর্ঘ কালও থাকে না। অতএব উপযুক্ত দীর্ঘকালের অভাব- নিবন্ধনই বলিতে.হয় যে, স্বপ্নদর্শনকারী স্থানান্তরে গমন করে না, (দেহেই থাকে)। আরও এক কথা, সমস্ত স্বপ্নদর্শীই যেখানে স্বপ্ন দর্শন করে, জাগরিত হইয়া ত আর সেখানে থাকে না।[প্রকৃতপক্ষে] স্বপ্নদর্শী যদি অন্যত্র যাইয়াই স্বপ্নদর্শন করিত, তাহা হইলে সে নিশ্চয়ই সেই স্থানে জাগরিত হইত;[কেন না, এত অল্প সময়ে প্রত্যাগমন হইতে পারে না।] অথচ এরূপ ত হয় না। রাত্রিতে নিদ্রিত হইয়াও যেন দিনের বেলায়ই সমস্ত বিষয় দর্শন করিতেছে মনে করে; এবং আপনাকে বহুলোকের সহিত সম্মিলিত দর্শন করে;

৭৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

কিন্তু যাহাদের সহিত মিলিত হয়,[সত্য হইলে] তাহাদেরও সেইরূপ দর্শন সম্ভব হইত; অথচ সে রূপ ত দর্শন হয় না। আর যদি দেখিয়া থাকিত, তাহা হইলে নিশ্চয়ই তাহারা বলিত যে, ‘আমরা আজ তোমাকে সেখানে দেখিয়াছিলাম।’ কিন্তু তাহাও ত হয় না। অতএব, স্বপ্নদর্শী স্বপ্নাবস্থায় দৃশ্য-দেশে গমন করে না(স্বদেহেই বর্তমান থাকে) ॥ ৩১ ॥ ২

অভাবশ্চ রথাদীনাং ক্রয়তে ন্যায়পূর্ব্বকম্। বৈতথ্যং তেন বৈ প্রাপ্তং স্বপ্নআহুঃ প্রকাশিতম্ ॥ ৩২ ॥ ৩ সরলার্থঃ

রথাদীনাম্(স্বপ্নদৃশ্যানাং) অভাবঃ(অসত্ত্বং) চ(অপি) ন্যায়পূর্ব্বকং (যুক্তিযুক্তং) ক্রয়তে—“ন তত্র রথা রথযোগাঃ” ইত্যাদৌ শ্রুতৌ ইতি শেষঃ]। তেন(স্থানসংবৃতত্বাদিহেতুনা) প্রাপ্তং(সিদ্ধং)[এব] বৈতথ্যং (প্রপঞ্চমিথ্যাত্বং)[শ্রুত্যা] স্বপ্নে[আত্মনঃ স্বয়ংজ্যোতিঃ-স্বরূপত্ব-প্রতিপাদন- পরয়া] প্রকাশিতম্(প্রতিপাদিতম্), আহুঃ(কথয়ন্তি)[জ্ঞানিন ইতি শেষঃ]। [যুক্তিসিদ্ধমেব বৈতথ্যং শ্রুতিরনুবদতীতি ভাবঃ]।

স্বপ্নদৃশ্য রথাদির অসত্তা যুক্ত্যনুযায়ী শ্রুতিতেও শোনা যায়। জ্ঞানিগণ বলেন যে, সেই যুক্তিসিদ্ধমিথ্যাত্বই স্বপ্নে আত্মার স্বয়ংজ্যোতিঃ-স্বরূপত্ব প্রতিপাদনের অভিপ্রায়ে শ্রুতিতে প্রকাশিত হইয়াছে মাত্র ॥ ৩২ ॥ ৩

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ইতশ্চ স্বপ্নদৃশ্যা ভাবা বিতথাঃ; যতঃ অভাবশ্চৈব রথাদীনাং স্বপ্নদৃশ্যানাং শ্রূয়তে, ন্যায়পূর্ব্বকং যুক্তিতঃ শ্রুতৌ “ন তত্র রথাঃ” ইত্যত্র। তেনান্তঃস্থান- সংবৃতত্বাদিহেতুনা প্রাপ্তং বৈতথ্যং তদনুবাদিন্যা শ্রুত্যা স্বপ্নে স্বয়ং-জ্যোতিষ্ট- প্রতিপাদনপরয়া প্রকাশিতমাহুব্রহ্মবিদঃ ॥ ৩২ ॥ ৩

ভাষ্যানুবাদ

এই কারণেও স্বপ্নদৃশ্য বিষয়গুলি মিথ্যা; যেহেতু ‘সেখানে(স্বপ্নে) রথ নাই’ ইত্যাদি শ্রুতিতে স্বপ্নদৃশ্য রথাদির যুক্তিসিদ্ধ অভাব(অসত্তা) পরিশ্রুত হইতেছে। ব্রহ্মবিদ্গণ বলিয়া থাকেন যে, দেহমধ্যে স্থানাল্পত্বাদি কারণেই মিথ্যাত্ব প্রাপ্ত বা প্রমাণিত হইয়াছে; শ্রুতি

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ৭৭

কেবল স্বপ্নে আত্মার স্বয়ংজ্যোতিঃ-স্বরূপত্ব প্রতিপাদনাভিপ্রায়েই তাহা প্রকাশ করিয়াছেন মাত্র ॥৩২॥ ৩

অন্তঃস্থানাত্তু ভেদানাং তস্মাজ্জাগরিতে স্মৃতম্। যথা তত্র, তথা স্বপ্নে সংবৃতত্বেন ভিদ্যতে ॥ ৩৩ ॥ ৪ সরলার্থঃ

[স্বপ্নে সিদ্ধং বৈতথ্য্যং জাগরিতেহপি অতিদিশতি “অন্তঃস্থানাৎ” ইত্যাদিনা।] —[স্বপ্নে] ভেদানাং(বিশেষাণাং ভাবানামিতি যাবৎ) তু(পুনঃ) অন্তঃস্থানাৎ (দেহমধ্যে সংবৃতস্থানবর্তিত্বাৎ হেতোঃ)[বৈতথ্য্যং]; তস্মাৎ(দৃশ্যত্বাৎ হেতোঃ) জাগরিতেহপি স্মৃতম্(বৈতথ্য্যমুক্তম্)। তত্র(জাগরিতে) যথা, স্বপ্নে[অপি] তথা(তদ্বদেব দৃশ্যত্বাদি হেতুঃ);[কেবলং] সংবৃতত্বেন(হেতুনা) ভিদ্যতে (স্বপ্ন-জাগ্রদ্দৃশ্যানাং ভেদ ইত্যর্থঃ)।

স্বপ্নাবস্থায় পদার্থসমূহ অল্পস্থানে দৃশ্য হয় বলিয়া অসত্য; জাগরণ-দশায়ও সেই দৃশ্যত্বহেতুতেই দৃশ্য পদার্থসমূহের মিথ্যাত্ব বিজ্ঞাত হয়। পদার্থসমূহ স্বপ্নে যেরূপ, জাগরণেও সেইরূপ; স্বপ্নে কেবল স্বপ্ন স্থানে থাকে, এইমাত্র প্রভেদ ॥ ৩৩ ॥ ৪

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

জাগ্রদ্দৃশ্যানাং ভাবানাং বৈতথ্যমিতি প্রতিজ্ঞা, দৃশ্যত্বাৎ ইতি হেতুঃ; স্বপ্ন- দৃশ্যভাববৎ ইতিদৃষ্টান্তঃ। যথা তত্র স্বপ্নে দৃশ্যানাং ভাবানাং বৈতথ্য্যং, তথা জাগরিতেহপি দৃশ্যত্বমবিশিষ্টিতি হেতুপনয়ঃ। তস্মাজ্জাগরিতেহপি বৈতথ্য্যং স্মৃতমিতি নিগমনম্। অন্তঃস্থানাৎ সংবৃতত্বেন চ স্বপ্নদৃশ্যানাং ভাবানাং জাগ্রদ্দৃশ্যেভ্যো ভেদঃ। দৃশ্যত্বমসত্যত্বঞ্চাবিশিষ্টমুভয়ত্র ॥ ৩৩ ॥ ৪

ভাষ্যানুবাদ

জাগ্রৎকালীন দৃশ্য পদার্থ-সমূহ মিথ্যা, ইহা প্রতিজ্ঞা; দৃশ্যত্ব তাহার হেতু; স্বপ্নদৃশ্য ভাবের ন্যায়, ইহা দৃষ্টান্ত। যেমন স্বপ্নে দৃশ্য পদার্থসমূহের মিথ্যাত্ব, জাগরিতাবস্থায়ও তেমনি; জাগরিতাবস্থায়ও ‘দৃশ্য’ স্বরূপ হেতুটি তুল্য, ইহা হেতুর উপনয়; অতএব জাগরিত অবস্থায়ও[পদার্থসমূহের] মিথ্যাত্ব জ্ঞাত হইয়াছে; ইহা নিগমন, অভ্যন্তরে অবস্থান-নিবন্ধন অল্পস্থানবর্তিত্ব হেতু জাগ্রৎকালীন দৃশ্য

৭৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

পদার্থ হইতে স্বপ্নদৃশ্য পদার্থসমূহের প্রভেদ আছে সত্য, কিন্তু দৃশ্যত্ব ও অসত্যত্ব ধৰ্ম্মদ্বয় উভয় স্থলেই অবিশিষ্ট বা তুল্য ॥ ৩৩ ॥ ৪

ভেদানাং হি সমত্বেন প্রসিদ্ধেনৈব হেতুনা ॥ ৩৪ ॥ ৫ স্বপ্ন-জাগরিতে স্থানে হ্যেকমাহুর্মনীষিণঃ।

সরলার্থঃ

মনীষিণঃ(বিবেকিনঃ) স্বপ্ন-জাগরিতে স্থানে(স্বপ্নস্থানে, জাগরিতস্থানে চ) প্রসিদ্ধেন(কল্পিতেন) হেতুনা(গ্রাহ্য-গ্রাহকভাবরূপেণ) ভেদানাং(ভাবানাং) সমত্বেন(তুল্যত্বেন হেতুনা) একম্(একত্বম্) আহুঃ(কথয়ন্তি)।

মনীষিগণ বলিয়া থাকেন যে, প্রসিদ্ধ হেতুবলেই স্বপ্ন ও জাগরিত অবস্থায় পদার্থ সকল সমান, এই কারণে উভয় স্থানেই পদার্থসমূহ এক বা সমান, অর্থাৎ অসত্য ॥ ৩৪ ॥ ৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

প্রসিদ্ধেনৈব ভেদানাং গ্রাহ্যগ্রাহকত্বেন হেতুনা সমত্বেন স্বপ্নজাগরিতস্থানয়ো- রেকত্বমাহুঃ বিবেকিন ইতি পূর্ব্বপ্রমাণসিদ্ধস্যৈব ফলম্ ॥ ৩৪ ॥ ৫

ভাষ্যানুবাদ

পদার্থসমূহের গ্রাহ্য-গ্রাহকভাবরূপ লোকপ্রসিদ্ধ হেতুতেই সাম্য থাকায় বিবেকিগণ স্বপ্ন ও জাগরিতাবস্থার একত্ব বলিয়া থাকেন; ইহা পূর্ব্ব-প্রমাণ-সিদ্ধ হেতুরই ফল-রূপে নির্দিষ্ট হইয়াছে ॥ ৩৪ ॥ ৫

আদাবন্তে চ যন্নাস্তি বর্তমানেহপি তৎ তথা। বিতথৈঃ সদৃশাঃ সন্তোহবিতথা ইব লক্ষিতাঃ ॥ ৩৫ ॥ ৬

সরলার্থঃ

[ যুক্ত্যন্তরমাহ—আদাবিতি]—যৎ(দৃশ্যং) আদৌ(আবির্ভাবাৎ প্রাক্) অন্তে[অবসানে—তিরোভাবে) চ(অপি) ন অস্তি(অসৎ), তৎ(দৃশ্যং) বর্তমানে(অনুভবসময়ে) অপি তথা(অসৎ এব)। বিতথৈঃ(রজ্জু সর্প- মৃগতৃষ্ণাদিভিঃ) সদৃশাঃ(আদ্যন্তয়োঃ অভাবাৎ তুল্যাঃ) সন্তঃ(ভবন্তঃ)[অপি] অবিতথাঃ(সত্যরূপাঃ) ইব(ইবশব্দঃ অবাস্তবত্ববাচী) লক্ষিতাঃ(প্রতীতাঃ) [ভবন্তি]।

আদিতে ও অবসানে যাহা নাই—অসৎ, বর্ত্তমানেও তাহা সেইরূপ—অসৎ।

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ৭৯

পদার্থসমূহ অসত্য মৃগতৃষ্ণাদিতুল্য হইয়াও অবিতথবৎ—সত্যেয় ন্যায় প্রতীত হইয়া থাকে মাত্র ॥ ৩৫ ॥ ৬

শাঙ্কর ভাষ্যম্

ইতশ্চ বৈতথ্যং জাগ্রদ্দৃশ্যানাৎ ভেদানামাদ্যন্তয়োরভাবাৎ; যৎ আদৌ অন্তে চ নাস্তি মৃগতৃষ্ণিকাদি, তৎ মধ্যেহপি নাস্তীতি নিশ্চিতং লোকে। তথা ইমে জাগ্রদ্দৃশ্যা ভেদাঃ আদ্যন্তয়োরভাবাদ্বিতথৈরেব মৃগতৃষ্ণিকাদিভিঃ সদৃশত্বাদ্বিতথা এব; তথাহপ্যবিতথা ইব লক্ষিতা মূঢ়ৈরনাত্মবিদ্ভিঃ ॥ ৩৫ ॥ ৬

ভাষ্যানুবাদ

এই কারণেও জাগ্রৎকালে দৃশ্য পদার্থসমূহের মিথ্যাত্ব, যেহেতু আদিতে ও অন্তে উহাদের অভাব। মৃগতৃষ্ণাদি যে সকল বস্তু আদিতে ও অন্তে নাই, মধ্যেও(বর্তমান কালেও) সে সকল নাই— অসৎ; ইহা জগতে নিশ্চিত আছে। সেইরূপ এই সমুদয় জাগ্রৎ- দৃশ্য পদার্থ আদি ও অন্তে অসত্তা-নিবন্ধন অসত্য মৃগতৃষ্ণাদির তুল্য; সুতরাং নিশ্চিতই অসত্য; তথাপি মূঢ় অনাত্মজ্ঞব্যক্তিগণ যেন অবিতথের ন্যায়—সত্য বলিয়াই যেন দর্শন করিয়া থাকে ॥ ৩৫ ॥ ৬

সপ্রয়োজনতা তেষাং স্বপ্নে বিপ্রতিপদ্যতে। তস্মাদাদ্যন্তবত্ত্বেন মিথ্যৈব খলু তে স্মৃতাঃ॥ ৩৬॥ ৭

সরলার্থঃ

তেষাং(জাগ্রদ্দৃশ্যানাং) সপ্রয়োজনতা(স্নান-পানাদিসাধনতা) স্বপ্নে (স্বপ্নদশায়াং) বিপ্রতিপদ্যতে(ব্যভিচরতি—নিবর্ত্ততে ইতি যাবৎ)। তস্মাৎ (হেতোঃ) আদ্যন্তবত্ত্বেন(আদিমত্ত্বেন অন্তবত্ত্বেন চ হেতুনা) তে(জাগ্রদ্দৃশ্যাঃ) খলু(নিশ্চয়ে) মিথ্যা(অসত্যাঃ) এব স্মৃতাঃ(চিন্তিতাঃ নিশ্চিতা ইত্যর্থঃ) ॥ জাগ্রৎকালীন দৃশ্যপদার্থসমূহের যে প্রয়োজন সাধকতা, তাহা স্বপ্নসময়ে থাকে না; সেই কারণে ঐ সকল পদার্থ আদ্যন্তবিশিষ্ট(উৎপত্তি-বিনাশশীল); সুতরাং সে সমুদয় পদার্থ মিথ্যা বলিয়া নিশ্চিত হইয়াছে ॥ ৩৬ ॥ ৭

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

স্বপ্নদৃশ্যবৎ জাগরিতদৃশ্যানাম্ অপি অসত্ত্বমিতি যদুক্তং তদযুক্তম্। তস্মাৎ জাগ্রদ্বশ্যা অন্নপানবাহনাদয়ঃ ক্ষুৎপিপাসাদিনিবৃত্তিং কুর্ব্বন্তঃ গমনাগমনাদিকাৰ্য্যঞ্চ সপ্রয়োজনা দৃষ্টাঃ; ন তু স্বপ্নদৃশ্যানাং তদন্তি; তস্মাৎ স্বপ্নদৃশ্যবৎ জাগ্রদ্বশ্যানাম

৮০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

অসত্ত্বং মনোরথমাত্রমিতি। তৎন; কস্মাৎ? যস্মাৎ যা সপ্রয়োজনতা দৃষ্টা অন্নপানা- দীনাং, সা স্বপ্নে বিপ্রতিপদ্যতে। জাগারতে হি ভুক্তা পীত্বা চ তৃপ্তো বিনিবর্তিততৃট্ সুপ্তমাত্র এব ক্ষুৎপিপাসাদ্যাৰ্ত্ম অহোরাত্রোষিতম্ অভুক্তবন্তমাত্মানাং মন্যতে। যথা স্বপ্নে ভুক্তা পীত্বা চাতৃপ্তোত্থিতঃ, তথা। তস্মাৎ জাগ্রদ্ দৃশ্যানাং স্বপ্নে বিপ্রতিপত্তিদৃষ্ট্বা। অতো মন্যামহে—তেষামপি অসত্ত্বং স্বপ্নদৃশ্যবদনাশঙ্কনীয়মিতি। তস্মাৎ আদ্যন্তবত্ত্বমুভয়ত্র সমানমিতি মিথ্যৈব খলু তে স্মৃতাঃ ॥ ৩৬ ॥ ৭

ভাষ্যানুবাদ

পূর্ব্বে যে স্বপ্নদৃশ্যের ন্যায় জাগ্রৎকালীন দৃশ্য পদার্থসমূহেরও মিথ্যাত্ব উক্ত হইয়াছে, তাহা যুক্তিযুক্ত নহে; যেহেতু অন্ন, পান ও বাহনাদি জাগ্রদৃশ্য পদার্থসমূহ ক্ষুধা-পিপাসাদি-নিবৃত্তি এবং গমনা- গমনাদি কার্য্য সম্পাদন করিয়া সপ্রয়োজন বা সার্থক দৃষ্ট হয়; কিন্তু স্বপ্নদৃশ্য পদার্থের তাহা দৃষ্ট হয় না। অতএব, স্বপ্নদৃশ্যের ন্যায় জাগ্রদൃശ্যেরও যে অসত্ত্ব, তাহা কেবল মনোরথ মাত্র না—তাহা নহে; কেন? যেহেতু অন্নপানাদির যে সপ্রয়োজনতা দৃষ্ট হইয়া থাকে, স্বপ্নে কিন্তু তাহারও বিপর্যয় ঘটে। কারণ, জাগ্রৎকালে পান- ভোজন করিয়া তৃপ্তিলাভপূর্ব্বক তৃষ্ণাহীন অবস্থায় নিদ্রিত হইবামাত্র [স্বপ্নে] আপনাকে ক্ষুধা-তৃষ্ণা-প্রপীড়িত, অহোরাত্র-উপবাসী অভুক্ত বলিয়া মনে করিয়া থাকে; স্বপ্নে যেরূপ পান-ভোজন করিয়াও অতৃপ্তভাবে জাগরিত হয়, ঠিক সেইরূপ। সেই কারণেই জাগ্রদৃশ্য পদার্থ-সমুহের স্বপ্নাবস্থায় বৈপরীত্য দৃষ্ট হয়। অতএব মনে হয়, স্বপ্ন- দৃশ্যের ন্যায় জাগ্রদৃশ্যসমূহের অসত্ত্বও আশঙ্কার বিষয় নহে, অর্থাৎ উহাদেরও অসত্ত্ব নিশ্চিত। অতএব, উভয় স্থলেই আদ্যন্তবত্তা সমান; সুতরাং জাগ্রদৃশ্যসমূহ মিথ্যা বলিয়া চিন্তিত হইয়াছে ॥ ৩৬ ॥ ৭

অপূর্ব্বং স্থানিধর্ম্মো হি যথা স্বর্গনিবাসিনাম্। তানয়ং প্রেক্ষতে গত্বা যথৈবেহ সুশিক্ষিতঃ ॥ ৩৭ ॥ ৮ সরলার্থঃ

[স্বপ্নদৃশ্যানাং মিথ্যাত্বে হেত্বন্তরমুপন্যস্যতি “অপূর্ব্বম্” ইত্যাদি।—যথা স্বর্গনিবাসিনাং(স্বর্গস্থানাম্ ইন্দ্রাদীনাং)[সহস্রলোচনত্বাদিঃ স্থানিধৰ্ম্মঃ] তথা

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ৮১

স্বপ্নে[যৎ] অপূর্ব্বং(অভিনবং চতুৰ্দ্দন্তগজারোহণাদি)[দৃশ্যতে সোহপি] হি (নিশ্চয়ে) স্থানিধৰ্ম্মঃ(স্থানিনঃ দ্রষ্টুঃ আত্মনঃ ধৰ্ম্মঃ ইত্যর্থঃ) ইহ(অস্মিন্ লোকে) সুশিক্ষিতঃ(পথিপ্রাজ্ঞঃ জনঃ) যথা গত্বা[পশ্যতি],[তথা] এব অয়ং (স্বপ্নদর্শী) তান্(স্বাপ্নপদার্থান্) প্রেক্ষতে(পশ্যতি)[তস্মাৎ স্বপ্নদৃশ্যানামসত্ত্ব- মিত্যাশয়ঃ]।

স্বর্গবাসী ইন্দ্রাদির যেরূপ সহস্র চক্ষু প্রভৃতি অলৌকিক অবস্থা শ্রুত হওয়া যায়; তদ্রূপ স্বপ্নেও যে অপূর্ব্ব দর্শন হয়, ইহাও স্থানী—স্বপ্নদ্রষ্টা আত্মারই ধর্ম্ম বা স্বভাব। পথ-বিষয়ে সুশিক্ষিত ব্যক্তি যেমন সেই স্থানে যাইয়া দ্রষ্টব্য বিষয় দর্শন করিয়া থাকে, এই স্বপ্নদর্শীও সেইরূপ দৃশ্যসমূহ দর্শন করে ॥ ৩৭ ॥ ৮

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

স্বপ্নজাগ্রস্তেদয়োঃ সমত্বাৎ জাগ্রদ্দেদানামসত্ত্বমিতি যদুক্তং, তদসৎ। কস্মাৎ? দৃষ্টান্তস্যাসিদ্ধত্বাৎ। কথং? নহি জাগ্রদ্দষ্টা এবৈতে ভেদাঃ স্বপ্নে দৃশ্যন্তে; কিন্তুহি? অপূর্ব্বং স্বপ্নে পশ্যতি-চতুৰ্দ্দন্তগজমারূঢ়মষ্টভুজমাত্মানং মন্যতে। অন্যদপ্যেবংপ্রকারমপূর্ব্বং পশ্যতি স্বপ্নে। তৎ নান্যেনাসতা সমমিতি সদেব। অতঃ দৃষ্টান্তোহসিদ্ধঃ, তস্মাৎ স্বপ্নবজ্জাগরিতস্যাসত্ত্বমিত্যযুক্তম্। তত্র স্বপ্নে দৃষ্টমপূর্ব্বৎ যৎ মন্যসে, ন তৎ স্বতঃসিদ্ধম্। কিন্তুর্হি? অপূর্ব্বঃ স্থানিধর্মো হি স্থানিনো দ্রষ্টুরেব হি স্বপ্নস্থানবতো ধর্মঃ; যথা স্বর্গানিবাসিনামিন্দ্রাদীনাং সহস্রাক্ষত্বাদি; তথা স্বপ্নদৃশোহপূর্ব্বোহয়ং ধৰ্ম্মঃ; ন স্বতঃ সিদ্ধো দ্রষ্টু: স্বরূপবৎ। তানেবং প্রকারান্ অপূর্ব্বান্ স্বচিত্তবিকল্পানয়ং স্থানী স্বপ্নদৃক্ স্বপ্নস্থানং গত্বা প্রেক্ষতে। যথৈবেহ লোকে সুশিক্ষিতে। দেশান্তরমার্গস্তেন মার্গেণ দেশান্তরং গত্বা তান্ পদার্থান্ পশ্যতি, তদ্বৎ। তস্মাদ যথা স্থানিধৰ্মাণাং রজ্জুসর্প-মৃগতৃষ্ণিকাদীনামসত্ত্বং, তথা স্বপ্নদৃশ্যনামপূর্ব্বাণাং স্থানিধৰ্ম্মত্বমেবেত্যসত্ত্বং; অতো ন স্বপ্নদৃষ্টান্ত- স্যাসিদ্ধত্বম্ ॥ ৩৭ ॥ ৮

ভাষ্যানুবাদ

স্বপ্ন ও জাগ্রৎকালীন পদার্থসমূহের সমতা-নিবন্ধন যে জাগ্রৎ পদার্থসমূহের অসত্যতা কথিত হইয়াছে, তাহা ভাল কথা নহে; কারণ? যেহেতু দৃষ্টান্তই অসিদ্ধ। দৃষ্টান্তটি অসিদ্ধ কি প্রকারে? [উত্তর—] জাগ্রৎসময়ে যে সমস্ত পদার্থ দৃষ্ট হয়, সেই সকল পদার্থ ই ত স্বপ্নে দৃষ্ট হয় না; তবে কি? স্বপ্নে অপূর্ব্বরূপ(যেরূপ পূর্ব্বে কখনও দেখে নাই, সেইরূপ) দর্শন করে—আপনাকে চতুর্দ্দন্ত গজে

৮২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

আরূঢ়, অষ্টভুজশালী বলিয়া মনে করে। এইরূপ আরও অপূর্ব দর্শন করিয়া থাকে; কিন্তু সেগুলি ত অপর অসৎ পদার্থের সমান নহে; সুতরাং নিশ্চয়ই সৎ; কাজেই উক্ত দৃষ্টান্ত অসিদ্ধ হইল। অতএব, স্বপ্নের ন্যায় জাগরিতকে যে অসৎ বলা হইয়াছে, তাহা যুক্তিযুক্ত নহে। না!—তাহা নহে। তুমি যাহাকে স্বপ্নদৃষ্ট অসৎ বলিয়া মনে করিতেছ, তাহা কিন্তু স্বতঃসিদ্ধ অসৎ নহে; তবে কি? নিশ্চয়ই তাহা অপূর্ব স্থানিধৰ্ম্ম; অর্থাৎ স্বপ্নস্থানবর্তী স্থানী দ্রষ্টারই ধৰ্ম্ম। স্বর্গনিবাসী ইন্দ্রাদির যেরূপ সহস্রলোচনত্বাদি ধৰ্ম্ম, তদ্রূপ স্বপ্নদর্শীরও ইহা একপ্রকার অপূর্ব ধৰ্ম্ম; কিন্তু দ্রষ্টার নিজের ন্যায় উহা স্বভাবসিদ্ধ নহে। এই যে স্বপ্নস্থানাধিপতি স্বপ্নদর্শী, সে স্বপ্নস্থানে গমনপূর্ব্বক স্বীয়-চিত্তপরিকল্পিত এবংবিধ অপূর্ব বিষয়সমূহ দর্শন করিয়া থাকে। ইহ লোকে দেশান্তরীয় পথাভিজ্ঞ ব্যক্তি যেরূপ সেই বিজ্ঞাত পথে দেশান্তরে গমন করিয়া পদার্থসমূহ দর্শন করে, তদ্রুপ। অতএব, স্থানিধৰ্ম্ম অর্থাৎ দ্রষ্টার মনঃকল্পিত রজ্জু-সর্প ও মৃগতৃষ্ণা প্রভৃতির যেমন অসত্যতা, তেমনি অপূর্ব স্বপ্নদৃশ্য পদার্থ- সমূহেরও স্থানিধৰ্ম্মত্বই অসত্যতা; অতএব, স্বপ্ন-দৃষ্টান্তের অসিদ্ধি হইল না ॥ ৩৭ ॥ ৮

স্বপ্নবৃত্তাবপি স্বন্তশ্চেতসা কল্পিতত্ত্বসং।

বহিশ্চেতোগৃহীতং সদ্দৃষ্টিং বৈতথ্যমেতয়োঃ ॥ ৩৮ ॥ ৯

সরলার্থঃ

স্বপ্নবৃত্তৌ(স্বপ্নাবস্থায়াং) অপি অন্তঃ(অভ্যন্তরে) চেতসা(মনসা) কল্পিতং(মনঃসংকল্পমাত্রমিত্যর্থঃ) তু(পুনঃ) অসৎ;[স্বপ্ন এব] বহিঃ (বহির্দেশে) চেতোগৃহীতং(চেতসা উপলব্ধং ঘটাদি) তু সৎ; এতয়োঃ (অন্তর্বহিশ্চ চেতঃকল্পিতয়োঃ) বৈতথ্যং(মিথ্যাত্বং) দৃষ্টম্।

স্বপ্নাবস্থায়ও শরীরাভ্যন্তরে চিত্তকল্পিত বিষয় অসৎ; কিন্তু বহির্দেশে চিত্ত দ্বারা পরিজ্ঞাত বিষয়গুলি সৎ; এইরূপ সদসৎ বিভাগ-সত্ত্বেও উভয়ের মিথ্যাত্ব দেখিতে পাওয়া যায় ॥ ৩৮ ॥ ৯

শাঙ্কর-ভাষ্যম্ অপূর্ব্বত্বাশঙ্কাং নিরাকৃত্য স্বপ্নদৃষ্টান্তস্য পুনঃ স্বপ্নতুল্যতাং জাগ্রদ্ভেদানাং

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ৮৩

পপঞ্চয়ন্নাহ—স্বপ্নবৃত্তাবপি স্বপ্নস্থানে অপ্যন্তশ্চেতসা মনোরথসঙ্কল্পিতমসৎ; সঙ্কল্পানন্তরসমকালমেবাদর্শনাৎ। তত্রৈব স্বপ্নে বহিশ্চেতসা গৃহীতং চক্ষুরাদি- দ্বারেণোপলব্ধং ঘটাদি সৎ ইত্যেবমসত্যমিতি নিশ্চিতেহপি সদসদ্বিভাগো দৃষ্টঃ। উভয়োরপি অন্তর্ব্বহিশ্চেতঃ-কল্পিতয়োর্বৈতথ্যমেব দৃষ্টম্ ॥ ৩৮ ॥ ৯

ভাষ্যানুবাদ

স্বপ্নদৃষ্টান্তের অপূর্ব-শঙ্কা নিরাসপূর্বক জাগ্রৎ পদার্থসমূহের পুনর্ব্বার স্বপ্নতুল্যতা প্রকাশনার্থে বলিতেছেন—স্বপ্নবৃত্তিতে অর্থাৎ স্বপ্নস্থলেও অভ্যন্তরে চিত্তকল্পিত অর্থাৎ কেবলই মনোরথ-সংকল্পিত দৃশ্য পদার্থ অসৎ; কারণ, সঙ্কল্পের পর তাহার সঙ্গে-সঙ্গেই অদৃশ্য হইয়া যায়; আর সেই স্বপ্নেই বহির্দেশে চিত্ত দ্বারা গৃহীত অর্থাৎ চক্ষু প্রভৃতি ইন্দ্রিয় দ্বারা পরিজ্ঞাত ঘটাদি পদার্থ সৎ; ‘অসত্য’ বলিয়া নিশ্চয় সত্ত্বেও এরূপ সৎ-অসৎ বিভাগ দেখা গিয়াছে। অন্তরে ও বাহিরে মনঃ-সংকল্পিত এই উভয়ের বৈতথ্যই দৃষ্ট হইয়াছে * ॥ ৩৮ ॥ ৯

জাগ্রদ্বৃত্তাবপি স্বস্তশ্চেতসা কল্পিতং ত্বসং।

বহিশ্চেতো-গৃহীতং সদ্‌যুক্তং বৈতথ্যমেতয়োঃ ॥ ৩৯ ॥ ১০

সরলার্থঃ

জাগ্রদ্বৃত্তৌ(জাগরিতস্থানে) অপি তু(পুনঃ) অন্তঃ(শরীরমধ্যে) চেতসা(মনসা) কল্পিতং(রজ্জুসর্পাদি) অসৎ; বহিঃ(বহির্দেশে) চেতো- গৃহীতং(চেতসা ইন্দ্রিয়দ্বারা জ্ঞাতং) তু(পুনঃ) সৎ।[অতঃ] এতয়োঃ (অন্তর্ব্বহিঃকল্পিতয়োঃ) বৈতথ্যং(মিথ্যাত্বং) যুক্তং(যুক্তিসম্মতম্)।

জাগ্রৎ অবস্থায়ও অন্তরে মনঃসঙ্কল্পিত বিষয় অসৎ; আর বহির্দেশে মনের দ্বারা পরিজ্ঞাত বিষয় সৎ। অতএব, এই উভয়েরই মিথ্যাত্ব হওয়া যুক্তি- সম্মত ॥ ৩৯ ॥ ১০

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

সদসতোর্ব্বৈতথ্যং যুক্তম্; অন্তর্ব্বহিশ্চেতঃকল্পিতত্বাবিশেষাদিতি। ব্যাখ্যাত- মন্যৎ ॥ ৩৯ ॥ ১০

* তাৎপর্য্য—পদার্থের সৎ, অসৎ বিভাগ জগতে প্রসিদ্ধ আছে; তন্মধ্যে স্বপ্নকালে যে সমস্ত পদার্থ কেবলই মনের কল্পনাবশে দেখা যায়, সে সমস্তই অসৎ; আর বাহিরে যে সমস্ত পদার্থ ইন্দ্রিয়-সাহায্যে জানা যায়, তৎসমুদয় সৎ। এইরূপ জাগ্রৎকালেও মনঃকল্পিত রজ্জু-সর্পাদি অসৎ, আর বাহ্য ঘটপদাদি সৎ; প্রকৃত পক্ষে বাহিরে ও অন্তরে সমস্তই মনঃকল্পিত, সুতরাং অসৎ।

৮৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ভাষ্যানুবাদ

সৎ ও অসৎ উভয়েরই মিথ্যাত্ব যুক্তিসম্মত; কেন না অন্তরে ও বাহিরে, উভয়স্থানেই চিত্তপরিকল্পনার কিছুমাত্র বিশেষ নাই। অন্য অংশ পূর্ব্বেই ব্যাখ্যাত হইয়াছে ॥ ৩৯ ॥ ১০

উভয়োরপি বৈতথ্যং ভেদানাং স্থানয়োর্ব্বদি।

ক এতান্ বুধ্যতে ভেদান্ কো বৈ তেষাং বিকল্পকঃ ॥ ৪০ ॥ ১১ সরলার্থঃ

[পূর্ব্বপক্ষী বৈতথ্যমাক্ষিপন্ আহ—“উভয়োঃ” ইত্যাদি।]—যদি(সম্ভাব- নায়াং) উভয়োঃ স্থানয়োঃ(স্বপ্ন-জাগরয়োঃ) অপি ভেদানাং(পদার্থানাং) বৈতথ্যং(মিথ্যাত্বং)[স্যাৎ];[তর্হি] কঃ(পুরুষঃ) এতান্ ভেদান্ (পদার্থান্) বুধ্যতে(অনুভবতি), কঃ বৈ(বা) তেষাং(পদার্থানাং) বিকল্পকঃ (কল্পনালম্বনং)[ভবেৎ]।

দৃশ্যমান পদার্থসমূহ যদি উভয় স্থানেই(স্বপ্নে ও জাগরণে) মিথ্যা হয়, তাহা হইলে কে-ই বা এ সমস্ত উপলব্ধি করে? এবং কে-ই বা সে সমস্তের কল্পনা করে? ॥ ৪০ ॥ ১১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

চোদক আহ—স্বপ্নজাগ্রৎস্থানয়োর্ভেদানাং যদি বৈতথ্য্যং, ক এতান্ অন্তর্ব্বহিঃ চেতঃ-কল্পিতান্ বুধ্যতে? কো বৈ তেষাং বিকল্পকঃ স্মৃতিজ্ঞানয়োঃ ক আলম্বনম্? ইত্যভিপ্রায়ঃ; ন চেন্নিরাত্মবাদ ইষ্টঃ ॥ ৪০ ॥ ১১

ভাষ্যানুবাদ

পূর্ব্বপক্ষকারী বলিতেছেন—স্বপ্ন ও জাগরণ, এই উভয় স্থানেই যদি পদার্থসমূহের মিথ্যাত্ব হয়,[তাহা হইলে] অন্তরে ও বাহিরে মনঃকল্পিত এই অনন্ত পদার্থরাশি অনুভব করে কে? এবং সে সমস্তের কল্পনাকারীই বা কে? অভিপ্রায় এই যে, উক্ত স্মরণ ও অনুভবের অবলম্বন বা বিষয় কে? নচেৎ নিরাত্মবাদ অর্থাৎ অসদ্- বাদই স্বীকার করিতে হয় * ॥ ৪০ ॥ ১১

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ৮৫

কল্পয়ত্যাত্মনাত্মা দেবঃ স্বমায়য়া।

স এব বুধ্যতে ভেদানিতি বেদান্তনিশ্চয়ঃ ॥ ৪১ ॥ ১২

সরলার্থঃ[ অথ সিদ্ধান্তী স্বমতসিদ্ধয়ে তৎপ্রক্রিয়ামাহ—“কল্পয়তি” ইত্যাদি। —দেবঃ (প্রকাশস্বভাবঃ) আত্মা স্বমায়য়া(আত্মনঃ মায়াশক্ত্যা) আত্মনা(স্বয়মেব) আত্মানং কল্পয়তি(ভেদাকারেণ ব্যবস্থাপয়তি); সঃ(আত্মা) এব(নিশ্চয়ে) ভেদান্(পদার্থান্) বুধ্যতে(অনুভবতি), ইতি(এষঃ) বেদান্তনিশ্চয়ঃ (বেদান্তসিদ্ধান্তঃ)। এখন সিদ্ধান্তবাদী স্বমত সমর্থনের জন্য বলিতেছেন—স্ব প্রকাশ আত্মা স্বীয় মায়াপ্রভাবে আপনিই আপনাকে[বিভিন্ন পদার্থাকারে] কল্পিত করেন; এবং তিনিই আবার সেই সকল পদার্থ অনুভব করেন; ইহাই বেদান্তের সিদ্ধান্ত ॥ ৪১ ॥ ১২

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

স্বয়ং স্বমায়য়া স্বমাত্মানমাত্মা দেব আত্মন্যেব বক্ষমাণং ভেদাকারং কল্পয়তি রজ্জাদাবিব সর্পাদীন্; স্বয়মেব চ তান্ বুধ্যতে ভেদান্ তদ্বদেব; ইত্যেবং বেদান্তনিশ্চয়ঃ। নাহন্যোহস্তি জ্ঞান-স্মৃত্যাশ্রয়ঃ। ন চ নিরাস্পদে এব জ্ঞান-স্মৃতী বৈনাশিকানামিবেত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৪১ ॥ ১২

ভাষ্যানুবাদ

প্রকাশমান আত্মা স্বীয় মায়াপ্রভাবে রজ্জু-প্রভৃতিতে সর্পাদির ন্যায় আপনিই আপনাকে বক্ষ্যমাণ ভেদাকারে(পদার্থাকারে) কল্পনা করেন, এবং সেইরূপ নিজেই সে সমস্ত বিশেষ বিশেষ পদার্থের অনুভব করিয়া থাকেন। এইরূপই বেদান্তের স্থির সিদ্ধান্ত। জ্ঞান ও স্মৃতির আশ্রয় অপর কেহ নাই। অভিপ্রায় এই যে, শূন্যবাদী বৌদ্ধদিগের ন্যায় জ্ঞান ও স্মৃতি যে নিরাশ্রয়ই হইয়া থাকে, তাহাও নহে ॥ ৪১ ॥ ১২

এবং জগৎকর্তা ঈশ্বর, এই উভয়ই যদি মিথ্যা হইল, তাহা হইলেত প্রমাতা, প্রমেয়, প্রমাণ, এ সমস্তই অসৎ হইয়া পড়িল; আর এ সকলের অভাব স্বীকার করিলেত ফলতঃ নৈরাত্ম্যবাদই অঙ্গীকার করিতে হয়, অর্থাৎ আত্মার পর্য্যন্ত অসত্ত্ব স্বীকার করিতে হয়। অথচ আত্মার অস্তিত্ব অস্বীকার করা সম্ভব হয় না; কেন না, আত্মা না থাকিলে অন্যের অস্তিত্ব নিরাস করিবে কে? যিনিই বস্তুসত্তা প্রত্যাখ্যান করিতে বসিবেন, তাঁহাকেইত আত্মা বলিয়া মানিতে হইবে, সুতরাং নৈরাত্ম্যবাদ স্বীকার করা কিছুতেই সম্ভবপর হয় না।

৮৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

বিকরোত্যপরান্ ভাবানন্তশ্চিত্তে ব্যবস্থিতান্। নিয়তাংশ বহিশ্চিত্ত এবং কল্পয়তে প্রভুঃ॥ ৪২॥ ১৩

সরলার্থঃ

প্রভুঃ(ঈশ্বরঃ আত্মা) অন্তঃ(শরীরমধ্যে) চিত্তে(মনসি) ব্যবস্থিতান্ (সংস্কারত্মনা অবস্থিতান্—মনোরথকল্পিতান্ ইতি যাবৎ) অপরান্ ভাবান্ (শব্দাদীন্ পদার্থান্) বিকরোতি(বিবিধাকারেণ কল্পয়তি); এবং(তথা) বহিশ্চিত্তঃ(বহির্দেশে চিত্তং যস্য, স তথোক্তঃ সন্) নিয়তান্(নিয়তবৃত্তীন্ পৃথিব্যাদীন্) চ(অপি)[চকারাৎ অনিয়তবৃত্তীন্ চ] কল্পয়তে(সৃজতি)।

প্রভু ঈশ্বর সংস্কাররূপে চিত্তমধ্যস্থিত অপরাপর পদার্থসমূহ বিবিধাকারে কল্পনা করেন। আবার বহির্দেশে চিত্ত-সমাবেশ করিয়া স্বতঃসিদ্ধ ও অনিয়ত পদার্থ-সমূহ কল্পনা করিয়া থাকেন ॥ ৪২ ॥ ১৩

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

সঙ্কল্পয়ন্ কেন প্রকারেণ কল্পয়তীত্যুচ্যতে—বিকরোতি নানা করোত্যপরান্ লৌকিকান্ ভাবান্ পদার্থান্ শব্দাদীন্ অন্যাংশ অন্তশ্চিত্তে বাসনারূপেণ ব্যবস্থিতান্ অব্যাকৃতান্ নিয়তাংশ পৃথ্যাদীন্ অনিয়তাংশ কল্পনাকালান্ বহিশ্চিত্তঃ সন্। তথা অন্তশ্চিতো মনোরথাদিলক্ষণান্ ইত্যেবং কল্পয়তি, প্রভুঃ ঈশ্বর আত্মেত্যর্থঃ ॥৪২॥১৩

ভাষ্যানুবাদ

সঙ্কল্পকারী কি প্রকারে কল্পনা করে, তাহা কথিত হইতেছে— প্রভু—ঈশ্বর অর্থাৎ আত্মা বহিশ্চিত্ত অর্থাৎ বহির্মুখ হইয়া লোক- প্রসিদ্ধ শব্দাদি ভাব-সমূহকে—পদার্থ-সমূহকে এবং আরও যে সমস্ত পদার্থ সংস্কাররূপে অব্যক্তাবস্থায় মনোমধ্যে অবস্থিত আছে, সেই সমুদয় নিয়ত(স্থিরতর) পৃথিব্যাদি ও অনিয়ত অর্থাৎ জ্ঞানসমকাল- বর্তী(যতক্ষণ প্রতীতি, ততক্ষণ যাহাদের স্থিতি, সেই সকল বিদ্যুৎ প্রভৃতি) পদার্থ-সমূহ বিশেষরূপে করিয়া থাকেন—নানাকারে কল্পনা করিয়া থাকেন। সেইরূপ অন্তশ্চিত্ত অর্থাৎ অন্তর্দৃষ্টি অলম্বনপূর্ব্বক মনোরথাদি বিষয়সমূহ এইরূপে কল্পনা করিয়া থাকেন ॥ ৪২ ॥ ১৩ *

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ৮৭

চিত্তকালা হি যেহন্তস্তু দ্বয়কালাশ্চ যে বহিঃ। কল্পিতা এব তে সর্ব্বে বিশেষো নান্যহেতুকঃ ॥ ৪৩॥ ১৪

সরলার্থঃ

[ভূয়োহপি পদার্থানাং কল্পিতত্বং সমর্থয়তে—“চিত্তকালা” ইতি]। যে তু অন্তঃ(অন্তঃকরণে) চিত্তকালাঃ(জ্ঞানসমকালবর্তিনঃ), যে চ[অপি] বহিঃ (বহির্দেশে) দ্বয়কালাঃ(উভয়কালপরিদৃশ্যাঃ)[পদার্থাঃ], তে সর্ব্বে এব (অবধারণে) কল্পনাঃ(কল্পিতত্বাৎ অসত্যা ইতি ভাবঃ)। অন্যহেতুকঃ(হেত্ব- ন্তরসাধ্যঃ) বিশেষঃ(পার্থক্যং) ন[অস্তি]।

অন্তঃকরণস্থিত যে সমস্ত বিষয় চিত্তকাল অর্থাৎ যতক্ষণ জ্ঞান, ততক্ষণ বর্তমান থাকে, এবং বাহিরে যে সমস্ত পদার্থ দ্বয়কাল অর্থাৎ জ্ঞান ও বিষয়, উভয়েরই তুল্য কাল স্থায়ী; সে সমস্ত পদার্থ ই কল্পিত(মনের কল্পনা-প্রসূত); ইহাদের বৈলক্ষণ্যের অর্থাৎ আন্তর পদার্থ অসত্য, আর বাহ্য পদার্থ সত্য, এইরূপ বিশেষ কল্পনার অপর কোনও হেতু নাই ॥ ৪৩॥ ১৪

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

স্বপ্নবচ্চিত্তপরিকল্পিতং সর্বমিত্যেতদাশঙ্ক্যতে, - যস্মাচ্চিত্তপরিকল্পিতৈৰ্ম্মনো- রথাদিলক্ষণৈশ্চিত্তপরিচ্ছেদ্যৈর্ব্বলক্ষণ্যং বাহ্যানামন্যোন্যপরিচ্ছেদ্যত্বমিতি, সা ন যুক্তা আশঙ্কা। চিত্তকালা হি যেহন্তস্তু চিত্তপরিচ্ছেদ্যাঃ, নান্যঃ চিত্তকালব্যতিরেকেণ পরিচ্ছেদকঃ কালো যেষাং তে চিত্তকালাঃ; কল্পনাকাল এবোপলভ্যন্ত ইত্যর্থঃ। দ্বয়কালাশ্চ ভেদকালা অন্যোন্যপরিচ্ছেদ্যাঃ; যথা আগোদোহনমাস্তে, যাবদাস্তে, তাবৎ গাং দোগ্ধি, যাবদগাং দোগ্ধি, তাবদাস্তে; তাবানয়ম্ এতাবান্ সঃ ইতি পরস্পর-পরিচ্ছেদ্য-পরিচ্ছেদকত্বং বাহানাং ভেদানাং, তে দ্বয়কালাঃ। অন্তশ্চিত্ত-

নামরূপাভ্যামব্যক্তরূপেণ স্থিতান্ দ্রষ্টব্যপদার্থান্ প্রথমং সিসৃক্ষিতাকারেণ অন্ত- বিভাব্য পশ্চাৎ বহিঃ সর্ব্বপ্রতিপত্তৃ-সাধারণরূপেণ সম্পাদয়তি ইতি কল্পনায়াং ক্রমাধিগতিরিতি।[আনন্দগিরিঃ] ইহার মর্মার্থ এই যে,—সচরাচর দেখিতে পাওয়া যায় যে, কুম্ভকার কিংবা তন্তবায় যখন ঘট বা বস্ত্র নির্মাণ করিতে ইচ্ছুক হয়, তখন প্রথমেই ব্যবহার-যোগ্য ঘট বা বস্ত্রের আকৃতি বুদ্ধিতে স্থাপন করে; শেষে বুদ্ধিপরিকল্পিত সেই ঘট ও বস্ত্রকেই বাহিরে—ব্যবহারক্ষেত্রে আবিষ্কৃত করে এবং তাহাতে ‘ঘট’ ও ‘বস্ত্র’ ইত্যাদি নাম যোজনা করে। এইরূপ আদিকর্তা পরমেশ্বরও প্রথমে স্রষ্টব্য জগতের সূক্ষ্ম আকৃতিটি মায়ারূপ অন্তঃকরণে সঙ্কলন করিয়া—শেষে উপযুক্ত নাম ও স্থূল আকৃতি-সম্পন্নভাবে বাহিরে প্রকটিত করেন মাত্র।

৮৮ কারিকোপেত মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

কালা বাহ্যাশ্চ দ্বয়কালাঃ কল্পিতা এব তে সর্ব্বে। ন বাহ্যো দ্বয়কালত্ববিশেষঃ কল্পিতত্বব্যতিরেকেণান্যহেতুকঃ। অত্রাপি হি স্বপ্নদৃষ্টান্তো ভবত্যেব ॥ ৪৩ ॥ ১৪ ভাষ্যানুবাদ

সমস্ত জগৎই স্বপ্নের ন্যায় মানস-সংকল্পমাত্র, এই সিদ্ধান্তের উপর আশঙ্কা হইতেছে—যেহেতু কেবলই চিত্তপরিকল্পিত এবং চিত্তমধ্যে পরিচ্ছিন্ন, মনোরথাদির সহিত বাহ্য পদার্থসমূহের পরস্পর- পরিচ্ছেদ্যত্বরূপ বৈলক্ষণ্য রহিয়াছে;[অতএব স্বপ্নের ন্যায় মিথ্যা হইতে পারে না।] এই আশঙ্কা যুক্তিযুক্ত নহে; কেন না, অন্তঃস্থিত যে সমুদয় পদার্থ ‘চিত্তকাল’ অর্থাৎ চিত্তবৃত্তির অতিরিক্ত কোনকালই যে সকলের পরিচ্ছেদক হয় না, তাহারাই ‘চিত্তকাল’-পদবাচ্য। অভিপ্রায় এই যে, মনে মনে যতক্ষণ কল্পনা থাকে, ততক্ষণই সে সকলের উপলব্ধি হয়, এবং কল্পনার অবসানের সঙ্গে সঙ্গে ফুরাইয়া যায়। আর যে সমস্ত পদার্থ দ্বয়কাল—ভেদকালীন অর্থাৎ পরস্পর পরস্পরের দ্বারা পরিচ্ছেদার্হ; যেমন ‘গোদোহন-কাল পর্য্যন্ত আছে’, বলিলে বুঝা যায় যে, ইনি যতক্ষণ আছেন, ততক্ষণ গোদোহন করিতেছে, আর যতক্ষণ গোদোহন করিতেছে, ততক্ষণ ইনি আছেন; ‘ইহা সেই পরিমাণ, তাহাও এই পরিমাণ’, এইরূপে পরস্পরেই পরস্পরের ব্যবচ্ছেদ বা অপর হইতে পৃথকৃত হইয়া থাকে; এই জাতীয় পদার্থসমুহই ‘দ্বয়কাল’ পদবাচ্য। অভ্যন্তরস্থ চিত্তসমকালীন এবং বহির্দেশস্থ দ্বয়কালীন, এ সমস্তই কল্পিত; কিন্তু বাহ্য পদার্থ যে কালদ্বয়ত্বগত বিশেষ-বিশিষ্ট, কল্পনা ব্যতীত তাহার অপর কোনও কারণ নাই। অতএব এ বিষয়ে স্বপ্ন-দৃষ্টান্ত অবশ্যই প্রদর্শিত হইতে পারে ॥ ৪৩ ॥ ১৪

অব্যক্তা এব যেহন্তস্ত স্ফুটা এব চ যে বহিঃ। কল্পিতা এব তে সর্ব্বে বিশেষস্বিন্দ্রিয়ান্তরে ॥ ৪৪ ॥ ১৫

সরলার্থঃ

অন্তঃ(অন্তঃকরণে বাসনারূপেণ স্থিতাঃ) যে এব ভাবাঃ(পদার্থাঃ অব্যক্তাঃ (অস্ফুটাঃ), যে এব চ(অপি) বহিঃ স্ফুটাঃ(চক্ষুরাদীন্দ্রিয়গ্রাহ্যাঃ), তে সর্ব্বে

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ৮৯

এব(অবধারণে) কল্পিতাঃ(চিত্তসংকল্পজাঃ)।[তেষাং] বিশেষঃ(বৈলক্ষণ্যং) তু(পুনঃ) ইন্দ্রিয়ান্তরে(ইন্দ্রিয়ভেদে)[ভবতীতি শেষঃ]।

অন্তঃকরণে বাসনারূপে অবস্থিত যে সমস্ত পদার্থ অব্যক্ত বা অপরিস্ফুট, আর বহির্দেশে যে সমস্ত বিষয় সুস্পষ্টরূপে[প্রকাশ পায়], তৎসমস্তই চিত্তের কল্পিত;(গ্রহণোপযোগী) ইন্দ্রিয়ভেদে কেবল ভেদের প্রতীতি হয় মাত্র ॥ ৪৪ ॥ ১৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যদ্যপি অন্তরব্যক্তত্বং ভাবানাং মনোবাসনামাত্রাভিব্যক্তানাং, স্ফুটত্বং বা বহিশ্চক্ষুরাদীন্দ্রিয়ান্তরে বিশেষঃ, নাসৌ ভেদানাম্ অস্তিত্বকৃতঃ, স্বপ্নেহপি তথা দর্শনাৎ। কিন্তর্হি? ইন্দ্রিয়ান্তরকৃত এব। অতঃ কল্পিতা এব জাগ্রদ্ভাবা অপি স্বপ্নভাববদিতি সিদ্ধম্ ॥ ৪৪ ॥ ১৫

ভাষ্যানুবাদ

অন্তঃকরণে কেবল বাসনাবলে অভিব্যক্ত পদার্থসমূহের যদিও অব্যক্ততা(অস্ফুটতা) আছে, আর বহির্দেশে চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয় বিশেষ দ্বারা গৃহীত হয় বলিয়া স্ফুটত্বরূপে বিশেষ দৃষ্ট হইয়া থাকে; ইহা যে, পদার্থসমূহের অস্তিত্বের ফল, তাহা নহে; কেন না, স্বপ্নেও ঐরূপ দেখা যায়। পরন্তু ইহা কেবল বিভিন্ন ইন্দ্রিয় দ্বারা সম্পাদিত হয় মাত্র; অতএব জাগ্রৎকালীন পদার্থ-সমূহও স্বপ্নবৎ কল্পিতই (বাস্তবিক নহে) ॥ ৪৪॥ ১৫

জীবং কল্পয়তে পূর্ব্বং ততো ভাবান্ পৃথগ্‌বিধান্। বাহ্যানাধ্যাত্মিকাংশৈব যথাবিদ্যস্তথাস্মৃতিঃ॥ ৪৫॥ ১৬

সরলার্থঃ

[ তত্র কল্পনাপ্রকারমাহ—জীবমিতি।]—পূর্ব্বং(প্রথমং) জীবং(অহং করোমি, অহং সুখী ইত্যাদিলক্ষণং) কল্পয়তে; ততঃ(অনন্তরং) বাহ্যান্ (শব্দাদীন্) আধ্যাত্মিকান্(প্রাণাদীন্) চ(অপি) পৃথগবিধান্(নানারূপান্) ভাবান্(ক্রিয়া-কারক-ফলাত্মকান্)[কল্পয়তে]।[অয়ং চ জীবঃ] যথাবিদ্যঃ (যথা যাদৃশী বিদ্যা জ্ঞানং যস্য, সঃ তথোক্তঃ), তথাস্মৃতিঃ(তথা তাদৃশী স্মৃতিঃ যস্য, সঃ তথোক্তঃ)[ভবতি]।

প্রথমতঃ ‘আমি কর্ত্তা, সুখী দুঃখী’ ইত্যাদি ভাবাপন্ন জীবের কল্পনা করা হয়;

৯০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

অনন্তর নানাবিধ বাহ্যশব্দাদি ও আধ্যাত্মিক প্রাণাদি বিষয়সমূহ কল্পনা করা হয়। উক্ত জীব যাদৃশ বিজ্ঞান প্রাপ্ত হয়, তাদৃশই স্মৃতি লাভ করে ॥ ৪৫ ॥ ১৬

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

বাহ্যাধ্যাত্মিকানাং ভাবানাম্ ইতরেতর-নিমিত্ত-নৈমিত্তিকতয়া কল্পনায়াঃ কিং মূলমিতি। উচ্যতে—জীবং হেতুফলাত্মকম্, ‘অহং, করোমি, মম সুখদুঃখে’ ইত্যেবংলক্ষণম্। অনেবংলক্ষণ এব শুদ্ধে আত্মনি রজ্জামিব সর্পং কল্পয়তে পূর্ব্বম্। ততস্তাদর্থ্যেন ক্রিয়া-কারক-ফলভেদেন প্রাণাদীন্ নানাবিধান্ ভাবান্ বাহ্যান্ আধ্যাত্মিকংশ্চৈব কল্পয়তে। তত্র কল্পনায়াং কো হেতুরিতি, উচ্যতে— যোহসৌ স্বয়ংকল্পিতো জীবঃ সর্ব্বকল্পনায়ামধিকৃতঃ, স যথাবিদ্যঃ যাদৃশী বিদ্যা বিজ্ঞানমস্যেতি যথাবিদ্যঃ, তথাবিধৈব স্মৃতিস্তস্য, ইতি তথাস্মৃতির্ভবতি স ইতি। অতো হেতুকল্পনাবিজ্ঞানাৎ ফলবিজ্ঞানং, ততো হেতুফলস্মৃতিঃ, ততস্তদ্বজ্ঞান- তদর্থক্রিয়া-কারক-তৎফলভেদবিজ্ঞানানি। তেভ্যস্তৎস্মৃতিঃ, তৎস্মৃতেশ্চ পুনস্ত- দ্বিজ্ঞানানি, ইত্যেবং বাহ্যান্ আধ্যাত্মিকাংশ ইতরেতরনিমিত্তনৈমিত্তিকভাবেন অনেকধা কল্পয়তে ॥ ৪৫ ॥ ১৬

ভাষ্যানুবাদ

বাহ্য ও আধ্যাত্মিক বিষয়সমূহের কল্পনার মূল কারণ কি? [তাহা] বলা হইতেছে—‘আমি করিতেছি’ ‘আমার সুখ দুঃখ’ ইত্যাকার-লক্ষণান্বিত, হেতু-ফলাত্মক জীবকে, সুখদুঃখাদি-বিরহিত বিশুদ্ধ আত্মার রজ্জুতে সর্পকল্পনার ন্যায়, কল্পনা করা হয়। অনন্তর সেই জীবভোগার্থ, ক্রিয়াকারক-ফলভেদে বিভিন্নপ্রকার বাহ্য ও আধ্যাত্মিক প্রাণাদি পদার্থ-সমূহকেও নিশ্চিতরূপে কল্পনা করা হয়। সেই কল্পনার হেতু কি? তাহা বলা হইতেছে—এই যে স্বয়ংকল্পিত এবং সমস্ত কল্পনার অধিকারপ্রাপ্ত জীব, সেই জীব যথাবিদ্য হয় অর্থাৎ যাহার যে প্রকার বিদ্যা জ্ঞান, সে সেইরূপই স্মৃতিসম্পন্ন হইয়া থাকে। অতএব, বুঝিতে হইবে, প্রথমে হেতুকল্পনার জ্ঞান, তাহা হইতেই তৎফলের জ্ঞান হয়, তাহার পর হেতুফলের স্মরণ, তাহার পর তবিষয়ক জ্ঞান, তদর্থ ক্রিয়া, কারক ও ফল-বিশেষের জ্ঞান হইয়া থাকে। পুনশ্চ সেই সমস্ত কারণ এবং তবিষয়ক স্মৃতি হইতে বিজ্ঞানসমূহ সমুৎপন্ন হইয়া থাকে, আবার সেই জ্ঞান হইতে স্মৃতি,

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ৯১

এবং স্মৃতি হইতে আবার জ্ঞান সমুৎপন্ন হয়, এই প্রকারে পরস্পর কার্য্য-কারণভাবে সম্পন্ন বাহ্য ও আধ্যাত্মিক ভাবসমূহ নানা রকমে কল্পনা করা হইয়া থাকে ॥ ৪৫ ॥ ১৬

অনিশ্চিতা যথা রজ্জুরন্ধকারে বিকল্পিতা। সর্পধারাদিভির্ভৈস্তদ্বদাত্মা বিকল্পিতঃ॥ ৪৬॥ ১৭

সরলার্থঃ

অন্ধকারে অনিশ্চিতা(‘ইদমিখমেব’ ইতি নিশ্চয়রহিতা) রজ্জুঃ যথা সর্প- [জল-] ধারাদিভিঃ ভাবৈঃ(পদার্থাকারেণ) বিকল্পিতা(কল্পিতা)[ভবতি], আত্মা(জীবঃ)[অপি] তদ্বৎ(তথা) বিকল্পিতঃ(নানাকারেণ কল্পনাবিষয়ো ভবতি)।

‘ইহা অমুকই’ এইরূপ নিশ্চয়রহিত রজ্জুই যেমন অন্ধকারমধ্যে সর্প ও জলধারাদি নানা আকারে কল্পিত হয়, আত্মা জীবও তেমনি[নানারূপে] বিকল্পিত হইয়া থাকে। ৪৬॥ ১৭

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

তত্র জীবকল্পনা সর্ব্বকল্পনামূলমিত্যুক্তং, সৈব জীবকল্পনা কিংনিমিত্তেতি দৃষ্টান্তেন প্রতিপাদয়তি,—যথা লোকে স্বেন রূপেণ অনিশ্চিতা অনবধারিতা ‘এবমেব’ ইতি, রজ্জুঃ মন্দান্ধকারে কিং সর্পঃ উদকধারা দণ্ডঃ? ইতি বা অনেকধা বিকল্পিতা ভবতি—পূর্ব্বং স্বরূপানিশ্চয়নিমিত্তম্। যদি হি পূর্ব্বমেব রজ্জুঃ স্বরূপেণ নিশ্চিতা স্যাৎ, ন সর্পাদিবিকল্পোহভবিষ্যৎ, যথা স্বহস্তাঙ্গুল্যাদিষু; এষ দৃষ্টান্তঃ। তদ্ধেতুফলাদিসংসারধর্মানর্থবিলক্ষণতয়া স্বেন বিশুদ্ধবিজ্ঞপ্তিমাত্র- সত্ত্বাদ্বয়রূপেণানিশ্চিতত্বাৎ জীবপ্রাণাদ্যনন্তভাবভেদৈরাত্মা বিকল্পিতঃ, ইত্যেষ সর্ব্বো- পনিষদাং সিদ্ধান্তঃ ॥ ৪৬ ॥ ১৭

ভাষ্যানুবাদ

জীবকল্পনাই যে, সমস্ত কল্পনার মূল, এ কথা উক্ত হইয়াছে। সেই জীবকল্পনারই বা মূল কি? তাহা দৃষ্টান্ত দ্বারা সমর্থন করিতেছেন—জগতে[দেখিতে পাওয়া যায়] ‘ইহা এইরূপই’ এই ভাবে স্বীয় প্রকৃত স্বরূপে অনিশ্চিত—যাহার অবধারণ করা হয় নাই, সেই অনিশ্চিত রজ্জু যেরূপ অল্প অন্ধকারে ‘ইহা কি সর্প? কিংবা জলধারা? অথবা দণ্ড?’ ইত্যাদি অনেক প্রকারে কল্পিত হয়;

৯২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

তৎপূর্ব্বে রজ্জুর স্বরূপ না জানা থাকাই উহার কারণ; কেন না, পূর্ব্বেই যদি রজ্জুর স্বরূপ নিশ্চিত থাকিত, তাহা হইলে স্বীয় হস্তাঙ্গুলী প্রভৃতির ন্যায় উহাতেও কখনই সর্পাদির কল্পনা হইতে পারিত না! উক্ত দৃষ্টান্ত যেরূপ, ঠিক সেইরূপ, প্রোক্ত হেতু-ফলাদি সংসার-ধৰ্ম্মময় অনর্থ হইতে বিলক্ষণ স্বীয় বিশুদ্ধ জ্ঞানময় অদ্বিতীয় সত্তারূপী আত্মাকে জানা না থাকায়ই জীব, প্রোণাদি অনন্তপ্রকার ভেদে বিকল্পিত হইয়া থাকে। ইহাই সমস্ত উপনিষদের সিদ্ধান্ত ॥ ৪৬ ॥ ১৭

নিশ্চিতায়াং যথা রজ্জাং বিকল্পো বিনিবর্ত্ততে। রজ্জুরেবেতি চাদ্বৈতং তদ্বদাত্ম-বিনিশ্চয়ঃ ॥ ৪৭ ॥ ১৮ সরলার্থঃ

রজ্জাৎ যথা ‘রজ্জুঃ এব[ন সর্পঃ]’ ইতি(ইত্থং) নিশ্চিতায়াং(নিঃসংশয়ম্ অবধারিতায়াং সত্যাং) বিকল্পঃ(ভূ-রেখা-জলধারা-সর্পাদি-বিতর্কঃ) বিনিবর্ততে (বিশেষেণ নিবর্ততে),[ততশ্চ] ‘রজ্জুরেব’ ইতি অদ্বৈতং(বিতর্কাভাবাৎ কেবলীভাবঃ) চ(অপি)[সম্পদ্যতে], আত্মনিশ্চয়ঃ(আত্মনঃ অসংসারিত্বাদ্য- ধ্যবসায়ঃ)[অপি] তদ্বৎ তথৈব) ইত্যর্থঃ ॥

‘ইহা রজ্জুই অপর কিছু নহে’ এইরূপে রজ্জুনিশ্চয় হইলে পর যেমন[রজ্জু- গত][সর্পাদি] বিতর্ক নিবৃত্ত হইয়া যায়, এবং কেবলই রজ্জুর অদ্বৈত অর্থাৎ রজ্জুত্বমাত্র স্ফূর্ত্তি পায়, আত্মতত্ত্ব-নিশ্চয়ও তেমন-ই ॥ ৪৭ ॥ ১৮

শাঙ্কর-ভাষ্যম্ রজ্জুরেবেতি নিশ্চয়ে সর্ব্ববিকল্পনিবৃত্তৌ রজ্জুরেবেতি চাদ্বৈতং যথা, তথা ‘নেতি নেতি‘ইতি সর্ব্বসংসারধর্ম্মশূন্য-প্রতিপাদকশাস্ত্রজনিত-বিজ্ঞানসূর্য্যালোক-কৃতাত্মবি- নিশ্চয়ঃ “আত্মৈবেদং সর্ব্বং, অপূর্ব্বোহনপরোহনন্তরোহবাহ্যঃ সবাহ্যাভ্যন্তরো হ্যজো- হজরোহমরোহমৃতোহভয় এক এবাদ্বয়ঃ” ইতি ॥ ৪৭ ॥ ১৮

ভাষ্যানুবাদ

‘ইহা রজ্জুই,’ এইরূপ নিশ্চয় জ্ঞানের পর সর্পাদি-বিতর্ক নিবৃত্ত হইয়া গেলে, যেরূপ ‘রজ্জুই’[অপর কিছু নহে] এইরূপে রজ্জুর অদ্বিতীয় ভাব(কেবল রজ্জুত্ব)[স্ফূর্ত্তি পাইয়া থাকে]; তদ্রূপ [আত্মার] সর্বপ্রকার সংসারধর্ম্ম-(সুখদুঃখাদি)-শূন্যতা-প্রতিপাদক

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ৯৩

‘ইহা আত্মা নহে, ইহা আত্মা নহে’ ইত্যাদি শাস্ত্র-সমুৎপাদিত বিজ্ঞানরূপ সূর্যালোকের সাহায্যে এইরূপ আত্মনিশ্চয় হয় যে, ‘আত্মাই এই সমস্ত,[আত্মার] কারণ নাই, কার্য্য নাই, অন্তর নাই, বাহির নাই, জন্ম নাই, জরা নাই,[সুতরাং] আত্মা বাহ্যাভ্যন্তরবর্তী অমৃত, অভয়, এবং নিশ্চয়ই এক অদ্বিতীয়’ ॥ ৪৭ ॥ ১৮

প্রাণাদিভিরনন্তৈস্তু ভাবৈরেতৈর্বিকল্পিতঃ।

মাটৈষা তস্য দেবস্য যয়ায়ং মোহিতঃ স্বয়ম্ ॥ ৪৮ ॥ ১৯

সরলার্থঃ

[ আত্মা যৎ] এতৈঃ(পূর্ব্বোক্তৈঃ) প্রাণাদিভিঃ(প্রাণাদিস্বরূপৈঃ) অনন্তৈঃ (অসংখ্যেয়ৈঃ) ভাবৈঃ(পদার্থস্বরূপেণ) বিকল্পিতঃ(বিতর্ক-বিষয়তাং নীতঃ); এষা[খলু] তস্য দেবস্য(দ্যোতমানস্য আত্মনঃ) মায়া(অচিন্ত্য-শক্তিঃ); যয়া (মায়য়া) অয়ং(মায়াশ্রয়োহপি) স্বয়ং মোহিতঃ(মোহমিব নীতঃ),[নতু মোহিত এব, আত্মনঃ স্বতঃ মোহাসংসর্গিত্বাদিতি ভাবঃ] ॥

[আত্মা যে,] এই সমস্ত অসংখ্য প্রাণাদি বস্তুরূপে বিকল্পের বিষয়ীভূত হয়, ইহা কেবল সেই প্রকাশময় আত্মার মায়ামাত্র; যে মায়া দ্বারা—তিনি নিজেও যেন মোহিতই হইয়া থাকেন ॥ ৪৮ ॥ ১৯

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যদি আত্মা এক এবেতি নিশ্চয়ঃ, কথং প্রাণাদিভিরনন্তৈর্ভাবৈরেতৈঃ সংসার- লক্ষণৈর্বিকল্পিত ইতি? উচ্যতে, শৃণু—মায়ৈষা তস্যাত্মনো দেবস্য। যথা মায়াবিনা বিহিতা মায়া গগনমতিবিমলং কুসুমিতৈঃ সপলাশৈস্তরুভিরাকীর্ণমিব করোতি, তথা ইয়মপি দেবস্য মায়া, যয়া অয়ং স্বয়মপি মোহিত ইব মোহিতো ভবতি। “মম মায়া দুরত্যয়া” ইত্যুক্তম্ ॥ ৪৮ ॥ ১৯

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, ‘আত্মা একই’ এইরূপই যদি স্থির হয়, তাহা হইলে সংসার-গোচর এই প্রাণাদিরূপ অসংখ্য পদার্থাকারে বিকল্লিত হয় কিরূপে?* হাঁ, বলা হইতেছে, শ্রবণ কর—সেই প্রকাশময়ের

* আত্মা আছে কি না, জগতে এরূপ সংশয় কাহারো নাই; আপামর সকলেই জানে, আত্মা আছে, আমি আছি। তবে সংশয় হয় কেবল আত্মার স্বরূপ নিরূপণ লইয়া—আত্মা পদার্থটা কি?—উহা কি দেহ, প্রাণ, মন, অথবা বুদ্ধি, কিংবা আর কিছু? আত্মা বেচারী অনাদিকাল হইতে এইরূপ নানাবিধ বিতর্ক-

৯৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

(আত্মার) ইহা মায়া। মায়াবিপ্রযুক্ত মায়া যেরূপ বিমল গগনমণ্ডলকে পল্লব-শোভিত কুসুমিত তরুলতারাজি দ্বারাই যেন সমাচ্ছাদিত করিয়া থাকে; দ্যোতমান আত্মার মায়াও সেইরূপ— যে মায়া-প্রভাবে তিনি নিজেও মোহিত অর্থাৎ যেন মোহিতই হন। কথিতও হইয়াছে—‘আমার(ঈশ্বরের) মায়া দুরত্যয়া’ অর্থাৎ অতি কষ্টে তাহাকে অতিক্রম করা যায়। * ॥ ৪৮ ॥ ১৯

প্রাণা ইতি প্রাণবিদো ভূতানীতি চ তদ্বিদঃ। গুণা ইতি গুণবিদস্তত্ত্বানীতি চ তদ্বিদঃ ॥ ৪৯ ॥ ২০

সরলার্থঃ

[সংক্ষেপতঃ আত্মনি বিকল্পবিষয়া প্রাণাদয়ো নিৰ্দ্দিশ্যন্তে “প্রাণাঃ” ইত্যাদিভিঃ।]—প্রাণবিদঃ(প্রাণতত্ত্বচিন্তকাঃ) প্রাণা ইতি(প্রাণাপানাদি- পঞ্চকমেব আত্মা ইতি)[আহুঃ, ইতি শেষঃ]। ভূতানি[আত্মা] ইতি চ (অপি) তদ্বিদঃ(ভূত-চিন্তকাঃ); গুণাঃ(সত্ত্ব-রজস্তমাংসি আত্মা) ইতি গুণ- বিদঃ(ত্রিগুণজ্ঞাঃ), তত্ত্বানি(মহদাদিচতুর্বিংশতিসংখ্যকানি)[আত্মা] ইতি চ (অপি) তদ্বিদঃ(তত্ত্বজ্ঞাঃ)[সর্ব্বত্র ‘আহুঃ’ ইত্যস্য সম্বন্ধঃ]।

বিড়ম্বনা ভোগ করিয়া আসিতেছে; বোধ হয় সুদূর ভবিষ্যতেও উক্ত বিতর্কের আক্রমণ অতিক্রম করিয়া শান্তিলাভ করিতে পারিবে কি না, সন্দেহ। উক্তপ্রকার বিতর্ককে লক্ষ্য করিয়াই এখানে প্রাণাদি বিকল্পের কথা বলা হইয়াছে। * তাৎপর্য্য—স্বামী শঙ্করাচার্য্যের অভিমত অদ্বৈতবাদে ‘মায়া’ একটি প্রধান অবলম্বন; সুতরাং মায়া সম্বন্ধে বলিবার অনেক কথা আছে। আমরা এখানে তাহার স্থূল মর্ম্ম মাত্র প্রদান করিতেছি,—পরমাত্মা পরমেশ্বরের শক্তির নাম মায়া; পরমেশ্বর এই শক্তির প্রভাবেই জগৎ রচনা ও তাহার পরিচালনা করিয়া থাকেন, এবং এই মায়া সম্বন্ধ থাকায়ই ঈশ্বর লোকপ্রতীতির বিষয় হন। ভগবান্ নারদকে বলিয়াছেন, “মায়া হোষা ময়া সৃষ্টা যৎ মাং পশ্যসি নারদ। সর্ব্বভূত- গুণৈর্মুক্তং নৈবং মাং দ্রষ্টুমর্হসি।” অর্থাৎ হে নারদ, আমি যে মায়া সৃষ্টি করিয়াছি, তাহার প্রভাবেই তুমি আমাকে দেখিতে পাইতেছ; নচেৎ সর্ব্বপ্রকার ভূতগুণ—শব্দাদিরহিত আমাকে কখনই এইরূপ দর্শন করিতে সমর্থ হইতে পার না। মায়ার স্বরূপ সম্বন্ধে কথিত হইয়াছে যে, “ঋতেহর্থং যৎ প্রতীয়েত ন প্রতীয়েত কর্হিচিৎ। তাং বিদ্যাৎ আত্মনো মায়াৎ,” অর্থাৎ কোন বস্তুর অভাবেও যাহার প্রতীতি হয়, অথচ তত্ত্বদর্শনে কোথাও যাহার প্রতীতি হয় না; তাহাকে আত্মার মায়া বলিয়া জানিবে।

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ৯৫

প্রাণ-চিন্তকগণ বলেন, প্রাণই আত্মা; ভূতচিন্তকগণ বলেন—ভূতসমূহই [ আত্মা], গুণবিদ্গণ বলেন, সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ, এই গুণত্রয়ই[ আত্মা], আর তত্ত্ববিদগণ বলিয়া থাকেন, চতুর্বিংশতি তত্ত্বই[ আত্মা] ॥ ৪৯ ॥ ২০

পাদা ইতি পাদবিদো বিষয়া ইতি তদ্বিদঃ। লোকা ইতি লোকবিদো দেবা ইতি চ তদ্বিদঃ ॥ ৫০॥ ২১

সরলার্থঃ

পাদাঃ(বিশ্বাদয়ঃ তত্ত্বম্) ইতি পাদবিদঃ(পাদাঃ-বিশ্বাদয়ঃ আত্মনঃ অংশাঃ, তান্ যে বিদন্তি, তে পাদবিদঃ); বিষয়াঃ(ভোগারহাঃ শব্দাদয়ঃ তত্ত্বম্) ইতি তদ্বিদঃ(বিষয়সত্যতাবিদঃ বাৎস্যায়ন-প্রভৃতয়ঃ); লোকাঃ(ভূঃ ভুবঃ স্বরিতি ত্রয়ো লোকাঃ সন্তঃ) ইতি লোকবিদঃ(পৌরাণিকাঃ); দেবাঃ(অগ্নীন্দ্রাদয়ঃ এব সন্তঃ) ইতি চ তদ্বিদঃ(কর্মিণঃ)[বদন্তীতি সর্ব্বত্রান্বয়ঃ]।*

আত্মার পাদবিদ্গণ বলেন, বিশ্বাদি পাদসমূহই তত্ত্ব; বিষয়াভিজ্ঞ বাৎস্যায়ন প্রভৃতি বলেন—শব্দাদি বিষয়ই সত্য; লোকবিৎ পৌরাণিকগণ বলেন—‘ভূর্ভুবঃ স্বর্’ এই লোকত্রয়ই সত্য; এবং দেবতাভিজ্ঞ কর্ম্মিগণ বলেন—দেবতাই সত্য ॥ ৫০ ॥ ২১

বেদা ইতি বেদবিদো যজ্ঞা ইতি চ তদ্বিদঃ।

ভোক্তেতি চ ভোক্তৃবিদো ভোজ্যমিতি চ তদ্বিদঃ॥ ৫১॥ ২২ সরলার্থঃ

বেদাঃ(ঋগ্বেদাদয়ঃ তত্ত্বানি) ইতি, বেদবিদঃ(ঋগ্বেদাদিপাঠকাঃ), যজ্ঞাঃ (জ্যোতিষ্টোমাদয়ঃ তত্ত্বানি) ইতি চ তদ্বিদঃ(যাজ্ঞিকা বৌধায়নপ্রভৃতয়ঃ),

* তাৎপর্য্য—অগ্নীন্দ্রাদয়ো দেবাঃ তত্তৎফলদাতারো নেশ্বরাস্তথা, ইতি দেবতা- কাণ্ডীয়াঃ। তদপি কল্পনামাত্রম্, অস্মদাদিপ্রযত্নমপেক্ষ্য ফলদাতৃত্বে তেষাৎ ভৃত্যেভ্যো বিশেষাভাবপ্রসঙ্গাৎ, স্বাতন্ত্র্যেণোপকারকত্বে তদারাধনবৈয়র্থ্যাৎ, তদ্ভক্তানামপি বিপ্রতিপত্তিদর্শনাৎ, তৎপ্রসাদস্য অকিঞ্চিৎকরত্বাদিতি (আনন্দগিরিঃ)। ইহার মর্মার্থ এই যে, কৰ্ম্মমীমাংসকগণ বলিয়া থাকেন, অগ্নি ইন্দ্র প্রভৃতি চেতনদেবতাগণই যথাযোগ্য ফল দান করিয়া থাকেন; কিন্তু তাঁহারা ঈশ্বর নহেন। তাঁহাদের এ কথাও কেবল কল্পনামাত্র,—সত্য হইতে পারে না। কেন না, দেবতাগণ যদি আমাদের চেষ্টা অনুসারে ফলদান করেন, তাহা হইলে ভৃত্য অপেক্ষা তাঁহাদের কিছু মাত্র বিশেষ থাকে না; আর যদি আমাদের কর্মানুষ্ঠানের অপেক্ষা না করিয়া স্বেচ্ছামতেই ফল প্রদান করেন, তাহা হইলেও তাঁহাদের

৯৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ভোক্তা(ভোক্তৈব ন কর্ত্তা) ইতি ভোক্তৃবিদঃ(সাংখ্যপ্রভৃতয়ঃ), ভোজ্যং (ভোগার্হং বস্তু এব তত্ত্বম্) ইতি চ তদ্বিদঃ(ভোজনপরাঃ)[ বদন্তি]। ‡

বেদপাঠকগণ বলেন—ঋক্ প্রভৃতি বেদই প্রকৃত তত্ত্ব; যাজ্ঞিকগণ বলেন— যজ্ঞ; ভোক্তৃত্ববিৎ সাংখ্যবাদিগণ বলেন—ভোক্তাই প্রকৃত তত্ত্ব(কর্তা নহে); আর ভোগাভিজ্ঞগণ বলেন—ভোজনীয় বস্তুই প্রকৃত সত্য ॥ ৫১ ॥ ২২

সূক্ষ্ম ইতি সূক্ষ্মবিদঃ স্থূল ইতি চ তদ্বিদঃ। মুৰ্ত ইতি মুর্তবিদোহমুর্ত ইতি চ তদ্বিদঃ ॥ ৫২ ॥ ২৩

সরলার্থঃ

সূক্ষ্মঃ(অণুপরিমাণঃ) ইতি তদ্বিদঃ(পরমাণুবিদঃ); স্থূলঃ(দেহাদিরূপঃ) ইতি চ(অপি) তদ্বিদঃ(দেহাত্মপ্রত্যয়াঃ বৌদ্ধাঃ); মূর্ত্তঃ মূর্ত্তিমান্—ত্রিশূলাদি- ধারী, শঙ্খ-চক্রাদিধারী বা) ইতি মূর্ত্তবিদঃ(আগমিকাঃ); অমুৰ্ত্তঃ(শূন্যং) ইতি চ(অপি) তদ্বিদঃ(শূন্যবাদিনঃ বৌদ্ধাঃ)[ বদন্তি]।

সূক্ষ্ম পরমাণুচিন্তকগণ বলেন- সূক্ষ্ম-পরমাণুস্বরূপ; দেহাত্মপ্রত্যয়সম্পন্ন স্থূলগ্রাহিগণ বলেন-স্কুলই(দেহই) সত্য; মূর্ত্তিসেবকগণ বলেন-মূর্ত্ত-ত্রিশূলাদি- ধারী কিংবা শঙ্খ-চক্রাদিধারী মূর্ত্তিমানই তত্ত্ব; আবার অমুৰ্ত্ত-চিন্তাশীল শূন্যবাদি- গণ বলেন-অমূর্ত্তই(শূন্যই) সত্য ॥ ৫২ ॥ ২৩

কাল ইতি কালবিদো দিশ ইতি চ তদ্বিদঃ। বাদা ইতি বাদবিদো ভুবনানীতি তদ্বিদঃ ॥ ৫৩ ॥ ২৪

আরাধনার কোন আবশ্যকতা থাকে না। বিশেষতঃ দেবতা-ভক্তগণের মধ্যেও ভজনীয় দেবতার উৎকর্ষাপকর্ষ লইয়া বিবাদ দেখিতে পাওয়া যায়, তখন তাঁহাদের অনুগ্রহ বিশেষ কার্যকর নহে। * তাৎপর্য্য—জ্যোতিষ্টোমাদয়ো যজ্ঞা বস্তুভূতাঃ ভবন্তীতি বৌধায়নপ্রভৃতয়ঃ যাজ্ঞিকা মন্যন্তে; তদাপ ভ্রান্তিমাত্রম্। “যজ্ঞং ব্যাখ্যাস্যামো দ্রব্যং দেবতা ত্যাগঃ”। ইত্যত্র একস্মিন্ যজ্ঞবিজ্ঞানাভাবাৎ সমুদয়স্যাবস্তুত্বাৎ, ইত্যাহ যজ্ঞ ইতি।(আনন্দগিরিঃ)। অভিপ্রায় এই যে,—বৌধায়ন প্রভৃতি যাজ্ঞিক মনে করেন যে, জ্যোতিষ্টোমাদি যজ্ঞই যথার্থ সত্য; কিন্তু তাঁহাদের সে কথাও কেবল ভ্রান্তিমাত্র; কারণ, তাঁহারা বলেন, দ্রব্য দেবতা ও দেবতোদ্দেশে দ্রব্য-ত্যাগই যজ্ঞের প্রকৃত স্বরূপ; সুতরাং তাঁহাদের মতে এক একটির যজ্ঞত্ব নাই, সুতরাং এক একটিতে না থাকায় সমুদয়েও যজ্ঞত্ব থাকিতে পারে না।

বৈথ্য-প্রকরণম্ ৯৭

সরলার্থঃ

কালঃ(পরমার্থঃ) ইতি কালবিদঃ(জ্যোতির্ব্বিদঃ); দিশঃ(পূর্ব্বাদ্যাঃ পরমাথাঃ) ইতি চ তদ্বিদঃ(দিক্তত্ত্বজ্ঞাঃ-স্বরোদয়বিশারদাঃ); বাদাঃ(মন্ত্র- পদ-প্রভৃতয়ঃ পরমার্থাঃ) ইতি বাদবিদঃ; ভুবনানি(চতুৰ্দ্দশ লোকাঃ পরমার্থাঃ) ইতি তদ্বিদঃ(ভুবনকোষবিদঃ)[বদন্তীতি শেষঃ] ॥

কালবিৎ জ্যোতিষিগণ বলেন—কালই সত্যবস্তু; দিক্তত্ত্বজ্ঞ স্বরোদয়বিশারদ- গণ(যাঁহারা শ্বাসাদির অবস্থাদ্বারা ভবিষ্যৎ নিরূপণ করেন, তাঁহারা) বলেন— দিক্সমুহই সত্য; বাদবিদ্গণ(বস্তুর স্বভাব-বিচারকগণ) বলেন—ধাতুবাদ ও মন্ত্রবাদ প্রভৃতি বাদই সত্য; ব্রহ্মাণ্ডকোষের তত্ত্বাভিজ্ঞগণ বলেন—চতুৰ্দ্দশ ভুবনই সত্য ॥ ৫৩ ॥ ২৪

মন ইতি মনোবিদো বুদ্ধিরিতি চ তদ্বিদঃ। চিত্তমিতি চিত্তবিদো ধর্ম্মাধর্ম্মৌ চ তদ্বিদঃ ॥ ৫৪ ॥ ২৫

সরলার্থঃ

মনঃ(চিত্তমেব আত্মা) ইতি মনোবিদঃ(লোকায়তিকবিশেষাঃ); বুদ্ধিঃ (অধ্যবসায়লক্ষণমন্তঃকরণমেব আত্মা) ইতি তদ্বিদঃ(বিজ্ঞানবাদিনঃ বৌদ্ধাঃ); চিত্তং(বাহ্যাকারশূন্যং অন্তর্বিজ্ঞানমেব আত্মা) ইতি চিত্তবিদঃ(বৌদ্ধাঃ); ধৰ্মাধর্ম্মো(বিধিনিষেধগম্যে পুণ্য-পাপে সত্যভূতে) ইতি চ তদ্বিদঃ(কৰ্ম্ম- মীমাংসকাঃ)[ বদন্তি ইতি শেষঃ] ॥

মনস্তত্ত্ববিদ্গণ(একজাতীয় নাস্তিক) বলেন—মনই আত্মা; বিজ্ঞানবাদী- বৌদ্ধগণ বলেন—বুদ্ধিই আত্মা; চিত্তবিদ্গণ(যাঁহারা বাহিরে বস্তুসত্তা স্বীকার করেন না, তাঁহারা) বলেন—চিত্তই সত্য; ধর্ম্মাধর্ম্মবিশারদ কর্ম্মীমাংসকগণ বলেন —ধর্ম্ম ও অধর্ম্মই সত্য পদার্থ ॥ ৫৪ ॥ ২৫

পঞ্চবিংশক ইত্যেকে ষড়্‌বিংশ ইতি চাপরে। একত্রিংশক ইত্যাহুরনন্ত ইতি চাপরে॥ ৫৫॥ ২৬

সরলার্থঃ

একে(সাংখ্যাঃ) পঞ্চবিংশকঃ(পঞ্চবিংশতিসংখ্যকঃ প্রকৃত্যাদিগণঃ) ইতি; ষড় বিংশঃ(উক্তানি পঞ্চবিংশতিঃ ঈশ্বরশ), ইতি ষড় বিংশতি-সংখ্যা-পরিমিতো- গণঃ) ইতি চ অপরে(পাতঞ্জলাঃ);[কেচিৎ] একত্রিংশকঃ(একত্রিংশৎ-সংখ্যা- পরিমিতো গণঃ) ইতি, অপরে(বাদিনঃ) চ অনন্তঃ(অসংখ্যঃ পদার্থভেদঃ) ইতি আহুঃ(বদন্তি)।

৯৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

কেহ কেহ অর্থাৎ সাংখ্যাচার্য্যগণ বলেন—পঞ্চবিংশতি; অপরে(পাতঞ্জলগণ) বলেন, ষড়বিংশতি; কেহ কেহ বলেন, একত্রিংশৎ এবং অপর সম্প্রদায় বলেন, জাগতিক পদার্থ অনন্ত ॥ ৫৫ ॥ ২৬

লোকান্ লোকবিদঃ প্রাহুরাশ্রমা ইতি তদ্বিদঃ। স্ত্রীপুংনপুংসকং লৈঙ্গাঃ পরাপরমথাপরে॥ ৫৬॥ ২৭

সরলার্থঃ

লোকবিদঃ(লোকানুরঞ্জনপরাঃ) লোকান্(লোকপ্রসাধনমেব তত্ত্বম্ ইতি) প্রাহুঃ; তদ্বিদঃ(আশ্রমতত্ত্বজ্ঞা দক্ষপ্রভৃতয়ঃ) আশ্রমাঃ(এব পরমার্থাঃ) ইতি [প্রাহুঃ], লৈঙ্গাঃ(বৈয়াকরণাঃ) স্ত্রীপুংনপুংসকং(স্ত্রীলিঙ্গ-পুংলিঙ্গ-ক্লীবলিঙ্গক- শব্দরাশিঃ এব তত্ত্বম্ ইতি)[প্রাহুঃ]; অথ(পক্ষান্তরে) অপরে(বাদিনঃ) পরাপরং(পরাপরে ব্রহ্মণী তত্ত্বম্ ইতি)[প্রাহুঃ]।

যাঁহারা লোকানুরঞ্জনে তৎপর, তাঁহারা লোকানুরঞ্জনকেই তত্ত্ব বলিয়া নির্দেশ করেন; আশ্রমবিৎ দক্ষ প্রভৃতি আশ্রমকেই তত্ত্ব বলেন; লৈঙ্গ বৈয়াকরণগণ স্ত্রীলিঙ্গ, পুংলিঙ্গ ও ক্লীবলিঙ্গ শব্দসমূহকেই তত্ত্ব বলিয়া নির্দেশ করেন; এবং অপর সম্প্রদায় পরাপর উভয়প্রকার ব্রহ্মকেই তত্ত্ব বলিয়া ব্যাখ্যা করেন ॥ ৫৬ ॥ ২৭

সৃষ্টিরিতি সৃষ্টিবিদো লয় ইতি চ তদ্বিদঃ।

স্থিতিরিতি স্থিতিবদঃ সর্ব্বে চেহ তু সর্ব্বদা ॥ ৫৭ ॥ ২৮

সরলার্থঃ

সৃষ্টিবিদঃ(পৌরাণিকাঃ) সৃষ্টিঃ[তত্ত্বম্] ইতি; লয়ঃ(প্রলয় এব তত্ত্বং) ইতি তদ্বিদঃ(প্রলয়বিদঃ পৌরাণিকাঃ); স্থিতিবিদঃ(পৌরাণিকাঃ) স্থিতিরিতি [প্রাহুঃ]; ইহ(আত্মনি) তু(পুনঃ) সর্ব্বে(উক্তা অনুক্তা অপি) সর্ব্বদা [বর্ত্তন্তে]।

সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়বিৎ পৌরাণিকগণের মধ্যে কেহ বলেন—সৃষ্টিই পরমার্থ সৎ; কেহ বলেন—প্রলয়ই সত্য, আবার কেহ বলেন—স্থিতিই সত্য; বস্তুতঃ উক্ত অনুক্ত সমস্ত পদার্থই সর্ব্বদা এই পরমাত্মায় প্রতিষ্ঠিত ॥ ৫৭ ॥ ২৮

শাঙ্কর-ভাষ্যম

প্রাণঃ প্রাজ্ঞো বীজাত্মা, তৎকার্য্যভেদা হীতরে স্থিত্যন্তাঃ। অন্যে চ সর্ব্বে লৌকিকাঃ সর্ব্বপ্রাণিপরিকল্পিতা ভেদা রজ্জামিব সর্পাদয়ঃ তচ্ছন্যে আত্মনি আত্ম- স্বরূপানিশ্চয়হেতোঃ অবিদ্যয়া কল্পতা ইতি পিণ্ডীকৃতোহর্থঃ। প্রাণাদিশ্লোকানাং

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ৯৯

পত্যেকং পদার্থব্যাখ্যানে ফলপ্রয়োজনত্বাৎ সিদ্ধপদার্থত্বাচ্চ যত্নো ন কৃতঃ ॥ ৪৯— ৫৭ ॥ ২০—২০ ॥

ভাষ্যানুবাদ

প্রাণ অর্থ-প্রাজ্ঞ, যিনি বীজাবস্থাপন্ন;[সেই প্রাণ হইতে] স্থিতি পর্যন্ত অপর যাহা কিছু, তৎসমস্তই তাহার কার্য্যভেদমাত্র। লোকপ্রসিদ্ধ অপর সমস্ত বিষয়গুলি রজ্জুতে কল্পিত সর্পের ন্যায় সমস্ত প্রাণিকর্তৃক পরিকল্পিত; আত্মাতে সে সমস্ত না থাকিলেও আত্মার স্বরূপ-পরিজ্ঞান না থাকায়, মায়া দ্বারা তাহাতে কল্পিত হইয়া রহিয়াছে; ইহাই[উক্ত শ্লোকসমূহের] স্থূলার্থ। প্রাণাদি শ্লোক- সমূহের প্রত্যেক পদার্থ ধরিয়া ব্যাখ্যা করার প্রয়াস নিষ্প্রয়োজন বা অনাবশ্যক; এই কারণে আর সেরূপ ব্যাখ্যা করা হইল না ॥ ৪৯— ৫৭॥ ২০—২৮

যং ভাবং দর্শয়েদ্ যস্য তং ভাবং স তু পশ্যতি। তঞ্চাবতি স ভূত্বাসৌ তদ্‌গ্রহঃ সমুপৈতি তম্ ॥ ৫৮ ॥ ২৯ সরলার্থঃ

[আচার্য্যঃ] যং ভাবং(উক্তম্ অনুক্তং বা) যস্য(জিজ্ঞাসোঃ সম্বন্ধে) দর্শয়েৎ (প্রকাশয়েৎ), সঃ(জিজ্ঞাসুঃ) তু(পুনঃ) তং ভাবং[আত্মস্বরূপেণ] পশ্যতি (অহং মম ইতি বা অনুভবতি), অসৌ(আত্মা) সঃ(উপদিষ্টঃ ভাবস্বরূপঃ) ভূত্বা তম্(জিজ্ঞাসুম্) অবতি(সর্ব্বতঃ রক্ষতি); তদ্‌গ্রহঃ(তস্মিন্ গ্রহঃ আগ্রহঃ ইদমেব তত্ত্বম্ ইতি অভিনিবেশঃ) তং(দ্রষ্টারং) সমুপৈতি(তদাত্মভাবং সাধয়তি) ইত্যর্থঃ। গুরু যাহাকে যে ভাব পরম তত্ত্ব বলিয়া প্রদর্শন করান, সে সেই ভাবই আত্ম- স্বরূপে দর্শন করিয়া থাকে; আত্মা সেই ভাবাপন্ন হইয়া তাহাকে রক্ষা করেন, এবং তদ্বিষয়ে যে আগ্রহ অর্থাৎ আত্মত্বাভিনিবেশ, তাহাই তাহাকে প্রাপ্ত হইয়া থাকে ॥ ৫৮ ॥ ২৯

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কিং বহুনা, প্রাণাদীনাম্ অন্যতমম্ উক্তমনুক্তং বা অন্যং যৎ ভাবং পদার্থং দর্শয়েৎ যস্যাচার্য্যোহন্যো বা আপ্ত ‘ইদমেব তত্ত্বম্’ ইতি, স তং ভাবমাত্মভূতং পশ্যতি ‘অয়মহমিতি বা মমেতি বা’, তঞ্চ দ্রষ্টারং স ভাবোহবতি, যো দর্শিতো ভাবঃ, অসৌ স ভূত্বা রক্ষতি, স্বেনাত্মনা সর্ব্বতো নিরুণদ্ধি। তস্মিন্ গ্রহস্তদ্গ্রহঃ

১০০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

তদভিনিবেশঃ—‘ইদমেব তত্ত্বম্’ ইতি, স তং গ্রহীতারমুপৈতি, তস্যাত্মভাবং নিগচ্ছতীত্যর্থঃ ॥ ৫৮ ॥ ২৯

ভাষ্যানুবাদ।

অধিক কি, আচার্য্য কিংবা অপর কোনও আপ্ত-পুরুষ কথিত প্রাণাদির মধ্যে যে কোন একটি উক্ত বা অনুক্ত অপর যে কোন একটি পদার্থকে ‘ইহাই তত্ত্ব’ বলিয়া যাহার নিকট প্রদর্শন করেন, সেই ব্যক্তি সেই ভাবকেই আত্মস্বরূপে দর্শন করে, অর্থাৎ ‘আমি বা আমার’ ইত্যাকারে গ্রহণ করে। যে পদার্থটি প্রদর্শিত হইয়াছে, সেই পদার্থই সেই দ্রষ্টাকে রক্ষা করে, তাহাই তদ্ভাব প্রাপ্ত হইয়া রক্ষা করে, অর্থাৎ স্বীয় আত্মস্বরূপে[তাঁহাকে] সর্ব্ব বিষয় হইতে নিরুদ্ধ করিয়া রাখে। সেই ভাবের উপরে যে গ্রহ, তাহাই ‘তদ্‌গ্রহ’ অর্থাৎ ‘ইহাই তত্ত্ব’ এই- রূপে যে অভিনিবেশ, সেই অভিনিবেশই সেই উপদেশ-গ্রহীতাকে প্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ তাহার আত্মভাব লাভ করে ॥ ৫৮ ॥ ২৯

এতৈরেষোহপৃথগ্‌ভাবৈঃ পৃথগেবেতি লক্ষিতঃ।

এবং যো বেদ তত্ত্বেণ কল্পয়েৎ সোহবিশঙ্কিতঃ ॥ ৫৯ ॥ ৩০

সরলার্থঃ

এষঃ(আত্মা) এতৈঃ(পূর্ব্বোক্তৈঃ) অপৃথগ্ভাবৈঃ(অপৃথগ্‌ভূতৈঃ অপি প্রাণাদিভি) পৃথক্(ব্যতিরিক্তঃ) এব(নিশ্চয়ে) লক্ষিতঃ(নিশ্চিতঃ)[ভবতি, মুঢ়ৈরিতিশেষঃ]। যঃ(বিবেকী) এবং(আত্মব্যতিরেকেণ অসত্ত্বং প্রাণাদীনাং) তত্ত্বেন(যাথার্থ্যেন) বেদ(জানাতি); সঃ(জ্ঞানী) অবিশঙ্কিতঃ(নিঃশঙ্কঃ সন্)[বেদবাক্যস্য অর্থং] কল্পয়েৎ(অস্য বাক্যস্য ইদং তাৎপর্য্যম্, অস্য চ ইদম্, ইতি বিভাগশঃ নিরূপয়েৎ)।

এই আত্মা উক্ত প্রাণাদি হইতে পৃথক্ না হইয়াও, অজ্ঞজনকর্তৃক পৃথক্ বলিয়াই কল্পিত হইয়া থাকে।[কিন্তু] যে লোক যথাযথভাবে এইরূপ জানে—আত্ম- ব্যতিরেকে প্রাণাদির সত্তা নাই, এই ভাব বুঝিতে পারে, সেই জ্ঞানী নিঃশঙ্কচিত্তে [বেদবাক্যের তাৎপর্য্য-বিভাগ] বুঝিয়া করিয়া থাকেন ॥ ৫৯ ॥ ৩০

শাঙ্কর ভাষ্যম্

এতৈঃ প্রাণাদিভিরাত্মনঃ অপৃথগ্‌ভূতৈঃ অপৃথগ্‌ভাবৈরএব আত্মা রজ্জুরিব সর্পাদিবিকল্পনারূপৈঃ পৃথগেবেতি লক্ষিতোহভিলক্ষিতো নিশ্চিতো মূঢ়ৈরিত্যর্থঃ।

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ১০১

বিবেকিনান্ত রজ্জামিব কল্পিতাঃ সর্পাদয়ো নাত্মব্যতিরেকেণ প্রাণাদয়ঃ সন্তীত্যভি- প্রায়ঃ, “ইদং সর্ব্বং যদয়মাত্মা” ইতি শ্রুতেঃ। এবমাত্মব্যতিরেকেণাসত্ত্বং রজ্জুসর্প- বদাত্মনি কল্পিতানাম্, আত্মানঞ্চ কেবলং নির্বিকল্পং যো বেদ তত্ত্বেন শ্রুতিতো যুক্তিতশ্চ, সোহবিশঙ্কিতো বেদার্থং বিভাগতঃ কল্পয়েৎ কল্পয়তীত্যর্থঃ—‘ইদমেবং- পরং বাক্যম্, অদোহন্যপরম্ ইতি। “নহ্যনধ্যাত্মবিদ বেদান্ জ্ঞাতুং শক্লোতি তত্ত্বতঃ। নহ্যনধ্যাত্মবিৎ কশ্চিৎ ক্রিয়াফলমুপাশ্নুতে” ইতি হি মানবং বচনম্ ॥ ৫৯ ৷ ৩০

ভাষ্যানুবাদ

রজ্জুতে কল্পিত সর্পাদির ন্যায় আত্মা হইতে অভিন্ন এই সকল পৃথক্ পৃথক্ প্রাণাদি পদার্থের সহিত এই আত্মা পৃথক্ বলিয়াই মূঢ়জনকর্তৃক লক্ষিত অর্থাৎ নিশ্চিত হইয়া থাকে। অভিপ্রায় এই যে, বিবেকী জন- গণের নিকট কিন্তু রজ্জু-কল্পিত সর্পাদির ন্যায় এই প্রাণাদিরও আত্মা- তিরিক্ত সত্তা নাই; কারণ, ‘এই সমস্তই আত্মস্বরূপ’, এই শ্রুতিই এ বিষয়ে প্রমাণ। যে লোক শ্রুতি ও যুক্তি অনুসারে রজ্জুসর্পের ন্যায় আত্মাতে কল্পিত পদার্থসমূহের আত্ম-ব্যতিরেকে অসত্ত্ব এবং আত্মাকেই কেবল নির্বিবিকল্প বা নির্বিবশেষরূপ জানেন, তিনি অশঙ্কিতভাবে (নিঃশঙ্কচিত্তে) পৃথক্ পৃথক্ ভাবে বেদার্থ কল্পনা করেন, অর্থাৎ এই বাক্যের তাৎপর্য্য এইরূপ, অমুক বাক্যের তাৎপর্য্য অন্যরূপ, এইভাবে বেদার্থ কল্পনা করিয়া থাকেন। কারণ, ‘অধ্যাত্মতত্ত্বজ্ঞ ভিন্ন অপর কোন ব্যক্তিই যথার্থরূপে বেদ বুঝিতে সমর্থ হয় না; এবং অধ্যাত্মতত্ত্ব- জ্ঞানরহিত কোন পুরুষই ক্রিয়ার উপযুক্ত ফল ভোগ করিতে সমর্থ হয় না।’ এইরূপ মনুবচন আছে ॥ ৫৯ ॥ ৩০

স্বপ্ন-মায়ে যথা দৃষ্টে গন্ধর্ব্বনগরং যথা।

তথা বিশ্বমিদং দৃষ্টং বেদান্তেষু বিচক্ষণৈঃ ॥ ৬০ ॥ ৩১ সরলার্থঃ

স্বপ্ন মায়ে(স্বপ্নশ্চ মায়া চ) যথা দৃষ্টে(অসত্যে অপি সত্যবৎ অনুভূতে) গন্ধর্ব্বনগরং(অকস্মাৎ আকাশে যৎ বিচিত্রনগরাকারং দৃশ্যতে; তৎ গন্ধর্ব্বনগরম উচ্যতে; তৎ) যথা(দৃষ্টং), ইদং(দৃশ্যমানং) বিশ্বং(জগৎ অপি) বিচক্ষণৈঃ (প্রাজ্ঞৈঃ) বেদান্তেষু তথা(তদ্বৎ এব--অসত্যমপি সত্যবৎ প্রতিভাসমানং) দৃষ্টং(জ্ঞাতং ভবতি)। স্বপ্ন ও মায়া যেরূপ[ মিথ্যা হইয়াও সত্যবং] দৃষ্ট হয়, এবং গন্ধর্ব্বনগরও

১০২ কারিকোপেত মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

যেরূপ দৃষ্ট হয়, পণ্ডিতগণ বেদান্তে এই জগৎকেও সেইরূপই দেখিয়া থাকেন ॥ ৬০ ॥ ৩১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যদেতৎ দ্বৈতস্য অসত্ত্বমুক্তং যুক্তিতঃ, তদ্বেদান্ত প্রমাণাবগতমিত্যাহ-স্বপ্নশ্চ মায়া চ স্বপ্নমায়ে অসদ্বত্ত্বাত্মিকে অসত্যৌ সদ্বত্ত্বাত্মিকে ইব লক্ষ্যেতে অবিবেকিভিঃ। যথা চ প্রসারিতপণ্যাপণগৃহ-প্রাসাদস্ত্রীপুংজনপদব্যবহারাকীর্ণমিব গন্ধর্বনগরং দৃশ্য- মানমেব সৎ অকস্মাদভাবতাং গতং দৃষ্টম্, যথা চ স্বপ্নমায়ে দৃষ্টে অসদ্রূপে, তথা বিশ্বমিদং দ্বৈতং সমস্তমসদ্দৃষ্টম্। ক্ব? ইত্যাহ-বেদান্তেষু “নেহ নানাস্তি কিঞ্চন।” “ইন্দ্রো মায়াভিঃ”। “আত্মৈবেদমগ্র আসীৎ” “ব্রহ্মৈবেদমগ্র আসীৎ” “দ্বিতীয়াদ্বৈ ভয়ং ভবতি।” “নতু তদ্ দ্বিতীয়মস্তি।” “যত্র তস্য সর্ব্বমাত্মৈবাভূৎ” ইত্যাদিযু, বিচক্ষণৈনিপুণতরবস্তুদর্শিভিরেভিঃ পণ্ডিতৈরিত্যর্থঃ। “তমঃশ্বভ্রনিভং দৃষ্টং বর্ষবুদ্বুদ- সন্নিভম্। নাশপ্রায়ং সুখাদ্ধীনং নাশোত্তরমভাবগম্” ইতি ব্যাসস্মৃতেঃ ॥ ৬০ ॥ ৩১

ভাষ্যানুবাদ

যুক্তি অনুসারে এই জগতের যে অসত্যতা উক্ত হইয়াছে, স্বতঃ- প্রমাণ বেদান্ত হইতেই তাহা অবগত; ইহা প্রতিপাদনার্থ বলিতেছেন —স্বপ্ন ত মায়া, এই উভয় অসৎস্বরূপ—অসত্য হইলেও, অবিবেকিগণ কর্তৃক সদ্বস্ত বলিয়াই যেন লক্ষিত হইয়া থাকে, এবং প্রসারিত পণ্য, আপণ-গৃহ, প্রাসাদ, স্ত্রীপুরুষ ও গ্রামাদি ব্যবহারযোগ্য স্থানে পরি- পূর্ণবৎ প্রতীয়মান গন্ধর্বনগর যেমন দেখিতে দেখিতেই হঠাৎ অদৃশ্যতা প্রাপ্ত হইতে দেখা যায়, স্বপ্ন ও মায়া যেমন অসৎস্বরূপ দৃষ্ট হইয়া থাকে, তেমনি এই সমস্ত বিশ্ব—দ্বৈত জগৎ অসৎ বলিয়া দৃষ্ট হইয়া থাকে। কোথায়? তাহা বলিতেছেন—‘জগতে নানা কিছু নাই’; ‘ঈশ্বর মায়া দ্বারা(বহুরূপ হন)’; ‘অগ্রে এই জগৎ একমাত্র আত্মস্বরূপই ছিল’; ‘অগ্রে এই জগৎ একমাত্র ব্রহ্মস্বরূপই ছিল’; ‘দ্বিতীয় হইতেই ভয় হইয়া থাকে’; ‘কিন্তু সেই দ্বিতীয় ত কেহ নাই’, ‘যে অবস্থায় এ সমস্তই ইহার আত্মস্বরূপ হয়’ ইত্যাদি বেদান্তশাস্ত্রে। বিচক্ষণ অর্থ—খুব নিপুণতাসহকারে দর্শনকারী পণ্ডিত;[তাঁহাদের কর্তৃক দৃষ্ট হইয়াছে]। যেহেতু ব্যাস-স্মৃতিতেও আছে—[বিবেকিগণ কর্তৃক] অন্ধকারস্থ

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ১০৩

ভূগর্ভের ন্যায় দৃষ্ট[এই বিশ্ব] বর্ষার জলবুদ্বুদ-সদৃশ, বিনাশ-বহুল, সুখহীন এবং বিনাশের পরই অভাবপ্রাপ্ত’ হয় ॥ ৬০ ॥ ৩১

ন নিরোধো ন চোৎপত্তির্নবদ্ধো ন চ সাধকঃ। ন মুমুক্ষু র্ন বৈ মুক্ত ইত্যেষা পরমার্থতা ॥ ৬১ ॥ ৩২

সরলার্থঃ

[প্রকরণার্থমুপসংহরন্ আহ—“ন নিরোধঃ” ইতি]—[দ্বৈতমিথ্যাত্বনিশ্চয়ে সতি] নিরোধঃ(প্রলয়ঃ) ন, উৎপত্তিঃ(জন্ম) ন; বদ্ধঃ(সংসারী) ন; সাধকঃ (সাধনবান্) ন; মুমুক্ষুঃ(মুক্তিমিচ্ছুঃ) ন; মুক্তঃ চ(অপি) ন[ভবতি ইতি সর্ব্বত্র সম্বধ্যতে]। ইতি(উক্তরূপা) এষা পরমার্থতা(পারমার্থিকী অবস্থা)।

দ্বৈতমিথ্যাত্ব নিশ্চয় হইলে পর, প্রলয় নাই, উৎপত্তি নাই, বদ্ধভাব নাই, সাধক নাই, মুমুক্ষু নাই এবং মুক্তও নাই; এইরূপ ভাবই পারমার্থিক ভাব ॥ ৬১ ॥ ৩২

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

প্রকরণার্থোপসংহারার্থোহয়ং শ্লোকঃ-যদা বিতথং দ্বৈতম্, আত্মৈবৈকঃ পর- মার্থতঃ সন্, তদেদং নিষ্পন্নং ভবতি-সর্ব্বোহয়ং লৌকিকো বৈদিকশ ব্যবহারোহ- বিদ্যাবিষয় এবেতি। তদ্বা ন নিরোধঃ, নিরোধনং নিরোধঃ প্রলয়ঃ, উৎপত্তিঃ জন্ম, বদ্ধঃ সংসারী জীবঃ, সাধকঃ সাধনবান্ মোক্ষস্য, মুমুক্ষুর্মোচনার্থী, মুক্তঃ-বিমুক্ত- বন্ধঃ। উৎপত্তি-প্রলয়য়োরভাবাৎ বন্ধাদয়ো ন সন্তীত্যেষা পরমার্থতা।

কথমুৎপত্তি-প্রলয়য়োঃ অভাব ইতি? উচ্যতে-দ্বৈতস্যাস্য অসত্ত্বাৎ, “যত্র হি দ্বৈতমিব ভবতি।” “য ইহ নানের পশ্যতি।” “আত্মৈবেদং সর্ব্বম্,” ব্রহ্মৈবেদং সর্ব্বম্,” “একমেবাদ্বিতীয়ম্” “ইদং সর্ব্বং, যদয়মাত্মা” ইত্যাদিনা দ্বৈতস্যাসত্ত্বং সিদ্ধম্। সতো হ্যুৎপত্তিঃ প্রলয়ো বা স্যাৎ, নাসতঃ শশবিষাণাদেঃ। নাপ্যদ্বৈতমুৎ- পদ্যতে লীয়তে বা অদ্বয়ঞ্চ উৎপত্তি-প্রলয়বচ্চেতি বিপ্রতিষিদ্ধম্। যস্ত পুনদ্বৈত- সংব্যবহারঃ স রজ্জুসর্পবৎ আত্মনি প্রাণাদিলক্ষণঃ কল্পিতঃ ইত্যুক্তম্। ন হি মনো- বিকল্পনায়াঃ রজ্জুসর্পাদিলক্ষণায়া রজ্জাং প্রলয় উৎপত্তিব্বা; ন চ মনসি রজ্জুসর্প- স্যোৎপত্তিঃ প্রলয়ো বা; ন চোভয়তো বা। তথা মানসত্বাবিশেষাৎ অদ্বৈতস্য। ন হি নিয়তে মনসি সুষুপ্তে বা দ্বৈতং গৃহ্যতে। অতো মনোবিকল্পনামাত্রং দ্বৈতমিতি সিদ্ধম্। তস্মাৎ সূক্তং দ্বৈতস্যাসত্ত্বাৎ নিরোধাদ্যভাবঃ পরমার্থতেতি।

যদ্যেবং দ্বৈতাভাবে শাস্ত্রব্যাপারঃ নাদ্বৈতে বিরোধাৎ। তথা চ সত্যদ্বৈতস্য বস্তুত্বে প্রমাণাভাবাৎ শূন্যবাদপ্রসঙ্গঃ, দ্বৈতস্য চাভাবাৎ; ন। রজ্জ সর্পাদি-

১০৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

বিকল্পনায়া নিরাস্পদত্বে অনুপপত্তিরিতি প্রত্যুক্তমেতৎ কথমুজ্জীবয়সীত্যাহ-রজ্জু- রপি সর্পবিকল্পস্য আম্পদীভূতা বিকল্পিতৈবেতি দৃষ্টান্তানুপপত্তিঃ; ন; বিকল্পনাক্ষয়ে অবিকল্পিতস্য অবিকল্পিতত্বাদেব সত্ত্বোপপত্তেঃ। রজ্জু সর্পবৎ অসত্ত্বমিতি চেৎ; ন, একান্তেনাবিকল্পিতত্বাৎ অবিকল্পিতরজ্জংশবৎ প্রাক্ সর্পাভাববিজ্ঞানাৎ বিকল্পয়িতুশ্চ প্রাক্ বিকল্পনোৎপত্তেঃ সিদ্ধত্বাভ্যুপগমাদেব অসত্ত্বানুপপত্তিঃ।

কথং পুনঃ স্বরূপে ব্যাপারাভাবে শাস্ত্রস্য দ্বৈতবিজ্ঞাননিবর্তকত্বম্? নৈষ দোষঃ; রজ্জাং সর্পাদিবৎ আত্মনি দ্বৈতস্য অবিদ্যাধ্যস্তত্বাৎ; কথং ‘সুখ্যহং দুঃখী মুঢ়ো জাতো মৃতো জীর্ণো দেহবান্ পশ্যামি ব্যক্তাব্যক্তঃ কর্তা ফলী সংযুক্তো বিষুক্তঃ ক্ষীণো বৃদ্ধোহহং মমৈতৎ,’ ইত্যেবমাদয়ঃ সর্ব্বে আত্মনি অধ্যারোপ্যন্তে। আত্মা এতেঘ- নুগতঃ সর্ব্বত্রাব্যভিচারাৎ, যথা সর্পধারাদিভেদেষু রজ্জুঃ। যদা চৈবং বিশেষ্য- স্বরূপ-প্রত্যয়স্য সিদ্ধত্বান্ন কর্তব্যত্বং শাস্ত্রেণ; অকৃতকর্তৃচ শাস্ত্রং কৃতানুকারিত্বে অপ্রমাণম্। যতঃ অবিদ্যাধ্যারোপিত-সুখিত্বাদিবিশেষ-প্রতিবন্ধাদেব আত্মনঃ স্বরূপেণ অনবস্থানম্, স্বরূপাবস্থানঞ্চ শ্রেয় ইতি সুখিত্বাদিনিবর্তকং শাস্ত্রম্ আত্মনি অসুখিত্বাদিপ্রত্যয়-করণেন নেতি নেত্যস্থলাদিবাক্যৈঃ। আত্মস্বরূপবৎ অসুখি- ত্বাদিরপি সুখিত্বাদিভেদেষু নানুবৃত্তোহস্তি ধর্ম্মঃ। যদ্যনুবৃত্তঃ স্যাৎ, নাধ্যারোপ্যেত, সুখিত্বাদিলক্ষণে বিশেষঃ; যথা উষ্ণত্বগুণবিশেষবতি অগ্নৌ শীততা, তস্মান্নিব্বিশেষ এবাত্মনি সুখিত্বাদয়ো বিশেষাঃ কল্পিতাঃ। যত্ত অসুখিত্বাদিশাস্ত্রমাত্মনঃ, তৎ সুখিত্বাদিবিশেষনিবৃত্ত্যর্থমেবেতি সিদ্ধম্। “সিদ্ধন্তু নিবর্তকত্বাৎ” ইত্যাগমবিদাং সূত্রম্ ॥ ৬১ ॥ ৩২

ভাষ্যানুবাদ

এই প্রকরণের তাৎপর্য্য উপসংহারের জন্য এই শ্লোকটি[রচিত] হইয়াছে—যখন[জানিতে পারে যে] দ্বৈতমাত্রই মিথ্যা, একমাত্র আত্মাই যথার্থ সৎ পদার্থ, তখন এইরূপ ভাব উপস্থিত হয়—লোকসিদ্ধ এবং বেদবিহিত এই সমস্ত ব্যাপারই অবিদ্যার বিষয়ীভূত(অজ্ঞানাধীন); তদবস্থায় নিরোধ থাকে না, নিরোধ অর্থ—নিরোধন—প্রলয়। উৎপত্তি অর্থ জন্ম; বদ্ধ অর্থ—সংসারী জীব; সাধক—মোক্ষোপযোগী সাধন-সম্পন্ন, মুমুক্ষু—মোক্ষার্থী; মুক্ত—বন্ধন-বিমুক্ত। উৎপত্তি ও প্রলয় না থাকায় বন্ধাদি অবস্থাসমূহও থাকিতে পারে না; ইহাই পরমার্থতা(যথার্থ অবস্থা)।

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ১০৫

ভাল, উৎপত্তি ও প্রলয় নাই কেন? বলা হইতেছে-যেহেতু দ্বৈতের সত্ত্ব নাই; ‘যে অবস্থায় দ্বৈতের ন্যায় হয়,’ ‘যিনি ইহাতে নানাত্বের ন্যায় দর্শন করেন; ‘এই সমস্তই আত্মা,’ ‘এই সমস্তই ব্রহ্মস্বরূপ’, ‘ব্রহ্ম এক অদ্বিতীয়’, ‘এ সমস্তই এই আত্মস্বরূপ’, ইত্যাদি শ্রুতি হইতে দ্বৈত জগতের অসত্যতা প্রমাণিত হইয়া থাকে। সৎ পদার্থেরই উৎপত্তি ও প্রলয় সম্ভবপর, কিন্তু অসৎ- শশশৃঙ্গাদির পক্ষে কখনই নহে। আর অদ্বৈত বস্তুর যে উৎপত্তি ও প্রলয় হইতে পারে, তাহাও নহে; কারণ অদ্বিতীয়ও বটে, আবার উৎপত্তি-প্রলয়শীলও বটে, একথা পরস্পর-বিরুদ্ধ। এই যে, দ্বৈত প্রাণাদি জগতের ব্যবহার দৃষ্ট হইতেছে, ইহা কেবল রজ্জুতে আরোপিত সর্পের ন্যায় আত্মাকে কল্পিত মাত্র, একথা পূর্বেই কথিত হইয়াছে। কেন না, কেবলই মনের কল্পনাপ্রসূত রজ্জুসর্পাদি পদার্থের কখনই রজ্জুতে উৎপত্তি বা প্রলয় সংঘটিত হয় না; আর মনোমধ্যেও যে রজ্জুসর্পের উৎপত্তি বা প্রলয় হইয়া থাকে, তাহাও নহে। অথবা তদুভয় হইতে অর্থাৎ মন ও রজ্জু হইতেও যে, সর্পাদির উৎপত্তি-প্রলয় হইয়া থাকে, তাহাও নহে। মানসত্ব(মানস-সংকল্প-প্রসূতত্ব) উভয়ের পক্ষেই তুল্য; সুতরাং দ্বৈত জগৎও রজ্জু সর্পেরই তুল্য। কারণ, মন যখন[সমাধি দ্বারা] নিয়মিত হয়, কিংবা সুষুপ্তি-দশা প্রাপ্ত হয়, তখন তাহাতে দ্বৈতপ্রতীতি কিছুমাত্র থাকে না; অতএব, দ্বৈতজগৎ যে, মনের কল্পনামাত্র, ইহা নিশ্চিত। অতএব, দ্বৈতের অসত্তা-নিবন্ধন নিরোধাদি অবস্থার অভাবকে যে পরমার্থতা বলা হইয়াছে, তাহা সু- সঙ্গতই হইয়াছে।

ভাল, এইরূপে যদি দ্বৈতাভাবপ্রতিপাদনেই শাস্ত্রের ব্যাপার (চেষ্টা) স্বীকার করা হয়, আর বিরোধবশতঃ অদ্বৈত-প্রতিপাদনে তাৎপর্য্য স্বীকার করা না হয়, অর্থাৎ দ্বৈতাভাব প্রতিপাদন করাই যদি শাস্ত্রের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়, এবং একের অভাব-বোধনে প্রবৃত্ত শাস্ত্র দ্বারা অপরের সত্তা-প্রতিপাদন স্বীকার করিতে গেলেও যদি বিরোধ

১০৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যাপনিষৎ

উপস্থিত হয়;[তাহা হইলে জিজ্ঞাস্য এই যে,] অদ্বৈত-প্রতিপাদনে যদি শাস্ত্রের তাৎপর্য্যই স্বীকার করা না হয়, এবং দ্বৈতমাত্রেরই অভাব স্বীকার করা হয়, তাহা হইলে অদ্বৈতের সত্যতা বিষয়ে কোন প্রমাণ না থাকায় ‘শূন্যবাদই ত’ স্বীকার করা হইল। * না—তাহা হয় না। কোন একটি আশ্রয় না থাকিলে যে রজ্জু-সর্পাদিরই কল্পনা হইতে পারে না, তাহা ত পূর্ব্বেই প্রতিপাদিত হইয়াছে; অতএব এখন আবার সেই খণ্ডিত আপত্তিরই উত্থাপন করিতেছ কিরূপে?

[শূন্যবাদী পুনশ্চ] প্রশ্ন করিতেছেন যে, ভাল, সর্পকল্পনার (ভ্রমের) আশ্রয়ীভূত রজ্জুও ত কল্পিত—অসত্য; সুতরাং[অদ্বৈতের সত্যতা-সাধনে উহা] দৃষ্টান্ত হইতে পারে না। না—এ আপত্তি হইতে পারে না; কারণ, যাহা কল্পিত নহে(সত্য), বিকল্প বা ভ্রমবুদ্ধি বিনষ্ট হইলে পর অকল্পিতত্ব নিবন্ধনই ত তাহার(অদ্বৈতের) সত্যতা সিদ্ধ হয়। যদি বল, রজ্জু-সর্পের ন্যায় তাহারও অসত্যতা হউক? না—তাহা হইতে পারে না; কারণ, অকল্পিত রজ্জুভাব যেরূপ সর্পা- ভাব-জ্ঞানের পূর্ব্বেও সত্য, অতএব উহা একান্তই কল্পিত হইতে পারে না, তদ্রূপ ব্রহ্মও যখন একেবারেই অকল্পিত,[সুতরাং তাঁহার অসত্যতাও সম্ভাবিত হইতে পারে না]। বিশেষতঃ যিনি সমস্ত বিকল্প-কল্পনার কর্ত্তা, সেই বিকল্পয়িতাকে ত সর্প-কল্পনার পূর্ব্বেই সিদ্ধ বা অকল্পিত বলিয়া অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে, কাজেই অসত্ত্ব বা শূন্যবাদের সম্ভাবনা হয় না।

ভাল, স্বরূপতঃ দ্বৈতবিজ্ঞানের উপর যখন নিষেধ-শাস্ত্রের কোনরূপ

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ১০৭

ব্যাপার নাই, তখন সেই শাস্ত্র দ্বৈতবিষয়ক জ্ঞানের নিবৃত্তি সাধন করে কিরূপে? না-এ দোষও হয় না; কারণ, রজ্জুতে কল্পিত সর্পাদির ন্যায় অবিদ্যাবশতঃ আত্মাতেও দ্বৈতভাব অধ্যস্ত হইয়াছে। কি প্রকারে?- ‘আমি সুখী, দুঃখী, মূঢ়, জাত, মৃত, জীর্ণ, দেহী, আমি দর্শন করিতেছি, ব্যক্তাব্যক্ত-স্বরূপ, কর্তা, সফল, সংযুক্ত, বিযুক্ত, ক্ষীণ, বৃদ্ধ এবং এ সমস্ত আমার’ ইত্যাদি ধর্মসমূহ আত্মাতে আরোপিত হইয়া থাকে। সর্প-জলধারাদি নানাবিধবিকল্পের মধ্যে রজ্জু যেমন অনুস্যূতই থাকে, তেমনি উক্ত অধ্যাস-সমুহেও আত্মা সর্বদাই অনুস্যূত রহিয়াছে; কারণ, তাহার কোথাও ব্যভিচার বা অভাব নাই। এইরূপই যখন নিয়ম, তখন স্বতঃসিদ্ধ বিশেষ্যরূপী ব্রহ্মের স্বরূপগত প্রতীতি বিষয়ে শাস্ত্রের আর কিছুই কর্তব্য নাই। বিশেষতঃ শাস্ত্র হইতেছে অজ্ঞাত- জ্ঞাপক; সেই শাস্ত্র যদি কৃতানুকারী অর্থাৎ বিজ্ঞাত-জ্ঞাপক(অনু- বাদক) হয়, তাহা হইলে শাস্ত্র অপ্রমাণ হইয়া পড়ে। যেহেতু আত্মাতে অবিদ্যারোপিত সুখিত্বাদি বিশেষ ভাবসমূহের বাধাবশতঃ আত্মার স্বরূপাবস্থানও সিদ্ধ হইতেছে না; পরন্তু এই স্বরূপাবস্থানই জীবের পরম শ্রেয়ঃ; অতএব, “নেতি নেতি অস্থলং” অর্থাৎ ‘ইহা আত্মা নহে’, ‘আত্মা স্থূল নহে’ ইত্যাদি বাক্য দ্বারা সুখিত্বাদি ধৰ্ম্ম-প্রতিষেধক শাস্ত্রও আত্মার অসুখিত্বাদি প্রতীতি সমুৎপাদন করায় সাফল্য লাভ করিয়া থাকে;[অতএব অদ্বৈত শাস্ত্রের অপ্রামাণ্য হইতেছে না। বিশেষতঃ আত্ম-স্বরূপ যেরূপ সুখিত্বাদি বিভিন্ন প্রতীতিতে অনুগত থাকে, তদ্রূপ সুখিত্বাদি রূপ বিভিন্ন প্রত্যয়ে অনুগত অসুখিত্বাদি বলিয়া যে কোনরূপ ধর্ম আছে, তাহা নহে। যদি অনুগত থাকিত, তাহা হইলে উষ্ণ অগ্নিতে যেরূপ শীতলতা ধর্ম্মের আরোপ হয় না, তদ্রূপ সুখিত্বাদি-রূপ বিশেষ ধর্মও কখনই আত্মায় আরোপিত হইতে পারিত না। অতএব বুঝিতে হইবে, নির্বিশেষ আত্মাতেই সুখিত্বাদি বিশেষ বিশেষ ধর্মসমূহ কল্পিত হইয়া থাকে। আত্মার অসুখিত্বাদি-প্রতিপাদক যে শাস্ত্র, কেবল সুখিত্বাদি ধর্মবিশেষের প্রতিষেধ করাই তাহার উদ্দেশ্য; কারণ, শাস্ত্রজ্ঞগণের এইরূপ একটি সূত্র আছে যে, ‘সুখিত্বাদি

১০৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ধর্ম্মের প্রতিষেধ করে বলিয়া অস্থূলত্বাদি-বোধক শাস্ত্রের প্রামাণ্য সিদ্ধ হয়’ * ॥ ৬১ ॥ ৩২

ভাবৈরসদ্ভিদেবায়মদ্বয়েন চ কল্পিতঃ।

ভাবা অপ্যদ্বয়েনৈব তস্মাদদ্বয়তা শিবা ॥ ৬২ ॥ ৩৩

সরলার্থঃ

অয়ম্(আত্মা) অসদ্ভিঃ(পরমার্থসত্তারহিতৈঃ) এব(নিশ্চয়ে) ভাবৈঃ (প্রাণাদিভিঃ)[পরমার্থসত্যেন] অদ্বয়েন(অদ্বিতীয়ত্বেন) চ(অপি) কল্পিতঃ (বিকল্পাস্পদতাং নীতঃ)। ভাবাঃ(প্রাণাদয়ঃ) অপি অদ্বয়েন(সতা আত্মনা) কল্পিতাঃ(স্বস্মিন্ আরোপিতাঃ); তস্মাৎ(হেতোঃ) অদ্বয়তা(কল্পনাকালেহপি অদ্বয়ভাবঃ এব) শিবা(সর্ব্বভয়নিবারকত্বাৎ শুভা)[ভবতি ইতি শেষঃ]।

এই[পরমার্থ সত্য] আত্মাই অসত্য(কল্পিত) প্রাণাদি পদার্থরূপে এবং স্বীয় অদ্বয়রূপেও কল্পিত হন। প্রাণাদি পদার্থসমূহও আবার অদ্বয়ভাবে(সৎরূপে) কল্পিত হয়; অতএব অদ্বয়ভাবই মঙ্গলময়[দ্বৈতভাব নহে] ॥ ৬২ ॥ ৩৩

শঙ্কর-ভাষ্যম্

পূর্ব্বশ্লোকার্থস্য হেতুমাহ—যথা রজ্জামসদ্ভিঃ সর্প-ধারাদিভিরদ্বয়েন রজ্জুদ্রব্যেণ সতা অয়ং সর্পঃ, ইয়ং ধারা, দণ্ডোহয়ম্ ইতি বা রজ্জুদ্রব্যমেব কল্প্যতে, এবং প্রাণাদিভিরনন্তৈঃ অসদ্ভিরেবাবিদ্যমানৈঃ ন পরমার্থতঃ। নহ্যপ্রচলিতে মনসি কশ্চিদ্ভাব উপলক্ষয়িতুং শক্যতে কেনচিৎ। ন চাত্মনঃ প্রচলনমস্তি। প্রচলিতস্যৈ- বোপলভ্যমানা ভাবা ন পরমার্থতঃ সন্তঃ কল্পয়িতুং শক্যাঃ। অতোহসদ্ভিরেব প্রাণাদিভির্ভাবৈরদ্বয়েন চ পরমার্থসতা আত্মনা রজ্জুবৎ সর্ব্ববিকল্পাস্পদভূতেন অয়ং স্বয়মের আত্মা কল্পিতঃ সদৈকস্বভাবোহপি সন্। তে চাপি প্রাণাদিভাবা অদ্বয়েনৈব সতা আত্মনা বিকল্পিতাঃ; নহি নিরাস্পদা কাচিৎ কল্পনা উপলব্ধ্যতে; অতঃ সর্ব্ব- কল্পনাস্পদত্বাৎ স্বেনাত্মনা অদ্বয়স্য অব্যভিচারাৎ কল্পনাবস্থায়ামপি অদ্বয়তা শিবা;

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ১০৯

কল্পনা এব ত্বশিবাঃ, রজ্জু সর্পাদিবৎ ত্রাসাদিকারিণ্যো হিতাঃ। অদ্বয়তা অভয়া; অতঃ সৈব শিবা ॥ ৬২ ॥ ৩৩

ভাষ্যানুবাদ

পূর্ব্ব শ্লোকে যে বিষয় প্রতিপাদিত হইয়াছে, তদ্বিষয়ে হেতু- প্রদর্শন করিতেছেন—রজ্জুতে অবিদ্যমান সর্প জলধারাদি ভাবে এবং অদ্বয়ভাবে—অর্থাৎ একই রজ্জু যেমন সত্য রজ্জু দ্রব্যরূপে এবং ‘ইহা সর্প, ইহা জলধারা অথবা ইহা দণ্ড’ ইত্যাদি রূপে কল্পিত হইয়া থাকে, তেমান[আত্মাও] অসৎ—অবিদ্যমান অর্থাৎ পরমার্থসত্তাশূন্য প্রাণাদি অনন্ত পদার্থরূপে[কল্পিত হয়]। কেন না, মন চঞ্চল বা ক্রিয়োন্মুখ না হইলে কেহ কখনও কোন বস্তু উপলব্ধি করিতে সমর্থ হয় না; অথচ আত্মার কখনও প্রচলন(ক্রিয়া) নাই; সুতরাং প্রচলিত(চিন্তা- পরিণত) মনের পরিকল্পিতরূপে উপলব্ধ্যমান্ পদার্থসমূহকে পরমার্থসৎ বলিয়া কল্পনা করিতে পারা যায় না। অতএব অসৎস্বরূপ প্রাণাদি পদার্থাকারে এবং সর্ব্ব কল্পনার আশ্রয়ীভূত পরমার্থসৎ অদ্বয় আত্মাকারে—এই আত্মা সর্বদা একরূপ হইলেও স্বয়ংই তদাকারে কল্পিত হইয়া থাকে। আবার সেই প্রাণাদি পদার্থসমূহও এই পরমার্থ- সৎ অদ্বয় আত্মস্বরূপে কল্পিত হয়; কারণ আশ্রয় ব্যতীত কোন কল্পনাই উৎপন্ন হয় না; অতএব সমস্ত কল্পনার আশ্রয়ত্ব হেতু এবং স্বরূপতও অদ্বয়ভাবের ব্যভিচার না থাকায়[বুঝিতে হইবে,] প্রাণাদি কল্পনাকালেও অদ্বয়তাই শিব অর্থাৎ মঙ্গলময়, কল্পনাটাই কেবল অমঙ্গল; কারণ, কল্পনা অসত্য হইলেও রজ্জু-সর্পাদির ন্যায় ত্রাসাদি সমুৎপাদন করিয়া থাকে; কিন্তু অদ্বয়ভাবে কোন ভয় নাই; অতএব তাহাই মঙ্গলময় ॥ ৬২ ॥ ৩৩

নাত্মভাবেন নানেদং ন স্বেনাপি কথঞ্চন। ন পৃথঙ্গনাপৃথক্ কিঞ্চিদিতি তত্ত্ববিদো বিদুঃ ॥ ৬৩ ॥ ৩৪

সরলার্থঃ

নানা(নানাত্বেন প্রতীয়মানং) ইদং(জগৎ) আত্মভাবেন(পরমার্থ-স্বরূপেণ) ন[সৎ], স্বেন(স্বস্বরূপেণ জগদাকারেণ) অপি(সমুচ্চয়ে) কথঞ্চন(কথমপি)

১১০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ন[সৎ]; কিঞ্চিৎ(কিমপি বস্তু) পৃথক্(ব্রহ্মণঃ ভিন্নং) ন, অপৃথক্(ব্রহ্ম- স্বরূপং চ).ন[ভবতি], ইতি(এবং) তত্ত্ববিদঃ(তত্ত্বদর্শিনঃ) বিদুঃ(জানন্তি)।

নানারূপে প্রতীতিগোচর এই জগৎ ব্রহ্মরূপেও সৎ নহে, এবং স্বরূপতও(জগৎ- রূপেও) সৎ নহে; কোন বস্তুই[ব্রহ্ম হইতে] পৃথক্ও নহে, আবার অপৃথক্ও (অভিন্নস্বরূপও) নহে, তত্ত্বদর্শিগণ এইরূপ বুঝিয়া থাকেন ॥ ৬৩॥ ৩৪

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কুতশ্চাদ্বয়তা শিবা? নানাভূতং পৃথত্বম্ অন্যস্য অন্যস্মাৎ যত্র দৃষ্টং, তত্রাশিবং ভবেৎ। ন হ্যত্রাদ্বয়ে পরমার্থসত্যাত্মনি প্রাণাদিসংসারজাতমিদং জগদাত্মভাবেন পরমার্থস্বরূপেণ নিরূপ্যমাণং নানা বস্তুন্তরভূতং ভবতি; যথা রজ্জু স্বরূপেণ প্রকাশেন নিরূপ্যমাণো ন নানাভূতঃ কল্পিতঃ সর্পোহস্তি, তদ্বৎ। নাপি স্বেন প্রাণাদ্যাত্মনা ইদং বিদ্যতে কদাচিদপি, রজ্জুসর্পবৎ কল্পিতত্বাদেব। তথা অন্যোন্যং ন পৃথক্ প্রাণাদি বস্তু; যথা অশ্বান্মহিষঃ পৃথবিদ্যতে, এবম্। অতঃ অসত্ত্বাৎ নাপি অপৃথবিদ্যতেহন্যোন্যং পরেণ বা কিঞ্চিদিতি। এবং পরমার্থতত্ত্বমাত্মবিদো ব্রাহ্মণা বিদুঃ। অতঃ অশিবহেতুত্বাভাবাৎ অদ্বয়তৈব শিবেত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৬৩ ॥ ৩৪

ভাষ্যানুবাদ

অদ্বয়তাই বা শিব কেন?[উত্তর-] যেখানেই এক বস্তু হইতে অপর বস্তুর নানাত্ব-পার্থক্য দৃষ্ট হয়, সেখানেই অশিব হইয়া থাকে। কেন না, পরমার্থসৎ এই অদ্বিতীয় আত্মাতে[কল্পিত] প্রাণাদি- সংসারাত্মক এই জগৎ আত্মভাবে-পরমার্থসত্যরূপে নিরূপণ করিলে পর নানা অর্থাৎ পৃথক্ বস্তু বলিয়া প্রতিপন্ন হয় না। কেন না, রজ্জুকে রজ্জু স্বরূপে চিন্তা করিলে তাহাতে যেমন নানাভূত অর্থাৎ রজ্জু হইতে যেরূপ পৃথরূপে কল্পিত সর্প আর সত্তালাভ করে না, ইহাও সেইরূপ। আর স্বীয় প্রাণাদিস্বরূপেও যে, এই জগৎ কখনও বিদ্যমান(সত্তাযুক্ত) হইতে পারে, তাহাও নহে; কারণ, ইহাও রজ্জু সর্পের ন্যায় নিশ্চয়ই কল্পিত। সেইরূপ, অশ্ব হইতে যেরূপ মহিষের পৃথক্ সত্তা আছে; তদ্রূপ প্রাণাদি বস্তুগুলিরও যে, পরস্পর পৃথক্ সত্তা আছে, তাহা নহে; অতএব অসত্যতা নিবন্ধনই পরস্পর বা অপরের সহিত ইহাদের অপৃথগ ভাবও নাই। পরমার্থতত্ত্ববিৎ ব্রাহ্মণগণ এইরূপই অবগত আছেন। অতএব অমঙ্গলের কোনও কারণ না থাকায় এই অদ্বয়ভাবই মঙ্গলময় ॥ ৬৩ ॥ ৩৪

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ১১১

বীতরাগ-ভয়-ক্রোধৈর্ম্মুনিভির্ব্বেদপারগৈঃ। নির্বিকল্পো হ্যয়ং দৃষ্টঃ প্রপঞ্চোপশমোহদ্বয়ঃ॥ ৬৪॥ ৩৫

সরলার্থঃ

[তদেতৎ সম্যগ্দর্শনং স্তোতুমাহ-বীতেত্যাদি।]-বীতরাগ-ভয়ক্রোধৈঃ (বীতাঃ অপগতাঃ রাগঃ বিষয়াভিলাষঃ, ভয়ং, ক্রোধঃ চ যেভ্যঃ, তে তথোক্তাঃ, তৈঃ) বেদপারগৈঃ(বেদার্থ-তত্ত্বজ্ঞৈঃ) মুনিভিঃ(মননশীলৈঃ কর্তৃভিঃ) অয়ং(আত্মা) হি(নিশ্চয়ে) নির্বিকল্পঃ(প্রাণাদি-বিকল্পরহিতঃ) প্রপঞ্চোপশমঃ(নিষ্প্রপঞ্চঃ) অদ্বয়ঃ(দ্বৈতসম্বন্ধবর্জিতঃ)[চ] দৃষ্টঃ(অনুভূতঃ)।

রাগ, ভয় ও ক্রোধশূন্য, বেদার্থতত্ত্বজ্ঞ, মুমিগণকর্তৃক এই আত্মাই সর্ব্বপ্রকার ভেদশূন্য, দ্বৈতবর্জিত ও অদ্বিতীয় বলিয়া পরিজ্ঞাত হইয়া থাকেন ॥ ৬৪ ॥ ৩৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

তদেতৎ সম্যগ্দর্শনং স্থূয়তে-বিগতরাগ-ভয়-দ্বেষ-ক্রোধাদিসর্ব্বদোষৈঃ সর্ব্বদা মুনিভিঃ, মননশীলৈর্বিবেকিভিঃ, বেদপারগৈঃ অবগতবেদার্থতত্ত্বৈজ্ঞানিভিঃনির্বিকল্পঃ সর্ব্ববিকল্পশূন্যঃ অয়মাত্মা দৃষ্ট উপলব্ধো বেদান্তার্থতৎপরৈঃ। প্রপঞ্চোপশমঃ প্রপঞ্চো দ্বৈতভেদবিস্তারঃ, তস্যোপশমোহভাবো যস্মিন্, স আত্মা প্রপঞ্চোপশমঃ, অতএব অদ্বয়ঃ। বিগতদোষৈরেব পণ্ডিতৈঃ বেদান্তার্থতৎপরৈঃ সন্ন্যাসিভিঃ পরমাত্মা দ্রষ্টুং শক্যঃ, নান্যৈঃ রাগাদিকলুষিতচেতোভিঃ স্বপক্ষপাতদর্শনৈঃ তার্কিকাদিভিরিত্যভি- প্রায়ঃ ॥ ৬৪ ॥ ৩৫

ভাষ্যানুবাদ

সেই এই তত্ত্বজ্ঞানের প্রশংসা করা হইতেছে-সর্বদা যাঁহাদের রাগ(বিষয়ানুরাগ), ভয়, দ্বেষ ও ক্রোধাদি সমস্ত দোষ অপগত হইয়াছে, এবং যাঁহারা বেদার্থের তত্ত্ব অবগত হইয়াছেন; বেদান্তার্থ- নিরূপণ-তৎপর সেই সমস্ত মুনিগণকর্তৃক-বিবেকসম্পন্ন মননশালী জ্ঞানিগণ-কর্তৃক এই আত্মা নির্বিকল্প অর্থাৎ সর্বপ্রকার কল্পনাসম্বন্ধ- রহিত, প্রপঞ্চোপশম, অর্থাৎ দ্বৈতভেদের বিস্তাররূপ যে প্রপঞ্চ, যেখানে তাহার উপশম রহিয়াছে[তাহাই প্রপঞ্চোপশম]। যেহেতু সেই আত্মা প্রপঞ্চোপশম, সেই হেতুই অদ্বয়। অভিপ্রায় এই যে, রাগদ্বেষরহিত ও বেদান্তার্থচিন্তাতৎপর সন্ন্যাসিগণই পরমাত্মাকে দেখিতে

১১২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

পান, কিন্তু তদ্ভিন্ন রাগদ্বেষাদি-দোষ-কলুষিতচিত্ত[অতএব] স্বপক্ষ- পাতদর্শী অপর তার্কিকগণ দেখিতে পান না ॥ ৬৪ ॥ ৩৫

তস্মাদেবং বিদিত্বেনমদ্বৈতে যোজয়েৎ স্মৃতিম্। অদ্বৈতং সমনুপ্রাপ্য জড়বল্লোকমাহরেৎ॥ ৬৫॥ ৩৬

সরলার্থঃ

তস্মাৎ এনং(আত্মানং) এবং(পূর্ব্বোক্তপ্রকারং সর্ববিকল্পাদিশূন্যৎ) বিদিত্বা (বিশেষতঃ জ্ঞাত্বা) অদ্বৈতে(অদ্বৈতভাবোপগমে) স্মৃতিং(মতিং) যোজয়েৎ (সম্পাদয়েৎ)। অদ্বৈতং(অদ্বিতীয়ভাবং) সমনুপ্রাপ্য(সম্যক্ অনুভূয়) জড়বৎ(জড়ইব) লোকম্ আচরেৎ(আত্মানং অপ্রকাশয়ন্ লোকব্যবহারং কুৰ্য্যাদিত্যাশয়ঃ) ॥ অতএব, আত্মাকে পূর্ব্বোক্ত প্রকারে অবগত হইয়া সেই অদ্বৈততত্ত্ববিষয়েই মনোনিবেশ করিবে, এবং আত্মাকে অবগত হইয়া জড়ের ন্যায় লোকের সহিত ব্যবহার করিবে; অর্থাৎ আপনার জ্ঞানিভাব প্রকাশ করিবে না ॥ ৬৫ ॥ ৩৬

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যস্মাৎ সর্ব্বানর্থপ্রশমনরূপত্বাৎ অদ্বয়ং শিবম্ অভয়ম্, অতএবং বিদিত্বা অদ্বৈতে স্মৃতিং যোজয়েৎ; অদ্বৈতাবগমায়ৈব স্মৃতিৎ কুৰ্য্যাদিত্যর্থঃ। তচ্চ অদ্বৈতম্ অবগম্য ‘অহমস্মি পরং ব্রহ্ম’ ইতি বিদিত্বা অশনায়াদ্যতীতং সাক্ষাদপরোক্ষাৎ অজমাত্মানং সর্ব্বলোকব্যবহারাতীতং জড়বৎ লোকমাচরেৎ-অপ্রখ্যাপয়ন্ আত্মানমহম্ এবং বিধ ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৬৫ ॥ ৩৬

ভাষ্যানুবাদ

যেহেতু সর্বপ্রকার অনর্থ-প্রশমনের কারণ বলিয়া অদ্বয়ই অভয় ও মঙ্গলময়; অতএব ইহাকে(আত্মাকে) জানিয়া অদ্বৈত-বিষয়ে স্মৃতি সংযোজনা করিবে, অর্থাৎ অদ্বৈততত্ত্বাবগতি-বিষয়েই স্মৃতি করিবে। সেই অদ্বৈত অবগত হইয়া ‘আমি হইতেছি পরব্রহ্মস্বরূপ’, ইহা অবগত হইয়া ভোজনেচ্ছাদিরহিত, সাক্ষাৎপ্রত্যক্ষস্বরূপ জন্মশূন্য এবং সর্বপ্রকার লোকব্যবহারাতীত আত্মাকে(আপনাকে) জড়ের ন্যায় আচরণ করিবে। অভিপ্রায় এই যে, ‘আমি এবংপ্রকার’ এইরূপে আপনাকে প্রকাশিত না করিয়া আচরণ করিবে ৷ ৬৫ ॥ ৩৬

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ১১৩

নিঃস্তুতির্নমস্কারো নিঃস্বধাকার এব চ। চলাচলনিকেতশ্চ যতির্য্যাদৃচ্ছিকো ভবেৎ॥ ৬৬॥৩৭

সরলার্থঃ

[আচারপ্রকারমাহ—নিঃস্তুতিরিত্যাদিনা।]—যতিঃ(সংযমশীলঃ বিদ্বান্) নিঃস্তুতিঃ(নিঃ নাস্তি স্তুতিঃ যস্য, সঃ তথোক্তঃ) নির্নমস্কারঃ(নমস্কাররহিতঃ) নিঃস্বধাকারঃ(পৈত্রকর্মবর্জ্জিতঃ), চলাচলনিকেতঃ(চলম্ অচলং চ শরীরং নিকেতঃ আশ্রয়ঃ যস্য, সঃ তথোক্তঃ) এব চ সন্ যাদৃচ্ছিকঃ(যদৃচ্ছাপ্রাপ্তপরিতুষ্টঃ) ভবেৎ, নতু গ্রাসাচ্ছাদনাদ্যর্থং যত্নং কুৰ্য্যাদিতি ভাবঃ ॥

উক্ত যতি(যমশীল জ্ঞানী) স্তুতিহীন, নমস্কারবজ্জিত, পৈত্রকর্মরহিত হইয়া কেবল চলাচল-স্বভাব শরীর-মাত্রাশ্রিতভাবে যাদৃচ্ছিক হইবেন অর্থাৎ ঘটনাক্রমে লব্ধ বস্তু দ্বারা সন্তুষ্ট থাকিবেন ॥ ৬৬ ॥৩৭

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কয়া চর্য্যয়া লোকমাচরেদিত্যাহ—স্তুতিনমস্কারাদি সর্ব্বকৰ্ম্মবজ্জিতঃ, ত্যক্ত- সর্ব্ববাহ্যৈষণঃ প্রতিপন্নপরমহংসপারিব্রাজ্য ইত্যভিপ্রায়ঃ। “এতং বৈ তমাত্মানং বিদিত্বা” ইত্যাদিশ্রুতেঃ। “তদ্বুদ্ধয়স্তদাত্মানস্তন্নিষ্ঠাস্তৎপরায়ণাঃ” ইত্যাদিস্মৃতেশ্চ। চলং শরীরং প্রতিক্ষণমন্যথাভাবাৎ, অচলম্ আত্মতত্ত্বম্, যদা কদাচিদ্ভোজনাদি- সংব্যবহারনিমিত্তম্, আকাশবদচলং স্বরূপমাত্মতত্ত্বম্ আত্মনো নিকেতম্ আশ্রয়মাত্ম- স্থিতিং বিস্মৃত্য ‘অহম্’ ইতি মন্যতে যদ্য, তদা চলো দেহো নিকেতো যস্য, সোহয়- মেবং চলাচলনিকেতো বিদ্বান্ ন পুনর্ব্বাহ্যবিষয়াশ্রয়ঃ। স চ যাদৃচ্ছিকো ভবেৎ যদৃচ্ছাপ্রাপ্তকৌপীনাচ্ছাদন-গ্রাসমাত্রদেহস্থিতিরিত্যর্থঃ ॥ ৬৬ ॥ ৩৭

ভাষ্যানুবাদ

কিরূপ ভাবে লোক-ব্যবহার করিবে? তাহা বলিতেছেন— স্তুতি-নমস্কারাদি সমস্ত কর্মানুষ্ঠানরহিত এবং সর্বপ্রকার কামনা- বর্জিত, অর্থাৎ পরমহংস-পারিব্রাজ্যধারী(সন্ন্যাসী); যেহেতু এ বিষয়ে ‘এই সেই আত্মাকে বিদিত হইয়া’ ইত্যাদি শ্রুতি-বাক্য এবং ‘যাঁহাদের বুদ্ধি, আত্মা, নিষ্ঠা, তাঁহাতে(ব্রহ্মে) সমর্পিত, এবং যাঁহারা তাঁহাতেই শরণাপন্ন’ ইত্যাদি স্মৃতিশাস্ত্র আছে। প্রতিক্ষণে অন্যথাভাব হয় বলিয়া এই শরীরই ‘চল’, আত্মতত্ত্বই অচল(কূটস্থ); যখন কোন সময়েই ভোজনাদি ব্যবহারের জন্য আত্মা চঞ্চল হয় না,

১১৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

অতএব আকাশবৎ অচল; সেই আত্মতত্ত্ব যাঁহার নিকেত বা আশ্রয়- স্থান, এবং যখন সেই আত্মস্থিতি বিস্মৃত হইয়া ‘আমি’ বলিয়া অভিমান করে, তখন চল দেহ যাঁহার নিকেত বা আশ্রয় হন, সেই এই বিদ্বান্ উক্ত প্রকারে চলাচল-দেহ হন; কিন্তু কখনও বাহ্য বিষয়কে আশ্রয় করেন না। তিনি যাদৃচ্ছিক হইবেন, অর্থাৎ যদৃচ্ছাক্রমে(দৈবাৎ) প্রাপ্ত কৌপীনাচ্ছাদন এবং সামান্য আহার্য্য দ্বারাই তাঁহার দেহরক্ষা হইয়া থাকে ॥ ৬৬ ॥ ৩৭

তত্ত্বমাধ্যাত্মিকং দৃষ্ট্বা তত্ত্বং দৃষ্ট্বা তু বাহ্যতঃ।

তত্ত্বীভূতস্তদারাস্তদ্বাদপ্রচ্যুতো ভবেৎ ॥ ৬৭ ॥ ৩৮

ইতি মাণ্ডূকোপনিষদার্থাবিষ্করণপরাসু গৌড়পাদীয়কারিকাসু

বৈতথ্যাখ্যং দ্বিতীয়ং প্রকরণং সমাপ্তম্ ॥ ২ ॥

সরলার্থঃ

[তদা সঃ] আধ্যাত্মিকং(আত্মবিষয়কং) তত্ত্বং দৃষ্ট্বা(সম্যক্ অবগম্য), বাহ্যতঃ(বহিরপি) তত্ত্বং দৃষ্ট্বা তদারামঃ(ব্রহ্মতত্ত্বে এব আ—সম্যক্ রমতে যঃ, সঃ তথাভূতঃ) তত্ত্বীভূতঃ(তত্ত্বাদভিন্নতাং গতঃ সন্) তত্ত্বাৎ(পরতত্ত্বাৎ ব্রহ্মণঃ) অপ্রচ্যুতঃ(ভ্রষ্টঃ ন) ভবেৎ।[সঃ কদাচিদপি তত্ত্বভ্রষ্টো ন ভবেদিত্যভিপ্রায়ঃ]। [সে সময় সেই বিবেকী পুরুষ], আধ্যাত্মিক তত্ত্ব দর্শন করিয়া এবং বাহ্য তত্ত্বও অনুভব করিয়া তত্ত্বেই সর্ব্বদা প্রীতিমান্ ও তত্ত্বস্বরূপই হইয়া যান, কখনও তত্ত্ব হইতে চ্যুত হন না ॥ ৬৭॥ ৩৮

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

বাহ্যং পৃথিব্যাদি তত্ত্বম্ আধ্যাত্মিকঞ্চ দেহাদিলক্ষণং রজ্জুসর্পাদিবৎ স্বপ্নমায়া- দিবচ্চ অসৎ, “বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়ম্” ইত্যাদিশ্রুতেঃ। আত্মা চ সবাহ্যাভ্যন্তরো হ্যজোহপূর্ব্বোহনপরোহনন্তরোহবাহ্যঃ কৃৎস্ন আকাশবৎ সর্ব্বগতঃ সুক্ষ্মোহচলো নির্গুণো নিষ্কলো নিষ্ক্রিয়ঃ ‘তৎসত্যং স আত্মা তত্ত্বমসি’ ইতিশ্রুতেঃ। ইত্যেবং তত্ত্বদৃষ্ট্যা তত্ত্বীভূতস্তদারামো ন বাহ্যরমণঃ; যথা অতত্ত্বদর্শী কশ্চিৎ তম্ আত্মত্বেন প্রতিপন্নঃ চিত্তচলনমনু চলিতমাত্মানং মন্যমানঃ তত্ত্বাচ্চলিতং দেহাদিভূতম্ আত্মানং কদাচিন্নন্যতে—প্রচ্যুতোহহম্ আত্মতত্ত্বাদিদানীমিতি। সমাহিতে তু মনসি কদাচিৎ তত্ত্বভূতং প্রসন্নমাত্মানং মন্যতে ইদানীমস্মি তত্ত্বীভূত ইতি। ন তথা আত্মবিদ্ভবেৎ। আত্মন একরূপত্বাৎ স্বরূপপ্রচ্যবনাসম্ভবাচ্চ। সদৈব ব্রহ্মাস্মীত্য-

বৈতথ্য-প্রকরণম্ ১১৫

পঢ়াতো ভবেত্তত্ত্বাৎ, সদা অপ্রচ্যুতাত্মদর্শনো ভবেদিত্যভিপ্রায়ঃ। “শুনি চৈব ঋপাকে চ।” “সমং সর্ব্বেষু ভূতেষু” ইত্যাদিস্মৃতেঃ ॥ ৬৭ ॥ ৩৮

ইতি শ্রীগোবিন্দভগবৎ পূজ্যপাদশিষ্যস্য পরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্যস্য শঙ্করভগবতঃ কৃতৌ গৌড়পাদীয়ে আগমশাস্ত্রভাষ্যে দ্বিতীয়-প্রকরণং বৈতথ্যাখ্যং সমাপ্তম্ ॥

ভাষ্যানুবাদ

বাহ্য পৃথিব্যাদি-তত্ত্ব এবং আধ্যাত্মিক দেহাদি-তত্ত্ব, উভয়ই রজ্জুসর্পবৎ এবং স্বপ্নকালীন মায়ার ন্যায় অসৎ; কারণ, শ্রুতি বলিয়াছেন, ‘বিকার অর্থ কেবল বাক্যারম্ভ নাম মাত্র’ ইত্যাদি। অথচ, আত্মা কিন্তু বাহ্যাভ্যন্তর সর্বত্র বর্তমান, জন্মরহিত, কারণরহিত ও কৰ্ম্মশূন্য, অন্তর ও বাহ্যরহিত, পরিপূর্ণ, আকাশের ন্যায় সর্ব্বগত, অতিশয় সূক্ষ্ম, অচল, নির্গুণ, নিরংশ, নিষ্ক্রিয় স্বরূপ। কারণ, ‘তিনিই সত্য, তিনিই আত্মা, তুমিও তৎস্বরূপ’, এই শ্রুতিই প্রমাণ। এইরূপে তত্ত্ব দর্শন করিয়া নিজেও তত্ত্বস্বরূপই হইয়া যান, এবং তত্ত্বারাম হন, অর্থাৎ কোন বাহ্য বিষয়ে প্রীতিভোগ করেন না। অতত্ত্বদর্শী কোন লোক যেরূপ মনকে আত্মা বলিয়া গ্রহণপূর্ব্বক মনের চাঞ্চল্যানুসারে আত্মাকেও চলিত(ক্ষুব্ধ) মনে করিয়া প্রকৃত তত্ত্ব হইতে বিচ্যুত এবং দেহাদিরূপে চলিত আপনাকে মনে করে, ‘আমি এখন তত্ত্ব হইতে প্রচ্যুত হইতেছি‘। আর মন সমাহিত হইলে কখনও তত্ত্বস্বরূপ, নিত্যপ্রসন্ন আত্মাকে মনে করে যে, ‘আমি এখন তত্ত্বীভূত হইয়াছি’। কিন্তু আত্মবিৎ কখনও সেরূপ মনে করেন না। কেননা, আত্মা এরূপ(কূটস্থ); সুতরাং কখনও তাঁহার স্বরূপপ্রচ্যুতি সম্ভব হয় না; অর্থাৎ ‘আমি সর্বদাই সৎ ব্রহ্মস্বরূপ’ এই ভাবনা থাকায় স্বরূপপ্রচ্যুত হন না; কাজেই তিনি আত্মতত্ত্ব হইতে কখনও স্বরূপতঃ প্রচ্যুত হন না। ‘কুকুরে ও শ্বপাক চণ্ডালে[সমদর্শন করেন]।’ ‘সর্বভূতে সমান[ঈশ্বরকে যিনি জানেন]’ ইত্যাদি স্মৃতিশাস্ত্র হইতেও উক্ত বিষয় প্রমাণিত হয় ॥ ৬৭ ॥ ৩৮

গৌড়পাদীয় কারিকা-ভাষ্যানুবাদে বৈতথ্য-নামক দ্বিতীয় প্রকরণ সমাপ্ত ॥

গৌড়পাদীয়কারিকাসু অদ্বৈতাখ্যং তৃতীয়ং প্রকরণম্

— ♦ ♦ —

উপাসনাশ্রিতো ধর্ম্মো জাতে ব্রহ্মণি বর্ত্ততে। প্রাগুৎপত্তেরজং সর্ব্বং তেনাসৌ কৃপণঃ স্মৃতঃ॥ ৬৮॥ ১

সরলার্থঃ

[ তর্কবলেন দ্বৈতমিথ্যাত্বং প্রসাধ্য অদ্বৈতপারমার্থিকত্বমপি তর্কবলেনৈব সাধয়িতুং প্রকরণমিদম্ আরভ্যতে, উপাসনেত্যাদিভিঃ]-উপাসনাশ্রিতঃ(আত্মন উপাসনাং মোক্ষসাধনত্বেন প্রাপ্তঃ) ধৰ্ম্মঃ(দেহস্য প্রাণানাং বা ধারকত্বাৎ জীবঃ) জাতে(দেহাদ্যাকারেণ বিবর্তমানে) ব্রহ্মণি বর্ত্ততে; যদ্বা, উপাসনাশ্রিতঃ (উপাসনাঙ্গরূপঃ তাৎকালিকঃ) ধর্মঃ(অনুষ্ঠানাত্মকঃ) জাতে ব্রহ্মণি(কার্য্যব্রহ্মণি ঈশ্বরস্বরূপে) বর্ত্ততে[তুরীয়ে তু মানস-ব্যাপাররূপায়া উপাসনায়া অপ্রবৃত্তে- রিত্যাশয়ঃ]। উৎপত্তেঃ(সৃষ্টেঃ) প্রাক্(পূর্ব্বং তু) সর্ব্বম্(আত্মানং, তদিতরৎ চ) অজং(জন্মরহিতং-ব্রহ্মস্বরূপং)[মন্যতে]। তেন(হেতুনা) অসৌ (উপাসকঃ জীবঃ) কৃপণঃ(ক্ষুদ্রাশয়ঃ) স্মৃতঃ(চিন্তিতঃ)[জ্ঞানিভিঃ ইতি শেষঃ]।

উপাসনাবলম্বী জীব কার্য্যব্রহ্মে বর্তমান থাকে, অর্থাৎ আপনাকে তাহারই অধীন বলিয়া মনে করে; এবং উৎপত্তির পূর্ব্বেই সকলকে অজ অর্থাৎ জন্মরহিত ব্রহ্মস্বরূপ[বলিয়া মনে করে, বর্তমান নহে]। এই কারণে[জ্ঞানিগণ] তাহাকে কৃপণ(ক্ষুদ্রাশয়) বলিয়া জানেন ॥ ৬৮ ॥ ১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ওঁকারনির্ণয়ে উক্তঃ প্রপঞ্চোপশমঃ শিবোহদ্বৈত আত্মেতি প্রতিজ্ঞামাত্রেণ, “জ্ঞাতে দ্বৈতং ন বিদ্যতে” ইতি চ। তত্র দ্বৈতাভাবস্তু বৈতথ্যপ্রকরণেন স্বপ্ন-মায়া- গন্ধর্ব্বনগরাদিদৃষ্টান্তৈঃ দৃশ্যত্বাদ্যন্তবত্ত্বাদিহেতুভিঃ, তর্কেণ চ প্রতিপাদিতঃ। অদ্বৈতং কিমাগমমাত্রেণ প্রতিপত্তব্যম্? আহোস্বিৎ তর্কেণাপি, ইত্যত আহ—শক্তিতে তর্কেণাপি জ্ঞাতুম্; তৎ কথম্ ইত্যদ্বৈতপ্রকরণমারভ্যতে।

উপাস্যোপাসনাদিভেদজাতং সর্ব্বং বিতথং কেবলশ্চাত্মা অদ্বয়ঃ পরমার্থঃ, ইতি

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১১৭

স্থিতমতীতে প্রকরণে। যত উপাসনাশ্রিত উপাসনামাত্মনো মোক্ষসাধনত্বেন গতঃ উপাসকোহহং, মমোপাস্যং ব্রহ্ম, তদুপাসনং কৃত্বা জাতে ব্রহ্মণি ইদানীং বর্তমানঃ অজং ব্রহ্ম শরীরপাতাদূর্দ্ধং প্রতিপৎস্যে, প্রাগুৎপত্তেশ্চ অজমিদং সর্ব্বমহঞ্চ। যদাত্মকোহহং প্রাগুৎপত্তেরিদানীং জাতঃ জাতে ব্রহ্মণি চ বর্তমানঃ, উপাসনয়া পুনস্তদেব প্রতিপৎস্য ইত্যেবমুপাসনাশ্রিতো ধৰ্ম্মঃ সাধকো যেনৈবং ক্ষুদ্রব্রহ্মবিৎ, তেনাসৌ কারণেন কৃপণো দীনোহল্পকঃ স্মৃতো নিত্যাজব্রহ্মদর্শিভিঃ মহাত্মভিরিত্য- ভিপ্রায়ঃ। “যদ্বাচানভ্যুদিতং, যেন বাগভ্যুদ্যতে, তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি, নেদং য দদমুপাসতে” ইত্যাদি শ্রুতেস্তলবকারাণাম্ ॥ ৬৮ ॥ ১

ভাষ্যানুবাদ

ওঙ্কার নির্ণয়াবসরে কেবল প্রতিজ্ঞাত হইয়াছে যে, ‘আত্মা প্রপঞ্চ- শূন্য, শিব ও অদ্বৈত; ‘এবং আত্মজ্ঞানোদয়ে দ্বৈত থাকে না’, ইহাও কথিত হইয়াছে। তন্মধ্যে অতীত বৈতথ্য-প্রকরণে, স্বপ্ন, মায়া ও গন্ধর্ববনগরাদি দৃষ্টান্ত, দৃশ্যত্ব ও আদ্যন্তবত্তা(বিনাশশীলতা) প্রভৃতি হেতু দ্বারা এবং তর্কের সাহায্যেও দ্বৈতাভাবমাত্র প্রতিপাদিত হইয়াছে। এখন জিজ্ঞাসা হইতেছে যে, অদ্বৈততত্ত্বটি কি কেবল শাস্ত্রের সাহায্যেই বুঝিতে হইবে? অবথা তর্কের সাহায্যেও? অর্থাৎ শাস্ত্র, তর্ক, এই উভয়ের দ্বারাই বুঝিতে পারা যায় কি? এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন যে, তর্কের সাহায্যেও[অদ্বৈতভাব] বুঝিতে পারা যায়; তাহাই বা হয় কি প্রকারে? তন্নিরূপণার্থ এই অদ্বৈত-প্রকরণ আরব্ধ হইতেছে-অতীত প্রকরণে অবধারিত হইয়াছে যে, উপাস্য ও উপাসনাদি প্রভেদসমূহ মিথ্যা, কেবল অদ্বয় আত্মাই পরমার্থ সৎ; কারণ, উপাসনাশ্রিত অর্থাৎ আমি উপাসক, ব্রহ্ম আমার উপাস্য, এই ভাবে যিনি উপাসনাকেই মোক্ষ-সাধনরূপে অবলম্বন করেন, তাঁহার উপাসনা করিয়া বর্তমান সময়ে কার্য্য-ব্রহ্মে অবস্থিত আমিই দেহ- পাতের পর জন্মরহিত ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হইব; উৎপত্তির পূর্ব্বেও কিন্তু এই সমস্ত জগৎ এবং আমি, সকলেই অজ ব’ জন্মরহিত ব্রহ্মস্বরূপ [ছিলাম]। আমি উৎপত্তির পূর্ব্বে যদাত্মক বা যে ব্রহ্মস্বরূপ ছিলাম, জন্মলাভের পর কার্য্যব্রহ্মে বর্তমান আমি উপাসনার সাহায্যে পুনশ্চ সেই ব্রহ্মভাবই লাভ করিব; এই প্রকারে উপাসনাবলম্বিত ধৰ্ম্ম, অর্থাৎ

১১৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

সাধক পুরুষ যেহেতু এই প্রকার ক্ষুদ্রব্রহ্মজ্ঞ, সেই কারণেই এই সাধককে নিত্যব্রহ্মদর্শী মহাত্মগণ কৃপণ—দীন অর্থাৎ ক্ষুদ্রহৃদয় বলিয়া জানিয়া- ছেন। কারণ, তলবকার শ্রুতিতে(কেনোপনিষদে)[কথিত আছে যে,] ‘যিনি বাক্য দ্বারা উচ্চারিত হন না, পরন্তু যাঁহার সাহায্যে বাক্য স্বয়ং উচ্চারিত হয়, তুমি তাঁহাকেই ব্রহ্ম বলিয়া জানিও, কিন্তু লোকে যাহাকে ‘ইদং’রূপে(সম্মুখীন বস্তুরূপে) উপাসনা করিয়া থাকে, তাহাকে নহে, অর্থাৎ তাহাকে ব্রহ্ম বলিয়া বুঝিও না ॥ ৬৮ ॥ ১

অতো বক্ষ্যাম্যকার্পণ্যমজাতি সমতাঙ্গতম্।

যথা ন জায়তে কিঞ্চিজ্জায়মানং সমন্ততঃ ॥ ৬৯ ॥ ২

সরলার্থঃ

[ যত উপাসনাশ্রিতো ধৰ্ম্মঃ(জীবঃ) কৃপণঃ,] অতঃ অজাতি(জন্মরহিতং) সমতাং গতম্(সর্ব্বত্র সমং) অকার্পণ্যং(ব্রহ্মস্বরূপম্) বক্ষ্যামি(কথয়িষ্যামি), যথা(যেন প্রকারেণ) সমন্ততঃ(সর্ব্বতঃ) জায়মানং(উৎপদ্যমানং)[অপি] কিঞ্চিৎ[বস্তু][রজ্জুসর্পবৎ মিথ্যাত্বাৎ পরমার্থতঃ] ন জায়তে(ন উৎপদ্যতে), [তথা ইতি শেষঃ] ॥

[ যেহেতু উপাসনাশ্রিত জীব কৃপণস্বভাব] অতএব সর্ব্বত্র সমভাবে বর্তমান, জন্মরহিত, অকার্পণ্য ব্রহ্মস্বরূপ বলিব। যাহাতে[ বুঝিতে পারা যায় যে,] সর্ব্বত্রই যাহা কিছু উৎপন্ন হইতেছে বলিয়া মনে হয়, বস্তুতঃ তাহার কিছুই জন্মিতেছে না, অর্থাৎ রজ্জু-সর্পের ন্যায় তৎসমস্তই কল্পিত মাত্র ॥ ৬৯ ॥ ২

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

সবাহ্যাভ্যন্তরম্ অজমাত্মানং প্রতিপত্তু মশকুবন্ অবিদ্যয়া দীনমাত্মানং মন্যমানো জাতোহহং জাতে ব্রহ্মণি বর্তে, তদুপাসনাশ্রিতঃ সন্ ব্রহ্ম প্রতিপৎস্যে, ইত্যেবং প্রতিপন্নঃ কৃপণো ভবতি যস্মাৎ, অতো বক্ষ্যামি অকার্পণ্যম্ অকৃপণভাবমজং ব্রহ্ম। তদ্ধি কার্পণ্যাস্পদং, ‘যত্রান্যোহন্যৎপশ্যত্যন্যচ্ছূণোত্যন্যদ্ বিজানাতি, তদল্পং,’ ‘মর্ত্যং তৎ’, ‘বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়ম্’ ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ। তদ্বিপরীতং সবাহ্যাভ্যন্তরম্ অজমকার্পণ্যং ভূমাখ্যং ব্রহ্ম যৎ প্রাপ্য অবিদ্যাকৃতসর্ব্বকার্পণ্যনিবৃত্তিঃ, তদকার্পণ্যং বক্ষ্যামীত্যর্থঃ। তদজাতি অবিদ্যমানা জাতিরস্য, সমতাং গতং সর্ব্ব- স্বাম্যং গতম্; কস্মাৎ? অবয়ববৈষম্যাভাবাৎ। যদ্ধি সাবয়বং বস্তু, তদবয়বৈ- বৈষম্যং গচ্ছৎ জায়ত ইত্যুচ্যতে; ইদন্ত নিরবয়বত্বাৎ সমতাং গতমিতি ন কৈশ্চিদ-

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১১৯

বয়বৈঃ স্ফুটতি, অতঃ অজাতি অকার্পণ্যম্; সমন্ততঃ সমন্তাৎ যথা ন জায়তে কি ঞ্চদল্লমপি ন স্ফুটতি, রজ্জুসর্পবদবিদ্যাকৃত-দৃষ্ট্যা জায়মানং যেন প্রকারেণ ন জায়তে সর্ব্বতঃ অজমেব ব্রহ্ম ভবতি, তথা তং প্রকারং শৃণু ইত্যর্থঃ ॥ ৬৯ ॥ ২

ভাষ্যানুবাদ

যেহেতু, বাহ্যাভ্যন্তর-সহকৃত অজ আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করিতে অসমর্থ হইয়া অবিদ্যাবশে আপনাকে দীন মনে করিয়া ‘আমি জাত হইয়াছি, জন্মের পরও কার্য্যব্রহ্মে বর্তমান রহিয়াছি’, এবং ‘তাঁহার উপাসনা আশ্রয় করিয়া ব্রহ্ম লাভ করিব,’ এইরূপ জ্ঞানসম্পন্ন জীব কৃপণ হইতেছে, অতএব, অকার্পণ্য অর্থাৎ অকৃপণস্বভাব জন্মরহিত ব্রহ্মস্বরূপ বর্ণনা করিব। ‘যে অবস্থায় অপরে অপরকে দেখে, অপরকে শ্রবণ করে এবং অপরকে জানে, তাহা অল্প অর্থাৎ তাহাই মর্ত্য বা বিনাশশীল।’ ‘বিকার অর্থই বাক্যারব্ধ নামমাত্র’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতে জানা যায় যে, ঐরূপ দীনভাবই কার্পণ্য-স্থান, আর তদ্বিপরীত- ভাবাপন্ন, বাহ্যাভ্যন্তরবর্তী, অজ ভূমা ব্রহ্মই অকার্পণ্যস্বরূপ। অর্থাৎ যাহাকে প্রাপ্ত হইয়া অবিদ্যাকৃত সমস্ত কার্পণ্যের নিবৃত্তি হয়, সেই অকার্পণ্য বলিব। তাহাই অজাতি, অর্থাৎ যাহার জাতি বা জন্ম নাই; সমতাপ্রাপ্ত অর্থাৎ সর্ব্ব পদার্থের সহিত সমানভাবপ্রাপ্ত। কারণ কি? যেহেতু তাঁহার অবয়বকৃত বৈষম্য নাই। যে বস্তু সাবয়ব, তাহাই অবয়ব বৈষম্য লাভ করিয়া ‘উৎপন্ন হইতেছে’ বলিয়া কথিত হইয়া থাকে। কিন্তু এই ব্রহ্ম নিরবয়ব; সুতরাং সর্ব্বসাম্য প্রাপ্ত হন, কোন অবয়ব দ্বারাই অভিব্যক্ত বা বিকৃত হন না; এইজন্যই তিনি জন্মরহিত, কার্পণ্যদোষশূন্য এবং সর্বব্যাপী ব্রহ্ম, অবিদ্যাকৃত ভ্রমদৃষ্টিবশতঃ রজ্জু-সর্পবৎ জায়মান হইলেও বস্তুতঃ অতি অল্পমাত্রও যে প্রকারে জন্মে না, সর্বতোভাবে অজই থাকেন, সেই প্রকার[বলিতেছি,] শ্রবণ কর ॥ ৬৯ ॥ ২

আত্মা হ্যাকাশবজ্জীবৈর্ঘটাকাশৈরিবোদিতঃ। ঘটাদিবচ্চ সঙ্ঘাতৈর্জ্জাতাবেতন্নিদর্শনম্ ॥ ৭০ ॥ ৩

১২০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

সরলার্থঃ

আকাশবৎ(আকাশেন তুল্যঃ) আত্মা(পরমাত্মা) হি ঘটাকাশৈঃ ইব (ঘটোপহিতাকাশতুল্যৈঃ) জীবৈঃ(অন্তঃকরণোপহিতৈঃ চিদাভাসৈঃ) উদিতঃ (উৎপন্নঃ)[জীবভাবেন উৎপন্ন ইতি ব্যবহ্রিয়তে ইত্যাশয়ঃ]। ঘটাদিবৎ (ঘটাদিভিরিব) সংঘাতৈঃ(দেহৈঃ) চ(অপি)[উৎপন্নঃ ভবতি]। জাতৌ (আত্মনো জন্মনি) এতৎ নিদর্শনং(দৃষ্টান্তঃ),[যথোক্তাকাশবৎ আত্মা, ইত্যভিপ্রায়ঃ]।

পরমাত্মা আকাশবৎ হইয়াও ঘটাকাশসদৃশ জীবরূপে উৎপন্ন হইয়া থাকেন, এবং ঘটাদির ন্যায় দেহ-সংঘাত ভাবেও উৎপন্ন বলিয়া ব্যবহৃত হইয়া থাকেন। আত্মার জন্ম বিষয়ে ইহাই দৃষ্টান্ত ॥ ৭০ ॥ ৩

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

অজাতি ব্রহ্মাকার্পণ্যং বক্ষ্যামীতি প্রতিজ্ঞাতং তৎসিদ্ধ্যর্থং হেতুৎ দৃষ্টান্তং চ বক্ষ্যামীত্যাহ-আত্মা পরঃ হি যস্মাৎ আকাশবৎ সূক্ষ্মো নিরবয়বঃ সর্ব্বগতঃ আকাশবদুক্তঃ জীবৈঃ ক্ষেত্রজ্ঞৈঃ ঘটাকাশৈরিব ঘটাকাশতুল্যৈঃ উদিত উক্তঃ; স এব আকাশসমঃ পর আত্মা। অথবা, ঘটাকাশৈরথা, আকাশ উদিতঃ উৎপন্নঃ, তথা পরো জীবাত্মভিরুৎপন্নঃ। জীবাত্মনাং পরমাদাত্মন উৎপত্তির্যা ক্রয়তে বেদান্তেষু, সা মহাকাশাদ ঘটাকাশোৎপত্তিসমা ন পরমার্থত ইত্যভিপ্রায়ঃ। তস্মাদেবাকাশা- দঘটাদয়ঃ সঙ্ঘাতা যথা উৎপদ্যন্তে, এবমাকাশস্থানীয়াৎ পরমাত্মনঃ পৃথিব্যাদিভূত- সঙ্ঘাতা আধ্যাত্মিকাশ্চ কার্যকরণলক্ষণা রজ্জুসর্পবদ্বিকল্পিতঃ জায়ন্তে। অত উচ্যতে-“ঘটাদিবচ্চ সঙ্ঘাতৈরুদিতঃ” ইতি। যদা মন্দবুদ্ধিপ্রতিপিপাদয়িষয়া শ্রুত্যা আত্মনো জাতিরুচ্যতে জীবাদীনাম্, তদা জাতাবুপগম্যমানায়াম্ এতন্নিদর্শনং দৃষ্টান্তো যথোদিতাকাশবদিত্যাদিঃ ॥ ৭০ ॥ ৩

ভাষ্যানুবাদ

পূর্ব্বে প্রতিজ্ঞা করা হইয়াছে যে, আমি, জন্মহীন(অজ) অকার্পণ্য ব্রহ্মস্বরূপ নিরূপণ করিব এবং তাহা প্রমাণ করিবার জন্য হেতু ও দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করিব; এইজন্য বলিতেছেন—যেহেতু পরমাত্মা আকাশবৎ অর্থাৎ আকাশের ন্যায় সূক্ষ্ম, নিরবয়ব ও সর্বব্যাপী বলিয়া কথিত হইয়াছেন; সেই পরমাত্মাই ঘটাকাশ-তুল্য ক্ষেত্রজ্ঞ জীবগণ- কর্তৃক আকাশ-সদৃশ কথিত হইয়াছেন। অথবা, ঘটাকাশ দ্বারা আকাশ যেমন উৎপন্ন হয়, তেমনি পরমাত্মাও জীবগণ-রূপে উৎপন্ন

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১২১

হন। অভিপ্রায় এই যে, বেদান্তশাস্ত্রে যে, পরমাত্মা হইতে জীবগণের উৎপত্তি শোনা যায়, তাহা ঠিক মহাকাশ হইতে ঘটাকাশোৎপত্তির তুল্য, কিন্তু উহা বাস্তবিক নহে। সেই আকাশ হইতেই যেমন ঘটাদি পদার্থনিচয় জন্মলাভ করে, ঠিক তেমনি আকাশ-স্থানীয় পরমাত্মা হইতে পৃথিব্যাদি ভূতসমষ্টি এবং আধ্যাত্মিক দেহাদি রজ্জু- সর্পবৎ কল্পিত ভাবে সমুৎপন্ন হইয়া থাকে। এইজন্যই “ঘটাদিবচ্চ” কথা কথিত হইতেছে—শ্রুতি যখন অল্পবুদ্ধি লোকদিগের প্রবোধার্থ আত্মা হইতে জীবাদি পদার্থের উৎপত্তি বর্ণনা করেন, তখনই আত্মার জন্ম স্বীকার করা হইয়া থাকে, সেই অবস্থায়ই পূর্ব্বোক্ত প্রকার আকাশাদি দৃষ্টান্ত বুঝিতে হইবে ॥ ৭০ ॥ ৩

ঘটাদিষু প্রলীনেষু ঘটাকাশাদয়ো যথা। আকাশে সম্প্রলীয়ন্তে তদ্বজ্জীব ইহাত্মনি॥ ৭১॥ ৪

সরলার্থঃ

ঘটাদিষু প্রলীনেষু(কারণেষু লয়ং গতেষু সৎসু) ঘটাকাশাদয়ঃ(ঘটাদ্যুপাধি- পরিচ্ছিন্না আকাশপ্রভৃতয়ঃ) যথা(যদ্বৎ) আকাশে(স্বস্বরূপে) সংপ্রলীয়ন্তে (সম্যক্ তদাত্মতাং গচ্ছন্তি); তদ্বৎ(তথৈব) জীবাঃ(বুদ্ধিপরিচ্ছিন্নাঃ আত্মানঃ) ইহ আত্মনি(স্বস্বরূপে ব্রহ্মণি)[প্রলীয়ন্তে ইতি শেষঃ]।

ঘটাদি উপাধি বিনষ্ট হইলে তদুপহিত আকাশও যেরূপ আকাশে বিলীন হইয়া যায়, তদ্রূপ[অন্তঃকরণরূপ উপাধির অপগমে] জীবগণও এই আত্মায় (ব্রহ্মে) বিলয় প্রাপ্ত হয় ॥ ৭১ ॥ ৪

শঙ্কর-ভাষ্যম্

যথা ঘটাদ্যুৎপত্যা ঘটাকাশাদ্যুৎপত্তিঃ; যথা চ ঘটাদিপ্রলয়ে ঘটাকাশাদি- প্রলয়ঃ, তদ্বদ্ দেহাদিসঙ্ঘাতোৎপত্যা জীবোৎপত্তিঃ, তৎপ্রলয়ে চ জীবানা মহ আত্মনি প্রলয়ঃ ন স্বত ইত্যর্থঃ ॥ ৭১ ॥ ৪

ভাষ্যানুবাদ

ঘটাদির উৎপত্তিতে যেরূপ ঘটাকাশাদির উৎপত্তি, এবং ঘটাদির প্রলয়ে যেরূপ ঘটাকাশাদির প্রলয় হয়, তদ্রূপ দেহাদি সংঘাতের (ইন্দ্রিয়াদি সমষ্টির) সমুৎপত্তিতে জীবের উৎপত্তি এবং তাহার Pramakshina Math

Probaticis s
১২২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

প্রলয়ে জীবগণের এই আত্মাতে প্রলয় হইয়া থাকে, কিন্তু স্বভাবতঃ নহে ॥ ৭১ ॥ ৪

যথৈকস্মিন্ ঘটাকাশে রজোধূমাদিভিযুতে। ন সর্ব্বে সম্প্রযুজ্যন্তে তদ্বজ্জীবাঃ সুখাদিভিঃ ॥ ৭২ ॥ ৫ সরলার্থঃ

যথা একস্মিন্ ঘটাকাশে রজোধুমাদিভিঃ(বাহ্যমলৈঃ) যুতে(সতি), সর্ব্বে (ঘটাকাশাঃ) ন সংপ্রযুজ্যন্তে(ন লিপ্যন্তে), তদ্বৎ(তথৈব) জীবাঃ সুখাদিভিঃ [ন লিপ্যন্তে ইতি শেষঃ]।

একটি ঘটাকাশ ধূলি-ধুমাদি দ্বারা আবৃত হইলে যেমন সকল ঘটাকাশই তাহা দ্বারা লিপ্ত হয় না, তেমনি জীবও সুখাদি ধর্ম্ম দ্বারা(লিপ্ত হয় না)।[অর্থাৎ এক জীবের সুখ-দুঃখাদি দ্বারা অপরাপর জীব কখনই সুখী দুঃখী হয় না] ॥ ৭২ ॥৫

শঙ্কর-ভাষ্যম্

সর্ব্বদেহেষু আত্মৈকত্বে একস্মিন্ জনন-মরণ-সুখাদিমতি আত্মনি সর্ব্বাত্মনাং তৎসম্বন্ধঃ ক্রিয়াফলসাঙ্কর্য্যঞ্চ স্যাৎ, ইতি যে আহুদ্বৈতিনঃ, তান্ প্রতি ইদমুচ্যতে —যথা একস্মিন্ ঘটাকাশে রজোধুমাদিভিঃ যুতে সংযুক্তে ন সর্ব্বে ঘটাকাশাদয়ঃ তদ্রজোধুমাদিভিঃ সংপ্রযুজ্যন্তে, তদ্বজ্জীবাঃ সুখাদিভিঃ।

ননু এক এবাত্মা? বাঢ়ম্; ননু ন শ্রুতং ত্বয়া-আকাশবৎ সর্ব্বসঙ্ঘাতেষু এক এবাত্মেতি। যদি এক এবাত্মা, তহি সর্ব্বত্র সুখী দুঃখী চ স্যাৎ। ন চেদং সাঙ্খ্যস্য চোদ্যং সম্ভবতি। ন হি সাঙ্খ্য আত্মনঃ সুখদুঃখাদিমত্ত্বমিচ্ছতি বুদ্ধিসম- বায়াভ্যুপগমাৎ সুখদুঃখাদীনাম্। ন চোপলব্ধিস্বরূপস্য আত্মনো ভেদকল্পনায়াৎ প্রমাণমস্তি। ভেদাভাবে প্রধানস্য পারার্থ্যানুপপত্তিরিতি চেৎ, ন; প্রধানকৃত- স্বার্থস্য আত্মনি অসমবায়াৎ; যদি হি প্রধানকৃতো বন্ধো মোক্ষো বা অর্থঃ পুরুষেষু ভেদেন সমবৈতি, ততঃ প্রধানস্য পারার্থ্যমাত্মৈকত্বে নোপপদ্যতে, ইতি যুক্তা পুরুষভেদকল্পনা। ন চ সাংখ্যৈর্ব্বন্ধো মোক্ষো বা অর্থঃ পুরুষসমবেতোহভ্যুপ- গম্যতে; নির্বিশেষাশ্চ চেতনমাত্রা আত্মানোহভ্যুপগম্যন্তে। অতঃ পুরুষসত্তা- মাত্রপ্রযুক্তমেব প্রধানস্য পারার্থ্যং সিদ্ধং, ন তু পুরুষভেদপ্রযুক্তমিতি। অতঃ পুরুষভেদকল্পনায়াং হেতুঃ ন প্রধানস্য পারার্থ্যং; ন চান্যৎ পুরুষভেদকল্পনায়াং প্রমাণমস্তি সাংখ্যানাম্। পরসত্তামাত্রমেব চৈতন্নিমিত্তীকৃত্য স্বয়ং বধ্যতে মুচ্যতে চ প্রধানম্। পরশোপলব্ধিমাত্রসত্তাস্বরূপেণ প্রধানপ্রবৃত্তৌ হেতুঃ; ন কেনচিদ্- বিশেষেণেতি কেবলমূঢ়তয়ৈব পুরুষভেদকল্পনা বেদার্থপরিত্যাগশ্চ।

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১২৩

যে তু আহুর্ব্বৈশেষিকাদয়ঃ-ইচ্ছাদয় আত্মসমবায়িন ইতি। তদপ্যসৎ; স্মৃতিহেতুনাং সংস্কারাণামপ্রদেশবতি আত্মনি অসমবায়াৎ। আত্ম-মনঃসংযোগাচ্চ- মৃত্যুৎপত্তেঃ স্মৃতিনিয়মানুপপত্তিঃ, যুগপদ্বা সর্ব্বমৃত্যুৎপত্তিপ্রসঙ্গঃ। ন চ ভিন্ন- জাতীয়ানাং স্পর্শাদিহীনানামাত্মনাং মন আদিভিঃ সম্বন্ধো যুক্তঃ; ন চ দ্রব্যাৎ রূপাদয়ো গুণাঃ কৰ্ম্ম-সামান্য-বিশেষ-সমবায়া ভিন্নাঃ সন্তি। পরেষাং যদি হ্যত্যন্ত- ভিন্না এব দ্রব্যাৎ স্যুঃ ইচ্ছাদয়শ্চাত্মনঃ, তথা সতি দ্রব্যেণ তেষাৎ সম্বন্ধানুপপত্তিঃ। অযুতসিদ্ধানাং সমবায়লক্ষণঃ সম্বন্ধো ন বিরুধ্যত ইতি চেৎ, ন; ইচ্ছাদিভ্যোহ- নিত্যেভ্য আত্মনো নিত্যস্য পূর্ব্বসিদ্ধত্বাৎ, নাযুতসিদ্ধত্বোপপত্তিঃ। আত্মনা অযুত- সিদ্ধত্বে চ ইচ্ছাদীনামাত্মগতমহত্ত্ববৎ নিত্যত্বপ্রসঙ্গঃ; সচানিষ্টঃ, আত্মনোহনির্ম্মোক্ষ- প্রসঙ্গাৎ। সমবায়স্য চ দ্রব্যাদন্যত্বে সতি দ্রব্যেণ সম্বন্ধান্তরং বাচ্যম্; যথা দ্রব্য- গুণয়োঃ। সমবায়ো নিত্যসম্বন্ধ এবেতি ন বাচ্যমিতি চেৎ; তথা সতি সমবায়- সম্বন্ধবতাং নিত্যসম্বন্ধ-প্রসঙ্গাৎ পৃথক্তানুপপত্তিঃ। অত্যন্তপৃথত্ত্বে চ দ্রব্যাদীনাং স্পর্শবদস্পর্শদ্রব্যয়োরিব ষষ্ঠ্যর্থানুপপত্তিঃ। ইচ্ছাদ্যপজনাপায়বদ্গুণবত্তে চাত্মনো- হনিত্যত্বপ্রসঙ্গঃ। দেহফলাদিবৎ সাবয়বত্বং বিক্রিয়াবত্ত্বঞ্চ দেহাদিবদেবেতি দোষৌ অপরিহার্য্যো। যথা ত্বাকাশস্য অবিদ্যাধ্যারোপিত ঘটাদ্যপাধিকৃত-রজো- ধূমমলত্বাদি-দোষবত্ত্বং, তথা আত্মনোহবিদ্যাধ্যারোপিত-বুদ্ধ্যাদ্যপাকৃত সুখ- দুঃখাদি-দোষবত্ত্বে বন্ধমোক্ষাদয়ো ব্যবহারিকা ন বিরুধ্যন্তে; সর্ব্ববাদিভির- বিদ্যাকৃত-ব্যবহারাভ্যুপগমাৎ পরমার্থানভ্যুপগমাচ্চ। তস্মাদাত্মভেদপরিকল্পনা বৃথৈব তার্কিকৈঃ ক্রিয়ত ইতি ॥ ৭২॥ ৫

ভাষ্যানুবাদ

একই আত্মা যদি সমস্ত দেহে থাকে, তাহা হইলে এক আত্মা জন্মমরণ-সুখ দুঃখাদি-সম্পন্ন হইলে সমস্ত আত্মাই তাহার সহিত সম্বদ্ধ হইতে পারে, এবং ক্রিয়াফলেরও সাংকর্য্য অর্থাৎ একজনের ক্রিয়াফল অপরে ভোগ করিতে পারে? যে সকল দ্বৈতবাদী এইরূপ আপত্তি করিয়া থাকেন, তাঁহাদের প্রতি এই কথা বলা হইতেছে,—একটি ঘটাকাশ ধূলি ও ধূমাদি দ্বারা সংযুক্ত হইলে, যেমন অপর সমস্ত ঘটাকাশ সেই ধূলি ধূমাদি দ্বারা সংস্পৃষ্ট হয় না, তেমনি জীবগণও [ অপরের] সুখাদি দ্বারা[স্পৃষ্ট হয় না]।

ভাল, আজ্ঞা ত সর্ব্বত্রই এক; হাঁ, একই বটে; আকাশের ন্যায়

১২৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

একই আত্মা যে, সমস্ত দেহে রহিয়াছেন, তাহা কি তুমি শ্রবণ কর নাই? বেশ কথা, আত্মা যদি একই হয়, তাহা হইলে ত সর্বত্রই সুখ দুঃখ উপলব্ধি করিতে পারে। সাংখ্যমতে এরূপ আপত্তি হইতে পারে না; কারণ, সাংখ্য কখনও আত্মায় সুখ-দুঃখ-সম্বন্ধ ইচ্ছা করেন না। যেহেতু তাঁহাদের মতে সুখ-দুঃখাদি সমস্তই বুদ্ধি-সমবেত (বুদ্ধি ধৰ্ম্ম); সাক্ষাৎ অনুভবস্বরূপ আত্মার ভেদকল্পনা-পক্ষেও কোন প্রমাণ নাই। যদি বল, আত্মার ভেদ না থাকিলে প্রধানের (প্রকৃতির) পারার্থ্য উপপন্ন হইতে পারে না; * না-এ আপত্তিও হইতে পারে না। কেন না, প্রকৃতি-সম্পাদিত কোন প্রয়োজনই (সুখ-দুঃখাদি বিষয়ই) আত্মাতে সম্ভবপর হয় না। প্রকৃতি-সম্পাদিত বন্ধ-মোক্ষাদি প্রয়োজন যদি আত্মাতে পৃথক্ পৃথক্ ভাবে সম্বন্ধ হইত, তাহা হইলে আত্মার একত্ব পক্ষে প্রকৃতির পরার্থত্ব উপপন্ন হয় না বলিয়াই পুরুষের ভেদ-কল্পনা আবশ্যক হইত; কিন্তু বন্ধ বা মোক্ষরূপ প্রয়োজন যে আত্মাতেই সম্পন্ন হয়, তাহা ত সাংখ্যবাদিগণ অঙ্গীকার করেন না; তাঁহারা বলেন, আত্মা নির্বিশেষ(নির্গুণ) একমাত্র চৈতন্যস্বরূপ। অতএব, কেবল পুরুষাস্তিত্ব নিবন্ধনই প্রকৃতির পরার্থতা (পুরুষার্থতা) সিদ্ধ হইয়া থাকে; কিন্তু সেই পরার্থতা যে, পুরুষের (আত্মার) ভেদজনিত, তাহা নহে। অতএব প্রকৃতির পরার্থতাই যে, আত্মভেদ-কল্পনার হেতু, তাহা নহে; অথচ সাংখ্যবাদিগণের পক্ষে আত্মভেদ-কল্পনার ইহা ছাড়া আর কোন প্রমাণও নাই। এই প্রধান (প্রকৃতি) অপরের(আত্মার) সত্তাকে সহায় করিয়া নিজেই বন্ধ ও

অদ্বৈত প্রকরণম্ ১২৫

মোক্ষ লাভ করিয়া থাকে। অনুভবস্বরূপ পুরুষ প্রকৃতিগত চেষ্টার হেতুভূত হন, তাহাও কেবল স্বীয় সান্নিধ্যমাত্রে, কিন্তু অন্য কোন প্রকার বিশেষকার্য্য দ্বারা নহে, অর্থাৎ চেতন পুরুষ সন্নিহিত থাকায়ই অচেতন প্রকৃতিতে সৃষ্টিক্রিয়া উপস্থিত হয়, তদুদ্দেশে পুরুষের কোন প্রকার যত্ন করিতে হয় না; অতএব, পুরুষ-বহুত্ব কল্পনা আর প্রকৃত বেদার্থ পরিত্যাগ করা কেবল মূঢ়তারই ফল।

আর বৈশেষিকগণ যে বলিয়া থাকেন, ইচ্ছা প্রভৃতি ধর্মগুলি আত্মসমবেত, অর্থাৎ ইচ্ছাদি গুণগুলি স্বভাবতঃ আত্মাতেই থাকে, বুদ্ধিতে নহে। তাহাও উত্তম কথা নহে, কেন না, আত্মা প্রদেশহীন নিরবয়ব; স্মৃতিজ্ঞানের হেতুভূত সংস্কারসমূহ কখনই সেই আত্মাতে সমবেত থাকিতে পারে না। আর কেবল আত্মার সহিত মনের সংযোগবশতঃ স্মৃতি-সমুৎপত্তি স্বীকার করিলেও স্মৃতির নিয়ম(ভিন্ন ভিন্ন স্মৃতি হওয়ার ব্যবস্থা) উপপন্ন হইতে পারে না।* পক্ষান্তরে, একসঙ্গেই সমস্ত স্মৃতি জাগরিত হইতে পারে। বিশেষতঃ স্পর্শাদি গুণহীন বিভিন্নজাতীয় আত্মসমূহের সহিত মন প্রভৃতির সম্বন্ধও হইতে পারে না। কেন না, রূপরসাদি গুণসমূহ এবং কৰ্ম্ম, সামান্য(জাতি), বিশেষ, সমবায়ও যে, ৺ দ্রব্য হইতে পৃথগ ভাবে আছে, তাহা নহে। পরমতে(বৈশেষিক মতে) রূপরসাদি গুণসমূহ যদি দ্রব্য হইতে, আর ইচ্ছাদি গুণসমূহও যদি আত্মা হইতে অত্যন্ত ভিন্নই হয়, তাহা হইলে

* তাৎপর্য্য—আত্মা যখন অংশহীন অখণ্ড বস্তু, তখন তাহাতে যে সংস্কার উপস্থিত হয়, তাহা কোন স্থানবিশেষে থাকিতে পারে না; সুতরাং এক দেহে আত্মাতে স্মরণ হইলেই সর্ব্বদেহে তাহার বোধ হইতে পারে। প্রত্যেক মনের সহিতই প্রত্যেক আত্মার সংযোগ থাকায়, আত্মমনঃসংযোগও উহার ভেদক হইতে পারে না। ঃ তাৎপর্য্য—বৈশেষিক মতে সাধারণতঃ দ্রব্য, গুণ, কৰ্ম্ম, সামান্য, বিশেষ, সমবায়, এই ছয় প্রকার ভাব পদার্থ আছে; ইহাদের প্রত্যেকটিই স্বতন্ত্র, পৃথক্ সত্তাবান্। তন্মধ্যে দ্রব্য অর্থ—যাহাতে সমবায় সম্বন্ধে গুণক্রিয়াদি থাকে। গুণ—রূপ, রস, গন্ধ প্রভৃতি চব্বিশটি। কৰ্ম্ম—গমনাদি ক্রিয়া। সামান্য অর্থ— জাতি, মনুষ্যত্ব, গোত্ব প্রভৃতি। বিশেষ—পরমাণুর পরস্পর ভেদক ধৰ্ম্ম, যাহার ফলে বিভিন্নপ্রকার পরমাণু হইতে বিভিন্নপ্রকার কার্য্য উৎপন্ন হয়। সমবায়— একপ্রকার সম্বন্ধ, যেমন গুণ, কৰ্ম্ম ও জাতি প্রভৃতির সহিত দ্রব্যের সম্বন্ধ—সমবায়।

১২৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ত দ্রব্যের সহিত ঐ সকল গুণের সমবায়-সম্বন্ধও হইতে পারে না। যদি বল, ‘অযুতসিদ্ধ’ পদার্থসমূহের(জন্মসিদ্ধ যাহাদের সম্বন্ধ, সেই সকলের) পক্ষে সমবায়-সম্বন্ধ বিরুদ্ধ হয় না;(রূপের সহিত দ্রব্যের যে সম্বন্ধ, তাহা স্বভাবসিদ্ধ; সুতরাং দ্রব্যের সহিত রূপাদিগুণের সমবায়-সম্বন্ধ স্বীকারে কোন আপত্তি হইতে পারে না)। না,- একথাও হইতে পারে না; কারণ, ইচ্ছাদিগুণ সমুদয় অনিত্য(পরভবিক), আর আত্মা হইতেছে নিত্য, সুতরাং পূর্বসিদ্ধ অর্থাৎ ইচ্ছাদি গুণোৎপত্তির পূর্বেই বর্তমান; অতএব, নিত্যানিত্য পদার্থের অযুত- সিদ্ধত্ব হইতে পারে না। আর যদি আত্মার সহিত ইচ্ছাদিগুণসমূহের অপৃথক্যালবর্তিত্বরূপ অযুতসিদ্ধত্ব স্বীকার কর, তাহা হইলেও আত্মগত মহৎপরিমাণ যেরূপ নিত্য, ইচ্ছাদি গুণগুলিও সেইরূপ নিত্য হইতে পারে; তাহাও ত তোমার অভিমত নহে; কারণ, তাহা হইলে আত্মার আর মুক্তি-সম্ভাবনা থাকে না।(কেন না নিত্য ইচ্ছাদি গুণগুলি ত আত্মা হইতে কখনও বিযুক্ত হইতে পারে না।)[আরও এক কথা] সমবায়-সম্বন্ধটি যদি দ্রব্য হইতে পৃথক্ হয়, তাহা হইলে [তাহার জন্য] অপর একটি সম্বন্ধ স্বীকার করা আবশ্যক হয়, যেরূপ দ্রব্য ও গুণের জন্য সমবায়নামক একটি সম্বন্ধ স্বীকার করা হইয়া থাকে, তদ্রূপ। আর সমবায়ও যে নিশ্চয়ই নিত্য সম্বন্ধ, তাহাও বলা যায় না; তাহা হইলে সমবায়-সম্বন্ধযুক্ত পদার্থসমূহের সম্বন্ধ-নিত্যতা নিবন্ধন[উভয়ের মধ্যে] পার্থক্য থাকা প্রমাণিত হইতে পারে না। বিশেষতঃ, দ্রব্যাদি পদার্থসমূহ অত্যন্ত ভিন্ন হইলে স্পর্শযোগ্য ও তদ্বিপরীত পদার্থ দ্বারা, যেমন ষষ্ঠী বিভক্তি দ্বারা সম্বন্ধ নির্দেশ করা যায় না, তেমনি দ্রব্যগুণাদিরও সম্বন্ধ(দ্রব্যের গুণ ইত্যাদি প্রকার) নির্দেশ করা যাইত না। আর আত্মা যদি উৎপত্তি-বিনাশশীল ইচ্ছাদি- গুণসম্পন্ন হইত, তাহা হইলে আত্মারও অনিত্যতা সম্ভব হইত; আর দেহাদির ন্যায় আত্মারও সাবয়বত্ব ও বিকারিত্ব এই দুইটি দোষ অপরিহার্য্য হইয়া পড়িত।[আমাদের মতে] কিন্তু, আকাশের যেমন অবিদ্যা-সমারোপিত ধূলিধূমাদি-দোষবত্তা হয়, তেমনি আত্মাতেও

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১২৭

অবিদ্যাসমারোপিত বুদ্ধি প্রভৃতি উপাধি দ্বারা সমুৎপাদিত সুখদুঃখাদি- দোষসম্বন্ধ থাকিলেও, ব্যবহারসিদ্ধ বন্ধমোক্ষাদি-ব্যবস্থা বিরুদ্ধ হয় না; কারণ সমস্ত বাদীরাই ব্যবহারের অবিদ্যাকৃতত্ব স্বীকার করিয়াছেন, আর পারমার্থিক সত্তা অস্বীকার করিয়াছেন। অতএব তার্কিকগণের যে আত্মভেদ-কল্পনা, তাহা নিশ্চয়ই বৃথা ॥ ৭৫ ॥ ৫

রূপ-কার্য্য-সমাখ্যাশ্চ ভিদ্যন্তে তত্র তত্র বৈ। আকাশস্য ন ভেদোহস্তি তদ্বজ্জীবেষু নির্ণয়ঃ ॥ ৭৩॥ ৬

সরলার্থঃ

[ আত্মন ঔপাধিকভেদসম্বন্ধম্ এব ভেদব্যবহারহেতুতয়া উপপাদয়তি- রূপেত্যাদিনা।] তত্র তত্র[আকাশে যথা-] রূপ-কার্য্য-সমাখ্যাঃ(রূপাণি- ঘটাদ্যপাধিকৃতানি আকাশস্য অল্পত্ব-মহত্ত্বাদীনি, কাৰ্য্যাণি-জলাহরণাদীনি, সমাখ্যাঃ-নামানি-ঘটাকাশমঠাকাশাদীনি) চ(চকারঃ প্রত্যেকসম্বন্ধার্থঃ) ভিদ্যন্তে(ভিন্নাঃ ভবন্তি), আকাশস্য বৈ(পুনঃ)[স্বরূপতঃ] ভেদঃ(বিভাগঃ) ন অস্তি(ন ভবতি); জীবেষু(দেহোপাধিভিন্নেষু চৈতন্যেষু)[অপি] তদ্বৎ (ঘটাদ্যুপহিতাকাশবৎ এব) নির্ণয়ঃ(সিদ্ধান্তঃ)[বিবেকিনামিতি শেষঃ]।

ঘটাদি উপাধিসংযুক্ত সেই সেই আকাশে[যেরূপ] অল্পত্ব-মহত্ত্বাদিরূপ, জলা- হরণাদি কার্য্য, এবং ঘটাকাশাদি নাম ভিন্ন ভিন্ন হইয়া থাকে;[কিন্তু] আকাশের কোনই ভেদ হয় না; জীবগণের(দেহোপহিত চৈতন্যের) সম্বন্ধে সিদ্ধান্তও সেইরূপ ॥ ৭৩॥ ৬

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

কথং পুনরাত্মভেদনিমিত্ত ইব ব্যবহার একস্মিন্ আত্মনি অবিদ্যাকৃত উপপদ্যত ইতি। উচ্যতে-যথা ইহাকাশ একস্মিন্ ঘট-করকাপবরকাদ্যাকাশানাম্ অল্পত্ব- মহত্ত্বাদিরূপাণি ভিদ্যন্তে কার্য্যমুদকাহরণধারণ-শয়নাদি; সমাখ্যাশ্চ ঘটাকাশ- করকাকশাভ্যাস্তৎকৃতাশ্চ ভিন্ন্না দৃশ্যন্তে; তত্র তত্র বৈ ব্যবহারবিষয় ইত্যর্থঃ। সর্ব্বোহয়মাকাশে রূপাদিভেদকৃতো ব্যবহারঃ অপরমার্থ এব। পরমার্থতস্তু আকাশস্য ন ভেদোহস্তি। ন চ আকাশভেদনিমিত্তো ব্যবহারোহস্তি অন্তরেণ পরোপাধিকৃতং দ্বারম্। যথৈতৎ, তদ্বৎ দেহোপাধিভেদকৃতেষু জীবেষু ঘটাকাশস্থানীয়েষু আত্মসু নিরূপণাৎ কৃতো বুদ্ধিমদ্ভিনির্ণয়ো নিশ্চয় ইত্যর্থঃ ॥ ৭৩ ॥ ৬

১২৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ভাষ্যানুবাদ

একই আত্মাতে কেবল অবিদ্যাকৃত ভেদ-নিবন্ধনই বা ভেদ- ব্যবহার উপপন্ন হয় কিরূপে? বলা হইতেছে—ব্যবহারক্ষেত্রে এই একই আকাশে যেমন ঘট, করক(কমণ্ডলু) ও অপবরক(গৃহ- বিশেষ) প্রভৃতি দ্বারা পরিচ্ছিন্ন আকাশের অল্পত্ব-মহত্ত্বাদি রূপসমূহ (আকৃতি) বিভিন্ন হইয়া থাকে, সেইরূপ জলের আহরণ, ধারণ ও শয়নাদি কার্য্য এবং সেই উপাধিকৃত ঘটাকাশ ও করকাকাশ ইত্যাদি বিভিন্নপ্রকার নামও পরিদৃষ্ট হইয়া থাকে। আকাশে যে ঐ সমস্ত রূপনামাদি-বিভাগকৃত ভেদ-ব্যবহার, বস্তুতঃ তৎসমস্তই অসত্য; বাস্তবিক পক্ষে উহা দ্বারা আকাশের কোন প্রকারই ভেদ হয় না; কেন না, কোন একটি ঔপাধিক দ্বার অবলম্বন ব্যতীত কখনই আকাশের ভেদ-ঘটিত ভেদ-ব্যবহার হইতে পারে না। উক্ত উদা- হরণ যেরূপ, ঠিক তদ্রূপই দেহোপাধিভেদে বিভিন্নতাপন্ন, ঘটাকাশ- স্থলবর্তী জীবসমূহেও বুদ্ধিমান্ ব্যক্তিগণ স্থির নিশ্চয় করিয়াছেন। অর্থাৎ দেহাদি উপাধিভেদেই জীবগণের ভেদ, কিন্তু বাস্তবিক কোন ভেদ নাই ॥ ৭৩॥ ৬

নাকাশস্য ঘটাকাশো বিকারাবয়বৌ যথা। নৈবাত্মনঃ সদা জীবো বিকারাবয়বৌ তথা ॥ ৭৪ ॥ ৭

সরলার্থঃ

ঘটাকাশঃ(ঘটোপাধিক আকাশঃ) যথা আকাশস্য(মহাকাশস্য) বিকারা- বয়বৌ(বিকারঃ পরিণামঃ, অবয়ষঃ অংশঃ চ) ন[ভবতি], তথা জীবঃ(দেহা- দ্যুপাধিকঃ)[অপি] সদা(নিত্যং) আত্মনঃ(পরমাত্মনঃ) বিকারাবয়বৌ ন [ভবতঃ],[অপিতু তৎস্বরূপ এব ইভ্যভিপ্রায়ঃ।]

ঘটাকাশ যেমন মহাকাশের বিকার বা অংশ নহে,[বস্তুতঃ তৎস্বরূপই বটে] তেমনি জীবও কখনই পরমাত্মার বিকার বা অবয়ব নহে, বস্তুতঃ তৎস্বরূপই বটে ॥ ৭৪ ॥ ৭

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ননু তত্র পরমার্থকৃত এব ঘটাকাশাদিষু রূপকার্য্যাদিভেদব্যবহার ইতি;

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১২৯

নৈতদস্তি; যস্মাৎ পরমার্থাকাশস্য ঘটাকাশো ন বিকারঃ, যথা সুবর্ণস্য রুচকাদিঃ; যথা বা অপাং ফেনবুদহিমাদিঃ; নাপ্যবয়বঃ, যথা চ বৃক্ষস্য শাখাদিঃ। ন তথাকাশস্য ঘটাকাশঃ বিক’রাবয়বৌ যথা, তথা নৈবাত্মনঃ পরস্য পরমার্থসতো মহাকাশস্থানীয়স্য ঘটাকাশস্থানীয়ো জীবঃ সদা সর্ব্বদা যথোক্তদৃষ্টান্তবৎ ন বিকারঃ, নাপ্যবয়বঃ। অত আত্মভেদকৃতব্যবহারো মৃষৈবেত্যর্থঃ ॥ ৭৪ ॥ ৭

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, ঘটাকাশ প্রভৃতিতে যে রূপ ও কাৰ্য্যাদিভেদ-ব্যবহার তাহা ত যথার্থই বটে,(মিথ্যা হইবে কেন?) না, ইহা পরমার্থ হইতে পারে না; কেন না, রুচকাদি অলঙ্কার যেরূপ সুবর্ণের বিকার, অথবা ফেনবুদ্বুদহিমাদি যেমন জলের বিকার, ঘটাকাশ কখনই তেমনি সত্য আকাশের বিকার নহে, বৃক্ষের শাখার ন্যায় উহা(মহাকাশের) অবয়ব বা অংশও নহে। ঘটাকাশ যেরূপ মহাকাশের বিকার বা অবয়ব নহে, সেইরূপ ঘটাকাশস্থানীয় জীবও মহাকাশস্থানীয় পরমার্থ সৎ পরমাত্মার—উক্ত দৃষ্টান্তেরই অনুরূপ বিকার বা অবয়ব নহে। অতএব আত্ম-ভেদকৃত ভেদব্যবহার নিশ্চয়ই মিথ্যা ॥ ৭৪ ॥ ৭

যথা ভবতি বালানাং গগনং মলিনং মলৈঃ। তথা ভবত্যবুদ্ধানামাত্মাপি মলিনো মলৈঃ ॥ ৭৫ ॥ ৮

সরলার্থঃ

বালানাং(শিশূনাং সমীপে) গগনং(আকাশং) যথা মলৈঃ(রজোধুমাদিভিঃ) মলিনং ভবতি(মলিনমিব প্রতিভাতীতি ভাবঃ), তথা অবুদ্ধানাং(অজ্ঞানাং সমীপে) আত্মা অপি মলৈঃ(বাহ্যদোষৈঃ রাগাদিভিঃ) মলিনঃ[ইব] ভবতি। (রাগাদিদোষদূষিত ইব প্রকাশতে ইত্যাশয়ঃ)।

আকাশ যেমন বালকগণের নিকট ধূলিধূমাদি মলের দ্বারা মলিন[বলিয়া প্রতীত হয়], তেমনি অজ্ঞ জনগণের সমীপে আত্মাও রাগদ্বেষাদি-দোষে মলিন বলিয়া[প্রতিভাত হইয়া থাকে]॥ ৭৫॥৮

১৩০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যস্মাদ যথা ঘটাকাশাদিভেদবুদ্ধিনিবন্ধনো রূপকার্য্যাদিভেদব্যবহারঃ, তথা দেহোপাধি-জীবভেদকৃতো জন্মমরণাদিব্যবহারঃ; তস্মাৎ তৎকৃতমেব ক্লেশকৰ্ম্মফল- মলবত্ত্বম্ আত্মনো ন পরমার্থত ইত্যেতমর্থং দৃষ্টান্তেন প্রতিপিপাদয়িষন্নাহ-যথা ভবতি লোকে বালানামবিবেকিনাং গগনমাকাশং ঘনরজোধুমাদিমলৈর্মলিনং মলবৎ, ন গগন-যাথাত্ম্যবিবেকবতাম্; তথা ভবত্যাত্মা পরোহপি, যো বিজ্ঞাতা প্রত্যক্- ক্লেশকর্মফলমলৈর্মলিনোহবুদ্ধানাং-প্রত্যগাত্মবিবেকরহিতানাং, নাত্মবিবেকবতাম্। ন হি ঊষরদেশস্তৃত্বৎপ্রাণ্যধ্যারোপিতোদকফেনতরঙ্গাদিমান, তথা নাত্মা অবুধা- রোপিতক্লেশাদিমলৈর্মলিনো ভবতীত্যর্থঃ ॥ ॥ ৭৫ ॥ ৮

ভাষ্যানুবাদ

ঘটাকাশাদি ভেদবুদ্ধি হইতে যেরূপ উক্ত রূপকাৰ্য্যাদি ভেদ- ব্যবহার উৎপন্ন হয়, সেইরূপ জন্মমরণাদি ব্যবহারও যেহেতু দেহো- পাধিকৃত জীবভেদ হইতেই সমুৎপন্ন হয়; সেই হেতু, আত্মার যে ক্লেশ* কৰ্ম্ম ও তৎফলভোগরূপ মলসম্বন্ধ, তাহাও নিশ্চয়ই উপাধিকৃত, কিন্তু তাহা পারমার্থিক নহে। এই বিষয়টি দৃষ্টান্ত দ্বারা প্রতি- পাদনেচ্ছায় বলিতেছেন—

সংসারে বালক অর্থাৎ অবিবেকিগণের নিকট যেমন গগন অর্থাৎ আকাশমণ্ডল মেঘ ধূলি ও ধূমাদি দ্বারা মলিন অর্থাৎ মালিন্যযুক্ত [ বিবেচিত হয়], বস্তুতঃ গগনের প্রকৃত তত্ত্বাভিজ্ঞদিগের নিকট নহে; তেমনি যিনি স্বয়ং বিজ্ঞাতা প্রত্যক্(সর্বব্যাপী) পরমাত্মা, তিনিও প্রত্যক্ আত্মতত্ত্বজ্ঞানহীন লোকদিগের নিকট ক্লেশ, কৰ্ম্ম ও কৰ্ম্মফল- রূপ মলের দ্বারা মলিনবৎ হন; কিন্তু আত্মতত্ত্ব-বিবেকিগণের নিকট নহে। কারণ তৃষ্ণাতুর প্রাণিকর্তৃক জল, ফেন ও তরঙ্গাদি আরোপিত হইলেও ঊষর ভূমি(ক্ষার ভূমি) কখনই জলাদিসম্পন্ন হয় না; সেইরূপ আত্মাও কখনই অজ্ঞজনসমারোপিত ক্লেশাদি মলের দ্বারা মলিন হন না। ॥ ৭৫ ॥ ৮

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৩১

মরণে সম্ভবে চৈব গত্যাগমনয়োরপি। স্থিতৌ সর্ব্বশরীরেষু চাকাশেনাবিলক্ষণঃ॥ ৭৬॥ ৯

সরলার্থঃ

[ উক্তমেবার্থং বিশদয়তি—“মরণে” ইত্যাদিনা।]—মরণে(দেহাত্মসম্বন্ধ- ধ্বংসে) সম্ভবে(উৎপত্তৌ) চ(অপি), গত্যাগমনয়োঃ(ইহলোকে পরলোকে চ গমনাগমনয়োঃ) অপি সর্ব্বশরীরেষু স্থিতৌ চ[আত্মা] আকাশেন(ঘটাকাশেন) অবিলক্ষণঃ(অপৃথক্বভাবঃ)[বেদিতব্যঃ]।

মৃত্যু, জন্ম, লোকান্তরে গমনাগমন এবং সর্ব্বশরীরে অবস্থিতিতেও ঘটাকাশের সহিত আত্মার বৈলক্ষণ্য নাই, অর্থাৎ ঘটাকাশের ন্যায়ই আত্মার জন্ম-মরণ ব্যবহার কেবল ঔপাধিক মাত্র ॥ ৭৬ ॥ ৯

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

পুনরপ্যুক্তমেবার্থং প্রপঞ্চয়তি—ঘটাকাশজন্মনাশগমনাগমনস্থিতিবৎ সর্ব্বশরীরেষু আত্মনো জন্মমরণাদিরাকাশেন অবিলক্ষণঃ প্রত্যেতব্য ইত্যর্থঃ ॥ ৭৬ ॥ ৯

ভাষ্যানুবাদ

পুনশ্চ পূর্ব্বোক্ত বিষয়কেই বিস্তৃত করিয়া বলিতেছেন—ঘটা- কাশের জন্ম, নাশ, গমন, আগমন ও স্থিতির ন্যায় আত্মারও যে সর্ব্ব- দেহে জন্মমরণাদি ব্যবহার, আকাশের সহিত তাহার কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য(প্রকারভেদ) নাই, বুঝিতে হইবে ॥ ৭৬ ॥ ৯

সঙ্খ্যাতাঃ স্বপ্নবৎ সর্ব্বে আত্মমায়া-বিসজ্জিতাঃ। আধিক্যে সর্ব্বসাম্যে বা নোপপত্তির্হি বিদ্যতে ॥ ৭৭ ॥ ১০

সরলার্থঃ

সর্ব্বে সংঘাতাঃ(দেহাদয়ঃ) স্বপ্নবৎ(স্বপ্নদেহবৎ) আত্ম-মায়াবিসর্জিতাঃ (আত্মনঃ মায়য়া অবিদ্যয়া বিসজ্জিতাঃ উৎপাদিতাঃ)[ন পরমার্থতঃ সন্তঃ ইতি “অবিদ্যাস্মিতা-রাগ-দ্বেষাভিনিবেশাঃ পঞ্চ ক্লেশাঃ। তন্মধ্যে(১) অবিদ্যা— অনাত্মদেহাদিতে আত্মবুদ্ধি করা।(২) অস্মিতা—বুদ্ধির সহিত আত্মাকে এক বলিয়া দর্শন করা।(৩) রাগ—বিষয়াভিনিবেশ।(৪) দ্বেষ—ইচ্ছার ব্যাঘাতকারীর উপর ক্রোধ।(৫) অভিনিবেশ—মরণাদিত্রাস।

১৩২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ভাবঃ]। হি(যস্মাৎ) আধিক্যে(পশ্বাদি-দেহাপেক্ষয়া দেবাদিদেহানাম্ উৎকর্ষে) সর্ব্বসাম্যে(সর্ব্বেষাং সাম্যে) বা(অপি) উপপত্তিঃ(উৎকর্যাদিজনকঃ হেতুঃ) ন বিদ্যতে(নাস্তীত্যর্থঃ)।

সমস্ত সংঘাতই(দেহাদি সমষ্টিই) স্বীয় মায়া বা অবিদ্যার সাহায্যেই সমুত্থিত হইয়াছে,(বস্তুতঃ উহারা সত্য পদার্থ নহে); কারণ, সমস্ত দেহাদিরই অপেক্ষা- কৃত উৎকর্ষ বা সমতালাভে অপর কোন প্রকার কারণ নাই ॥ ৭৭ ॥ ১০

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ঘটাদিস্থানীয়াস্ত দেহাদিসঙ্ঘাতাঃ স্বপ্নদৃশ্যদেহাদিবৎ মায়াবি-কৃতদেহাদিবচ্চ আত্মমায়াবিসজ্জিতাঃ, আত্মনো মায়া অবিদ্যা, তয়া প্রত্যুপস্থাপিতাঃ, ন পরমার্থতঃ সন্তীত্যর্থঃ। যদি আধিক্যম্ অধিকভাবঃ তির্য্যগদেহাদ্যপেক্ষয়া দেবাদিকার্য্যকরণ- সঙ্ঘাতানাং, যদি বা সর্ব্বেষাং সমতৈব, তেষাৎ ন হ্যপপত্তিসম্ভবঃ সদ্ভাব-প্রতি- পাদকো * হেতুর্বিদ্যতে নাস্তি, হি যস্মাৎ; তস্মাৎ অবিদ্যাকৃতা এব ন পরমার্থতঃ সন্তীত্যর্থঃ ॥ ৭৭ ॥ ১০

ভাষ্যানুবাদ

[ঘটাকাশের] ঘটাদি-স্থানীয় দেহাদি সংঘাতসমূহ স্বপ্নদৃশ্য দেহাদির ন্যায় এবং মায়াবি-প্রদর্শিত(ঐন্দ্রজালিক-প্রদর্শিত) দেহাদির ন্যায় আত্ম-মায়া দ্বারা বিসর্জিত অর্থাৎ আত্মার যে মায়া— অবিদ্যা(অজ্ঞান), তাহা দ্বারা প্রত্যুপস্থাপিত, কিন্তু প্রকৃত পক্ষে সত্য নহে। কেন না, আধিক্য অর্থ—অধিকভাব(উৎকর্ষ); পশুপক্ষী প্রভৃতির দেহ অপেক্ষায় যে, দেবতা প্রভৃতির কার্য্যকরণা- ত্মক দেহের আধিক্য, অথবা, যদি সমস্ত দেহের সমতাই ঘটে, যেহেতু তৎসমুদায়ের সম্পাদনসমর্থ কোন কারণ নাই; সেই হেতুই[বুঝিতে হয়,] ঐ সমস্তই অবিদ্যাকৃত, পারমার্থিক সত্য নহে ॥ ৭৭ ॥ ১০

রসাদয়ো হি যে কোষা ব্যাখ্যাতাস্তৈত্তিরীয়কে। তেষামাত্মা পরো জীবঃ খং যথা সম্প্রকাশিতঃ ॥ ৭৮ ॥ ১১

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৩৩

সরলার্থঃ

‘তৈত্তিরীয়কে(তৈত্তিরীয়শাখোপনিষদি) রসাদয়ঃ(‘অন্নরসময়ঃ প্রাণময়ঃ’ ইত্যাদয়ঃ) যে(পঞ্চ) কোষাঃ(কোষশব্দিতাঃ) ব্যাখ্যাতাঃ(স্পষ্টং বর্ণিতাঃ); যথা(আকাশমিব) পরঃ(পরমাত্মা) তেষাং(কোষাণাং) আত্মা[সন্] জীবঃ(জীবনহেতুত্বাৎ জীবসংজ্ঞয়া) সংপ্রকাশিতঃ(বর্ণিতঃ),[“আত্মা আকাশবৎ” ইত্যাদি শ্লোকে অস্মাভিঃ, ইতিশেষঃ]।

তৈত্তিরীয় উপনিষদে রসাদি(অন্নময়াদি) যে পাঁচটি কোষ ব্যাখ্যাত আছে, আকাশবৎ পরমাত্মাই সেই পঞ্চকোষের আত্মস্বরূপ জীব বলিয়া আমরা [ ইতঃপূর্ব্বে] প্রকাশ করিয়াছি ॥ ৭৮ ॥ ১১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

উৎপত্যাদিবার্জতস্য অদ্বয়স্যাস্থ্য আত্মতত্ত্বস্য শ্রুতিপ্রমাণকত্বপ্রদর্শনার্থং বাক্যানি উপন্যস্যন্তে-রসাদয়োহন্নরসময়ঃ প্রাণময়ঃ ইত্যেবমাদয়ঃ কোষা ইব কোষাঃ, অস্যাদেরিব উত্তরোত্তরস্যাপেক্ষয়া বহির্ভাবাৎ পূর্ব্বস্য, ব্যাখ্যাতা বিস্পষ্টমাখ্যাতাঃ তৈত্তিরীয়কশাখোপনিষদ্বল্যাং, তেষাং কোষাণামাত্মা, যেনাত্মনা পঞ্চাপি কোষা আত্মবন্তোহন্তরমেন; স হি সর্ব্বেযাং জীবননিমিত্তত্বাৎ জীবঃ। কোহসাবিত্যাহ -পর এবাত্মা, যঃ পূর্ব্বং “সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম” ইতি প্রকৃতঃ; যস্মাদাত্মনঃ স্বপ্ন- মায়াদিবৎ আকাশাদিক্রমেণ রসাদয়ঃ কোষলক্ষণাঃ সঙ্ঘাতা আত্মমায়াবিসর্জিতা ইত্যুক্তম্। স আত্মা অস্মাভির্যথা খং, তথেতি সম্প্রকাশিতঃ “আত্মা হ্যাকাশবৎ” ইত্যাদিশ্লোকৈঃ। ন তার্কিকপরিকল্পিতাত্মবৎ পুরুষবুদ্ধি প্রমাণগম্য ইত্যভি- প্রায়ঃ ॥ ৭৮৷ ১১

ভাষ্যানুবাদ

উৎপত্ত্যাদিবিহীন অদ্বিতীয় বস্তুই যে প্রকৃত আত্মা, ইহা শ্রুতি- প্রমাণ দ্বারা সমর্থন করিবার উদ্দেশে শ্রুতিবাক্যসমূহ উল্লিখিত হইতেছে—তৈত্তিরীয়কে, অর্থাৎ তৈত্তিরীয় উপনিষদে, রসাদি অর্থাৎ অন্নরসময় ও প্রাণময় প্রভৃতি যে সমস্ত কোষ * ব্যাখ্যাত আছে;

১৩৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

অর্থাৎ স্পষ্টাক্ষরে বর্ণিত হইয়াছে। এখানে উত্তরোত্তর কোষসমূহ অপেক্ষা পূর্বপূর্ব্ব কোষগুলি বহির্ভূত বা বাহিরে অবস্থিত; এই কারণে খড়গাধার কোষের সাদৃশ্যানুসারে অন্নময়াদিকে কোষ বলা হইয়া থাকে; সুতরাং কোষ অর্থ-কোষের ন্যায়; বাস্তবিকই কোষ নহে। সেই কোষসমূহের আত্মস্বরূপ; সর্বাভ্যন্তরস্থ যে আত্মা দ্বারা পাঁচটি কোষই আত্মবান্ হইয়া থাকে; তাহাই সকলের জীবনের কারণ, এই নিমিত্ত ‘জীব’ শব্দবাচ্য। এই জীব কে? তাহাই বলিতেছেন-পরমাত্মাই, যিনি ইতঃপূর্বে ‘সত্য, জ্ঞান ও অনন্ত ব্রহ্ম’ বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন, এবং যে আত্মা হইতে আকাশাদি ক্রমে রসাদি(অন্নময়াদি) কোষরূপ সঙ্ঘাতসমূহ স্বপ্ন ও মায়ার ন্যায় আত্ম- মায়া দ্বারা সমুপস্থাপিত বলিয়া নির্দেশ করা হইয়াছে। “আত্মাই আকাশবৎ” ইত্যাদি শ্লোকে আমরাও সেই আত্মাকে আকাশের সদৃশ বলিয়া প্রকাশ করিয়াছি। অভিপ্রায় এই যে, তার্কিক-কল্পিত আত্মার ন্যায় এই আত্মা কেবলই মনুষ্যবুদ্ধিমাত্রগম্য নহে,[পরন্তু শ্রুতিপ্রমাণগম্য] ॥ ৭৮ ॥ ১১

দ্বয়োর্ব্বয়োর্দ্ধধূজ্ঞানে পরং ব্রহ্ম প্রকাশিতম্। পৃথিব্যামুদরে চৈব যথাকাশঃ প্রকাশিতঃ॥ ৭৯॥ ১২

সরলার্থঃ

[লোকে] যথা(যদ্বৎ) পৃথিব্যাম্(অধিভূতে) উদরে(অধ্যাত্ম-জঠরে) চ আকাশঃ এব(এক এব আকাশ ইত্যর্থঃ) প্রকাশিতঃ(প্রকটিতঃ ভবতি), [তথা] মধুজ্ঞানে(বৃহদারণ্যকোক্ত মধুব্রাহ্মণে) দ্বয়োঃ দ্বয়োঃ(অধ্যাত্মম্ অধি- দৈবতং চ, যাবৎদ্বৈতবিজ্ঞানমিত্যর্থঃ), পরং ব্রহ্ম প্রকাশিতম্(আত্মতয়া নিরূপিতম্) [অস্তি ইতি শেষঃ]।

পঞ্চকর্মেন্দ্রিয়যুক্ত প্রাণ—প্রাণময় কোষ। পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয়যুক্ত মন—মনোময় কোষ। জ্ঞানেন্দ্রিয়াদি-সহকৃত বুদ্ধি—বিজ্ঞানময় কোষ। আর প্রিয়, মোদ, প্রমোদ-নামক বৃত্তিযুক্ত সত্ত্বগুণসম্পন্ন ‘কারণশরীর’—অবিদ্যাই আনন্দময় কোষ নামে অভিহিত হইয়াছে। প্রিয়বস্তুর দর্শনে, লাভে এবং ভোগে যে আনন্দ হয়, তাহাই যথাক্রমে প্রিয়, মোদ ও প্রমোদ নামে কথিত হয়।

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৩৫

সংসারক্ষেত্রে পৃথিবী ও উদর-মধ্যে যেমন একই আকাশ[অবস্থিত বলিয়া] প্রমাণিত হইয়া থাকে, তেমনি মধুব্রাহ্মণেও অধ্যাত্ম ও অধিদৈবত—এই উভয় স্থানে একই ব্রহ্ম নিরূপিত হইয়াছেন ॥ ৭৯!! ১২

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কিঞ্চ, অধিদৈবতমধ্যাত্মঞ্চ তেজময়োহমৃতময়ঃ পুরুষঃ পৃথিব্যাদ্যন্তর্গতঃ যঃ বিজ্ঞাতা পর এবাত্মা ব্রহ্ম সর্ব্বমিতি দ্বয়োদ্ব য়োঃ আদ্বৈতক্ষয়াৎ পরং ব্রহ্ম প্রকাশিতম্; কেত্যাহ —ব্রহ্মবিদ্যাখ্যং মধু অমৃতম্ অমৃতত্বং মোদনহেতুত্বাৎ, তদ্ বিজ্ঞায়তে যস্মিন্নিতি মধুজ্ঞানং—মধুব্রাহ্মণং, তস্মিন্নিত্যর্থঃ। কিমিব? ইত্যাহ—পৃথিব্যামুদরে চৈব যথৈক আকাশোহনুমানেন প্রকাশিতো লোকে, তদ্বদিত্যর্থঃ ॥ ৭৯ ॥ ১২

ভাষ্যানুবাদ

অপিচ, অধ্যাত্ম ও অধিদৈবতভেদে তেজোময়(জ্যোতিৰ্ম্ময়) ও অমৃতময় পুরুষ পৃথিব্যাদির অন্তর্গত এবং বিজ্ঞাতা(জীবস্বরূপ) যে আত্মা, পরমাত্মাই তৎসমস্ত, এইরূপে উভয়স্থলেই দ্বৈতক্ষয় না হওয়া পর্যন্ত পরব্রহ্ম প্রতিপাদিত হইয়াছেন; কোথায়, তাহা বলিতেছেন —ব্রহ্মবিদ্যা-নামক যে মধুস্বরূপ অমৃত; আনন্দের হেতু বলিয়াই ইহার অমৃতত্ব; তাহা বিজ্ঞাত হয় যেখানে, তাহার নাম ‘মধুজ্ঞান’ অর্থাৎ ‘মধুব্রাহ্মণ’, তাহাতে[অর্থাৎ বৃহদারণ্যক উপনিষদে ‘মধু- ব্রাহ্মণ’ নামক একটি অংশ আছে; সেই অংশে]। কাহার মত? তাহা বলিতেছেন—সংসারে যেমন পৃথিবী ও উদরে একই আকাশ অনুমান দ্বারা প্রকাশিত হয় অর্থাৎ নিরূপিত হয়, তাহার ন্যায় ॥ ৭৯ ॥ ১২

জীবাত্মনোরন্যত্বমভেদেন প্রশস্যতে।

নানাং নিন্দ্যতে যচ্চ তদেবং হি সমঞ্জসম্ ॥ ৮০ ॥ ১৩

সরলার্থঃ

যৎ(যস্মাৎ) জীবাত্মনোঃ(জীবস্য পরমাত্মনঃ চ) অনন্যত্বম্(একত্বম্) অভেদেন(ভেদপ্রত্যাখ্যানেন) প্রশস্যতে(স্থূয়তে)। যৎ চ নানাত্বং(ভেদ-

১৩৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যাপনিষৎ

দর্শনং) নিন্দ্যতে,[শ্রুত্যা শাস্ত্রক্বদ্ভিশ], তৎ(তস্মাৎ) এবং(যথোক্তম্ একত্বম্ এব) সমঞ্জসম্(যুক্তিযুক্তং, নির্দোষমিতি যাবৎ) ॥ ৮০ ॥ ১৩

যেহেতু জীব ও পরমাত্মার অভেদে একত্ব দর্শন প্রশংসিত এবং যেহেতু ভেদ- দর্শন নিন্দিত হইতেছে, সেই হেতু উক্ত অভেদই সামঞ্জস্যপূর্ণ ॥ ৮০ ॥ ১৩

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যদ্ যুক্তিতঃ শ্রুতিতশ্চ নির্দ্ধারিতং জীবস্য পরস্য চাত্মনোরনন্যত্বম্ অভেদেন প্রশস্যতে স্থূয়তে শাস্ত্রেণ ব্যাসাদিভিশ্চ; যচ্চ সর্ব্বপ্রাণিসাধারণং স্বাভাবিকং শাস্ত্র- বহিষ্কৃতৈঃ কুতার্কিকৈঃ বিরচিতং নানাত্বদর্শনং নিন্দ্যতে “ন তু তদ্বদ্বিতীয়মস্তি”, “দ্বিতীয়াদ্ বৈ ভয়ং ভবতি।” “উদরমন্তরং কুরুতে, অথ তস্য ভয়ং ভবতি” “ইদং সর্ব্বং যদয়মাত্মা। “মৃত্যোঃ স মৃত্যুমাপ্নোতি য ইহ নানেব পশ্যতি।” ইত্যেবমাদি- বাক্যৈঃ অন্যেশ্চ ব্রহ্মবিদ্ভিঃ যচ্চৈতৎ, তদেবং হি সমঞ্জসং ঋজ্রববোধং ন্যায্য- মিত্যর্থঃ। যাস্তু তার্কিকপরিকল্পিতাঃ কুদৃষ্টয়ঃ তা অনৃজো নিরূপ্যমাণা ন ঘটনাং প্রাঞ্চন্তীত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৮০ ॥ ১৩

ভাষ্যানুবাদ

যেহেতু শাস্ত্র ও ব্যাসাদি মুনিগণ, যুক্তি ও শ্রুতি অনুসারে অব- ধারিত জীব ও পরমাত্মার অনন্যত্ববাদেরই তুল্যরূপে প্রশংসা অর্থাৎ স্তব করিয়া থাকেন; এবং শাস্ত্রবহির্ভূত কুতার্কিকগণ-কল্পিত সর্ব্ব- প্রাণিসাধারণ(প্রাণিমাত্রেই যাহা জানে, সেই) স্বাভাবিক ভেদ- দর্শনের ‘কিন্তু সেই দ্বিতীয় কিছু নাই’, ‘দ্বিতীয় হইতেই ভয় হয়,’ [‘যে লোক ইহাতে] অল্পমাত্রও ভেদদর্শন করে, তাহারই ভয় হইয়া থাকে।’ ‘এ সমস্তই এই আত্মস্বরূপ।’ ‘যে লোক ইহাতে ভেদের মতও দর্শন করে, সে লোক মৃত্যুর পরও মৃত্যুপ্রাপ্ত হয়।’ ইত্যাদি প্রকার শ্রুতি-বাক্য এবং অন্যান্য ‘ব্রহ্মবিদ্গণও নিন্দা করিয়া থাকেন, এই যে স্তুতি ও নিন্দা, তাহা উক্ত প্রকারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়; অর্থাৎ সরলভাবে শাস্ত্রার্থ বোধ করাই ন্যায্য। আর কুতার্কিকগণের পরিকল্পিত যে সমস্ত কুদৃষ্টি(ভেদদর্শন), বিচার করিয়া দেখিলে সে সমস্ত ঋজুতাযুক্ত(সরল) নহে এবং সামঞ্জস্যও লাভ করে না ॥৮০৷৷১৩

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৩৭

জীবাত্মনোঃ পৃথক্ত্বং যৎ প্রাগুৎপত্তেঃ প্রকীর্তিতম্। ভবিষ্যদ্বৃত্ত্যা গৌণং তন্মুখ্যত্বং হি ন যুজ্যতে ॥ ৮১ ॥ ১৪

সরলার্থঃ

প্রাক্(পূর্ব্বং কর্ম্মকাণ্ডে) উৎপত্তেঃ(উৎপত্তিবোধকোপনিষদ্বাক্যেভ্যঃ) জীবাত্মনোঃ(জীবস্য আত্মনশ্চ) যৎ পৃথত্ত্বং(ভেদঃ) প্রকীর্তিতং(কথিতং), তৎ (পৃথত্ত্বকীর্ত্তনং) ভবিষ্যদ্বৃত্ত্যা(সৃষ্ট্যুত্তরভাবি-দেহাদ্যুপাধিকৃতং ভেদম্ অনুসৃত্য উক্তং)[ভাবিনি ভূতবৎ উপচারাৎ ইতি ন্যায়াদিতি ভাবঃ] গৌণম্। হি (যস্মাৎ)[তস্য] মুখ্যত্বং(যথার্থত্বং) ন যুজ্যতে(ন সংগচ্ছতে),[উক্ত শ্রুত্যাদি বিরোধাৎ এবেতি ভাবঃ]।

উৎপত্তিবোধক উপনিষৎ-বাক্য হইতে যে,(কর্মকাণ্ডে) জীব ও আত্মার পার্থক্য কথিত হইয়াছে, তাহা ভবিষ্যৎ ভেদ অনুসারে, অর্থাৎ সৃষ্টির পর যে, দেহাদি উপাধি-ভেদে ভেদ হইবে, তদনুসারে বলা হইয়াছে বলিয়া গৌণ, বস্তুতঃ ঐ ভেদবাক্যের ঐরূপ মুখ্যার্থ হইতে পারে না ॥ ৮১ ॥ ১৪

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ননু শ্রুত্যাপি জীব-পরমাত্মনোঃ পৃথত্ত্বং যৎ প্রাগুৎপত্তেঃ উৎপত্যর্থোপনিষদ্- বাক্যেভ্যঃ পূর্ব্বং প্রকীর্তিতং কর্মকাণ্ডে অনেকশঃ কামভেদতঃ ‘ইদং কামঃ, অদঃ কামঃ’ ইতি পরশ্চ “স দাধার পৃথিবীং দ্যাম্” ইত্যাদিমন্ত্রবর্ণৈঃ; তত্র কথং কৰ্ম্ম-জ্ঞানকাণ্ড-বাক্যবিরোধে জ্ঞানকাণ্ডবাক্যার্থস্য এব একত্বস্য সামঞ্জস্যম্ অবধার্যত ইতি।

অত্রোচ্যতে-“যতো বা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে। “যথাগ্নেঃ ক্ষুদ্রা বিস্ফু- লিঙ্গাঃ।” “তস্মাদ বা এতস্মাদাত্মন আকাশঃ সম্ভূতঃ।” “তদৈক্ষত”, “তত্তেজোহ সৃজত” ইত্যাদ্যুৎপত্যর্থোপনিষদ্বাক্যেভ্যঃ প্রাক্ পৃথত্ত্বং কৰ্ম্মকাণ্ডে প্রকীর্তিতং যৎ, তৎ ন পরমার্থতঃ কিন্তুর্হি? গৌণম্; মহাকাশ-ঘটাকাশাদিভেদবৎ, যথৌদনং পচতীতি ভবিষ্যদ্বৃত্ত্যা, তদ্বৎ। ন হি ভেদবাক্যানাং কদাচিদপি মুখ্যভেদার্থত্বম্ উপপদ্যতে, স্বাভাবিকাবিদ্যাবৎ প্রাণিভেদদৃষ্ট্যনুবাদিত্বাৎ আত্মভেদবাক্যানাম্। ইহ চ উপনিষৎসু উৎপত্তিপ্রলয়াদিবাক্যৈঃ জীব-পরমাত্মনোঃ একত্বমেব প্রতিপিপাদয়ি- ষিতম্, “তত্ত্বমসি,” “অন্যোৎসাবন্যোহহমস্মীতি ন স বেদ” ইত্যাদিভিঃ; অত উপনিষৎসু একত্বং শ্রুত্যা প্রতিপিপাদয়িষিতং ভবিষ্যতীতি ভাবিনীমিব বৃত্তিমা- শ্রিত্য লোকে ভেদদৃষ্ট্যনুবাদো গৌণ এবেত্যভিপ্রায়ঃ।

১৩৮ কারিকোপেত-মাণ্ড ক্যোপনিষৎ

অথবা, “তদৈক্ষত, তত্তেজোহসৃজত” ইত্যাদিদুৎপত্তেঃ প্রাক্ “একমেবাদ্বিতীয়ম্” ইত্যেকত্বং প্রকীর্তিতম্। তদেব চ “তৎ সত্যং, স আত্মা, তত্ত্বমসি,” ইত্যেকত্বৎ ভবিষ্যতীতি তাং ভবিষ্যদ্বৃত্তিমপেক্ষ্য যজ্জীবাত্মনোঃ পৃথক্ত্বং যত্র কচিদ্ বাক্যে গম্যমানং তদেগৌণম্, যথা ওদনং পচতীতি, তদ্বৎ ॥ ৮১ ॥ ১৪

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, স্বয়ং শ্রুতিও যখন ইতঃপূর্ব্বে কর্মকাণ্ডে পুরুষের বহুবিধ কামনা-ভেদানুসারে ‘ইহার ইহা কামনা’ ‘অমুকের অমুক বিষয়ে কামনা’ ইত্যাদি উৎপত্তিবোধক উপনিষদ্বাক্য হইতে জীব ও পরমাত্মার পার্থক্য প্রতিপাদন করিয়াছেন, এবং ‘তিনি পৃথিবীকে এবং এই দ্যুলোককে ধারণ করিয়াছেন’, ইত্যাদি মন্ত্রে পরমেশ্বরকেও পৃথক্ নির্দেশ করিয়াছেন, তখন কর্মকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ডের বিরোধসত্ত্বে কেবল জ্ঞানকাণ্ডীয় বাক্যলব্ধ একত্বেরই সামঞ্জস্য অবধারিত হইতেছে কিরূপে?

এতদুত্তরে বলা হইতেছে—‘যাঁহা হইতে এই সমস্ত ভূত জন্মলাভ করে’, ‘অগ্নি হইতে যেমন ক্ষুদ্র বিস্ফুলিঙ্গসমূহ[নির্গত হয়]’, ‘সেই এই আত্মা হইতে আকাশ উৎপন্ন হইল,’ ‘তিনি আলোচনা করিয়াছিলেন,’ ‘তিনি তেজঃ সৃষ্টি করিলেন।’ উৎপত্তিবোধক এই সকল উপনিষদ্- বাক্য হইতে প্রথমতঃ কর্মকাণ্ডে যে পৃথক্ত্ব কথিত হইয়াছে, তাহা যথার্থ নহে; তবে কি? গৌণার্থক, অর্থাৎ মহাকাশ ও ঘটাকাশাদি ভেদের ন্যায় উহা গৌণ; যেমন, ‘ওদন(অন্ন) পাক করিতেছে’, এই স্থলে ভবিষ্যৎ অবস্থা(অন্নভাব) চিন্তা করিয়া ‘ওদন’ শব্দের প্রয়োগ করা হয়, ইহাও তদ্রূপ।[লোকে চাউলই পাক করিয়া থাকে, পাকের পর ওদন(ভাত) হয়; তথাপি ভাবী ওদনভাব মনে করিয়া তণ্ডুল-পাককেই ওদন-পাক বলিয়া ব্যবহার করিয়া থাকে; সৃষ্টির পূর্বকালীন জীব- পরমাত্মার বিভাগ-নির্দেশও তদ্রূপ]। কেন না, ভেদবোধক বাক্যগুলির মুখ্য ভেদার্থবোধকতা কস্মিন্ কালেও উপপন্ন হয় না; কারণ, আত্ম-- ভেদ-বোধক বাক্যগুলি কেবল প্রাণিগণের স্বভাবসিদ্ধ যে ভেদদর্শন...

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৩৯

তাহারই অনুবাদক মাত্র। অভিপ্রায় এই যে, এই জ্ঞানকাণ্ডীয় উপনিষৎসমূহের উৎপত্তি-প্রলয়-বোধক ‘তুমি সেই ব্রহ্মস্বরূপ,’[ ‘যে মনে করে’] ‘ব্রহ্ম অন্য, আর আমি অন্য, সে জানে না’, ইত্যাদি বাক্যনিচয় দ্বারা কেবল জীব ও পরমাত্মার একত্ব প্রতিপাদন করাই অভিপ্রেত; অতএব উক্ত উপনিষৎসমূহে শ্রুতিকর্তৃক জীব-পরমাত্মার একত্বই প্রতিপাদিত হইবে, তাই ভাবী একত্ব বৃত্তি অবলম্বন করিয়াই যেন লোকপ্রসিদ্ধ এই ভেদদর্শনের অনুবাদ করা হইয়াছে, অতএব, ইহা নিশ্চয়ই গৌণার্থক(মুখ্যার্থক নহে)।

অথবা, “একম্ এব অদ্বিতীয়ম্” ইত্যাদি শ্রুতিতে—‘তিনি আলোচনা করিয়াছিলেন,’ ‘তিনি তেজঃ সৃষ্টি করিলেন’ ইত্যাদি শ্রুতি- কথিত উৎপত্তির পূর্ব্বেই একত্ব প্রতিপাদিত হইয়াছে, সেই একত্বই আবার ‘তিনি সত্য, তিনি আত্মা, তুমি তৎস্বরূপ” এই স্থলে অভিহিত হইবে, এই ভবিষ্যৎকালীন একত্বকে অপেক্ষা করিয়াই যে কোনও বাক্যে জীব ও পরমাত্মার যে পৃথক্ত্ব অবগত হওয়া যায়, তাহা গৌণ; যেমন ‘ওদন পাক করিতেছে’ বাক্য, ইহাও তদ্রূপ ॥ ৮১ ॥ ১৪

মূল্লোহবিস্ফুলিঙ্গাদ্যৈঃ সৃষ্টির্ধা চোদিতান্যথা। উপায়ঃ সোহবতারায় নাস্তি ভেদঃ কথঞ্চন ॥ ৮২ ॥ ১৫

সরলার্থঃ

[পুরা(প্রথমং)] মূল্লোহ-বিস্ফুলিঙ্গাদ্যৈঃ(মৃত্তিকা-লোহাদি-দৃষ্টান্তৈঃ) অন্যথা(অভেদে ভেদং সমারোপ্য) যা সৃষ্টিঃ(সর্গক্রমঃ) চোদিতা(উক্তা), সঃ(সর্ব্বঃ সৃষ্টিপ্রকারঃ)[কেবলং] অবতারায়(বুদ্ধ্যারোহার্থং) উপায়ঃ(সাধনং); [বস্তুতস্তু] কথঞ্চন(কথমপি) ভেদঃ(পৃথত্ত্বং) ন অস্তি(ন বিদ্যতে)। প্রথমে মৃত্তিকা, লৌহ ও বিস্ফুলিঙ্গাদি দৃষ্টান্ত দ্বারা যে ভিন্ন ভিন্ন প্রকারে সৃষ্টি প্রকাশিত হইয়াছে, তাহা কেবল বুদ্ধি-প্রবেশের উপায় মাত্র; বস্তুতঃ, উহাতে কিছুমাত্র ভেদ নাই ॥ ৮২ ॥১৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ননু যদ্যুৎপত্তেঃ প্রাক্ অজং সর্ব্বমেকমেব অদ্বিতীয়ং, তথাপি উৎপত্তেরুদ্ধং।

১৪০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

জাতমিদং সর্ব্বৎ জীবাশ্চ ভিঃ। ইতি। মৈবম্; অন্যার্থত্বাৎ উৎপত্তিশ্রুতীনামা পূর্ব্বমপি পরিহৃত এবায়ং দোষঃ-স্বপ্নবৎ আত্মমায়াবিসজ্জিতাঃ সঙ্ঘাতাঃ, ঘটা- কাশোৎপত্তিভেদাদিবৎ জীবানামুৎপত্তিভেদাদিরিতি। ইত এব উৎপত্তি-ভেদাদি- শ্রুতিভ্য আকৃষ্য ইহ পুনরুৎপত্তিশ্রুতীনামৈদম্পর্য্যপ্রতিপিপাদয়িষয়োপন্যাসঃ। মূল্লো- হবিস্ফুলিঙ্গাদি দৃষ্টান্তোপন্যাসৈ: সৃষ্টিঃ যা চ উদিতা প্রকাশিতা কল্পিতা অন্যথা অন্যথা ‘চ, স সর্ব্বঃ সৃষ্টিপ্রকারো জীবপরমাত্মিকত্ব-বুদ্ধ্যবতারায় উপায়োহস্মাকম্, যথা প্রাণসংবাদে বাগাদ্যাসুর-পাপ্নাবেধাদ্যাখ্যায়িকা কল্পিতা প্রাণবৈশিষ্ট্যবোধাবতারায়। তদপি অসিদ্ধমিতি চেৎ; ন, শাখাভেদ্বন্যথা অন্যথা চ প্রাণাদিসংবাদশ্রবণাৎ। যদি হি বাদঃ পরমার্থ এবাভূৎ, একরূপ এব সংবাদঃ সর্ব্বশাখাসু অশ্রোষ্যৎ, বিরুদ্ধা- নেকপ্রকারেণ নাশ্রোষ্যৎ, ক্রয়তে তু; তস্মাৎ ন তাদর্থ্যং সংবাদশ্রুতীনাম্। তথোৎ পত্তিবাক্যানি প্রত্যেতব্যানি। কল্পসর্গভেদাৎ সংবাদশ্রুতীনাম্ উৎপত্তিশ্রুতীনাঞ্চ প্রতিসর্গমন্যথাত্বমিতি চেৎ, ন নিষ্প্রয়োজনত্বাৎ যথোক্তবুদ্ধ্যবতার-প্রয়োজন-ব্যতি- রেকেণ। ন হন্যপ্রয়োজনবত্ত্বং সংবাদোৎপত্তিশ্রুতীনাং কল্পয়িতুম্। তথাত্ব- প্রতিপত্তয়ে ধ্যানার্থমিতি চেৎ, ন, কলহোৎপত্তিপ্রলয়ানাং প্রতিপত্তিরনিষ্টত্বাৎ। তস্মাৎ উৎপত্যাদিশ্রুতয় আত্মৈকত্ববুদ্ধ্যবতারায়ৈব, ন অন্যার্থাঃ কল্পয়িতুং যুক্তাঃ। অতো নাস্তি উৎপত্যাদিকৃতো ভেদঃ কথঞ্চন ॥ ৮২ ৷ ১৫

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, উৎপত্তির পূর্ব্বে যদিও সমস্ত জগৎই এক অদ্বিতীয় অজ- স্বরূপ থাকুক, তথাপি উৎপত্তির পরে উৎপন্ন এই সমস্ত জগৎ এবং জীবগণ ত পৃথক্ই বটে। না—এরূপ হইতে পারে না; কেননা, উৎ- পত্তিবোধক শ্রুতিসমূহের তাৎপর্য্য অন্যপ্রকার,(ভেদ-প্রতিপাদনে নহে)। এই দেহাদি সংঘাতসমষ্টি স্বপ্ন ও মায়াসদৃশ, এবং জীবগণের যে উৎপত্তি ও ভেদ প্রভৃতি, তাহাও ঘটাকাশের উৎপত্তি ও ভেদাদির অনুরূপ,(বাস্তবিক নহে,) ইত্যাদি প্রকারে ইতঃপূর্ব্বেই উক্ত দোষের সমাধান করা হইয়াছে। সেখান হইতেই উৎপত্তি-ভেদাদি-বোধক শ্রুতিসমূহ আকর্ষণপূর্ব্বক এখানে উৎপত্তিবোধক শ্রুতিসমূহেরও উক্ত প্রকার তাৎপর্য্য প্রতিপাদনার্থই উল্লেখ করা হইয়াছে।[ইতঃপূর্ব্বে] মৃত্তিকা, লোহ ও বিস্ফুলিঙ্গাদি দৃষ্টান্ত প্রদর্শনর্বপূক যে ভিন্ন ভিন্ন

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৪১.

প্রকারে সৃষ্টিপ্রণালী প্রকাশিত হইয়াছে; সেই সমস্ত সৃষ্টিপ্রকারই কেবল জীব ও পরমাত্মার একত্ব-বিষয়ে আমাদের বুদ্ধি প্রবেশের উপায়স্বরূপ, প্রাণের শ্রেষ্ঠত্ব-বিষয়ে বুদ্ধিপ্রবেশার্থ ‘প্রাণসংবাদে’ বাগাদি ইন্দ্রিয়সম্বন্ধে যেরূপ আসুরপাপস্পর্শাদির আখ্যায়িকা বিরচিত হইয়াছে, ইহাও তদ্রূপ *। যদি বল, তাহাও হইতে পারে না; না—তাহা নহে; কারণ, ভিন্ন ভিন্ন শাখাতেও এক প্রাণসংবাদই বিভিন্নপ্রকার শুনিতে পাওয়া যায়; কিন্তু, ঐ প্রাণসংবাদ যদি যথার্থই হইত, তাহা হইলে সমস্ত শাখায় একপ্রকারেরই প্রাণসংবাদ শোনা যাইত, পরস্পর বিরুদ্ধ অনেকপ্রকার কখনই শোনা যাইত না; পরন্তু ঐরূপই শ্রুত হইয়া থাকে। অতএব, প্রাণসংবাদাদিপ্রতিপাদক শ্রুতিসমূহের যথার্থতা বিষয়ে তাৎপর্য্য নহে, জগদুৎপত্তিবোধক শ্রুতিসমূহের অবস্থাও ঐরূপ বুঝিতে হইবে।

যদি বল, বিভিন্নকল্পীয় সৃষ্টিভেদানুসারে প্রাণসংবাদাদি শ্রুতিসমূহ এবং উৎপত্তিবোধক শ্রুতিসমূহেরও প্রত্যেক সৃষ্টিতেই ত অন্যথাত্ব হইয়া থাকে; না—পূর্ব্বে যে বুদ্ধ্যারোহরূপ প্রয়োজনের উল্লেখ করা হইয়াছে, তদ্ভিন্ন ঐরূপ প্রয়োজন-কল্পনার কিছুমাত্র আবশ্যক নাই; কেননা, প্রাণসংবাদও উপত্যাদি শ্রুতিসমূহের কখনই অন্যরূপ প্রয়োজন কল্পনা করা যাইতে পারে না। আর তাদৃশ অবস্থা-প্রাপ্তির হেতুভূত ধ্যানার্থ ই যে ঐরূপ বলা হইয়াছে, তাহাও নহে; কারণ, কলহ(বিবাদ), উৎপত্তি ও প্রলয়প্রাপ্তি কখনই ইষ্ট হইতে পারে না;(বরং সকলেরই

১৪২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

অনিষ্ট)। অতএব আত্মৈকত্ব বিষয়ে বুদ্ধিপ্রবেশের জন্যই উৎপত্ত্যাদি- বোধক শ্রুতিসমূহ; উহাদের অন্যপ্রকার অর্থ কল্পনা করা যুক্তিসম্মত হয় না। অতএব কোন প্রকারেই উৎপত্তি প্রভৃতি দ্বারা ভেদ সম্ভাবিত হয় না ॥ ৮২ ॥ ১৫

আশ্রমাস্ত্রিবিধা হীন-মধ্যমোৎকৃষ্টদৃষ্টয়ঃ। উপাসনোপদিষ্টেয়ং তদর্থমনুকম্পয়া॥ ৮৩॥ ১৬

সরলার্থঃ

হীন-মধ্যমোৎকৃষ্টদৃষ্টয়ঃ(হীনা অপকৃষ্টা, মধ্যমা উৎকৃষ্টা চ দৃষ্টিঃ দর্শনশক্তিঃ যেষাং তে তথোক্তাঃ) ত্রিবিধাঃ(ত্রিপ্রকারাঃ) আশ্রমাঃ(আশ্রমিণঃ—ব্রহ্মচারি- গৃহি-বানপ্রস্থরূপাঃ)[অন্যে চ বর্ণিনঃ সন্তি;][শ্রুত্যা] অনুকম্পয়া(হীন- মধ্যমৌ অপি উত্তমাং দৃষ্টিং লভেতাং, ইতি করুণয়া) তদর্থম্(হীন-মধ্যমোপ- কারার্থং) ইয়ম্(যথোক্তপ্রকারা) উপাসনা উপদিষ্টা(বিহিতা)।

অধিকারিগণের হীন, মধ্যম ও উত্তম দর্শনশক্তি অনুসারে তিন প্রকার আশ্রম (আশ্রমী) আছে; শ্রুতি দয়াপূর্ব্বক হীন ও মধ্যমাধিকারীর উপকারার্থ এই উপাসনার উপদেশ দিয়াছেন; কিন্তু, উত্তমাধিকারীর পক্ষে ভেদসাপেক্ষ উপাসনার বিধান নাই ॥ ৮৩॥ ১৬

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যদি হি পর এবাত্মা নিত্যশুদ্ধবুদ্ধমুক্তস্বভাব একঃ পরমার্থতঃ সন্ “একমেবা- দ্বিতীয়ম্” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ, অসদন্যৎ, কিমর্থেয়মুপাসনা উপদিষ্টা?-“আত্মা বা অরে দ্রষ্টব্যঃ।” “য আত্মা অপহতপাপ্না”, “স ক্রতুং কুব্বীত।” “আত্মেত্যেবো- পাসীত” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ, কর্মাণি চাগ্নিহোত্রাদীনি? শৃণু তত্র কারণম্-আশ্রমা আশ্রমিণোহধিকৃতাঃ, বর্ণিনশ্চ মার্গগাঃ, আশ্রমশব্দস্য প্রদর্শনার্থত্বাৎ, ত্রিবিধাঃ। কথং? হীনমধ্যমোৎকৃষ্টদৃষ্টয়ঃ; হীনা নিকৃষ্ট’, মধ্যমা উৎকৃষ্টা চ দৃষ্টিঃ দর্শনসামর্থ্যং যেষাং, তে, মন্দ-মধ্যমোত্তম-বুদ্ধিসামর্থ্যোপেতা ইত্যর্থঃ। উপাসনা উপদিষ্টেয়ং, তদর্থং মন্দ-মধ্যমদৃষ্ট্যাশ্রমাদ্যর্থং কৰ্ম্মাণিচ। ন চ ‘আত্মৈক এবাদ্বিতীয়ঃ’ ইতি নিশ্চিতোত্তম-দৃষ্ট্যর্থম্। দয়ালুনা বেদেন অনুকম্পয়া সম্মার্গগাঃ সন্তঃ কথমিমাম্ উত্তমাম্ একত্বদৃষ্টিং প্রাপ্নু য়ুরিতি। “যন্মনসা ন মনুতে যেনাহুৰ্মনো মতম্। তদেব

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৪৩

বক্ষ ত্বং বিদ্ধি, নেদং যদিদমুপাসতে,” “তত্ত্বমসি,” “আত্মৈবেদং সর্ব্বম্” ইত্যাদি- শ্রুতিভ্যঃ ॥ ৮৩ ॥ ১৬

ভাষ্যানুবাদ

“একম্ এব অদ্বিতীয়ম্” ইত্যাদি শ্রুতি অনুসারে যদি নিত্যশুদ্ধ, নিত্যবুদ্ধ ও নিত্যমুক্ত পরমাত্মাই একমাত্র সত্য হন, এবং তদ্ভিন্ন অপর সমস্তই যদি অসত্য হয়, তাহা হইলে ‘আত্মাকে দর্শন করিবে’, ‘যে আত্মা অপহতপাপ্মা(নিষ্পাপ)’, ‘তিনি চিন্তা করিবেন’, ‘আত্মা বলিয়াই উপাসনা করিবে,’ ইত্যাদি শ্রুতিতে উপাসনার এবং অগ্নি হোত্রাদি কর্ম্মের উপদেশ কিসের জন্য? হাঁ, তাহার কারণ শ্রবণ কর, -আশ্রম অর্থাৎ অধিকারী আশ্রমী(যাহারা ব্রহ্মচর্য্যাদি আশ্রমগ্রহণে অধিকারী) এবং সৎপথবর্তী[অপরাপর] বর্ণভুক্ত লোকসমূহ ত্রিবিধ- তিন প্রকার। কি প্রকারে?-[যেহেতু তাহারা] হীন, মধ্যম ও উৎকৃষ্ট দৃষ্টিসম্পন্ন, অর্থাৎ যাহাদের দৃষ্টি-দর্শন-শক্তি হীন-নিকৃষ্ট, মধ্যম ও উত্তম, সেই সমস্ত মন্দ, মধ্যম ও উত্তম বুদ্ধি-সামর্থ্য-সম্পন্ন লোকসকল। তাহাদের জন্য অর্থাৎ সেই সকল মন্দ ও মধ্যম বুদ্ধিশক্তি-সম্পন্ন আশ্রমীদিগের উদ্দেশে, এই উপাসনা ও কৰ্ম্মসমূহ উপদিষ্ট হইয়াছে; কিন্তু, ‘আত্মা এক অদ্বিতীয়’, এই প্রকার নিশ্চয়া- ত্মক উত্তমদৃষ্টিসম্পন্নদিগের উদ্দেশে নহে।[মন্দ ও মধ্যম দৃষ্টিসম্পন্ন লোকেরাও] সৎপথাবলম্বী হইয়া কি প্রকারে এই উত্তম দৃষ্টিলাভ করিতে পারে, এই প্রকার দয়াপরবশ হইয়া বেদ ‘যাহাকে মনের দ্বারা চিন্তা করা যায় না, পরন্তু[পণ্ডিতগণ] মনও যাহ। দ্বারা প্রকাশিত হয়, বলিয়া থাকেন, তুমি তাঁহাকেই ব্রহ্ম বলিয়া জানিবে; কিন্তু যাহাকে ‘ইদং বলিয়া(পরিচ্ছিন্নভাবে) উপাসনা কর, তাহাকে নহে।’ ‘তুমি তৎস্বরূপ’, ‘এই সমস্তই আত্মস্বরূপ’ ইত্যাদি শ্রুতিদ্বারা[উপাসনা ও কর্ম্মের বিধান করিয়াছেন] * ॥ ৮৩৷ ১৬

* তাৎপর্য্য—যাহারা আত্মৈকত্ব জ্ঞানে অনধিকারী—মন্দ ও মধ্যম, তাহারা

১৪৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

স্বসিদ্ধান্তব্যবস্থাসু দ্বৈতিনো নিশ্চিতা দৃঢ়ম্। পরস্পরং বিরুধ্যন্তে তৈরয়ং ন বিরুধ্যতে ॥ ৮৪ ॥ ১৭

সরলার্থঃ

দ্বৈতিনঃ(ভেদবাদিনঃ) স্বসিদ্ধান্তব্যবস্থাসু(স্বস্ববুদ্ধিপরিকল্পিত-সিদ্ধান্ত- ভেদেযু) দৃঢ়ৎ(যদা স্যাৎ, তথা) নিশ্চিতাঃ(‘ইদমেব তত্ত্বং’ ইতি কৃতনিশ্চয়াঃ সন্তঃ), পরস্পরম্(অন্যোন্যং) বিরুধ্যন্তে(মমৈব সিদ্ধান্তঃ সাধীয়ান্, নতু অন্যেষাৎ দ্বৈতিনামপি, ইত্থং বিরোধং কুর্ব্বন্তি)। অয়ং(অস্মদীয়ঃ আত্মৈকত্বপক্ষঃ)[পুনঃ] তৈঃ(পরস্পর-বিরোধিভিঃ সহ) ন বিরুধ্যতে,[এতদনন্যভূতত্ত্বাৎ তেষামিতি ভাবঃ]।

দ্বৈতবাদিগণ আপন আপন বিভিন্নপ্রকার সিদ্ধান্তে দৃঢ়নিশ্চিত হইয়া পরস্পরে বিরোধ করিয়া থাকেন; কিন্তু, এই আত্মৈকত্বদর্শী তাঁহাদের সহিত বিরোধ করেন না; কারণ, তাঁহাদের উপর ত ইঁহার আর পার্থক্য বোধ নাই ॥ ৮৪ ॥ ১৭

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

শাস্ত্রোপপত্তিভ্যাম্ অবধারিতত্বাৎ অদ্বয়াত্মদর্শনং সম্যগ্দর্শনং, তদ্বাহ্যত্বাৎ মিথ্যাদর্শনমন্যৎ। ইতশ্চ মিথ্যাদর্শনং দ্বৈতিনাং-রাগদ্বেষাদি দোষাস্পদত্বাৎ। কথং, স্বসিদ্ধান্তব্যবস্থাসু স্বসিদ্ধান্তরচনানিয়মেষু কপিল-কণাদ-বুদ্ধার্হতা।দ-দৃষ্ট্যনুসারিণো দ্বৈতিণো নিশ্চিতাঃ, ‘এবম্ এবৈষ পরমার্থো নান্যথা’ ইতি তত্র তত্র অনুরক্তাঃ প্রতিপক্ষঞ্চ আত্মনঃ পশ্যন্তস্তং দ্বিষন্তঃ ইত্যেবং রাগদ্বেষোপেতাঃ স্বসিদ্ধান্তদর্শন- নিমিত্তমেব পরস্পরম্ অন্যোন্যং বিরুধ্যন্তে। তৈঃ অন্যোন্যবিরোধিভিঃ অস্মদীয়োহয়ং বৈদিকঃ সর্ব্বানন্যত্বাদ আত্মৈকত্বদর্শনপক্ষো ন বিরুধ্যতে। যথা স্বহস্তপাদাদিভিঃ। এবং রাগদ্বেষাদিদোষানাস্পদত্বাৎ আত্মৈকত্ববুদ্ধিরেব সম্যগ- দর্শনমিত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৮৪ ॥ ১৭

ভাষ্যানুবাদ

শাস্ত্র এবং যুক্তিদ্বারা অবধারিত হয় বলিয়া এই অদ্বিতীয় আত্মদর্শনই প্রথমতঃ কৰ্ম্ম দ্বারা চিত্তকে নির্মূল ও স্থির করিয়া ক্রমে উপাসনার দিকে অগ্রসর হইবে। উপাসনায় সিদ্ধিলাভ করিয়া ক্রমে ‘আত্মৈকত্ব’-জ্ঞান লাভ করিতে সমর্থ হইবে। কাহার কতটুকু অধিকার আছে, তাহা নিজেই বুঝিতে পারে, না বুঝিলে, গুরুর আশ্রয় গ্রহণ করিতে হইবে।

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৪৫

সম্যগদর্শন বা যথার্থ জ্ঞান, ইহার বহির্ভূত বলিয়া অপর সমস্ত জ্ঞানই মিথ্যা। এই কারণেও দ্বৈতবাদীদিগের দর্শন মিথ্যা দর্শন; যেহেতু তাহা রাগ-দ্বেষাদি দোষের বিষয়ীভূত। কি প্রকারে?—স্ব-সিদ্ধান্ত-ব্যবস্থা সমূহে, অর্থাৎ নিজ নিজ সিদ্ধান্ত-প্রণয়নের নিয়মে কপিল, কণাদ, বুদ্ধ, আর্হত(জৈনবিশেষ) প্রভৃতির পথানুসারী দ্বৈতবাদিগণ নিশ্চিত হইয়া—এই প্রকার সিদ্ধান্তই যথার্থ সত্য, অন্যপ্রকার নহে, এই প্রকার নিশ্চয়ানুসারে তাহাতেই অনুরক্ত হইয়া, আবার স্বমতের প্রতিপক্ষ দর্শনে তাহার প্রতি বিদ্বেষ করিতে থাকে। এইরূপে রাগ-দ্বেষপরায়ণ হইয়া স্বসিদ্ধান্ত ব্যবহার জন্য পরস্পর বিরোধ করিয়া থাকে। আত্মৈকত্বদর্শনে সমস্তই যখন অনন্য বা অভিন্ন হইয়া যায়, তখন আমাদের এই বেদসিদ্ধ আত্মৈকত্ব দর্শন পক্ষটি নিজের হস্তপদাদির ন্যায়[অনন্যভূত] সেই পরস্পর-বিরোধী দ্বৈতবাদিগণের সহিত বিরুদ্ধ হয় না। অভিপ্রায় এই যে, এই প্রকারে রাগদ্বেষাদি দোষের আশ্রয় না হওয়ায়, এই আত্মৈকত্ব-দর্শনই যথার্থ দর্শন(জ্ঞান),(তদ্ভিন্ন সমস্ত জ্ঞানই মিথ্যাজ্ঞান) ॥ ৮৪ ॥ ১৭

অদ্বৈতং পরমার্থো হি দ্বৈতং তদ্ভেদ উচ্যতে। তেষামুভয়থা দ্বৈতং তেনায়ং ন বিরুধ্যতে ॥ ৮৫ ॥ ১৮

সরলার্থঃ

[অবিরোধে হেতুমাহ—অদ্বৈতমিত্যাদি।—হি(যস্মাৎ) অদ্বৈতং(দ্বৈতা- ভাবঃ) পরমার্থঃ(সত্যং), দ্বৈতং(প্রপঞ্চভেদঃ) তদ্ভেদঃ(তস্য অদ্বৈতস্য ভেদঃ— কার্য্যং) উচ্যতে(কথ্যতে)[বিবেকিভিরিতিশেষঃ]। তেষাং(দ্বৈতিনাং) [পুনঃ] উভয়থা(পরমার্থতঃ অপরমার্থতশ্চ) দ্বৈতং[এব], তেন(হেতুনা) অয়ং(অস্মৎপক্ষঃ) ন বিরুধ্যতে[দ্বৈতিভিরিতি শেষঃ]॥

যেহেতু,[আমাদের মতে] অদ্বৈতই প্রকৃত সত্য, দ্বৈত কেবল তাহার ভেদ বা কার্য্য বলিয়া কথিত হয়; আর দ্বৈতবাদিগণের মতে[পরমার্থ, অপরমার্থ] উভয়রূপে কেবলই দ্বৈত,(অদ্বৈত নহে), সেই হেতুই আমাদের পক্ষ তাহাদের সহিত বিরুদ্ধ হয় না ॥ ৮৫ ॥ ১৮

১০

১৪৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যাপনিষৎ

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কেন হেতুনা তৈঃ ন বিরুধ্যতে ইত্যুচ্যতে-অদ্বৈতং পরমার্থঃ, হি যস্মাদ দ্বৈতং নানাত্বম্ তস্য অদ্বৈতস্য ভেদঃ তদ্ভেদঃ, তস্য কার্য্যমিত্যর্থঃ, “একমেবা- দ্বিতীয়ম্,” “তৎ তেজোহসৃজত” ইতি শ্রুতেঃ; উপপত্তেশ্চ, স্বচিত্তস্পন্দনাভাবে সমাধৌ মুচ্ছায়াং সুষুপ্তৌ বা অভাবাৎ। অতস্তম্ভেদ উচ্যতে দ্বৈতম্। দ্বৈতিনাং তু তেষাং পরমার্থতঃ অপরমার্থতশ্চ উভয়থাপি দ্বৈতমেব, যদি চ তেষাং ভ্রান্তানাং দ্বৈতদৃষ্টিঃ, অস্মাকমদ্বৈতদৃষ্টিঃ অভ্রান্তানাং, তেনায়ং হেতুনা অস্মৎপক্ষো ন বিরুধ্যতে তৈঃ, “ইন্দ্রো মায়াভিঃ” “ন তু তদ্বিতীয়মস্তি” ইতি শ্রুতেঃ। যথা মত্তগজারূঢ় উন্মত্তৎ ভূমিষ্ঠং ‘প্রতিগজারূঢ়োহহং, গজং বাহয় মাং প্রতি’ ইতি ব্রুবাণমপি তৎ প্রতি ন বাহয়তি অবিরোধবুদ্ধ্যা, তদ্বৎ। ততঃ পরমার্থতো ব্রহ্মবিদাত্মৈব দ্বৈতিনাম্। তেনায়ং হেতুনা অস্মৎপক্ষো ন বিরুধ্যতে তৈঃ ॥ ৮৫ ॥ ১৮ ॥

ভাষ্যানুবাদ

কি কারণে তাহাদের সহিত বিরোধ হয় না, তাহা কথিত হইতেছে —‘হি’ অর্থ যেহেতু; যেহেতু অদ্বৈতই পরমার্থ সত্য, দ্বৈত—নানাত্ব কেবল তাহার—অদ্বৈতেরই ভেদ, অর্থাৎ তাহারই কার্য্য; যেহেতু ‘এক অদ্বিতীয়ই,’ ‘তিনি তেজ সৃষ্টি করিলেন,’ এই শ্রুতি হইতে এবং সমাধি, মূর্চ্ছা ও সুষুপ্তি সময়ে স্বীয় চিত্তের ক্রিয়া স্থগিত হইয়া গেলে কোন দ্বৈতেরই অস্তিত্ব থাকে না; এই জাতীয় যুক্তি হইতেও ইহা সমর্থিত হয়। অতএব, দ্বৈত জগৎ তাহারই কার্য্য বলিয়া কথিত হয়। কিন্তু সেই সমুদয় দ্বৈতবাদীর মতে উভয়প্রকারেই—পরমার্থরূপে ও অপরমার্থরূপে কেবলই দ্বৈত(পদার্থ); দ্বৈতদৃষ্টি যখন ভ্রান্তদিগের, আর অদ্বৈতদৃষ্টি যখন অভ্রান্ত আমাদের[অভিমত], তখন সেই হেতুতেই আমাদের পক্ষ তাহাদের সহিত বিরুদ্ধ হয় না। ‘ঈশ্বর মায়া দ্বারা[বহুরূপ হন],’ ‘কিন্তু তাঁহার ত আর দ্বিতীয় নাই,’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতে(দ্বৈতের অসত্যতা প্রতিপন্ন হইতেছে)। মদমত্ত গজে আরূঢ় ব্যক্তিকে যদি ভূমিষ্ঠ কোন মদমত্ত ব্যক্তি বলে— ‘তোমার প্রতিকূলে আমিও গজে আরোহণ করিয়াছি, তুমি আমার

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৪৭

দিকে হস্তী পরিচালিত কর,’ এই কথা বলিলেও সেই গজারূঢ় ব্যক্তি যেমন তাহার দিকে হস্তী চালনা করে না; কারণ, সে বুঝিয়াছে যে, প্রকৃতপক্ষে আমার কেহ বিরোধী বা প্রতিপক্ষ নাই, ইহাও ঠিক তদ্রূপ। অতএব প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্মবিৎ পুরুষ দ্বৈতবাদিগণের আত্ম- স্বরূপই বটে, সেই হেতুই আমাদের পক্ষ তাহাদের সহিত বিরুদ্ধ হয় না ॥ ৮৫ ॥১৮

মায়য়া। ভিখাতে হেতন্নান্যথাজং কথঞ্চন।

তত্ত্বতো ভিদ্যমানে হি মর্ত্ত্যতামৃতং ব্রজেৎ ॥ ৮৬ ॥ ১৯

সরলার্থঃ

[অদ্বৈতভেদে কারণমাহ—মায়য়েতি।]—এতৎ অজম্(অদ্বৈতং সৎ) মায়য়া(অবিদ্যাশক্ত্যা) ভিদ্যতে(নানাত্বং গচ্ছতি), কথঞ্চন(কথমপি) অন্যথা নহি(নৈব), হি(যস্মাৎ) তত্ত্বতঃ(বস্তুতঃ) ভিদ্যমানে(অদ্বৈতে দ্বৈততাং গতে সতি) অমৃতং(অবিনাশি অজং) মর্ত্যতাৎ(মরণশীলতাং) ব্রজেৎ (গচ্ছেৎ)।[অজমপি বিনশ্যেত ইতি ভাবঃ]।

এই অজ(জন্মরহিত) অদ্বৈতই মায়া দ্বারা বিবিধ ভেদ প্রাপ্ত হইয়া থাকেন, কিন্তু ইহার অন্যথা নহে, অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষেই ভেদপ্রাপ্ত হন না; কারণ, অদ্বৈত যদি প্রকৃতই ভেদপ্রাপ্ত হইতেন, তাহা হইলেই নিশ্চয়ই সেই অমৃতস্বরূপ অদ্বৈতও মরণশীলতা(বিনশ্বরত্ব) প্রাপ্ত হইতেন ॥ ৮৬॥ ১৯

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

দ্বৈতমদ্বৈতভেদ ইত্যুক্তে দ্বৈতমপ্যদ্বৈতবৎ পরমার্থসদিতি স্যাৎ কস্যচিৎ আশঙ্কা, ইত্যত আহ-যৎ পরমার্থসৎ অদ্বৈতং, মায়য়া ভিদ্যতে হোতৎ তৈমিরিকানেকচন্দ্রবৎ রজ্জুঃ সর্পধারাদিভির্ভেদৈরিব; ন পরমার্থতঃ, নিরবয়বত্বাদাত্মনঃ। সাবয়বং হব্যয়বান্যথাত্বেন ভিদ্যতে, যথা মৃৎ ঘটাদিভেদৈঃ। তস্মাৎ নিরবয়বমজং নান্যথা কথঞ্চন, কেনচিদপি প্রকারেণ ন ভিদ্যতে ইত্যভিপ্রায়ঃ। তত্ত্বতো ভিদ্যমানং হি অমৃতম্ অজমদ্বয়ং স্বভাবতঃ সৎ মর্ত্যতাং ব্রজেৎ, যথা অগ্নিঃ শীততাম্। তচ্চানিষ্টং স্বভাববৈপরীত্যগমনম্, সর্ব্বপ্রমাণবিরোধাৎ। অজমব্যয়ম্ আত্মতত্ত্বং মায়য়ৈব ভিদ্যতে, ন পরমার্থতঃ। তস্মাৎ ন পরমার্থসদ্দ্বৈতম্ ॥ ৮৬ ॥ ১৯

১৪৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ভাষ্যানুবাদ

এই দ্বৈত জগৎ অদ্বৈতেরই ভেদ বা কার্য্য, একথা বলিলে কাহারও মনে শঙ্কা হইতে পারে যে, অদ্বৈতের ন্যায় তৎকার্য্য দ্বৈতও বোধ হয়, সত্য পদার্থ; এইজন্যই বলিতেছেন—পরমার্থ সত্য যে অদ্বৈত, সেই অদ্বৈতই তৈমিরিক-রোগীর দৃষ্ট বহু চন্দ্রের ন্যায়, এবং সর্প ও জলধারাদিরূপে বিকল্পিত রজ্জুর ন্যায় মায়া দ্বারা বিভেদ(নানাত্ব) প্রাপ্ত হন। কিন্তু এই ভেদ পারমার্থিক নহে; কারণ, আত্মা স্বভাবতঃই নিরবয়ব(অংশহীন); সাবয়ব পদার্থই অবয়বের পরিবর্তনে ভেদপ্রাপ্ত হইয়া থাকে, মৃত্তিকা যেমন ঘটাদিভেদে পরিণত হয়, তদ্রূপ। অতএব, নিরবয়ব অজ(আত্মা) অন্য কোন প্রকারেই ভেদপ্রাপ্ত হয় না, ইহাই উক্ত বাক্যের অভিপ্রায়। আর যদি বাস্তবিকই ভেদপ্রাপ্ত হইত, তাহা হইলে অজ অদ্বয় বস্তু স্বভাবতঃ অমৃত(অনশ্বর) হইয়াও অগ্নির শীতলতাপ্রাপ্তির ন্যায় মর্ত্যতা (মরণশীলতা) প্রাপ্ত হইত। স্বভাবের যে বিপর্যয়, তাহা ত কাহারই ইষ্ট(অভিলষিত) নহে। কারণ, তাহা হইলে সমস্ত প্রমাণের সহিত বিরোধ উপস্থিত হয়।[অতএব বুঝিতে হইবে] অজ অদ্বয় আত্মতত্ত্ব কেবল মায়া দ্বারাই নানাত্ব প্রাপ্ত হইয়া থাকে; বস্তুতঃ নহে। এই কারণেই দ্বৈত জগৎ পরমার্থ সৎ নহে ॥ ৮৬ ॥১৯

অজাতস্যৈব ভাবস্য জাতিমিচ্ছন্তি বাদিনঃ। অজাতো হ্যমৃতো ভাবো মর্ত্ত্যতাং কথমেষ্যতি ॥ ৮৭ ॥ ২০

সরলার্থঃ

[ বিপক্ষে বাধকমাহ]—বাদিনঃ(দ্বৈতিনঃ) অজাতস্য(জন্মরহিতস্য) এক (নিশ্চয়ে) ভাবস্য(সত্যবস্তুনঃ ব্রহ্মণঃ) জাতিং(জন্ম) ইচ্ছন্তি,[কিন্তু] অজাতঃ (জন্মরহিতঃ) অমৃতঃ(মরণরহিতঃ) হি(এব)[চ] ভাবঃ(আত্মা) কথং (কেন প্রকারেণ) মর্ত্যতাং(মরণশীলতাং) এষ্যতি(প্রাপ্স্যতি)?[অমৃতঃ ম্রিয়তে ইতি হি বিপ্রতিষিদ্ধম্ ইতি ভাবঃ]।

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৪৯

দ্বৈতবাদিগণ জন্মহীন সত্য পদার্থ আত্মারও জন্ম ইচ্ছা করিয়া থাকেন। কিন্তু, যে পদার্থ নিশ্চয়ই জন্ম ও মরণহীন, তাহা কি প্রকারে মরণধর্ম্ম—মর্ত্যত্ব প্রাপ্ত হইবে? অমৃত পদার্থের মৃত্যু, ইহা বিরুদ্ধ কথা ॥ ৮৭ ॥ ২০

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যে তু পুনঃ কেচিৎ উপনিষদ্ব্যাখ্যাতারো ব্রহ্মবাদিনো বাবদূকা অজাতস্য এব আত্মতত্ত্বস্য অমৃতস্য স্বভাবতো জাতিম্ উৎপত্তিম্ ইচ্ছন্তি পরমার্থত এব, তেষাং জাতং চেৎ, তদেব মর্ত্যতাম্ এষ্যত্যবশ্যম্। স চাজাতো হ্যামৃতো ভাবঃ স্বভাবতঃ পন্ আত্মা কথং মর্ত্যতামেষ্যতি? ন কথঞ্চন মর্ত্যত্বং স্বভাববৈপরীত্যম্ এষ্যতীত্যর্থঃ ॥ ৮৭ ॥ ২০

ভাষ্যানুবাদ

কিন্তু উপনিষদ্ব্যাখ্যাতা যে সমস্ত ব্রহ্মবাদী বাবদূক(বহুভাষী লোক) অজাত, স্বভাবতঃই অমৃতস্বরূপ আত্মতত্ত্বের সত্য সত্যই জন্ম বা উৎপত্তি ইচ্ছা করিয়া থাকেন,[তাঁহাদের মতেও,] যদি উৎপন্নই হয়, তাহা হইলে, সেই উৎপন্ন পদার্থ ত অবশ্যই বিনাশ প্রাপ্ত হইবে; কিন্তু অজাত সেই ভাব পদার্থ(আত্মা) স্বভাবতঃ অমৃত হইয়া(মরণ- শূন্য হইয়া) কিরূপে মর্ত্যতা লাভ করিবে? অর্থাৎ কোন প্রকারেই স্বভাবের বিপরীত মর্ত্যত্ব-ধর্ম্ম প্রাপ্ত হইতে পারে না ॥ ৮৭ ॥২০

ন ভবত্যমৃতং মর্ত্যং ন মর্ত্যমমৃতং তথা। প্রকৃতেরন্যথাভাবো ন কথঞ্চিদ্ভবিষ্যতি ॥ ৮৮ ॥ ২১

সরলার্থঃ

অমৃতং(স্বভাবতঃ মরণরহিতং বস্তু) মর্ত্যং(মরণশীলং) ন ভবতি; তথা মর্ত্যম্(মরণশীলম্)[অপি] অমৃতং(মরণরহিতং—নিত্যং) ন[ভবতি], কথঞ্চিৎ(কেনাপি প্রকারেণ) প্রকৃতেঃ(স্বভাবস্য) অন্যথাভাবঃ(বিপর্যয়ঃ) ন ভবিষ্যতি। স্বভাবং পরিত্যজ্য ক্ষণমপি বস্তু ন তিষ্ঠেদিতি ভাবঃ।

যাহা স্বভাবতঃই অমৃত—মরণরহিত, তাহা কখনই মরণশীল হয় না; সেইরূপ

১৫০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

যাহা স্বভাবতঃই মরণশীল, তাহাও কখন অমৃত হয় না;[কারণ] কোন প্রকারেই প্রকৃতির অন্যথাভাব অর্থাৎ স্বভাবের বিপর্যয় হইবে না ॥ ৮৮ ॥ ২১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যস্মাৎ ন ভবতি অমৃতং মর্ত্যং লোকে নাপি মর্ত্যম্ অমৃতং তথা, ততঃ প্রকৃতেঃ স্বভাবস্য অন্যথাভাবঃ স্বতঃ প্রচ্যুতিঃ ন কথঞ্চিৎ ভবিষ্যতি; অগ্নেরিক ঔষ্ণ্যস্য ॥ ৮৮ ॥ ২১

ভাষ্যানুবাদ

যেহেতু জগতে অমৃত বস্তু কখনই মর্ত্য(মরণশীল) হয় না, সেইরূপ মর্ত্যও অমৃত হয় না; সেই হেতুই প্রকৃতির—স্বভাবের অন্যথাভাব অর্থাৎ অগ্নি হইতে যেমন উষ্ণতার প্রচ্যুতি ঘটে না, তেমনি স্বরূপ হইতে প্রচ্যুতি কোন প্রকারেই হইবে না ॥ ৮৮ ॥ ২১

স্বভাবেনামৃতো যস্য ভাবো গচ্ছতি মর্ত্যতাম্। কৃতকেনামৃতস্তস্য কথং স্থাস্যতি নিশ্চলঃ॥ ৮৯॥ ২২

সরলার্থঃ

যস্য(বাদিনঃ মতে) স্বভাবেন অমৃতঃ(মরণরহিতঃ) ভাবঃ পদার্থ: মর্ত্যতাং (নশ্বরতাং) গচ্ছতি(লভতে); তস্য(বাদিনঃ মতে) কৃতকেন(জন্যত্বেন হেতুনা) অমৃতঃ(ভাবঃ) কথং নিশ্চলঃ(অমৃতত্বেন স্থিরঃ সন্) স্থাস্যতি; উৎপদ্যতে চ, ন নশ্যতি চ, ইতি হি বিপ্রতিষিদ্ধং লোকে।

যাহার মতে অমৃতস্বভাব পদার্থও মর্ত্যতা প্রাপ্ত হইয়া থাকে; তাহার মতে, জন্যত্ব হেতু ‘অমৃত’ বলিয়া কোন পদার্থ চিরস্থায়ী থাকিতে পারে না ॥ ৮৯ ॥ ২২

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যস্য পুনর্ব্বাদিনঃ স্বভাবেন অমৃতো ভাবো মর্ত্যতাং গচ্ছতি—পরমার্থতো জায়তে, তস্য প্রাগুৎপত্তেঃ স ভাবঃ স্বভাবতোহমৃত ইতি প্রতিজ্ঞা মৃষৈব। কথং তর্হি? কৃতকেন অমৃতস্তস্য স্বভাবঃ। কৃতকেনামৃতঃ স কথং স্থাস্যতি নিশ্চলঃ? অমৃতস্বভাবতয়া ন কথঞ্চিৎ স্থাস্যতি। আত্ম-জাতিবাদিনঃ সর্ব্বথা অজং নাম নাস্ত্যেব; সর্ব্বমেতন্মর্ত্যম্। অতঃ অনির্মোক্ষপ্রসঙ্গ ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৮৯ ॥ ২২

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৫১

ভাষ্যানুবাদ

যে বাদীর মতে স্বভাবতঃ অমৃত পদার্থও মর্ত্যতা লাভ করে—অর্থাৎ সত্যসত্যই জন্মে, তাহার মতে উৎপত্তির পূর্ব্বে সেই ভাব পদার্থ স্বভাবতঃই অমৃত এই প্রতিজ্ঞা নিশ্চয়ই মিথ্যা হইয়া পড়ে। তাহা হইলে, কৃতকত্ব বা জন্যত্ব নিবন্ধন তাহার অমৃত স্বভাবটি কিরূপে স্থির থাকিবে? অর্থাৎ উহা যখন ক্রিয়াজন্য, তখন কোন প্রকারেই ঐ অমৃত ভাব স্থির(অবিনষ্ট) থাকিতে পারে না। অতএব যাঁহারা আত্মার জন্ম স্বীকার করেন, তাঁহাদের মতে সর্ব্বদা ‘অজ’ বলিয়া কোন পদার্থই থাকিতে পারে না; সমস্তই মর্ত্য হইয়া পড়ে। * তাহার ফলে কাহারই আর মোক্ষ সম্ভব হইতে পারে না ॥ ৮৯ ॥ ২২

ভূততোহভূততো বাপি সৃজ্যমানে সমা শ্রুতিঃ। নিশ্চিতং যুক্তিযুক্তঞ্চ যত্তদ্ভবতি নেতরৎ॥ ৯০॥ ২৩

সরলার্থঃ

ভূততঃ(পরমার্থতঃ) অভূততঃ(অসত্যাৎ মায়াতঃ) বা অপি সৃজ্যমানে (উৎপাদ্যমানে বস্তুনি বিষয়ে) সমা(তুল্যা) শ্রুতিঃ[অস্তি]।[ততশ্চ] নিশ্চিতং(শ্রুত্যা সাধিতং) যুক্তিযুক্তং চ(যুক্ত্যা চ সমর্থিতং) যৎ, তৎ এব [গ্রাহ্যং] ভবতি, ইতরৎ(তদ্বিপরীতং) ন[গ্রাহ্যম্ ইতি শেষঃ]।

পরমার্থ সৃষ্টি ও অপরমার্থ সৃষ্টি, উভয় বিষয়েই সমান শ্রুতি রহিয়াছে,. তন্মধ্যে যে বিষয়টি শ্রুতিনিশ্চিত ও যুক্তসম্মত হয়, তাহাই গ্রহণীয়, অপর নহে।

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ননু অজাতিবাদিনঃ সৃষ্টিপ্রতিপাদিকা শ্রুতির্নসঙ্গচ্ছতে প্রামাণ্যম্। বাঢ়ম্;- বিদ্যতে সৃষ্টিপ্রতিপাদিকা শ্রুতিঃ, সা তু অন্যপরা, ‘উপায়ঃ সোহবতারায় ইতি

১৫২ কারিকোপেত মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

‘অবোচাম। ইদানীম্ উক্তেহপি পরিহারে পুনশ্চোদ্যপরিহারৌ বিবক্ষিতার্থং প্রতি সৃষ্টি-শ্রুত্যক্ষরাণাম্ আনুলোম্যবিরোধাশঙ্কামাত্রপরিহারার্থে। ভূততঃ পরমার্থতঃ সৃজ্যমানে বস্তুনি অভূততো মায়য়া বা মায়াবিনেব সৃজ্যমানে বস্তুনি সমা তুল্যা সৃষ্টিশ্রুতিঃ। ননু গৌণমুখ্যয়োঃ মুখ্যে শব্দার্থপ্রতিপত্তিযুক্তা, ন, অন্যথা সৃষ্টের প্রসিদ্ধত্বাৎ নিষ্প্রয়োজনত্বাচ্চ ইত্যবোচাম। অবিদ্যাসৃষ্টিবিষয়ৈব সর্ব্বা গৌণী মুখ্যা চ সৃষ্টিঃ ন পরমার্থতঃ। ‘সবাহ্যাভ্যন্তরোহ্যজঃ’ ইতি শ্রুতেঃ। তস্মাৎ শ্রুত্যা নিশ্চিতং যৎ একমেবাদ্বিতীয়ম্ অজম্ অমৃতমিতি যুক্তিযুক্তঞ্চ। যুক্ত্যা চ সম্পন্নং তদেব ইত্যবোচাম পূর্ব্বৈগ্রস্থৈঃ তদেব শ্রুত্যর্থো ভবতি, নেতরৎ কদাচিদপি কচিদপি ॥ ৯০ ॥ ২৩

ভাষ্যানুবাদ

প্রশ্ন হইতেছে যে, অদ্বৈতবাদীর পক্ষে ত সৃষ্টি-প্রতিপাদনে শ্রুতির সঙ্গতি বা সামঞ্জস্য রক্ষা পায় না; হাঁ, সত্য কথা; সৃষ্টি- বোধক শ্রুতি আছে বটে, কিন্তু সৃষ্টি-প্রতিপাদনে তাহার তাৎপর্য্য নাই। পূর্বেই বলিয়াছি যে, ‘উহা কেবল অদ্বৈত-বিষয়ে বুদ্ধ্যা- রোহের উপায় মাত্র।’ উক্ত পরিহার বিষয়ে অভিপ্রেত অদ্বৈতসিদ্ধির সম্বন্ধে সৃষ্টিবোধক শ্রুতিসমূহের আক্ষরিক অর্থ অনুকূল হয় কি না— এই শঙ্কা-পরিহারার্থই এখন পুনর্বার আপত্তি ও তাহার পরিহার প্রদর্শিত হইতেছে। ভূততঃ অর্থাৎ যথার্থরূপে সৃজ্যমান বস্তুবিষয়ে, অথবা অভূততঃ অর্থাৎ অযথার্থরূপে মায়াবী যেমন মায়া দ্বারা সৃষ্টি করে তেমনি ভাবে, সৃজ্যমান বিষয়ে সৃষ্টিবোধক তুল্য শ্রুতি রহিয়াছে; [অভিপ্রায় এই যে, সৃজ্যমান পদার্থ সত্য সত্যই সৃষ্টি হউক বা মায়া- দ্বারাই রচিত হউক, উভয় পক্ষেরই অনুকূলে তুল্যরূপ শ্রুতি রহিয়াছে]। ভাল, গৌণার্থক ও মুখ্যার্থক শব্দদ্বয়ের মধ্যে মুখ্যার্থক শব্দানুযায়ী বোধ হওয়াই ত যুক্তিসম্মত? না, সে কথা হইতে পারে না; কারণ, সত্য সৃষ্টিতেই যে, সৃষ্টিশব্দের মুখ্যার্থকল্পনা, তাহা অপ্রসিদ্ধ এবং নিষ্প্রয়োজনও বটে; ইহা পূর্বেই বলিয়াছি। গৌণ, মুখ্য, সমস্ত সৃষ্টিই অবিদ্যামূলক সৃষ্টি-বিষয়ে, পারমার্থিক সৃষ্টি-বিষয়ে

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৫৩

নহে; কেন না, শ্রুতি বলিতেছেন—‘বাহ্য ও অন্তর, সর্বত্র বর্তমান থাকিয়াও তিনি অজ।’ অতএব, শ্রুতি দ্বারা যাহা এক অদ্বিতীয়, অজ ও অমৃত বলিয়া নিশ্চিত এবং যুক্তি দ্বারাও সমর্থিত, তাহাই[শ্রুতির প্রকৃত অর্থ, ইহা] পূর্ব্বোক্ত বাক্যসমূহ দ্বারা প্রতিপাদন করিয়াছি। তাহাই শ্রুতির প্রকৃত অর্থ; অপর অর্থ কখনও কোথাও[শ্রুতির অভিপ্রেত] নহে * ॥ ৯০ ॥ ২৩

নেহ নানেতি চান্নায়াদিন্দ্রো মায়াভিরিত্যপি। অজায়মানো বহুধা মায়য়া জায়তে তু সঃ ॥ ৯১ ॥ ২৪

সরলার্থঃ

নেহ নানেত্যামায়াৎ(‘ইহ নানা নাস্তি’ ইতি এবংলক্ষণাৎ বেদবচনাৎ) ‘ইন্দ্রঃ মায়াভিরিতি’ ইন্দ্রঃ(ঈশ্বরঃ) মায়াভিঃ(স্বশক্তিভিঃ)[বহুরূপ ঈয়তে] (ইত্যেবংলক্ষণাৎ বেদবচনাৎ) অপি অজায়মানঃ(অনুৎপদ্যমানঃ) সঃ(ঈশ্বর) মায়য়া(স্বশক্ত্যা) বহুধা(নানারূপেণ) জায়তে(প্রকাশতে),[নতু স্বত ইতি ভাবঃ]।

‘ব্রহ্মে কোনপ্রকার ভেদ নাই,’ এবং ‘ঈশ্বর মায়া দ্বারা[বহুরূপে প্রকাশ ‘পান]’ এই শ্রুতি অনুসারেও[জানা যায় যে,] সেই পরমেশ্বর জাত না হইয়াও, মায়াপ্রভাবে বহুরূপে প্রকাশ পাইয়া থাকেন ॥ ৯১ ॥ ২৪

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কথং শ্রুতিনিশ্চয় ইত্যাহ—যদি হি ভূতত এব সৃষ্টিঃ স্যাৎ, ততঃ সত্যমেব

* তাৎপর্য্য—বিপক্ষ বলিয়াছেন যে, সত্য-সৃষ্টিই সৃষ্টি-শব্দের মুখ্য অর্থ, ঐন্দ্রজালিকের মায়িক সৃষ্টিতে যে সৃষ্টি-শব্দের প্রয়োগ, তাহা গৌণ; অর্থাৎ ঐরূপ ‘অর্থ সৃষ্টি-শব্দের প্রকৃত অর্থ নহে। গৌণার্থ ও মুখ্যার্থের মধ্যে মুখ্যার্থ গ্রহণ করাই ন্যায্য। তেজস্বিতা গুণ দেখিয়া কোন লোককে যদি ‘অগ্নি’ বলা হয়, তাহা তাহার গৌণ প্রয়োগ। তৎকালেই যদি কেহ তাহাকে অগ্নি আনয়ন করিতে বলে, তাহা হইলে সে লোক কখনই প্রসিদ্ধ অগ্নি না আনিয়া সেই অগ্নিতুল্য লোকটিকে আনয়ন করে না। তদুত্তরে ভাষ্যকার বলিতেছেন যে, মুখ্য সৃষ্টিই সৃষ্টি-শব্দের অর্থ নহে, পরন্তু গৌণ-মুখ্য উভয়ই, নচেৎ স্বপ্নে সৃষ্টিকে ‘সৃষ্টি’ বলিয়া ব্যবহার করা যাইতে পারে না; কারণ, উহা যে বাস্তবিক সৃষ্টি নহে—গৌণ, এ বিষয়ে কাহারও আপত্তি নাই।

১৫৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

নানা বস্তু ইতি তদভাবপ্রদর্শনার্থম্ আয়ায়ো ন স্যাৎ। অস্তি চ “নেহ নানাস্তি কিঞ্চন” ইত্যাদিরামায়ো দ্বৈতভাবপ্রতিষেধার্থঃ। তস্মাৎ আত্মৈকত্বপ্রতিপত্ত্যর্থা কল্পিতা সৃষ্টিরভূতৈব প্রাণসংবাদবৎ। “ইন্দ্রো মায়াভিঃ” ইত্যভূতার্থপ্রতিপাদকেন মায়াশব্দেন ব্যপদেশাৎ।

ননু প্রজ্ঞাবচনো মায়াশব্দঃ; সত্যম্। ইন্দ্রিয়-প্রজ্ঞয়া অবিদ্যাময়ত্বেন মায়াত্মা- ভ্যুপগমাদদোষঃ। মায়াভিরিন্দ্রিয়প্রজ্ঞাভিঃ অবিদ্যারূপাভিরিত্যর্থঃ। “অজায়- মানো বহুধা বিজায়তে” ইতি শ্রুতেঃ। তস্মাৎ মায়য়া এব জায়তে তু সঃ।’ তু-শব্দঃ অবধারণার্থঃ—মায়য়া এবেতি। ন হি অজায়মানত্বং বহুধা জন্ম চৈকত্র সম্ভবতি। অগ্নেরিব শৈত্যম্ ঔষ্ণ্যঞ্চ। ফলবত্ত্বাৎ চ আত্মৈকত্বদর্শনমেব শ্রুতি-- নিশ্চিতোহর্থঃ, ‘তত্র কো মোহঃ কঃ শোক একত্বমনুপশ্যতঃ” ইত্যাদিমন্ত্রবর্ণাৎ, “মৃত্যোঃ স মৃত্যুমাপ্নোতি” ইতি নিন্দিতত্বাচ্চ সৃষ্ট্যাদিভেদদৃষ্টেঃ ৯১ ॥ ২৪

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, উক্ত সিদ্ধান্তটি শ্রুতি-সিদ্ধ কিপ্রকারে?[তদুত্তরে] বলিতেছেন—সৃষ্টি যদি যথার্থ সত্যই হইত, তাহা হইলে জাগতিক বিভাগ বা নানাত্বও অবশ্যই সত্য হইত; সুতরাং তাহা হইলে ভেদ- নিষেধক শ্রুতি কখনই স্থান পাইত না; অথচ দ্বৈতভাবের সত্যতা- প্রতিষেধক ‘ইহাতে কিছুই নানা বা ভেদ নাই’ ইত্যাদি শ্রুতি রহিয়াছে। অতএব, আত্মার একত্ব-প্রতিপাদনার্থ পরিকল্পিত সৃষ্টিতত্ত্ব: প্রাণসংবাদেরই অনুরূপ অসত্য; এই কারণেই, “ইন্দ্রঃ মায়াভিঃ” এই স্থলে অসত্যতা-বোধক ‘মায়া’ শব্দের প্রয়োগ হইয়াছে।

ভাল, ‘মায়া’ শব্দ ত প্রজ্ঞাবাচক(জ্ঞানবোধক); হাঁ, তাহা সত্য; কিন্তু ইন্দ্রিয়জনিত জ্ঞানমাত্রই অবিদ্যাময়, এই কারণেই ঐন্দ্রিয়িক জ্ঞানকে ‘মায়া’ বলিয়া স্বীকার করা হইয়া থাকে, সুতরাং[আলোচ্য স্থলে] কোন দোষ হয় নাই। “মায়াভিঃ” কথার অর্থ-অবিদ্যা-- ত্মক ইন্দ্রিয়-প্রজ্ঞা দ্বারা; কেন না, শ্রুতি বলিয়াছেন-‘তিনি জন্ম- হীন, অথচ বহুরূপে প্রকাশ পাইয়া থাকেন।’ অতএব, সেই পরমাত্মা মায়া দ্বারাই জন্মলাভ করেন,(কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নহে)।

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৫৫

মূলের ‘তু’ শব্দের অর্থ—অবধারণ, অর্থাৎ ‘মায়া দ্বারাই’ এইরূপ অর্থ। বস্তুতঃ একই বস্তুতে সত্যসত্যই জন্মহীনতা ও বহুপ্রকার জন্মপরিগ্রহ কখনই সম্ভবপর হয় না; যেমন অগ্নিতে উষ্ণতা ও শীতলতা সম্ভবে না, তদ্রূপ। অতএব, প্রতিনিয়ত ‘একত্ব-দর্শনকারী ব্যক্তির আর শোকই বা কি? মোহই বা কি?’ এই মন্ত্র হইতে এবং[যে এই ব্রহ্মে ভেদ দর্শন করে,] ‘সে মৃত্যুর পরও মৃত্যু প্রাপ্ত হয়,’ এইরূপে ভেদবুদ্ধির নিন্দা-দর্শন হইতে এবং আত্মৈকত্ব দর্শনের ফলোল্লেখ হইতেও[জানা যায় যে] আত্মৈকত্ব-জ্ঞানই শ্রুতিসিদ্ধ অর্থ,(ভেদদর্শন নহে)॥ ৯১ ॥ ২৪

সম্ভূতেরপবাদাচ্চ সম্ভবঃ প্রতিষিধ্যতে। কোন্বেনং জনয়েদিতি কারণং প্রতিষিধ্যতে॥ ৯২॥ ২৫

সরলার্থঃ

সংভূতেঃ(জন্মনঃ) অপবাদাৎ(“অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি, যে সম্ভূতিম্ উপাসতে” ইত্যাদৌ নিন্দনাৎ) সম্ভবঃ(জন্ম) প্রতিষিধ্যতে(নিষিধ্যতে)। [তথা] কঃ নু(আক্ষেপে কঃ খলু ন কোহপি ইত্যর্থঃ,) এনং(পরমাত্মানং) জনয়েৎ(উৎপাদয়েৎ),[“নায়ং কুতশ্চিৎ ন বভূব কশ্চিৎ” ইত্যাদি-শ্রুতেরিতি ভাবঃ]; ইতি(অনেন বাক্যেন) কারণং(তদুৎপাদকং চ) প্রতিষিধ্যতে; [উৎপাদকাভাবাৎ ন স উৎপদ্যতে ইতি ভাবঃ]।

[শ্রুতিতে] সম্ভৃতির নিন্দা হইতে[বুঝা যায় যে,] সম্ভব নিষিদ্ধ হইতেছে।’ আর কেইবা ইহাকে উৎপাদন করিবে? এই কথা হইতে[জানা যায় যে,] তাহার উৎপত্তির কারণও প্রতিষিদ্ধ হইতেছে ॥ ৯২ ॥ ২৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

“অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি যে সম্ভূতিমুপাসতে” ইতি শ্রুতেঃ সম্ভূতেরুপাস্যত্বাপবাদাৎ- সম্ভবঃ প্রতিষিধ্যতে। ন হি পরমার্থতঃ সম্ভূতায়াং সম্ভূতৌ তদপবাদ উপপদ্যতে! ননু বিনাশেন সম্ভূতেঃ সমুচ্চয়বিধ্যর্থঃ সম্ভূত্যপবাদঃ। যথা “অন্ধন্তমঃ প্রবিশন্তি যেহবিদ্যামুপাসতে” ইতি। সত্যমেব, দেবতাদর্শনস্য সম্ভূতিবিষয়স্য বিনাশশব্দ-

১৫৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

বাচ্যস্য কৰ্ম্মণঃ সমুচ্চয়বিধানার্থঃ সম্ভৃত্যপবাদঃ। তথাপি বিনাশাখ্যস্য কর্মণঃ স্বাভাবিকাজ্ঞান প্রবৃত্তিরূপস্য মৃত্যোঃ অতিতরণার্থত্ববৎ দেবতাদর্শনকৰ্ম্মসমুচ্চয়স্য পুরুষসংস্কারার্থস্য কৰ্ম্মফলরাগপ্রবৃত্তিরূপস্য সাধ্যসাধনৈষণাদ্বয়লক্ষণস্য মৃত্যোঃ অতিতরণার্থত্বম্। এবং হোষণাদ্বয়লক্ষণাৎ অবিদ্যয়া মৃত্যোরতিতীর্ণস্য বিরক্তস্য উপনিষচ্ছাস্ত্রার্থালোচনপরস্য নান্তরীয়কী পরমাত্মৈকত্ব-বিদ্যোৎপত্তিঃ, ইতি পূর্ব্ব- ভাবিনীম্ অবিদ্যামপেক্ষ্য পশ্চাদ্ভাবিনী ব্রহ্মবিদ্যা অমৃতত্বসাধনা একেন পুরুষেণ সম্বধ্যমানা অবিদ্যয়া সমুচ্চীয়ত ইত্যুচ্যতে। অতোইন্যার্থত্বাৎ অমৃতত্বসাধনং ব্রহ্মবিদ্যামপেক্ষ্য নিন্দার্থ এব ভবতি সম্ভৃত্যপবাদঃ। যদ্যপি অশুদ্ধিবিয়োগ- হেতুঃ অতন্নিষ্ঠত্বাৎ। অতএব সম্ভতেরপবাদাৎ সম্ভূতেঃ আপেক্ষিকমেব সত্ত্বমিতি পরমার্থসদাত্মৈকত্বম্ অপেক্ষ্য অমৃতাখ্যঃ সম্ভবঃ প্রতিষিধ্যতে। এবং মায়া- নিৰ্ম্মিতস্যৈব জীবস্য অবিদ্যয়া প্রত্যুপস্থাপিতস্য অবিদ্যানাশে স্বভাবরূপত্বাৎ পরমার্থতঃ কো নু এনং জনয়েৎ? ন হি রজ্জাম্ অবিদ্যারোপিতং সর্পং পুনর্বিবেকতো নষ্টং জনয়েৎ কশ্চিৎ; তথা ন কশ্চিৎ এনং জনয়েদিতি। কো নু ইত্যাক্ষেপার্থত্বাৎ কারণং প্রতিষিধ্যতে। অবিদ্যোভূতস্য নষ্টস্য জনয়িতৃ কারণং ন কিঞ্চিদস্তি ইত্যভিপ্রায়ঃ। “নায়ং কুতশ্চিৎ ন বভূব কশ্চিৎ” ইতি শ্রুতেঃ ॥ ৯২ ॥ ২৫

ভাষ্যানুবাদ

‘যাহারা সম্ভৃতির উপাসনা করে, তাহারা অন্ধতমে প্রবেশ করে,’ এই শ্রুতিতে সম্ভৃতির উপাসনায় নিন্দাশ্রবণহেতু সম্ভবের প্রতিষেধ করা হইতেছে; কেননা, সম্ভৃতি যদি যথার্থই সত্য হইত, তাহা হইলে কখনই তদুপাসনার নিন্দা করা সঙ্গত হইত না।

ভাল, ‘যাহারা অবিদ্যার উপাসনা করে, তাহারা অন্ধতমে প্রবেশ করে’ ইত্যাদির ন্যায় বিনাশের সহিত সম্ভূতির সমুচ্চয়-বিধানার্থও ত সম্ভূতির নিন্দাবাদ হইতে পারে। অর্থাৎ যেখানেই উৎপত্তি আছে, সেখানেই বিনাশও আছে, ইহা জ্ঞাপনার্থই ঐরূপ নিন্দা করা হইয়াছে। হাঁ, একথা সত্যই বটে; যদিও সম্ভূতি-বিষয়ক দেবতা- চিন্তা এবং বিনাশ-শব্দবাচ্য কর্ম্মের সমুচ্চয় বা সহানুষ্ঠান-বিধানার্থই সম্ভূতির অপবাদ করা হইয়াছে সত্য, তথাপি স্বাভাবিক অজ্ঞানমূলক

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৫৭।

প্রবৃত্তিরূপ মৃত্যু অতিক্রম করা যেমন ‘বিনাশ’-সংজ্ঞক কর্মের প্রয়োজন, তেমনি কৰ্ম্মফলে অনুরাগমূলক প্রবৃত্তিরূপ যে সাধ্য ও সাধনবিষয়ক দ্বিবিধ বাসনাত্মক মৃত্যু, তাহা অতিক্রম করাই পুরুষ-সংস্কার-বিষয়ক দৈবতচিন্তা ও কর্মের সহানুষ্ঠানের প্রয়োজন। কেন না, পুরুষ এইরূপে উক্ত দ্বিবিধ কামনাময় মৃত্যু ও চিত্তগত অশুদ্ধি হইতে বিমুক্ত হইয়া সংস্কারসম্পন্ন বিশুদ্ধ হইতে পারে। অতএব, পুরুষকে উক্তলক্ষণ মৃত্যু হইতে উত্তীর্ণ করাই দেবতা-চিন্তা ও কর্মের সহানুষ্ঠানের প্রয়োজন। ঠিক এইরূপেই উক্ত বাসনাদ্বয়রূপ অবিদ্যা- মৃত্যু হইতে উত্তীর্ণ, বিষয়-বৈরাগ্যসম্পন্ন এবং উপনিষৎ-শাস্ত্রের আলোচনায় তৎপর পুরুষের পক্ষে পরমাত্মার একত্ববুদ্ধিরূপা বিদ্যার উৎপত্তি অবশ্যম্ভাবিনী হইয়া থাকে; এই কারণে পূর্ববর্তী অবিদ্যা অপেক্ষা পরভবিক অমৃতত্ব-সাধনীভূত ব্রহ্মবিদ্যা একই পুরুষের সহিত সম্বদ্ধ হয় বলিয়া, অবিদ্যার সহিত সমুচ্চিত হয় বলা হইয়া থাকে অতএব, প্রকৃত অমৃতত্ব-সাধনীভূত ব্রহ্মবিদ্যা অপেক্ষা[সমুচ্চয়ানুষ্ঠান যখন] অন্যার্থ অর্থাৎ চিত্তশুদ্ধির সাধকমাত্র, তখন উহা অশুদ্ধিক্ষয়ের হেতুভূত হইলেও অমৃতত্বাংশে তাৎপর্য্য না থাকায় উক্ত সম্ভূতির অপবাদ নিশ্চয়ই নিন্দার্থ। অতএব উক্ত অপবাদ হইতেই বুঝা যায় যে, সম্ভূতির সত্তা আপেক্ষিক মাত্র; সুতরাং পরমার্থসৎ আত্মার একত্ব অপেক্ষা করিয়াই অমৃতনামক সম্ভব প্রতিষিদ্ধ হইতেছে। এইরূপে মায়ানিৰ্ম্মিত এবং অবিদ্যা-সমুদবোধিত জীবের অবিদ্যা বিনষ্ট হইলে, স্বরূপে অবস্থিতি হয়; সুতরাং তৎকালে সত্যসত্যই ইহাকে কে আর উৎপাদন করিবে? কেন না, রজ্জু-সর্পের ন্যায় অবিদ্যা- সমারোপিত সমস্ত দৃশ্য পদার্থ বিবেকজ্ঞানে একবার বিনষ্ট হইলে, তাহা কি আর কেহ জন্মাইতে পারে?-কখনই নহে; সেই প্রকার ইহাকেও আর কেহই জন্মাইতে পারে না। ‘কঃ নু’ ইহার অর্থ- আক্ষেপ-অপরকে প্রতিষেধ করা; সুতরাং এখানে উৎপত্তি-কারণের প্রতিষেধ করা হইতেছে। অভিপ্রায় এই যে, অবিদ্যা-সমুদ্ভুত পদার্থ,

১৫৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

একবার বিনষ্ট হইয়া গেলে, পুনর্ব্বার তাহাকে জন্মাইতে পারে, এমন কোন কারণ নাই। কারণ, শ্রুতি বলিতেছেন—‘ইহা কোন কারণ হইতে কোনরূপে উৎপন্ন হন নাই।’ ॥ ৯২ ॥২৫॥

স এষ নেতি নেতীতি ব্যাখ্যাতং নিহৃতে যতঃ। সর্ব্বমগ্রাহ্যভাবেন হেতুনাজং প্রকাশতে ॥ ৯৩ ॥ ২৬

সরলার্থঃ

যতঃ(যস্মাৎ হেতোঃ) “সঃ এষঃ নেতি নেতি”(শ্রুতিঃ) অগ্রাহ্যভাবেন (গ্রহণযোগ্যত্বেন) হেতুনা(কারণেন) ব্যাখ্যাতং(উপায়ত্বেন বর্ণিতং) সর্ব্বং (দ্বৈতং) নিহৃতে(গোপায়তি, মিথ্যাত্বেন বারয়তি)[তস্মাৎ হেতোঃ] অজং (জন্মরহিতম্ আত্মস্বরূপং) প্রকাশতে ॥ ৯৩ ॥ ২৬

যেহেতু, ‘সেই এই আত্মা ইহা নহে’ এই শ্রুতি অগ্রাহ্যত্বনিবন্ধন পূর্ব্ববর্ণিত সমস্ত বিষয়ের আলাপ করিতেছে, সেই হেতুই অজ আত্মস্বরূপ প্রকাশ পাইয়া থাকে ৷ ৯৩৷ ২৬

শঙ্কর-ভাষ্যম্

সর্ব্ববিশেষপ্রতিষেধেন “অথাত আদেশো নেতি নেতি” ইতি প্রতিপাদিতস্য আত্মনো দুর্বোধত্বং মন্যমানা শ্রুতিঃ পুনঃ পুনঃ উপায়ান্তরত্বেন তস্যৈব প্রতি- পিপাদয়িষয়া যদ্যদ্ব্যাখ্যাতং, তৎসর্ব্বং নিহুতে, গ্রাহ্যং জনিমবুদ্ধিবিষয়ম্ অপলপতি, অর্থাৎ “স এষ নেতি নেতি” ইত্যাত্মনঃ অদৃশ্যতাং দর্শয়ন্তী শ্রুতিঃ। উপায়স্য উপেয়-নিষ্ঠতামজানত উপায়ত্বেন ব্যাখ্যাতস্য উপেয়বগ্রাহ্যতা মা ভূৎ, ইতি অগ্রাহ্যভাবেন হেতুনা কারণেন নিহ্নুত ইত্যর্থঃ। ততশ্চৈবম্ উপায়স্য উপেয়নিষ্ঠতামেব জানত উপেয়স্য চ নিত্যৈকরূপত্বমিতি, তস্য সবাহ্যাভ্যন্তরমজম্ আত্মতত্ত্বং প্রকাশতে স্বয়মেব ॥ ৯৩ ॥ ২৬

ভাষ্যানুবাদ

অনন্তর এইরূপ উপদেশ[প্রদত্ত হইতেছে যে,] ‘ইহা নহে, ইহা নহে’ এই শ্রুতি,[ইতঃ পূর্ব্বে] সমস্ত বিশেষ বস্তুর প্রতিষেধ দ্বারা যে আত্মৈকত্ব প্রতিপাদন করিয়াছেন, তাহা দুজ্ঞেয় মনে করিয়া তাহারই

অদ্বৈত প্রকরণম্ ১৫৯

উপপাদনার্থ বিভিন্ন উপায়ে যাহা যাহা বর্ণিত হইয়াছে, তৎসমস্তই মিথ্যা বলিয়া অপলাপ করিতেছেন। অর্থাৎ ‘সেই এই আত্মা, ইহা নহে, ইহা নহে’ এইরূপে আত্মার অদৃশ্যতা(অগ্রাহ্যতা)-প্রতি- পাদক এই শ্রুতিই জন্য-বুদ্ধিবৃত্তির বিষয়ীভূত—গ্রাহ্য পদার্থের অপলাপ করিতেছেন। উপেয় বা প্রাপ্য-নির্ণয়েই যে উপায়ের পর্যবসান, ইহা যে জানে না, তাহার মনে এইরূপ ভ্রম হইতে পারে যে, উপেয় ব্রহ্মবস্তুর ন্যায় তদুপায়রূপে নিরূপিত বিষয়গুলিও হয় ত গ্রহণীয় অর্থাৎ অবশ্য জ্ঞাতব্য, এই ভ্রান্তি-নিবৃত্তির উদ্দেশ্যে অগ্রাহ্যতা-রূপ হেতু দ্বারা[উহার সত্তা] অপলাপ করিতেছেন। অনন্তর এইরূপে ‘জ্ঞাতব্য-নির্ণয়ই উপায়ের তাৎপর্য্য, এবং জ্ঞাতব্য পদার্থটিই(পরমাত্মাই) নিত্য একরূপ’ ইহা যিনি জানেন, তাঁহার নিকট বাহ্যাভ্যন্তরস্থ, অজ আত্মস্বরূপ আপনিই প্রকাশ পাইয়া থাকেন ॥ ৯৩ ॥ ২৬

সতো হি মায়য়া জন্ম যুজ্যতে নতু তত্ত্বতঃ।

তত্ত্বতো জায়তে যস্য জাতং তস্য হি জায়তে ॥ ৯৪ ॥ ২৭

সরলার্থঃ

হি(যস্মাৎ) সতঃ(নিত্যস্য) জন্ম মায়য়া যুজ্যতে(সম্ভবতি), ন তু(ন -পুনঃ) তত্ত্বতঃ(পরমার্থতঃ)[জন্ম যুজ্যতে]। যস্য(বাদিনঃ মতে) তত্ত্বতঃ (পরমার্থত এব) জায়তে, তস্য(মতে) হি(নিশ্চয়ে) জাতং(উৎপন্নম্ এব) জায়তে(নতু অজম্; অজস্য জন্মাসম্ভবাৎ, জাতস্য চ জায়মানত্বে অনবস্থাদোষা- পত্তেরিতি ভাবঃ] ॥ ৯৪ ॥ ২৭

যেহেতু সৎপদার্থের জন্ম মায়া দ্বারাই হইতে পারে, কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে হইতে পারে না। যাহার মতে বাস্তবিকই জন্ম হয়, নিশ্চয়ই তাহার মতে জাত পদার্থই জন্মে, একথা স্বীকার করিতে হয়। তাহা হইলে অনবস্থা দোষ আসিয়া উপস্থিত হইতে পারে ॥ ৯৪ ॥ ২৭

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

এবং হি শ্রুতিবাক্যশৈত্যং সর্ব্বাহ্যাভ্যন্তরমজম্, আত্মতত্ত্বমদ্বয়ং ন ততোহন্যৎ।

১৬০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

অন্তীতি নিশ্চিতমেতৎ। যুক্ত্য। চাধুনা এতদেব পুননিদ্ধার্য্যত ইত্যাহ, তত্রৈতৎ স্যাৎ সদা অগ্রাহ্যমেব চেৎ অসদেবাত্মতত্ত্বমিতি। তৎ ন, কার্য্যগ্রহণাৎ। যথা সতো মায়াবিনো মায়য়া জন্মকার্য্যং, এবং জগতো জন্মকার্য্যং গৃহ্যমাণং মায়াবিনমিব পরমার্থং সন্তমাত্মানং জগজ্জন্ম মায়াস্পদমেব গময়তি। যস্মাৎ সতো হি বিদ্যামানাৎ কারণাৎ মায়ানিৰ্ম্মিতস্য হস্ত্যাদিকার্য্যস্যেব জগজ্জন্ম যুগ্যতে, নাসতঃ কারণাৎ। ন তু তত্ত্বত এবাত্মনো জন্ম যুজ্যতে। অথবা সতো বিদ্যমানস্য বস্তুনো রজ্জাদেঃ সর্পাদিবৎ মায়য়া জন্ম যুজ্যতে, ন তু তত্ত্বতো যথা, তথা অগ্রাহ্যস্য তস্যাপি সত এবাত্মনো রজ্জুসর্পবৎ জগদ্রূপেণ মায়য়া জন্ম যুজ্যতে, ন তু তত্ত্বত এবাজস্য আত্মনো জন্ম। যস্য পুনঃ পরমার্থসৎ অজমাত্মতত্ত্বং জগদ্রূপেণ জায়তে বাদিনঃ, ন হি তস্যাজং জায়ত ইতি শক্যং বক্তুং বিরোধাৎ। ততস্তস্যার্থাৎ জাতং জায়ত ইত্যাপন্নম্ ততশ্চানবস্থা জাতাৎ জায়মানত্বেন। তস্মাৎ অজমেকমেবাত্ম- তত্ত্বমিতি সিদ্ধম্ ॥ ৯৪ ॥ ২৭

ভাষ্যানুবাদ

উক্তপ্রকার শত শত শ্রুতি দ্বারা ইহাই অবধারিত হইল যে, বাহ্যাভ্যন্তরবর্তী অজ অদ্বয় আত্মতত্ত্বই সত্য, তদ্ভিন্ন আর কিছুই সত্য নাই। এখন যুক্তির সাহায্যে পুনশ্চ তাহাই অবধারিত হইতেছে। এইরূপ প্রমাণিত হইতে পারে যে, আত্মতত্ত্ব যদি চিরদিনই অগ্রাহ্য— জ্ঞানের অবিষয় হয়, তাহা হইলে ত তাহা ‘অসৎ’ বলিয়াই পরিগণিত হইতে পারে? না—তাহা হইতে পারে না; কারণ, তাহার কার্য্য দেখিতে পাওয়া যায়। সত্য মায়াবীর যেরূপ মায়া দ্বারা জন্ম অর্থাৎ কার্য্য হইয়া থাকে, তদ্রূপ এই জগতেরও জন্ম বা উৎপত্তিরূপ কার্য্য দর্শনেই প্রতীতি জন্মাইয়া দেয় যে, পরমার্থসৎ আত্মাই মায়াবীর ন্যায় এই জগৎ-জন্মনিদান মায়ার আশ্রয়ীভূত, অর্থাৎ তাহার মায়ায়ই এই জগতের উৎপত্তি প্রতীতি হইতেছে। যেহেতু মায়াবীর মায়া-সৃষ্ট হস্তী প্রভৃতি কার্য্যের ন্যায় সৎ কারণ হইতেই জগতের জন্ম সম্ভবপর হয়, অসৎ কারণ হইতে উৎপত্তি সম্ভব হয় না, এবং সত্যসত্যই আত্মার জন্ম সম্ভব হয় না;[অতএব জগদুৎপত্তিও মায়াময় ভিন্ন আর কিছু নহে]।

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৬১.

অথবা, সৎ—বিদ্যমান রজ্জু প্রভৃতি পদার্থের যেমন মায়া দ্বারা সপাদিরূপে জন্মলাভ সম্ভবপর হয়, কিন্তু পরমার্থতঃ হয় না; তেমনি সৎ ব্রহ্ম অগ্রাহ্য হইলেও, রজ্জু-সর্পের ন্যায় তাঁহারও মায়া দ্বারা জগদাকারে জন্ম সম্ভব হয়, কিন্তু সত্যসত্যই জন্মরহিত এই আত্মার জন্ম সম্ভব হয় না। কিন্তু, যে বাদীর মতে পরমার্থ সৎ অজ আত্মার প্রকৃতপক্ষেই জগদাকারে জন্ম স্বীকৃত হয়, তাহার মতেও অজ—যাহার জন্ম নাই, তাহার জন্ম হয়, একথা বলিতে পারা যায় না; কারণ [ অজের জন্ম বলিলে] বিরুদ্ধ কথা হয়। অতএব, তাহার মতে জাত পদার্থ জন্মে, এই কথাই প্রকারান্তরে স্বীকার করিতে হয়। তাহা হইলে অনবস্থা দোষ হওয়ায় ফলতঃ জন্মই সিদ্ধ হইতে পারে না।* অতএব আত্মতত্ত্ব যে অজ ও এক, ইহা সিদ্ধ হইল ॥ ৯৪ ॥ ২৭

অসতো মায়য়া জন্ম তত্ত্বতো নৈব যুজ্যতে।

বন্যাপুত্রো ন তত্ত্বেণ মায়য়া বাপি জায়তে ॥ ৯৫ ॥ ২৮

সরলার্থঃ

অসতঃ(মিথ্যাভূতস্য) মায়য়া তত্ত্বতঃ(পরমার্থতঃ বা) জন্ম(উৎপত্তিঃ) ন এব(নিশ্চয়ে) যুজ্যতে(সংগচ্ছতে)।[যতঃ] বন্ধ্যাপুত্রঃ(বন্ধ্যায়া অপুত্রায়াঃ পুত্রঃ) তত্ত্বেন(যাথার্থ্যেন) মায়য়া অপি বা ন জায়তে।[পুত্র- জনন্যাঃ বন্ধ্যাত্বমেব নোপপদ্যতে ইত্যাশয়ঃ] ॥ ৯৫ ॥ ২৮

অসত্য পদার্থের মায়িক বা পারমার্থিক, কোনরূপেই জন্ম হইতে পারে না; কারণ, মায়া দ্বারা কিংবা প্রকৃত পক্ষে কোনরূপেই বন্ধ্যার পুত্র জন্মে না ॥ ৯৫ ॥ ২৮

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

অসদ্বাদিনাম্ অসতো ভাবস্য মায়য়া তত্ত্বতো বা ন কথঞ্চন জন্ম যুজ্যতে,

* তাৎপর্য্য—যাহার জন্ম নাই, তাহার জন্ম হয়, ইহা বিরুদ্ধ বলিয়াই ঐরূপ কথা বলা যায় না; সুতরাং বাধ্য হইয়া বলিতে হইবে যে, যাহা জন্মে(জাত), তাহারই জন্ম হয়। এ কথা বলিলেও ‘অনবস্থা’ দোষ আসিয়া উপস্থিত হইতে পারে। ‘জাতং জায়তে’ অর্থাৎ যাহা জন্মিয়াছে, তাহাই আবার জন্মিয়াছে; সুতরাং তৎপূর্ব্বেও তাহার জন্ম স্বীকার করিতে হইবে, তৎপূর্ব্বেও আবার জন্ম এইরূপে জন্মপ্রবাহ-কল্পনার বিশ্রাম না হওয়ায় অনবস্থা দোষ ঘটে।

১১

১৬২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যাপনিষৎ

অদৃষ্টত্বাৎ। ন হি বন্ধ্যাপুত্রোমায়য়া তত্ত্বতো বা জায়তে, তস্মাদত্র অসদ্বাদো দূরত এব অনুপপন্ন ইত্যর্থঃ ॥ ১৫ ॥:৮

ভাষ্যানুবাদ

অসদ্বাদীর পক্ষেও মায়া দ্বারা কিংবা যথার্থরূপে, কখনই অসৎ পদার্থের জন্ম হইতে পারে না; কেন না ঐরূপ দেখা যায় না। কারণ, মায়া দ্বারা বা সত্যসত্যই বন্ধ্যার পুত্র জন্মে না। অতএব, এ বিষয়ে অসদ্বাদীর পক্ষ একেবারেই অসঙ্গত ॥ ৯৫ ॥ ২৮

যথা স্বপ্নে দ্বয়াতাসং স্পন্দতে মায়য়া মনঃ।

পরমাত্মবিজ্ঞপ্ত্যা ইতি বা পাঠঃ।

তথা জাগ্রদ্বয়াভাসং স্পন্দতে মায়য়া মনঃ ॥ ৯৬ ॥ ২৯

সরলার্থঃ

স্বপ্নে(স্বপ্নকালে) মনঃ(চিত্তং) যথা মায়য়া(অবিদ্যয়া) দ্বয়াভাসং (দ্বৈতাকারেণ অবভাসমানং সৎ) স্পন্দতে(দ্বৈতবিষয়ে চেষ্টাং কুরুতে); তথা (তদ্বৎ) মনঃ মায়য়া জাগ্রদ্বয়াভাসং(জাগ্রৎকালীন-দ্বৈতাকারেণ প্রতিভাসমানং সৎ) স্পন্দতে(বিবিধাং চেষ্টাং কুরুতে ইত্যর্থঃ) ॥ ৯৬ ॥ ২৯

স্বপ্নকালে মন যেরূপ মায়াদ্বারা দ্বৈতাকারে সমুদ্ভাসিত হইয়া নানাবিধ চেষ্টা(ক্রিয়া) করিয়া থাকে; তদ্রূপ জাগ্রৎকালেও মন মায়া দ্বারা দ্বৈত্তাকারে প্রতিভাসমান হইয়া বিবিধ কার্য্য করিয়া থাকে ॥ ৯৬। ২৯

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কথং পুনঃ সতো মায়য়ৈব জন্মেতি? উচ্যতে-যথা রজ্জাং বিকল্পিতঃ সর্পো রজ্জুরূপেণ অবেক্ষ্যমাণঃ সন্, এবং মনঃ পরমার্থবিজ্ঞপ্ত্যা * আত্মরূপেণ অবেক্ষ্যমাণং সৎ গ্রাহ্যগ্রাহকরূপেণ দ্বয়াভাসং স্পন্দতে স্বপ্নে মায়য়া, রজ্জামিব সর্পঃ; তথা তদ্- বদেব জাগ্রৎ জাগরিতে স্পন্দতে মায়য়া মনঃ, স্পন্দত ইবেত্যর্থঃ ॥ ৯৬ ॥ ২৯

ভাষ্যানুবাদ

মায়া দ্বারা সৎপদার্থের জন্ম কিরূপ? তাহা কথিত হইতেছে।

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৬৩

রজ্জুতে কল্পিত সর্প যেরূপ রজ্জুরূপে পরিদৃষ্ট হয়[প্রকাশ পায়], এইরূপ, আত্ম-বুদ্ধিতে আত্মস্বরূপে পরিদৃষ্ট হইয়া মনই মায়াদ্বারা গ্রাহ্য-গ্রাহকরূপ(জ্ঞেয়-জ্ঞাতৃস্বরূপ) দ্বৈতাকারে প্রকাশমান হইয়া দর্শনাদি কার্য্য করে; যেমন—রজ্জুতে কল্পিত সর্প। ঠিক তেমনই জাগ্রৎকালেও মন মায়া দ্বারা[নানাকারে] স্পন্দিত হইয়া থাকে; বস্তুতঃ তাহার ঐ স্পন্দন বাস্তবিক নহে ॥ ৯৬॥ ২৯

অদ্বয়ঞ্চ দ্বয়াভাসং মনঃ স্বপ্নে ন সংশয়ঃ।

অদ্বয়ঞ্চ দ্বয়াভাসং তথা জাগ্রন্ন সংশয়ঃ ॥ ৯৭ ॥ ৩০

সরলার্থঃ

স্বপ্নে চ অদ্বয়ৎ(দ্বিতীয়রহিতম্ অপি) মনঃ দ্বয়াভাসং(দ্বৈতাকারেণ অবভাসমানং সৎ)[প্রকাশতে, অত্র] সংশয়ঃ ন[অস্তি]। তথা(তদ্বদেব) অদ্বয়ং চ(অপি) জাগ্রৎ(জাগরিতাবস্থা) দ্বয়াভাসং[ভবতি, অত্র] সংশয়ঃ ন[অস্তি];[স্বপ্নবৎ জাগ্রদপি মনঃকল্পিতমেব ইত্যাশয়ঃ] ॥ ৯৭ ॥ ৩০

স্বপ্নাবস্থায় যেমন একক মনই মায়া দ্বারা সদ্বিতীয়বং প্রকাশ পাইয়া থাকে, তেমনি জাগ্রদবস্থায়ও একাকী মনই মায়া দ্বারা বিবিধ দ্বৈতাকারে প্রতিভাসমান হইয়া থাকে ৷ ৯৭ ॥ ৩০

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

রজ্জুরূপেণ সর্প ইব পরমার্থত আত্মরূপেণ অদ্বয়ং সৎ দ্বয়াভাসং মনঃ স্বপ্নে, ন সংশয়ঃ। ন হি স্বপ্নে হস্ত্যাদি গ্রাহ্যং, তদ্‌গ্রাহকং বা চক্ষুরাদি দ্বয়ং বিজ্ঞানব্যতিরে- কেণ অস্তি। জাগ্রদপি তথৈবেত্যর্থঃ। পরমার্থসবিজ্ঞানমাত্রাবিশেষাৎ ॥ ৯৭ ॥ ৩০

ভাষ্যানুবাদ

রজ্জুতে কল্পিত সর্প যেমন রজ্জুরূপে অদ্বিতীয়ই বটে, তেমনি স্বরূপাবস্থায় প্রকৃত পক্ষে মন আত্মস্বরূপে অদ্বিতীয় হইলেও[মায়া- দ্বারা] সদ্বিতীয়বৎ প্রতিভাত হয়, ইহাতে সংশয় নাই; কেন না, স্বপ্নাবস্থায় একমাত্র বিজ্ঞান ব্যতীত হস্তিপ্রভৃতি দৃশ্য কিংবা তদ্গ্রাহক

১৬৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

চক্ষুঃ প্রভৃতি দ্বৈত যে বিদ্যমান থাকে, তাহা নহে, জাগ্রদবস্থাও ঠিক তদ্রূপই; কারণ, তখনও পরমার্থ সত্য কেবল বিজ্ঞানরূপত্বের কিছুমাত্র বিশেষ হয় না ॥ ৯৭ ॥ ৩০

মনোদৃশ্যমিদং দ্বৈতং যৎ কিঞ্চিৎ সচরাচরম্। মনসো হ্যমনীভাবে দ্বৈতং নৈবোপলভ্যতে ॥ ৯৮ ॥ ৩১

সরলার্থঃ

দৃশ্যম্(দর্শনযোগ্যম্) ইদং(অনুভূয়মানং) সচরাচরং(স্থাবর-জঙ্গমসহিতং) যৎ কিঞ্চিৎ দ্বৈতং,[তৎ সর্ব্বং] মনঃ(মন এব, ন ততো ভিন্নম্); হি(যস্মাৎ) মনসঃ অমনীভাবে(নিরোধসমাধৌ সংকল্পাদিবিরহে জাতে) দ্বৈতং(জগৎ) ন এব উপলভ্যতে(উপলব্ধিবিষয়ো ন ভবতীত্যর্থঃ) ॥

দৃশ্যমান এই চরাচরাত্মক যে কিছু দ্বৈত,[তৎসমস্তই] মনঃস্বরূপ;[মনের অতিরিক্ত জগতের সত্তা নাই]। কারণ,[নিরোধ-সময়ে] মনের যখন মনস্ত (সংকল্পনা) বিলুপ্ত হইয়া যায়, তখন নিশ্চয়ই দ্বৈতের উপলব্ধি হয় না ॥ ৯৮ ॥ ৩১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

রজ্জুসর্পবৎ বিকল্পনারূপং দ্বৈতরূপেণ মন এবেত্যুক্তম্। তত্র কিং প্রমাণ- মিতি অন্বয়-ব্যতিরেকলক্ষণম্ অনুমানমাহ—কথং? তেন হি মনসা বিকল্প্যমানেন দৃশ্যং—মনোদৃশ্যামদং দ্বৈতং সর্ব্বং মন ইতি প্রতিজ্ঞা, তদ্ভাবে ভাবাৎ তদভাবে অভাবাৎ। মনসো হি অমনীভাবে নিরুদ্ধে বিবেকদর্শনাভ্যাসবৈরাগ্যাভ্যাং রজ্জামিব সর্পে লয়ং গতে বা সুষুপ্তে দ্বৈতং নৈবোপলভ্যত ইত্যভাবাৎ সিদ্ধং দ্বৈতস্যাসত্ত্বমিত্যর্থঃ ॥ ৯৮ ॥ ৩১

ভাষ্যানুবাদ

মনই রজ্জু-সর্পের ন্যায় দ্বৈতরূপে বিকল্পনাময় ইহা বলা হইয়াছে। ইহার প্রমাণ কি? এইজন্য অন্বয় ও ব্যতিরেকাত্মক অনুমান প্রমাণ বলিতেছেন—কি প্রকার? যেহেতু, বিকল্প্যমান মন দ্বারা দৃশ্য— মনোদৃশ্য এই সমস্ত দ্বৈত নিশ্চয়ই মনঃস্বরূপ, ইহা প্রতিজ্ঞা, (সাধ্যরূপে নির্দেশ); কেন না, যেহেতু, মনের সত্তায় দ্বৈতের সত্তা,

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৬৫

আর মনের অসত্তায় দ্বৈতের অসত্তা। মনের অমনীভাব হইলে অর্থাৎ নিরুদ্ধাবস্থা হইলে, বিবেকদর্শনের পুনঃ পুনঃ অনুশীলন ও বৈরাগ্য দ্বারা রজ্জুতে সর্পের ন্যায় লয়প্রাপ্তি হইলে, অথবা সুষুপ্তিতে কখনই দ্বৈত উপলব্ধ হয় না; অতএব, অভাব-বশতঃই দ্বৈতভাব অসিদ্ধ ॥ ৯৮ ॥ ৩১

আত্মসত্যানুবোধেন ন সঙ্কল্পয়তে যদা।

অমনস্তাং তদা যাতি গ্রাহ্যাভাবে তদগ্রহম্ ॥ ৯৯ ॥ ৩২

সরলার্থঃ

তৎ(মনঃ) আত্মসত্যানুবোধেন(আত্মনঃ সত্যত্বোপলব্ধ্যা) যদা(যস্মিন্ কালে) ন সংকল্পয়তে(সংকল্পং ন করোতি), তদা গ্রাহ্যাভাবে(গ্রহণযোগ্য- বস্তুনুপলব্ধৌ) অগ্রহং(গ্রহণচিন্তারহিতং সৎ) অমনস্তাং(অমনোভাবং বিকল্পরাহিত্যং) যাতি(প্রাপ্নোতি)।

সেই মন যখন আত্মার সত্যতা উপলব্ধি করিয়া সংকল্প পরিত্যাগ করে, তখন আর গ্রহণযোগ্য কোন বস্তু না থাকায় বস্তু-গ্রহণের চিন্তা-বর্জিত হইয়া অমনস্তা(সংকল্পরাহিত্য) লাভ করে ॥ ৯৯ ॥ ৩২

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

কথং পুনরয়ম্ অমনীভাবঃ? ইতি উচ্যতে--আত্মৈব সত্যমাত্মসত্যং, মৃত্তিকাবৎ, “বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়ং, মৃত্তিকেত্যেব সত্যম্” ইতি শ্রুতেঃ। তস্য শাস্ত্রাচার্য্যোপদেশম্ অনু বোধ আত্মসত্যানুবোধঃ। তেন সঙ্কল্প্যাভাবাৎ তৎ ন সঙ্কল্পয়তে, দাহ্যাভাবে জ্বলনমিবাগ্নেঃ যদা যস্মিন্ কালে, তদা তস্মিন্ কালে অমনস্তাম্ অমনোভাবং যাতি; গ্রাহ্যাভাবে তন্মনোহগ্রহং গ্রহণ- বিকল্পনাবর্জিতমিত্যর্থঃ ॥ ৯৯ ॥ ৩২

ভাষ্যানুবাদ

সেই অমনীভাব হয় কি প্রকারে? তাহা বলিতেছেন—‘বিকার বা কার্য্য মাত্রই বাক্যারব্ধ নামমাত্র, মৃত্তিকাই প্রকৃত সত্য’ এই শ্রুতি অনুসারে[জানা যায় যে,] মৃত্তিকার ন্যায় আত্মাই একমাত্র সত্য

১৬৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

পদার্থ—আত্মসত্য, শাস্ত্র ও আচার্য্যের উপদেশানুসারে যে, তাহার জ্ঞান, তাহারই নাম—আত্মসত্যানুবোধ; সেই হেতু, দাহ্যাভাবে অগ্নির ন্যায় সংকল্পযোগ্য বিষয় না থাকায়, যে সময় সেই মন আর সংকল্প করে না; তখন অর্থাৎ সেই কালে গ্রাহ্য পদার্থ না থাকায় মন অগ্রহ হইয়া—গ্রহণবিষয়ক চিন্তা পরিত্যাগ করিয়া, অমনস্তা— অমনোভাব(সংকল্প-রাহিত্য) প্রাপ্ত হইয়া থাকে ॥ ৯৯ ॥ ৩২

অকল্পকমজং জ্ঞানং জ্ঞেয়াভিন্নং প্রচক্ষতে। ব্রহ্ম জ্ঞেয়মজং নিত্যমজেনাজং বিবুধ্যতে॥ ১০০॥ ৩৩

সরলার্থঃ

নিত্যম্(কূটস্থম্) অজং ব্রহ্ম[যস্য জ্ঞানস্য] জ্ঞেয়ং[ভবতি, তৎ] অকল্পকম্(সর্ব্বকল্পনারহিতম্) অজং(নিত্যং) জ্ঞানং(জ্ঞানমেব) জ্ঞেয়া- ভিন্নং(জ্ঞেয়েন ব্রহ্মণা অভিন্নং) প্রচক্ষতে(কথয়ন্তি)[বিবেকিন ইতি শেষঃ]। নিত্যম্ অজং(ব্রহ্ম)[স্বয়মেব] অজেন(জ্ঞানেন) বিবুধ্যতে(বোধং লভতে)। যদ্বা অজেন(নিত্যেন জ্ঞানেন কর্তৃস্বরূপেণ) অজম্(আত্মতত্ত্বং) বিবুধ্যতে (বিজ্ঞায়তে ইত্যর্থঃ)।

নিত্য. অজ ব্রহ্ম যে জ্ঞানের বিষয়ীভূত হন, সর্ব্ববিকল্পবর্জিত সেই অজ (নিত্য) জ্ঞান জ্ঞেয় ব্রহ্ম হইতে ভিন্ন নহেন, অজ ব্রহ্ম নিজেই নিত্য জ্ঞান দ্বারা প্রকাশ পাইয়া থাকেন ॥ ১০০ ॥ ৩৩

শঙ্কর-ভাষ্যম্

যদি অসদিদং দ্বৈতং, কেন সমঞ্জসমাত্মতত্ত্বং বিবুধ্যতে? ইতি উচ্যতে-অক- ল্পকং সর্ব্বকল্পনাবর্জিতং, অতএব অজং জ্ঞানং জ্ঞপ্তিমাত্রং জ্ঞেয়েন পরমার্থসতা ব্রহ্মণা অভিন্নং প্রচক্ষতে কথয়ন্তি ব্রহ্মবিদঃ। “ন হি বিজ্ঞাতুর্বিজ্ঞাতেঃ বিপরি- লোপো বিদ্যুতে” অগ্ন্যুষ্ণবৎ। “বিজ্ঞানমানন্দং ব্রহ্ম।” “সত্যং জ্ঞানমানন্দং* ব্রহ্ম” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ। তস্যৈব বিশেষণং-ব্রহ্ম জ্ঞেয়ং যস্য, স্বস্থং তদিদং ব্রহ্ম জ্ঞেয়ং ঔষ্ণ্যস্যেব অগ্নিবৎ অভিন্নম্; তেন আত্মস্বরূপেণ অজেন জ্ঞানেন অজং জ্ঞেয়মাত্মতত্ত্বং স্বয়মেব বিবুধ্যতে অবগচ্ছতি। নিত্যপ্রকাশস্বরূপ ইব সবিতা নিত্যবিজ্ঞানৈকরসঘনত্বাৎ ন জ্ঞানান্তরমপেক্ষত ইত্যর্থঃ ॥ ১০০ ॥ ৩৩

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৬৭

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, এই সমস্ত দ্বৈতই যদি অসৎ হইল, তাহা হইলে প্রকৃত সত্য আত্মতত্ত্ব কাহার দ্বারা পরিজ্ঞাত হয়? বলা হইতেছে-অকল্পক অর্থাৎ সর্বপ্রকার কল্পনারহিত, এই কারণেই অজ(উৎপত্তিশূন্য) কেবলই জ্ঞান-বস্তুটিকে জ্ঞেয়রূপী পরমার্থসত্য ব্রহ্মের সহিত অভিন্ন- এক বলিয়া ব্রহ্মবিদ্গণ বলিয়া থাকেন। শ্রুতি বলিয়াছেন-অগ্নির উষ্ণতার ন্যায় ‘বিজ্ঞাতার জ্ঞানও বিলুপ্ত হয় না।’ ‘ব্রহ্ম জ্ঞান ও আনন্দ-স্বরূপ,’ ‘ব্রহ্ম সত্য জ্ঞান ও অনন্ত’ ইত্যাদি। তাঁহারই বিশেষণ-ব্রহ্ম যাহার জ্ঞেয়, স্বরূপস্থ সেই এই জ্ঞান, অগ্নির উষ্ণতাবৎ জ্ঞেয় ব্রহ্ম হইতে অভিন্ন। সেই অজ জ্ঞেয়স্বরূপ আত্মতত্ত্ব স্বয়ংই আপনাকে স্বস্বরূপ অজ জ্ঞান দ্বারা অবগত হন অর্থাৎ এক জ্ঞানই ব্রহ্মভাবে জ্ঞেয়, আবার স্বরূপতঃ জ্ঞাতা। নিত্যপ্রকাশ-স্বরূপ সূর্য্য যেমন[আত্মপ্রকাশের জন্য আর অপর প্রকাশের অপেক্ষা করে না,] তেমনি আত্মাও একমাত্র নিত্য জ্ঞানস্বরূপ; সুতরাং[আপনার প্রকাশের জন্য] জ্ঞানান্তরের অপেক্ষা করে না ॥ ১০০ ॥ ৩৩

নিগৃহীতস্য মনসো নির্বিকল্পস্য ধীমতঃ। প্রচারঃ স তু বিজ্ঞেয়ঃ সুষুপ্তেহন্যো ন তৎসমঃ ॥ ১০১॥ ৩৪

সরলার্থঃ

নিগৃহীতস্য(নিরুদ্ধস্য) নির্বিকল্পস্য(বিকল্পনারহিতস্য) ধীমতঃ(বিবেক- শালিনঃ) মনসঃ[যঃ] প্রচারঃ(ব্যাপারঃ), স(প্রচারঃ) তু[এব] বিজ্ঞেয়ঃ (বিশেষেণ জ্ঞাতব্যঃ)[যোগিভিরিতি শেষঃ]। সুষুপ্তে(সুষুপ্ত্যবস্থায়াং) [পুনঃ] অন্যঃ(অন্যপ্রকারঃ—অবিদ্যামোহকলিতঃ)[প্রচারঃ ভবতি, অতঃ] ন তৎসমঃ(নিরুদ্ধসম ইত্যর্থঃ)।

নিরোধাবস্থাপন্ন, বিকল্পশূন্য ও বিবেকসম্পন্ন মনের যে প্রচার, তাহাই [যোগিগণের] বিশেষরূপে জ্ঞাতব্য; সুষুপ্তাবস্থায় যে প্রচার বা বৃত্তি, তাহা কিন্তু অন্যপ্রকার—অবিদ্যা-মোহ-সমন্বিত; অতএব ইহা নিরুদ্ধাবস্থার সমান নহে ॥ ১০১ ॥ ৩৪

১৬৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

আত্মসত্যানুবোধেন সঙ্কল্পমকুর্ব্বৎ বাহ্যবিষয়াভাবে নিরিন্ধনাগ্নিবৎ প্রশান্তং সৎ নিগৃহীতং নিরুদ্ধং মনো ভবতীত্যুক্তম্। এবঞ্চ মনসো হ্যমনীভাবে দ্বৈতাভাব- শ্চোক্তঃ। তস্যৈবং নিগৃহীতস্য নিরুদ্ধস্য মনসো নির্বিকল্পস্য সর্ব্বকল্পনাবজ্জিতস্য ধীমতো বিবেকবতঃ প্রচরণং প্রচারো যঃ, স তু প্রচারঃ বিশেষেণ জ্ঞেয়ো বিজ্ঞেয়ো যোগিভিঃ।

ননু সর্ব্বপ্রত্যয়াভাবে যাদৃশঃ সুষুপ্তিস্থস্য মনসঃ প্রচারঃ, তাদৃশ এব নিরুদ্ধস্যাপি, প্রত্যয়াভাবাবিশেষাৎ কিং তত্র বিজ্ঞেয়ম্? ইতি। অত্রোচ্যতে-নৈবম্, যস্মাৎ সুষুপ্তেইন্যঃ প্রচার অবিদ্যামোহতমোগ্রস্তস্য অন্তর্লীনানেকানর্থপ্রবৃত্তিবীজবাসনাবতঃ মনসঃ আত্মসত্যানুবোধ-হুতাশবিপ্লুষ্টাবিদ্যাদ্যনর্থপ্রবৃত্তিবীজস্য নিরুদ্ধস্য অন্য এব প্রশান্তসর্ব্বক্লেশরজসঃ স্বতন্ত্রঃ প্রচারঃ, অতো ন তৎসমঃ। তস্মাদযুক্তঃ স বিজ্ঞাতুমিত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ১০১ ॥ ৩৪

ভাষ্যানুবাদ

পূর্ব্বে কথিত হইয়াছে যে, পরমার্থসত্য আত্মার উপলব্ধিবশতঃ সংকল্প পরিত্যাগ করায় বাহ্য বিষয়[ জ্ঞাতব্য] থাকে না, তখন মন কাষ্ঠশূন্য অগ্নির ন্যায় প্রশান্ত হইয়া নিগৃহীত—নিরুদ্ধ হইয়া থাকে; এইপ্রকার মনের মননস্বভাব রহিত হইয়া গেলে যে দ্বৈতাভাব ঘটে, তাহাও উক্ত হইয়াছে। সেই যে, এই নিগৃহীত—নিরুদ্ধাবস্থাপন্ন এবং সর্ব্বপ্রকার কল্পনারহিত ও বিবেকসম্পন্ন মনের প্রচার—প্রচরণ অর্থাৎ ব্যাপার, সেই প্রচারই যোগিগণের বিশেষরূপে জ্ঞাতব্য *।

অদ্বৈত প্রকরণম্ ১৬৯

ভাল, নিরুদ্ধাবস্থায় যদি সর্বপ্রকার প্রতীতির অভাব হয়, তাহা হইলে সুষুপ্তি-সময়ে মনের যে প্রকার অবস্থা হয়, নিরোধাবস্থাপন্ন মনের অবস্থাও ত সেই প্রকারই হইল? কারণ, উভয় স্থলেই প্রতীতির অভাব তুল্য; সুতরাং সে অবস্থায় আর কি জানিতে হইবে? তদুত্তরে বলা হইতেছে—না—এরূপ বলিতে পার না, কারণ, সুষুপ্তি-সময়ে মনঃ অবিদ্যা-মোহরূপ তমোগ্রস্ত থাকে, এবং অনেকানেক অনর্থোৎ- পত্তির বীজবাসনাও তাহার অভ্যন্তরে লীন হইয়া থাকে, তাহার ব্যাপার অন্যপ্রকার; আর আত্মার সত্যতা উপলব্ধিরূপ হুতাশন দ্বারা যাহার অনর্থপ্রবৃত্তির বীজভূত অবিদ্যাদি দোষরাশি বিশেষরূপে দগ্ধ হইয়াছে, এবং যাহার ক্লেশ-নিদান রজোগুণ প্রশমিত হইয়াছে, নিরুদ্ধাবস্থাপন্ন সেই মনের প্রচার বা ব্যাপার সৌষুপ্ত প্রচার হইতে স্বতন্ত্র বা পৃথগ্ভূত; অতএব, ঐ উভয় প্রচার সমান নহে; সুতরাং নিরুদ্ধে মনোব্যাপার জানিতে পারা যাইতে পারে * ॥ ১০১ ॥ ৩৪

লীয়তে হি সুষুপ্তে তন্নিগৃহীতং ন লীয়তে। তদেব নির্ভয়ং ব্রহ্ম জ্ঞানালোকং সমন্ততঃ ॥ ১০২ ॥ ৩৫

সরলার্থঃ

[অবস্থাদ্বয়ে প্রচারভেদে হেতুং দর্শয়তি—“লীয়তে” ইত্যাদিনা।]—হি (যস্মাৎ) সুষুপ্তে তৎ(মনঃ) লীয়তে(কারণশরীরে অবিদ্যায়াং প্রবিশতি)

* তাৎপর্য্য—আপত্তি হইল যে, সুষুপ্তি অবস্থায় যেরূপ কোন প্রকার মনো- ব্যাপার থাকে না, সেইরূপ নিরুদ্ধাবস্থায়ও যদি সর্ব্বপ্রকার প্রতীতি বা মনোব্যাপার বিরত হইয়া যায়, তাহা হইলে সে অবস্থায় ত কিছুমাত্র জ্ঞাতব্য থাকিতে পারে না; সুতরাং জ্ঞাতব্যাভাব জানিবার আদেশ করা সঙ্গত হয় কিরূপে? তদুত্তরে বলিতেছেন যে, না—নিরুদ্ধ ও সুষুপ্তি অবস্থা তুল্য নহে; সুষুপ্তি অবস্থায় মন চেষ্টারহিত ও অবিদ্যামোহে সমাবৃত থাকে; তখন প্রকৃত পক্ষে অজ্ঞানেরই বৃত্তি হয়; আর নিরুদ্ধাবস্থায় সত্ত্বোৎকর্ষ বৃদ্ধি পাইয়া স্বতন্ত্র একপ্রকার ব্যাপার উপস্থিত করে, তখন আর অজ্ঞান-বৃত্তি থাকে না; সুতরাং উভয় অবস্থার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রহিয়াছে। এই কারণেই নিরুদ্ধকালীন সাত্ত্বিক মনোব্যাপারকে জ্ঞাতব্য বলিয়া উপদেশ করা হইয়াছে।

১৭০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

নিগৃহীতং(নিরুদ্ধাবস্থাপন্নং)[তু] ন লীয়তে(স্বস্বরূপেণৈব তিষ্ঠতি); [তস্মিন্ সময়ে] তৎ(মনঃ) এব নির্ভয়ং(সর্ব্বভয়নিমিত্তশূন্যং) সমন্ততঃ (চতুৰ্দ্দিক্ষু) জ্ঞানালোকং(জ্ঞানৈকরসং) ব্রহ্ম[সম্পদ্যতে ইতি শেষঃ]।

যেহেতু সুষুপ্তিদশায় মন অবিদ্যায় বিলীন হইয়া যায়, কিন্তু নিরুদ্ধাবস্থাপন্ন মন তাহাতে বিলীন হয় না; তখন সেই মনই অভয় ও সর্ব্বতোভাবে জ্ঞান-- প্রকাশ-সম্পন্ন ব্রহ্মভাব লাভ করিয়া থাকে।

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

প্রচারভেদে হেতুমাহ-লীয়তে সুষুপ্তৌ হি যস্মাৎ সর্ব্বাভিঃ অবিদ্যাদিপ্রত্যয়-- বীজবাসনাভিঃ সহ তমোরূপম্ অবিশেষরূপং বীজভাবমাপদ্ধতে, তদ্বিবেকবিজ্ঞান- পূর্ব্বকং নিরুদ্ধং নিগৃহীতং সৎ ন লীয়তে তমোবীজভাবং নাপদ্যতে। তস্মাদযুক্তঃ প্রচারভেদঃ সুষুপ্তস্য সমাহিতস্য মনসঃ। যদা গ্রাহ্যগ্রাহকাবিদ্যাকৃতমলদ্বয়বর্জিতং, তদা পরমদ্বয়ং ব্রহ্মৈব তৎ সংবৃত্তম্, ইত্যতস্তদেব নির্ভয়ম্। দ্বৈতগ্রহণস্য ভয়- নিমিত্তস্য অভাবাৎ। শান্তমভয়ং ব্রহ্ম, যদ্বিদ্বান্ ন বিভেতি কুতশ্চন, তদেব বিশেষ্যতে-জ্ঞপ্তিজ্ঞানম্ আত্মস্বভাবচৈতন্যং, তদেব জ্ঞানম্ আলোকঃ প্রকাশো যস্য, তদ্ ব্রহ্ম জ্ঞানালোকং বিজ্ঞানৈকরসঘনম্ ইত্যর্থঃ। সমন্ততঃ সমস্তাৎ সর্ব্বতো ব্যোমবৎ নৈরন্তর্য্যেণ ব্যাপকম্ ইত্যর্থঃ ॥ ১০২ ॥ ৩৫

ভাষ্যানুবাদ

মনের প্রচারভেদে হেতু বলিতেছেন—যেহেতু সুষুপ্তি-অবস্থায় মন অবিদ্যাদি সমস্ত প্রতীতির কারণীভূত বাসনার সহিত তমঃস্বভাব অবিশেষরূপ(যাহা সকলের পক্ষেই সাধারণ) বীজভাব(কারণাবস্থা) প্রাপ্ত হইয়া থাকে, কিন্তু সেই মন বিবেকজ্ঞান দ্বারা নিগৃহীত— নিরুদ্ধাবস্থাপন্ন হইয়া আর লীন হয় না—তমঃস্বভাব বীজভাব প্রাপ্ত হয় না; অতএব, সুষুপ্ত ও সমাহিত(নিরুদ্ধ) চিত্তের প্রচারভেদ অবশ্যই যুক্তিযুক্ত।[মন] যখন অবিদ্যাকৃত গ্রাহ্য-গ্রাহকভাবজনিত দ্বিবিধ মলবর্জিত হয়, তখন তাহা অদ্বৈত পরব্রহ্মভাবেই সম্পন্ন হয়, এই কারণে তাহাই নির্ভয়; কেননা, ভয়ের কারণীভূত দ্বৈতবিজ্ঞান তখন থাকে না। ব্রহ্মই শান্ত ও অভয়স্বরূপ, পুরুষ যাহাকে জানিলে

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৭১

কোথা হইতেও ভীত হয় না, তাহাকেই বিশেষ করিয়া বলা হইতেছে —জ্ঞান অর্থ—জ্ঞপ্তি(বোধ), অর্থাৎ আত্মস্বরূপ চৈতন্য; সেই জ্ঞানই যাহার আলোক অর্থাৎ প্রকাশস্বরূপ, তাহাই জ্ঞানালোক অর্থাৎ একমাত্র বিজ্ঞানমূর্ত্তি। সমন্তত অর্থ—সর্বদিকে অর্থাৎ আকাশের ন্যায় নিরন্তরভাবে সর্বদিকব্যাপী ॥ ১০২ ॥ ৩৫

অজমানিদ্রমস্বপ্ননামকমরূপকম্।

সকৃদ্বিভাতং সর্ব্বজ্ঞং নোপচারঃ কথঞ্চন ॥ ১০৩ ॥ ৩৬

সরলার্থঃ

[ব্রহ্ম] অজম্(জন্মরহিতম্) অনিদ্রম্(অবিদ্যা-নিদ্রা-রহিতম্) অস্বপ্নম্ (স্বপ্নদর্শনশূন্যম্) অনামকম্(নাম্না নির্দ্দিষ্টমশক্যম্), অরূপকম্(ন কেনচিৎ নিরূপয়িতুং শক্যং) সকৃৎ(একবারমেব) বিভাতং(প্রকাশমানং) সর্ব্বজ্ঞং (সর্ব্বাত্মকং, জ্ঞস্বরূপং চ);[অতঃ তস্মিন্] কথঞ্চন(কথমপি) উপচারঃ (কর্ত্তব্যঃ) ন[বিদ্যতে ইতি শেষঃ]।

ব্রহ্ম স্বরূপতই জন্মরহিত, নিদ্রাশূন্য(সুষুপ্তিরহিত), স্বপ্নবর্জিত, নামরূপশূন্য এবং একবারই প্রকাশমান সর্ব্বাত্মক ও জ্ঞানস্বরূপ; অতএব, তাঁহাতে কোন প্রকার কর্তব্য সম্ভবপর হয় না ॥ ১০৩ ॥ ৩৬

শঙ্কর-ভাষ্যম্

জন্মনিমিত্তাভাবাৎ সবাহ্যাভ্যন্তরম্ অজম্; অবিদ্যানিমিত্তং হি জন্ম রজ্জুসর্পবৎ, ইত্যবোচাম। সা চাবিদ্যা আত্মসত্যানুবোধেন নিরুদ্ধা যতঃ, অতঃ অজম্, অত- এবানিদ্রম্,—অবিদ্যালক্ষণানাদিমায়া-নিদ্রা-স্বাপাৎ প্রবুদ্ধম্ অদ্বয়স্বরূপেণ আত্মনা; অতঃ অস্বপ্নম্। অপ্রবোধকৃতে হ্যস্য নাম-রূপে; প্রবোধাচ্চ তে রজ্জুসর্পবদ্বিনষ্টে; ন নাম্না অভিধীয়তে ব্রহ্ম, রূপ্যতে বা ন কেনচিৎ প্রকারেণ, ইতি অনামকম্ অরূপকঞ্চ তৎ। “যতো বাচো নিবর্তন্তে” ইত্যাদিশ্রুতেঃ।

কিঞ্চ, সকৃৎ বিভাতং সদৈব বিভাতং সদা ভারূপম্, গ্রহণান্যথাগ্রহণাবির্ভাব- তিরোভাববর্জিতত্বাৎ। গ্রহণাগ্রহণে হি রাত্র্যহনী; তমশ্চাবিদ্যালক্ষণং সদা অপ্রভাতত্বে কারণম্; তদভাবাৎ নিত্যচৈতন্যভারূপত্বাচ্চ যুক্তং সক্বদ্বিভাতমিতি। অতএব সর্ব্বঞ্চ তৎ জ্ঞস্বরূপঞ্চেতি সর্ব্বজ্ঞম্; নেহ ব্রহ্মণি এবংবিধে উপচরণমুপচারঃ

১৭২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

কর্তব্যঃ, যথা অন্যেষামাত্মস্বরূপব্যতিরেকেণ সমাধানাদ্যুপচারঃ। নিত্যশুদ্ধবুদ্ধমুক্ত- স্বভাবত্বাদ্‌ব্রহ্মণঃ কথঞ্চন ন কথঞ্চিদপি কর্তব্যসম্ভবঃ অবিদ্যানাশে ইত্যর্থঃ ॥১০৩৷৷৩৬

ভাষ্যানুবাদ

জীবের জন্ম যে, রজ্জু-সর্পের ন্যায় অবিদ্যাকৃত, তাহা বলিয়াছি। জন্মের সেই কারণ না থাকায় বাহ্যাভ্যন্তরবর্তী ব্রহ্ম অজ,—যেহেতু আত্ম- সত্যের উপলব্ধি দ্বারা সেই অবিদ্যা নিরুদ্ধ হইয়াছে, সেই হেতুই অজ; সেই কারণেই অনিদ্র অর্থাৎ অনাদি অবিদ্যারূপ মায়া-নিদ্রা না থাকায় অদ্বয় আত্মস্বরূপে প্রবুদ্ধ(সর্বদা জাগরিত), এই জন্যই অস্বপ্ন (স্বপ্নদর্শনরহিত)। ইহার নাম ও রূপ, উভয়ই অজ্ঞানকৃত; প্রবোধ হওয়ায় রজ্জু-সর্পের ন্যায় সেই উভয়ই বিনষ্ট হইয়া যায়। ব্রহ্ম কোন নামে অভিহিত হন না, এবং কোন প্রকারে নিরূপিতও হন না; এই কারণে তিনি অনামক ও অরূপক। যেহেতু শ্রুতি বলিতেছেন— ‘মন যাহাকে না পাইয়া বাক্যের সহিত ফিরিয়া আইসে’ ইত্যাদি।

অপিচ, তিনি সকৃদ্বিভাত, অর্থাৎ সর্বদাই প্রকাশমান,-সর্বদা প্রকাশ-স্বরূপ; কেননা, বিষয় গ্রহণ কিংবা বিপরীত ভাবে গ্রহণ অথবা আবির্ভাব ও তিরোভাব-রূপ অপ্রকাশ তাঁহার নাই। বিষয় উপলব্ধি করা আর না করা, দিন-রাত্রিস্থানীয়, এই উভয় এবং অবিদ্যাত্মক তম(মোহ), ইহারাই অপ্রকাশের কারণ হইয়া থাকে, তাহা না থাকায় এবং নিত্য-চৈতন্যময় প্রকাশরূপত্ব হেতু তাহার সকৃৎবিভাতত্বও যুক্তিযুক্তই বটে; এই কারণেই তিনি সর্ব্বও বটেন এবং জ্ঞানস্বরূপও বটেন, সুতরাং সর্বজ্ঞ। অপরাপর লোকদিগের যেরূপ আত্মস্বরূপ ব্যতীতও সমাধি-চিন্তা প্রভৃতি কর্ত্তব্য কৰ্ম্ম সম্ভব হয়, এবংবিধ ব্রহ্মে তদ্রূপ কোনপ্রকার উপচার কর্ত্তব্য বলিয়া সম্ভব হয় না। অভিপ্রায় এই যে, অবিদ্যা বিনষ্ট হইয়া গেলে পর ব্রহ্ম নিত্য শুদ্ধ বুদ্ধ(জ্ঞানস্বরূপ) ও মুক্তস্বভাব হন, এইজন্য ব্রহ্ম সম্বন্ধে কোন প্রকারেই কোন কর্তব্যতা সম্ভব হইতে পারে না॥ ১০৩॥ ৩৬

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৭৩.

সর্ব্বাভিলাপবিগতঃ সর্ব্বচিন্তাসমুখিতঃ। সুপ্রশান্তঃ সকৃজ্যোতিঃ সমাধিরচলোহভয়ঃ॥ ১০৪॥ ৩৭

সরলার্থঃ

[উত্তেহর্থে হেতুমাহ—সর্ব্বেত্যাদি।]—সর্ব্বাভিলাপবিগতঃ(অভিধানসাধন- বাগিন্দ্রিয়বজ্জিতঃ)[‘অভিলাপ’পদং সর্ব্বেন্দ্রিয়াণাম্ উপলক্ষণার্থং, তেন সর্ব্বে- ন্দ্রিয়রহিত ইত্যর্থঃ]; সর্ব্বচিন্তাসমুত্থিতঃ(সর্ব্বাভ্যঃ চিন্তাভ্যঃ সমুত্থিতঃ উদগতঃ অন্তঃকরণশূন্য ইত্যর্থঃ); সুপ্রশান্তঃ(ক্ষোপরহিতঃ), সকৃজ্জ্যোতিঃ(সকৃদ্বিভাতঃ), সমাধিঃ(সমাধিলভ্যত্বাৎ সমাধিস্বরূপঃ), অচলঃ(নিষ্ক্রিয়ঃ)[অতএব] অভয়ঃ (দ্বৈতবিজ্ঞানবিলয়াৎ সর্ব্বভয়রহিতশ্চ ইত্যর্থঃ)[আত্মা ইতি শেষঃ]।

[আত্মা স্বভাবতঃই] সর্ব্বপ্রকার শব্দ-সাধনীভূত বাগিন্দ্রিয়রহিত(সর্ব্বেন্দ্রিয়- শূন্য), সর্ব্বপ্রকার চিন্তার সাধনীভূত অন্তঃকরণশূন্য, সুপ্রশান্ত, সকৃৎপ্রকাশময়, সমাধিগম্য এবং অচল ও অভয়স্বরূপ ॥ ১০৪ ॥ ৩৭

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

অনামকত্বাদ্যুক্তার্থসিদ্ধয়ে হেতুমাহ—অভিলপ্যতে অনেনেতি অভিলাপো বাক্করণং সর্ব্বপ্রকারস্য অভিধানস্য, তস্মাদ্ বিগতঃ। বাগত্র উপলক্ষণার্থা, সর্ব্ববাহ্য- করণবর্জিত ইত্যেতৎ। তথা, সর্ব্বচিন্তাসুমুত্থিতঃ, চিন্ত্যতে অনয়া ইতি চিন্তা বুদ্ধিঃ, তস্যাঃ সমুত্থিতঃ, অন্তঃকরণবিবর্জিত ইত্যর্থঃ, “অপ্রাণো হ্যমনাঃ শুভ্রঃ”, “অক্ষরাৎ পরতঃ পরঃ” ইত্যাদি শ্রুতেঃ। যস্মাৎ সর্ব্ববিষয়বর্জিতঃ; অতঃ সুপ্রশান্তঃ। সকৃজ্জ্যোতিঃ সদৈব জ্যোতিঃ আত্মচৈতন্যস্বরূপেণ; সমাধিঃ সমাধি- নিমিত্তপ্রজ্ঞাবগম্যত্বাৎ, সমাধীয়তে অস্মিন্নিতি বা সমাধিঃ। অচলঃ অবিক্রিয়ঃ; অতএব অভয়ঃ বিক্রিয়াভাবাৎ ॥ ১০৪ ॥ ৩৭

ভাষ্যানুবাদ

পূর্ব্বোক্ত অনামকত্বাদি প্রমাণ করিবার নিমিত্ত হেতু বলিতেছেন —যাহা দ্বারা শব্দ করা যায়, তাহার নাম অভিলাপ, সর্বপ্রকার শব্দোচ্চারণের সাধনীভূত বাগিন্দ্রিয়; তাহা হইতে বিগত—রহিত, বাক্-শব্দটি এখানে অপরাপর ইন্দ্রিয়েরও প্রতিপাদক;[সুতরাং

১৭৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

বুঝিতে হইবে,] সমস্ত বহিরিন্দ্রিয়-বর্জিত। সেইরূপ সর্বচিন্তা- সমুত্থিত—যাহা দ্বারা কোন বিষয় ভাবা যায়, তাহার নাম চিন্তা, অর্থাৎ বুদ্ধি, সেই বুদ্ধি হইতে উত্থিত, অর্থাৎ অন্তঃকরণবর্জিত; কারণ, শ্রুতি বলিতেছেন যে, তিনি ‘অপ্রাণ অমনা ও শুভ্র(শুদ্ধ)’, পর অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ অক্ষর অর্থাৎ প্রকৃতি অপেক্ষা পর ইত্যাদি। যেহেতু সমস্ত বিষয় বর্জিত, সেই হেতুই সম্যরূপে প্রশান্ত। সকৃজ্জোতিঃ অর্থাৎ আত্মচৈতন্যস্বরূপে সর্বদাই জ্যোতিঃস্বরূপ। সমাধি অর্থ—সমাধি- জনিত বুদ্ধিগম্য বলিয়া ‘সমাধি’ পদবাচ্য; অথবা, যাহার বিষয়ে চিত্তকে একাগ্র করা যায়, তাহার নাম সমাধি। অচল—বিকাররহিত, এই কারণেই অভয়—নির্বিকার বলিয়াই অভয়-পদবাচ্য ॥ ১০৪ ॥ ৩৭

গ্রহো ন তত্র নোৎসর্গশ্চিন্তা যত্র ন বিদ্যতে। আত্মসংস্থং তদা জ্ঞানমজাতি সমতাং গতম্ ॥ ১০৫ ॥৩৮

সরলার্থঃ

যত্র(ব্রহ্মণি) চিন্তা ন বিদ্যতে(অমনস্কত্বাৎ মনোধর্মঃ চিন্তা নাস্তি); তত্র(ব্রহ্মণি) গ্রহঃ(গ্রহণং) ন, উৎসর্গঃ(ত্যাগশ্চ) ন[বিদ্যতে ইতি শেষঃ]। তদা(আত্মসত্যানুবোধসময়ে) আত্মসংস্থং(স্বরূপাপন্নং) অজাতি (জন্মবর্জিতং) জ্ঞানং সমতাং গতং(সাম্যপ্রাপ্তং ভবতি, ভেদজ্ঞানং নিবর্ত্ততে ইতি ভাবঃ)।

যাঁহাতে(ব্রহ্মে) কোনরূপ চিন্তা নাই, তাঁহাতে গ্রহণ বা পরিত্যাগও সম্ভবে না; সেই অবস্থায়(আত্ম-সত্যানুভব সময়ে) আত্মপ্রতিষ্ঠ ও জন্মরহিত জ্ঞান সমতা লাভ করে; অর্থাৎ তখন ভেদবুদ্ধি বিলুপ্ত হইয়া যায় ॥ ১০৫ ॥ ৩৮

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যস্মাদ ব্রহ্মৈব “সমাধিরচলোহভয়” ইত্যুক্তং; অতো ন তত্র তস্মিন্ ব্রহ্মণি গ্রহো গ্রহণম্ উপাদানং, ন উৎসর্গ উৎসর্জনং হানং বা বিদ্যতে। যত্র হি বিক্রিয়া তদ্- বিষয়ত্বং বা, তত্র হানোপাদানে স্যাতাম্; ন তদ্‌ দ্বয়মিহ ব্রহ্মণি সম্ভবতি; বিকার- হেতোঃ অন্যস্যাভাবাৎ নিরবয়বত্বাচ্চ; অতো ন তত্র হানোপাদানে সম্ভবতঃ। চিন্তা যত্র ন বিদ্যতে, সর্ব্বপ্রকারৈব চিন্তা ন সম্ভবতি যত্র অমনস্বাৎ; কুতস্তত্র

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৭৫

হানোপাদানে ইত্যর্থঃ। যদৈব আত্মসত্যানুবোধো জাতঃ, তদৈব আত্মসংস্থং বিষয়াভাবাৎ অগ্ন্যুষ্ণবৎ আত্মন্যেব স্থিতং জ্ঞানম্, অজাতি জাতিবর্জিতম্; সমতাং গতং পরং সাম্যমাপন্নং ভবতি। যদাদৌ প্রতিজ্ঞাতম্ “অতো বক্ষ্যাম্য- কার্পণ্যমজাতিসমতাং গতম্” ইতি, ইদং তদুপপত্তিতঃ শাস্ত্রতশ্চোক্তম্ উপসংহ্রিয়তে— অজাতি সমতাং গতমিতি। এতস্মাদাত্মসত্যানুবোধাৎ কার্পণ্যবিষয়মন্যৎ, “যো বা এতদক্ষরং গার্গ্যবিদিত্বা অস্মাল্লোকাৎ প্রৈতি, স কৃপণঃ” ইতি শ্রুতেঃ। প্রাপ্যৈ- তৎ সর্ব্বঃ কৃতকৃত্যো ব্রাহ্মণো ভবতীত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ১০৫ ॥ ৩৮

ভাষ্যানুবাদ

যেহেতু ব্রহ্মকেই সমাধি অচল ও অভয় বলিয়া নির্দেশ করা হইয়াছে, অতএব তাঁহাতে- সেই ব্রহ্মে গ্রহণ অর্থাৎ গ্রহ বা উপাদান নাই, এবং উৎসর্গ বা হান(পরিত্যাগ) নাই। কারণ, যাহাতে বিকার বা বিকারযোগ্যতা থাকে, তাহাতেই হান(ত্যাগ) ও উপাদান (গ্রহণ) হইয়া থাকে; কিন্তু ব্রহ্মে তাহার দুইই অসম্ভব; কারণ, [তাঁহার] বিকারোৎপাদক অপর কোন পদার্থও নাই, এবং স্বয়ংও নিরবয়ব; এইজন্যই তাঁহাতে হান ও উপাদান সম্ভবপর হয় না। যাঁহাতে চিন্তা নাই-অর্থাৎ চিন্তাসাধন মন না থাকায় কোন প্রকার চিন্তাই যাঁহাতে সম্ভব হয় না, তাঁহাতে আবার হান বা উপাদান সম্ভব হয় কিরূপে? যে সময়েই আত্ম-সত্যের বোধ উপস্থিত হয়, সেই সময়েই মন আত্মসংস্থ হয়-অর্থাৎ[দাহ্যাভাবে] অগ্নির উষ্ণতা যেমন অগ্নিরূপে অবস্থিত হয়, তেমনি জ্ঞাতব্য বিষয় না থাকায় তখন জ্ঞানও আত্মাতেই অবস্থিত হয়, এবং অজাতি অর্থাৎ জন্মবর্জ্জিত ও সমতা- প্রাপ্ত অর্থাৎ পরম সাম্য প্রাপ্ত হয়। ইতঃপূর্ব্বে ‘অতঃপর অজাতি ও সমতাপ্রাপ্ত অকার্পণ্য বলিব’ এই বলিয়া যাহা প্রতিজ্ঞাত হইয়াছিল, এখানে “অজাতি ও সমতাংগতম্” কথায় শাস্ত্র ও যুক্তি অনুসারে তাহারই উপসংহার করা হইতেছে। এই আত্মসত্যের সম্যক্ উপলব্ধি হইতে কারপণ্যের বিষয়ীভূত বস্তুটি পৃথক্। কারণ, শ্রুতি বলিতেছেন- ‘হে গার্গি! যে লোক এই অক্ষর ব্রহ্মকে না জানিয়া ইহলোক হইতে

!

১৭৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

প্রয়াণ করে, সে লোক কৃপণ’ ইতি। অভিপ্রায় এই যে, সকলেই এই তত্ত্ব লাভ করিয়া কৃতকৃত্য ব্রহ্মনিষ্ঠ—ব্রাহ্মণ হইয়া থাকে ॥ ১০৫ ॥ ৩৮

অস্পর্শযোগো বৈ নাম দুর্দ্দর্শঃ সর্ব্বযোগিভিঃ। যোগিনো বিভ্যতি হ্যস্মাদভয়ে ভয়দর্শিনঃ॥ ১০৬॥ ৩৯

সরলার্থঃ

অস্পর্শযোগঃ(সর্ব্ববিষয়সম্বন্ধবজ্জিতঃ) নাম(প্রসিদ্ধঃ) সর্ব্বযোগিভিঃ (কর্তৃভিঃ) দুর্দর্শঃ(দুঃখেন দ্রষ্টুং অধিগন্তং শক্যঃ) বৈ(এব)। অভয়ে (আস্মিন্ নির্বিকল্পযোগে) ভয়দশিনঃ(ভয়ং মন্যমানাঃ) যোগিনঃ হি(নিশ্চয়ে) অস্মাৎ(অস্পর্শযোগাৎ) বিভ্যতি(আত্মনাশ-সম্ভাবনয়া ভীতা ভবন্তি)।

সর্ব্বপ্রকার বিষয়সংস্পর্শরহিত এই অস্পর্শ যোগটি যোগিগণের পক্ষে দুর্লভ; [এই কারণে] অভয়ে(যেখানে কোন ভয় নাই, সেখানেও) ভয়দর্শী যোগিগণ এই অস্পর্শ যোগ হইতে ভীত হইয়া থাকেন ॥ ১০৬ ॥ ৩৯

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যদ্যপি ইদমিথং পরমার্থতত্ত্বং, অস্পর্শযোগো নাম অয়ং সর্ব্বসম্বন্ধাখ্যস্পর্শ- বর্জিতত্বাৎ অস্পর্শযোগো নাম বৈ স্মর্য্যতে প্রসিদ্ধ উপনিষৎসু। দুঃখেন দৃশ্যত ইতি দুর্দর্শঃ সর্ব্বৈরোগিভিঃ বেদান্তবিজ্ঞানরাহিতৈঃ, সর্ব্বযোগিভিঃ আত্মসত্যানু- বোধায়াসলভ্য এবেত্যর্থঃ। যোগিনো বিভ্যতি হি অস্মাৎ সর্ব্বভয়বর্জিতাদপি আত্মনাশরূপম্ ইমং যোগং মন্যমানা ভয়ং কুর্ব্বন্তি, অভয়েহস্মিন্ ভয়দর্শিনো ভয়- নিমিত্তাত্মনাশ-দর্শনশীলা অবিবেকিন ইত্যর্থঃ ॥ ১০৬ ॥ ৩৯

ভাষ্যানুবাদ

যদিও পরমার্থ-তত্ত্বটি এইরূপই(সর্ব্বানর্থ-নিবর্ত্তকই বটে), [তথাপি] অস্পর্শযোগ, অর্থাৎ কোনপ্রকার বিষয়ের সম্বন্ধরূপ স্পর্শ না থাকায় উপনিষৎশাস্ত্রে ইহা ‘অস্পর্শযোগ’ নামে প্রসিদ্ধ বলিয়া কথিত হয়। দুঃখে দর্শন করা যায় বলিয়া, বেদান্ত-বিজ্ঞান-বিরহিত সমস্ত যোগিগণের দুর্দ্দর্শ, অর্থাৎ সমস্ত যোগিগণের পক্ষেই একমাত্র আত্মসত্যানুবোধোপযোগী ক্লেশ দ্বারাই লভ্য। এই অভয় যোগেও

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৭৭

ভয়দর্শী অর্থাৎ আত্মবিনাশ-সম্ভাবনায় ভয়দর্শনশীল অবিবেকী যোগি- গণ এই যোগকে আত্মবিনাশরূপী মনে করিয়া সর্বভয়-বজ্জিত এই যোগ হইতেও ভীত হন, অর্থাৎ ভয় করিয়া থাকেন ॥ ১০৬॥ ৩৯

মনসো নিগ্রহায়ত্তমভয়ং সর্ব্বযোগিনাম্। দুঃখক্ষয়ঃ প্রবোধশ্চাপ্যক্ষয়া শান্তিরেব চ ॥ ১০৭ ॥ ৪০

সরলার্থঃ

সর্ব্বযোগিনাং(আত্মসত্যানুবোধরহিতানাং হীন-মধ্যম-প্রজ্ঞানাং) অভয়ং (ভয়নিবৃত্তিঃ), দুঃখক্ষয়ঃ(দুঃখনিবৃত্তিঃ), প্রবোধঃ(আত্মবোধঃ), অক্ষয়া(নিত্যা) শান্তিঃ(মোক্ষঃ) এব চ(অপি) মনসঃ(অন্তঃকরণস্য) নিগ্রহায়ত্তং(সংযমাধীনং ভবতি)।[‘নিগ্রহায়ত্ত’শব্দস্য যথাযোগং সর্ব্বত্র লিঙ্গব্যত্যয়ঃ কার্য্যঃ]।

যে সমস্ত যোগী আত্মসত্যবোধরহিত, তাহাদের পক্ষে ভয়নিবৃত্তি, দুঃখধ্বংস, আত্মবোধ ও অক্ষয় শান্তি অর্থাৎ মুক্তি, এ সমস্তই মনের নিগ্রহাধীন ॥ ১০৭ ॥ ৪০

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যেষাং পুনব্রহ্মস্বরূপ ব্যতিরেকেণ রজ্জুসর্পবৎ কল্পিতমেব মন ইন্দ্রিয়াদি চ ন পরমার্থতো বিদ্যতে, তেষাং ব্রহ্মস্বরূপাণামভয়ং মোক্ষাখ্যা চাক্ষয়া শান্তিঃ স্বভাবত এব সিদ্ধা, নান্যায়ত্তা, “নোপচারঃ কথঞ্চন” ইত্যুক্তেঃ। যে তু অতোহন্যে যোগিনো মার্গগা হীনমধ্যমদৃষ্টয়ো মনোহন্যৎ আত্মব্যতিরিক্তম্ আত্মসম্বন্ধি পশ্যন্তি, তেষাম্ আত্মসত্যানুবোধরহিতানাং মনসো নিগ্রহায়ত্তম্ অভয়ং সর্ব্বেষাং যোগিনাম্। কিঞ্চ, দুঃখক্ষয়োহপি; ন হ্যাত্মসম্বন্ধিনি মনসি প্রচলিতে দুঃখক্ষয়োহস্তি অবিবেকি- নাম্। কিঞ্চ, আত্মপ্রবোধোহপি মনোনিগ্রহায়ত্ত এব। তথা, অক্ষয়াপি মোক্ষাখ্যা শান্তিস্তেষাং মনো-নিগ্রহায়ত্তৈব ॥ ১০৭ ॥ ৪০

ভাষ্যানুবাদ

যাহাদের নিকট মন ও ইন্দ্রিয়সমূহ ব্রহ্মব্যতিরেকে কেবলই কল্পিত, পরমার্থ সত্য নহে, অর্থাৎ রজ্জুসর্পস্থলে যেমন রজ্জুই সত্য, আর দৃশ্যমান সর্প কল্পিত মাত্র—অসত্য, তেমনি যাঁহারা একমাত্র ব্রহ্মকেই সত্য বলিয়া জানেন, এবং তদতিরিক্ত সমস্তকেই কল্পিত অসত্য বলিয়া

১২

১৭৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যাপনিষৎ

বুঝিতে পারেন, তাঁহাদের পক্ষে অভয় এবং মোক্ষনামক অক্ষয়া শান্তি স্বভাবতই সিদ্ধ, অন্যের অধীন নহে; কেননা, পূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে যে, তাহাতে কোন প্রকার উপচার সম্ভব হয় না। কিন্তু সৎপথবর্তী এবং হীন ও মধ্যম দৃষ্টিসম্পন্ন, অপর যে সমস্ত যোগী মনকে অন্য বলিয়া —আত্মা হইতে পৃথক্ আত্ম-সম্বন্ধী বলিয়া দর্শন করেন, সত্যস্বরূপ আত্মার স্বরূপানভিজ্ঞ সেই সমস্ত যোগীর পক্ষে অভয়প্রাপ্তি মনো- নিগ্রহের(মনঃসংযমের) আয়ত্ত অর্থাৎ অধীন। আরও এক কথা, দুঃখক্ষয়ও(মনোনিগ্রহের আয়ত্ত); কারণ, বিবেকবিহীন ব্যক্তি- গণের আত্মসম্বন্ধী মন চঞ্চল হইলে কখনই দুঃখক্ষয় হয় না, এবং আত্ম প্রবোধও মনোনিগ্রহেরই অধীন। সেইরূপ তাহাদের অক্ষয় (অবিনাশী) মোক্ষনামক শান্তিও মনোনিগ্রহেরই আয়ত্ত ॥ ১০৭ ॥ ৪০

উৎসেক উদধৈর্যদ্বৎ কুশাগ্রেণৈকবিন্দুনা। মনসো নিগ্রহস্তদ্বদ্ভবেদপরিখেদতঃ॥ ১০৮॥ ৪১

সরলার্থঃ

কুশাগ্রেণ(অতিসূক্ষ্মেণ) একবিন্দুনা(একৈকবিন্দুনা) উদধেঃ(সমুদ্রস্য) উৎসেকঃ(সেচনং) যদ্বৎ, অপরিখেদতঃ(অনির্ব্বেদাৎ অবসাদং বিনা) মনসঃ নিগ্রহঃ(আয়ত্তীকরণং সংযমঃ)[অপি] তদ্বৎ ভবতি(তথৈব সম্ভবতীত্যর্থঃ) ॥

কুশের অগ্রভাগ দ্বারা এক এক বিন্দু জল তুলিয়া সমুদ্র-সেচনের ন্যায় অখিন্ন- চিত্তে উদ্যমসহকারে মনোনিগ্রহও ঠিক সেইরূপ[সম্ভবপর হয়] ॥ ১০৮ ॥ ৪১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

মনোনিগ্রহোহপি তেষাম্ উদধেঃ কুশাগ্রেণৈকবিন্দুনা উৎসেচনেন শোষণব্যবসায়বৎ ব্যবসায়বতাম্ অনবসন্নান্তঃকরণানাম্ অনির্ব্বেদাৎ অপরিখেদতঃ ভবতীত্যর্থঃ ॥ ১০৮ ॥ ৪১

ভাষ্যানুবাদ

কুশের অগ্রভাগ দ্বারা এক বিন্দু করিয়া জলসেচন দ্বারা সমুদ্রশোষণ- প্রয়াস যেরূপ,[যোগানুষ্ঠানে] যাহাদের অন্তঃকরণ অবসন্ন বা

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৭৯

‘অনুৎসাহসম্পন্ন হয় না, উদ্যমশীল সেই সমস্ত লোকের মনোনিগ্রহও সেইরূপ[ সম্পন্ন] হইয়া থাকে ॥ ১০৮ ॥ ৪১

উপায়েন নিগৃহ্লীয়াদ্‌বিক্ষিপ্তং কাম-ভোগয়োঃ। সুপ্রসন্নং লয়ে চৈব যথা কামো লয়স্তথা॥ ১০৯॥ ৪২

সরলার্থঃ

কাম-ভোগয়োঃ(কামবিষয়ে ভোগবিষয়ে চ) বিক্ষিপ্তং(চঞ্চলং)[মনঃ] উপায়েন(বক্ষ্যমাণেন) নিগৃহীয়াৎ(নিরুদ্ধং কুৰ্য্যাৎ)।[লীয়তে সর্ব্বমস্মিন্ ইতি লয়ঃ সুষুপ্তিঃ, তস্মিন্] লয়ে চ(অপি) সুপ্রসন্নম্(উদ্বেগবজ্জিতম্)[অপি মনঃ নিগৃহীয়াৎ] এব।[যতঃ] কামঃ(বিষয়স্পৃহা) যথা(যদ্বৎ অনর্থহেতুঃ), লয়ঃ[অপি] তথা(অনর্থহেতুরিত্যর্থঃ)।[অতঃ সোহপি ত্যাজ্যঃ ইত্যাশয়ঃ]।

কাম্য বিষয়ে ও ভোগ্য বিষয়ে বিক্ষিপ্ত মনকে বক্ষ্যমাণ উপায় দ্বারা নিগৃহীত করিবে, এবং যাহাতে সমুদয় বিলীন হয় সেই লয়-নামক সুষুপ্তির অবস্থায় অতিশয় প্রসন্ন(সর্ব্ববিধ উদ্বেগহীন) মনকেও নিগৃহীত করিবে; কারণ, কাম যেরূপ অনর্থকর, লয়ও তেমনি অনর্থকর ॥ ১০৯ ॥ ৪২

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কিম্ অপরিখিন্নব্যবসায়মাত্রমেব মনোনিগ্রহ উপায়ঃ? ন ইত্যুচ্যতে। ‘অপরিখিন্নব্যবসায়বান্ সন্ বক্ষ্যমাণেন উপায়েন কামভোগবিষয়েষু বিক্ষিপ্তং মনো নিগৃহীয়াৎ নিরুন্ধ্যাৎ আত্মনি এব ইত্যর্থঃ। কিঞ্চ, লীয়তে অস্মিন্নিতি সুষুপ্তো লয়ঃ. তস্মিন্ লয়ে চ সুপ্রসন্নম্ আয়াসবর্জিতমপি ইত্যেতৎ, নিগৃহীয়াৎ ইত্যনু- বর্ত্ততে। সুপ্রসন্নঞ্চেৎ কস্মাৎ নিগৃহ্যতে? ইতি, উচ্যতে—যস্মাদ যথা কামঃ অনর্থহেতুঃ, তথা লয়োহপি। অতঃ কামবিষয়স্য মনসো নিগ্রহবৎ লয়াদপি নিরোদ্ধব্যত্বম্ ইত্যর্থঃ ॥ ১০৯ ॥ ৪২

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, অখিন্নচিত্তে উদ্যমই কি মনোনিগ্রহের একমাত্র উপায়? না —বলা হইতেছে যে, উহাই একমাত্র উপায় নহে; অখিন্নভাবে

১৮০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

চেষ্টাবান্ হইয়া কাম ও ভোগবিষয়ে বিক্ষিপ্ত বা চঞ্চলীভূত মনকে বক্ষ্যমাণ উপায়ে নিগৃহীত করিবে, অর্থাৎ আত্মাতেই নিরুদ্ধ করিবে। আরও কথা, যাহাতে লয় পায়, সেই সুষুপ্তির নাম লয়; সেই লয়াবস্থায় সুপ্রসন্ন বা আয়াসবর্জ্জিত মনকেও নিগৃহীত করিবে। এখানেও নিগৃহীয়াৎ কথাটির সম্বন্ধ হইতেছে। ভাল, যদি সুপ্রসন্ন থাকে, তবে আর নিগ্রহ করিবে কেন? বলা হইতেছে—যেহেতু কাম(বিষয়স্পৃহা) যেরূপ অনর্থহেতু, লয়ও ঠিক তদ্রূপই[অনর্থহেতু]; অতএব কামবিষয়াসক্ত মনের নিগ্রহের ন্যায় লয় হইতেও মনকে নিরুদ্ধ করা আবশ্যক ॥ ১০৯ ॥ ৪২

দুঃখং সর্ব্বমনুষ্মৃত্য কাম-ভোগান্নিবর্ত্তয়েৎ।

অজং সর্ব্বমনুষ্য জাতং নৈব তু পশ্যতি ॥ ১২০ ॥ ৪৩

সরলার্থঃ

সর্ব্বং(দ্বৈতং) দুঃখং(দুঃখমিশ্রিতং) অনুস্মৃত্য(নিয়তং স্মৃত্বা) কামভোগাৎ (অভিলষিতাৎ ভোগাৎ)[মনঃ] নিবর্ত্তয়েৎ(নিগৃহ্লীয়াৎ)। সর্ব্বম্(দ্বৈতম্) অজম্(ব্রহ্মস্বরূপম্) অনুস্মৃত্য তু(পুনঃ) জাতং(দ্বৈতং) ন এব পশ্যতি, (দ্বৈতসত্তাং নানুভবতীত্যর্থঃ)।

সমস্ত দ্বৈত বস্তুই দুঃখমিশ্রিত—প্রতিনিয়ত ইহা স্মরণ করিয়া মনকে অভিলষিত বিষয়ভোগ হইতে নিবর্ত্তিত করিবে, আবার সমস্তই ব্রহ্মস্বরূপ, ইহা স্মরণ করিয়া দ্বৈত বস্তু দর্শন করে না, অর্থাৎ তৎসমস্তই মিথ্যা বলিয়া দর্শন করে ॥ ১১০ ॥ ৪৩

শঙ্কর-ভাষ্যম্

কঃ স উপায় ইতি? উচ্যতে-সর্ব্বং দ্বৈতম্ অবিদ্যাবিজৃম্ভিতং দুঃখমেব, ইত্যনুস্মৃত্য কামভোগাৎ-কামনিমিত্তো ভোগ ইচ্ছাবিষয়ঃ, তস্মাৎ বিপ্রসূতং মনো নিবর্তয়েৎ বৈরাগ্যভাবনয়া ইত্যর্থঃ। অজং ব্রহ্ম সর্ব্বমিত্যেতৎ শাস্ত্রাচার্য্যো- পদেশতঃ অনুস্মৃত্য তদ্বিপরীতং দ্বৈতজাতং নৈব তু পশ্যতি, অভাবাৎ ॥ ১১০ ॥ ৪৩

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৮১

ভাষ্যানুবাদ

সেই উপায়টি কি? তাহা কথিত হইতেছে—অবিদ্যা-সমুদ্ভূত সমস্ত দ্বৈতই দুঃখ-মিশ্রিত, ইহা নিরন্তর স্মরণ করিয়া কাম-ভোগ হইতে অর্থাৎ কামনাবশতঃ যে ভোগ—অভিলাষের বিষয়, তদাসক্ত মনকে তাহা হইতে বৈরাগ্যভাবনা দ্বারা নিবর্ত্তিত করিবে; অজ ব্রহ্মই সর্ব্ব অর্থাৎ সমস্ত দ্বৈতই ব্রহ্মস্বরূপ, শাস্ত্র ও আচার্য্যোপদেশ হইতে ইহা[ অবগত হইয়া] নিরন্তর স্মরণ করত নিশ্চয়ই দ্বৈত-সমূহ দর্শন করে না; কারণ,[ দ্বৈত বলিয়া কোন সত্য বস্তু] নাই ॥ ১১০ ॥ ৪৩

লয়ে সম্বোধয়েচ্ছিতং বিক্ষিপ্তং শময়েৎ পুনঃ।

সকষায়ং বিজানীয়াৎ সমপ্রাপ্তং ন চালয়েৎ ॥ ১১১ ॥ ৪৪

সরলার্থঃ

চিত্তং লয়ে(সুষুপ্তে লীনং সৎ) সংবোধয়েৎ(আত্মবিবেকেন যোজয়েৎ), বিক্ষিপ্তং(কাম-ভোগেষু প্রধাবৎ) পুনঃ(বারংবারম্ অভ্যাসেন) শময়েৎ (প্রশান্তং—স্থিরং কুৰ্য্যাৎ); সকষায়ং(বিষয়ানুরক্তং সৎ) বিজানীয়াৎ(বিষয়- দোষ-দর্শনেন সম্প্রজ্ঞাতসমাধৌ নিযোজয়েৎ); সমপ্রাপ্তং(সাম্যম্ উপগতং সৎ) ন চালয়েৎ(ততঃ প্রত্যাহৃত্য ন বিষয়াভিমুখীকুর্য্যাৎ) ॥

চিত্ত লয়াখ্য সুষুপ্তাবস্থায় লীন হইলে তাহাকে জাগরিত করিবে অর্থাৎ আত্মজ্ঞানে নিয়োজিত করিবে। বিক্ষিপ্ত অর্থাৎ ইতস্ততঃ কাম্য বিষয়ে ধাবমান হইলে, বারংবার অভ্যাস দ্বারা তাহাকে প্রশান্ত করিবে; সকষায় হইলে, অর্থাৎ বিষয়ানুরাগে সমাসক্ত হইলে, বিষয়ের দোষদর্শনপূর্ব্বক তাহাকে সমাধিতে নিযুক্ত করিবে; কিন্তু একবার সমতা লাভ করিলে, তাহাকে আর চঞ্চল বা বিষয়োন্মুখ করিবে না ॥ ১১১ ॥ ৪৪

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

এবমনেন জ্ঞানাভ্যাসবৈরাগ্যদ্বয়োপায়েন লয়ে সুষুপ্তে লীনং সম্বোধয়েৎ মনঃ, আত্মবিবেকদর্শনেন যোজয়েৎ। চিত্তং মন ইত্যনর্থান্তরম্। বিক্ষিপ্তঞ্চ কাম- ভোগেষু শময়েৎ পুনঃ। এবং পুনঃ পুনঃ অভ্যস্যতো লয়াৎ সম্বোধিতং বিষয়েভ্যশ্চ

১৮২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ব্যাবর্তিতং, নাপি সাম্যাপন্নং অন্তরালাবস্থং সকষায়ং সরাগং বীজসংযুক্তং মন ইতি বিজানীয়াৎ। ততোহপি যত্নতঃ সাম্যম্ আপাদয়েৎ। যদা তু সমপ্রাপ্তং ভবতি—সমপ্রাপ্ত্যভিমুখী ভবতীত্যর্থঃ; ততস্তৎ ন বিচালয়েৎ বিষয়াভিমুখং ন কুৰ্য্যাদিত্যর্থঃ ॥ ১১১ ॥ ৪৪

ভাষ্যানুবাদ

চিত্ত অর্থাৎ মন লয়াখ্য সুষুপ্তে লীন হইলে উক্তপ্রকার জ্ঞান:- ভ্যাস ও বৈরাগ্য, এই দ্বিবিধ উপায়ে সংবোধিত করিবে অর্থাৎ আত্ম- বিষয়ক বিবেকজ্ঞানের সহিত সংযোজিত করিবে[অর্থাৎ আত্মা ও অনাত্মার বিবেকদর্শনে মনোযোগ করিবে]। চিত্ত ও মন ভিন্ন পদার্থ নহে—একই। কাম্যবিষয়ের উপভোগে[মন] বিক্ষিপ্ত বা চঞ্চল হইলে পুনঃ পুনঃ অভ্যাস দ্বারা প্রশান্ত করিবে, মনের স্থিরতা সম্পাদন করিবে। এইরূপে বারংবার অভ্যাসবশতঃ লয়াবস্থা হইতে প্রবোধিত এবং ভোগ্য বিষয় হইতেও নিবৃত্ত, কিন্তু সমতা-প্রাপ্ত না হইয়া মধ্যবর্তী অবস্থায় স্থিত—সকষায় অর্থাৎ[সংস্কারবশতঃ] অনুরাগযুক্ত মনকে “আমার মন সরাগ অর্থাৎ প্রবৃত্তির বীজভূত অনুরাগযুক্ত” এইরূপে জানিবে, অর্থাৎ যত্নপূর্ব্বক(সম্প্রজ্ঞাত সমাধি দ্বারা) সেই অবস্থা হইতেও মনের সমতা সম্পাদন করিবে। কিন্তু, যে সময় সমতা লাভ করে—সমভাব প্রাপ্তিতে উন্মুখ হয়, সেই সমভাব হইতে তাহাকে চালিত করিবে না, অর্থাৎ বিষয়াভিমুখ করিবে না ৷ ১১১ ॥ ৪৪

নাস্বাদয়েৎ সুখং তত্র নিঃসঙ্গঃ প্রজ্ঞয়া ভবেৎ।

নিশ্চলং নিশ্চরং চিত্তমেকীকুর্য্যাৎ প্রযত্নতঃ ॥ ১১২ ॥ ৪৫

সরলার্থঃ

অপিচ, তত্র(সমতাপ্রাপ্তৌ) সুখং(সমাধিজম্ আনন্দং) ন আস্বাদয়েৎ (অনুরক্তো ন ভবেদিত্যর্থঃ), প্রজ্ঞয়া(বিবেকজ্ঞানেন) নিঃসঙ্গঃ(নিরভিলাষঃ) ভবেৎ। নিশ্চলম্[অপি] চিত্তং নিশ্চয়ৎ(বহির্গন্তমুদ্যতং সৎ) প্রযত্নতঃ

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৮৩

( যোগোক্তপ্রকারেণ) একীকুর্য্যাৎ( সর্ব্বতঃ প্রত্যাহৃত্য আত্মন্যেব নিবেশয়েৎ, ইত্যর্থঃ)।

সে সময় যে রস বা সুখের উদ্ভব হয়, তাহা আস্বাদন করিবে না; পরন্তু বিবেকজ্ঞান দ্বারা নিঃসঙ্গ(নিঃস্পৃহ) হইবে। সেই স্থিরীভূত চিত্ত যদি পুনশ্চ বাহিরে যাইতে উদ্যত হয়, তাহা হইলে যত্নপূর্ব্বক আত্মচৈতন্যের সহিত সম্মিলিত করিবে ॥ ১১২ ॥ ৪৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

সমাধিৎসতো যোগিনো যৎ সুখং জায়তে, তৎ ন আস্বাদয়েৎ, তত্র ন রাজ্যেত ইত্যর্থঃ। কথং তর্হি? নিঃসঙ্গঃ নিঃস্পৃহঃ প্রজ্ঞয়া বিবেকবুদ্ধ্যা,-যৎ উপলভ্যতে সুখং, তৎ অবিদ্যাপরিকল্পিতং মৃষৈব ইতি বিভাবয়েৎ; ততোহপি সুখরাগাৎ নিগৃহীয়াৎ ইত্যর্থঃ। যদা পুনঃ সুখরাগান্নিবৃত্তং নিশ্চলস্বভাবং সৎ নিশ্চরদ্ বহিনির্গচ্ছদ্ ভবতি চিত্তং, ততস্ততো নিয়ম্য উক্তোপায়েন আত্মন্যেব একীকুর্য্যাৎ প্রযত্নতঃ, চিৎস্বরূপসত্তামাত্রমেব আপাদয়েদিত্যর্থঃ ॥ ১১২ ॥ ৪৫

ভাষ্যানুবাদ

সমাধিসম্পাদনেচ্ছু যোগীর যে সুখ উপস্থিত হয়, তাহা আস্বাদন করিবে না অর্থাৎ তাহাতে অনুরক্ত হইবে না। তবে কিপ্রকারে? এই বিবেকজ্ঞান দ্বারা নিঃসঙ্গ বা নিঃস্পৃহ হইয়া এইরূপ ভাবনা করিবে যে, যে সুখ অনুভূত হইতেছে তাহা অবিদ্যাকল্পিত নিশ্চয়ই মিথ্যা, অর্থাৎ সেই সুখবিষয়ক অনুরাগ হইতেও[মনকে] নিগৃহীত করিবে। চিত্ত যখন সুখানুরাগ হইতেও নিবৃত্ত হইয়া পুনশ্চ বাহ্য বিষয়ে গমনোন্মুখ হয়, তখন তাহা হইতে নিয়মিত(নিবারিত) করিয়া উক্ত উপায়ানুসারে যত্নপূর্ব্বক আত্মাতে একীভূত করিবে, অর্থাৎ কেবলই সৎচিৎ-আত্মস্বরূপতা সম্পাদন করিবে ॥ ১১২ ॥ ৪৫

যদা ন লীয়তে চিত্তং ন চ বিক্ষিপ্যতে পুনঃ।

অনিশমনাভাসং নিষ্পন্নং ব্রহ্ম তৎ তদা ॥ ১১৩ ॥ ৪৬

১৮৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

সমর্থঃ

যদা পুনঃ চিত্তং[ সুষুপ্তৌ] ন লীয়তে, ন চ বিক্ষিপ্যতে(চঞ্চলীক্রিয়তে) অনিঙ্গনং(নিষ্কম্পং) অনাভাসং(বিষয়াকারেণ চ ন অবভাসমানং)[ভবতি], তদা তৎ(চিত্তং) ব্রহ্ম নিষ্পন্নং(ব্রহ্মভাবং প্রাপ্তং ভবতি)।

চিত্ত যখন সুষুপ্তিতে লীন হয় না, এবং বিক্ষেপযুক্তও হয় না, এবং নিশ্চল ও বিষয়-প্রকাশশীলতাশূন্য হয়, তখন সেই চিত্ত ব্রহ্মভাব লাভ করিয়া থাকে ॥ ১১৩ ॥ ৪৬

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যথোক্তেন উপায়েন নিগৃহীতং চিত্তং যদা সুষুপ্তৌ ন লীয়তে, ন চ পুনর্বিষয়েষু, বিক্ষিপ্যতে, অনিঙ্গনমচলং নিবাতপ্রদীপকল্পম্, অনাভাসং ন কেনচিৎ কল্পিতেন বিষয়ভাবেন অবভাসতে ইতি; যদা এবং লক্ষণং চিত্তং, তদা নিষ্পন্নং ব্রহ্ম; ব্রহ্ম- স্বরূপেণ নিষ্পন্নং চিত্তং ভবতীত্যর্থঃ ॥ ১১৩ ॥ ৪৬

ভাষ্যানুবাদ

যথোক্ত উপায়ে নিগৃহীত চিত্ত যখন সুষুপ্তিতে লীন হয় না, এবং বিষয়েও বিক্ষিপ্ত হয় না, এবং অনিঙ্গন—নিশ্চল—নিবাত-প্রদীপকল্প ও অনাভাস হয়, অর্থাৎ কল্পিত কোন বিষয়াকারেই প্রকাশ পায় না; চিত্ত যখন উক্ত লক্ষণাক্রান্ত হয়, তখনই ব্রহ্মভাবে নিষ্পন্ন, অর্থাৎ চিত্ত তখনই ব্রহ্মস্বরূপে অবস্থিত হইয়া থাকে ॥ ১১৩ ॥ ৪৬

স্বস্থং শান্তং সনির্ব্বাণম্ অকথ্যং সুখমুত্তমম্। অজমজেন জ্ঞেয়েন সর্ব্বজ্ঞং পরিচক্ষতে ॥ ১১৪ ॥ ৪৭

সরলার্থঃ

[ এতচ্চ] উত্তমং(নিরতিশয়ং) সুখং(আত্মবোধরূপং) স্বস্থং(স্বাত্মনি স্থিতং, নির্ব্বিকারং বা) শান্তং(সর্ব্বদুঃখপ্রশমনরূপং) সনির্বাণং(নির্ব্বাণেন কৈবল্যেন সহ বর্ত্ততে ইতি নির্ব্বাণপদভাক্), অকথ্যং(বর্ণয়িতুম্ অশক্যম্), অজং(অনুৎপন্নং নিত্যসিদ্ধম্) অজেন(নিত্যেন) জ্ঞেয়েন(ব্রহ্মরূপেণ) সর্ব্বজ্ঞং (ব্রহ্মণঃ সর্ব্বজ্ঞত্বাৎ) পরিচক্ষতে(কথয়ন্তি)[ব্রহ্মবিদ ইতি শেষঃ] ॥

ব্রহ্মবিদ্গণ এই আত্মবোধরূপ পরম সুখকে স্বস্থ—আত্মগত, শান্ত, কৈবল্য-

অদ্বৈত-প্রকরণম্ ১৮৫

সহচারী, অবর্ণনীয় এবং অজ ও জ্ঞেয়স্বরূপ ব্রহ্মরূপে অজ(নিত্য) ও সর্ব্বজ্ঞ বলিয়া নির্দেশ করিয়া থাকেন ॥ ১১৪ ॥ ৪৭

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যথোক্তং পরমার্থসুখম্ আত্মসত্যানুবোধলক্ষণৎ স্বস্থং স্বাত্মনি স্থিতম্; শান্তং সর্ব্বানর্থোপশমরূপম্। সনির্বাণং, নির্ব্বতিনির্ব্বাণং কৈবল্যং, সহ নির্ব্বাণেন বর্ত্ততে। তচ্চ অকথ্যং-ন শক্যতে কথয়িতুম্, অত্যন্তাসাধারণবিষয়ত্বাৎ। সুখমুত্তমং নিরতিশয়ং হি তৎ যোগিপ্রত্যক্ষমেব। ন জাতম্ ইত্যজম্; যথা বিষয়-বিষয়ং; অজেন অনুৎপন্নেন জ্ঞেয়েন অব্যতিরিক্তং সৎ স্বেন সর্বজ্ঞরূপেণ সর্ব্বজ্ঞং ব্রহ্মৈব সুখং পরিচক্ষতে কথয়ন্তি ব্রহ্মবিদঃ ॥ ১১৪ ॥ ৪৭

ভাষ্যানুবাদ

ব্রহ্মবিদ্গণ আত্মসত্যানুবোধাত্মক যথোক্ত পারমার্থিক সুখকে স্বস্থ-স্বীয় আত্মাতে অবস্থিত; শান্ত-সর্বপ্রকার অনর্থ-(দুঃখ-) প্রশমনস্বরূপ; সনির্বাণ, নির্ব্বাণ অর্থ-নির্বৃতি অর্থাৎ কৈবল্য (মুক্তি), সেই নির্ব্বাণের সহিত বর্তমান; তাহাও আবার অকথ্য -নির্দেশ করিয়া বলিবার অযোগ্য; কেন না, উহা অত্যন্ত অসাধারণ, অর্থাৎ অনুভবকারী ভিন্ন অপরে গ্রহণ করিতে পারে না; ‘উত্তম-নিরতিশয়(যাহা অপেক্ষা আর অধিক নাই), তাহা কেবল যোগিগণেরই প্রত্যক্ষগম্য; বৈষয়িক সুখের ন্যায় জন্মে না বলিয়াই অজ; সেই অজ(অনুৎপন্ন সুখ) জ্ঞেয়(ব্রহ্ম) হইতে স্বতন্ত্র নহে; এইজন্য স্বীয় সর্বজ্ঞরূপে ব্রহ্মকেই ঐ সুখ বলিয়া বর্ণনা করিয়া থাকেন ৷ ১১৪ ॥ ৪৭

ন কশ্চিজ্জায়তে জীবঃ সম্ভবোহস্য ন বিদ্যতে। এতত্তদুত্তমং সত্যং যত্র কিঞ্চিন্ন জায়তে ॥ ১১৫॥ ৪৮

ইতি গৌড়পাদীয়কারিকাসু অদ্বৈতাখ্যং তৃতীয়ং প্রকরণম্ ॥ ৩ ॥

সরলার্থঃ

কশ্চিৎ( কশ্চিদপি) জীবঃ ন জায়তে( উৎপদ্যতে), অন্য( জীবস্য)

১৮৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যাপনিষৎ
তৃতীয় ‘মদ্বৈত-প্রকরণ সমাপ্ত ॥

সম্ভবঃ(সম্ভবতি অস্মাদিতি সম্ভবঃ কারণং) ন বিদ্যতে(নাস্তি)। তৎ এতৎ (যথোক্তং) উত্তমং(পূর্ব্বোক্তানাং উপায়ভূতসত্যানাং মধ্যে শ্রেষ্ঠং) সত্যং (পরমার্থং), যত্র(যস্মিন্ সত্যে ব্রহ্মণি) কিঞ্চিৎ(স্বল্পমাত্রম্ অপি) ন জায়তে (নোৎপদ্যতে)।

কোন জীবই জন্মে না, ইহার উৎপাদকও নাই।(ইহাই সেই সর্ব্বোত্তম সত্য বা পরমার্থ বস্তু ব্রহ্ম), যে ব্রহ্মে কিছুমাত্রও জন্মে না, অর্থাৎ যাঁহাতে জন্ম-- প্রতীতিটা কেবল মায়ামাত্র ॥ ১১৫ ॥ ৪৮

শঙ্কর-ভাষ্যম্

সর্ব্বোহপ্যয়ং মনোনিগ্রহাদিঃ মূল্লৌহাদিবৎ সৃষ্টিরুপাসনা চোক্তা পরমার্থস্বরূপ- প্রতিপত্যুপায়ত্বেন, ন পরমার্থসত্যেতি। পরমার্থসত্যং তু-ন কশ্চিৎ জায়তে জীবঃ কর্তা ভোক্তা চ নোৎপদ্যতে কেনচিদপি প্রকারেণ। অতঃ স্বভাবতঃ অজস্য অন্য একস্য আত্মনঃ সম্ভবঃ কারণং ন বিদ্যতে নাস্তি। যস্মাৎ ন বিদ্যতে অস্য কারণং, তস্মাৎ ন কশ্চিজ্জায়তে জীব ইত্যেতৎ। পূর্ব্বেষু উপায়ত্বেন উক্তানাং সত্যানাম্ এতৎ উত্তমং সত্যং, যস্মিন্ সত্যস্বরূপে ব্রহ্মণি অণুমাত্রমপি কিঞ্চিৎ ন জায়তে ইতি ॥ ১১৫ ॥ ৪৮

ইতি শ্রীগোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদাশষ্যস্য পরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীশঙ্করভগবতঃ কৃতৌ গৌড়পাদীয়ভাষ্যে আগমশাস্ত্রবিব- রণেহদ্বৈতাখ্য-তৃতীয়প্রকরণভাষ্যম্ ॥ ৩ ॥

ভাষ্যানুবাদ

পূর্ব্বোক্ত মনোনিগ্রহাদি, মৃত্তিকা-লৌহাদির ন্যায় সৃষ্টিপদ্ধতি এবং উপাসনা, এই সমস্তই কেবল পরমার্থস্বরূপ ব্রহ্মোপলব্ধির উপায় মাত্র; কিন্তু পরমার্থ সত্য নহে। কিন্তু পরমার্থ সত্য হইতেছে এই যে, কর্তৃভোক্তৃস্বরূপ কোন জীবই কোন প্রকারেই জন্মে না—উৎপন্ন হয় না, অতএব স্বভাবত অজ(জন্মরহিত) এই এক(অদ্বিতীয়) আত্মার সম্ভব—কারণ নাই। যেহেতু ইহার কারণ বিদ্যমান নাই; সেই হেতুই কোন জীব জন্মে না। পূর্ব্বে উপায়রূপে যে সমস্ত সত্য পদার্থ উক্ত হইয়াছে, তৎসমুদয় অপেক্ষা ইহাই উত্তম(উৎকৃষ্ট) সত্য, যেই সত্যস্বরূপ ব্রহ্মে অণুমাত্রও কোন বস্তু জন্মলাভ করে না॥ ১১৫॥ ৪৮ তৃতীয় ‘অদ্বৈত-প্রকরণ সমাপ্ত ॥

অথ গৌড়পাদীয়কারিকাসু অলাতশান্ত্যাখ্যং চতুর্থং প্রকরণম্

জ্ঞানেনাকাশকল্পেন ধর্ম্মান্ যো গগনোপমান্। জ্ঞেয়াভিন্নেন সম্বুদ্ধস্তং বন্দে দ্বিপদাংবরম্॥ ১১৬॥ ১

সরলার্থঃ

যঃ(পুরুষোত্তমঃ) আকাশকল্পেন(আকাশাদ ঈষন্যুনেন শূন্যপ্রায়েণ ইত্যর্থঃ) জ্ঞেয়াভিন্নেন(জ্ঞেয়ঃ পরমাত্মা, তদভিন্নেন, আত্মস্বরূপানতিরিক্তেন) জ্ঞানেন [আত্মনঃ] ধর্মান্ গগনোপমান্(আকাশকল্পান্ অসদ্রূপান্) সংবুদ্ধঃ(জ্ঞাতবান্), তং দ্বিপদাং(পুরুষাণাং) বরং(শ্রেষ্ঠং, পুরুষোত্তমং নারায়ণমিতি যাবৎ) বন্দে (অভিবাদয়ে)।

যিনি আকাশ-সদৃশ অথচ জ্ঞেয় আত্মা হইতে অভিন্ন জ্ঞানবলে আকাশ-সদৃশ [ আত্মার] ধর্মসমূহ অবগত হইয়াছিলেন, সেই পুরুষোত্তমকে বন্দনা করিতেছি ॥ ১১৬ ॥ ১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ওঙ্কারনির্ণয়দ্বারেণ আগমতঃ প্রতিজ্ঞাতস্য অদ্বৈতস্য বাহ্যবিষয়ভেদ-বৈতথ্যাচ্চ প্রসিদ্ধস্য পুনরদ্বৈতে শাস্ত্রযুক্তিভ্যাং সাক্ষান্নির্ধারিতস্য এতদুত্তমং সত্যম্ ইত্যুপ- সংহারঃ কৃতোহন্তে তস্য এতস্য আগমার্থস্য অদ্বৈতদর্শনস্য প্রতিপক্ষভূতা দ্বৈতিনো বৈনাশিকাশ্চ; তেষাং চ অন্যোন্য-বিরোধাৎ রাগদ্বেষাদিক্লেশাস্পদং দর্শনমিতি মিথ্যাদর্শনত্বং সূচিতম্, ক্লেশানাস্পদত্বাৎ সম্যগ্ দর্শনমিতি অদ্বৈতদর্শনস্তুতরে। তদিহ বিস্তরেণ অন্যোন্যবিরুদ্ধতয়া অসম্যগ্ দর্শনত্বং প্রদর্শ্য তৎপ্রতিষেধেন অদ্বৈত- দর্শনসিদ্ধিঃ উপসংহর্তব্যা অবীতন্যায়েন, ইতি অলাতশান্তি-প্রকরণম্ আরভ্যতে। তত্র অদ্বৈতদর্শনসম্প্রদায়কর্তুঃ অদ্বৈতস্বরূপেণৈব নমস্কারার্থোহয়ম্ আদ্যশ্লোকঃ। আচার্য্যপূজা হি অভিপ্রেতার্থসিদ্ধ্যর্থেষ্যতে শাস্ত্রারম্ভে। আকাশেন ঈষদসমাপ্তম্ আকাশকল্পম্ আকাশতুল্যমিত্যেতৎ। তেন আকাশকল্পেন জ্ঞানেন। কিং? ধর্মানাত্মনঃ। কিংবিশিষ্টান্? গগনোপমান্ গগনমুপমা যেষাং তে গগনো-

১০৮ কারিকোপেত মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

পমাঃ, তানাত্মনো ধর্মান্। জ্ঞানস্যৈব পুনর্ব্বিশেষণম্-জ্ঞেয়ৈধর্ম্মৈঃ আত্মভিঃ অভিন্নম্ অগ্ন্যুষ্ণবৎ সবিতৃপ্রকাশবচ্চ যৎ জ্ঞানং, তেন জ্ঞেয়াভিন্নেন জ্ঞানেন আকাশকল্পেন জ্ঞেয়াত্মস্বরূপাব্যতিরিক্তেন গগনোপমান্ ধৰ্মান্ যঃ সম্বুদ্ধঃ সম্বুদ্ধবান্ নিত্যমেব ঈশ্বরো যো নারায়ণাখ্যঃ, তং বন্দে অভিবাদয়ে, দ্বিপদাং বরং দ্বিপদোপলক্ষিতানাং পুরুষাণাং বরং প্রধানং পুরুষোত্তমম্ ইত্যভিপ্রায়ঃ। উপদেষ্ট- নমস্কারমুখেন জ্ঞান-জ্ঞেয়-জ্ঞাতৃভেদরহিতং পরমার্থতত্ত্বদর্শনমিহ প্রকরণে প্রতিপি- পাদয়িষিতং প্রতিপক্ষপ্রতিষেধদ্বারেণ প্রতিজ্ঞাতং ভবতি ॥ ১১৬ ॥ ১

ভাষ্যানুবাদ

প্রথমতঃ ওঁকারের স্বরূপ-নিরূপণ দ্বারা শাস্ত্রানুসারে অদ্বৈততত্ত্ব প্রতিজ্ঞাত হইয়াছে এবং বাহ্যবিষয়সমূহের মিথ্যাত্ব প্রতিপাদন ‘দ্বারা তাহা সমর্থিত বা প্রমাণিত হইয়াছে, পুনশ্চ অদ্বৈতবিষয়ক শাস্ত্র ও যুক্তির সাহায্যে সাক্ষাৎ সম্বন্ধেও অদ্বৈততত্ত্ব অবধারিত করিয়া অবশেষে ইহাকেই সর্বোত্তম সত্য বলিয়া উপসংহার করা হইয়াছে। দ্বৈতবাদী ও বৈনাশিকগণই(ক্ষণিক বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধগণ) শাস্ত্রের যথার্থ তাৎপর্য্য এই অদ্বৈততত্ত্বের প্রতিপক্ষ। তাহাদের মধ্যে পরস্পর বিরোধ থাকায়, তাহাদের দর্শন রাগ-দ্বেষাদি দোষে কলুষিত; সুতরাং ‘তাহাদের দর্শনের মিথ্যাত্ব বা অসারত্বও সূচিত হইয়াছে। কোনরূপ ক্লেশের(পূর্ব্বোক্ত দোষের) বিষয়ীভূত নয় বলিয়া অদ্বৈত দর্শনই ঠিক যথার্থ দর্শন, এইরূপে অদ্বৈতবিদ্যার প্রশংসা করাই ঐরূপ সূচনার উদ্দেণ্য। এখানে প্রতিপক্ষগণের দর্শন-সমুদয় পরস্পর বিরোধ- ভাবাপন্ন হওয়ায়, অসম্যক্ দর্শন অর্থাৎ যথার্থ জ্ঞানোপদেশ নহে, ইহা প্রদর্শনপূর্ব্বক তাহার প্রত্যাখ্যান দ্বারা অবীত বা ব্যতিরেকী অনুমান- প্রণালী অনুসারে * অদ্বৈতসিদ্ধির উপসংহার করা আবশ্যক; এই অভিপ্রায়ে এই ‘অলাতশান্তি’-নামক চতুর্থ প্রকরণ আরব্ধ হই-

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ১৮৯

তেছে; তাহাতেও আবার অদ্বৈত-দর্শনের সম্প্রদায়-প্রবর্ত্তকের পক্ষে অদ্বৈত পদার্থেরই নমস্কার করা সঙ্গত; সুতরাং তথাবিধ নমস্কারার্থেই এই আদ্যশ্লোক[রচিত হইয়াছে]; যেহেতু অভিপ্রেত বিষয়ের সিদ্ধির নিমিত্ত শাস্ত্রারম্ভে আচার্য্যপূজা অভিলষিত হইয়া থাকে।

যাহা আকাশ হইতে ঈষৎ অল্প, তাহাই আকাশকল্প, অর্থাৎ আকাশের তুল্য। সেই আকাশকল্প জ্ঞান দ্বারা,—কি? আত্মার ধর্মসমূহকে,—কি প্রকার ধর্মসমূহকে? গগনোপম, অর্থাৎ আকাশ যাহাদের উপমানভূত, গগনোপম সেই সমস্ত আত্ম-ধর্মকে। পুনশ্চ জ্ঞানের বিশেষণ[প্রদত্ত হইতেছে]। নারায়ণনামক যে ঈশ্বর অগ্নির উষ্ণতার ন্যায় এবং সূর্য্যের প্রকাশের ন্যায় জ্ঞাতব্য অর্থাৎ ধর্মস্বরূপ আত্ম-সমূহের সহিত অভিন্ন যে জ্ঞান, জ্ঞেয়াভিন্ন অর্থাৎ জ্ঞেয় আত্মস্বরূপ হইতে অপৃথগ্‌ভূত, আকাশতুল্য সেই জ্ঞান দ্বারা আকাশসদৃশ ধর্মসমূহকে সর্ব্বদাই অবগত আছেন; তাঁহাকে বন্দনা করি—প্রণাম করি।* “দ্বিপদাং বরং” এ কথার অভিপ্রায় এই যে, দ্বিপদগণের মধ্যে অর্থাৎ পুরুষগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ—পুরুষোত্তম। এই প্রকরণে জ্ঞান, জ্ঞেয় ও জ্ঞাতৃভেদরহিত, পরমার্থ আত্মতত্ত্ব নির্ণয় করাই মুখ্য উদ্দেশ্য, তাহা এই উপদেষ্টা গুরুর নমস্কার-স্থলেই প্রতি- পক্ষ-সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান দ্বারা বিজ্ঞাপিত হইল ॥ ১১৬ ॥ ১

অস্পর্শযোগা বৈ নাম সর্ব্বসত্ত্বসুখো হিতঃ। অবিবাদোহবিরুদ্ধশ্চ দেশিতস্তং নমাম্যহম্ ॥ ১১৭ ॥ ২

১৯০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

সরলার্থঃ

অস্পর্শযোগঃ(নাস্তি স্পর্শস্য যোগঃ সম্বন্ধঃ যস্মিন্, স তথোক্তঃ, ব্রহ্মস্বভাবঃ) বৈ(এব) নাম(প্রসিদ্ধঃ) সর্ব্বসত্ত্বসুখঃ(সর্ব্বেষাং প্রাণিনাং চিত্তানাং বা সুখা- বহঃ) হিতঃ(কল্যাণকরঃ) অবিবাদঃ(বিসংবাদ-রহিতঃ) অবিরুদ্ধঃ(বিরোধশূন্যঃ) চ(সমুচ্চয়ে)[যঃ যোগঃ] দেশিতঃ(শাস্ত্রেণ উপদিষ্টঃ), অহং তং(যোগং) নমামি(বন্দে) ॥ ১১৭ ॥ ২

সর্ব্বপ্রকার বিষয়-সংস্পর্শরহিত—‘অস্পর্শযোগ’ নামে প্রসিদ্ধ, সর্ব্বসুখাবহ, হিতকর, এবং বিবাদরহিত ও অবিরুদ্ধ যে যোগ শাস্ত্রে উপদিষ্ট হইয়াছে, আমি তাহাকে নমস্কার করি ॥ ১১৭ ॥ ২

শঙ্কর-ভাষ্যম্

অধুনা অদ্বৈতদর্শনযোগস্য নমস্কারঃ তৎস্তুতয়ে; স্পর্শনং স্পর্শঃ সম্বন্ধো ন বিদ্যতে যস্য যোগস্য কেনচিৎ কদাচিদপি, সোহস্পর্শযোগো ব্রহ্মস্বভাব এব, বৈ নামেতি ব্রহ্মবিদাম্ অস্পর্শযোগ ইত্যেবং প্রসিদ্ধ ইত্যর্থঃ। স চ সর্ব্বসত্ত্বসুখো ভবতি। কশ্চিৎ অত্যন্তসুখসাধনবিশিষ্টোহপি দুঃখরূপঃ, যথা তপঃ; অয়ন্তু ন তথা; কিন্তুহি? সর্ব্বসত্ত্বানাং সুখঃ। তথেহ ভবতি কশ্চিদ্বিষয়োপভোগঃ সুখঃ, ন হিতঃ; অয়ন্তু সুখো হিতশ্চ, নিত্যম্ অপ্রচলিতস্বভাবত্বাৎ। কিঞ্চ, অবিবাদঃ বিরুদ্ধবদনং বিবাদঃ পক্ষপ্রতিপক্ষপরিগ্রহেণ যস্মিন্ ন বিদ্যতে, সোহবিবাদঃ। কস্মাৎ? যতঃ অবিরুদ্ধশ, য ঈদৃশো যোগো দেশিত উপদিষ্টঃ শাস্ত্রেণ; তং নমাম্যহং প্রণমামীত্যর্থঃ ॥ ১১৭ ॥ ২

ভাষ্যানুবাদ

এখন অদ্বৈতদর্শনযোগের প্রশংসার্থ তাহার নমস্কার করিতেছেন। স্পর্শ অর্থ স্পর্শন অর্থাৎ কখনও কোন বিষয়ের সহিত যাহার স্পর্শ বা সম্বন্ধ নাই, তাহা অস্পর্শযোগ, তাহা ব্রহ্মস্বভাবই বটে,[‘বৈ,’ ও ‘নাম’ শব্দ অবধারণ ও প্রসিদ্ধ্যর্থক] ব্রহ্মবিদ্গণের নিকট ‘অস্পর্শযোগ’ এইরূপ প্রসিদ্ধ। সেই যোগ সকলেরই সুখাবহ হইয়া থাকে। কোন বিষয় অত্যন্ত সুখসাধন হইয়াও দুঃখময় হইয়া থাকে, যেমন তপস্যা; ইহা কিন্তু সেরূপ নহে। তবে কিরূপ?—না, সকল প্রাণীরই সুখকর। সেইরূপ কোন কোন বিষয়োপভোগ সুখকর হইয়াও অহিত হইয়া

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ১৯১

থাকে; ইহা কিন্তু সুখকরও বটে এবং হিতও বটে। কারণ, কোন কালেই ইহার স্বরূপচ্যুতি ঘটে না। অপিচ, ইহা অবিবাদ। পক্ষ ও প্রতিপক্ষ অবলম্বনপূর্ব্বক যে বিরুদ্ধ কথন, তাহার নাম বিবাদ; সেই বিবাদ যাহাতে বিদ্যমান নাই, তাহাই অবিবাদ; কারণ? যেহেতু ইহা বিরুদ্ধ নহে—অবিরুদ্ধও বটে। ঈদৃশ যে যোগ শাস্ত্রে উপদিষ্ট হইয়াছে, আমি সেই যোগকে প্রণাম করিতেছি ॥ ১১৭ ॥ ২

ভূতস্য জাতিমিচ্ছন্তি বাদিনঃ কেচিদেব হি অভূতস্যাপরে ধীরা বিবদন্তঃ পরস্পরম্ ॥ ১১৮ ॥ ৩

সরলার্থঃ

[ দ্বৈতিনাং বিবাদপ্রকারমাহ—ভূতস্যেত্যাদি।]—পরস্পরং বিবদন্তঃ(বিরুদ্ধ- কথনশীলাঃ) কেচিৎ এব(ন তু সর্ব্বে) বাদিনঃ(সাংখ্যাঃ এব) ভূতস্য (বিদ্যমানস্য সতঃ) জাতিম্(উৎপত্তিম্) ইচ্ছন্তি। অপরে ধীরাঃ(ধীমন্তঃ) (বৈশেষিকা নৈয়ায়িকাশ্চ বাদিনঃ) অভূতস্য(অসতঃ)[জাতিম্ ইচ্ছন্তি ইতি শেষঃ] ॥ ১১৮ ॥ ৩

পরস্পর বিবাদকারী কোন কোন বাদীরাই(সাংখ্যমতাবলম্বীরাই কেবল) ভূত বা সৎপদার্থের উৎপত্তি ইচ্ছা করেন; আবার বুদ্ধিমান্ অপরাপর বাদিগণ(নৈয়ায়িক ও বৈশেষিকগণ) অসৎপদার্থেরই উৎপত্তি ইচ্ছা করিয়া থাকেন ॥ ১১৮ ॥ ৩

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কথং দ্বৈতিনঃ পরস্পরং বিরুধ্যন্তে, ইতি উচ্যতে—ভূতস্য বিদ্যমানস্য বস্তুনো জাতিম্ উৎপত্তিম্ ইচ্ছন্তি বাদিনঃ কেচিদেব হি সাঙ্গ্যাঃ; ন সর্ব্ব এব দ্বৈতিনঃ। যস্মাৎ অভূতস্য অবিদ্যমানস্য অপরে বৈশেষিকা নৈয়ায়িকাশ্চ ধীরা ধীমন্তঃ প্রাজ্ঞাভিমানিন ইত্যর্থঃ, বিবদন্তঃ বিরুদ্ধং বদন্তো হি অন্যোন্যম্ ইচ্ছন্তি জেতুম্ ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ১১৮ ॥ ৩

ভাষ্যানুবাদ

দ্বৈতবাদীরা পরস্পর কি প্রকারে বিবাদ করিয়া থাকেন, তাহা

১২২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যাপনিষৎ

কথিত হইতেছে—কোন কোন বাদীরাই—কেবল সাংখ্যবাদীরাই ভূত অর্থাৎ বিদ্যমান বস্তুরই জাতি বা উৎপত্তি ইচ্ছা করেন(স্বীকার করেন), কিন্তু সমস্ত দ্বৈতবাদীরাই নহে; যেহেতু ধীর—ধীমান্ অর্থাৎ যাঁহারা আপনাকে প্রাজ্ঞ বলিয়া অভিমান করিয়া থাকেন, সেই নৈয়ায়িক ও বৈশেষিকাদি অপরাপর বাদিগণ বিবাদ করিয়া অর্থাৎ পরস্পর জয় লাভের ইচ্ছায় বিরুদ্ধভাষণ-তৎপর হইয়া অভূত অর্থাৎ অবিদ্যমান পদার্থেরও উৎপত্তি ইচ্ছা করিয়া থাকেন। * ॥ ১১৮ ॥ ৩

ভূতং ন জায়তে কিঞ্চিদভূতং নৈব জায়তে। বিবদন্তোহদ্বয়া হ্যেবমজাতিং খ্যাপয়ন্তি তে ॥ ১১৯ ॥ ৪

সরলার্থঃ

ভূতং(বিদ্যমানং সৎ) কিঞ্চিৎ(কিমপি) ন জায়তে(ন উৎপদ্যতে আত্মবৎ); অভূতং(অবিদ্যমানং-অসৎ অপি) ন এব জায়তে; ইতি(ইত্থং) বিবদন্তঃ(পরস্পরং বিরুদ্ধং বাদং কুর্ব্বন্তঃ সাংখ্যাঃ তার্কিকাশ্চ)[বস্তুতঃ] অদ্বয়াঃ(অদ্বৈতমতানুসারিণ এব সন্তঃ) তে(বাদিনঃ) অজাতিং(অনুৎপত্তিং) হি(এব) খ্যাপয়ন্তি(প্রকাশয়ন্তি) ইত্যর্থঃ ॥ ১১৯ ॥ ৪

কোন সৎপদার্থই জন্মে না, এবং কোন অসৎ পদার্থই জন্মে না, এইরূপে বিবাদ করায় সেই বাদিগণ(সাংখ্য ও নৈয়ায়িকাদি)[ফলতঃ] অদ্বৈতমতানুযায়ী হইয়া অনুৎপত্তিই প্রকাশ করিয়া থাকেন ॥ ১১৯॥ ৪

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ১৯৩

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

তৈরেবং বিরুদ্ধবদনেন অন্যোন্যপক্ষপ্রতিষেধং কুর্ব্বদ্ভিঃ কিং খ্যাপিতং ভবতীতি উচ্যতে—ভূতং বিদ্যমানং বস্তু ন জায়তে কিঞ্চিবিদ্যমানত্বাৎ এব, আত্মবৎ; ইত্যেবং বদন্ অসদ্বাদী সাঙ্খ্যপক্ষং প্রতিষেধতি সজ্জন্ম। তথা অভূতম্ অবিদ্য- মানম্ অবিদ্যমানত্বাৎ ন এব জায়তে, শশবিষাণবৎ; ইত্যেবং বদন্ সাঙ্খ্যোহপি অসদ্বাদিপক্ষম্ অসজ্জন্ম প্রতিষেধতি। বিবদন্তো বিরুদ্ধং বদন্তঃ অদ্বয়া অদ্বৈতি- নোহপ্যেতে অন্যোন্যস্য পক্ষৌ সদসতোর্জন্মনা প্রতিষেধন্তঃ অজাতিম্ অনুৎপত্তিম্ অর্থাৎ খ্যাপয়ন্তি প্রকাশয়ন্তি তে ॥ ১১৯ ॥ ৪

ভাষ্যানুবাদ

তাঁহারা এইরূপে পরস্পরের পক্ষ খণ্ডনপূর্ব্বক বিবাদ করায়, কিরূপ সিদ্ধান্ত স্থাপিত হয়, তাহা বলা হইতেছে—ভূত বা নিত্যসিদ্ধ বলিয়া আত্মা যেমন উৎপন্ন হয় না; তেমনি ভূত অর্থাৎ বিদ্যমান কোন বস্তুই উৎপন্ন হইতে পারে না, বিদ্যমানতাই তাহার কারণ। এইরূপ বলিয়া অসৎবাদী( নৈয়ায়িক প্রভৃতি) সাংখ্য-সম্মত সৎ-পদার্থের জন্ম প্রতিষেধ করিয়া থাকেন। সেইরূপ, অভূত অর্থাৎ শশ-শৃঙ্গের ন্যায় অবিদ্যমান পদার্থ অবিদ্যমানতা হেতুই—অর্থাৎ নাই বলিয়াই জন্মে না; এইরূপ বলিয়া সাংখ্যও আবার অসদ্বাদি-সম্মত অসতের জন্মবাদ প্রতিষেধ করিয়া থাকেন। বিবাদ করতঃ অর্থাৎ বিরুদ্ধবাদকারী এই বাদিগণ পরস্পরের সৎ-জন্ম, আর অসৎ-জন্ম, এই পক্ষদ্বয় খণ্ডন করিয়া [ প্রকৃত পক্ষে] অদ্বয় অর্থাৎ অদ্বৈতমতানুযায়ীই হইয়া পড়েন।

১৩

১২৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যাপনিষৎ

তাহার ফলে প্রকারান্তরে তাঁহারা অজাতি অর্থাৎ জ্ঞানের অনুৎপত্তিই খ্যাপন—প্রকাশ করিয়া থাকেন * ॥ ১১৯ ॥ ৪

খ্যাপ্যমানামজাতিং তৈরনুমোদামহে বয়ম্। বিবদামো ন তৈঃ সার্দ্ধমবিবাদং নিবোধত ॥ ১২০ ॥ ৫

সরলার্থঃ

তৈঃ(বাদিভিঃ) খ্যাপ্যমানাম্(নিরূপ্যমাণাম্) অজাতিম্(উৎপত্ত্যভাবং) বয়ং(অদ্বৈতবাদিনঃ) অনুমোদামহে(স্বীকুৰ্ম্মঃ); তৈঃ(সাংখ্যাদিভিঃ) সার্দ্ধং (সহ) ন বিবদামঃ(বিবাদং কুৰ্ম্মঃ)।[হে শিষ্যাঃ!] অবিবাদং(বিবাদ- রহিতং পরমার্থতত্ত্বং) নিবোধত(অবগচ্ছত) ॥

সেই বাদিগণকর্তৃক প্রকাশিত অনুৎপত্তিবাদ আমরা অনুমোদনই করি; কিন্তু তাঁহাদের সহিত বিবাদ করি না। হে শিষ্যগণ, পরমার্থ-তত্ত্ব নির্বিবাদ বলিয়া অবগত হও ॥ ১২০ ॥ ৫

শঙ্কর-ভাষ্যম্

তৈঃ এবং খ্যাপ্যমানাম্ অজাতিম্ ‘এবমস্ত’ ইতি অনুমোদামহে কেবলং, ন তৈঃ সার্দ্ধং বিবদামঃ পক্ষ-প্রতিপক্ষগ্রহণেন; যথা তে অন্যোন্যম্ ইত্যভিপ্রায়ঃ। অতস্তম্ অবিবাদং বিবাদরহিতং পরমার্থদর্শনম্ অনুজ্ঞাতম্ অস্মাভিঃ নিবোধত, হে শিষ্যাঃ ॥ ১২০॥ ৫

ভাষ্যানুবাদ

তাঁহাদের প্রকাশিত অনুৎপত্তিবাদকে আমরা ‘এবম্ অস্ত’(এই রূপই হউক) বলিয়া কেবল অনুমোদনই করি, কিন্তু পক্ষ ও প্রতি- পক্ষ ভাব অবলম্বনপূর্ব্বক তাঁহাদের সহিত বিবাদ করি না। অভিপ্রায়

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ১৯৫

এই যে, তাঁহারা যেরূপ পরস্পর বিবাদ করেন, আমরা সেরূপ বিবাদ করি না। অতএব, হে শিষ্যগণ, আমাদের অনুমোদিত সেই অবিবাদ বা বিবাদরহিত পরমার্থতত্ত্ব অবগত হও ॥ ১২০ ॥ ৫

অজাতস্যৈব ধর্ম্মস্য জাতিমিচ্ছন্তি বাদিনঃ। অজাতো হ্যমৃতো ধর্ম্মো মর্ত্ত্যতাং কথমেষ্যতি ॥ ১২১ ॥ ৬

সরলার্থঃ

বাদিনঃ(সদসদ্বাদিনঃ) অজাতস্য(জন্মরহিতস্য) এব(নিশ্চয়ে) ধৰ্ম্মস্য (বস্তুনঃ) জাতিম্(উৎপত্তিম্) ইচ্ছন্তি[কিন্তু] অজাতঃ হি(এব), [অতএব] অমৃতঃ(নাশরহিতঃ) ধর্ম্মঃ কথং(কেন রূপেণ) মর্ত্যতাং(মরণ- শীলতাং) এষ্যতি(প্রাপ্স্যতি)?[ন কথমপি ইতি ভাবঃ]॥

সদসদ্বাদিগণ(যাঁহারা সৎ অসৎ উভয়রূপই স্বীকার করেন, তাঁহারা) অজাত পদার্থেরই উৎপত্তি স্বীকার করেন। কিন্তু, যাহা নিশ্চয়ই অজাত ও অমৃত— বিনাশরহিত ধৰ্ম্ম; তাহা আবার মর্ত্যতা প্রাপ্ত হইবে কি প্রকারে? ॥ ১২১ ॥ ৬

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

সদসদ্বাদিনঃ সর্ব্বে। অয়ন্ত পুরস্তাৎ কৃতভাষ্যঃ শ্লোকঃ॥ ১২১॥ ৬

ভাষ্যানুবাদ

বাদী অর্থ যাঁহারা সৎ ও অসৎ, উভয়রূপই স্বীকার করেন, তাঁহারা। পূর্ব্বেই(তৃতীয় প্রকরণে) এই শ্লোকের ভাষ্য ব্যাখ্যা করা হইয়াছে ॥ ১২১ ॥ ৬

ন ভবত্যহমৃতং মর্ত্যং ন মর্ত্যমমৃতং তথা। প্রকৃতেরন্যথাভাবো ন কথঞ্চিদ্ভবিষ্যতি ॥ ১২২ ॥ ৭ স্বভাবেনামৃতো যস্য ধর্ম্মো গচ্ছতি মর্ত্যতাম্। কৃতকেনামৃতস্তস্য কথং স্থাস্যতি নিশ্চলঃ ॥ ১২৩ ॥ ৮

সরলার্থঃ

মর্ত্যং(মরণশীলং বস্তু) অমৃতং(নাশরহিতং) ন ভবতি, তথা(তদ্বৎ)

১৯৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

অমৃতং(মরণরহিতং)[অপি বস্তু] মর্ত্যং(মরণশীলং) ন[ভবতি]। [যতঃ] প্রকৃতেঃ(বস্তুস্বভাবস্য) অন্যথাভাবঃ(বিপর্যয়ঃ) কথঞ্চিৎ(কথমপি) ন ভবিষ্যতি ॥

মরণশীল পদার্থ অমরণশীল হয় না, সেইরূপ অমরণশীল পদার্থও মরণশীল হইতে পারে না। যেহেতু কোনপ্রকারেই প্রকৃতির অন্যথাভাব(স্বভাব-বিপর্যয়) হইতে পারে না ॥ ১২২ ॥ ৭

যস্য(বাদিনঃ মতে) স্বভাবেন(প্রকৃত্যা এব) অমৃতঃ(অবিনশ্বরঃ) ধৰ্ম্মঃ মর্ত্যতাং(বিনাশং) গচ্ছতি, তস্য কৃতকেন(ক্রিয়া-লব্ধঃ) অমৃতঃ(মোক্ষঃ) নিশ্চলঃ(অবিকৃতঃ সন্) কথং স্থাস্যতি?[ন কথমপীতি ভাবঃ] ॥ ১২৩॥৮

যাহার মতে স্বভাবসিদ্ধ অমৃতত্ব(অনশ্বরত্ব) ধৰ্ম্মও বিনাশ প্রাপ্ত হয়, তাহার সৎ-ক্রিয়ালব্ধ অমৃতত্ব অর্থাৎ মুক্তি কিরূপে নিশ্চল বা অবিনশ্বর হইয়া থাকিবে? তাহা কখনই অবিকৃত থাকিতে পারে না ॥ ১২৩॥৮

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

উক্তার্থানাং শ্লোকানাম্ ইহোপন্যাসঃ পরবাদিপক্ষাণাম্ অন্যোন্যবিরোধ- খ্যাপিতানুমোদন-প্রদর্শনার্থঃ ॥ ১২২-২৩ ॥ ৭-৮

ভাষ্যানুবাদ

উক্তার্থবিশিষ্ট শ্লোক-সমূহের এইস্থানে উপন্যাস অর্থাৎ কথন কেবল পরবাদিগণের পরস্পর-বিরোধখ্যাপনের অনুমোদন- প্রদর্শনার্থ ॥ ১২২-২৩ ॥ ৭-৮

সাংসিদ্ধিকী স্বাভাবিকী সহজা অকৃতা চ যা। প্রকৃতিঃ সেতি বিজ্ঞেয়া স্বভাবং ন জহাতি যা ॥ ১২৪ ॥ ৯

সরলার্থঃ

যা সাংসিদ্ধিকী(যোগসিদ্ধিলব্ধা অণিমাদ্যৈশ্বর্য্যপ্রাপ্তিরূপা), স্বাভাবিকী (বস্তুস্বভাবসিদ্ধা অগ্ন্যুষ্ণত্বাদিবৎ), সহজা(আশ্রয়েণ সহৈব জাতা পক্ষ্যাদীনাং আকাশ-গমনাদিঃ), যা চ(অপি) অকৃতা(ন ক্রিয়য়া সম্পন্না), যা[অপি], স্বভাবং ন জহাতি(ন ত্যজতি), সা চ ‘প্রকৃতিঃ’ ইতি(জ্ঞাতব্যা) লৌকিকৈরিতি শেষঃ] ॥ ১২৪ ॥ ৯

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ১২৭

যাহা যোগসাধনাদিসিদ্ধি সাংসিদ্ধিকী, কিংবা বস্তুর স্বভাবসিদ্ধ, অথবা সহজ অর্থাৎ আশ্রয়ের সঙ্গে সঙ্গে জাত, এবং যাহা কোন ক্রিয়া দ্বারা উৎপাদিত নহে, আর যাহা স্বীয় স্বরূপ কখনও পরিত্যাগ করে না; তাহাই ‘প্রকৃতি’ বলিয়া জ্ঞাতব্য ॥ ১২৪ ॥ ৯

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যস্মাল্লৌকিক্যপি প্রকৃতিন বিপর্য্যেতি, কা অসাবিত্যাহ—সম্যসিদ্ধিঃ সংসিদ্ধিঃ তত্র ভবা সাংসিদ্ধিকী; যথা যোগিনাং সিদ্ধানামণিমাদ্যৈশ্বর্য্য-প্রাপ্তিঃ প্রকৃতিঃ, সা ভূতভবিষ্যৎকালয়োরপি যোগিনাং ন বিপর্য্যেতি, তথৈব সা। তথা, স্বাভাবিকী দ্রব্যস্বভাবত এব সিদ্ধা; যথা অগ্ন্যাদীনামুষ্ণ প্রকাশাদিলক্ষণা; সাপি ন কালান্তরে ব্যভিচরতি দেশান্তরে চ। তথা সহজা আত্মনা সহৈব জাতা; যথা পক্ষ্যাদীনামা- কাশগমনাদিলক্ষণা। অন্যাপি যা কাচিদকৃতা কেনচিন্ন কৃতা; যথা অপাং নিম্নদেশগমনাদিলক্ষণা। অন্যাপি যা কাচিৎ স্বভাবং ন জহাতি, সা সর্ব্বা প্রকৃতিরিতি বিজ্ঞেয়া। লোকে মিথ্যাকল্পিতেষু লৌকিকেম্বপি বস্তুযু প্রকৃতির্নান্যথা ভবতি, কিমুত অজস্বভাবেষু পরমার্থবস্তুঘমৃতত্বলক্ষণা প্রকৃতির্নান্যথা ভবতীত্যভি- প্রায়ঃ ॥ ১২৪ ॥ ৯

ভাষ্যানুবাদ

যেহেতু লৌকিক প্রকৃতিও বিপর্যস্ত বা অন্যথাভূত হয় না। এই লৌকিক প্রকৃতি কি, তাহা বলিতেছেন,-সংসিদ্ধি অর্থ সম্যরূপে সিদ্ধি; তাহা হইতে উৎপন্ন-সাংসিদ্ধিকী; যেমন সিদ্ধ যোগিগণের ‘অণিমা’ প্রভৃতি ঐশ্বর্যপ্রাপ্তি একটি প্রকৃতি; যোগিগণের সেই প্রকৃতি অতীত ও অনাগত ভবিষ্যৎকালেও অন্যথাভূত হয় না, সেই রূপেই বর্তমান থাকে। সেইরূপ স্বাভাবিকী-যাহা দ্রব্যের স্বভাব- সিদ্ধ, যেমন অগ্নিপ্রভৃতির উষ্ণপ্রকাশাদি প্রকৃতি, তাহাও কালান্তরে বা দেশান্তরে রূপান্তরিত হয় না;[সেইরূপই থাকে]। সেইরূপ সহজা অর্থাৎ আত্মার সঙ্গে-সঙ্গেই উৎপন্ন; যেমন পক্ষিপ্রভৃতির আকাশ-গমনাদি। আরও যাহা কিছু অকৃত অর্থাৎ কাহারও দ্বারা সম্পাদিত নহে,[তাহাও প্রকৃতি]; যেমন জলের নিম্নদেশে গমন

১৯৮ কারিকোপেত-মাণ্ডুক্যোপনিষৎ

প্রভৃতি। আরও যাহা কিছু স্বীয় স্বভাব পরিত্যাগ না করে, সে সমুদয়ও প্রকৃতি বলিয়া জানিতে হইবে। অভিপ্রায় এই যে, সংসারে মিথ্যা। কল্পিত বস্তুগত লোকসিদ্ধ প্রকৃতিও যখন অন্যথাভূত হয় না, তখন স্বভাবতঃ অজ পরমার্থবস্তু ব্রহ্মগত অমৃতত্ব প্রকৃতি যে অন্যথা হয় না, ইহা ত আর বলিতেই হয় না ॥ ১২৪ ॥ ৯

জরা-মরণনির্মুক্তাঃ সর্ব্বে ধর্ম্মাঃ স্বভাবতঃ। জরা-মরণমিচ্ছন্তশ্চ্যবন্তে তন্মনীষয়া ॥ ১২৫ ॥ ১০

সরলার্থঃ

স্বভাবতঃ(স্বভাবেনৈব) জরামরণনির্ম্মুক্তাঃ(জরামরণাদি-বিকারবর্জ্জিতাঃ), সর্ব্বে ধৰ্ম্মাঃ(আত্মানঃ) জরামরণম্(স্বোপাধিদেহেষু আত্মত্বাধ্যাসেন জরাৎ মৃত্যুং চ) ইচ্ছন্তঃ(কাময়মানাঃ সন্তঃ) তন্মনীষয়া(জরামরণাদিচিন্তয়া) চ্যবন্তে (স্বভাবাৎ প্রচ্যুতা ভবন্তীত্যর্থঃ) ॥

স্বভাবতই জরামরণাদিবর্জিত আত্মা নামক ধৰ্ম্মসমূহ জরামরণ ইচ্ছা করিয়া সেই চিন্তায়ই স্বভাব হইতে চ্যুত হইয়া থাকে ৷ ১২৫ ॥ ১০

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কিংবিষয়া পুনঃ সা প্রকৃতিঃ, যস্যা অন্যথাভাবো বাদিভিঃ কল্প্যতে? কল্পনায়াং বা কো দোষঃ? ইত্যাহ—জরামরণনির্ম্মুক্তাঃ জরামরণাদি-সর্ব্ববিক্রিয়াবর্জিতা ইত্যর্থঃ। কে? সর্ব্বে ধৰ্ম্মাঃ, সর্ব্বে আত্মান ইত্যেতৎ, স্বভাবতঃ প্রকৃতিত এব। অত এবংস্বভাবাঃ সন্তো ধর্ম্মা জরামরণমিচ্ছন্ত ইবেচ্ছন্তো রজ্জামিব সর্পম্ আত্মনি কল্পয়ন্তশ্চ্যবন্তে স্বভাবতঃ চলন্তীত্যর্থঃ। তন্মনীষয়া জরা-মরণচিন্তয়া তদ্ভাবভাবি- তত্ব-দোষেণ ইত্যর্থঃ ॥ ১২৫॥ ১০

ভাষ্যানুবাদ

বাদিগণ যে প্রকৃতির অন্যথাভাব কল্পনা করিয়া থাকেন, সেই প্রকৃতির বিষয় কি? আর সেই কল্পনায়ই বা দোষ কি? তাহা বলিতেছেন—জরামরণনিৰ্ম্মুক্ত অর্থ—জরামরণাদি সর্ব্বপ্রকার

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ১৯১

বিকারবজ্জিত। কাহারা?—সমস্ত ধৰ্ম্ম অর্থাৎ সমস্ত আত্মা। ‘স্বভাবতঃ’ অর্থ—প্রকৃতি হইতে। অতএব ধর্ম্ম বা আত্মসমূহ এবং- বিধ স্বভাবসম্পন্ন হইয়াও জরামরণ ইচ্ছা করিয়া অর্থাৎ রজ্জুতে সর্পের ন্যায় আত্মাতেও জরামরণাদি ধর্ম্মসমূহ কল্পনা করিয়া তদ্- বিষয়ক মনীষা দ্বারা অর্থাৎ সেই জরামরণচিন্তায় তদ্ভাবে ভাবিত হয়, সেই দোষেই তাহারা চ্যুত হয়, অর্থাৎ স্বীয় প্রকৃত অবস্থা হইতে বিচলিত হয় ॥ ১২৫ ॥ ১০

কারণং যস্য বৈ কার্য্যং কারণং তস্য জায়তে।

জায়মানং কথমজং ভিন্নং নিত্যং কথঞ্চ তৎ ॥ ১২৬ ॥ ১১

সরলার্থঃ

যস্য(বাদিনঃ মতে) কারণম্(উপাদানং) বৈ(এব) কার্য্যং[ভবতি] (কারণম্ এব কাৰ্য্যাকারেণ পরিণমতে ইতি ভাবঃ), তস্য(সৎকার্য্যবাদিনঃ মতে) কারণম্(উপাদানং মৃত্তিকাদি), জায়তে(ঘটাদিরূপেণ পরিণমতে)। জায়মানম্ (উৎপদ্যমানং) চ তৎ(কারণং প্রধানং) কথং(কেন রূপেণ) অজং(জন্ম- রহিতং), ভিন্নং(কার্য্যাকারেণ ভেদং চ প্রাপ্তৎ সৎ) নিত্যং,[ভবেৎ]; [সাবয়বং ভিন্নং চ ঘটাদি অনিত্যমেব দৃষ্টম্, নতু নিত্যমিতি ভাবঃ] ॥

যে সাংখ্যবাদীর মতে কারণই কার্য্যস্বরূপ, অর্থাৎ কার্য্য ও কারণ অভিন্ন পদার্থ, তাহার মতে কারণই কার্য্যাকারে উৎপন্ন হয়। কিন্তু, উৎপন্ন পদার্থ(প্রধান) কিরূপে অজ হইতে পারে? আর বিকারপ্রাপ্ত হইয়াই বা কিরূপে নিত্য থাকিতে পারে? ১২৬॥ ১১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কথং সজ্জাতিবাদিভিঃ সাংখ্যৈঃ অনুপপন্নমুচ্যতে? ইত্যাহ বৈশেষিকঃ। কারণং মৃদবদুপাদানলক্ষণং, যস্য বাদিনো বৈ কার্য্যং কারণমেব কার্য্যাকারেণ পরিণমতে, তস্য বাদিন ইত্যর্থঃ। তস্য অজমেব সৎ প্রধানাদি কারণং মহদাদি- কার্য্যরূপেণ জায়ত ইত্যর্থঃ। মহদাদ্যাকারেণ চেৎ জায়মানং প্রধানং কথম্ অজমুচ্যতে তৈঃ, বিপ্রতিষিদ্ধঞ্চেদং জায়তে অজঞ্চেতি। নিত্যঞ্চ তৈরুচ্যতে প্রধানং; ভিন্নং বিদীর্ণম্ স্ফুটিতম্ একদেশেন সৎ কথং নিত্যং ভবেদিত্যর্থঃ। ন হি সাবয়বং ঘটাদি একদেশস্ফুটনধৰ্মি নিত্যং দৃষ্টং লোক ইত্যর্থঃ।

২০০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

বিদীর্ণঞ্চ স্যাৎ একদেশেনাজং নিত্যঞ্চেতি এতদ্বিপ্রতিষিদ্ধং তৈরভিধীয়ত ইত্যাভিপ্রায়ঃ ॥ ১২৬ ॥ ১১

ভাষ্যানুবাদ

সদুৎপত্তিবাদী সাংখ্যকারগণ অসঙ্গত কথা বলেন কিপ্রকারে? তদুত্তরে বৈশেষিক বলিতেছেন-যে বাদীর মতে মৃত্তিকার ন্যায় উপাদান কারণই কার্য্য-স্বরূপ হইয়া থাকে, অর্থাৎ যে সাংখ্যবাদীর মতে কারণই কার্য্যরূপে পরিণত হইয়া থাকে, তাঁহার মতে প্রধান বা প্রকৃতি প্রভৃতি কারণগুলি অজ হইয়াও মহত্তত্ত্বাদি কার্য্যাকারে উৎপন্ন হইয়া থাকে; কারণ যদি মহদাদি কার্য্যরূপে উৎপন্ন হইল, তাহা হইলে তাঁহারা[কারণকে] অজ বলেন কিপ্রকারে? জন্মে, অথচ অজ বা জন্মরহিত, ইহা বিরুদ্ধ কথা। তাঁহারা[প্রধানকে] নিত্যও বলিয়া থাকেন; কিন্তু প্রধান যখন ভিন্ন অর্থাৎ বিদীর্ণ হয়-একাংশে স্ফুটিত বা বিকৃত হয়, তখন কি প্রকারেই বা নিত্য হইবে? কেন না, সাবয়ব ঘটাদি পদার্থ একাংশে স্ফুটিত হইয়া কোথাও নিত্য থাকিতে দেখা যায় না। অভিপ্রায় এই যে, একাংশে স্ফুটিত হইবে, অথচ অজ, নিত্যও থাকিবে-এইটি তাঁহারা বিরুদ্ধ কথা বলিয়া থাকেন ॥ ১২৬ ॥ ১১

কারণাদ যদ্যনন্যত্বমতঃ কার্য্যমজং যদি। *

জায়মানাদি বৈ কার্য্যাৎ কারণং তে কথং ধ্রুবম্ ॥ ১২৭ ॥ ১২

সরলার্থঃ

[তব মতে] যদি(সম্ভাবনায়াং)[কার্য্যস্য] কারণাৎ(অজাৎ) অনন্যত্বং (অভিন্নত্বং)[স্যাৎ]; অতঃ(হেতোঃ)[তব মতে] কার্য্যম্[অপি] অজং (জন্মরহিতং) স্যাৎ(ভবেৎ)।[অপিচ,] জায়মানাৎ[উৎপদ্যমানাৎ অনিত্যাৎ) কাৰ্য্যাৎ[অনন্যং(অভিন্নং)] হি(নিশ্চয়ে) কারণং তে(তব মতে) কথং ধ্রুবং(নিত্যং)[স্যাৎ],[ন কথমপীতি ভাবঃ] ॥

অলাতশান্ত-প্রকরণম্ ২০১

কার্য্য যদি অজ কারণ হইতে অন্য বা পৃথক্ই না হয়, তবে তোমার মতে কার্য্যও অজ(জন্মরহিত) হইতে পারে। আর তোমার মতে জায়মান কার্য্য হইতে অনন্যভূত কারণই বা কিরূপে ধ্রুব(অবিকৃত) থাকিতে পারে? ॥ ১২৭ ॥ ১২

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

উক্তস্যৈবার্থস্য স্পষ্টীকরণার্থমাহ—কারণাদজাৎ কার্য্যস্য যদি অনন্যত্বম্ ইষ্টং ত্বয়া, ততঃ কার্য্যমপ্যজমিতি প্রাপ্তম্। ইদঞ্চ অন্যদ্বিপ্রতিষিদ্ধং কার্য্যমজঞ্চেতি তব। কিঞ্চান্যৎ, কার্য্য-কারণয়োরনন্যত্বে জায়মানাদ্ধি বৈ কাৰ্য্যাৎ কারণমনন্যং নিত্যং ধ্রুবঞ্চ তে কথং ভবেৎ। ন হি কুক্কুট্যা একদেশঃ পচ্যতে, একদেশঃ প্রসবায় কল্প্যতে ॥ ১২৭ ॥ ১২

ভাষ্যানুবাদ

পূর্ব্বোক্ত গ্রন্থার্থই স্পষ্ট করিবার অভিপ্রায়ে বলিতেছেন—অজ কারণ হইতে কার্য্যের অনন্যত্বই যদি তোমার অভিমত হয়, তাহা হইলে সেই কার্য্যও অজরূপই হইবে। ইহাও তোমার বড়ই বিরুদ্ধ কথা যে, কার্য্যও বটে, অথচ অজও বটে;(অর্থাৎ জন্য পদার্থ কখনও অজ হইতে পারে না)। আরও এক কথা, কার্য্য ও কারণের অনন্যত্ব হইলে জায়- মান কার্য্য হইতে অপৃথভূত কারণই বা তোমার মতে ধ্রুব অর্থাৎ নিত্য থাকে কিরূপে? কেননা, কুক্কুটীর এক অংশ পাক হইতেছে, আর অপর অংশ সন্তানপ্রসবের জন্য রক্ষিত হইতেছে, ইহা কখনও হইতে পারে না ॥ ১২৭ ॥ ১২

অজৈবাদ্যজায়তে যস্য দৃষ্টান্তস্তস্য নাস্তি বৈ।

জাতাচ্চ জায়মানস্য ন ব্যবস্থা প্রসজ্যতে ॥ ১২৮ ॥ ১৩

সরলার্থঃ

যস্য(সাংখ্যবাদিনঃ মতে) অজাৎ(জন্মরহিতাৎ কারণাৎ)[কার্য্যং] জায়তে, তস্য(বাদিনঃ মতে) দৃষ্টান্তঃ(উদাহরণম্) ন অস্তি, বৈ(নিশ্চয়ে, নাস্ত্যেব ইত্যর্থঃ)। জাতাৎ(উৎপন্নাৎ অনিত্যাৎ)[কারণাৎ] জায়মানস্য

২০২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

(উৎপদ্যমানস্য) চ(অপি) ব্যবস্থা ন প্রসজ্যতে,(অপিতু অব্যবস্থা—অনবস্থা; আপদ্যতে ইত্যর্থঃ)।

যাহার মতে অজ কারণ হইতে কার্য্য উৎপন্ন হয়, তাহার মতে নিশ্চয়ই দৃষ্টান্ত নাই। আর জাত পদার্থ হইতে কার্য্য জন্মিলেও কোন ব্যবস্থা থাকে না,- অর্থাৎ অনবস্থা দোষ উপস্থিত হয় ॥ ১২৮ ॥ ১৩

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কিঞ্চ অন্যৎ, অজাদনুৎপন্নাৎ বস্তুনো জায়তে যস্য বাদিনঃ কার্য্যম্, দৃষ্টান্তস্তস্য নাস্তি বৈ, দৃষ্টান্তাভাবে অর্থাৎ অজাৎ ন কিঞ্চিজ্জায়ত ইতি সিদ্ধন্তবর্তীত্যর্থঃ। যদা পুনর্জাতাৎ জায়মানস্য বস্তুনঃ অভ্যুপগমঃ, তদপি অন্যস্মাৎ জাতাৎ, তদপি অন্যস্মাদিতি ন ব্যবস্থা প্রসজ্যতে; অনবস্থানং স্যাদিত্যর্থঃ ॥ ১২৮ ॥ ১৩

ভাষ্যানুবাদ

আরও কিছু; যে বাদীর মতে অজ অর্থাৎ অনুৎপন্ন বস্তু হইতে যে কোন কার্য্য হয়, নিশ্চয়ই তাহার দৃষ্টান্ত নাই। দৃষ্টান্তের অভাবে, ফলতঃ অজ কারণ হইতে যে, কিছুই উৎপন্ন হয় না, ইহাই সিদ্ধ হইয়া’ থাকে। আর যখন উৎপন্ন কারণ হইতেই বস্তুর জন্ম স্বীকার করা হয়, তখনও অন্য কারণ হইতে জাত, তাহাও আবার অন্য কারণ হইতে—এইরূপে অব্যবস্থা উপস্থিত হয়, অর্থাৎ অনবস্থা দোষ হয় *॥ ১২৮ ॥ ১৩

হেতোরাদিঃ ফলং যেষামাদির্হেতুঃ ফলস্য চ।

হেতোঃ ফলস্য চানাদিঃ কথং তৈরুপবর্ণ্যতে ॥ ১২৯ ॥ ১৪:

সরলার্থঃ

যেষাং(বাদিনাং মতে) ফলং(শরীরপরিগ্রহরূপং জন্ম) হেতোঃ(তৎ-

অশান্তি-প্রকরণম্ ৩৩৩

কারণস্য ধর্ম্মাদেঃ) আদিঃ(কারণম্), হেতুঃ(ধর্মাধর্মাদিরূপং কারণং) চ(অপি) ফলস্য(জন্মনঃ) আদিঃ(কারণং)[ভবতি]; তৈঃ(বাদিভিঃ) হেতোঃ (কারণস্য)[তৎ] ফলস্য চ(অপি) অনাদিঃ(সম্বন্ধঃ) কথং বর্ণাতে (নিরূপ্যতে)?[নিত্যকূটস্থস্য হেতু-ফলভাবঃ ন কথমপি উপপদ্যতে ইতি ভাবঃ]।

যাঁহাদের মতে ধর্ম্মাধর্ম্ম-ফল জন্মই তৎকারণ ধর্ম্মাদির কারণ; এবং হেতুভূত ধর্ম্মাদিও আবার তৎফল-জন্মের কারণ; তাঁহারা ঐ হেতু ও ফলের অনাদি সম্বন্ধ বর্ণনা করেন কি প্রকারে? ॥ ১২৯ ॥ ১৪

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

“যত্র ত্বস্য সর্ব্বম্ আত্মৈব অভূৎ” ইতি পরমার্থতো দ্বৈতাভাবঃ শ্রুত্যোক্তঃ; তমাশ্রিত্যাহ—হেতোঃ ধর্ম্মাদেঃ আদিঃ কারণং দেহাদিসঙ্ঘাতঃ ফলং যেষাং বাদিনাম্; তথা আদিঃ কারণম্ হেতুঃ ধর্ম্মাদিঃ ফলস্য চ দেহাদিসಂಘাতস্য। এবং হেতু-ফলয়োঃ ইতরেতরকার্য্যকারণত্বেন আদিমত্ত্বং ক্রবদ্ভিরেবং হেতোঃ ফলস্য অনাদিত্বং কথং তৈঃ উপবর্ণ্যতে? বিপ্রতিষিদ্ধমিত্যর্থঃ। ন হি নিত্যস্য কূটস্থস্যাত্মনো হেতু-ফলাত্মকতা সম্ভবতি ॥ ১২৯ ॥ ১৪

ভাষ্যানুবাদ

‘যে অবস্থায় এই বিবেকীর নিকট সমস্তই আত্মস্বরূপ হইয়া যায়’ এই শ্রুতি কর্তৃক পরমার্থতই দ্বৈতাভাব কথিত হইয়াছে; সেই সিদ্ধান্ত অবলম্বনে বলিতেছেন—যে সমস্ত বাদীর মতে ফলস্বরূপ দেহাদি- সমষ্টিই[তাহার] হেতুভূত ধর্মাদির কারণ; সেইরূপ, হেতুভূত ধর্মাদিই আবার তৎফল দেহাদি-সমষ্টির আদি অর্থাৎ কারণ; এই প্রকারে হেতু ও ফলের পরস্পর কার্য্য-কারণভাবে আদিমত্ববাদী(জন্মবাদী) তাঁহারা কিরূপে হেতু ও ফলের উক্তপ্রকার অনাদিত্ব বর্ণনা করিয়া থাকেন। অর্থাৎ ইহা অতি বিরুদ্ধ কথা; কারণ, নিত্য ও কূটস্থ আত্মার ত আর হেতু-ফলভাব কখনও সম্ভব হয় না * ॥ ১২৯ ॥ ১৪

* তাৎপর্য্য—এই যে সমস্ত দ্বৈতবাদীরা জগতে কার্য্যকারণভাবের ব্যবস্থা রক্ষার জন্য হেতু ও ফলের অর্থাৎ ধর্ম্মাধর্ম্ম ও জন্মের অনাদিত্ব স্বীকার করিয়া

২০৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

হেতোরাদিঃ ফলং যেষামাদির্হেতুঃ ফলস্য চ। তথা জন্ম ভবেত্তেষাং পুত্রাজ্জন্ম পিতুর্যথা ॥ ১৩০ ॥ ১৫

সরলার্থঃ

[ বাদিনামুক্তেরিরুদ্ধত্বং বিশদয়িতুমাহ]—যেষাং(বাদিনাং মতে) ফলং [ এব] হেতোঃ(কারণস্য) আদিঃ(কারণং), হেতুঃ চ(কারণমপি) ফলস্য আদিঃ; তেষাং[মতে] পুত্রাৎ পিতুঃ(জনকস্য) জন্ম(উৎপত্তিঃ) যথা(যদ্বৎ অসম্ভাব্যং),[উক্ত প্রকারং] জন্ম[অপি] তথা(তদ্বদেব অসম্ভবম্ ইত্যর্থঃ)।

যাঁহাদের মতে ফলই(কার্য্যই) হেতুর কারণ, এবং হেতুও আবার ফলের কারণ; তাঁহাদের মতে পুত্র হইতে পিতার জন্ম যেরূপ[অসম্ভব], তাঁহাদের অভিমত জন্মও ঠিক সেইরূপই হইয়া পড়ে ॥ ১৩০ ॥ ১৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কথং তৈর্বিরুদ্ধম্ অভ্যুপগম্যতে? ইতি; উচ্যতে—হেতুজন্যাদেব ফলাৎ হেতোর্জন্ম অভ্যুপগচ্ছতাং তেষামীদৃশো বিরোধ উক্তো ভবতি, যথা পুত্রাৎ জন্ম পিতুঃ ॥ ১৩০ ॥ ১৫

ভাষ্যানুবাদ

তাঁহারা যে কিপ্রকারে বিরুদ্ধ সিদ্ধান্ত স্বীকার করেন, তাহা কথিত হইতেছে—হেতু-সম্ভূত ফল হইতে হেতুর জন্ম স্বীকারকারী তাঁহাদের উক্ত সিদ্ধান্তটি—পুত্র হইতে পিতার জন্ম যেরূপ বিরুদ্ধ, ঠিক সেই- রূপই বিরুদ্ধ হয় ॥ ১৩০ ॥ ১৫

সম্ভবে হেতু-ফলয়োরেষিতব্যঃ ক্রমস্ত্বয়া। যুগপৎসম্ভবে যস্মাদসম্বন্ধো বিষাণবৎ॥ ১৩১॥ ১৬

সরলার্থঃ

হেতু-ফলয়োঃ(কার্য্য-কারণয়োঃ) সম্ভবে(উৎপত্তৌ) ক্রমঃ(হেতোঃ

থাকেন, তাঁহাদের মতে যখন ধর্ম্মাধর্ম্ম ও তৎফল জন্মের পরস্পর কার্য্যকারণভাব স্বীকৃত হয়, তখন আর হেতু-ফলের অনাদিত্ব রক্ষা পায় কিরূপে? আর আত্মাকেও তাঁহারা মূল উপাদান বলিতে পারেন না; কারণ, আত্মা স্বভাবতই নিত্য ও নিব্বি- কার-স্বরূপ; সুতরাং তাহারও পরিণামাত্মক উপাদানতা সম্ভবপর হয় না।

অনাতশান্তি-প্রকরণম্ ২০৫

পূর্ব্ববর্তিত্বং, ফলস্য চ পরবর্ত্তিত্বং, এবং রূপৎ পারম্পর্য্যং) ত্বয়া(দ্বৈতবাদিনা) এষিতব্যঃ(স্বীকর্তব্যঃ); যস্মাৎ যুগপৎ-সম্ভবে(অক্রমেণ উৎপত্তৌ সত্যাং) বিষাণবৎ(সব্যেতর-শৃঙ্গয়োঃ ইব) অসম্বন্ধঃ(কার্যকারণভাবরূপ-সম্বন্ধাভাবঃ) [ভবেৎ]।[যথা যুগপদুৎপন্নয়োঃ দক্ষিণ-বামশৃঙ্গয়োঃ কার্যকারণভাবঃ নাস্তি; তদ্বদিত্যাভপ্রায়ঃ]।

হেতু ও ফলের অর্থাৎ কারণ ও কার্য্যের উৎপত্তিতে তোমাকে অবশ্যই পৌর্ব্বাপর্য্যক্রম স্বীকার করিতে হইবে; পক্ষান্তরে, এক সঙ্গে উভয়ের উৎপত্তি স্বীকার করিলে দক্ষিণ ও বামপার্শ্ববর্তী শৃঙ্গদ্বয়ের ন্যায় উহাদের কার্য্য-কারণভাবরূপ সম্বন্ধই সিদ্ধ হয় না ॥ ১৩১ ॥ ১৬

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যথোক্ত বিরোধো ন যুক্তঃ অভ্যুপগন্তুমিতি চেৎ, মন্যসে, সম্ভবে হেতু-ফলয়ো- রুৎপত্তৌ ক্রম এষিতব্যঃ, ত্বয়া অন্বেষ্টব্যঃ—হেতুঃ পূর্ব্বং, পশ্চাৎ ফলঞ্চেতি। ইতশ্চ যুগপৎসম্ভবে যস্মাৎ হেতুফলয়োঃ কার্য্যকারণত্বেন অসম্বন্ধঃ। যথা যুগপৎ- সম্ভবতোঃ সব্যেতর-গো-বিষাণয়োঃ ॥ ১৩১ ॥ ১৬

ভাষ্যানুবাদ

যদি মনে কর, যেরূপ বিরোধ প্রদর্শিত হইল, তাহা অঙ্গীকার করা যাইতে পারে না;[তৎসম্বন্ধে বলা হইতেছে যে,] সম্ভব বা উৎপত্তি বিষয়ে হেতু ও ফলের ক্রম অর্থাৎ হেতু পূর্ববর্তী, আর ফল তাহার পশ্চাদ্বর্ত্তী, এইরূপ পৌর্বাপর্য্য তোমাকে অবশ্যই অন্বেষণ করিতে হইবে।[ক্রম থাকিলেই পূর্বোক্ত বিরোধ অপরিহার্য্য হইয়া পড়ে।] এই হেতুও[ক্রম স্বীকার করিতে হইবে,] যেহেতু যুগপৎ (এক সঙ্গে) উৎপত্তি স্বীকার করিলে যুগপৎ সমুৎপন্ন সব্য ও দক্ষিণ পার্শ্বস্থ শৃঙ্গদ্বয়ের ন্যায় হেতু ও ফলের কার্য্য-কারণভাব-সম্বন্ধই হইতে পারে না ॥ ১৩১ ॥ ১৬

ফলাদুৎপদ্যমানঃ সন্ ন তে হেতুঃ প্রসিধ্যতি। অপ্রসিদ্ধঃ কথং হেতুঃ ফলমুৎপাদয়িষ্যতি ॥ ১৩২ ॥ ১৭

:২০৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

সরলার্থঃ

তে(তব অভিমতঃ) হেতুঃ(কারণং) ফলাৎ(কার্য্যাৎ) উৎপদ্যমানঃ(জায়মানঃ) সন্ ন প্রসিধ্যতি(কারণত্বেন সিদ্ধিং ন লভতে), অপ্রসিদ্ধঃ(কারণত্বেন অসিদ্ধঃ) হেতুঃ(চ) কথং ফলম্ উৎপাদয়িষ্যতি(জনয়িষ্যতি, ন কথমপীতি ভাবঃ)।

তোমার মতে হেতু যখন কার্য্য হইতে উৎপন্ন হয়, তখন তাহার হেতুত্বই সিদ্ধ হয় না; সুতরাং অসিদ্ধ হেতু আর ফলোৎপাদন করিবে কিরূপে? ॥ ১৩২ ॥ ১৭

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কথমসম্বন্ধ ইত্যাহ—জন্যাৎ স্বতঃ অলব্ধাত্মকাৎ ফলাৎ উৎপদ্যমানঃ সন্ শশবিষাণাদেরিব অসতো ন হেতুঃ প্রসিধ্যতি জন্ম ন লভতে। অলব্ধাত্মকঃ অপ্রসিদ্ধঃ সন্ শশবিষাণাদিকল্পঃ তে তব কথং ফলমুৎপাদয়িষ্যতি? ন হি ইতরেতরাপেক্ষ-সিদ্ধ্যোঃ শশবিষাণকল্পয়োঃ কার্যকারণভাবেন সম্বন্ধঃ কচিদ্দৃষ্টঃ অন্যথা বেত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ১৩২ ॥ ১৭

ভাষ্যানুবাদ

[হেতু ও ফলের] অসম্বন্ধ হয় কিরূপে, তাহা বলিতেছেন—জন্য অর্থাৎ যে নিজেই আত্মলাভ করে নাই(উৎপন্ন হয় নাই), শশ- শৃঙ্গাদির ন্যায় অসৎ মিথ্যাভূত সেই ফল বা কার্য্য হইতে যদি উৎপন্ন হয়, তাহা হইলে সেই হেতুটি নিজেই সিদ্ধ হইতে পারে না, অর্থাৎ উৎপত্তিই লাভ করিতে পারে না; অপ্রসিদ্ধ অর্থাৎ নিজেই আত্মলাভ করিতে না পারায় শশশৃঙ্গসদৃশ তোমার অভিমত সেই হেতুটি আর ফলোৎপাদন করিবে কিরূপে? অভিপ্রায় এই যে, পরস্পর-সাপেক্ষ যাহাদের উৎপত্তি, শশশৃঙ্গতুল্য সেই পদার্থদ্বয়ের মধ্যে কোথাও কার্য্য-কারণ-ভাব সম্বন্ধে কিংবা অন্যপ্রকার সম্বন্ধও দৃষ্ট হয় না * ॥ ১৩২ ॥ ১৭

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২০৭

যদি হেতোঃ ফলাৎ সিদ্ধিঃ ফলসিদ্ধিশ্চ হেতুতঃ। কতরৎ পূর্ব্বনিষ্পন্নং যস্য সিদ্ধিরপেক্ষয়া ॥ ১৩৩ ॥ ১৮

সরলার্থঃ

[তদেব বিশদয়ন্ আহ]—ফলাৎ(কাৰ্য্যাৎ) যদি হেতোঃ(কারণস্য) সিদ্ধিঃ (নিষ্পত্তিঃ—আত্মলাভ ইতি যাবৎ)। হেতুতঃ(কারণাৎ) চ(অপি) ফল- সিদ্ধিঃ(কার্য্যোৎপত্তিঃ)[ভবেৎ],[তর্হি] কতরৎ(তয়োঃ মধ্যে কিং পুনঃ) পূর্ব্বনিষ্পন্নং(প্রথমোৎপন্নং) যস্য অপেক্ষয়া(সাহায্য দ্বারা)[উত্তরস্য কার্য্যস্য] সিদ্ধিঃ(উৎপত্তিঃ স্যাদিত্যর্থঃ)।

কার্য্য হইতে যদি কারণের উৎপত্তি হয়, এবং কারণ হইতেও যদি কার্য্যের উৎপত্তি হয়, তাহা হইলে সেই উভয়ের মধ্যে কোন্টি প্রথমোৎপন্ন, যাহার সাহায্যে পরবর্তীর সিদ্ধি হইবে?[অথচ যুগপৎসমুৎপন্নের মধ্যে সেরূপ কল্পনা করা সম্ভবপর হয় না] ॥ ১৩৩॥ ১৮

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

অসম্বন্ধতাদোষেণ অপোদিতেহপি হেতুফলয়োঃ কার্য্যকারণভাবে, যদি হেতু- ফলয়োঃ অন্যোন্যসিদ্ধিঃ অভ্যুপগম্যত এব ত্বয়া, কতরৎ পূর্ব্বনিষ্পন্নং হেতুফলয়োঃ, যস্য পশ্চাদ্ভাবিনঃ সিদ্ধিঃ স্যাৎ পূর্ব্বসিদ্ধ্যপেক্ষয়া তদ্‌ ব্রূহীত্যর্থঃ ॥ ১৩৩ ॥ ১৮

ভাষ্যানুবাদ

সম্বন্ধের অসম্ভাবনা দোষে হেতু ও ফলের কার্য্য-কারণভাব প্রত্যাখ্যাত হইলেও, যদি হেতু-ফলের পরস্পর-সাপেক্ষ সিদ্ধিই তুমি অঙ্গীকার কর,[তাহা হইলে জিজ্ঞাসা করি,] হেতু ও ফলের মধ্যে কোন্টি প্রথমোৎপন্ন, পশ্চাদ্ভাবীর সিদ্ধিতে(উৎপত্তিতে) যাহার পূর্বসিদ্ধি অপেক্ষিত হইতে পারে? তাহা বল ॥ ১৩৩ ॥ ১৮

পূর্ব্বে থাকার আবশ্যকতা না থাকে, তাহা হইলে এক-কারণোৎপন্ন দুইটীর মধ্যে কে যে কাহার কারণ, তাহা নিরূপণ করা অসম্ভব। এইরূপেই যদি কার্য্য- কারণভাব স্বীকার করা হয়, তাহা হইলে গো প্রভৃতি প্রাণীর এককালোৎপন্ন শৃঙ্গদ্বয়ও পরস্পর কার্য্য-কারণ-ভাবাপন্ন হইতে পারে; অথচ এরূপ কার্য্য-কারণভাব কেহই স্বীকার করে না। বিশেষতঃ, পরস্পরসাপেক্ষ উৎপত্তি বলিলে প্রকৃত পক্ষে একটিরও উৎপত্তি সিদ্ধ হইতে পারে না; সুতরাং উক্ত কার্য্য-কারণভাব শশশৃঙ্গের ন্যায় অসৎ বলিয়া পরিগণিত হইতে পারে।

২০৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

অশক্তিরপরিজ্ঞানং ক্রমকোপোহথবা পুনঃ। এবং হি সর্ব্বথা বুদ্ধৈরজাতিঃ পরিদীপিতা ॥ ১৩৪ ॥ ১৯

সরলার্থঃ

[ এতৎ নির্ণেতুমশক্যং চেৎ ত্বয়া, তহি এষা] অশক্তিঃ অপরিজ্ঞানং(অজ্ঞতা —মুঢ়তা ইত্যর্থঃ), অথবা,(হেতুফলয়োরক্রমিকত্ব-স্বীকারে) ক্রমকোপঃ(হেতোঃ কার্য্যং, কাৰ্য্যাৎ চ হেতুঃ ইত্যেবং আনন্তর্য্যরূপস্য ক্রমস্য কোপঃ বাধঃ) পুনঃ (অপি)[ভবতি], এবং হি(উক্তেনৈব ক্রমেণ) বুদ্ধৈঃ(কর্তৃভিঃ) অজাতিঃ অনুৎপত্তিঃ[এব] পরিদীপিতা(দৃঢ়ীকৃতা)।

[পূর্ব্বোক্ত প্রশ্নের উত্তর-দানে যে] অশক্তি বা অসামর্থ্য, তাহাই[তাহাদের] অপরিজ্ঞান বা অনভিজ্ঞতার চিহ্ন। আর অক্রমে(যুগপৎ) উৎপত্তি স্বীকার করিলেও, তাহাদের কথিত উৎপত্তিক্রম বাধিত হয়। তাহার ফলে বুদ্ধেরা এই প্রকারে উৎপত্তির অভাব পক্ষই দৃঢ়তর করিয়া থাকে ॥ ১৩৪ ॥ ১৯

শঙ্কর-ভাষ্যম্

অথৈতৎ ন শক্যতে বক্তুমিতি মন্যসে, সা ইয়ম্ অশক্তিঃ অপরিজ্ঞানম্, তত্ত্বা- বিবেকো মূঢ়তা ইত্যর্থঃ। অথবা যোহয়ং ত্বয়োক্তঃ ক্রমঃ—হেতোঃ ফলস্য সিদ্ধিঃ ফলাচ্চ হেতোঃ সিদ্ধিরিতি ইতরেতরানন্তর্য্যলক্ষণঃ, তস্য কোপো বিপর্য্যাসঃ অন্যথাভাবঃ স্যাৎ ইত্যভিপ্রায়ঃ। এবং হেতুফলয়োঃ কার্যকারণভাবানুপপত্তেঃ অজাতিঃ সর্ব্বস্য অনুৎপত্তিঃ পরিদীপিতা প্রকাশিতা অন্যোন্যাপেক্ষদোষং ব্রুবদ্ভবাদিভিঃ বুদ্ধৈঃ পণ্ডিতৈঃ ইত্যর্থঃ ॥ ১৩৪ ॥ ১৯

ভাষ্যানুবাদ

যদি মনে কর যে, ইহা বলিতে পারা যায় না;[তাহা হইলে] সেই এই অশক্তি অপরিজ্ঞানই অর্থাৎ তত্ত্ব-বিবেকের অভাবস্বরূপ মূঢ়তা ভিন্ন আর কিছু নহে। পক্ষান্তরে, তুমি যে ক্রম নির্দেশ করিয়াছ— কারণ হইতে কার্য্যোৎপত্তি, এবং কার্য্য হইতে কারণোৎপত্তি, এই যে হেতু-ফলের পৌর্ব্বাপর্য্য, তাহার অন্যথাভাব—বিপর্যয় ঘটে। প্রতিপক্ষ বুদ্ধিমান্ পণ্ডিতগণ এই প্রকারে—পরস্পরাপেক্ষতা দোষ প্রকাশ করিয়া প্রদর্শিত পদ্ধতিক্রমে হেতু ও ফলের কার্য্য-কারণ--

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২০৯

ভাবের অনুপপত্তি নিবন্ধন সমস্ত পদার্থেরই অজাতি বা জন্মাভাব- বাদই পরিদীপিত—প্রকাশিত করিয়াছেন ॥ ১৩৪ ॥ ১৯

বীজাঙ্কুরাখ্যো দৃষ্টান্তঃ সদা সাধ্যসমো হি সঃ। ন হি সাধ্যসমো হেতুঃ সিদ্ধৌ সাধ্যস্য যুজ্যতে ॥ ১৩৫ ॥ ২০

সরলার্থঃ

বীজাঙ্কুরাখ্যঃ(বীজাৎ অঙ্কুরো জায়তে, অঙ্কুরাৎ চ বীজম্, ইত্যেবংলক্ষণঃ যঃ) দৃষ্টান্তঃ(জন্যানামপি অনাদিত্বে উদাহরণম্); সঃ(দৃষ্টান্তঃ) সদা সাধ্যসমঃ (সাধ্যেন সহ অবিশিষ্টঃ—অসিদ্ধ ইত্যর্থঃ) হি[এব]। সাধ্যসমঃ হেতুঃ (লিঙ্গং) সাধ্যস্য(সাধনীয়স্য) সিদ্ধৌ(অস্তিত্বসাধনে) ন হি(নৈব) যুজ্যতে (ঘটতে) ॥

বীজ হইতে অঙ্কুর, আবার অঙ্কুর হইতে বীজ হয়, এই যে ‘বীজাঙ্কুর’ নামক উদাহরণ, তাহাও সাধ্যেরই সমান; অর্থাৎ তাহার অনাদিত্বও অসিদ্ধ। আর স্বয়ং অসিদ্ধ হেতু কখনই সাধনীয়ের সাধনে সমর্থ হয় না ৷ ১৩৫ ॥ ২০

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ননু হেতু ফলয়োঃ কার্য্য-কারণভাব ইতি অস্মাভিঃ উক্তং শব্দমাত্রমাশ্রিত্যচ্ছল- মিদং ত্বয়োক্তং—‘পুত্রাজ্জন্ম পিতুর্যথা,’ ‘বিষাণবচ্চাসম্বন্ধঃ’ ইত্যাদি। ন হি অস্মাভিঃ অসিদ্ধাৎ হেতোঃ ফলসিদ্ধিঃ, অসিদ্ধাৎ বা ফলাৎ হেতুসিদ্ধিঃ অভ্যুপগতা; কিন্তুহি? বীজাস্কুরবৎ কার্য্য-কারণভাবঃ অভ্যুপগম্যত ইতি। অত্রোচ্যতে।— বীজাঙ্কুরাখ্যো যো দৃষ্টান্তঃ স সাধ্যেন তুল্যো মমেত্যভিপ্রায়ঃ।

ননু প্রত্যক্ষঃ কার্য্য-কারণভাবো বীজাস্কুরয়োঃ অনাদিঃ, ন পূর্ব্বস্য পূর্ব্বস্য অপর- বদাদি-মত্ত্বাভ্যুপগমাৎ। যথা ইদানীমুৎপন্নঃ অপরঃ অঙ্কুরঃ বীজাদিমান্, বীজঞ্চ অপরম্ অন্যস্মাৎ অঙ্কুরাৎ ইতি ক্রমেণোৎপন্নত্বাৎ আদিমৎ; এবং পূর্ব্বপূর্ব্বঃ অঙ্কুরঃ, বীজঞ্চ পূর্ব্বং পূর্ব্বম্ আদিমৎ এবেতি প্রত্যেকং সর্ব্বস্য বীজাস্কুরজাতস্য আদিমত্ত্বাৎ কস্যচি- দপি অনাদিত্বানুপপত্তিঃ। এবং হেতুফলয়োঃ।

অথ বীজাঙ্কুরসন্ততেঃ অনাদিমত্ত্বম্ ইতি চেৎ; ন, একত্বানুপপত্তেঃ। ন হি বীজাঙ্কুরব্যতিরেকেণ বীজাস্কুরসন্ততিনামৈকা অভ্যুপগম্যতে হেতুফলসন্ততিঃ বা তদনাদিত্ববাদিভিঃ। তস্মাৎ সূক্তং “হেতোঃ ফলস্য চানাদিঃ কথং তৈঃ উপবর্ণ্যতে”

১৪

২১০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ইতি। তথাচ, অন্যদপি অনুপপত্তেঃ ন চ্ছলম্ ইত্যভিপ্রায়ঃ, ন চ লোকে সাধ্যসমো হেতুঃ সাধ্যস্য সিদ্ধৌ সিদ্ধিনিমিত্তং যুজ্যতে প্রযুজ্যতে প্রমাণকুশলৈরিত্যর্থঃ। হেতুরিতি দৃষ্টান্তঃ অত্রাভিপ্রেতঃ গমকত্বাৎ। প্রকৃতো হি দৃষ্টান্তো ন হেতু- রিতি ॥ ১৩৫ ॥ ২০

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, আমরা যে হেতু-ফলের কার্য্য-কারণ-ভাব বলিয়াছি, তুমি কেবল সেই কথাটি মাত্র অবলম্বন করিয়া—‘পুত্র হইতে যেমন পিতার জন্ম,’ এবং ‘শশ-বিষাণের ন্যায় অসম্বন্ধ’ ইত্যাদি বাক্‌ছলের প্রয়োগ করিয়াছ; বস্তুতঃ আমরা ত কখনই অসিদ্ধ হেতু হইতে কার্য্যোৎপত্তি, কিংবা অসিদ্ধ কার্য্য হইতেও কারণোৎপত্তি স্বীকার করি না; তবে কি?—বীজাঙ্কুরের ন্যায়[অনাদি] কার্য্য-কারণ-ভাব স্বীকার করিয়া থাকি। তদুত্তরে বলা হইতেছে যে, তোমার যে ‘বীজাঙ্কুর’ নামক দৃষ্টান্ত, তাহা আমার অভিমত সাধ্যেরই সমান—অনুরূপ।

ভাল, বীজাকুরের কার্য্য-কারণ-ভাব যে অনাদি, তাহা ত প্রত্যক্ষ- সিদ্ধ? না—কারণ, পূর্ব্ব পূর্ব্ব বস্তুই যখন উত্তরোত্তর বস্তুর আকার ধারণ করে, তখন ত তাহার আদিমত্তা বা সাদিত্বই সিদ্ধ হইতেছে। বর্তমান সময়ে বীজ হইতে সমুৎপন্ন একটি অঙ্কুর যেমন আদিমান, বীজও আবার অপর অঙ্কুর হইতে এইক্রমে উৎপন্ন হয় বলিয়া আদিমান; এইপ্রকার পূর্ব্ব পূর্ব্ব অঙ্কুর ও পূর্ব্ব পূর্ব্ব বীজ যেমন নিশ্চয়ই আদিমান; অতএব উক্তপ্রকারে বীজাকুরজাত প্রত্যেকই যখন আদিমান; তখন উহার কোনটিরই অনাদিত্ব সিদ্ধ হইতে পারে না। হেতু ও ফল সম্বন্ধেও এইরূপ নিয়ম।

যদি বল,[ বীজ ও অঙ্কুর অনাদি না হইলেও] বীজাঙ্কুর-প্রবাহ ত অনাদি হইতে পারে? না—একত্বের অনুপপত্তি-নিবন্ধন তাহাও হইতে পারে না। কেননা’, হেতু-ফলের অনাদিত্ব-বাদিগণও বীজাঙ্কুরাতিরিক্ত বীজাঙ্কুর-প্রবাহ কিংবা হেতু-ফল-প্রবাহ বলিয়া কোন একটি স্বতন্ত্র পদার্থ স্বীকার করেন না। অতএব, ‘তাঁহারা হেতু ও ফলের অনাদিত্ব

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২১১

কিরূপে বর্ণনা করেন,’ একথা ঠিকই বলা হইয়াছে। অভিপ্রায় এই যে, তাহা হইলে অন্যপ্রকার ছলও সম্ভব হয় না। কেননা, জগতে যাঁহারা প্রমাণপটু, তাঁহারা কখনই সাধ্য-সিদ্ধির নিমিত্ত সাধ্যসম(সাধ্যেরই অনুরূপ—অনিশ্চিত) হেতুর প্রয়োগ করেন না। এখানে ‘হেতু’ অর্থ—দৃষ্টান্ত; কারণ, তাহা জ্ঞাপক বা প্রতীতি-সাধক হইতেছে, আর আলোচ্য স্থলেও দৃষ্টান্তই প্রস্তাবিত, হেতু নহে ॥ ১৩৫ ॥ ২০

পূর্ব্বাপরাপরিজ্ঞানমজাতেঃ পরিদীপকম্।

জায়মানাদি বৈ ধর্ম্মাৎ কথং পূর্ব্বং ন গৃহ্যতে ॥ ১৩৬ ॥ ২১

সরলার্থঃ

[ হেতুফলয়োঃ] পূর্ব্বাপরাপরিজ্ঞানং(পৌর্ব্বাপর্য্যজ্ঞানাভাবঃ) অজাতেঃ (জন্মাভাবস্য) পরিদীপকম্(জ্ঞাপকম্)। হি(যস্মাৎ) জায়মানাৎ ধর্মাৎ(কাৰ্য্যাৎ পূর্ব্বং(পূর্ব্ববর্ত্তি)[তৎকারণং] কথং ন গৃহ্যতে?[কার্য্যং যদি সত্যমেব জায়তে, তর্হি, তদ্‌গ্রহণসমকালমেব তৎকারণম্ অপি অবশ্যমেব গৃহ্যেত, নচৈবম, অতো ন জায়তে ইত্যাশয়ঃ।

হেতু ও ফলের যে পৌর্ব্বাপর্য্য-নির্ণয়ের অসদ্ভাব, তাহাই জন্মাভাবের জ্ঞাপক; কারণ, কার্য্য যদি সত্যসত্যই জন্মিত, তাহা হইলে সেই কার্য্য-দর্শনেই তৎপূর্ব্ববর্তী কারণও পরিজ্ঞাত হইয়া যাইত ॥ ১৩৬ ॥ ২১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কথং বুদ্ধৈঃ অজাতিঃ পরিদীপিতা? ইত্যাহ—যদেতৎ হেতু-ফলয়োঃ পূর্ব্বাপরা- পরিজ্ঞানং, তচ্চ এতদজাতেঃ পরিদীপকং অববোধকম্ ইত্যর্থঃ। জায়মানো হি চেৎ ধর্ম্মো গৃহ্যতে, কথং তস্মাৎ পূর্ব্বং কারণং ন গৃহ্যতে? অবশ্যং হি জায়মানস্য গ্রহীত্রা তজ্জনকং গ্রহীতব্যম্, জন্য-জনকয়োঃ সম্বন্ধস্য অনপেতত্বাৎ। তস্মাৎ অজাতিপরিদীপকং তৎ ইত্যর্থঃ ॥ ১৩৬ ॥ ২১

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, বুদ্ধগণ জন্মাভাব উদ্দীপিত করিলেন কিরূপে?[তদুত্তরে] বলিতেছেন—এই যে, হেতু ও ফলের পৌর্ব্বাপর্য্য নিরূপণের অসামর্থ্য,

২১২ কারিকোপেত মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ইহাই জন্মাভাবের পরিদীপক অর্থাৎ জ্ঞাপক। কারণ, উৎপত্তি- সময়ে ধর্মই(কার্য্যই) যদি পরিজ্ঞাত হইতে পারে, তাহা হইলে, তাহারও পূর্ববর্তী কারণ পদার্থটি পরিজ্ঞাত হইবে না কেন? যে লোক জায়মান কার্য্য দর্শন করিয়া থাকে, তাহার পক্ষে সেই কার্য্যের জনককে দর্শন করাও অবশ্যই সম্ভবপর। কারণ, জন্য ও জনকের সম্বন্ধ ত তখনও পরিত্যক্ত হয় নাই; কাজেই তাহা(জ্ঞানাভাব) অজাতির পরিজ্ঞাপক ॥ ১৩৬ ॥ ২১

স্বতো বা পরতো বাপি ন কিঞ্চিদ্বস্তু জায়তে। সদসৎ সদসদ্বাপি ন কিঞ্চিদ্বস্তু জায়তে ॥ ১৩৭ ॥ ২২

সরলার্থঃ

স্বতঃ(অপরাধীনতয়া) বা, পরতঃ(পরস্মাৎ কারণান্তরাৎ) বা(অপি) কিঞ্চিৎ অপি(কিমপি বস্তু) ন জায়তে(নোৎপদ্যতে)। সৎ(সত্তাবৎ— পৃথিব্যাদি), অসৎ(সত্তাহীনং আকাশকুসুমাদিকং), সদসৎ(উভয়াত্মকং) বা, অপি(সম্ভাবনায়াং) ‘কিঞ্চিৎ ন জায়তে,(ন কেনাপি রূপেণ কিমপি সমুৎপদ্যতে ইত্যর্থঃ)।

কি স্বতঃ কি পরতঃ কোন কিছুই উৎপন্ন হয় না; কারণ সৎ, অসৎ কিংবা, সদসৎ কোনরূপেই উৎপন্ন হইতে পারে না ॥ ১৩৭ ॥ ২২

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ইতশ্চ ন জায়তে কিঞ্চিৎ; যৎ জায়মানং বস্তু স্বতঃ পরতঃ উভয়তো বা সৎ অসৎ সদসদ্বা জায়তে, ন তস্য কেনচিদপি প্রকারেণ জন্ম সম্ভবতি। ন তাবৎ স্বয়মেব অপরিনিষ্পন্নাৎ স্বরূপাৎ স্বয়মেব জায়তে, যথা ঘটঃ, তস্মাদেব ঘটাৎ। নাপি পরতঃ অন্যস্মাৎ অন্যঃ, যথা ঘটাৎ ঘটঃ, পটাৎ পটান্তরম্। তথা নোভয়তঃ,. বিরোধাৎ। যথা ঘটপটাভ্যাং ঘটঃ পটো বা ন জায়তে। ননু মৃদো ঘটো জায়তে- পিতুশ পুত্রঃ? সত্যম্; অস্তি, জায়তে ইতি প্রত্যয়ঃ শব্দশ্চ মুঢ়ানাম্। তৌ এব তু শব্দ-প্রত্যয়ৌ বিবেকিভিঃ পরীক্ষ্যেত—কিং সত্যমেব তৌ? উত মৃষা? ইতি। যাবতা পরীক্ষ্যমাণে শব্দপ্রত্যয়বিষয়ং বস্তু ঘটপুত্রাদিলক্ষণং শব্দমাত্রমেব তৎ, “বাচারন্তণম্” ইতি শ্রুতেঃ। সচ্চেৎ, ন জায়তে, সত্ত্বাৎ, মৃৎপিত্রাদিবৎ। যদি

অলাতশান্তি-প্রকরণম ২১৩

অসৎ, তথাপি ন জায়তে, অসত্ত্বাদেব, শশবিষাণবৎ। অথ সদসৎ, তথাপি ন জায়তে, বিরুদ্ধস্য একস্য অসম্ভবাৎ। অতো ন কিঞ্চিদ্বস্তু জায়ত ইতি সিদ্ধম্। যেষাং পুনর্জনিঃ এব জায়ত ইতি ক্রিয়াকারকফলৈকত্বম্ অভ্যুপগম্যতে, ক্ষণিকত্বঞ্চ বস্তুনঃ, তে দূরত এব ন্যায়াপেতাঃ। ইদম্ ইথম্ ইতি অবধারণক্ষণান্তরানবস্থানাৎ, অননুভূতস্য স্মৃত্যনুপপত্তেশ্চ ॥ ১০৭ ॥ ২২

ভাষ্যানুবাদ

এই কারণেই কিছু জন্মলাভ করে না; কারণ, জায়মান যে বস্তু স্বতঃ, পরতঃ কিংবা উভয়তও সৎ, অসৎ কিংবা সদসৎ—উভয়রূপেও জন্মে না, তাহার কোনরূপেই জন্ম হইতে পারে না। কেন না, ঘট যেমন সেই ঘট হইতেই জন্মিতে পারে না, তেমনি কার্য্য নিজেই যখন অনিষ্পন্ন—অনুৎপন্ন, তখন আর সে স্বরূপ হইতেই(আপনা হইতেই) জন্মিতে পারে না। ঘট হইতেই যেমন পট হয় না, তেমনি অন্য হইতে—পৃথগ্‌ভূত কারণান্তর হইতেও জন্মিতে পারে না। আর বিরুদ্ধ বলিয়াই উভয়রূপ হইতে(সদসদাত্মক কারণ হইতে) হয় না; দেখা যায়, ঘট ও পট হইতে ঘট কিংবা পট কখনই সমুৎপন্ন হয় না।

কেন, মৃত্তিকা হইতে ত ঘট জন্মে, এবং পিতা হইতেও পুত্র জন্মিয়া থাকে? হাঁ, মূঢ়লোকদিগের নিকট ‘জন্মে’ বলিয়া একটা প্রতীতি ও শব্দব্যবহার আছে, সত্য। কিন্তু প্রতীতি এবং শব্দ এই দুইটির সত্য মিথ্যা বিষয়ে বিবেকিগণ পরীক্ষা করিয়া বলেন যে, শব্দ ও প্রতীতির বিষয়ীভূত যে ঘট ও পুত্রাদিরূপ বস্তু, তাহা কেবলই শব্দমাত্রসার; যেহেতু শ্রুতি বলিয়াছেন-“বাক্যারব্ধ নামই বিকার (কার্য্য)”।[জায়মান] পদার্থ যদি সৎ হইত, তবে কখনই জন্মিত না; সত্তাই তাহার হেতু; মৃত্তিকা ও পিতা প্রভৃতি ইহার দৃষ্টান্ত। যদি অসৎ হয়, তাহা হইলেও জন্মিতে পারে না, অসত্তাই তাহার হেতু; যেমন-শশশৃঙ্গ প্রভৃতি। আর যদি সদসৎ উভয়াত্মক হয়, তথাপি জন্মিতে পারে না; একই বস্তু কখনও বিরুদ্ধস্বভাব হইতে পারে না; সুতরাং কোন কিছুই যে জন্মে না, ইহা প্রমাণিত হইল। আর যে বৌদ্ধদিগের মতে জন্ম-ক্রিয়াই জন্ম লাভ করে, তাহাতে ক্রিয়া, কারক

২১৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ও ফলের একত্ব স্বীকার করা হয়—এবং বস্তুর ক্ষণিকত্বও অঙ্গীকার করা হয়, তৎসমুদয় ত একেবারেই যুক্তিবহির্ভূত; কারণ ‘ইহা এই- রূপ’ এইপ্রকার অবধারণের পরক্ষণেই যখন কিছু থাকে না, পক্ষান্তরে, যাহা অনুভূত হয় নাই, সে বিষয়ের স্মরণ হওয়াও উপপন্ন হয় না; [ অতএব, এই বৌদ্ধ-মত সঙ্গত নহে] ॥ ১৩৭ ॥ ২২

হেতুর্ন জায়তেইনাদেঃ ফলঞ্চাপি স্বভাবতঃ। আর্দিন বিদ্যতে যস্য তস্য হ্যার্দিন বিদ্যতে ॥ ১৩৮ ॥ ২৩

সরলার্থঃ

অনাদেঃ(আদিরহিতাৎ ফলাৎ) হেতুঃ(তৎকারণং) ন জায়তে; ফলং (কার্য্যং) চ(অপি) স্বভাবতঃ(নির্নিমিত্তং) অপি(এব)[ন জায়তে]। যস্য(বস্তুনঃ) আদিঃ(কারণং) ন বিদ্যতে(অস্তি), তস্য হি(নিশ্চয়ে) আদিঃ (জন্ম) ন বিদ্যতে(নৈব বিদ্যতে ইত্যর্থঃ)॥

অনাদি ফল হইতে তাহার কারণ উৎপন্ন হইতে পারে না, এবং অনাদি কারণ হইতেও ফল উৎপন্ন হইতে পারে না, ইহাই বস্তুর স্বভাব। কারণ, যাহার আদি বা কারণ নাই, নিশ্চয়ই তাহার জন্মও নাই ৷ ১৩৮ ॥ ২৩

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কিঞ্চ, হেতু-ফলয়োঃ অনাদিত্বমভ্যুপগচ্ছতা ত্বয়া বলাৎ হেতু-ফলয়োঃ অজন্মৈব অভ্যুপগতং স্যাৎ, কথম্? অনাদেঃ আদিরহিতাৎ ফলাৎ হেতুর্নজায়তে। ন হ্যনুপন্নাৎ অনাদেঃ ফলাৎ হেতোঃ জন্ম ইষ্যতে ত্বয়া, ফলঞ্চ আদিরহিতাৎ অনাদেহেতোঃ অজাৎ স্বভাবত এব নির্নিমিত্তং জায়ত ইতি নাভ্যুপগম্যতে। তস্মাৎ অনাদিত্বম্ অভ্যুপগচ্ছতা ত্বরা হেতুফলয়োঃ অজন্মৈব অভ্যুপগম্যতে। যস্মাৎ আদিঃ কারণং ন বিদ্যতে যস্য লোকে, তস্য আদিঃ পূর্ব্বোক্তা জাতির্না বিদ্যতে। কারণবত এব হ্যাদিঃ অভ্যুপগম্যতে, ন অকারণবতঃ ॥ ১৩৮ ॥ ২৩

ভাষ্যানুবাদ

অপিচ, হেতু ও ফল, উভয়েরই অনাদিত্ব স্বীকার করায়, তোমার পক্ষে হেতু-ফলের জন্মাভাব বাধ্য হইয়া স্বীকার করিতে হয়। কি

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২১৫

প্রকারে?[কারণ,] অনাদি অর্থাৎ আদিরহিত ফল হইতে হেতু উৎপন্ন হইতে পারে না; কেন না, অনুৎপন্ন অনাদি ফল হইতে যে তৎকারণের উৎপত্তি, তাহা ত তুমিও স্বীকার কর না; আর আদি- রহিত—অনাদি অজ হেতু হইতে যে বিনা কারণেই—স্বভাবতঃ কার্য্য উৎপন্ন হয়, ইহাও তুমি স্বীকার কর না। অতএব হেতু ও ফলের অনাদিত্ব স্বীকারকারী তোমাকে হেতু ও ফলের জন্মাভাবই স্বীকার করিতে হয়। যেহেতু, জগতে যাহার আদি অর্থাৎ কারণ বিদ্যমান নাই, নিশ্চয়ই তাহার আদি অর্থাৎ পূর্ব্বোক্ত জন্মও বিদ্যমান নাই। কেননা, যাহার কারণ বিদ্যমান থাকে, তাহারই উৎপত্তি হইয়া থাকে, কিন্তু কারণহীনের তাহা হয় না ॥ ১৩৮ ॥ ২৩

প্রজ্ঞপ্তেঃ সনিমিত্তত্বমন্যথা দ্বয়নাশতঃ।

সংক্লেশস্যোপলব্ধশ্চ পরতন্ত্রাস্তিতা মতা ॥ ১৩৯ ॥ ২৪

সরলার্থঃ

প্রজ্ঞপ্তেঃ(শব্দাদিজ্ঞানস্য) সনিমিত্তত্বং(সবিষয়ত্বং)[স্বীকর্তব্যম্]; অন্যথা (জ্ঞানস্য সনিমিত্তত্বাভাবে) দ্বয়নাশতঃ(দৃশ্যমান-বৈচিত্র্যস্য অভাব-প্রসঙ্গাৎ) সংক্লেশস্য(অনুভূয়মান-দুঃখস্য) উপলব্ধেঃ(প্রত্যক্ষতঃ) চ(অপি) পরতন্ত্রাস্তিতা (পরেষাং দ্বৈতবাদিনাং তন্ত্রস্য শাস্ত্রস্য অর্থাৎ শাস্ত্রপ্রতিপাদ্যস্য বাহ্যপদার্থস্য অস্তিত্বা সত্তা) মতা(সম্মতা ইত্যর্থঃ) ॥

জ্ঞানমাত্রেরই(শব্দাদি-বিষয়ক জ্ঞানের) একটি নিমিত্ত বা বিষয় থাকে; তাহা না হইলে শব্দস্পর্শাদি জগদ্বৈচিত্র্যের বিলোপ হইতে পারে। বিশেষতঃ(বাহ্য- পদার্থের সম্বন্ধ বণতঃ যখন) দুঃখের উপলব্ধিও হইয়া থাকে, তখন পরকীয় শাস্ত্রোক্ত[বাহ্যপদার্থের] অস্তিত্বও অবশ্যই স্বীকার করিতে হয় ॥ ১৩৯ ॥ ২৪

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

উক্তস্যৈব অর্থস্য দৃঢ়ীকরণচিকীর্ষয়া পুনরাক্ষিপতি, —প্রজ্ঞানং প্রজ্ঞপ্তিঃ শব্দাদিপ্রতীতিঃ, তস্যাঃ সনিমিত্তত্বম্; নিমিত্তং কারণং বিষয় ইত্যেতৎ; সনিমিত্তত্বং সবিষয়ত্বং স্বাত্ম-ব্যতিরিক্তবিষয়তা ইত্যেতৎ, প্রতিজানীমহে। ন হি নির্বিষয়া:

২১৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যাপনিষৎ

প্রজ্ঞপ্তিঃ শব্দাদিপ্রতীতিঃ স্যাৎ; তস্যাঃ সনিমিত্তত্বাৎ। অন্যথা নির্বিষয়ত্বে শব্দ- স্পর্শ-নীলপীতলোহিতাদি প্রত্যয়বৈচিত্র্যস্য দ্বয়স্য নাশতঃ, নাশঃ অভাবঃ প্রসজ্যেত ইত্যর্থঃ। ন চ প্রত্যয়বৈচিত্র্যস্য দ্বয়স্য অভাবোহস্তি, প্রত্যক্ষত্বাৎ। অতঃ প্রত্যয়বৈচিত্র্যস্য দ্বয়স্য দর্শনাৎ, পরেষাং তন্ত্রং পরতন্ত্রম্ ইত্যন্যশাস্ত্রং, তস্য পর- তন্ত্রাশ্রয়স্য বাহ্যার্থস্য প্রজ্ঞানব্যতিরিক্তস্য অস্তিতা মতা অভিপ্রেতা। ন হি প্রজ্ঞপ্তেঃ প্রকাশমাত্রস্বরূপায়া নীল-পীতাদি-বাহ্যালম্বন-বৈচিত্র্যমন্তরেণ স্বভাব- ভেদেনৈব বৈচিত্র্যং সম্ভবতি। স্ফটিকস্যেব নীলাদ্যুপাধ্যাশ্রয়ৈঃ বিনা বৈচিত্র্যং ন ঘটত ইত্যভিপ্রায়ঃ। ইতশ্চ পরতন্ত্রাশ্রয়স্য বাহ্যার্থস্য জ্ঞানব্যতিরিক্তস্য অস্তিত্বা। সংক্লেশনং সংক্লেশো দুঃখম্ ইত্যর্থঃ। উপলব্ধ্যতে হি অগ্নিদাহাদিনিমিত্তং দুঃখং, যদি অগ্ন্যাদিবাহ্যং দাহাদি-নিমিত্তং বিজ্ঞানব্যতিরিক্তং, ন স্যাৎ, ততো দাহাদিদুঃখং ন উপলভ্যেত, উপলব্ধ্যেত তু অতস্তেন মন্যামহে অস্তি বাহ্যোহর্থ ইতি। নহি বিজ্ঞানমাত্রে সংক্লেশো যুক্তঃ, অন্যত্রাদর্শনাৎ ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ১৩৯ ॥ ২৪

ভাষ্যানুবাদ

পূর্ব্বোক্ত বিষয়কেই দৃঢ়তর করিবার অভিপ্রায়ে পুনশ্চ দোষো- দ্ভাবন করিতেছেন—প্রজ্ঞপ্তি অর্থ—প্রজ্ঞান, অর্থাৎ শব্দাদি বিষয়ের উপলব্ধি; যেহেতু তাহা সনিমিত্ত; নিমিত্ত অর্থ—কারণ, অর্থাৎ শব্দাদি বিষয়;[আমরা জ্ঞানের] সনিমিত্তত্ব—সবিষয়ত্ব, অর্থাৎ জ্ঞানাতিরিক্ত বিষয় সত্তা প্রতিজ্ঞা করিতেছি;[অর্থাৎ জ্ঞানের যে, জ্ঞানাতিরিক্ত শব্দাদি বিষয় আছে, তাহা আমরা প্রতিজ্ঞাপূর্ব্বক স্থাপন করিতে প্রস্তুত আছি।] কেননা, প্রজ্ঞপ্তি বা শব্দাদিজ্ঞান কখনই বিষয়শূন্য হইতে পারে না। যেহেতু জ্ঞানমাত্রই সবিষয়ক। অন্যথা—জ্ঞানের নির্বিষয়ত্ব স্বীকার করিলে, শব্দ, স্পর্শ, নীল, পীত, লোহিতাদি জ্ঞানের বৈচিত্র্য বা বৈলক্ষণ্যরূপ দ্বয়ের(ভেদের) নাশ অর্থাৎ অভাব হইতে পারে; অথচ জ্ঞানবৈচিত্র্য যখন প্রত্যক্ষসিদ্ধ, তখন সেই বৈচিত্র্যময় দ্বৈতের অভাব কখনই হইতে পারে না। অতএব প্রত্যয়গত বৈচিত্র্যদর্শনহেতু অপরাপর[বাদীর] শাস্ত্রোক্ত জ্ঞানাতিরিক্ত বাহ্যার্থের অস্তিত্ব অভিমত হয়। পরতন্ত্র অর্থ—পরের

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২১৭

কৃত তন্ত্র(শাস্ত্র), তাহার অর্থাৎ সেই পরতন্ত্রাশ্রিত বাহ্যার্থের। কেননা, একমাত্র প্রকাশই জ্ঞানের স্বরূপ, তদ্ভিন্ন তাহার স্বভাবতঃ কোন ভেদ নাই। নীল, পীতাদি বাহ্যপদার্থের অবলম্বনজাত বৈচিত্র্য ব্যতীত সেই প্রকাশমাত্ররূপ জ্ঞানের কখনই স্বরূপগত ভেদ সম্ভবপর হয় না। অভিপ্রায় এই যে, নীল প্রভৃতি কোন বর্ণের সংসর্গ ব্যতীত স্ফটিকের যেরূপ বর্ণভেদ হয় না, ইহাও তদ্রূপ। এই কারণেও পরকীয় শাস্ত্রসম্মত জ্ঞানাতিরিক্ত বাহ্য পদার্থের অস্তিত্ব স্বীকার করিতে হয়। সংক্লেশ অর্থ—ক্লেশপ্রদ, অর্থাৎ দুঃখ; অগ্নিদাহাদি- জনিত যে দুঃখ, তাহা সকলেরই উপলব্ধি-গোচর হইয়া থাকে। যদি বিজ্ঞানাতিরিক্ত দাহকর অগ্নি প্রভৃতি বাহ্য পদার্থ না থাকিত, তাহা হইলে নিশ্চয়ই দাহাদি-নিমিত্ত-সম্ভূত দুঃখ কেহই উপলব্ধি করিতে পারিত না; অথচ সকলেই কিন্তু তাহা উপলব্ধি করিয়া থাকে। অতএব, ইহা হইতেই মনে হয় যে,[ বিজ্ঞানাতিরিক্ত,] বাহ্যপদার্থ আছে; কেবলই বিজ্ঞান হইলে উক্তপ্রকার ক্লেশোৎপত্তি কখনই যুক্তিযুক্ত নহে; কারণ, অন্যত্র কোথাও ঐরূপ দেখা যায় না ॥ ১৩৯ ॥ ২৪

প্রজ্ঞপ্তেঃ সনিমিত্তত্বমিষ্যতে যুক্তিদর্শনাৎ। নিমিত্তস্যানিমিত্তত্বমিষ্যতে ভূতদর্শনাৎ॥ ১৪০॥ ২৫

সরলার্থঃ

যুক্তিদর্শনাৎ(ক্লেশোপলব্ধিরূপ-যুক্তিদর্শনাৎ হেতোঃ)[দ্বৈতবাদিনা ত্বয়া] প্রজ্ঞপ্তেঃ(জ্ঞানস্য) সনিমিত্তত্বম্(সবিষয়ত্বম্) ইষ্যতে।[অদ্বৈতবাদিভিঃ অস্মাভিঃ অপি] ভূতদর্শনাৎ(পরমার্থব্রহ্মৈকত্বদর্শনাৎ হেতোঃ) নিমিত্তস্য(তব জ্ঞান- বিষয়ত্বেন অভিমতস্য ঘটাদেঃ) অনিমিত্তত্বম্(জ্ঞানবৈচিত্র্যাহেতুত্বম্) ইষ্যতে। [মৃদ্যতিরেকেণাসত্ত্বাৎ মৃদেকসত্ত্বাচ্চ ঘটাদয়োহপি একরূপাঃ সন্তঃ জ্ঞানবৈচিত্র্যং সাধয়িতুং নালমিত্যভিপ্রায়ঃ]

ক্লেশোপলব্ধিরূপ যুক্তি অনুসারে তুমি জ্ঞানের সবিষয়ত্ব ইচ্ছা করিতেছ। ভাল, আমরাও(অদ্বৈতবাদিগণও) প্রকৃত তত্ত্বদৃষ্টি অনুসারে জ্ঞানবিষয়ীভূতরূপে অভিমত ঘটাদি বিষয়কে জ্ঞানবৈচিত্র্যের অহেতু বলিয়া ইচ্ছা করিতেছি। অর্থাৎ

২১৮ কারিকোপেত-মাণ্ড ক্যোপনিষৎ

মৃত্তিকারূপে সমস্ত ঘটই যেমন এক, তেমনি ব্রহ্মদৃষ্টিতে সমস্ত পদার্থ ই এক—ব্রহ্মা হইতে ভিন্ন নহে; সুতরাং তোমার অভিমত বিষয়গুলিও জ্ঞানভেদ জন্মাইতে পারে না ॥ ১৪০ ॥ ২৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

অত্রোচ্যতে-বাঢ়ম্ এবং, প্রজ্ঞপ্তেঃ সনিমিত্তত্বং দ্বয়সংক্লেশোপলব্ধিযুক্তিদর্শনাৎ ইষ্যতে ত্বয়া। স্থিরীভব তাবৎ ত্বং-যুক্তিদর্শনং বস্তুনঃ তথাত্বাভ্যুপগমে কারণম্ ইত্যত্র। ব্রূহি কিং তত ইতি। উচ্যতে-নিমিত্তস্য প্রজ্ঞপ্ত্যালম্বনাভিমতস্য তব ঘটাদেঃ অনিমিত্তত্বম্ অনালম্বনত্বং বৈচিত্র্যাহেতুত্বম্ ইষ্যতে অস্মাভিঃ। কথং? ভূতদর্শনাৎ পরমার্থদর্শনাৎ ইত্যেতৎ। ন হি ঘটো যথাভূতমৃদ্রূপদর্শনে সতি তদ্ব্যতিরেকেণ অস্তি, যথা অশ্বাৎ মহিষঃ, পটো বা তন্তুব্যতিরেকেণ, তন্তবশ্চ অংশুব্যতিরেকেণ, ইত্যেবম্ উত্তরোত্তরভূতদর্শনে আ শব্দপ্রত্যয়নিরোধাৎ নৈব নিমিত্তম্ উপলভামহ ইত্যর্থঃ।

অথবা, অভূতদর্শনাদ্বাহ্যার্থস্যানিমিত্তত্বম্ ইষ্যতে রজ্জাদৌ ইব সর্পাদেঃ ইত্যর্থঃ।’ ভ্রান্তিদর্শনবিষয়ত্বাচ্চ নিমিত্তস্য অনিমিত্তত্বং ভবেৎ, তদভাবে অভাবাৎ। ন হি সুষুপ্ত-সমাহিত-মুক্তানাং ভ্রান্তিদর্শনাভাবে আত্মব্যতিরিক্তো বাহ্যোহর্থ উপলভ্যতে। ন হি উন্মত্তাবগতং বস্তু অনুন্মত্তৈঃ অপি তথাভূতং গম্যতে। এতেন দ্বয়দর্শনং সংক্লেশোপলব্ধিশ্চ প্রত্যুক্তা ৷ ১৪০ ॥ ২৫

ভাষ্যানুবাদ

[ইহার উত্তরে] বলা যাইতেছে—আচ্ছা, দুঃখোৎপাদক দ্বৈত- দর্শনরূপ যুক্তির বলে তুমি(দ্বৈতবাদী) জ্ঞানের সবিষয়তা ইচ্ছা করিতেছ, উল্লিখিত যুক্তিদর্শনই যে, বস্তুর দুঃখোৎপাদনের হেতু, এ বিষয়ে তুমি একটুকু স্থির হও, অর্থাৎ স্বীয় সংকল্প রক্ষা করিতে যত্নপর হও। আচ্ছা, বল, তাহাতে কি হইল?[শ্রবণ কর,] বলা হইতেছে—নিমিত্তের অর্থাৎ জ্ঞানের অবলম্বন বা বিষয়রূপে তোমার অভিমত যে ঘটাদি বিষয়, আমরা সেই ঘটাদি বিষয়ের আলম্বনত্ব অর্থাৎ জ্ঞানবৈচিত্র্যের হেতুত্ব ইচ্ছা করি না। কি হেতু? ভূতদর্শনহেতু অর্থাৎ পরমার্থতত্ত্ব দর্শনই ইহার হেতু। কেননা, যথা-

অনাতশান্তি-প্রকরণম্ ২:৯

যথরূপে ঘটের মৃন্ময়তা পরিজ্ঞাত হইলে আর অশ্ব হইতে মহিষের ন্যায় মৃত্তিকাতিরিক্ত ঘট বলিয়া কোন পদার্থ থাকে না; অথবা, তন্তু ব্যতিরেকে বস্ত্র, এবং অংশু(আঁশ) হইতে পৃথক্ তন্তু বলিয়া কোন বস্তু থাকে না; এইরূপে উত্তরোত্তর পরমার্থতত্ত্ব দর্শন সংঘটিত হইলে, যতক্ষণ শব্দ ও শব্দজ্ঞানের ব্যবহার বিনিবৃত্ত না হয়, ততক্ষণ ত আর বৈচিত্র্যের কোন কারণ পরিদৃষ্ট হইতেছে না।

অথবা, রজ্জুতে সমারোপিত সর্পাদি বাহ্য পদার্থের অভূতত্ব বা অসত্যতা দর্শন হেতুই তৎসমুদয়ের নিমিত্ততা ইচ্ছা করা হয় না। বিশেষতঃ, ভ্রমজ্ঞানের বিষয় বলিয়া কল্পিত হইলেও ঐ সমস্ত নিমিত্তের অনিমিত্ততা হইতে পারে; যেহেতু ভ্রান্তিজ্ঞানের অভাবে বাহ্য পদার্থেরও অভাব হইয়া থাকে। কেননা, সুষুপ্ত, সমাহিত ও মুক্ত পুরুষের ভ্রান্তি-জ্ঞান বিলুপ্ত হইয়া গেলে পর আত্মাতিরিক্ত কোন বাহ্য পদার্থই উপলব্ধির বিষয় হয় না, কারণ, উন্মত্ত ব্যক্তি যে বস্তু যেরূপ দর্শন করিয়া থাকে, অনুন্মত্ত ব্যক্তি কখনই সে বস্তু সেরূপ অনুভব করে না। ইহা দ্বারাই(উক্ত যুক্তিবলে) দ্বৈত-দর্শন ও দুঃখোপলব্ধি প্রত্যাখ্যাত হইল * ॥ ১৪০ ॥ ২৫

চিত্তং ন সংস্পৃশত্যর্থং নার্থাভাসং তথৈব চ। অভূতো হি যতশ্চার্থো নার্থাভাসস্ততঃ পৃথক্ ॥ ১৪১ ॥২৬

সরলার্থঃ

[তস্মাৎ] চিত্তং(মনঃ) অর্থং(বাহ্যবিষয়ং) ন সংস্পৃশতি(ন গৃহ্লাতি),

* তাৎপর্য্য—দ্বৈতবাদীর যুক্তি এই যে, কোন একটি বস্তুর সংস্পর্শ ব্যতিরেকে যখন জ্ঞান উৎপন্ন হয় না বা হইতে পারে না; পরন্তু বাহ্য বস্তুর সান্নিধ্যবশতঃই জ্ঞানের উৎপত্তি হইয়া থাকে; বিশেষতঃ জ্ঞান স্বরূপতঃ একরূপ হইলেও যখন তাহার পার্থক্য পরিদৃষ্ট হয়=‘ঘটজ্ঞান, পটজ্ঞান’ ইত্যাদি; তখন জ্ঞানগত সেই বৈচিত্র্য বা পার্থক্যের কারণ বিজ্ঞেয় বিষয় ভিন্ন অপর কিছুই হইতে পারে না। অধিকন্তু, বিভিন্নপ্রকার জ্ঞান যে পর্যায়ক্রমে সুখ দুঃখ সমুৎপাদন করিয়া থাকে, তাহারও একমাত্র কারণ, সেই বিষয়-ভেদ। এই সকল কারণ- বশতঃ জ্ঞানাতিরিক্ত বাহ্য পদার্থের অস্তিত্ব স্বীকার করিতে হয়। তদুত্তরে

২২০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

“অর্থাভাসং(বিষয়ত্বেন প্রতিভাসমানং) চ(অপি) তথা এব(তদ্বৎ এব) (ন স্পৃশতীত্যর্থঃ)। যতঃ(যস্মাৎ কারণাৎ) অর্থঃ(বাহ্যঃ পদার্থঃ) অভূতঃ (অসত্যঃ) হি(এব), অর্থাভাসঃ চ(অপি) ততঃ(চিত্তাৎ) পৃথক্(অতি- রিক্তঃ) ন[অস্তি]।

অতএব, চিত্ত কখনই বাহ্য পদার্থকে গ্রহণ করে না, এবং অর্থাভাস(মনঃ- কল্পিত বিষয়কেও) গ্রহণ করে না। যেহেতু বাহ্য পদার্থ কখনই সত্য নহে, এবং অর্থাভাসও চিত্ত হইতে পৃথক্ নহে; অর্থাৎ চিত্তকল্পিত বিষয়সমূহ চিত্তেরই স্বরূপ, অতিরিক্ত নহে ॥ ১৪১ ॥ ২৬

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যস্মাৎ নাস্তি বাহ্যং নিমিত্তং অতশ্চিত্তং ন স্পৃণত্যর্থং বাহ্যালম্বনবিষয়ম্, নাপি অর্থাভাসং, চিত্তত্বাৎ, স্বপ্নচিত্তবৎ। অভূতো হি জাগারতেহপি স্বপ্নার্থবৎ এব বাহ্যঃ শব্দাদ্যর্থো যত উক্তহেতুত্বাচ্চ। নাপি অর্থাভাসঃ চিত্তাৎ পৃথক্; চিত্তমেব ‘হি ঘটাদ্যর্থবৎ অবভাসতে, যথা স্বপ্নে ॥ ১৪১ ॥ ২৬

ভাষ্যানুবাদ

যেহেতু বাহ্য কোনও নিমিত্ত বা বিষয় নাই, অতএব চিত্ত কোন অর্থকে, অর্থাৎ জ্ঞানের আলম্বনীভূত বাহ্য বিষয়কে স্পর্শ করে না এবং অর্থাভাসকেও স্পর্শ করে না;[ যাহা বস্তুতঃ বিষয় না হইয়াও কেবল কল্পনাবলে বিষয়াকারে প্রতিভাসমান হয়, তাহাকে ‘অর্থাভাস’ বলা যায়।] কারণ, উহাও স্বপ্নচিত্তের ন্যায় চিত্তস্বরূপই বটে,(তদতি-

আচার্য্য বলিতেছেন যে,-না; উল্লিখিত যুক্তিবলে বাহ্য পদার্থের অস্তিত্ব স্বীকারের কিছুমাত্র আবশ্যক হয় না। স্বপ্নসময়ে যে বিচিত্র জ্ঞানভেদ হইয়া থাকে, তখন বাহ্য পদার্থ কোথায় আছে? আর রজ্জুতে যখন সর্প দৃষ্ট হয়, তখন সেখানেও ত সর্পের কিছুমাত্র অস্তিত্ব থাকে না; অথচ বিভিন্নাকারে সুস্পষ্ট জ্ঞান হইয়া থাকে; সুতরাং বাহ্যার্থ ব্যতিরেকেও জ্ঞান-বৈচিত্র্য সম্পন্ন হইতে পারে। বিশেষতঃ তত্ত্বদৃষ্টিতে ব্রহ্মাতিরিক্ত কোন বস্তুরই যখন সত্তা নাই-সমস্তই অসৎ, তখন মৃত্তিকাতিরিক্ত যেমন ঘটের পৃথক্ অস্তিত্ব কিংবা প্রতীতি হয় না, তেমনি জ্ঞানস্বরূপ ব্রহ্মাতিরিক্তভাবে কোন বাহ্য পদার্থই নাই এবং তদ্বিষয়ে পৃথক্ পৃথক্ প্রতীতিও হয় না; অতএব, অনর্থক অযৌক্তিক বাহ্যার্থ স্বীকার করা যাইতে পারে না।

অনাৎশান্তি-প্রকরণম্ ২২১।

রিক্ত নহে)। যেহেতু পূর্ব্বোক্ত যুক্তি অনুসারে শব্দাদি বাহ্যপদার্থ স্বপ্নকালীন বিষয়ের ন্যায় জাগরিতকালেও নিশ্চয়ই অভূত(অবিদ্যমান— অসৎ), আর অর্থাভাসও চিত্ত হইতে পৃথক্ নহে। কেননা, স্বপ্নের ন্যায় জাগরিতকালেও চিত্তই ঘটাদি বিষয়াকারে প্রতিভাসমান হইয়া থাকে ॥ ১৪১ ॥ ২৬

নিমিত্তং ন সদা চিত্তং সংস্পৃশত্যধ্বস্থু ত্রিষু।

অনিমিত্তো বিপর্য্যাসঃ কথং তস্য ভবিষ্যতি ॥ ১৪২ ॥ ২৭

সরলার্থঃ

চিত্তং(মনঃ) ত্রিষু(অতীতানাগতবর্ত্তমানেষু) অধ্বসু(অবস্থাসু)[অপি] সদা(নিত্যং) নিমিত্তং(বিষয়ং) ন স্পৃশতি।[তথা সতি] তস্য(চিত্তস্য) অনিমিত্তঃ(নির্বিষয়ঃ) বিপৰ্য্যাসঃ(ভ্রান্তিঃ) কথং(কেন প্রকারেণ) ভবিষ্যতি [ন কথমপি, ইতি ভাবঃ]।

অতীত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান, এই অবস্থাত্রয়েই চিত্ত কখনও বিষয়কে স্পর্শ করে না; সুতরাং বিপর্য্সের কারণীভূত বিষয়ই যখন না রহিল, তখন, সেই চিত্তের নিনিমিত্ত বিপৰ্য্যাস বা ভ্রম কিরূপেই বা হইবে? ১৪২॥ ২৭

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ননু বিপৰ্য্যাসঃ তহি অসতি ঘটাদৌ ঘটাদ্যাভাসতা চিত্তস্য; তথা চ সতি- অবিপর্য্যাসঃ কচিদ্বক্তব্য ইতি। অত্রোচ্যতে-নিমিত্তং বিষয়ম্ অতীতানাগতবর্ত্ত- মানাধ্বসু ত্রিঘপি সদা চিত্তং ন সংস্পৃশেদেব হি। যদি হি কচিৎ সংস্পৃশেৎ, সঃ অবিপর্য্যাসঃ পরমার্থঃ, ইত্যতঃ তদপেক্ষয়া অসতি ঘটে ঘটাভাসতা বিপর্য্যাসঃ স্যাৎ; ন তু তদন্তি কদাচিদপি চিত্তস্য অর্থসংস্পর্শনম্। তস্মাৎ অনিমিত্তে বিপর্যায়সঃ কথং তস্য চিত্তস্য ভবিষ্যতি? ন কথঞ্চিৎ বিপর্যাসোহস্তি ইত্যভি- প্রায়ঃ। অয়মেব হি স্বভাবঃ চিত্তস্য, যদুত অসতি নিমিত্তে ঘটাদৌ তদ্বৎ অবভাসনম্ ॥ ১৪২ ॥ ২৭

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, তাহা হইলে ত ঘটাদি বিষয়ের অভাবে চিত্তের যে ঘটাদি-

২২২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

বিষয়াকারে প্রতিভাস, তাহা ত বিপৰ্য্যাস বা ভ্রম বলিয়া গণ্য হইতে পারে? তাহা হইলে ত কোন একস্থলে অবিপর্য্যাস বা সত্য বিজ্ঞান থাকা আবশ্যক। এতদুত্তরে বলা হইতেছে—অতীত, অনাগত (ভবিষ্যৎ) ও বর্তমান, এই অবস্থাত্রয়েও সর্বদা চিত্ত নিমিত্তকে— বিষয়কে স্পর্শ করে না; যদি কোনস্থলে বিষয়কে গ্রহণ করিত, তাহা হইলে সেই অবিপর্য্যাস পরমার্থ সত্য হইত; এবং তাহার অপেক্ষায় অসৎ ঘটাদি-বিষয়ক ঘটাভাসাকার জ্ঞানও বিপৰ্য্যাস বলিয়া গণ্য হইতে পারিত; কিন্তু তাহা ত হয় না, অর্থাৎ কস্মিন্ কালেও ত চিত্তের বিষয়সংস্পর্শ নাই। অতএব, সেই চিত্তের নির্নিমিত্ত বিপর্যায় (ভ্রম) কিরূপে হইবে? অভিপ্রায় এই যে, কোন প্রকারেই বিপর্য্যাস নাই। চিত্তের স্বভাবই এইপ্রকার যে, ঘটাদিবিষয় বিদ্যমান না থাকিলেও নিজেই তদাকারে প্রতিভাসমান হয় ॥ ১৪২ ॥ ২৭

তস্মান্ন জায়তে চিত্তং চিত্তদৃশ্যং ন জায়তে।

তস্য পশ্যন্তি যে জাতিং খে বৈ পশ্যন্তি তে পদম্ ॥ ১৪৩ ॥ ২৮

সরলার্থঃ

তস্মাৎ(উক্তাৎ এব কারণাৎ) চিত্তং ন জায়তে, চিত্তদৃশ্যং(বাহ্যং বস্তু— ঘটাদি)[অপি] ন জায়তে, যে(বাদিনঃ) তস্য(চিত্তস্য) জাতিং(জন্ম) পশ্যন্তি(মন্যন্তে), তে(চিত্তজন্মবাদিনঃ) বৈ(নিশ্চয়ে) খে(আকাশে) পদং পশ্যন্তি(অবলোকয়ন্তি, অত্যন্তসম্ভবমপি সম্ভাবয়ন্তি তে ইতি ভাবঃ)।

উক্ত হেতুতেই চিত্ত জন্মে না, চিত্তের দৃশ্য ঘটাদিও জন্মে না। যাহারা সেই চিত্তের জন্মদর্শন করে তাহারা আকাশেও পক্ষিপ্রভৃতির চরণচিহ্ন দর্শন করে॥ ১৪৩ ॥ ২৮

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

“প্রজ্ঞপ্তেঃ সনিমিত্তত্বম্” ইত্যাদি এতদন্তং বিজ্ঞানবাদিনো বৌদ্ধস্য বচনং বাহ্যার্থবাদিপক্ষ প্রতিষেধপরম্ আচার্য্যেণ অনুমোদিতম্। তদেব হেতুং কৃত্বা তৎপক্ষপ্রতিষেধায় তদিদম্ উচ্যতে “তস্মাৎ” ইত্যাদি। যস্মাৎ অসত্যেব ঘটাদৌ

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২২৩

ঘটাদ্যাভাসতা চিত্তস্য বিজ্ঞানবাদিনা অভ্যুপগতা, তদনুমোদিতম্ অস্মাভিরপি ভূতদর্শনাৎ। তস্মাৎ তস্যাপি চিত্তস্য জায়মানাবভাসতা অসত্যেব জন্মনি যুক্তা ভবিতুমিতি, অতো ন জায়তে চিত্তম্; যথা চিত্তদৃশ্যং ন জায়তে, অতস্তস্য যে জাতিং পশ্যন্তি বিজ্ঞানবাদিনঃ ক্ষণিকত্বদুঃখিত্বশূন্যত্বানাত্মত্বাদি চ। তেনৈব চিত্তেন চিত্তস্বরূপং দ্রষ্টুমশক্যং পশ্যন্তঃ খে বৈ পশ্যন্তি তে পদং পক্ষ্যাদীনাম্। অত ইতরেভ্যোহপি দ্বৈতিভ্যঃ অত্যন্তসাহসিকা ইত্যর্থঃ। যেহপি শূন্যবাদিনঃ পশ্যন্ত এব সর্ব্বশূন্যতাং স্বদর্শনস্যাপি অন্যতাং প্রতিজানতে, তে ততোহপি সাহসিকতরাঃ খং মুষ্টিনাপি জিঘৃক্ষন্তি ॥ ১৪৩ ॥ ২৮

ভাষ্যানুবাদ

বিজ্ঞানবাদী বাহ্যপদার্থের অস্তিত্ববাদী বৌদ্ধের মত-খণ্ডনার্থ “প্রজ্ঞপ্তেঃ সনিমিত্তত্বং” এই হইতে আরম্ভ করিয়া এই পর্যন্ত যাহা বলিয়াছেন, তাহা আচার্য্যেরও(গৌড়পাদেরও) অনুমোদিত। উক্ত যুক্তিনিচয়কেই হেতুরূপে গ্রহণ করিয়া এখন সেই পক্ষ-প্রতিষেধার্থ এই “তস্মাৎ” ইত্যাদি শ্লোক বলা হইতেছে। যেহেতু বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধ ঘটাদি বিষয়ের অসত্ত্বেও চিত্তের ঘটাদিরূপে প্রতিভাস স্বীকার করিয়াছেন, ভূতদর্শনবলে বা পরমার্থদৃষ্টিতে আমরাও তাহা অনু- মোদন করিয়া থাকি। সেই হেতুই প্রকৃতপক্ষে জন্ম না হইলেও, সেই চিত্তের জায়মানতা প্রতীতি হওয়া অযুক্ত হয় না; অতএব চিত্তের দৃশ্য—ঘটাদি পদার্থ যেরূপ জন্মে না, তদ্রূপ[প্রকৃতপক্ষে] চিত্তও জন্ম লাভ করে না। অতএব, যে সকল বিজ্ঞানবাদী(বৌদ্ধ প্রভৃতি) সেই চিত্তের জন্মলাভ দর্শন করিয়া থাকেন, ক্ষণিকত্ব দুঃখিত্ব, শূন্যত্ব ও অনাত্মত্বাদি স্বীকার করিয়া থাকেন এবং চিত্ত দ্বারাই সেই চিত্তের স্বরূপ দর্শন অসম্ভব হইলেও, যাঁহারা দর্শন করিয়া থাকেন, তাঁহারা আকাশেও পক্ষী প্রভৃতির পদদর্শন করিয়া থাকেন। অভিপ্রায় এই যে, অপরাপর দ্বৈতবাদী অপেক্ষাও তাঁহারা অত্যন্ত সাহসী। আর যে সমস্ত শূন্যবাদী স্বয়ং দেখিয়াও সর্ব্বশূন্যতা এমন কি স্বীয় প্রত্যক্ষেরও শূন্যত্ব সমর্থন করিয়া থাকেন, তাঁহারা বিজ্ঞানবাদী

২২৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

অপেক্ষাও অধিকতর সাহসিক—আকাশকেও মুষ্টিমধ্যে ধারণ করিতে, ইচ্ছা করেন ॥ ১৪৩ ॥ ২৮

অজাতং জায়তে যস্মাদজাতিঃ প্রকৃতিস্ততঃ। প্রকৃতেরন্যথাভাবো ন কথঞ্চিদ্ভবিষ্যতি॥ ১৪৪॥ ১৯

সরলার্থঃ

অজাতং(জন্মরহিতং চিত্তং) যস্মাৎ(কারণাৎ) জায়তে, সা প্রকৃতিঃ (কারণং) অজাতিঃ(জন্মশূন্যা); ততঃ(তস্মাৎ হেতোঃ) প্রকৃতেঃ(অজায়াঃ) অন্যথাভাবঃ(বিকারঃ) কথঞ্চিৎ(কেনাপি প্রকারেণ) ন ভবিষ্যতি।

জন্মরহিত চিত্ত যাহা হইতে জন্ম লাভ করে, তাহার প্রকৃতিটি স্বভাবতই অজা। সেই কারণে প্রকৃতির অন্যথাভাব(অজার জন্ম) কোন প্রকারেই সম্ভব হইবে না ॥ ১৪৪ ॥ ২৯

শঙ্কর-ভাষ্যম্

উক্তৈঃ হেতুভিঃ অজমেকং ব্রহ্মেতি সিদ্ধং, যৎ পুনরাদৌ প্রতিজ্ঞাতং তৎ- ফলোপসংহারার্থঃ অয়ং শ্লোকঃ। অজাতং যচ্চিত্তং ব্রহ্মৈব জায়ত ইতি বাদিভিঃ পরিকল্প্যতে, তৎ অজাতং জায়তে যস্মাৎ অজাতিঃ প্রকৃতিঃ, তস্য; ততঃ তস্মাৎ. অজাতরূপায়াঃ প্রকৃতেঃ অন্যথাভাবো জন্ম ন কথাঞ্চদ্ভবিষ্যতি ॥ ১৪৪ ॥ ২৯

ভাষ্যানুবাদ

ব্রহ্ম যে অজ ও এক, তাহা পূর্ব্বোক্ত যুক্তি-সমূহ দ্বারা প্রমাণিত হইয়াছে। প্রথমে যাহা প্রতিজ্ঞাত হইয়াছে, সেই প্রতিজ্ঞাফলের উপসংহারার্থ এই শ্লোক আরব্ধ হইতেছে—অজাত, অতএবই ব্রহ্ম- স্বরূপ যে চিত্তকে বাদিগণ সমুৎপন্ন বলিয়া পরিকল্পনা করিয়া থাকেন, সেই অজাত চিত্ত যাহা হইতে জন্মলাভ করে, সেই অজাই তাহার প্রকৃতি;[ অজপদার্থের জন্ম হয়, ইহা বিরুদ্ধ কথা] সেই কারণেই স্বরূপতই জন্মহীন প্রকৃতির অন্যথাভাব বা বিকার(জন্ম) কোন প্রকারেই হইবে না ॥ ১৪৪ ॥ ২৯

অলাতশান্তি প্রকরণম্ ২২৫

অনাদেরন্তবত্ত্বঞ্চ সংসারস্য ন সেৎস্যতি। অনন্ততা চাদিমতো মোক্ষস্য ন ভবিষ্যতি ॥ ১৪৫ ॥ ৩০

সরলার্থঃ

[ মোক্ষ-সংসারয়োঃ পারমার্থিকত্বপক্ষ-নিরসনায় আহ—“অনাদেঃ” ইত্যাদি] —[ বাদিনামভিমতস্য] অনাদেঃ সংসারস্য অন্তবত্ত্বং(পরিসমাপ্তিঃ) চ(অপি) ন সেৎস্যতি। আদিমতঃ(জন্যস্য) মোক্ষস্য চ(অপি) অনন্ততা(অপরি- সমাপ্তিঃ) ন ভবিষ্যতি ॥

বাদিগণের আভমত অনাদি সংসারের অন্ত হইতে পারে না, এবং আদিমান্ অর্থাৎ বিবেকজ্ঞানজন্য মোক্ষের অনন্তত্ব বা অক্ষয়ত্ব হইতে পারে না ॥ ১৪৫ ॥ ৩০

শঙ্কর-ভাষ্যম্

অয়ঞ্চ অপর আত্মনঃ সংসারমোক্ষয়োঃ পরমার্থসদ্ভাববাদিনাং দোষ উচ্যতে,- অনাদেঃ অতীতকোটিরহিতস্য সংসারস্য অন্তবত্ত্বং সমাপ্তিঃ ন সেৎস্যতি যুক্তিতঃ সিদ্ধিং ন উপযাস্যতি। ন হি অনাদিঃ সন্ অন্তবান্ কশ্চিৎ পদার্থো দৃষ্টো লোকে। বীজাঙ্কুরসম্বন্ধ-নৈরন্তর্য্য-বিচ্ছেদো দৃষ্ট ইতি চেৎ; ন, একবস্তুভাবেন অপোদিত- ত্বাৎ। তথা অনন্ততাপি বিজ্ঞানপ্রাপ্তিকালপ্রভবস্য মোক্ষস্য আদিমতো ন ভবিষ্যতি; ঘটাদিষু অদর্শনাৎ। ঘটাদিবিনাশবৎ অবস্তুত্বাৎ অদোষ ইতি চেৎ; তথা চ মোক্ষস্য পরমার্থসদ্ভাব-প্রতিজ্ঞাহানিঃ; অসত্ত্বাদেব; শশবিষাণস্যেব আদিমত্ত্বাভাবশ ॥ ১৪৫ ॥ ৩০

ভাষ্যানুবাদ

আত্মার সংসার ও মোক্ষ, এই উভয়কেই যাঁহারা পরমার্থ সত্য বলিয়া স্বীকার করেন, তাঁহাদের পক্ষে এই আর একটি দোষ কথিত হইতেছে—অনাদি অর্থাৎ যাহার আদি বা পূর্ব্ব নাই, সেই সংসারের অন্তবত্তা অর্থাৎ সমাপ্তি বা শেষ কোন যুক্তি দ্বারা সিদ্ধ হইবে না; কারণ, জগতে অনাদি কোন পদার্থকেই অন্তবান্(বিনাশী) দেখা যায় না। যদি বল, বীজ ও অঙ্কুরের অনাদি সম্বন্ধেরও ত বিচ্ছেদ দেখা যায়? না—তাহা বলিতে পার না; কারণ, এক বস্তু নয় বলিয়াই

১৫

২২৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

উহা পরিত্যক্ত, অর্থাৎ সেখানে বীজ ও অঙ্কুর, দুইটি পৃথক্ পদার্থ; সুতরাং তত্রত্য অনাদি সম্বন্ধও বিনষ্ট হইতে পারে; কিন্তু অনাদি অথচ এক, এরূপ পদার্থের বিনাশ কোথাও দেখা যায় না। এইরূপ বিজ্ঞানোদয়ের সমকালভাবী অতএব আদিমান্(জন্য) মোক্ষেরও অনন্তত্ব(অনশ্বরত্ব) সিদ্ধ হইতে পারে না; কেননা, জন্য ঘটাদি পদার্থে(অনন্তত্ব) দেখা যায় না। যদি বল, ঘটাদিবিনাশের ন্যায় উহাও অবস্তু, সুতরাং দোষ নাই; তাহা হইলেও ‘মোক্ষ পরমার্থ সৎ’ এই প্রতিজ্ঞার হানি হয়। পক্ষান্তরে, অসত্ত্বনিবন্ধনই শশ-বিষাণা- দির ন্যায় উহারও আদিমত্তা হইতে পারে না ॥ ১৪৫ ॥ ৩০

আদাবন্তে চ যন্নাস্তি বর্ত্তমানেহপি তৎ তথা। বিতথৈঃ সদৃশাঃ সন্তোহবিতথা ইব লক্ষিতাঃ ॥ ১৪৬ ॥ ৩১

সরলার্থঃ

যৎ(বস্তু) আদৌ(উৎপত্তেঃ প্রাক্) অন্তে(বিনাশোত্তরং) চ(অপি) ন অস্তি(ন বিদ্যতে), তৎ(বস্তু) বর্তমানে অপি তথা(নাস্ত্যেব)।[অতঃ] [তে] বিতথৈঃ(অসত্যৈঃ) সদৃশাঃ(অনুরূপাঃ) সন্তঃ অবিতথা ইব(পরমার্থা ইব) লক্ষিতাঃ(প্রতীতাঃ)[ভ্রান্ত্যা ভবন্তীতি শেষঃ]।

যাহা আদিতে ও অন্তে নাই—অসৎ, বর্তমান অবস্থায়ও তাহা তদ্রূপই অর্থাৎ অসৎই। অতএব, তাহা মিথ্যার অনুরূপ হইয়াও ভ্রমবশতঃ কেবল সত্য বস্তুর ন্যায় পরিলক্ষিত হয় মাত্র ॥ ১৪৬। ৩১

সপ্রয়োজনতা তেষাং স্বপ্নে বিপ্রতিপদ্যতে। তস্মাদাদ্যন্তবত্ত্বেন মিথ্যৈব খলু তে স্মৃতাঃ॥ ১৪৭॥ ৩২

সরলার্থঃ

তেষাং(পদার্থানাং) সপ্রয়োজনতা(কার্যকারিতা) স্বপ্নে(স্বপ্নকালে) বিপ্রতিপদ্যতে(বিরুদ্ধভাবমাপদ্যতে, নিষ্প্রয়োজনা সম্পদ্যতে ইত্যর্থঃ)। তস্মাৎ (হেতোঃ) আদ্যন্তবত্ত্বেন(আদিমত্ত্বেন-জন্যত্বেন, অন্তবত্ত্বেন-বিনাশিত্বেন চ

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২২৭

(হেতুনা) তে(পদার্থাঃ) খলু(নিশ্চয়ে) মিথ্যা এব স্মৃতাঃ(চিন্তিতাঃ) । বিবেকিভিঃ ইতি শেষঃ]।

যেহেতু দৃশ্য পদার্থনিচয়ের কার্য্যকারিতা-স্বভাব স্বপ্নসময়ে বিরুদ্ধ হইয়া যায়, অতএব আদি ও অন্ত অর্থাৎ উৎপত্তি ও বিনাশ থাকায় বিবেকিগণ এই সমস্ত পদার্থকে মিথ্যা বলিয়াই চিন্তা করিয়াছেন ॥ ১৪৭ ॥ ৩২

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

বৈতথ্যে কৃতব্যাখ্যানৌ শ্লোকো ইহ সংসার-মোক্ষাভাবপ্রসঙ্গেন পঠিতৌ॥ ১৪৬ ॥ ৩১-১৪৭ ॥ ৩২

ভাষ্যানুবাদ

বৈতথ্য-প্রকরণেই এই শ্লোক দুইটি ব্যাখ্যাত হইয়াছে। সংসার ও মোক্ষের অসত্যতা স্থাপন-প্রসঙ্গে এখানে আবার পঠিত হইয়াছে ॥ ১৪৬ ॥ ৩১—১৪৭ ॥ ৩২

সর্ব্বে ধৰ্ম্মা মৃষা স্বপ্নে কায়স্যান্তনিদর্শনাৎ। সংবৃতেইস্মিন্ প্রদেশে বৈ ভূতানাং দর্শনং কুতঃ ॥ ১৪৮ ॥ ৩৩

সরলার্থঃ

স্বপ্নে কায়স্য(দেহস্য) অন্তঃ(অভ্যন্তরে) নিদর্শনাৎ(অনুভবাৎ) সর্ব্বে ধৰ্ম্মাঃ(বাহ্যাঃ পদার্থাঃ) মৃষা(মিথ্যাভূতাঃ);[তৎসারূপ্যাৎ] অস্মিন্ সংবৃতে (নিরবকাশে অখণ্ডস্বরূপে) প্রদেশে(ব্রহ্মণি) ভূতানাং[বিদ্যমানানাং] দর্শনং বৈ(অবধারণে) কুতঃ(কস্মাৎ কারণাৎ)[মৃষা ন স্যাদিতি শেষঃ]।

স্বপ্নসময়ে দেহের অভ্যন্তরে দৃষ্ট হয় বলিয়া যখন স্বাপ্ন পদার্থ-সমূহ মিথ্যা, তখন নিরবকাশ(ফাঁক-শূন্য) ব্রহ্মে বিদ্যমান পদার্থসমূহই বা মিথ্যা হইবে না কেন? ॥ ১৪৮ ॥ ৩৩

শঙ্কর-ভাষ্যম্

“নিমিত্তস্যানিমিত্তত্বম্ ইষ্যতে ভূতদর্শনাৎ” ইত্যয়মর্থঃ প্রপঞ্চ্যতে এতৈঃ শ্লোকৈঃ ॥ ১৪৮ ॥ ৩৩

২২৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ভাষ্যানুবাদ

পরমার্থ-দৃষ্টিতে তোমার অভিপ্রেত নিমিত্তেরও অনিমিত্তত্ব স্বীকার করিতে হয়। পূর্ব্বোক্ত এই বাক্যার্থই অত্রত্য শ্লোকসমূহে বিশদভাবে বর্ণিত হইতেছে ॥ ১৪৮ ॥ ৩৩

ন যুক্তং দর্শনং গত্বা কালস্যানিয়মাদ্গতৌ। প্রতিবুদ্ধশ্চ বৈ সর্ব্বস্তস্মিন্ দেশে ন বিদ্যতে ॥ ১৪৯ ॥ ৩৪

সরলার্থঃ

[স্বপ্নে] গতৌ(শরীরাদ বহির্দেশগমনে) কালস্য(জাগরিতে যাবতা কালেন তদ্দেশে গমনং ভবতি, তাবতঃ কালস্য) অনিয়মাৎ(ব্যবস্থাভাবাৎ, মাস-পরিমিত- কালগম্যেহপি তৎক্ষণাদেব গমনদর্শনাদিত্যর্থঃ) গত্বা(বিষয়দেশং প্রাপ্য) দর্শনং (বিষয়োপলব্ধিঃ) ন যুক্তং(অযুক্তমিত্যর্থঃ)। বৈ(যস্মাৎ) সর্ব্বঃ(স্বপ্নদর্শী) প্রতিবুদ্ধঃ(জাগরিতঃ সন্) তস্মিন্(স্বপ্নানুভূতে) দেশে(স্থানে) ন বিদ্যতে, [অপিতু, স্বীয়-শয়ন-কক্ষে এব তিষ্ঠতীত্যাশয়ঃ] ॥

[স্বপ্নসময়ে, দৃশ্যদেশে] গমনোপযোগী কালের নিয়ম না থাকায়, বিষয়দেশে যাইয়া বিষয় দর্শন করা যুক্তিযুক্ত হয় না; বিশেষতঃ, স্বপ্নদর্শী সকলেই জাগরিত হইয়া আর সেই স্বপ্নানুভূত প্রদেশে থাকে না; পরন্তু নিজের শয়নকক্ষেই বিদ্যমান থাকে ॥ ১৪৯ ॥ ৩৪

পাঙ্কর-ভাষ্যম্

জাগরিতে গত্যাগমনকালৌ নিয়তৌ, দেশঃ প্রমাণতো যঃ, তস্য অনিয়মাৎ নিয়মস্য অভাবাৎ স্বপ্নে ন দেশান্তরগমন মত্যর্থঃ ॥ ১৪৯ ॥ ৩৪

ভাষ্যানুবাদ

জাগরিতাবস্থায় গমনাগমনের উপযুক্ত যে সময় নির্দিষ্ট আছে, এবং প্রমাণসিদ্ধ যে স্থান নির্দিষ্ট আছে, তাহার অনিয়মহেতু অর্থাৎ নিয়মাভাবহেতু স্বপ্নসময়ে আর বহির্দেশে গমন হয় না ॥ ১৪৯ ॥ ৩৪

মিত্রাদ্যৈঃ সহ সংমন্ত্র্য সম্বুদ্ধো ন প্রপদ্যতে। গৃহীতঞ্চাপি যৎকিঞ্চিৎ প্রতিবুদ্ধো ন পশ্যতি ॥ ১৫০ ॥ ৩৫

অনা তশান্তি-প্রকরণম্ ২২৯

সরলার্থঃ

[স্বপ্নে] মিত্রাদ্যৈঃ(সুহৃৎপ্রভৃতিভিঃ) সহ সংমন্ত্র্য(সংভাষ্য) সংবুদ্ধঃ (জাগরিতঃ সন্) ন প্রপদ্যতে(তৎ সংমন্ত্রণং নোপলভতে)।[স্বপ্নে] যৎ কিঞ্চিৎ(যৎ কিমপি) গৃহীতং(লব্ধং) চ[ভবতি], প্রতিবুদ্ধঃ(জাগরিতঃ সন্(তৎ) অপি ন পশ্যতি।[অতঃ স্বপ্নে বাসনাতিরিক্তং কিমপি বস্তুভূতং নাস্তীত্যাশয়ঃ]।

স্বপ্নদর্শী ব্যক্তি(স্বপ্নকালে) মিত্রাদির সহিত কথোপকথন করিয়া জাগরিত হইয়া আর তাহা প্রাপ্ত হয় না এবং স্বপ্ন-সময়ে যাহা কিছু গ্রহণ করে, জাগরিত হইয়া[তাহাও] আর দেখিতে পায় না ॥ ১৫০ ॥ ৩৫

শঙ্কর-ভাষ্যম্

মিত্রাদ্যৈঃ সহ সংমন্ত্র্য তদেব মন্ত্রণং প্রতিবুদ্ধো ন প্রপদ্যতে। গৃহীতঞ্চ যৎ- কিঞ্চিৎ হিরণ্যাদি প্রাপ্নোতি। গতশ্চ ন দেশান্তরং গচ্ছতি স্বপ্নে ॥ ১৫০ ॥ ৩৫

ভাষ্যানুবাদ

মিত্র প্রভৃতির সহিত মন্ত্রণা বা কথোপকথন করিয়া প্রতিবুদ্ধ [ জাগরিত] হইলে আর তাহা দেখিতে পায় না।[স্বপ্নে] হিরণ্যাদি যাহা কিছু গ্রহণ করে, জাগ্রদবস্থায় আর তাহা প্রাপ্ত হয় না; এই কারণেও স্বপ্নে আর দেশান্তরে গমন করে না ॥ ১৫০ ॥ ৩৫

স্বপ্নে চাবস্তুকঃ কায়ঃ পৃথগন্যস্য দর্শনাৎ। যথা কায়স্তথা সর্ব্বং চিত্তদৃশ্যমবস্তুকম্ ॥ ১৫১ ॥ ৩৬

সরলার্থঃ

স্বপ্নে চ পৃথক্ অন্যস্য দর্শনাৎ(এতচ্ছরীর-ভিন্নত্বেন কায়ান্তরস্য উপলব্ধেঃ হেতোঃ) কায়ঃ(স্বাপ্নঃ দেহঃ) অবস্তুকঃ(বস্তুশূন্যঃ)। কায়ঃ(শরীরং) যথা (যদ্বৎ), তথা(তদ্বৎ এব) চিত্তদৃশ্যং সর্ব্বং(স্বপ্নং বস্তু) অবস্তুকং (মিথ্যারূপমিত্যর্থঃ ॥

গল্পে যখন পৃথক বলিয়াই অনুভূত হয়, তখন ঐ শরীর অবস্তু মিথ্যাময়।

২২৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ভাষ্যানুবাদ

পরমার্থ-দৃষ্টিতে তোমার অভিপ্রেত নিমিত্তেরও অনিমিত্তত্ব স্বীকার করিতে হয়। পূর্ব্বোক্ত এই বাক্যার্থই অত্রত্য শ্লোকসমূহে বিশদভাবে বর্ণিত হইতেছে ॥ ১৪৮ ॥ ৩৩

ন যুক্তং দর্শনং গত্বা কালস্যানিয়মাদগতৌ। প্রতিবুদ্ধশ্চ বৈ সর্ব্বস্তস্মিন্ দেশে ন বিদ্যতে ॥ ১৪৯ ॥ ৩৪

সরলার্থঃ

[স্বপ্নে] গতৌ(শরীরাদ্ বহির্দেশগমনে) কালস্য(জাগরিতে যাবতা কালেন তদ্দেশে গমনং ভবতি, তাবতঃ কালস্য) অনিয়মাৎ(ব্যবস্থাভাবাৎ, মাস-পরিমিত- কালগম্যেহপি তৎক্ষণাদেব গমনদর্শনাদিত্যর্থঃ) গত্বা(বিষয়দেশং প্রাপ্য) দর্শনং (বিষয়োপলব্ধিঃ) ন যুক্তং(অযুক্তমিত্যর্থঃ)। বৈ(যস্মাৎ) সর্ব্বঃ(স্বপ্নদর্শী) প্রতিবুদ্ধঃ(জাগরিতঃ সন্) তস্মিন্(স্বপ্নানুভূতে) দেশে(স্থানে) ন বিদ্যতে, [অপিতু, স্বীয়-শয়ন-কক্ষে এব তিষ্ঠতীত্যাশয়ঃ]॥

[স্বপ্নসময়ে, দৃশ্যদেশে] গমনোপযোগী কালের নিয়ম না থাকায়, বিষয়দেশে যাইয়া বিষয় দর্শন করা যুক্তিযুক্ত হয় না; বিশেষতঃ, স্বপ্নদর্শী সকলেই জাগরিত হইয়া আর সেই স্বপ্নানুভূত প্রদেশে থাকে না; পরন্তু নিজের শয়নকক্ষেই বিদ্যমান থাকে ॥ ১৪৯ ॥ ৩৪

পাঙ্কর-ভাষ্যম্

জাগরিতে গত্যাগমনকালৌ নিয়তৌ, দেশঃ প্রমাণতো যঃ, তস্য অনিয়মাৎ নিয়মস্য অভাবাৎ স্বপ্নে ন দেশান্তরগমন মত্যর্থঃ ॥ ১৪৯ ॥ ৩৪

ভাষ্যানুবাদ

জাগরিতাবস্থায় গমনাগমনের উপযুক্ত যে সময় নির্দিষ্ট আছে, এবং প্রমাণসিদ্ধ যে স্থান নির্দিষ্ট আছে, তাহার অনিয়মহেতু অর্থাৎ নিয়মাভাবহেতু স্বপ্নসময়ে আর বহির্দেশে গমন হয় না ॥ ১৪৯ ॥ ৩৪

মিত্রাদ্যৈঃ সহ সংমন্ত্র্য সম্বুদ্ধো ন প্রপদ্যতে। গৃহীতঞ্চাপি যৎকিঞ্চিৎ প্রতিবুদ্ধো ন পশ্যতি ॥ ১৫০ ॥ ৩৫

অনা তশান্তি-প্রকরণম্ ২২৯

সরলার্থঃ

[স্বপ্নে] মিত্রাদ্যৈঃ(সুহৃৎপ্রভৃতিভিঃ) সহ সংমন্ত্র্য(সংভাষ্য) সংবুদ্ধঃ (জাগরিতঃ সন্) ন প্রপদ্যতে(তৎ সংমন্ত্রণং নোপলভতে)।[স্বপ্নে] যৎ কিঞ্চিৎ(যৎ কিমপি) গৃহীতং(লব্ধং) চ[ভবতি], প্রতিবুদ্ধঃ(জাগরিতঃ সন্(তৎ) অপি ন পশ্যতি।[অতঃ স্বপ্নে বাসনাতিরিক্তং কিমপি বস্তুভূতং নাস্তীত্যাশয়ঃ]।

স্বপ্নদর্শী ব্যক্তি(স্বপ্নকালে) মিত্রাদির সহিত কথোপকথন করিয়া জাগরিত হইয়া আর তাহা প্রাপ্ত হয় না এবং স্বপ্ন-সময়ে যাহা কিছু গ্রহণ করে, জাগরিত হইয়া[তাহাও] আর দেখিতে পায় না ৷ ১৫০ ॥ ৩৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

মিত্রাদ্যৈঃ সহ সংমন্ত্র্য তদেব মন্ত্রণং প্রতিবুদ্ধো ন প্রপদ্যতে। গৃহীতঞ্চ যৎ- কিঞ্চিৎ হিরণ্যাদি প্রাপ্নোতি। গতশ্চ ন দেশান্তরং গচ্ছতি স্বপ্নে ॥ ১৫০ ॥ ৩৫

ভাষ্যানুবাদ

মিত্র প্রভৃতির সহিত মন্ত্রণা বা কথোপকথন করিয়া প্রতিবুদ্ধ [ জাগরিত] হইলে আর তাহা দেখিতে পায় না।[স্বপ্নে] হিরণ্যাদি যাহা কিছু গ্রহণ করে, জাগ্রদবস্থায় আর তাহা প্রাপ্ত হয় না; এই কারণেও স্বপ্নে আর দেশান্তরে গমন করে না ॥ ১৫০ ॥ ৩৫

স্বপ্নে চাবস্তুকঃ কায়ঃ পৃথগন্যস্য দর্শনাৎ। যথা কায়স্তথা সর্ব্বং চিত্তদৃশ্যমবস্তুকম্ ॥ ১৫১ ॥ ৩৬

সরলার্থঃ

স্বপ্নে চ পৃথক্ অন্যস্য দর্শনাৎ(এতচ্ছরীর-ভিন্নত্বেন কায়ান্তরস্য উপলব্ধেঃ হেতোঃ) কায়ঃ(স্বাপ্নঃ দেহঃ) অবস্তুকঃ(বস্তুশূন্যঃ)। কায়ঃ(শরীরং) যথা (যদ্বৎ), তথা(তদ্বৎ এব) চিত্তদৃশ্যং সর্ব্বং(স্বপ্নং বস্তু) অবস্তুকং (মিথ্যারূপমিত্যর্থঃ ॥

স্বপ্নে যখন পৃথক্ বলিয়াই অনুভূত হয়, তখন ঐ শরীর অবস্তু মিথ্যাময়।

২৩০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

শরীর যেমন অবস্তু—মিথ্যা, তেমনি কেবল চিত্তদৃশ্য অর্থাৎ কেবলই মনের’ বাসনাকল্পিত অপর সমস্তই অবস্তু—মিথ্যা ॥ ১৫১ ॥ ৩৬

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

স্বপ্নে চ অটন্ দৃশ্যতে যঃ কায়ঃ, সঃ অবস্তুকঃ, ততোহন্যস্য স্বাপদেশস্থস্য পৃথক্ কায়ান্তরস্য দর্শনাৎ। যথা স্বপ্নদৃশ্যঃ কায়ঃ অসন্, তথা সর্ব্বং চিত্তদৃশ্যম্ অবস্তুকং জাগরিতেহপি, চিত্তদৃশ্যত্বাৎ ইত্যর্থঃ। স্বপ্নসমত্বাৎ অসৎ জাগরিতমপীতি প্রকরণার্থঃ ॥ ১৫১ ॥ ৩৬

ভাষ্যানুবাদ

স্বপ্নে পর্যটনকারী যে দেহ দৃষ্ট হয়, নিজ নিদ্রাকক্ষে তাহা হইতে পৃথক্ অপর দেহ যখন দৃষ্ট হয়, তখন ঐ দেহ অবস্তু—অসত্য। স্বপ্নদৃশ্য দেহ যেরূপ অসৎ, তদ্রূপ জাগ্রৎ অবস্থায়ও চিত্তদৃশ্য যাহা কিছু, তৎ- সমস্তই অবস্তু; চিত্তদৃশ্যত্বই ঐ মিথ্যাত্বের হেতু। স্বপ্নসদৃশ বলিয়া জাগ্রৎকালীন বস্তুও অসৎ। ইহাই এই প্রকরণলব্ধ অর্থ ॥ ১৫১ ॥ ৩৬

গ্রহণাজ্জাগরিতবত্তদ্ধেতুঃ স্বপ্ন ইষ্যতে। তদ্ধেতুত্বাত্তু তস্যৈব সজ্জাগরিতমিষ্যতে॥ ১৫২॥ ৩৭

সরলার্থঃ

[স্বপ্নে] জাগরিতবৎ(জাগরিতস্য ইব) গ্রহণাৎ(বিষয়োপলব্ধেঃ হেতোঃ) স্বপ্নঃ তদ্ধেতুঃ(জাগরিতজন্যঃ) ইষ্যতে। তদ্ধেতুত্বাৎ(জাগরিতজন্যত্বাৎ হেতোঃ) তু(পুনঃ) তস্য(স্বপ্নদর্শিনঃ) এব[তৎ(স্বপ্নকারণীভূতং)] জাগরতং সৎ (সত্যং) ইষ্যতে;[ন তু তদন্যস্য ইত্যাশয়ঃ]॥

স্বপ্নসময়ে জাগরিতানুভূতির অনুরূপ দর্শন হয়, এইজন্য জাগ্রৎ অবস্থাকে স্বপ্নাবস্থার হেতু বলিয়া স্বীকার করা হয়; কিন্তু সেই জাগরণ যাহারই মতে স্বপ্নদর্শনের হেতু তাহার পক্ষেই সত্য বলিয়া গৃহীত হইতে পারে; অপরের নিকটে নহে ॥ ১৫২ ॥ ৩৭

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ইতশ্চ অসত্ত্বং জাগ্রদ্বস্তনঃ জাগরিতবৎ জাগরিতস্যেব গ্রহণাদ্ গ্রাহ্য-গ্রাহক- রূপেণ স্বপ্নস্য, তজ্জাগরিতং হেতুরস্য স্বপ্নস্য, স স্বপ্নঃ তদ্ধেতুঃ জাগরিতকার্য্যম্

অনাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৩১

ইষ্যতে। তদ্ধেতুত্বাৎ জাগরিতকার্য্যত্বাৎ তস্যৈব স্বপ্নদৃশ এব সৎ জাগরিতং, ন তু অন্যেষাম্; যথা স্বপ্ন ইত্যভিপ্রায়ঃ। যথা স্বপ্নঃ স্বপ্নদৃশ এব সন্ সাধারণ- বিদ্যমানবস্তুবৎ অবভাসতে, তথা তৎকারণত্বাৎ সাধারণবিদ্যমানবস্তুবৎ অবভাসনম্, ন তু সাধারণং বিদ্যমানবস্তু স্বপ্নবৎ এবেত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ১৫২ ॥ ৩৭

ভাষ্যানুবাদ

এই কারণেও জাগ্রৎবস্তুর অসত্ত্ব; কেননা, জাগ্রৎ-কালীন দর্শনের অনুসারে গ্রাহ্য-গ্রাহকভাবে স্বপ্ন পদার্থ অনুভূত হইয়া থাকে। এইজন্য জাগরিতাবস্থাই স্বপ্নের হেতু, অর্থাৎ স্বপ্নাবস্থাটি জাগ্রদবস্থারই কার্য্য বা ফল বলিয়া ইচ্ছা করা হইয়া থাকে। জাগরিতাবস্থাটি সেই স্বপ্নদর্শনের কারণ; এইজন্য সেই স্বপ্নদর্শীর পক্ষেই জাগরিতাবস্থাটি সত্য, অপরের পক্ষে নহে। অভিপ্রায় এই যে, স্বপ্ন যেমন স্বপ্নদর্শীর নিকটই অপরাপর সাধারণ সত্য বস্তুর ন্যায় প্রতিভাত হইয়া থাকে, সেইরূপ জাগ্রদ্বস্তুও সাধারণ বর্তমান বস্তুর আকারে প্রতিভাসমান হয় মাত্র; কিন্তু প্রকৃত- পক্ষে উহা কখনই সাধারণভাবে বিদ্যমান নহে, পরন্তু স্বপ্নেরই অনুরূপ ॥ ১৫২ ॥ ৩৭

উৎপাদস্যাপ্রসিদ্ধত্বাদজং সর্ব্বমুদাহৃতম্।

ন চ ভূতাদ্ভূতস্য সম্ভবোহস্তি কথঞ্চন ॥ ১৫৩ ॥ ৩৮

সরলার্থঃ

অপিচ, উৎপাদস্য(উৎপত্তেঃ) অপ্রসিদ্ধত্বাৎ(অসিদ্ধত্বাৎ) সর্ব্বং(জগৎ) অজম্(জন্মরহিতং মায়াময়ং) উদাহৃতম্(উক্তম্)।[যস্মাৎ] ভূতাৎ (নিত্যসিদ্ধাৎ ব্রহ্মণঃ) অভূতস্য(অসতঃ কার্য্যস্য) কথঞ্চন(কথমপি) সম্ভবঃ (উৎপত্তিঃ) চ(অপি) ন অস্তি(বিদ্যতে) ॥

উৎপত্তিই সিদ্ধ হয় না বলিয়া, সমস্তই অজ(জন্মরহিত) বলিয়া অভিহিত হইয়াছে। বস্তুতঃ সত্যপদার্থ ব্রহ্ম হইতে কখনই অসৎ—মিথ্যা কার্য্যের কোন মতেই উৎপত্তি হইতে পারে না ॥ ১৫৩॥ ৩৮

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ননু স্বপ্নকারণত্বেহপি জাগরিতবস্তুনো ন স্বপ্নবৎ অবস্তুত্বম্। অত্যন্তচলো হি

২৩২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

স্বপ্নঃ জাগরিতন্তু স্থিরং লক্ষ্যতে। সত্যমেবম্ অবিবেকিনাং স্যাৎ, বিবেকিনান্ত ন কস্যচিৎ বস্তুন উৎপাদঃ প্রসিদ্ধঃ; অতঃ অপ্রসিদ্ধত্বাৎ উৎপাদস্য আত্মৈব সর্ব্বমিতি অজং সর্ব্বম্ উদাহৃতং বেদান্তেষু ‘সবাহ্যাভ্যন্তরো হ্যজঃ’ ইতি।

যদপি মন্যসে, জাগরিতাৎ সতঃ অসন্ স্বপ্নো জায়তে ইতি, তৎ অসৎ; ন ভূতাৎ বিদ্যমানাৎ অভূতস্য অসতঃ সম্ভবোহস্তি লোকে। ন হ্যসতঃ শশবিষাণাদেঃ সম্ভবো দৃষ্টঃ কথঞ্চিদপি ॥ ১৫৩ ॥ ৩৮

ভাষ্যানুবাদ

প্রশ্ন হইতেছে যে, জাগ্রৎ বস্তু যদি স্বপ্নদৃষ্ট বস্তুর কারণই হইল, তাহা হইলে ত জাগ্রৎ-বস্তুনিচয়ের মিথ্যাত্ব হইতে পারে না।[দেখিতে পাওয়া যায়,] স্বপ্ন অত্যন্ত চঞ্চল(অ-চিরস্থায়ী); কিন্তু জাগরিত পদার্থ স্থির বলিয়া অনুভূত হইয়া থাকে। হাঁ, অবিবেকিগণের নিকট এইরূপই প্রতীতি হইয়া থাকে সত্য; কিন্তু বিবেকিগণের নিকট কোন বস্তুরই উৎপত্তি প্রসিদ্ধ নহে। অতএব, উৎপত্তিই যখন অপ্রসিদ্ধ, তখন আত্মাই এই দৃশ্যমান সমস্ত বস্তুময়; এই কারণেই ‘তিনি বাহ্যাভ্যন্তর-সর্বত্র স্থিত ও অজ’ ইত্যাদি বাক্য দ্বারা সমস্ত বেদান্তশাস্ত্রে সমস্ত জগৎকেই অজ বলিয়া নির্দেশ করা হইয়াছে।

আর তুমি যে মনে কর, সৎস্বরূপ জাগরিত হইতেই অসৎ স্বপ্ন সমুৎপন্ন হইয়া থাকে, তাহাও উত্তম কথা নহে; কারণ, জগতে ভূত অর্থাৎ বিদ্যমান সৎপদার্থ হইতে কখনই অসৎ অবিদ্যমান পদার্থের উৎপত্তি হয় না; কেননা, শশবিষাণ প্রভৃতি অসৎ পদার্থের সত্তা কখনই কোন রূপে দৃষ্ট হয় না ॥ ১৫৩॥ ৩৮

অসজ্জাগরিতে দৃষ্ট্বা স্বপ্নে পশ্যতি তন্ময়ঃ। অসৎ স্বপ্নেহপি দৃষ্ট্বা চ প্রতিবুদ্ধো ন পশ্যতি ॥ ১৫৪ ॥ ৩৯

সরলার্থঃ

[জনঃ] জাগরিতে(জাগ্রদবস্থায়াং) অসৎ(অসত্যং বস্তু) দৃষ্টা তন্ময়ঃ (তৎসংস্কারপ্রবণঃ সন্) স্বপ্নে পশ্যতি(জাগ্রদৃষ্টমেব বিলোকয়তি), স্বপ্নে অপি অসৎ দৃষ্টা(অনুভূয়) প্রতিবুদ্ধঃ(জাগরিতঃ সন্)[তৎ] ন পশ্যতি ॥

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৩৩

জাগরিতাবস্থায় অসৎ পদার্থনিচয় দর্শন করিয়া তন্ময় হইয়া অর্থাৎ সেই সংস্কারের বশবর্তী হইয়া স্বপ্নে তাহা দর্শন করিয়া থাকে; কিন্তু স্বপ্নাবস্থায় অসৎ পদার্থ দর্শন করিয়াও আবার জাগরিতাবস্থায় সে সমুদয় দেখিতে পায় না ॥ ১৫৪ ॥ ৩৯

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ননু উক্তং ত্বয়ৈব স্বপ্নো জাগরিতকার্য্যমিতি, তৎ কথম্ উৎপাদঃ অপ্রসিদ্ধ ইত্যুচ্যতে? শৃণু, তত্র যথা কার্যকারণভাবঃ অস্মাভিঃ অভিপ্রেত ইতি। অসৎ অবিদ্যমানং রজ্জু সর্পবৎ বিকল্পিতং বস্তু জাগরিতে দৃষ্টা তদ্ভাবভাবিতঃ তন্ময়ঃ স্বপ্নেহপি জাগরিতবৎ গ্রাহ্যগ্রাহকরূপেণ বিকল্পয়ন্ পশ্যতি, তথা অসৎ স্বপ্নেহপি দৃষ্টা চ প্রতিবুদ্ধো ন পশ্যতি অবিকল্পয়ন্, চশব্দাৎ। তথা জাগরিতেহপি দৃষ্টা স্বপ্নে ন পশ্যতি কদাচিৎ ইত্যর্থঃ। তস্মাৎ জাগরিতং স্বপ্নহেতুঃ ইত্যুচ্যতে, ন তু পরমার্থসৎ ইতি কৃত্বা ॥ ১৫৪ ॥ ৩৯

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, তুমিই ত বলিয়াছ যে, স্বপ্নাবস্থাটি জাগ্রৎ-অবস্থার কার্য্য; তবে আবার উৎপত্তির অসম্ভাবনা বলিতেছ কি প্রকারে?[উত্তর-] সেখানে আমরা কি ভাবে কার্য্য-কারণভাব কল্পনা করিয়া থাকি, তাহা শ্রবণ কর। জাগ্রৎ অবস্থায়, রজ্জু সর্পের ন্যায় কল্পিত অসৎ-অবিদ্য- মান বস্তু দর্শন করিয়া তন্ময় হইয়া, সেই ভাবে ভাবিত হইয়া স্বপ্নেও জাগ্রৎ-অবস্থার ন্যায় গ্রাহ্য-গ্রাহকভাবে বিকল্প করিয়া বস্তু দর্শন করিয়া থাকে। সেইরূপ, স্বপ্নেও আবার অসৎ পদার্থ দর্শনের পর জাগরিত হইয়া ঐরূপ বিকল্পনার অভাবে তাহা আর দর্শন করে না। সেইরূপ কখন কখন জাগরিতাবস্থায়ও বস্তু দর্শন করিয়া তাহা আর স্বপ্নে দেখিতে পায় না। এইজন্য জাগরতিকে স্বপ্নের হেতুভূত বলা হইয়া থাকে; কিন্তু উহা পরমার্থ সত্য বলিয়া নহে ॥ ১৫৪ ॥ ৩৯

নাস্ত্যসদ্দেতুকমসং সদসদ্দেতুকন্তথা।

সচ্চ সদ্দেবতুকং নাস্তি সদ্দেবতুকমসৎ কুতং ॥ ১৫৫ ॥ ৪০

২৩৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

সরলার্থঃ

[পরমার্থতস্তু কার্য্যকারণভাব এব নাস্তীত্যাহ]—অসদ্ধেতুকং(অসৎ হেতুঃ যস্য তৎ তথা), অসৎ ন অস্তি(ন বিদ্যতে), তথা অসদ্ধেতুকং(অসৎ-সমুৎপাদিতম্ অপি) সৎ[নাস্তি]। সদ্ধেতুকং(সজ্জনিতং) সৎ[অপি] ন অস্তি, অতঃ সদ্ধেতুকম্ অসৎ(কার্য্যং) কুতঃ(কস্মাৎ)[ভবেদিতি শেষঃ]।

অসৎ পদার্থ কখনও অসৎ-সমুৎপন্ন হয় না, সৎ কখন অসৎ জনিত হয় না; আবার সৎপদার্থ হইতেও সৎ উৎপন্ন হয় না, অতএব অসৎ হইতে আর সদুৎপত্তির কারণ কি সম্ভবে? ১৫৫ ॥ ৪০

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

পরমার্থতস্তু ন কস্যচিৎ কেনচিদপি প্রকারেণ কার্য্যকারণভাব উপপদ্যতে। কথম্? নাস্তি অসদ্ধেতুকম্ অসৎ শশবিষাণাদি হেতু কারণং যস্য অসত এব খ-পুষ্পাদেঃ, তৎ অসদ্ধেতুকম্ অসৎ ন বিদ্যতে। তথা সদপি ঘটাদি বস্তু অসদ্ধেতুকং শশবিষাণাদিকার্য্যং নাস্তি। তথ। সচ্চ বিদ্যমানং ঘটাদিবত্ত্বন্তরকার্য্যং নাস্তি। সৎকার্য্যম্ অসৎ কুতঃ এব সম্ভবতি? ন চান্যঃ কার্য্যকারণভাবঃ সম্ভবতি, শক্যো বা কল্পয়িতুম্। অতো বিবেকিনাম্ অসিদ্ধ এব কার্য্য-কারণভাবঃ কস্যচিৎ, ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ১৫৫ ॥ ৪০

ভাষ্যানুবাদ

প্রকৃতপক্ষে কোনপ্রকারেই কোন পদার্থের কার্য্যকারণভাব উপপন্ন হয় না। কেন?—অসৎহেতুক অসৎপদার্থ নাই; অর্থাৎ অসৎ— শশবিষাণ প্রভৃতিই যাহার—আকাশ কুসুমাদির হেতু; এরূপ অসদ্ধেতুক কোনও অসৎ পদার্থ বিদ্যমান নাই; সেইরূপ সৎ—ঘটাদি পদার্থও অসদ্ধেতুক অর্থাৎ শশবিষাণাদি হইতে সমুৎপন্ন নাই। সেই প্রকার সৎ অর্থাৎ বিদ্যমান বস্তুও আবার ঘটাদি অপর বস্তুর কার্য্যভূত নাই; অতএব, কিরূপে বা সত্যের কার্য্য অসৎ পদার্থ সম্ভবিতে পারে? অভিপ্রায় এই যে, অতএব বিবেকিগণের নিকট কোন পদার্থেরই কার্য্য- কারণভাব-সম্বন্ধ সম্ভবপর হয় না॥ ১৫৫॥ ৪০

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৫৫

বিপর্য্যাসাদ্যথা জাগ্রদচিন্ত্যান্ ভূতবৎ স্পৃশেৎ। তথা স্বপ্নে বিপর্য্যাসাদধর্ম্মাংস্তত্রৈব পশ্যতি ॥ ১৫৬ ॥ ৪১

সরলার্থঃ

জাগ্রদচিন্ত্যান্(জাগরিতেহপি চিন্তয়িতুমশক্যান্ রজ্জুসর্পাদীন্) বিপৰ্য্যাসাৎ (ভ্রমাৎ) যথা ভূতবৎ(পরমার্থসত্যবৎ) স্পৃশেৎ(বিকল্পয়তি)। তথা (তদ্বদেব) স্বপ্নে[অপি] বিপৰ্য্যাসাৎ[হেতোঃ] ধৰ্ম্মান্(হস্তি-প্রভৃতীন্) তত্রৈব(স্বপ্নদৃষ্টস্থানে এব) পশ্যতি(অনুভবতি)[নতু বাস্তবমিত্যাশয়ঃ] ॥

জাগ্রদবস্থায় যেমন ভ্রান্তিবশতঃ অচিন্তনীয় রজ্জুসর্পাদি কল্পিত হয়, স্বপ্নেও তদ্রূপ ভ্রান্তিবশে তথায় নানাবিধ দৃশ্য পদার্থ দর্শন করে; কিন্তু সেইগুলি সত্য নহে ৷ ১৫৬৷ ৪১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

পুনরপি জাগৎ-স্বপ্নয়োঃ অসতোঃ অপি কার্য্যকারণভাবাশঙ্কাম্ অপনয়ন্ আহ—বিপর্য্যাসাদবিবেকতো যথা জাগ্রৎ জাগরিতে অচিন্ত্যান্ ভাবান্ অশক্য- চিন্তনান্ রজ্জু সর্পাদীন ভূতবৎ পরমার্থবৎ স্পৃশেৎ স্পৃশন্নিব বিকল্পয়েৎ ইত্যর্থঃ কশ্চিদ যথা, তথা স্বপ্নে বিপর্য্যাসাৎ হস্ত্যাদীন্ পশ্যন্নিব বিকল্পয়তি, তত্রৈব পশ্যতি; ন তু জাগরিতাৎ উৎপদ্যমানান্ ইত্যর্থঃ ॥ ১৫৬ ॥ ৪১

ভাষ্যানুবাদ

জাগ্রৎ ও স্বপ্নাবস্থা অসৎ হইলেও তৎসম্বন্ধে কার্য্যকারণভাব’ আশঙ্কাপূর্বক তদপনয়নার্থ বলিতেছেন—কোনও লোক যেমন বিপর্যাস অর্থাৎ অবিবেক বশতঃ জাগ্রৎ অর্থাৎ জাগরিতাবস্থায়ও অচিন্তনীয় অর্থাৎ চিন্তার অযোগ্য রজ্জুসর্পাদি বিষয়সমূহ পরমার্থ- সত্যের ন্যায় স্পর্শ বা অনুভব করে; অর্থাৎ যেন স্পর্শ করিতেছে বলিয়াই মনে করিয়া থাকে; তেমনি স্বপ্নেও বিপর্যায়স বশতঃই হস্তি- প্রভৃতি দর্শন করিতেছি বলিয়াই যেন মনে করিয়া থাকে। সেখানেই দর্শন করিয়া থাকে; কিন্তু, জাগ্রদবস্থা হইতে সমুৎপন্ন[বিষয়সমূহ] নহে ॥ ১৫৬॥ ৪১

২৩৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

উপলম্ভাৎ সমাচারাদস্তি-বস্তুত্ববাদিনাম্। জাতিস্তু দেশিতা বুদ্ধৈরজাতেস্ত্রসতাং সদা॥ ১৫৭॥ ৪২

সরলার্থঃ

বুদ্ধৈঃ(জ্ঞানিভিঃ অদ্বৈতবাদিভিঃ) তু(পুনঃ) উপলম্ভাৎ(প্রত্যক্ষাৎ) সমাচারাৎ(বর্ণাশ্রমাদ্যাচরণাৎ)[চ] অস্তি-বস্তুত্ববাদিভিঃ(‘অস্তি বস্তু’ ইত্যেবং বদতাং) অজাতেঃ(অনুৎপত্তেঃ চ) এসতাং(বিভ্যতাম্ অবিবেকিনাং সম্বন্ধে) জাতিঃ(জন্ম) দেশিত(উপদিষ্টা)[ন পুনঃ তত্র তাৎপর্য্যম্ ইতি ভাবঃ]।

প্রত্যক্ষ দর্শন এবং বর্ণাশ্রমাদি আচার হইতে যাঁহারা বস্তুর অস্তিত্ব বা সত্যতা স্বীকার করেন এবং জন্মাভাব কথায় ভয় পান; বুদ্ধ—জ্ঞানিগণ তাঁহাদের জন্যই উৎপত্তির উপদেশ করিয়াছেন; কিন্তু বিবেকীদিগের জন্য নহে ॥ ১৫৭ ॥ ৪২

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যাপি বুদ্ধৈঃ অদ্বৈতবাদিভিঃ জাতিঃ দেশিতা উপদিষ্টা উপলব্ধনম্ উপলন্তঃ, তস্মাৎ উপলব্ধেরিত্যর্থঃ। সমাচারাৎ বর্ণাশ্রমাদিধর্মসমাচরণাচ্চ, তাভ্যাং হেতুভ্যাম্ অস্তিবস্তুত্ববাদিনাম্ অস্তি বস্তুভাব ইত্যেবংবদনশীলানাং দৃঢ়াগ্রহবতাং শ্রদ্দধানানাং মন্দবিবেকিনাম্ অর্থোপায়ত্বেন সা দেশিতা জাতিঃ; তাং গৃহ্নন্তু তাবৎ। বেদান্তাভ্যাসিনাং তু স্বয়মেব অজাদ্বয়াত্মবিষয়ো বিবেকো ভবিষ্যতীতি ন তু পরমার্থবুদ্ধ্যা। তে হি শ্রোত্রিয়াঃ। স্থূলবুদ্ধিত্বাদজাতেঃ অজাতিবস্তুনঃ সদা ত্রস্যন্ত্যাত্মনাশং মন্যমানা অবিবেকিন ইত্যর্থঃ। “উপায়ঃ সোহবতারায়” ইত্যুক্তম্ ॥ ১৫৭ ॥ ৪২

ভাষ্যানুবাদ

বুদ্ধ অদ্বৈতবাদিগণ যে, উপলব্ধ অর্থাৎ বাহ্যপদার্থের প্রত্যক্ষোপ- লব্ধি ও সমাচার দেখিয়া অর্থাৎ বর্ণাশ্রমাদি ধর্ম্মের ব্যবহার দর্শনানু- সারে জাতি—বাহ্যপদার্থের উৎপত্তির উপদেশ করিয়াছেন, তাহা কেবল যাহারা অস্তিত্বত্ববাদী অর্থাৎ ‘স্বভাবসিদ্ধ বস্তু আছে’, এইরূপ কথন- শীল, দৃঢ়তর আগ্রহান্বিত ও শ্রদ্ধাবান্ অল্পবিবেকী কোক তাহাদেরই বুদ্ধি প্রবেশের উপায়রূপে উপদিষ্ট হইয়াছে। তাহারা তাহা গ্রহণ

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৩৭

করে, করুক; কিন্তু, বেদান্তাভ্যাস-তৎপর লোকদিগের সম্বন্ধে অজ, অদ্বয়, আত্মবিষয়ক বিবেকজ্ঞান স্বতঃই উৎপন্ন হইবে,—পরন্তু উহাতে পরমার্থ দৃষ্ট কখনই হইবে না। সেই শ্রোত্রিয়গণ(যাঁহারা কেবলই শ্রোতা, তত্ত্ব-বোদ্ধা নহেন), স্থূলবুদ্ধিত্ব দোষে অজাতি অর্থাৎ জন্মরহিত ব্রহ্ম বস্তু হইতে সর্ব্বদাই ত্রাস বা ভয় অনুভব করিয়া থাকেন; কারণ, সেই অবিবেকিগণ উহাতে আত্মবিনাশ সম্ভাবনা করিয়া থাকেন। এইজন্যই কথিত হইয়াছে যে, ‘এ সমস্ত কেবল বুদ্ধি-প্রবেশের উপায় বা দ্বারমাত্র।’[বাস্তবিক কিছুমাত্র ভেদ নাই।] ॥ ১৫৭ ॥ ৪২

অজাতেস্ত্রসতাং তেষামুপলম্ভাদ্ বিয়ন্তি যে। জাতিদোষা ন সেৎস্যন্তি দোষোহপ্যল্পো ভবিষ্যতি ॥ ১৫৮ ॥ ৪৩

সরলার্থঃ

অজাতেঃ এসতাং(বিভ্যতাং) তেষাং(দ্বৈতবাদিনাং) যে(সন্মার্গপ্রবৃত্তাঃ) উপলম্ভাৎ(বস্তুনামুপলব্ধেঃ হেতোঃ) বিয়ন্তি(বিরুদ্ধং যন্তি, প্রতিপদ্যন্তে ইত্যর্থঃ), তেষাং জাতিদোষাঃ(জাতিস্বীকারকৃতাদোষাঃ) ন সেৎস্যন্তি(ন সম্পৎস্যন্তে), দোষঃ অপি অল্পঃ[এব] ভবিষ্যতি,[যতঃ তে শ্রদ্ধয়া সৎপথপ্রবৃত্তা ইতি ভাবঃ] ॥

অজাতিভীরু লোকদিগের মধ্যে যাঁহারা দ্বৈতপ্রত্যক্ষ বশতঃ বিরুদ্ধমতাবলম্বী হন,[অর্থাৎ দ্বৈতের অস্তিত্ব স্বীকার করিয়া উপাসনাদি কার্য্যে প্রবৃত্ত হন], তাঁহাদের সেই জাতি-স্বীকার-জনিত দোষ হয় না, আর হইলেও অল্পমাত্রই হয়; কারণ, তাঁহারা দ্বৈতাবলম্বনেও সৎপথে প্রবৃত্ত হইতেছেন ॥ ১৫৮ ॥ ৪৩

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যে চৈবম্ উপলম্ভাৎ সমাচারাচ্চ অজাতেঃ অজাতিবস্তুনঃ এসন্তঃ ‘অস্তি বস্তু’ ইত্যদ্বয়াৎ আত্মনঃ, বিয়ন্তি বিরুদ্ধং যন্তি, দ্বৈতং প্রতিপদ্যন্ত ইত্যর্থঃ। তেষাম্ অজাতেঃ এসতাং শ্রদ্দধানানাং সন্মার্গাবলম্বিনাং জাতিদোষা জাত্যুপলন্তকৃতা দোষা ন সেৎস্যন্তি, সিদ্ধিং ন উপযাস্যন্তি, বিবেকমার্গপ্রবৃত্তত্বাৎ। যদ্যপি কশ্চিদোষঃ স্যাৎ, সোহপি অল্প এব ভবিষ্যতি, সম্যদর্শনাপ্রতিপত্তিহেতুক ইত্যর্থঃ ॥ ১৫৮ ॥ ৪৩

২৩৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যাপনিষৎ

ভাষ্যানুবাদ

যাহারা উক্তপ্রকার উপলব্ধি ও তদনুরূপ ব্যবহার দর্শনে অজাতি হইতে—জন্মরহিত বস্তু হইতে অর্থাৎ অদ্বিতীয় আত্মা হইতে ভীত হইয়া বিরুদ্ধভাবাপন্ন হয় অর্থাৎ আত্মাতিরিক্ত দ্বৈতবস্তুর অস্তিত্ব স্বীকার করিয়া থাকে, অজাতি হইতে ত্রাসপ্রাপ্ত, শ্রদ্ধাবান্ এবং সৎপথবর্তী সেই সমস্ত লোকের পক্ষে জাতিদোষ অর্থাৎ জন্মোপলব্ধি- জনিত দোষসমূহ উপস্থিত হয় না অর্থাৎ অস্তিত্ব লাভ করিতে পারে না; কারণ, তাহারা[প্রকৃত পক্ষে] বিবেকপথে প্রবৃত্ত হইয়াছে। যদিও কোন দোষ হয়, অর্থাৎ সম্যজ্ঞানের প্রতিবন্ধক কোন দোষ হয়, তাহাও অল্পপরিমাণেই হইবে ॥ ১৫৮ ॥ ৪৩

উপলম্ভাৎ সমাচারান্মায়াহস্তী যথোচ্যতে।

উপলম্ভাৎ সমাচারাদস্তি বস্তু তথোচ্যতে ॥ ১৫৯ ॥ ৪৪

সরলার্থঃ

উপলম্ভাৎ(প্রত্যক্ষতঃ), সমাচারাৎ(দ্বৈতোচিতক্রিয়াদর্শনাৎ চ) মায়াহস্তী (মায়ানিম্মিতঃ হস্তী) যথা(যদবৎ)[হস্তী ইতি] উচ্যতে[অজ্ঞৈরিতিশেষঃ]; তথা(তদ্বদেব) উপলম্ভাৎ সমাচারাৎ ‘বস্তু অস্তি’ ইতি উচ্যতে,[নচ এতাবতা বস্তুত্বসিদ্ধিরিতি ভাবঃ]।

প্রত্যক্ষ দর্শন এবং তদুচিত ব্যবহার দর্শন বশতঃ মায়াময় হস্তীকে যেরূপ ‘হস্তী’ বলা যায়, ঠিক সেইরূপ উপলব্ধি ও সমাচার দর্শন বশতঃ ‘বস্তু আছে’ বলিয়া কথিত হইয়া থাকে ৷ ১৫৯ ॥ ৪৪

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ননু উপলব্ধ-সমাচারয়োঃ প্রমাণত্বাৎ অস্ত্যেব দ্বৈতং বস্তু, ইতি; ন; উপলন্ত- সমাচারয়োঃ ব্যভিচারাৎ। কথং ব্যভিচার ইতি? উচ্যতে—উপলভ্যতে হি মায়া- হস্তী হস্তীব; হস্তিনমিবাত্র সমাচরন্তি বন্ধনারোহণাদি-হস্তিসম্বন্ধিভিঃ ধর্ম্মৈঃ হস্তী ইতি চ উচ্যতে অসন্নপি যথা; অথৈব উপলম্ভাৎ সমাচারাৎ দ্বৈতং ভেদরূপমস্তি বস্তু ইত্যুচ্যতে। তস্মাৎ ন উপলব্ধ-সমাচারৌ দ্বৈতবস্তুসদ্ভাবে হেতু ভবত ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ১৫৯ ॥ ৪৪

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৩৯

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, উপলব্ধি এবং সমাচার বা ব্যবহারও যখন প্রমাণ, তখন নিশ্চয়ই দ্বৈতবস্তুর অস্তিত্ব আছে; না,-কারণ, উপলব্ধি ও সমাচারের ব্যভিচার দৃষ্ট হয়, অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে বস্তুর অভাবেও উপলব্ধি ও সমা- চার হইতে দেখা যায়। ব্যভিচার কিরূপ, তাহা কথিত হইতেছে— যেমন মায়াময় হস্তীও হস্তীর ন্যায়ই উপলব্ধির বিষয় হইয়া থাকে; সে স্থলে উহা বন্ধন ও আরোহণ প্রভৃতি হস্তিধর্মসমূহদ্বারা হস্তীর ন্যায়ই ব্যবহৃত হইয়া থাকে; যদিও উহা অসৎ; তথাপি ‘হস্তী’ বলিয়াই কথিত হয়; ঠিক তেমনি, উপলব্ধি ও সমাচার অনুসারেই বিভিন্ন প্রকার দ্বৈতাত্মক বস্তু আছে, বলিয়া অভিহিত হয় মাত্র। তাৎপর্য্য এই যে, উক্ত কারণেই উপলব্ধি ও সমাচার কখনই দ্বৈতবস্তুর অস্তিত্ব- সাধনের হেতু হইতে পারে না ॥ ১৫৯ ॥ ৪৪

জাত্যাভাসং চলাভাসং বস্তুভাসং তথৈব চ।

অজাচলমবস্থং বিজ্ঞানং শান্তমদ্বয়ম্ ॥ ১৬০ ॥ ৪৫

সরলার্থঃ

জাত্যাভাসং(অজাতি অপি জাতিবৎ প্রকাশমানং) চলাভাসং(সক্রিয়মিব), তথা এব বস্তুভাসং(বস্তুবদবভাসমানং) চ(অপি) বিজ্ঞানং[পরমার্থতঃ] অজাচলং(অজম্ অচলঞ্চ) অবস্তুত্বং(ঘটাদিবদ্ বস্তু-স্বভাবরহিতং),[অতএব] শান্তম্(নিব্বিশেষম্) অদ্বয়ম্[দ্বৈতরহিতমিত্যর্থঃ) ॥

এক বিজ্ঞানই জাতি, ক্রিয়া ও বিভিন্ন বস্তুরূপে প্রকাশ পাইয়া থাকে; প্রকৃত- পক্ষে সেই বিজ্ঞান জাতি, ক্রিয়া ও বস্তুধর্মরহিত, শান্ত ও অদ্বিতীয় ॥ ১৬০ ॥ ৪৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কিং পুনঃ পরমার্থসৎ বস্তু, যদাস্পদা জাত্যাদ্যসবুদ্ধয়ঃ, ইত্যাহ—অজাতি সৎ জাতিবৎ অবভাসত ইতি জাত্যাভাসম্; তদ্যথা দেবদত্তো জায়ত ইতি। চলাভাসং চলমিব আভাসত ইতি; যথা, স এব দেবদত্তো গচ্ছতীতি। বস্ত্বাভাসং, বস্তু দ্রব্যং ধৰ্ম্মি, তদ্বৎ অবভাসত ইতি বস্তুভাসম্; যথা, স এব দেবদত্তো গৌরো

২৪০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

দীর্ঘ ইতি। জায়তে দেবদত্তঃ স্পন্দতে দীর্ঘো গৌর ইত্যেবম্ অবভাসতে। পরমার্থতঃ তু অজম্ অচলম্ অবস্তুত্বম অদ্রব্যঞ্চ। কিং তৎ এবম্প্রকারম্? বিজ্ঞানং বিজ্ঞপ্তিঃ; জাত্যাদিরহিতত্ত্বাং শান্তম্ অতএব অদ্বয়ঞ্চ তদিত্যথঃ ॥ ১৬০ ॥ ৪৫

ভাষ্যানুবাদ

জন্মাদি অসৎপদার্থও যাহার আশ্রয়ে থাকিয়া প্রতীতির বিষয় থাকে, সেই পরমার্থ সত্য বস্তুটি কি? তাহা কথিত হইতেছে- অজাতি হইয়াও জাতিবিশিষ্টের ন্যায় প্রকাশ পাইয়া থাকে, এইজন্য জাত্যাভাস; উদাহরণ যথা,-‘দেবদত্তনামক কোন লোক জন্মিতেছে। চলাভাস;-যাহা চলের ন্যায়(সক্রিয়ের ন্যায়) প্রতিভাত হয়; উদাহরণ যথা,-‘সেই দেবদত্তই গমন করিতেছে’। বস্তুভাস,-বস্তু অর্থ-দ্রব্য, বা ধর্মী অর্থাৎ গুণাদি ধৰ্ম্ম যাহাকে আশ্রয় করিয়া থাকে; তাহার ন্যায় প্রকাশ পায় বলিয়া বস্তুভাস; উদাহরণ যেমন, ‘সেই দেবদত্তই গৌরবর্ণ ও দীর্ঘ।’ অর্থাৎ দেবদত্তই জন্মিতেছে, স্পন্দিত হইতেছে, দীর্ঘ ও গৌরবর্ণ, এই প্রকার প্রতিভাত হইয়া থাকে, প্রকৃতপক্ষে কিন্তু উহা অজ, অচল এবং বস্তুত্বশূন্য অদ্রব্য। এবংবিধ বস্তুটি কি? না-বিজ্ঞান অর্থাৎ জ্ঞানস্বরূপ, জাতি প্রভৃতি ধর্মরাহিত্য-- নিবন্ধন শান্ত, এবং শান্ত বলিয়াই অদ্বয় বা অদ্বিতীয় ॥ ১৬০ ॥ ৪৫

এবং ন জায়তে চিত্তমেবং ধৰ্ম্মা অজাঃ স্মৃতাঃ। এবমেব বিজানন্তো ন পতন্তি বিপর্য্যয়ে ॥ ১৬১ ॥ ৪৬

সরলার্থঃ

এবম্(উক্তেভ্যঃ হেতুভ্যঃ) চিত্তং(চিত্তকল্পিতং বস্তু)[তথা] এবং (যথোক্তেভ্যঃ হেতুভ্যঃ এব) ধৰ্ম্মাঃ(আত্মানঃ) অজাঃ(জন্মরহিতাঃ) স্মৃতাঃ [ব্রহ্মবিদ্ভিঃ কর্তৃভিঃ চিন্তিতাঃ উক্তা ইত্যর্থঃ]। এবম্(উক্তপ্রকারম্) এব (নিশ্চয়ে) বিজানন্তঃ(বিশেষেণ অবগচ্ছন্তঃ সন্তঃ) বিপর্যয়ে(ভ্রান্তৌ) ন পতন্তি (ন ভ্রান্তা ভবন্তি ইত্যর্থঃ) ॥

উক্তপ্রকার হেতু হইতে[জানা যায় যে,] চিত্ত অর্থাৎ চিত্তকল্পিত কিছুই-

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৪১.

জন্মে না, এবং ধর্মপদবাচ্য আত্মাও অজ বলিয়া কথিত হইয়াছে। যাঁহারা এইরূপই অবগত হন, তাঁহারা আর ভ্রমে পতিত হন না ॥ ১৬১ ॥ ৪৬

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

এবং যথোক্তেভ্যো হেতুভ্যো ন জায়তে চিত্তম্। এবং ধৰ্ম্মাঃ আত্মানঃ অজাঃ স্বতাঃ ব্রহ্মবিদ্ভিঃ। ধর্ম্মা ইতি বহুবচনম্ দেহে ভেদানুবিধায়িত্বাৎ অদ্বয়স্যৈব উপচারতঃ। এবমেব যথোক্তং বিজ্ঞানং জাত্যাদিরহিতম্, অদ্বয়ম্ আত্মতত্ত্বং বিজানন্তঃ ত্যক্তবাহ্যেষণাঃ পুনর্ন পতন্তি অবিদ্যাধ্বান্তসাগরে বিপর্যয়ে, ‘তত্র কো মোহঃ কঃ শোক একত্বমনুপশ্যত’ ইত্যাদিমন্ত্রবর্ণাৎ ॥ ১৬১ ॥ ৪৬

ভাষ্যানুবাদ

পূর্ব্বোক্ত হেতু হইতে[সিদ্ধ হয় যে,] চিত্ত জন্মে না, এই প্রকার ধৰ্ম্মপদবাচ্য আত্মাও ব্রহ্মবিদ্গণ কর্তৃক অজ বলিয়া চিন্তিত হইয়াছে। আত্মা অদ্বয়(এক) হইলেও, ভিন্ন ভিন্ন দেহে অনুগত থাকায় বহুত্বের উপচার বা আরোপ করিয়া ‘ধৰ্ম্ম’ শব্দের উত্তর বহুবচন প্রযুক্ত হইয়াছে। ঠিক এই প্রকার বিজ্ঞানকে অর্থাৎ জন্মাদিরহিত অদ্বিতীয় আত্মতত্ত্বকে জানিয়া যাঁহারা বাহ্য বস্তুর কামনা পরিত্যাগ করেন, তাঁহারা আর সাগর-সদৃশ অবিদ্যান্ধকার-রূপ বিপর্যয়ে(ভ্রমে) পতিত হন না। মন্ত্রে আছে, ‘একত্বদর্শীর সে অবস্থায় শোকই বা কি, আর মোহই বা কি?’ ॥ ১৬১ ॥ ৪৬

খজু-বক্রাদিকাভাসমলাতস্পন্দিতং যথা।

গ্রহণ-গ্রাহকভঙ্গং বিজ্ঞানস্পন্দিতং তথা ॥ ১৬২ ॥ ৪৭

সরলার্থঃ

অলাতস্পন্দিতং(উল্কাভ্রমণং) যথা(যদ্বৎ) ঋজুবক্রাদিকাভাসং(ঋজু- ভাবেন, বক্রভাবেন, আাদশব্দাৎ ভাবান্তরেণাপি আভাসমানং)[ভবতি]; বিজ্ঞানস্পন্দিতং(অবিদ্যাত্মক-বিজ্ঞানব্যাপারঃ)[অপি] তথা(তদ্বৎ এব) গ্রহণ-গ্রাহকাভাসং(গ্রহণাকারেণ, গ্রাহকাকারেণ চ বিষয়-বিষয়িরূপেণ আভাস- মানং)[ভবতি ইতিশেষঃ] ॥

১৬

২৪২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যাপনিষৎ

অলাতের(জ্বলৎকাষ্ঠখণ্ডের) পরিভ্রমণ যেরূপ সরল ও বক্রাদি নানাভাবে প্রকাশমান হয়, অবিদ্যাকৃত বিজ্ঞানস্পন্দনও গ্রহণাকারে(বিষয়াকারে) ও গ্রাহকাকারে(বিষয়িরূপে) প্রকাশিত হইয়া থাকে ॥ ১৬২ ॥ ৪৭

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যথোক্তং পরমার্থদর্শনং প্রপঞ্চয়িষ্যন্ আহ—যথা হি লোকে ঋজুবক্রাদি- প্রকারাভাসম্ অলাতস্পন্দিতম্ উল্কাচলনং, তথা গ্রহণ-গ্রাহকাভাসং বিষয়ি-বিষয়া- ভাসম্ ইত্যর্থঃ। কিং তৎ? বিজ্ঞানস্পন্দিতম্ স্পন্দিতমিব স্পন্দিতম্ অবিদ্যয়া; ন হি অচলস্য বিজ্ঞানস্য স্পন্দনমস্তি “অজাচলম্” ইতি হি উক্তম্ ॥ ১৬২ ॥ ৪৭

ভাষ্যানুবাদ

পূর্ব্বোক্ত পরমার্থজ্ঞানেরই বিস্তারার্থ বলিতেছেন—সংসারে অলাতস্পন্দিত অর্থাৎ উল্কাভ্রমণ যেরূপ সরল ও বক্রাদি নানাভাবে প্রকাশমান হইয়া থাকে, গ্রহণ-গ্রাহকাভাস অর্থাৎ বিষয়ী ও বিষয়া- কারে বিজ্ঞান-প্রকাশও ঠিক তদ্রূপ। সেই প্রকাশমান বস্তুটি কি? —বিজ্ঞানস্পন্দিত, অর্থাৎ[ প্রকৃতপক্ষে স্পন্দন না থাকিলেও] অবিদ্যা- বশে বিজ্ঞান যেন স্পন্দিতই হইয়া থাকে; কেননা, নিষ্ক্রিয় বিজ্ঞানের কখনই স্পন্দন নাই; পূর্ব্বেও[বিজ্ঞানকে] অজ ও অচল বলা হইয়াছে।[তাহাই ঐরূপ নানাকারে প্রতিভাত হয়]* ॥ ১৬২ ॥ ৪৭

অস্পন্দমানমলাতমনাভাসমজং যথা। অস্পন্দমানং বিজ্ঞানমনাভাসমজং তথা॥ ১৬৩॥ ৪৮

সরলার্থঃ

অস্পন্দমানম্(নিশ্চলম্) অলাতম্(উল্কাচক্রং) যথা অনাভাসম্(ঋজু- বক্রাদিভাবেন অপ্রকাশমানম্) অজং[চ][ভবতি], তথা অস্পন্দমানং বিজ্ঞানম্ [অপি] অনাভাসম্(বিষয়াকার-নির্ভাসরহিতম্) অজং(জন্মরহিতং চ) [ভবতি] ॥

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৪৩

নিস্পন্দ অলাত যেমন ঋজুবক্রাদিভাবে প্রকাশ কিংবা জন্ম লাভ করে না; অস্পন্দমান অর্থাৎ স্বরূপাবস্থ বিজ্ঞানও তেমনি বিষয়াকারে প্রতিভাত কিংবা জন্ম লাভ করে না ৷৷ ১৬৩ ৷৷ ৪৮

শঙ্কর-ভাষ্যম্

অস্পন্দমানং স্পন্দনবর্জিতং তদেব অলাতম্ ঋজ্যাদ্যাকারেণ অজায়মানম্ অনাভাসম্ অজং যথা, তথা অবিদ্যয়া স্পন্দমানম্ অবিদ্যোপরমে অস্পন্দমানং জাত্যাদ্যাকারেণ অনাভাসম্ অজম্ অচলং ভবিষ্যতীত্যর্থঃ ॥ ১৬৩ ॥ ৪৮

ভাষ্যানুবাদ

সেই অলাতই অস্পন্দমান অর্থাৎ স্পন্দনরহিত হইলে যেমন ঋজু- বক্রাদিভাবে আর প্রতিভাসমান হয় না, অজই থাকে; অবিদ্যাবশে স্পন্দমান বিজ্ঞানও তেমনি অবিদ্যা-বিরামে অস্পন্দমান অর্থাৎ জাতি প্রভৃতি প্রকারভেদে অপ্রকাশমান, এবং অজ অর্থাৎ অচলভাবেই থাকিবে। ॥ ১৬৩ ॥ ৪৮

অলাতে স্পন্দমানে বৈ নাভাসা অন্যতোভুবঃ। ন ততোহন্যত্র নিস্পন্দান্নালাতং প্রবিশন্তি তে॥ ১৬৪॥৪৯

সরলার্থঃ

কিঞ্চ, অলাতে স্পন্দমানে(ভ্রাম্যতি সতি) আভাসাঃ(বক্রাদিরূপাঃ আকারাঃ) ন অন্যতোভুবঃ(অলাতভিন্নাৎ কারণাৎ ন ভবন্তি ইত্যর্থঃ) বৈ (নিশ্চয়ে);[স্পন্দবিরামে চ] তে(আভাসাঃ) নিস্পন্দাৎ(নিশ্চলাৎ) ততঃ (তস্মাৎ অলাতাৎ) অন্যত্র ন[গতাঃ]; নচ(নাপি) অলাতং প্রবিশন্তি ॥ আরও এক কথা, অলাত যখন ভ্রমণ করিতে থাকে, তখন ঋজুবক্রাদি আকারে আভাস-সমুদয় কখনই অলাত ভিন্ন অপর কারণ হইতে সমুৎপন্ন হয় না; হইলে একটি অচ্ছিন্ন অগ্নিরেখা দৃষ্ট হয়, অলাতের পরিভ্রমণের অবস্থানুসারে সেই অগ্নিরেখাটি কখনও সরল, কখনও বা বক্র দেখা যায়। এই প্রকার বিজ্ঞান একরূপ হইলেও, অজ্ঞানের পরিস্পন্দানুসারে জ্ঞান-জ্ঞেয়াদি ভাবে দৃষ্ট হইয়া থাকে।

২৪৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

স্পন্দন-বিরত হইলেও, তাহারা অন্যত্র চলিয়া যায় না, এবং অলাতমধ্যেও প্রবেশ করে না ॥ ১৬৪ ॥ ৪৯

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কিঞ্চ, তস্মিন্ এব অলাতে স্পন্দমানে ঋজুবক্রাদ্যাভাসা অলাতাৎ অন্যতঃ কুতশ্চিদ্ আগত্য অলাতে নৈব ভবন্তীতি নান্যতোভুবঃ। ন চ তস্মান্নিস্পন্দাৎ অলাতাদ্ অন্যত্র নির্গতাঃ। ন চ নিস্পন্দম্ অলাতমেব প্রবিশন্তি তে॥ ১৬৪ ॥ ৪৯

ভাষ্যানুবাদ

আরও এক কথা, সেই অলাতই যখন স্পন্দমান হইতে থাকে, তখন সেই ঋজুবক্রাদিভাবে বিস্ফুরণগুলি অলাত ভিন্ন অপর কোনও কারণ হইতে যে আসিয়া প্রাদুর্ভূত হয়, তাহা নহে; এই জন্যই উহারা ‘অন্যতোভূ’ নহে। আর সেই নিস্পন্দ অলাত হইতে অন্যত্রও যে নির্গত হয়, তাহাও নহে; এবং সেই আভাস সমুদয় নিস্পন্দ অলাতেই যে প্রবেশ করিয়া থাকে, তাহাও নহে ॥ ১৬৪ ॥ ৪৯

ন নির্গতা অলাতাত্তে দ্রব্যত্বাভাবযোগতঃ।

বিজ্ঞানেহপি তথৈব সুরাভাসস্যাবিশেষতঃ ॥ ১৬৫ ॥ ৫০

সরলার্থঃ

তে(আভাসাঃ) দ্রব্যত্বাভাবযোগতঃ(দ্রব্যত্বাভাবযুক্তেঃ, অবস্তুত্বাদিত্যর্থঃ) অলাতাৎ ন নির্গতাঃ(ন নিঃসৃতাঃ);[বস্তুন এব প্রবেশনির্গমাদি ব্যবহারঃ সম্ভবতি, ন অবস্তুন ইত্যাশয়ঃ]। আভাসস্য(আভাসমানত’য়াঃ) অবিশেষতঃ (অবিশেষাৎ তুল্যত্বাৎ) বিজ্ঞানে(চিত্তবিজ্ঞানে) অপি[জন্মাদ্যাভাসাঃ] তথা (তদ্বৎ) এব(নিশ্চয়ে) স্যুঃ(ভবেয়ুঃ)[জন্মাদ্যাভাসাঃ অলাতচক্রভ্রান্তিবৎ বিজ্ঞানমাত্রনিষ্ঠাঃ অবস্তুভূতাঃ ইত্যাশয়ঃ] ॥

অলাতচক্রে প্রতীত সেই ঋজু বক্রাদি ভাবসমূহ যখন অবস্তু—মিথ্যা, তখন তাহারা অলাত হইতে উৎপন্ন হইতে পারে না; বুদ্ধি-পরিকল্পিত জন্মাদি আভাসও ঠিক তদ্রূপই; উভয়ের মধ্যে কিছুমাত্র বিশেষ নাই। জন্মাদি ভাবগুলি প্রকৃতপক্ষে না থাকিলেও ঐরূপে জ্ঞান হয় মাত্র; এইজন্য ঐগুলিকে আভাস বলা হয় ॥.৬৫ ॥ ৫০

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৪৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কিঞ্চ, ন নির্গতা অলাতাং তে আভাসাঃ গৃহাদিব, দ্রব্যত্বাভাবযোগতঃ, দ্রব্যস্য ভাবো দ্রব্যত্বং, তদভাবো দ্রব্যত্বাভাবঃ, দ্রব্যত্বাভাবযোগতো দ্রব্যত্বা ভাবযুক্তেঃ বস্তুত্বাভাবাদিতার্থঃ। বস্তুনো হি প্রবেশাদি সম্ভবতি, ন অবস্তুনঃ। বিজ্ঞানেহপি জাত্যাদ্যাভাসাঃ তথৈব স্যুঃ আভাসস্যাবিশেষতঃ তুল্যত্বাৎ॥ ১৬৫৷ ৫০

ভাষ্যানুবাদ

অপিচ, সেই আভাস সমুদয়(ঋজুবক্রাদি ভাবসমূহ) গৃহের ন্যায় সেই অলাত হইতে বহির্গত হয় না, দ্রব্যত্বাভাবই ইহার কারণ। দ্রব্যের যাহা ভাব বা ধৰ্ম্ম, তাহাই দ্রব্যত্ব, তাহার অভাব—দ্রব্যত্বাভাব; [সুতরাং]—“দ্রব্যত্বাভাবযোগতঃ” কথার অর্থ হইতেছে—দ্রব্যত্বা- ভাবযুক্তিহেতু, অর্থাৎ বস্তুত্বের অভাবই ঐ বিষয়ে প্রধান যুক্তি; কেননা, কোথাও প্রবেশ কিংবা কোথা হইতে নির্গত হওয়া বস্তুর পক্ষেই সম্ভব হয়, কিন্তু অবস্তুর পক্ষে কখনই সম্ভব হয় না। আরও এক কথা, বিজ্ঞানেও যে জন্মাদি ভাবের প্রতীতি, তাহাও ঠিক ঐরূপই; কেননা, উভয় স্থলেই আভাসাংশে কিছুমাত্র বিশেষ নাই, অর্থাৎ আভাসভাবটি উভয় স্থলেই তুল্য ॥ ১৬৫ ॥ ৫০

বিজ্ঞানে স্পন্দমানে বৈ নাভাসা অন্যতোভুবঃ।

ন ততোহন্যত্র নিস্পন্দান্ন বিজ্ঞানং বিশন্তি তে ॥ ১৬৬ ॥ ৫১

সরলার্থঃ

বিজ্ঞানে স্পন্দমানে সতি বৈ(নিশ্চয়ে) আভাসাঃ(জন্মাদিবুদ্ধয়ঃ) অন্যতো- ভুবঃ(কারণান্তরোৎপন্নাঃ) ন[ভবন্তি]। নিস্পন্দাৎ(নির্ব্যাপারাৎ) ততঃ (বিজ্ঞানাৎ) অন্যত্র ন[স্থিতাঃ], তে(আভাসাঃ) বিজ্ঞানং(বিজ্ঞানে) ন বিশন্তি(ন লীয়ন্তে),[তেষাম্ অবস্তুত্বাদিতি ভাবঃ]।

বুদ্ধিবিজ্ঞান স্পন্দমান বা সব্যাপার হইলেই যখন আভাস প্রকাশ পাইয়া থাকে, তখন তাহারা জ্ঞানাতিরিক্ত কোন কারণ হইতেই সমুৎপন্ন হয় না। আবার

২৪৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

বিজ্ঞানের ক্রিয়া বিরত হইলে পর, অন্য কাহাকেও আশ্রয় করে না, কিংবা সেই বিজ্ঞানেও লয় প্রাপ্ত হয় না; কারণ, উহা অবস্তু-মিথ্যা ॥ ১৬৬ ॥ ৫১

ন নির্গতান্তে বিজ্ঞানাৎ দ্রব্যত্বাভাবযোগতঃ। কার্য্য-কারণতাভাবাদ্ যতোহচিন্ত্যাঃ সদৈব তে॥ ১৬৭॥ ৫২.

সরলার্থঃ

তে(জন্মাদ্যাভাসাঃ) দ্রব্যত্বাভাবযোগতঃ(অবস্তুত্বাৎ হেতোঃ) বিজ্ঞানাৎ ন নির্গতাঃ(নিঃসৃতাঃ), যতঃ(হেতোঃ) তে(আভাসাঃ) কার্য্য কারণতাভাবাৎ (জন্য-জনকভাবস্য অসম্ভবাৎ) সদা এব অচিন্ত্যাঃ(চিন্তয়িতুমপি অশক্যাঃ)। [বিজ্ঞানাভাসয়োঃ কার্য্য-কারণভাবানুপপত্তেঃ, প্রত ক্ষমুপলব্ধেশ্চ অচিন্ত্যত্বং যুক্ত- মেব তয়োরিতিভাবঃ]।

উক্ত আভাসসমূহ যখন কোন বস্তুই নহে, তখন তাহারা বিজ্ঞান হইতে নির্গত হইতেই পারে না, কেননা, বিজ্ঞান ও আভাসের মধ্যে কার্য্যকারণভাব অনুপপন্ন হওয়ায় সেই আভাস সমুদয় সর্ব্বদাই অচিন্তনীয় ॥ ১৬৭ ॥ ৫২

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কথং তুল্যত্বমিত্যাহ—অলাতেন সমানং সর্ব্বং বিজ্ঞানস্য সদা অচলত্বন্তু বিজ্ঞানস্য বিশেষঃ। জাত্যাদ্যাভাসা বিজ্ঞানে অচলে কিংকৃতাঃ? ইত্যাহ—কার্য্য- কারণতাভাবাৎ জন্যজনকত্বানুপপত্তেঃ অভাবরূপত্বাৎ অচিন্ত্যাঃ তে যতঃ সদৈব। যথা অসৎসু ঋজ্বাদ্যাভাসেষু ঋজাদিবুদ্ধিঃ দৃষ্টা অলাতমাত্রে, তথা অসৎসু এব জাত্যা- দিষু বিজ্ঞানমাত্রে জাত্যাদিবুদ্ধিঃ মৃষৈবেতি সমুদায়ার্থঃ ॥ ১৬৬ ॥ ৫১—১৬৭ ॥ ৫২

ভাষ্যানুবাদ

আভাস-সমূহ অলাতচক্রতুল্য কি প্রকারে, তাহা বলিতেছেন— বিজ্ঞানের সমস্তই অলাতের তুল্য বা অনুরূপ, বিজ্ঞান স্বরূপতঃ সর্বদাই অচল বা নির্ব্যাপার; এইমাত্র কিঞ্চিৎ বিশেষ। বিজ্ঞান যখন নিস্পন্দ হয়, তখন জন্মাদি আভাসসমূহ কোথা হইতে জন্মে, তাহা বলিতেছেন—উহাদের মধ্যে যখন কার্য্য-কারণভাব, অর্থাৎ বিজ্ঞান জনক, আর আভাস তাহার জন্য বা ফল, ইহা যখন উপপন্ন

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৪৭

হইতেছে না; তখন আভাসসমূহ অভাবাত্মকই(মিথ্যাই বটে)। যেহেতু সেই আভাসসমূহ সর্বদাই অচিন্ত্য অর্থাৎ চিন্তা দ্বারা উহাদের তত্ত্বনিরূপণ করা যায় না, ঋজুপ্রভৃতি ভাব বিদ্যমান না থাকিলেও যেমন শুধু অলাতেই ঋজুবক্রাদি ভাবসমূহ পরিদৃষ্ট হইয়া থাকে, তেমনি প্রকৃত পক্ষে জন্মাদি ধৰ্ম্ম না থাকিলেও কেবল বিজ্ঞানেই মিথ্যা জন্মাদি বুদ্ধি সমুৎপন্ন হইয়া থাকে। ইহাই উক্ত শ্লোকদ্বয়ের অর্থ ॥ ১৬৬ ॥ ৫১—১৬৭ ॥ ৫২

দ্রব্যং দ্রব্যস্য হেতুঃ স্যাদন্যদন্যস্য চৈব হি। দ্রব্যত্বমন্য ভাবো বা ধর্ম্মাণাং নোপপদ্যতে ॥ ১৬৮ ॥ ৫৩

সরলার্থঃ

দ্রব্যং দ্রব্যস্য হেতুঃ(কারণং) স্যাৎ, অন্যৎ(অদ্রব্যম্ অবস্তু) চ অন্যস্য (অবস্তুনঃ) এব হেতুঃ হি স্যাৎ। ধর্ম্মাণাং(আত্মবিজ্ঞানানাং)[পুনঃ] দ্রব্যত্বম্ অন্যভাবঃ(অন্যত্বম্ অদ্রব্যত্বং) চ ন উপপদ্যতে(সংগচ্ছতে)।

এক দ্রব্যই অপর দ্রব্যের হেতু হইতে পারে, এবং অপরই(অদ্রব্যই) দ্রব্যেতর পদার্থের হেতু হইতে পারে। কিন্তু কোন আত্মারই দ্রব্যত্ব বা অদ্রব্যত্ব ধৰ্ম্ম কখনই সম্ভবপর হয় না ৷ ১৬৮ ॥ ৫৩

শঙ্কর-ভাষ্যম্

অজমেকম্ আত্মতত্ত্বমিতি স্থিতম্। তত্র যৈরপি কার্য্যকারণভাবঃ কল্প্যতে, তেষাং দ্রব্যং দ্রব্যস্য, অন্যস্য অন্যদ্ধেতুঃ কারণং স্যাৎ, ন তু তস্যৈব তৎ। নাপি অদ্রব্যং কস্যচিৎ কারণং স্বতন্ত্রং দৃষ্টং লোকে। ন চ দ্রব্যত্বং ধর্মাণাম্ আত্মনাম্ উপপদ্যতে, অন্যত্বং বা কুতশ্চিৎ; যেন অন্যস্য কারণত্বং কার্য্যত্বং বা প্রতিপদ্যেত। অতঃ অদ্রব্যত্বাৎ ‘অনন্যত্বাচ্চ ন কস্যচিৎ কার্য্যং কারণং বা আত্মা ইত্যর্থঃ ॥ ১৬৮৷ ৬৩

ভাষ্যানুবাদ

আত্মতত্ত্ব যে এক ও অজ, ইহা অবধারিত হইয়াছে, যাহারা তন্মধ্যেও কার্য্য-কারণভাব পরিকল্পনা করিয়া থাকে, তাহাদের মতেও:

২৪৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

দ্রব্যই দ্রব্যের এবং অপর পদার্থই অপর পদার্থের হেতু হইয়া থাকে; কিন্তু নিজেই নিজের হেতু নহে। আর জগতে অদ্রব্য পদার্থকেও স্বতন্ত্র বা স্বাধীন ভাবে অপর কাহারো কারণতা লাভ করিতে দেখা যায় না। আর ধৰ্ম্মপদবাচ্য আত্মসমূহের যে, কোন কারণে দ্রব্যত্ব বা অদ্রব্যত্ব উৎপন্ন হইতে পারে, তাহাও নহে; যাহার ফলে আত্মা অপরের কার্য্য বা কারণভাব প্রাপ্ত হইতে পারে। অতএব, আত্মা যখন দ্রব্য কিংবা অদ্রব্য কিছুই নহে, তখন উহা কাহারো কার্য্য বা কারণ হইতে পারে না ॥ ১৬৮ ॥ ৫৩

এবং ন চিত্তজা ধর্ম্মাশ্চিত্তং বাপি ন ধর্ম্মজম্।

এবং হেতুফলাজাতিং প্রবিশন্তি মনীষিণঃ॥ ১৬৯॥ ৫৪

সরলার্থঃ

এবম্(উক্তেভ্যঃ হেতুভ্যঃ) ধৰ্ম্মাঃ(বাহ্যধৰ্ম্মাঃ) চিত্তজাঃ(জ্ঞানস্বরূপাৎ চিত্তাৎ সমুৎপন্নাঃ) ন, চিত্তং বা অপি ধৰ্ম্মজং(বাহ্যপদার্থজাতং) ন। মনীষিণঃ (জ্ঞানিনঃ) এবং(যথোক্তহেতুভ্যঃ) হেতুফলাজাতিৎ(হেতোঃ)[তৎকার্য্যস্য চ] ফলস্য অজাতিং(জন্মাভাবং) প্রবিশন্তি(অধ্যবস্যন্তি)।

এই প্রকারে[জানা যায় যে], বাহ্য জাগতিক অবস্থাসমূহ(আত্মস্বরূপ) চিত্তজাত নহে, এবং চিত্তও কখন সেই বাহ্য-ধৰ্ম্ম হইতে সমুৎপন্ন নহে। মনীষি- গণ(ব্রহ্মবিদ্গণ) এই প্রকারেই হেতু ও কার্য্যের জন্মাভাব অধ্যবসায় বা অবধারণ করিয়া থাকেন ॥ ১৬৯ ॥ ২৪

শঙ্কর-ভাষ্যম্

এবং যথোক্তেভ্যঃ হেতুভ্যঃ আত্মবিজ্ঞানস্বরূপম্ এব চিত্তমিতি, ন চিত্তজা বাহ্যধৰ্ম্মাঃ, নাপি বাহ্যধৰ্ম্মজং চিত্তম্, বিজ্ঞানস্বরূপাভাসমাত্রত্বাৎ সর্ব্বধৰ্ম্মাণাম্। এবং ন হেতোঃ ফলং জায়তে, নাপি ফলাৎ হেতুঃ, ইতি হেতু-ফলয়োঃ অজাতিং হেতু- ফলাজাতিং প্রবিশন্তি অধ্যবস্যন্তি। আত্মনি হেতু-ফলয়োঃ অভাবমেব প্রতি- পদ্যন্তে ব্রহ্মবিদ্ ইত্যর্থঃ ॥ ১৬৯ ॥ ৫৪

ভাষ্যানুবাদ

উক্তপ্রকার হেতুনিচয় হইতে জানা যায় যে, চিত্ত পদার্থটি

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৪৯

আত্মজ্ঞানস্বরূপ; বাহ্যধৰ্ম্মসমূহ চিত্তজাত নহে, এবং চিত্তও বাহ্য- ধর্ম্মজাত নহে; কেননা, সমস্ত ধৰ্ম্ম বা অবস্থা জ্ঞানেরই পরিস্ফুরণ মাত্র। এই কারণেই হেতু হইতে ফল(কার্য্য) জন্মে না, এবং ফল হইতেও হেতু জন্মে না।[মনীষিগণ] এই প্রকারে হেতু ও ফলের অজাতি অর্থাৎ হেতু ও ফলের জন্মাভাব নিশ্চয়(অবধারণ) করিয়া থাকেন, অর্থাৎ ব্রহ্মবিদ্গণ আত্মাতে হেতু ও ফলের অভাবই বুঝিয়া থাকেন ॥ ১৬৯ ॥ ৫৪

যাবদেতু-ফলাবেশস্তাবদেতু-ফলোদ্ভবঃ।

ক্ষীণে হেতু-ফলাবেশে নাস্তি হেতু-ফলোদ্ভবঃ ॥ ১৭০ ॥ ৫৫

সরলার্থঃ

যাবৎ(যাবৎকালপর্য্যন্তং) হেতুফলাবেশঃ(হেতৌ তৎফলে চ আবেশঃ আগ্রহঃ স্যাৎ), তাবৎ হেতুফলোদ্ভবঃ(হেতোঃ ফলস্য কার্য্যস্য) চ উদ্ভবঃ (প্রতীতিঃ)[স্যাৎ]। হেতুফলাবেশে ক্ষীণে সতি হেতু-ফলোদ্ভবঃ(কার্য্য-কারণ- ভাবঃ)[অপি] ন[ভবতি ইতি শেষঃ]।

যতক্ষণ কার্য্য-কারণ-ভাবে লোকের আগ্রহ থাকে, ততক্ষণই কার্য্য-কারণ- ভাব প্রকাশ পায়; কিন্তু সেই হেতু-ফলভাবের চিন্তা ক্ষয়প্রাপ্ত হইলে, হেতু-ফল- ভাব আর স্ফূর্ত্তি পায় না ॥ ১৭০ ॥ ৫৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যে পুনঃ হেতু-ফলয়োঃ অভিনিবিষ্টাঃ, তেষাং কিং স্যাদিতি, উচ্যতে—ধৰ্ম্মা- ধৰ্ম্মাখ্যস্য হেতোঃ ‘অহং কর্তা, মম ধৰ্ম্মাধর্ম্মো, তৎফলং কালান্তরে ক্বচিৎ প্রাণি- নিকায়ে জাতো ভোক্ষ্যে’ ইতি যাবৎ হেতুফলয়োঃ আবেশো হেতুফলাগ্রহ আত্মনি অধ্যারোপণং, তচ্চিত্ততা ইত্যর্থঃ। তাবৎ হেতুফলয়োঃ উদ্ভবঃ—ধৰ্ম্মাধর্ময়োঃ তৎফলস্য চ অনুচ্ছেদেন প্রবৃত্তিঃ ইত্যর্থঃ। যদা পুনঃ মন্ত্রৌষধিবীর্য্যেণেব গ্রহাবেশো যথোক্তাদ্বৈতদর্শনেন অবিদ্যোদ্ভূত-হেতুফলাবেশঃ অপনীতো ভবতি, তদা তস্মিন্ ক্ষীণে নাস্তি হেতুফলোদ্ভবঃ ॥ ১৭০ ॥ ৫৫

ভাষ্যানুবাদ

যাহারা হেতুফলভাবে(কার্য্য-কারণভাব চিন্তায়) অভিনিবেশ-

২৫০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

সম্পন্ন, তাহাদের সম্বন্ধে কি হইবে? বলা হইতেছে—‘ধৰ্ম্ম ও অধৰ্ম্ম- নামক-ফল-হেতুর আমি কর্তা, ঐ ধৰ্ম্ম ও অধৰ্ম্ম আমারই, আমি অপর কোনও দেহে জন্ম লাভ করিয়া সময়ান্তরে তাহার ফল উপভোগ করিব,’ যে পর্য্যন্ত এইরূপে হেতুতে ও ফলে ‘অভিনিবেশ’ বা আগ্রহ অর্থাৎ আত্মাতে ঐ হেতু ও তৎফলের আরোপ বা তদ্‌-বিষয়ে একাগ্রতা থাকিবে, সেই পর্য্যন্তই হেতু-ফলোদ্ভব অর্থাৎ ধর্ম্ম, অধৰ্ম্ম ও তাহার ফলে নিরন্তর প্রবৃত্তি থাকিবে। কিন্তু যেমন মন্ত্র ও ঔষধ- শক্তি দ্বারা গ্রহাবেশ(দেবতা-বিশেষের আবেশ) নিবৃত্ত হয়, তেমনি উক্তপ্রকার অদ্বৈতাত্মদর্শনে অবিদ্যাকৃত হেতু-ফলাভিনিবেশ অপনীত; হইলে তাহার আর হেতু-ফলের চিন্তা থাকে না ॥ ১৭০ ॥ ৫৫

যাবদেতু-ফলাবেশঃ সংসারস্তাবদায়তঃ।

ক্ষীণে হেতুফলাবেশে সংসারং ন প্রপদ্যতে ॥ ১৭১ ॥ ৫৬

সরলার্থঃ

[পুংসাং] যাবৎ হেতু-ফলাবেশঃ(হেতৌ—কারণে, ফলে—তৎকার্য্যে চ আবেশঃ—অভিলাষঃ)[তিষ্ঠেৎ], তাবৎ(তৎকালপর্য্যন্তং) সংসারঃ(জন্ম- মরণ-সুখ-দুঃখাদিভোগরূপঃ) আয়তঃ(বিস্তৃতঃ)[ভবতি]। হেতুফলাবেশে (উক্তলক্ষণ-কার্য্য-কারণ-বিষয়কাগ্রহে) ক্ষীণে[সতি] সংসারং ন প্রপদ্যতে- (নৈব লভতে)[পুরুষ ইতি শেষঃ, মুচ্যতে ইত্যাশয়ঃ]।

জীবের যে পর্য্যন্ত হেতু ও ফল বিষয়ে অভিলাষ অব্যাহত থাকে, তৎকাল পর্য্যন্তই জন্ম-মরণাদি-প্রবাহরূপ এই সংসার বিস্তৃতি লাভ করিয়া থাকে; কিন্তু, কারণ ও তৎফলবিষয়ক আগ্রহ ক্ষয়প্রাপ্ত হইলে, জীব পুনরায় সংসার লাভ করে না ৷৷ ১৭১ ॥ ৫৬

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যদি হেতুফলোদ্ভবঃ, তদা কো দোষঃ ইতি, উচ্যতে—যাবৎ সম্যগ্দর্শনেন হেতুফলাবেশো ন নিবর্ত্ততে, অক্ষীণঃ সংসারঃ তাবদায়তো দীর্ঘো ভবতীত্যর্থঃ। ক্ষীণে পুনর্হেতুফলাবেশে সংসারং ন প্রপদ্যতে, কারণাভাবাৎ ॥ ১৭১ ॥ ৫৬

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৫১

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, যদি হেতু ও ফলের অর্থাৎ কারণের পর কার্য্য, আবার সেই কার্য্যের পর কারণ—এইপ্রকার কার্য্যকারণভাবের উপর অভিনিবেশই থাকে, তাহা হইলেই বা দোষ কি?[তদুত্তরে] বলা হইতেছে— যথার্থ তত্ত্বজ্ঞানপ্রভাবে যে পর্য্যন্ত কার্য্য-কারণবিষয়ে আগ্রহ নিবৃত্ত না হয়, ততকাল এই সংসার ক্ষীণ না হইয়া দীর্ঘতা বা বিস্তৃতি লাভ করিতে থাকে। কিন্তু হেতু ও ফলবিষয়ক অভিনিবেশ ক্ষয়প্রাপ্ত হইলে কারণের অভাবে(হেতু-ফলাভিনিবেশাত্মক কারণ বিনষ্ট হইলে) জীব আর সংসার প্রাপ্ত হয় না ॥ ১৭১ ॥ ৫৬

সংবৃত্যা জায়তে সর্ব্বং শাশ্বতং নাস্তি তেন বৈ। সদ্ভাবেন হ্যজং সর্ব্বমুচ্ছেদস্তেন নাস্তি বৈ ॥ ১৭২ ॥ ৫৭

সরলার্থঃ

সংবৃত্যা(ব্যবহারিকাজ্ঞানেন) সর্ব্বং(বস্তুজাতং) জায়তে(উৎপদ্যতে), তেন(হেতুনা) শাশ্বতং(অবিকারি)[বস্তু] ন অস্তি বৈ(অবধারণে), [পক্ষান্তরে চ] সর্ব্বং(জগৎ) হি(নিশ্চয়ে) সম্ভাবেন(পরমার্থসত্তয়া) অজং (জন্মরহিতং), তেন(হেতুনা) উচ্ছেদঃ(বিনাশঃ) বৈ(অপি) ন অস্তি, ন বিদ্যতে ইত্যর্থঃ।

সমস্ত পদার্থই অবিদ্যাবশে জন্মলাভ করিয়া থাকে; সুতরাং কোন বস্তুই শাশ্বত বা নিত্য নহে। আবার পরমার্থ-সত্য ব্রহ্মরূপে সমস্ত বস্তুই অজ—জন্ম- রহিত; সুতরাং সেইরূপে কাহারো উচ্ছেদ বা অত্যন্ত ধ্বংস হয় না॥ ১৭২॥ ৬৭

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ননু অজাৎ আত্মনঃ অন্যৎ নাস্ত্যেব; তৎ কথং হেতুফলয়োঃ সংসারস্য চোৎ- পত্তিবিনাশৌ উচ্যেতে ত্বয়া? শৃণু; সংবৃত্যা সংবরণং সংবৃতিঃ অবিদ্যাবিষয়ো লৌকিকব্যবহারঃ, তয়া সংবৃত্যা জায়তে সর্ব্বম্। তেন অবিদ্যাবিষয়ে শাশ্বতৎ নিত্যং নাস্তি বৈ। অত উৎপত্তিবিনাশলক্ষণ: সংসার আয়ত ইত্যুচ্যতে। পরমার্থ- সদ্ভাবেন তু অজং সর্ব্বমাত্মৈব যস্মাৎ; অতো জাত্যভাবাৎ উচ্ছেদঃ তেন নাস্তি বৈ কস্যচিৎ হেতুফলাদেঃ ইত্যর্থঃ ॥ ১৭২ ॥ ৫৭

-২৫২ কারিকোপেত মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, অজ আত্মা ভিন্ন যখন আর কিছুই নাই, তখন তুমি হেতু, ফল ও সংসারের উৎপত্তি ও বিনাশ বলিতেছ কি প্রকারে? [বলিতেছি] শ্রবণ কর; সংবৃতি অর্থ সংবরণ, অর্থাৎ অবিদ্যার বিষয়ীভূত লৌকিক ব্যবহার; সেই সংবৃতি দ্বারা সমস্ত বস্তুই জন্ম লাভ করিয়া থাকে; সেই হেতু অবিদ্যার অধিকার পর্যন্ত কোন বস্তুই শাশ্বত অর্থাৎ নিত্য নহে; এই কারণে উৎপত্তি-বিনাশাত্মক সংসার আয়ত হয় বলিয়া কথিত হইয়া থাকে। কিন্তু, পরমার্থসত্তা অনুসারে সমস্তই অজ আত্মস্বরূপ; সুতরাং, জন্মের অভাব জন্য হেতুফলাদি বস্তুরই উচ্ছেদ বা অত্যন্ত অভাব নাই ॥ ১৭২ ॥ ৫৭

ধর্ম্মা য ইতি জায়ন্তে জায়ন্তে তেন তত্ত্বতঃ।

জন্ম মাটোপমং তেষাং সা চ মায়া ন বিদ্যতে ॥ ১৭৩ ॥ ৫৮

সরলার্থঃ

যে ধৰ্ম্মাঃ(আত্মানঃ, অন্যে বা) জায়ন্তে ইতি[উচ্যন্তে], তে[অপি ধৰ্ম্মাঃ] তত্ত্বতঃ(পরমার্থতঃ) ন জায়ন্তে। তেষাং জন্ম(উৎপত্তিঃ), মায়োপমৎ(মায়া- সদৃশং), সা(মায়া) চ(মায়াপি) তত্ত্বতঃ(পরমার্থতঃ) ন বিদ্যতে।

ধৰ্ম্ম-পদ-বাচ্য যে সমস্ত আত্মা জন্মে বলিয়া কথিত হয়, প্রকৃতপক্ষে সে সমস্ত আত্মা জন্মে না; সে সমস্তের জন্ম কেবল মায়াসদৃশ, সেই মায়াও আবার প্রকৃতপক্ষে বিদ্যমান নাই—অসৎ॥ ১৭৩॥ ৫৮

শঙ্কর-ভাষ্যম্

যে অপি আত্মানঃ অন্যে চ ধৰ্ম্মা জায়তে ইতি কল্প্যন্তে তে, ইতি এবংপ্রকারা যথোক্তা সংবৃতিঃ নিৰ্দ্দিশ্যতে, ইতি সংবৃত্যৈব র্ম্মা জায়ন্তে; ন তে তত্ত্বতঃ পরমার্থতো জায়ন্তে। যৎ পুনঃ তৎসংবৃত্যা জন্ম তেষাং ধর্মানাং যথোক্তানাম্ যথা মায়রা জন্ম তথা তৎ মায়োপমং প্রত্যেতব্যম্। মায়া নাম বস্তু তহি? নৈবং; সা লচ মায়া ন বিদ্যতে। মায়া ইতি অবিদ্যমানস্য আখ্যা ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ১৭৩॥ ৫৮

ভাষ্যানুবাদ

যে সমস্ত আত্মা কিংবা অন্যান্য ধর্ম্ম জন্মে বলিয়া কল্পনা করা হয়;

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৫৩

অব্যবহিত পূর্ব্বে যে সংবৃতি উক্ত হইয়াছে, সেই উক্তপ্রকার সংবৃতিই ‘ইতি’ শব্দে নির্দিষ্ট হইতেছে; অর্থাৎ কেবল সংবৃতিবলেই উক্ত ধৰ্ম্মসমূহের জন্ম-ব্যবহার হইয়া থাকে, বস্তুতঃ সত্যসত্যই সে সমস্ত ধর্ম জন্মে না। আর পূর্ব্বোক্ত ধর্মসমূহের যে, সংবৃতিমূলক জন্ম, তাহাও মায়া দ্বারা যেরূপ জন্ম হয়, ঠিক তাহারই সদৃশ বলিয়া বুঝিতে হইবে। ভাল, তবে ত মায়াই বস্তুভূত; না,—এরূপ হইতে পারে না। কারণ, সেই মায়ারও কোন সত্তা নাই। অভি- প্রায় এই যে, অবিদ্যমান বা অসৎ পদার্থেরই নাম—‘মায়া’[সুতরাং তাহা বস্তুভূত নহে] ॥ ১৭৩ ॥ ৫৮

যথা মায়াময়াদ বীজাজ্জায়তে তন্ময়োহঙ্কুরঃ।

নাহসৌ নিত্যো ন চোচ্ছেদী তদ্বদ্ধর্ম্মেষু যোজনা ॥ ১৭৪ ॥ ৫৯

সরলার্থঃ

যথা মায়াময়াৎ(পরমার্থতঃ অসদ্রূপাৎ আম্রাদিবীজাৎ) তন্ময়ঃ(মায়াময়ঃ) [এব] অঙ্কুরঃ জায়তে(উৎপদ্যতে), অসৌ(অঙ্কুরঃ) ন নিত্যঃ ন চ(নাপি) উচ্ছেদী(বিনাশী)। তদ্বৎ(তথৈব) ধর্ম্মেষু(আত্মসু অপি) যোজনা (জন্মাদিচিন্তা)[কর্ত্তব্যা ইতি শেষঃ]।

মায়াময় আম্রাদি বীজ হইতে যেরূপ অঙ্কুর উৎপন্ন হইয়া থাকে, অথচ সেই অঙ্কুর নিত্যও নহে, কিংবা উচ্ছেদশীল অর্থাৎ বিনাশশীলও নহে; ধৰ্ম্মপদ-বাচ্য আত্মাতে জন্মনাশাদি সম্বন্ধও ঠিক তদ্রূপ ॥ ১৭৪ ॥ ৫৯

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কথং মায়োপমং তেষাং ধর্মাণাং জন্ম? ইত্যাহ—যথা মায়াময়াৎ আম্রাদি- বীজাৎ জায়তে তন্ময়ো মায়াময়ঃ অঙ্কুরঃ, নাসৌ অঙ্কুরো নিত্যঃ, ন চোচ্ছেদী বিনাশী বা। অভূতত্বাৎ এব ধর্ম্মেষু জন্মনাশাদিযোজনা-যুক্তিঃ, ন তু পরমার্থতো ধর্মাণাং জন্ম নাশো বা যুজ্যতে ইত্যর্থঃ ॥ ১৭৪ ॥ ৫৯

ভাষ্যানুবাদ

সেই সমস্ত ধর্ম্মের জন্ম মায়াময় কি প্রকারে? তদুত্তরে বলিতেছেন—মায়াময়(অসত্য) আম্রাদি বীজ হইতে যেরূপ

২৫৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

তদনুরূপ অর্থাৎ মায়াময় অঙ্কুর জন্ম লাভ করে; কিন্তু এই অঙ্কুর নিত্য নহে, ‘এবং উচ্ছেদী অর্থাৎ বিনাশশীলও নহে’। ধৰ্ম্ম-সমুদয় যখন অভূত বা অনুৎপন্ন, তখন সেই অভূতত্ত্ব নিবন্ধনই তৎসমুদয়ের জন্ম- নাশাদির যোজনা অর্থাৎ যোগ হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ধর্মসমূহের জন্ম বা বিনাশ কিছুই যুক্তিসিদ্ধ হয় না ॥ ১৭৪ ॥ ৫৯

নাজেষু সর্ব্বধর্ম্মেষু শাশ্বতাশাশ্বতাভিধা।

যত্র বর্ণা ন বর্ত্তন্তে বিবেকস্তত্র নোচ্যতে ॥ ১৭৫ ॥ ৬০

সরলার্থঃ

অজেষু(স্বভাবতঃ জন্মরহিতেষু) সর্ব্বধর্ম্মেযু(সর্ব্বেযু আত্মসু) শাশ্বতা- শাশ্বতাভিধা(শাশ্বতঃ—নিত্যঃ, অশাশ্বতঃ—অনিতাঃ ইতি অভিধানং) ন প্রবর্ত্ততে (ইতি শেষঃ)।[বর্ণান্তে, অর্থাঃ যৈঃ, তে] বর্ণাঃ শব্দাঃ যত্র(আত্মনি) ন বর্ত্তন্তে(ন প্রবর্ত্তন্তে), তত্র(আত্মনি বিষয়ে) বিবেকঃ(ইদম্ ইথমেব স্বরূপাব- ধারণং) ন উচ্যতে(ন কথ্যতে), “নৈব বাচা ন মনসা দ্রষ্টুং শক্যং ন চক্ষুষা” ইত্যাদি শ্রুতেঃ।

সমস্ত আত্মাই অজ(জন্মরহিত), সুতরাং তাহাদের সম্বন্ধে শাশ্বত বা অশাশ্বত(নিত্যানিত্য) শব্দ প্রযোজ্য নহে। যেখানে কোন শব্দই অভিধায়ক (বাচক) হয় না, তাহার স্বরূপত বিবেক বা নিত্যানিত্যাদি-বিভাগও নির্দেশ করা যায় না ॥ ১৭৫ ॥ ৬০

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

পরমার্থতঃ তু আত্মসু অজেষু নিত্যৈকরসবিজ্ঞপ্তিমাত্রসত্তাকেষু শাশ্বতঃ অশাশ্বত ইতি বা ন অভিধা, ন অভিধানং প্রবর্ত্তত ইত্যর্থঃ। যত্র যেষু, বর্ণ্যন্তে যৈঃ অর্থাঃ তে বর্ণাঃ শব্দা ন বর্ত্তন্তে—অভিধাতুং প্রকাশয়িতুং ন প্রবর্ত্তন্তে ইত্যর্থঃ। ইদম্ এব ইতি বিবেকো বিবিক্ততা তত্র নিত্যঃ অনিত্যঃ ইতি ন উচ্যতে, “যতো বাচো নিবর্ত্তন্তে” ইতি শ্রুতেঃ ॥ ১৭৫ ॥ ৬০

ভাষ্যানুবাদ

প্রকৃতপক্ষে কিন্তু আত্মা অজ নিত্য একমাত্র জ্ঞানস্বরূপ; সুতরাং সেই অজ আত্মাতে ‘শাশ্বত’(নিত্য) বা ‘অশাশ্বত’(অনিত্য)

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৫৫

ইত্যাদি অভিধান অর্থাৎ নাম বা শব্দ প্রবৃত্ত হয় না;(কোন শব্দ দ্বারা তাহাকে প্রকাশ করা যায় না)। বস্তুসমূহ যাহা দ্বারা বর্ণন করা যায়, তাহার নাম বর্ণ অর্থাৎ বস্তুবাচক শব্দ; সেই বর্ণসমূহ অর্থাৎ শব্দসমূহ যাহার বিষয়ে প্রবৃত্ত হয় না; অর্থাৎ তাহাকে বলিতে অর্থাৎ প্রকাশ করিতে প্রবৃত্ত বা সচেষ্ট হয় না। ‘ইহা এইপ্রকারই’ এবংবিধ ভাবে তাহার বিবেক অর্থাৎ নিত্য বা অনিত্য বলিয়া পৃথক্ করিয়া নির্দেশ করা যায় না। কেননা, শ্রুতি বলিয়াছেন-বাক্যসমূহ যাঁহার নিকট হইতে নিবৃত্ত হয় বা ফিরিয়া আইসে ॥ ১৭৫ ॥ ৬০

যথা স্বপ্নে দ্বয়াভাসং চিত্তং চলতি মায়য়া।

তথা জাগ্রদ্বয়াভাসং চিত্তং চলতি মায়য়া ॥ ১৭৬ ॥ ৬১

সরলার্থঃ

স্বপ্নে(স্বপ্নাবস্থায়াং) চিত্তম্(অন্তঃকরণং) যথা মায়য়া(অবিদ্যাবশাৎ) দ্বয়াভাসং(দ্বৈতাভাবেহপি দ্বৈতাকারেণ প্রতিভাসমানং সৎ) চলতি(স্পন্দতে, সব্যাপারং ভবতি), তথা জাগ্রৎ(জাগ্রতি অপি) চিত্তং মায়য়া দ্বয়াভাসং সৎ চলতি(স্পন্দতে)।

স্বপ্নাবস্থায় যেরূপ দ্বৈত না থাকিলেও চিত্তই সংস্কারবলে দ্বৈতাকারে প্রতি- ভাসমান হইয়া স্পন্দমান হয়(নানাবিধ কার্য্য করিয়া থাকে) তদ্রূপ জাগ্রৎ- কালেও চিত্তই মায়াবশতঃ দ্বৈতাকারে প্রকাশ পাইয়া নানাবিধ ক্রিয়া সম্পাদন করিয়া থাকে ॥ ১৭৬ ॥ ৬১

অদ্বয়ঞ্চ দ্বয়াভাসং চিত্তং স্বপ্নে ন সংশয়ঃ।

অদ্বয়ঞ্চ দ্বয়াভাসং তথা জাগ্রন্ন সংশয়ঃ ॥ ১৭৭ ॥ ৬২

সরলার্থঃ

স্বপ্নে অদ্বয়ং(দ্বৈতরহিতং) চ(অপি) চিত্তং দ্বয়াভাসং(দ্বয়াকারেণ আভাসতে প্রকাশতে ইতি দ্বয়াভাসং)[ভবতি, ইত্যত্র] সংশয়ঃ ন[অস্তি ইতি শেষঃ]। তথা অদ্বয়ং জাগ্রৎ(জাগ্রদবস্থা) চ(অপি) দ্বয়াভাসং[ভবতি, অত্র] সংশয়ঃ ন[অস্তি, ইতি শেষঃ]।

২৫৬ কারিকোপেত মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

স্বপ্নসময়ে অদ্বয় চিত্তই যে দ্বৈতাকারে প্রকাশ পাইয়া থাকে, তদ্বিষয়ে সংশয় নাই; তদ্রূপ জাগ্রৎ অবস্থাও যে অদ্বয় হইয়াও দ্বৈতাকারে প্রকাশ পায়, ইহাতে সংশয় নাই ॥ ১৭৭ ॥ ৬২

শঙ্কর-ভ।শ্যম্

যৎ পুনর্ব্বাগোচরত্বং পরমার্থতঃ অদ্বয়স্য বিজ্ঞানমাত্রস্য, তৎ মনসঃ স্পন্দন-- মাত্রং, ন পরমার্থত ইত্যুক্তার্থে শ্লোকো ॥ ১৭৬ ॥ ৬১—১৭৭ ॥ ৬২

ভাষ্যানুবাদ

তথাপি যে, প্রকৃত অদ্বয় ও বিজ্ঞানমাত্রস্বরূপ আত্মার বাক্য- বিষয়তা হইয়া থাকে, তাহা কেবল মনের স্পন্দন মাত্র(মানসিক চিন্তা মাত্র), কিন্তু তাহা প্রকৃত নহে। এই দুই শ্লোকের অর্থ পূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে ॥ ১৭৬ ॥ ৬১—১৭৭ ॥ ৬২

স্বপ্নদৃক্ প্রচরন্ স্বপ্নে দিক্ষু বৈ দশসু স্থিতান্। অণ্ডজান্ স্বেদজান্ বাপি জীবান্ পশ্যতি যান্ সদা ॥ ১৭৮ ॥ ৬৩

সরলার্থঃ

স্বপ্নদৃক্(স্বপ্নদর্শী জনঃ) স্বপ্নে বৈ দশসু দিক্ষু স্থিতান্ যান্ অণ্ডজান্ (অণ্ডেভ্যো জাতান্ পক্ষিপ্রভৃতীন্) স্বেদজান্(স্বেদেভ্যো জাতান্ যুক-মশকা- দীন্) জীবান্(প্রাণিভেদান্) সদা পশ্যতি।

স্বপ্নদর্শী পুরুষ স্বপ্নাবস্থায় পর্যটন করিতে করিতে দশদিক্স্থিত, অণ্ডজ, স্বেদজ- প্রভৃতি যে সমস্ত জীবকে সর্ব্বদা দর্শন করিয়া থাকে ॥ ১৭৮ ॥ ৬৩

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ইতশ্চ বাগ্‌গোচরস্য অভাবো দ্বৈতস্য—স্বপ্নান্ পশ্যতীতি স্বপ্নদৃক্ প্রচরন্ পর্য্যটন্ স্বপ্নে স্বপ্নস্থানে দিক্ষু বৈ দশসু স্থিতান্ বর্তমানান্ জীবান্ প্রাণিনঃ অণ্ডজান্ স্বেদজান্ বা যান্ সদা পশ্যতীতি ॥. ৭৮ ॥ ৬৩

ভাষ্যানুবাদ

এই কারণেও শব্দগোচর দ্বৈতের(জগতের) অভাব[বুঝিতে হইবে],—স্বপ্নদৃক্ অর্থ—যে লোক স্বপ্ন দর্শন করিয়া থাকে; সেই

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৫৭

স্বপ্নদৃক্ পুরুষ স্বপ্নে অর্থাৎ স্বপ্নাবস্থায় প্রচরণ অর্থাৎ পর্যটন করিতে করিতে দশ দিকে অবস্থিত—বর্ত্তমান অণ্ডজ কিংবা স্বেদজ যে সমস্ত জীবকে—প্রাণীকে সর্ব্বদা দর্শন করিয়া থাকে,—॥ ১৭৮ ॥ ৬৩

স্বপ্নদৃক্-চিত্তদৃশ্যাস্তে ন বিদ্যন্তে ততঃ পৃথক্। তথা তদ্দৃশ্যমেবেদং স্বপ্নদৃক্-চিত্তমিষ্যতে ॥ ১৭৯ ॥ ৬৪

সরলার্থঃ

স্বপ্নদৃক্-চিত্তদৃশ্যাঃ(স্বপ্নদর্শিনঃ চিত্তেন অনুভবনীয়াঃ) তে(জীবাঃ) ততঃ (স্বপ্নদৃচিত্তাৎ) পৃথক্ ন বিদ্যন্তে(ন সন্তি)। তথা ইদং স্বপ্নদৃচিত্তং[অপি] তদ্দৃশ্যং(স্বপ্নদর্শিনা দৃশ্যম্) ইষ্যতে,(চিত্তমপি স্বপ্নদৃশঃ পৃথক্ ন কিঞ্চিৎ অস্তীতি ভাবঃ)।

স্বপ্নদর্শীর চিত্তমাত্রদৃশ্য সেই সমস্ত জীব স্বপ্নদর্শীর চিত্ত হইতে পৃথক্ নহে; সেইরূপ স্বপ্নদর্শীর এই চিত্তও আবার সেই স্বপ্নদর্শীরই একমাত্র দৃশ্য বা দর্শন- যোগ্য বলিয়াই ইচ্ছা করা হইয়া থাকে(প্রতীত হইয়া থাকে); সুতরাং স্বপ্নদর্শী হইতে উহাও পৃথক্ নহে ॥ ১৭৯ ॥ ৬৪

শঙ্কর-ভাষ্যম্

যদ্যেবং, ততঃ কিম্? উচ্যতে—স্বপ্নদৃশঃ চিত্তং স্বপ্নদৃচিত্তং তেন দৃশ্যাঃ তে জীবাঃ; ততঃ তস্মাৎ স্বপ্নদৃচিত্তাৎ পৃথক্ ন বিদ্যন্তে ন সন্তীত্যর্থঃ। চিত্তমেব হি অনেক-জীবাদিভেদাকারেণ বিকল্প্যতে। তথা তদপি স্বপ্নদৃচিত্তমিদং তদ্দৃশ্যমেব, তেন স্বপ্নদৃশা দৃশ্যং তদ্দৃশ্যম্। অতঃ স্বপ্নদৃগব্যতিরেকেণ চিত্তং নাম ন অস্তী- ত্যর্থঃ ॥ ১৭৯ ॥ ৬৪

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, যদি এইরূপই হয়, তাহাতেই বা কি হইল? বলা হইতেছে—স্বপ্নদৃচিত্ত অর্থ স্বপ্নদর্শীর চিত্ত, উক্ত সেই জীবগণ সেই চিত্তেরই দৃশ্য; সেই স্বপ্নদর্শীর চিত্ত হইতে সে সমস্ত জীব আর পৃথকভাবে বিদ্যমান নাই, অর্থাৎ চিত্তই অনেকানেক জীবাকারে কল্পিত হইয়া থাকে। সেইরূপ, এই যে সেই স্বপ্নদর্শীর চিত্ত, তাহাও

১৭

২৫৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

কেবল তাহার—সেই স্বপ্নদর্শীরই একমাত্র দৃশ্য—তদৃশ্য। অতএব স্বপ্নদর্শীর অতিরিক্ত চিত্ত বলিয়া কিছু নাই ॥ ১৭৯ ॥ ৬৪

চরন্ জাগরিতে জাগ্রদ্দিক্ষু বৈ দশসু স্থিতান্। অণ্ডজান্ স্বেদজান্ বাপি জীবান্ পশ্যতি যান্ সদা ॥ ১৮০ ॥ ৬৫ জাগ্রচ্চিত্তেক্ষণীয়াস্তে ন বিদ্যন্তে ততঃ পৃথক্। তথা তদ্দৃশ্যমেবেদং জাগ্রতশ্চিত্তমিষ্যতে ॥ ১৮১ ॥ ৬৬

সরলার্থঃ

জাগ্রৎ(পুরুষঃ) জাগরিতে(জাগ্রদবস্থায়াং) চরন্(পর্যটন্) দশসু দিক্ষু স্থিতান্ যান্ অণ্ডজান, স্বেদজান্ বা অপি জীবান্(প্রাণিনঃ) সদা পশ্যন্তি; তে [খলু] জাগ্রচ্চিত্তেক্ষণীয়াঃ(জাগ্রতঃ পুরুষস্য চিত্তেন দৃশ্যাঃ) ততঃ(তস্মাৎ জাগ্রচ্চিত্তাৎ) পৃথক্ ন বিদ্যন্তে; তথা(তদ্বদেব) জাগ্রতঃ(পুরুষস্য) ইদং চিত্তং[অপি] তদৃশ্যম্(জাগ্রতা পুরুষেণ প্রকাশ্যম্) এব(নিশ্চয়ে) ইষ্যতে। [ন পুনঃ ততঃ পৃথক্ ইতি ভাবঃ]।

জাগ্রৎ ব্যক্তি জাগ্রদবস্থায় পর্যটন করিতে করিতে দশ দিকে স্থিত অণ্ডজ কিংবা স্বেদজ যে সমস্ত জীবকে সর্ব্বদা দর্শন করিয়া থাকে, তৎসমস্তই জাগ্রৎ পুরুষের চিত্তমাত্রদৃশ্য; সেই চিত্ত হইতে উহারা পৃথকভাবে বিদ্যমান নাই। সেইরূপ জাগ্রৎ ব্যক্তির এই চিত্তকেও আবার সেই জাগ্রৎ ব্যক্তিরই দৃশ্য বলিয়া স্বীকার করা হইয়া থাকে ৷ ১৮০ ॥ ৬৫—১৮১ ॥ ৬৬

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

জাগ্রতো দৃশ্যা জীবাঃ তচ্চিত্তাব্যতিরিক্তাঃ, চিত্তেক্ষণীয়ত্বাৎ স্বপ্নদৃক্-চিত্তেক্ষণীয়- জীববৎ। তচ্চ জীবেক্ষণাত্মকং চিত্তং দ্রষ্টুঃ অব্যতিরিক্তং দ্রষ্টৃদৃশ্যত্বাৎ, স্বপ্নচিত্তবৎ। উক্তার্থম্ অন্যৎ ॥ ১৮০ ॥ ৬৫—১৮১ ॥ ৬৬

ভাষ্যানুবাদ

জাগ্রৎ ব্যক্তির দৃশ্য জীবসমূহ যেহেতু কেবলই একমাত্র চিত্ত-দৃশ্য; সেই কারণে তাহারা সেই চিত্ত হইতে ব্যতিরিক্ত বা পৃথক্ নহে। স্বপ্নদর্শীর চিত্ত-দৃশ্য জীব ইহার দৃষ্টান্তস্থল। সেই জীবদর্শী চিত্তও আবার স্বপ্নচিত্তের ন্যায় একমাত্র দ্রষ্ট-দৃশ্যত্বনিবন্ধন দ্রষ্টা হইতে

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৫৯

অতিরিক্ত নহে। ইহার অবশিষ্ট অর্থ পূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে ॥ ১৮০ ॥ ৬৫—১৮১ ॥ ৬৬

উভে হ্যন্যোদ্যদৃশ্যে তে কিং তদন্তীতি চোচ্যতে। লক্ষণাশূন্যমুভয়ং তন্মতেনৈব গৃহ্যতে ॥ ১৮২ ॥ ৬৭

সরলার্থঃ

তে উভে(জীবঃ চিত্তং চ) হি(নিশ্চয়ে) অন্যোন্যদৃশ্যে(পরস্পর- প্রকাশ্যে;)[অতঃ বিবেকিনা] তৎ অস্তি ইতি কিং(কথম্) উচ্যতে (নৈবেত্যর্থঃ)।[লক্ষ্যতে জ্ঞায়তে অনেন ইতি লক্ষণা—প্রমাণং];[যতঃ] লক্ষণাশূন্যম্(অপ্রামাণিকম্) উভয়ং(চিত্তং তদ্দৃশ্যং চ) তন্মতেনৈব(তচ্চিত্ত- স্বরূপতয়া এব) গৃহ্যতে(প্রতীয়তে),[ন তু স্বতঃ পৃথক্ ইত্যাশয়ঃ]।

যেহেতু সেই চিত্ত ও তদ্বশ্য, এতদুভয়ই অন্যোন্য-দৃশ্য, অর্থাৎ পরস্পর -পরস্পরাপেক্ষিত; অতএব, বিবেকিগণ তাহাকে সৎ বলিবেন কেন? বিশেষতঃ অপ্রামাণিক ঐ উভয়ই ত(চিত্ত ও দৃশ্য) উভয়ের সহযোগে গৃহীত হইয়া থাকে ৷ ১৮২ ॥ ৬৭

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

জীবচিত্তে উভে চিত্ত-চৈত্যে তে অন্যোন্যদৃশ্যে ইতরেতরগম্যে। জীবাদি- বিষয়াপেক্ষং হি চিত্তং নাম ভবতি। চিত্তাপেক্ষং হি জীবাদিদৃশ্যম্। অতঃ তে অন্যোন্যদৃশ্যে। তস্মাৎ ন কিঞ্চিৎ অস্তীতি চ উচ্যতে—চিত্তং বা চিত্তেক্ষণীয়ং বা। কিং তদন্তীতি বিবেকিনা উচ্যতে! ন হি স্বপ্নে হস্তী হস্তিচিত্তং বা বিদ্যতে; তথা ইহাপি বিবেকিনাম্ ইত্যভিপ্রায়ঃ। কবং? লক্ষণাশূন্যং; লক্ষ্যতে অনয়েতি লক্ষণা প্রমাণং, প্রমাণশূন্যম্ উভয়ং চিত্তং চৈত্যং দ্বয়ং যতঃ, তন্মতেনৈব তচ্চিত্ততয়ৈব তদ্ গৃহ্যতে। নহি ঘটমতিং প্রত্যাখ্যান ঘটো গৃহ্যতে, নাপি ঘটং প্রত্যাখ্যান ঘটমতিঃ। নহি তত্র প্রমাণ-প্রমেয়ভেদঃ শক্যতে কল্পয়িতুম্ ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ১৮২ ॥ ৬৭

ভাষ্যানুবাদ

জীব ও চিত্ত অর্থাৎ চিত্ত ও তাহার দৃশ্য, এতদুভয়ই অন্যোন্যদৃশ্য

২৬০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যাপনিষৎ

অর্থাৎ পরস্পরের বিষয়ীভূত; কেননা, জীবাদি বিষয়কে অপেক্ষা করিয়া চিত্ত, আবার চিত্তকে অপেক্ষা করিয়া জীবাদি দৃশ্য হয়; অতএব, তাহারা উভয়ে পরস্পর দৃশ্যভাবাপন্ন। এই কারণেই বলা হয় যে, চিত্ত বা চিত্তদৃশ্য কিছুই নাই অর্থাৎ তৎসমস্তই অসৎ। [এইজন্যই] বিবেকিগণ কর্তৃক কোন বস্তুই ‘অস্তি’(আছে) বলিয়া উক্ত হয় না, অর্থাৎ কোন বস্তুই নাই। অভিপ্রায় এই যে, স্বপ্নে দৃশ্য- মান হস্তী কিংবা হস্তিচিত্ত থাকে না, বিবেকিগণের নিকট এই জাগ্রদ- বস্থায়ও তদ্রূপ। কি প্রকারে? যেহেতু লক্ষণাশূন্য; যাহা দ্বারা বস্তু লক্ষিত হয় অর্থাৎ পরিজ্ঞাত হয়, তাহাই লক্ষণা—প্রমাণ; যেহেতু চিত্ত ও চৈত্য(চিত্তের গ্রাহ্য) এই উভয়ই প্রমাণশূন্য, অথচ সেই চিত্ত- স্বরূপেই গৃহীত বা জ্ঞানের বিষয়ীভূত হইয়া থাকে। কেননা, ঘটা-- কার বুদ্ধিব্যতীত, কখনই ঘট-পদার্থকে জানা যায় না, এবং ঘটকে ত্যাগ করিয়াও আবার ঘটবুদ্ধি জানা যায় না। অভিপ্রায় এই যে, [ঘট ও ঘটবুদ্ধি,] এই স্থলে একটি প্রমাণ, অপরটি তাহার প্রমেয়; এই প্রকার ভেদ-কল্পনা করা যাইতে পারে না ॥ ১৮২ ॥ ৬৭

যথা স্বপ্নময়ো জীবো জায়তে ম্রিয়তেইপি চ। তথা জীবা অমী সর্ব্বে ভবন্তি ন ভবন্তি চ ॥ ১৮৩॥ ৬৮

সরলার্থঃ

স্বপ্নময়ঃ(স্বপ্নদৃষ্টঃ) জীবঃ(প্রাণী) যথা(যদ্বৎ) জায়তে চ ম্রিয়তে অপি, তথা(তদ্বৎ) অমী(জাগ্রদ্দশ্যাঃ) সর্ব্বে জীবাঃ ভবন্তি(জায়ন্তে), ন ভবন্তি (নশ্যন্তি) চ(অপি)।

স্বপ্নময় অর্থাৎ স্বপ্নদৃষ্টি জীবনিবহ যেরূপ[স্বপ্নেই] জন্মে ও মরে, এই(জাগ্রৎ- কালীন) জীবনিবহও ঠিক তদ্রূপ জন্মিতেছে ও বিনষ্ট হইতেছে; অর্থাৎ উভয়ের মধ্যে এই অংশে কিছুমাত্র পার্থক্য নাই ॥ ১৮৩ ॥ ৬৮

যথা মায়াময়ো জীবো জায়তে ম্রিয়তেইপি চ।

তথা জীবা অমী সর্ব্বে ভবন্তি ন ভবন্তি চ ॥ ১৮৪ ॥ ৬৯

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৬১

সরলার্থঃ

মায়াময়ঃ(ঐন্দ্রজালিকঃ) জীবঃ যথা জায়তে চ ম্রিয়তে অপি; তথা(জাগ্রৎ- কালীনঃ) অমী সর্ব্বে জীবাঃ ভবন্তি ন ভবন্তি চ।

ঐন্দ্রজালিক-দর্শিত মায়াময় জীব যেরূপ জন্মে ও বিনষ্ট হয়, জাগ্রৎকালীন এই জীবগণও তদ্রূপ জন্মে ও বিনষ্ট হয় ॥ ১৮৪ ॥ ৬৯

যথা নিৰ্ম্মিতকো জীবো জায়তে ম্রিয়তেইপি চ। তথা জীবা অমী সর্ব্বে ভবন্তি ন ভবন্তি চ॥ ১৮৫ ॥ ৭০

সরলার্থঃ

নির্মিতকঃ(কৃত্রিমঃ) জীবঃ যথা জায়তে ম্রিয়তে চ, অমী(জাগ্রৎ- কালীনাঃ) সর্ব্বে জীবাঃ[অপি] ভবন্তি, ন ভবন্তি(নশ্যন্তি) চ।

কৃত্রিম জীবনিবহ যেরূপ জন্মে ও মরে, এই সেই জাগ্রৎকালীন জীবগণও তদ্রূপ উৎপন্ন ও বিনষ্ট হইয়া থাকে। ॥ ১৮৫ ॥ ৭০

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

মায়াময়ো মায়াবিনা যঃ কৃতঃ, নির্মিতকো মন্ত্রৌষধ্যাদিভিঃ নিষ্পাদিতঃ, স্বপ্ন- মায়ানিস্মিতকা অণ্ডজাদয়ো জীবা যথা জায়ন্তে ম্রিয়ন্তে চ, তথা মনুষ্যাদিলক্ষণা অবিদ্যমানা এব চিত্তবিকল্পনামাত্রা ইত্যর্থঃ ॥ ১৮৩ ॥ ৬৮—১৮৪ ॥ ৬৯—১৮৫ ॥ ৭০

ভাষ্যানুবাদ

মায়াময় অর্থ—মায়াবিকর্তৃক যাহা কৃত হয়; নির্ম্মিতক অর্থ— মন্ত্র ও ওষধি প্রভৃতি দ্বারা বিরচিত। স্বপ্নময়, মায়াময় ও নির্ম্মিতক অগুজাদি জীবনিবহ যেরূপ জন্মিয়া থাকে, এবং মরিয়া যায়, তদ্রূপ মনুষ্যাদি জীবগণও নিশ্চয়ই অবিদ্যমান—অসৎ, কেবল মানসিক বিকল্পমাত্র(পরমার্থ সত্য নহে) ॥ ১৮৩ ॥ ৬৮—১৮৫ ॥ ৭০

ন কশ্চিজ্জায়তে জীবঃ সম্ভবোহস্য ন বিদ্যতে। এতৎ তদুত্তমং সত্যং যত্র কিঞ্চিন্ন জায়তে ॥ ১৮৬ ॥ ৭১

২৬২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

সরলার্থঃ

[উক্তমর্থম্ উপসংহরতি “ন কশ্চিৎ” ইত্যাদিনা।][তস্মাৎ] কশ্চিৎ (কশ্চিৎ অপি) জীবঃ ন জায়তে(উৎপদ্যতে), অস্য(জীবস্য) সম্ভবঃ(উৎপত্তি- সম্ভাবনা অপি) ন বিদ্যতে(ন অস্তি)। যত্র(সত্যে) কিঞ্চিৎ(কিঞ্চিদপি) ন জায়তে, তৎ এতৎ তু(এব) উত্তমং(পরমার্থং সত্যং),[অন্যত্তু আপেক্ষিক- মিত্যাশয়:]।

কোন জীবই উৎপন্ন হয় না, এবং উৎপত্তির সম্ভাবনাও নাই। ইহাই উত্তম সত্য, যাহাতে কোন জীবই প্রকৃতপক্ষে জন্ম লাভ করে না ॥ ১৮০ ॥ ৭১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ব্যবহারসত্যবিষয়ে জীবানাং জন্ম-মরণাদিঃ স্বপ্নাদিজীববৎ ইত্যুক্তম্; উত্তমং তু পরমার্থসত্যং—ন কশ্চিৎ জায়তে জীব ইতি। উক্তার্থম্ অন্যৎ ॥ ১৮৬ ॥ ৭১

ভাষ্যানুবাদ

ব্যবহারক্ষেত্রে যে, জীবসমূহের জন্ম-মরণাদি ব্যবহার, তাহা স্বপ্নাদি-দৃষ্ট জীবের ন্যায়, ইহা কথিত হইয়াছে। কোন জীবই যে প্রকৃত পক্ষে জন্মে না, ইহাই পারমার্থিক সত্য। অপরাংশের অর্থ পূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে ॥ ১৮৬ ॥ ৭১

চিত্তস্পন্দিতমেবেদং গ্রাহ্যগ্রাহকবদ্দয়ম্।

চিত্তং নির্ব্বিষয়ং নিত্যমসঙ্গং তেন কীর্ত্তিতম্ ॥ ১৮৭ ॥ ৭২

সরলার্থঃ

ইদম্(অনুভূয়মানং) গ্রাহ্যগ্রাহকবৎ(গ্রাহ্যগ্রাহকভাববিশিষ্টং) দ্বয়ং(জগৎ) চিত্তস্পন্দিতম্(মনঃকল্পিতম্) এব(নিশ্চয়ে);[পরমার্থতস্তু] চিত্তং নির্বিষয়ং (বিষয়সম্বন্ধশূন্যম্ আত্মস্বরূপম্ এব), তেন(হেতুনা) নিত্যম্ অসঙ্গং(সঙ্গরহিতং নির্বিকারং) কীর্তিতং(কথিতং, বিবেকিভিরিতি শেষঃ)।

এই যে, গ্রাহ্য-গ্রাহকভাবাপন্ন দ্বৈত জগৎ ইহা কেবল চিত্তেরই স্ফুরণমাত্র; প্রকৃতপক্ষে চিত্তও স্বভাবতঃ নির্বিষয়(আত্মস্বরূপ), সেই হেতু সর্ব্বদাই উহা অসঙ্গ বলিয়া কথিত ॥ ১৮৭ ॥ ৭২

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৬৩

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

সর্ব্বং গ্রাহ্য-গ্রাহকবৎ চিত্তস্পন্দিতমেব দ্বয়ম্। চিত্তং পরমার্থত আত্মৈবেতি নির্বিষয়ং তেন নির্বিষয়ত্বেন নিত্যম্ অসঙ্গং কীর্তিতম্ “অসঙ্গো হ্যায়ং পুরুষঃ” ইতি শ্রুতেঃ। সবিষয়স্য হি বিষয়ে সঙ্গঃ; নির্বিষয়ত্বাৎ চিত্তম্ অসঙ্গম্ ইত্যর্থঃ ॥ ১৮৭ ॥ ৭২

ভাষ্যানুবাদ

ইহা গ্রাহ্য, অমুক ইহার গ্রহণকারী—গ্রাহক, এইরূপ গ্রাহ্য-গ্রাহক- ভাবাপন্ন সমস্ত দ্বৈত(জগৎ) নিশ্চয়ই চিত্তস্পন্দন বা চিত্তের বিলাস- মাত্র(বস্তুতঃ উহাদের কিছুমাত্র সত্তা নাই)। চিত্তও প্রকৃত পক্ষে আত্মস্বরূপই বটে; সুতরাং নির্বিষয়; সেই নির্বিষয়ত্ব নিবন্ধনই নিত্য অসঙ্গ বলিয়া কথিত। যেহেতু শ্রুতিতে আছে—‘এই পুরুষ অসঙ্গ।’ কারণ, সবিষয় পদার্থেরই বিষয়ে সঙ্গ বা আসক্তি হইয়া থাকে; চিত্ত যখন নির্বিষয়—বিষয়সম্পর্ক-রহিত, তখন নিশ্চয়ই তাহা অসঙ্গ ॥ ১৮৭ ॥ ৭২

যোহস্তি কল্পিতসংবৃত্যা পরমার্থেন নাস্ত্যসৌ। পরতন্ত্রাভিসংবৃত্যা স্যান্নাস্তি পরমার্থতঃ॥ ১৮৮॥ ৭৩

সরলার্থঃ

যঃ(পদার্থঃ) কল্পিতসংবৃত্যা(কল্পিতয়া অসত্যয়া সংবৃত্যা ব্যবহারমাত্রেণ) অস্তি(সত্তাবান্ ভবতি), অসৌ(পদার্থঃ) পরমার্থেন(পরমার্থরূপেণ) ন অস্তি (বিদ্যতে)।[যশ্চ] পরতন্ত্রাভিসংবৃত্যা(পরেষাং তন্ত্রাণাং শাস্ত্রাণাং, সংবৃত্যা ব্যবহারেণ শাস্ত্রোক্ত-ব্যবহারতঃ) স্যাৎ,[সোহপি] পরমার্থতঃ ন অস্তি;[তস্মাৎ অসঙ্গত্বং যুক্তম্ ইতি ভাবঃ]।

যে পদার্থ কেবল কল্পিত লোকব্যবহারবলে সত্তা লাভ করিয়া থাকে, প্রকৃত- পক্ষে তাহা নাই—অসৎ। আর অপরাপর শাস্ত্রব্যবহারানুসারেও যাহা কল্পিত হয়, তাহাও ত বস্তুতঃ অসৎ[কারণ কল্পিত কোন পদার্থ ই সত্য হইতে পারে না; অতএব চিত্তকে ‘অসঙ্গ’ বলা অসঙ্গত হয় নাই] ॥ ১৮৮ ॥ ৭৩

২৬৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যাপনিষৎ

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ননু নির্বিষয়ত্বেন চেৎ অসঙ্গত্বং, চিত্তস্য ন নিঃসঙ্গতা ভবতি, যস্মাৎ শাস্তা শাস্ত্রং শিষ্যশ্চ ইত্যেবমাদেঃ বিষয়স্য বিদ্যমানত্বাৎ। নৈষ দোষঃ; কস্মাৎ? যঃ পদার্থঃ শাস্ত্রাদিঃ বিদ্যতে, স কল্পিতসংবৃত্যা; কল্পনা চ সা, পরমার্থপ্রতিপত্ত্যুপায়- ত্বেন সংবৃতিশ্চ সা, তয়া যঃ অস্তি, পরমার্থেন নাস্ত্যসৌ ন বিদ্যতে। “জ্ঞাতে দ্বৈতং ন বিদ্যতে” ইত্যুক্তম্। যশ পরতন্ত্রাভিসংবৃত্যা পরশাস্ত্রব্যবহারেণ স্যাৎ পদার্থঃ, স পরমার্থতো নিরূপ্যমাণো নাস্ত্যেব। তেন যুক্তম্ উক্তম্ “অসঙ্গং তেন কীর্তিতম্” ইতি ॥ ১৮৮ ॥ ৭৩

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, বিষয়াভাব-নিবন্ধনই যদি অসঙ্গত্ব হয়, তাহা হইলে ত চিত্তের আর নিঃসঙ্গতা হইতে পারে না; কারণ, চিত্তের সম্বন্ধে শাস্তা (উপদেষ্টা) শাস্ত্র ও শিষ্য, ইত্যাদি প্রকার বিষয় বিদ্যমান রহিয়াছে। না—ইহা দোষ হয় না। কারণ? শাসনকর্ত্তা প্রভৃতি যে সমস্ত পদার্থ বিদ্যমান আছে, তাহা কল্পিত সংবৃতি দ্বারা অর্থাৎ যাহা কেবল পরমার্থ-তত্ত্বোপলব্ধির উপায়ভাবে কল্পিত-ব্যবহার, সেই সংবৃতি বা ব্যবহারানুরোধে যাহার অস্তিত্ব, প্রকৃতপক্ষে তাহা কখনই নাই— অসৎ। ‘তত্ত্বজ্ঞানোদয়ে দ্বৈত থাকে না,’ ইহা পূর্ব্বেই কথিত হইয়াছে। আর পরতন্ত্রাভিসংবৃতি দ্বারা অর্থাৎ অপরাপর শাস্ত্রোক্ত ব্যবহারানু- সারেও যে পদার্থ অস্তিত্ব লাভ করে, বস্তুতঃ তত্ত্বনিরূপণ করিতে গেলে তাহাও নিশ্চয়ই অসৎ; অতএব উক্ত “অসঙ্গং তেন কীর্ত্তিতম্”— এই কথা যুক্তিযুক্তই বলা হইয়াছে ॥ ১৮৮ ॥ ৭৩

অজঃ কল্পিতসংবৃত্যা পরমার্থেন নাপ্যজঃ। পরতন্ত্রাভিনিষ্পত্যা সংবৃত্যা জায়তে তু সঃ ॥ ১৮৯ ॥ ৭৪

সরলার্থঃ

[আত্মা অপি] কল্পিতসংবৃত্যা(কল্পিতয়া সংবৃত্যা অবিদ্যামূলক-ব্যবহারেণ এব) অজঃ[উচ্যতে], পরমার্থেন(বস্তুতস্তু) অজোহপি ন(ব্যবহারাতীতত্বা-

অলাতশান্তি প্রকরণম্ ২৬৫

দিতি ভাবঃ), সঃ(অজঃ) তু(পুনঃ) পরতন্ত্রাভিনিষ্পত্যা(পরশাস্ত্রসিদ্ধয়া) সংবৃত্যা(জন্মাদিব্যবহারমপেক্ষ্য) জায়তে(উৎপদ্যতে, ন তু পরমার্থত ইত্যর্থঃ)।

আত্মাকেও অবিদ্যামূলক ব্যবহারানুসারেই অজ বলা হইয়া থাকে; বস্তুতঃ আত্মা অজও নহে। কেননা, অপরাপর শাস্ত্রসিদ্ধ অবিদ্যামুলক ব্যবহারানুসারেই সেই আত্মার জন্ম কল্পিত হইয়া থাকে ॥ ১৮৯ ॥ ৭৪

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ননু শাস্ত্রাদীনাং সংবৃতিত্বে অজ ইতীয়মপি কল্পনা সংবৃতিঃ স্যাৎ। সত্যম্ এবং; শাস্ত্রাদিকল্পিতসংবৃত্যা এব অজ ইত্যুচ্যতে। পরমার্থেন নাপ্যজঃ, যস্মাৎ পরতন্ত্রাভি- নিষ্পত্যা পরশাস্ত্রসিদ্ধিমপেক্ষ্য যঃ অজ ইত্যুক্তঃ, স সংবৃত্যা জায়তে। অতঃ অজ ইতীয়মপি কল্পনা পরমার্থবিষয়ে নৈব ক্রমত ইত্যর্থঃ ॥ ১৮৯ ॥ ৭৪

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, শাস্ত্রাদি সমস্তই যদি সংবৃতি অর্থাৎ অবিদ্যাত্মক হয়, তাহা হইলে ত ‘আত্মা অজ’, এই কল্পনাও সংবৃতি(অবিদ্যাত্মক) হইতে পারে? হাঁ, একথা সত্যই বটে, কিন্তু, শাস্ত্রাদি-কল্পিত সংবৃতি-বলেই আত্মা ‘অজ’ বলিয়া কথিত হইয়া থাকে; বাস্তবিক পক্ষে ত অজও নহে। যেহেতু পরশাস্ত্রোক্ত সিদ্ধান্তানুসারে যাহা ‘অজ’ বলিয়া কথিত, তাহাই সংবৃতি বা অবিদ্যাবশতঃ জন্ম লাভ করিয়া থাকে মাত্র। অতএব, পরমার্থ-চিন্তা-স্থলে, ‘অজ’ এই কল্পনাও কখনই উপস্থিত হইতে পারে না ॥ ১৮৯ ॥ ৭৪

অভূতাভিনিবেশোহস্তি দ্বয়ং তত্র ন বিদ্যতে। দ্বয়াভাবং স বুদ্ধৈব নির্নিমিত্তো ন জায়তে ॥ ১৯০ ॥ ৭৫

সরলার্থঃ

অভূতাভিনিবেশঃ(অভূতে অসত্যে দ্বৈতে, অভিনিবেশঃ আগ্রহমাত্রং) অস্তি, তত্র(অভিনিবেশে তু) দ্বয়ং[দ্বৈতং] ন বিদ্যতে;[নহি আগ্রহমাত্রেণ বস্তু- সিদ্ধির্ভবতীত্যাশয়ঃ]। দ্বয়াভাবং[দ্বৈতাভাবম্ আভাসমাত্রং] বুদ্ধা(অনুভূয়)

২৬৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

এব[যঃ] নির্নিমিত্তঃ(অভিনিবেশরহিতঃ ভবতি), সঃ ন জায়তে(নোৎপদ্যতে ইত্যর্থঃ)।

অসত্য দ্বৈতবিষয়ে লোকের অভিনিবেশ বা আগ্রহমাত্র আছে; কিন্তু সেই অভিনিবেশে দ্বৈতসিদ্ধি হয় না। যে ব্যক্তি দ্বৈতের অভাব অনুভব করে(সত্য উপলব্ধি করে), অভিনিবেশরূপ নিমিত্ত না থাকায় সে কখনই জন্মে না, অর্থাৎ- তাহার আর জন্ম ভ্রান্তি হয় না ৷ ১৯০ ॥ ৭৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যস্মাদসদ্বিষয়ঃ, তস্মাৎ অসত্যভূতে দ্বৈতে অভিনিবেশঃ অস্তি কেবলম্। অভিনিবেশঃ আগ্রহমাত্রং, দ্বয়ং তত্র ন বিদ্যতে। মিথ্যাভিনিবেশমাত্রঞ্চ জন্মনঃ কারণং যস্মাৎ, দ্বয়াভাবং বুদ্ধা নিনিমিত্তো নিবৃত্তমিথ্যাদ্বয়াভিনিবেশো যঃ, স ন জায়তে ॥ ১৯০ ॥ ৭৫

ভাষ্যানুবাদ

যেহেতু অভিনিবেশের বিষয় মাত্রই অসৎ(মিথ্যা), সেই হেতু অসত্যস্বরূপ দ্বৈতবিষয়ে কেবল অভিনিবেশই আছে মাত্র, কিন্তু, তাহার বিষয়(দ্বৈত) নাই। অভিনিবেশ অর্থ কেবলই আগ্রহ, কিন্তু সেই অভিনিবেশে দ্বৈত বিদ্যমান নাই। যেহেতু মিথ্যা অভিনিবেশও জন্মের কারণ হইয়া থাকে। সেই হেতুই যে লোক দ্বয়াভাব অবগত হইয়া মিথ্যাদ্বৈতাভিনিবেশরূপ নিমিত্ত পরিত্যাগ করে, সে লোক আর জন্মলাভ করে না ॥ ১৯০ ॥ ৭৫

যদা ন লভতে হেতুত্তমাধমমধ্যমান্।

তদা ন জায়তে চিত্তং হেত্বভাবে ফলং কুতঃ ॥ ১৯১ ॥ ৭৬

সরলার্থঃ

চিত্তং যদা(যস্মিন্ কালে) উত্তমাধমমধ্যমান্(ত্রিবিধান্) হেতুন্(কারণানি) ন লভতে, তদা চিত্তং ন জায়তে(জন্মাদিবিকারাভাসান্ ন প্রপদ্যতে)। [যুক্তং চৈতৎ, যতঃ] হেত্বভাবে(কারণাসত্ত্বে) ফলং(কার্য্যং) কুতঃ(কস্মাৎ) [ভবেদিতি শেষঃ]।

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৬৭

চিত্ত যখন উত্তম, মধ্যম অথবা অধম কোন প্রকার হেতুই দর্শন করে না, তখন চিত্ত আর জন্ম লাভ করে না। কারণ, হেতুর অভাবে কার্য্য হইবে কোথা হইতে? ॥ ১৯১ ॥ ৭৬

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

জাত্যাশ্রমবিহিতা আশীর্ব্বর্জিতৈঃ অনুষ্ঠীয়মানা ধর্ম্মা দেবত্বাদিপ্রাপ্তিহেতব উত্তমাঃ কেবলাখ্যধৰ্ম্মাঃ; অধৰ্ম্ম-ব্যামিশ্র মনুষ্যত্বাদি-প্রাপ্ত্যথা মধ্যমাঃ। তির্যগাদি- প্রাপ্তিনিমিত্তা অধর্মলক্ষণাঃ প্রবৃত্তিবিশেষাশ্চ অধমাঃ। তান্ উত্তম মধ্যমাধমান্ অবিদ্যাপরিকল্পিতান্ যদা একমেবাদ্বিতীয়ম্ আত্মতত্ত্বং সর্ব্বকল্পনাবর্জিতং জানন্ ন লভতে ন পশ্যতি, যথা বালৈঃ দৃশ্যমানং গগনে মলং বিবেকী ন পশ্যতি, তদ্বৎ, তদা ন জায়তে ন উৎপদ্যতে চিত্তং দেবাদ্যাকারৈঃ উত্তমাধমমধ্যমফলরূপেণ। ন হি অসতি হেতৌ ফলম্ উৎপদ্যতে বীজাদ্যভাবে ইব শস্যাদি ॥ ১৯১ ॥ ৭৬

ভাষ্যানুবাদ

ফলাকাঙ্ক্ষাবজ্জিত পুরুষ কর্তৃক অনুষ্ঠীয়মান, জাতি ও আশ্রমানু- সারে বিহিত এবং দেবত্বাদিপ্রাপ্তির হেতুভূত যে সমস্ত ধৰ্ম্ম, তাহাই কেবল-নামক অর্থাৎ নিরবচ্ছিন্ন ‘উত্তম’, অধর্মমিশ্রিত এবং মনুষ্যত্বাদি- প্রাপ্তির হেতুভূত ধর্মসমূহ ‘মধ্যম’, আর পশু পক্ষী প্রভৃতি তির্য্যগ্‌- যোনি প্রাপ্তির হেতুভূত অধর্মাত্মক বিশেষ বিশেষ প্রবৃত্তিই ‘অধম’। যেমন বালকের পরিদৃষ্ট গগনমালিন্য বিবেকিগণ দর্শন করেন না, তদ্রূপ, মনুষ্য যখন সর্বপ্রকার কল্পনাবর্জিত এক অদ্বিতীয় আত্মতত্ত্ব অবগত হইয়া অবিদ্যাপরিকল্পিত সেই উত্তম, মধ্যম ও অধম হেতুসমূহ দেখিতে পায় না, চিত্ত তখন আর দেবাদিভাবে উত্তম, মধ্যম ও অধম ফলরূপে জন্মে না। বীজাদির অভাবে যেমন শস্যাদি হয় না, তেমনি হেতুর অভাব হইলে আর ফল উৎপন্ন হইতে পারে না ৷ ১৯১ ॥ ৭৬

অনিমিত্তস্য চিত্তস্য যানুৎপত্তিঃ সমাদয়া।

অজাতস্য সর্ব্বস্য চিত্তদৃশ্যং হি তদ্যতঃ ॥ ১৯২ ॥ ৭৭

২৬৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

সরলার্থঃ

অনিমিত্তস্য(জন্মকারণরহিতস্য)[অতএব] অজাতস্য(অনুৎপন্নস্য) সর্ব্বস্য চিত্তস্য যা অনুৎপত্তিঃ(মোক্ষরূপা), সা অদ্বয়া(দ্বৈতরহিতা) সমা(নিত্যম্ একরূপা চ); যতঃ(যস্মাৎ হেতোঃ) তৎ(চিত্তং তদ্দৃশ্যং চেতি দ্বয়ং) চিত্তদৃশ্যং (ন তু বস্তু সৎ, ইত্যাশয়ঃ)।

উৎপত্তির কারণ না থাকায়, নিশ্চয়ই অজাত সমস্ত চিত্তের যে অনুৎপত্তি (মোক্ষাবস্থা), তাহা দ্বৈতরহিত এবং চিরকালই সমান বা একরূপ। কেননা, যেহেতু সেই দ্বৈত চিত্তদৃশ্য ভিন্ন আর কিছুই নহে ৷ ১৯২ ॥ ৭৭

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

হেত্বভাবে চিত্তং ন উৎপদ্যতে ইতি হি উক্তম্। সা পুনঃ অনুৎপত্তিঃ চিত্তস্য কীদৃশীতি উচ্যতে—পরমার্থদর্শনেন নিরস্তধৰ্মাধৰ্মাখ্যোৎপত্তি-নিমিত্তস্য অনিমিত্তস্য চিত্তস্যেতি যা মোক্ষাখ্যা অনুৎপত্তিঃ, সা সর্ব্বদা সর্ব্বাবস্থাসু সমা নির্বিশেষা অদ্বয়া চ; পূর্ব্বমপি অজাতস্যৈব অনুৎপন্নস্য চিত্তস্য সর্ব্বস্য অদ্বয়স্য ইত্যর্থঃ। যস্মাৎ প্রাগপি বিজ্ঞানাৎ চিত্তং দৃশ্যং তদ্বয়ং জন্ম চ, তস্মাৎ অজাতস্য সর্ব্বস্য সর্ব্বদা চিত্তস্য সমা অদ্বয়ৈব অনুৎপত্তিঃ ন পনঃ কদাচিদ্ভবতি, কদাচিৎ বা ন ভবতি। সর্ব্বদা একরূপা এব ইত্যর্থঃ ॥ ১৯২ ॥ ৭৭

ভাষ্যাঙ্কুবাদ

পূর্ব্বে কথিত হইয়াছে যে, হেতুর অভাবে চিত্ত আর উৎপন্ন হয় না, চিত্তের সেই অনুৎপত্তিই বা কি প্রকার, তাহা কথিত হইতেছে— পরমার্থতত্ত্ব ব্রহ্মস্বরূপ সাক্ষাৎকার বশতঃ সম্পূর্ণরূপে উৎপত্তির কারণী- ভূত ধর্ম্মাধৰ্ম্মনামক নিমিত্ত যাহার বিধ্বস্ত হইয়াছে, অনিমিত্ত বা নিমিত্ত- হীন সেই চিত্তের যে মোক্ষনামক অনুৎপত্তি, তাহা সকল সময়ে এবং সমস্ত অবস্থায়ই সমান ও অদ্বিতীয়।[জ্ঞানোদয়ের] পূর্ব্বেও সমস্ত চিত্তই অনুৎপন্ন এবং অদ্বয় বা ভেদ-রহিত। যেহেতু বিজ্ঞানোদয়ের পূর্ব্বেও চিত্ত ও দৃশ্য, এই দুইই জন্ম, অর্থাৎ দ্রষ্টদৃশ্যভাবই জন্মের হেতু; অতএব, বস্তুতঃ অজাত সমস্ত চিত্তেরই অনুৎপত্তি চিরকালই সমান

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৬৯

অর্থাৎ অদ্বয়ই বটে, কিন্তু সেই অনুৎপত্তি যে কখনও হয় আর কখনও হয় না, তাহা নহে; পরন্তু সর্ব্বদা একরূপই বটে ॥ ১৯২ ॥ ৭৭

বুদ্ধানিমিত্ততাং সত্যাং হেতুং পৃথগনাপুবন্। বীতশোকং তথাকামভয়ং পদমশ্নুতে ॥ ১৯৩ ॥ ৭৮

সরলার্থঃ

[উক্তক্রমেণ] অনিমিত্ততাং(কারণাভাবং) সত্যাং(পরমার্থরূপাং) বুদ্ধা (অবগম্য) পৃথক্(অন্যং) হেতুং(কারণং চ) অনাপ্নুবন্(অলভমানঃ সন্) বীতশোকং(শোকবজ্জিতং) তথা অকামম্(বীতস্পৃহম্) অভয়ং(সংসারভয়বর্জিতং) পদম্(অবস্থাম্) অশ্বতে(ভজতে)।

পূর্ব্বোক্ত যুক্তি অনুসারে জন্মাদি কারণের অভাবকে সত্য(পরমার্থরূপ) বুঝিতে পারিয়া এবং অন্য কোনও হেতু না দেখিয়া শোকরহিত এবং কাম ও ভয়বর্জ্জিত ব্রহ্মপদ ভোগ করিতে থাকেন ॥ ১৯৩॥ ৭৮

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যথোক্তেন ন্যায়েন জন্মনিমিত্তস্য দ্বয়স্য অভাবাৎ অনিমিত্ততাঞ্চ সত্যাং পরমার্থ- রূপাং বুদ্ধা হেতুং ধর্ম্মাদিকারণং দেবাদিযোনিপ্রাপ্তয়ে পৃথগনাপ্নুবন্ অনুপাদদানঃ ত্যক্তবাহ্যৈষণঃ সন্ কামশোকাদিবজ্জিতম্ অবিদ্যাদিরহিতম্ অভয়ং পদমন্নতে, পুনঃ ন জায়তে ইত্যর্থঃ ॥ ১৯৩ ॥ ৭৮

ভাষ্যানুবাদ

উক্তপ্রকার যুক্তি অনুসারে জন্মাদি অবস্থার কারণীভূত দ্বৈতের অভাববশতঃ অনিমিত্ততা বা অকারণভাবকে সত্য অর্থাৎ যথার্থ বলিয়া অবগত হইয়া এবং দেবাদিভাবপ্রাপ্তির পৃথক্ কোন ধর্ম্মাদি কারণ উপলব্ধি না করিয়া, বাহ্য পদার্থের অভিলাষ পরিত্যাগপূর্ব্বক কাম ও শোকদুঃখাদিবর্জিত ও অবিদ্যাদি-দোষ-শূন্য অভয় পদ(মোক্ষাবস্থা) ভোগ করিতে থাকে, পুনর্ব্বার আর জন্ম লাভ করে না ॥ ১৯৩ ॥ ৭৮

২৭০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

অভূতাভিনিবেশাদ্ধি সদৃশে তৎ প্রবর্ত্ততে। বস্তুভাবং স বুদ্ধৈব নিঃসঙ্গং বিনিবর্ত্ততে॥ ১৯৪॥ ৭৯

সরলার্থঃ

অভূতাভিনিবেশাৎ(অসত্যে অনুরাগাৎ হেতোঃ) হি(এব), সদৃশে (তদনুরূপে) তৎ(চিত্তং) প্রবর্ততে(ব্যাপ্রিয়তে)। সঃ(অভিনিবেশবান্ পুরুষঃ) বস্তুভাবং(বস্তুনঃ অসত্তাং) বুদ্ধা(অবগম্য) এব নিঃসঙ্গং(যথা স্যাৎ তথা) বিনিবর্ততে(অভিনিবেশবিষয়ং বিশেষেণ পরিত্যজতীত্যর্থঃ)।

চিত্ত অসত্য বিষয়েও অনুরাগবশতঃ সদৃশ অর্থাৎ স্বানুরূপ বিষয়ে প্রবৃত্ত হইয়া থাকে; কিন্তু যখন দৃশ্য বস্তুর অভাব বুঝিতে পারে, তখনই নিঃসঙ্গ বা অনাসক্তভাবে তাহা পরিত্যাগ করিয়া থাকে ॥ ১৯৪ ॥ ৭৯

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যস্মাৎ অভূতাভিনিবেশাৎ অসতি দ্বয়ে দ্বয়াস্তিত্বনিশ্চয়ঃ অভূতাভিনিবেশঃ তস্মাৎ অবিদ্যাব্যামোহরূপাৎ হি সদৃশে তদনুরূপে তচ্চিত্তং প্রবর্ততে। তস্য দ্বয়স্য বস্তুনঃ অভাবং যদা বুদ্ধবান্, তদা তস্মাৎ নিঃসঙ্গং নিরপেক্ষং সৎ বিনিবর্ততে অভূতাভিনিবেশবিষয়াৎ ॥ ১৯৪ ॥ ৭৯

ভাষ্যানুবাদ

যে অভূতাভিনিবেশবশতঃ অর্থাৎ দ্বয় বা দ্বৈত অসত্য হইলেও তাহার অস্তিত্ব বিষয়ে যে নিশ্চয় তাহারই নাম অভূতাভিনিবেশ; যেহেতু অবিদ্যা-মোহময় সেই অভূতাভিনিবেশ বশতঃই দ্বৈতসদৃশ অর্থাৎ দ্বৈতানুরূপ বিষয়ে উক্তপ্রকার চিত্তের প্রবৃত্তি হইয়া থাকে; আবার যখন সেই দ্বয় বস্তুর অভাব বা অসত্তা অবগত হয়, তখন নিঃসঙ্গ হইয়া অর্থাৎ ঐ সমস্ত বিষয়ের কোন অপেক্ষা না করিয়া সেই অভূতাভিনিবেশ হইতে বিশেষরূপে নিবৃত্ত হইয়া থাকে ॥ ১৯৪ ॥ ৭৯

নিবৃত্তস্যাপ্রবৃত্তস্য নিশ্চলা হি তদা স্থিতিঃ।

বিষয়ঃ স হি বুদ্ধানাং তৎ সাম্যমজমদ্বয়ম্ ॥ ১৯৫ ॥ ৮০

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৭১

সরলার্থঃ

তদা(তস্মিন্ সময়ে) হি(নিশ্চয়ে) নিবৃত্তস্য(অভিনিবেশাৎ বিরতস্য) অপ্রবৃত্তস্য(পুনরপি তত্র প্রবৃত্তিম্ অকুর্ব্বতঃ)[চিত্তস্য] নিশ্চলা(চাঞ্চল্যং বিক্ষেপঃ, তদ্বর্জিতা) স্থিতিঃ(অদ্বয়ব্রহ্ম-প্রতিষ্ঠা)[ভবতি], হি(যস্মাৎ) বুদ্ধানাং(পরমার্থদর্শিনাং) সঃ(অদ্বয়ঃ পরমাত্মা) বিষয়ঃ(গ্রাহ্যঃ);[কঃ সঃ? ইত্যাহ] তৎ(প্রক্রান্তম্) অজং, অদ্বয়ং সাম্যং(নির্বিশেষং ব্রহ্ম ইত্যর্থঃ)।

সেই সময় বিষয় হইতে বিনিবৃত্ত এবং পুনশ্চ বিষয়ে অপ্রবৃত্ত চিত্তের নিশ্চল ভাবে অবস্থিতি হইয়া থাকে; যাহারা বুদ্ধ অর্থাৎ পরম সত্য পদার্থ দর্শন করিয়া থাকেন, তাঁহাদের পক্ষে সেই অজ অদ্বয় নির্বিশেষ ব্রহ্মই একমাত্র প্রতীতির বিষয় হন;(অন্য কিছু প্রতীতির গোচর হয় না) ॥ ১৯৫ ॥ ৮০

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

নিবৃত্তস্য দ্বৈতবিষয়াৎ, বিষয়ান্তরে চ অপ্রবৃত্তস্য অভাবদর্শনেন চিত্তস্য নিশ্চলা চলনবর্জিতা ব্রহ্ম-স্বরূপৈব তদা স্থিতিঃ, যা এষা ব্রহ্মস্বরূপা স্থিতিঃ চিত্তস্য অদ্বয়- বিজ্ঞানৈকরসঘনলক্ষণা। স হি যস্মাৎ বিষয়ঃ গোচরঃ পরমার্থদর্শিনাং বুদ্ধানাং, তস্মাৎ তৎ সাম্যং পরং নির্বিশেষম্ অজম্ অদ্বয়ঞ্চ ॥ ১৯৫ ॥ ৮০

ভাষ্যানুবাদ

দ্বৈতবিষয় হইতে নিবৃত্ত, অভাব বা অসত্তা দর্শন করায়, অপরাপর বিষয়েও প্রবৃত্তিরহিত চিত্তের তৎকালে নিশ্চল—চাঞ্চল্য-বর্জ্জিত, ব্রহ্মস্বরূপেই অবস্থিতি হয়। চিত্তের এই যে, একমাত্র অদ্বিতীয় বিজ্ঞানরসঘন ব্রহ্মভাবে স্থিতি; যেহেতু পরমার্থদর্শী জ্ঞানিগণের তাহাই একমাত্র বিষয় হয়, সেই কারণেই তাহা নিরতিশয় সমভাবাপন্ন, অজ ও অদ্বয়স্বরূপ ॥ ১৯৫ ॥ ৮০

অজমানিদ্রমস্বপ্নং প্রভাতং ভবতি স্বয়ম্।

সকৃদ্বিভাতে হেয়ৈব ধর্ম্মো ধাতুস্বভাবতঃ ॥ ১৯৩ ॥ ৮১

সরলার্থঃ

[ তদানীং তু] অজম্ অনিদ্রম্ অস্বপ্নং[তৎ বস্তু] স্বয়ং প্রভাতম্(অন্যনিরপেক্ষ

২৭২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

প্রকাশমানং ভবতি), হি(যস্মাৎ) এষঃ ধৰ্ম্মঃ(আত্মা) ধাতুস্বভাবতঃ(বস্তু- স্বভাবাৎ এব) সকৃৎ বিভাতঃ(সদৈব প্রকাশময়ঃ)।

জন্ম, নিদ্রা ও স্বপ্নরহিত সেই আত্মবস্তুটি তখন আপনা হইতেই প্রকাশ পাইতে থাকে। কারণ এই আত্মরূপ ধর্মটি স্বভাবতই সদাপ্রকাশমান ॥ ১৯৬ ॥ ৮১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

পুনরপি কীদৃশশ্চ অসৌ বুদ্ধানাং বিষয় ইত্যাহ—স্বয়মেব তৎ প্রভাতং ভবতি ন আদিত্যাদ্যপেক্ষম্; স্বয়ংজ্যোতিঃস্বভাবম্ ইত্যর্থঃ। সকৃৎ বিভাতঃ সদৈব বিভাত ইত্যেতৎ। এষ এবংলক্ষণ আত্মাখ্যো ধর্ম্মো ধাতুস্বভাবতো বস্তুস্বভাবত ইত্যর্থঃ ॥ ১৯৬ ॥ ৮১

ভাষ্যানুবাদ

পুনশ্চ জিজ্ঞাসা হইতেছে যে, এই বিষয়টি জ্ঞানীদিগেরই বা কি প্রকার? বলা হইতেছে—তাহা স্বয়ংই প্রকাশমান, তাহার প্রকাশে আদিত্যাদির অপেক্ষা নাই, তাহা স্বভাবতঃই জ্যোতির্ম্ময়। এবংবিধ আত্মনামক ধর্মটি স্বভাবতঃই সর্বদাই প্রকাশমান ॥ ১৯৬ ॥ ৮১

সুখমাব্রিয়তে নিত্যং দুঃখং বিব্রিয়তে সদা। যস্য কস্য চ ধৰ্ম্মস্য গ্রহেণ ভগবানসৌ ॥ ১৯৭ ॥ ৮২

সরলার্থঃ

যস্য কস্য চ ধৰ্ম্মস্য(বস্তুনঃ) গ্রহেণ(গ্রহণেন) অসৌ ভগবান্(আত্মা) সদা সুখম্(অনায়াসেন) আব্রিয়তে(আবৃতঃ ক্রিয়তে), দুঃখম্(অতিকৃচ্ছে ণ) বিব্রিয়তে(প্রকাশ্যতে, ন তু অনায়াসেন ইতি ভাবঃ)।

যে কোনও বস্তু বিষয়ে আগ্রহ হইলেই তাহা দ্বারা এই ভগবান্ অর্থাৎ প্রকাশ- সম্পন্ন আত্মাও অনায়াসে আবৃত হয়, অথচ অতি কষ্টে প্রকাশিত বা প্রতীতি- গোচর হইয়া থাকে ৷ ১৯৭ ॥ ৮২

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

এবং বহুশ উচ্যমানমপি পরমার্থতত্ত্বং কম্মাৎ লৌকিকৈঃ ন গৃহ্যতে ইতি উচ্যতে —যস্মাৎ যস্য কস্যচিৎ দ্বয়বস্তুনো ধৰ্ম্মস্য গ্রহেণ গ্রহণাবেশেন মিথ্যাভিনিবিষ্টতয়া

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৭৩

সুখম্ আব্রিয়তে অনায়াসেন আচ্ছাদ্যতে ইত্যর্থঃ। দ্বয়োপলব্ধিনিমিত্তং হি তত্রা- বরণৎ ন যত্নান্তরম্ অপেক্ষতে। দুঃখঞ্চ বিব্রিয়তে প্রকটীক্রিয়তে, পরমার্থজ্ঞানস্য দুর্লভত্বাৎ। ভগবান্ অসৌ আত্মা অদ্বয়ো দেব ইত্যর্থঃ। অতো বেদান্তৈঃ আচার্য্যেশ্চ বহুশঃ উচ্যমানোহপি নৈব জ্ঞাতুং শক্য ইত্যর্থঃ, “আশ্চর্য্যো বক্তা কুশলোহস্য লব্ধা” ইতি শ্রুতেঃ ॥ ১৯৭ ॥ ৮২

ভাষ্যানুবাদ

ভাল, এইরূপে বহুবার বলা সত্ত্বেও আত্মাকে সাধারণে বুঝিতে পারে না কেন? তদুত্তরে বলা হইতেছে—যেহেতু এই ভগবান্ প্রকাশশীল অদ্বিতীয় আত্মা, যে কোনও দ্বৈতবস্তুর ধর্ম্মের(অবস্থায়) গ্রহ অর্থাৎ গ্রহণাভিনিবেশ বা মিথ্যা আগ্রহবশতঃ সুখে আবৃত হইয়া থাকে, অর্থাৎ অনায়াসে আচ্ছাদিত হইয়া পড়ে। কেবল দ্বৈতোপলব্ধি নিমিত্তই তাহাতে আবরণ হয়, অপর কোনও প্রযত্নের অপেক্ষা করে না; অথচ অতি কষ্টে বিবৃত অর্থাৎ প্রকটীকৃত হইয়া থাকে; কারণ, পরমার্থজ্ঞান অতি দুর্লভ। অভিপ্রায় এই যে, বেদান্তশাস্ত্র-সমূহ এবং আচার্য্যগণ কর্তৃক বহুপ্রকারে উক্ত হইলেও,[তাহাকে] জানিতে পারা যায় না। যেহেতু, শ্রুতি বলিয়াছেন যে, ‘ইহার বক্তা আশ্চর্য্য- ময়, এবং ইহার জ্ঞাতাও অতি নিপুণ’ ॥ ১৯৭ ॥ ৮২

অস্তি নাস্ত্যস্তি নাস্তীতি নাস্তি নাস্তীতি বা পুনঃ। চলস্থিরোভয়াভাবৈরাবৃণোত্যেব বালিশঃ ॥ ১৯৮ ॥ ৮৩

সরলার্থঃ

[ আবরণপ্রকারমাহ অস্তীত্যাদিনা।]—বালিশঃ(মূঢ়ঃ জনঃ)[আত্মা] অস্তি, নাস্তি, অস্তি নাস্তি(সন্ অসন্ চ) ইতি, নাস্তি নাস্তি ইতি বা(অপি) পুনঃ চলস্থিরোভয়াভাবৈঃ(চলত্বেন, স্থিরত্বেন, উভয়াত্মকত্বেন, অভাবরূপেণ চ) [ আত্মানম্] আবৃণোতি(আচ্ছাদয়তি)।

কিরূপে আত্মাকে আবৃত করে, তাহা কথিত হইতেছে—আত্মা আছে, নাই, আছেও বটে, নাইও বটে, এবং নিশ্চয়ই নাই, ইত্যাদি ভাবে চল, স্থির, উভয়াত্মক- ও অভাবরূপে মুঢ় লোকেরা আত্মাকে আবৃত করিয়া থাকে ৷ ১৯৮ ॥ ৮৩

১৮

২৭৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

অস্তি নাস্তীত্যাদিসূক্ষ্মবিষয়া অপি পণ্ডিতানাং গ্রহা ভগবতঃ পরমাত্মন আবরণা এব; কিমুত মূঢ়জনানাং বুদ্ধিলক্ষণা ইত্যেবমর্থং প্রদর্শয়ন্নাহ—অস্তীতি। অন্ত্যাত্মেতি কশ্চিৎ বাদী প্রতিপদ্যতে। নাস্তীতি অপরো বৈনাশিকঃ। অস্তি নাস্তীতি অপরঃ অর্দ্ধবৈনাশিকঃ সদসদ্বাদী দিগ্বাসাঃ। নাস্তি নাস্তীতি অত্যন্ত- শূন্যবাদী।

তত্র অস্তিভাবঃ চলঃ ঘটাদ্যনিত্যবিলক্ষণত্বাৎ। নাস্তিভাবঃ স্থিরঃ, সদা বিশেষত্বাৎ। উভয়ং চলস্থিরবিষয়ত্বাৎ সদসদ্ভাবঃ। অভাবঃ অত্যন্তাভাবঃ। প্রকারচতুষ্টয়স্যাপি তৈঃ এতৈঃ চলস্থিরোভয়াভাবৈঃ সদসদাদিবাদী সর্ব্বোহপি ভগবন্তম্ আবৃণোত্যেব বালিশঃ অবিবেকী। যদ্যপি পণ্ডিতো বালিশ এব পরমার্থতত্ত্বানববোধাৎ; কিমু স্বভাবমূঢ়ো জন ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ১৯৮ ॥ ৮৩

ভাষ্যানুবাদ

পণ্ডিতগণের ‘অস্তি নাস্তি’ ইত্যাদি-প্রকার অতি সূক্ষ্মবিষয়ক আগ্রহ বা অভিনিবেশসমূহও যখন ভগবান্ পরমাত্মার আবরক হইয়া থাকে, তখন মুঢ় লোকদিগের সামান্য বুদ্ধিতে যে আবরণ করিবে, তাহাতে আর বক্তব্য কি? ইহা প্রদর্শনার্থ বলিতেছেন-“অস্তি” ইত্যাদি। কোন এক বাদী স্বীকার করেন যে, ‘আত্মা আছে’, অপর বাদী(বৈনাশিক বৌদ্ধ) বলেন যে, ‘[আত্মা] নাই(অসৎ)’। অর্দ্ধবৈনাশিক(বিনাশবাদী) অপর কেহ বলেন যে, ‘আছেও বটে, নাইও বটে’; এটি সদসদ্বাদী দিগম্বর বৌদ্ধগণের মত। অত্যন্ত শূন্যবাদী বলেন-‘নাই-নাই’ অর্থাৎ অত্যন্ত অসৎ।

তন্মধ্যে অস্তি-ভাবটি চল; কেননা, উহা অনিত্য ঘটাদি পদার্থ হইতে বিলক্ষণ বা ভিন্নপ্রকার; সুতরাং পরিণামী বা সবিশেষ। সর্বদাই অবিশেষ বা একরূপ বলিয়া নাস্তি-ভাবটি স্থির। সদসদ্ভাবটি চল ও স্থির, উভয়প্রকার বিষয়াবগাহী হওয়ায় উভয়াত্মক। অভাব অর্থ অত্যন্তাভাব। সদসৎ প্রভৃতি মতবাদিগণ সকলেই বালিশ অর্থাৎ বিবেকহীন, তাহারা এই চারি প্রকার—চল, স্থির, উভয়াত্মকভাব ও

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৭৫

অভাব দ্বারা ভগবান্কে(আত্মাকে) নিশ্চয়ই আবৃত করিয়া থাকে। পণ্ডিতগণও যখন পরমার্থ সত্য আত্মতত্ত্বজ্ঞানের অভাবে মূর্খশ্রেণীভুক্ত হন, তখন স্বভাব-মূঢ় লোকের আর কথা কি? * ॥ ১৯৮ ॥ ৮৩

কোট্যশ্চতস্র এতাস্তু গ্রহৈর্য্যাসাং সদাবৃতঃ। ভগবানাভিরস্পৃষ্টো যেন দৃষ্টঃ স সর্ব্বদৃক্ ॥ ১৯৯ ॥ ৮৪

সরলার্থঃ

এতাঃ(পূর্ব্বোক্তাঃ) চতস্রঃ(চতুর্বিধাঃ) কোট্যঃ(পক্ষাঃ)[সন্তি], যাসাং(কোটীনাং) গ্রহৈঃ(আগ্রহৈঃ-অস্তিত্বাদিরূপৈঃ) সদা(সর্ব্বদা) আবৃতঃ (আচ্ছাদিতঃ)[অপি] ভগবান্(প্রকাশাদিমান্ আত্মা) যেন(মনস্বিনা) আভিঃ(অস্ত্যাদিকোটিভিঃ) অস্পৃষ্টঃ(অস্ত্যাদিবিকল্প-বর্জ্জিতঃ) দৃষ্টঃ(অনুভূতঃ), সঃ সর্ব্বদৃক্(সর্ব্বদর্শী ইত্যর্থঃ)।

এই চারিপ্রকার কোটি বা পক্ষ আছে, যাহাদের উপর আগ্রহ বা অভিনিবেশ দ্বারা আত্মা সর্ব্বদা আবৃত হইয়া থাকে। যে মনস্বী পুরুষ এই প্রকাশময় আত্মাকে উক্ত ‘অস্তি নাস্তি’ প্রভৃতি বিতর্ক-কল্পনায় অসংস্পৃষ্টরূপে অনুভব করিয়া থাকেন, তিনিই প্রকৃত সর্ব্বদৃক্ অর্থাৎ সর্ব্বদর্শী ॥ ১৯৯ ॥ ৮৪

২৭৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কীদৃক্ পুনঃ পরমার্থতত্ত্বং, যদববোধাৎ অবালিশঃ পণ্ডিতো ভবতীত্যাহ— কোট্যঃ প্রাবাদুকশাস্ত্রনির্ণয়ান্তা এতা উক্তা অস্তিনাস্তীত্যাদ্যাঃ চতস্রঃ, যাসাং কোটীনাং গ্রহৈঃ গ্রহণৈঃ উপলব্ধিনিশ্চয়ৈঃ সদা সর্ব্বদা আবৃত আচ্ছাদিতঃ তেষামেব প্রাবাদুকানাং যঃ, স ভগবান্ আভিঃ অস্তিনাস্তীত্যাদিকোটিভিঃ চতসৃভিরপি অস্পৃষ্টঃ অস্ত্যাদিবিকল্পনাবজ্জিত ইত্যেতৎ। যেন মুনিনা দৃষ্টো জ্ঞাতো বেদান্তেষু ঔপনিষদঃ পুরুষঃ, স সর্ব্বদৃক্ সর্বজ্ঞঃ পরমার্থপণ্ডিত ইত্যর্থঃ ॥ ১৯১ ৷ ৮৪

ভাষ্যানুবাদ

তাহা হইলে পরমার্থ কি প্রকার? যাহার জ্ঞানে লোক মূর্খত্ব পরিত্যাগ করিয়া পণ্ডিত হইয়া থাকে। তাহা কথিত হইতেছে— প্রাবাদুক অর্থাৎ অনর্থ বক্তা; তাহাদিগের শাস্ত্রোক্ত ‘অস্তি, নাস্তি’ ইত্যাদি ভাবের, এই চারি প্রকার সিদ্ধান্ত আছে। সেই বাবদূক- গণেরই উক্ত চারিপ্রকার সিদ্ধান্তে অনুভবাত্মক আগ্রহ বা গ্রহণ দ্বারা যে আত্মা সর্ব্বদা আবৃত বা আচ্ছাদিত হইয়া থাকে, উপনিষদ্বেদ্য সেই ভগবান্ আত্মাকে যে মুনি অর্থাৎ চিন্তাপরায়ণ ব্যক্তি ‘অস্তি নাস্তি’ ইত্যাদি চতুর্বিধ প্রকারেই অসংস্পৃষ্ট অর্থাৎ অস্ত্যাদি সর্বাধিকবিকাশ- রহিত দেখিতে পান; বস্তুতঃ তিনিই সর্বদিক্ অর্থাৎ সর্বদর্শী বা সর্বজ্ঞ, অর্থাৎ তিনিই প্রকৃত পণ্ডিত ॥ ১৯১ ॥ ৮৪

প্রাপ্য সর্ব্বজ্ঞতাং কৃৎস্নাং ব্রাহ্মণ্যং পদমদ্বয়ম্। অনাপন্নাদিমধ্যান্তং কিমতঃ পরমীহতে॥ ২০০॥ ৮৫

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৭৭

সরলার্থঃ

[ সঃ সর্বজ্ঞঃ] কৃৎস্নাং(সম্পূর্ণাং) সর্ব্বজ্ঞতাম্(সর্ব্ববিষয়সাক্ষাৎকারশক্তিম্) অনাপন্নাদিমধ্যান্তম্(উৎপত্তি-স্থিতি বিনাশরহিতম্) অদ্বয়ং(অদ্বিতীয়ং) ব্রাহ্মণ্যং (ব্রহ্মণঃ ইদং ব্রাহ্মণ্যং) পদং(স্থানং) প্রাপ্য(লব্ধা)[স্থিতঃ]; অতঃ(অস্মাৎ লাভাৎ) পরং(উৎকৃষ্টং অধিকং বা) কিং(বস্তু) ঈহতে(চেষ্টতে)?[স তেনৈব কৃতার্থো ভবতীত্যাশয়ঃ]।

সেই মনস্বী পুরুষ এই প্রকারে সম্পূর্ণভাবে সর্ব্বজ্ঞতাস্বরূপ এবং উৎপত্তি-স্থিতি- লয়-রহিত অদ্বিতীয় ব্রাহ্মণ্য(ব্রাহ্মণোচিত) পদ—অর্থাৎ অধিকার লাভ করিলে পর তাহার প্রার্থনীয় আর কি থাকে? ॥ ২০০ ॥ ৮৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

প্রাপ্যৈতাং যথোক্তাং কৃৎস্নাং সমস্তাং সর্ব্বজ্ঞতাং ব্রাহ্মণ্যং পদং ‘স ব্রাহ্মণঃ’ “এষ নিত্যো মহিমা ব্রাহ্মণস্য” ইতি শ্রুতেঃ। অনাপন্নাদিমধ্যান্তম্ আদিমধ্যান্তা উৎপত্তি-স্থিতি-লয়া অনাপন্না অপ্রাপ্তা যস্য অদ্বয়স্য পদস্য ন বিদ্যন্তে, তৎ অনাপন্না- দিমধ্যান্তং ব্রাহ্মণ্যং পদম্। তদেব প্রাপ্য লব্ধ। কিমতঃ পরমস্মাৎ আত্মলাভাৎ উর্দ্ধম্ ঈহতে চেষ্টতে, নিষ্প্রয়োজনমিত্যর্থঃ। “নৈব তস্য কৃতেনার্থঃ” ইত্যাদি- গীতাস্মৃতেঃ ॥ ২০০ ॥ ৮৫

ভাষ্যানুবাদ

অনাপন্নাদিমধ্যান্ত—আদি, মধ্য ও অন্ত-রহিত, অর্থাৎ যে অদ্বয় পদের উৎপত্তি, স্থিতি ও লয়-রূপ আদি, মধ্য ও অন্ত বিদ্যমান নাই, সেই অনাপন্নাদিমধ্যান্ত, সম্পূর্ণ সর্বজ্ঞতারূপ অদ্বিতীয় ব্রাহ্মণ্য পদ ( অধিকার) প্রাপ্ত হয়—লাভ করে; ইহার পর অর্থাৎ এই আত্মলাভের অনন্তর সে আর কোন্ বিষয়ে কামনা করিবে বা চেষ্টা করিবে? ‘কোন কর্মানুষ্ঠান দ্বারা তাহার কোন প্রয়োজন সিদ্ধ হয় না’ ইত্যাদি স্মৃতি হইতে[ জানা যায় যে কোন বিষয়েই তাহার] প্রয়োজন নাই। ‘তিনিই ব্রাহ্মণ’, এবং এই সর্বজ্ঞতাই ‘ব্রাহ্মণের নিত্য মহিমা’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতে জানা যায় যে, সর্বজ্ঞতাই প্রকৃত ব্রাহ্মণ্য পদ ॥ ২০০ ॥ ৮৫

২৭৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

বিপ্রাণাং বিনয়ো হ্যেষ শমঃ প্রাকৃত উচ্যতে। দমঃ প্রকৃতিদান্তত্বাদেবং বিদ্বান্ শমং ব্রজেৎ ॥ ২০১॥ ৮৬

সরলার্থঃ

বিপ্রাণাম্(ব্রাহ্মণানাম্) এষঃ(উক্তবিধঃ) বিনয়ঃ(বিনীতভাবঃ) হি (নিশ্চয়ে) প্রাকৃতঃ(স্বাভাবিকঃ) শমঃ(উপশমঃ নিবৃত্তিঃ) উচ্যতে(কথ্যতে) [বিবেকিভিঃ]।[তথা] প্রকৃতি-দান্তত্বাৎ(প্রকৃত্যা স্বভাবেন সংযতত্বাৎ) [এষ এব] দমঃ(ইন্দ্রিয়োপরমঃ)[উচ্যতে]। এবং(যথোক্তং শমং ব্রহ্ম) বিদ্বান্(জানন্) শমম্(উপশমং) ব্রজেৎ(গচ্ছেৎ)।

এই বিনয়ই ব্রাহ্মণগণের স্বভাবসিদ্ধ ‘শম’ বলিয়া কথিত হইয়া থাকে, এবং স্বভাবতঃই দান্ত বা সংযমশীল বলিয়া ইহাই তাহাদের দম(ইন্দ্রিয়-সংযম) বলিয়াও কথিত হয়। লোকে উক্তপ্রকার ব্রহ্মকে জানিয়া শম লাভ করিতে পারে ॥ ২০১ ॥ ৮৬

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

বিপ্রাণাং ব্রাহ্মণানাং বিনয়ো বিনীতত্বং স্বাভাবিকং যৎ এতদাত্মস্বরূপেণ অবস্থানম্। এষ বিনয়ঃ শমোহপ্যেষ এব, প্রাকৃতঃ স্বাভাবিকঃ অকৃতক উচ্যতে। দমোহপ্যেষ এব, প্রকৃতিদান্তত্বাৎ স্বভাবত এব চ উপশান্তরূপত্বাৎ ব্রহ্মণঃ। এবং যথোক্তং স্বভাবোপশান্তং ব্রহ্ম বিদ্বান্ শমম্ উপশান্তিং স্বাভাবিকীং ব্রহ্মস্বরূপাং ব্রজেৎ, ব্রহ্মস্বরূপেণ অবতিষ্ঠত ইত্যর্থঃ ॥ ২০১ ॥ ৮৬

ভাষ্যানুবাদ

বিপ্রগণের অর্থাৎ ব্রাহ্মণগণের যে স্বভাবসিদ্ধ বিনয় বা বিনীত ভাব অর্থাৎ উক্তপ্রকার আত্মস্বরূপে অবস্থান, ইহাই বিনয়, এবং ইহাই প্রাকৃত—স্বাভাবিক অর্থাৎ অকৃত্রিম ‘শম’(শান্তভাব বা চিত্তের উপশান্তি) বলিয়া কথিত হয়। ব্রহ্ম স্বভাবতঃই উপশান্তরূপী (নির্বিকার), সেই প্রকৃতি-দান্তত্ব বশতঃ ইহাই ‘দম’(ইন্দ্রিয়সংযম)। এইরূপে স্বভাবশান্ত ব্রহ্মকে অবগত হইলে, সেই বিদ্বান্ পুরুষ শমগুণ—

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৭৯

অর্থাৎ স্বভাবসিদ্ধ ব্রহ্মরূপা উপশান্তি প্রাপ্ত হইয়া থাকেন; অর্থাৎ ব্রহ্মরূপে অবস্থিতি করেন ॥ ২০১ ॥ ৮৬

সবস্তু সোপলম্ভঞ্চ দ্বয়ং লৌকিকমিষ্যতে। অবস্তু সোপলম্ভঞ্চ শুদ্ধং লৌকিকমিষ্যতে ॥ ২০২ ॥ ৮৭

সরলার্থঃ

[ইদানীং স্বমতমাহ সবস্তু ইত্যাদি]—সবস্তু(ব্যবহারিকেণ বস্তুনা সহ বর্তমানং), সোপলম্ভং(উপলম্ভেন—বিষয়ানুভবেন সহ বর্তমানং) দ্বয়ং(দ্বৈতং) লৌকিকম্(লোকব্যবহারানুগতং অর্থাৎ জাগরিতম্) ইষ্যতে। অবস্তু(অবিদ্যা- ত্মক-বস্তু-সম্বন্ধ-রহিতং) সোপলম্ভং(সানুভবং) চ শুদ্ধং(জাগ্রৎসম্বন্ধরাহিত্যাৎ কেবলং) লৌকিকম্(স্বপ্নস্থানীয়ম্) ইষ্যতে।

দৃশ্যমান বস্তু ও উপলব্ধির সহিত বর্তমান দ্বৈতকে লৌকিক(জাগরিতাবস্থা) বলা হয়, আর বস্তবিরহিত অনুভব সহকৃত দ্বৈতকে শুদ্ধ লৌকিক বলা হয় ॥ ২০২ ॥৮৭

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

এবম্ অন্যোন্যবিরুদ্ধত্বাৎ সংসারকারণ-রাগদ্বেষদোষাস্পদানি প্রাবাদুকানাং দর্শনানি। অতো মিথ্যাদর্শনানি তানীতি তদ্যুক্তিভিঃ এব দর্শয়িত্বা চতুষ্কোটি- বর্জিতত্ত্বাৎ রাগাদিদোষানাস্পদং স্বভাবশান্তম্ অদ্বৈতদর্শনমেব সম্যগ্দর্শনম্ ইত্যুপসংহৃতম্। অথেদানীং স্বপ্রক্রিয়াপ্রদর্শনার্থ আরম্ভঃ—

সবস্তু সংবৃতিসতা বস্তুনা সহ বর্তত ইতি সবস্তু, তথা চ উপলব্ধিঃ উললন্তঃ, তেন সহ বর্তত ইতি সোপলন্তঞ্চ শাস্ত্রাদিসর্ব্বব্যবহারাস্পদং গ্রাহ্য-গ্রহণলক্ষণং দ্বয়ং লোকা- দনপেতং লৌকিকং জাগরিতম্ ইত্যেতৎ। এবংলক্ষণং জাগরিতম্ ইষ্যতে বেদান্তেষু। অবস্তু সংবৃতেরপ্যভাবাৎ। সোপলন্তং বস্তুবৎ উপলন্তনম্ উপলন্তঃ অসত্যপি বস্তুনি, তেন সহ বর্ততে ইতি সোপলন্তঞ্চ। শুদ্ধং কেবলং প্রবিভক্তং জাগরিতাৎ স্থূলাৎ লৌকিকং সর্ব্বপ্রাণিসাধারণত্বাৎ ইষ্যতে স্বপ্ন ইত্যর্থঃ ॥ ২০২৷৷ ৮৭

ভাষ্যানুবাদ

বাচালদিগের দর্শনশাস্ত্র-সমূহ যখন এইপ্রকার পরস্পর-বিরোধ- গ্রস্ত, তখন নিশ্চয়ই সেই সমস্ত সাংসারিক রাগদ্বেষাদি-দোষাক্রান্ত;

২৮০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ইহা তাহাদের যুক্তিসমূহ দ্বারাই প্রদর্শন করিয়া—তাহার পর, পূর্ব্বোক্ত কোটি-চতুষ্টয়-বিনির্ম্মুক্ত, সুতরাং রাগদ্বেষাদি-দোষ-বিবর্জ্জিত— স্বভাবশান্ত(অনুদ্বেগকর) এই অদ্বৈত দর্শনই যে একমাত্র সম্যক্ দর্শন বা যথার্থ জ্ঞানোপদেশক শাস্ত্র, এ কথারও উপসংহার করা হইতেছে। এখন আপনার সিদ্ধান্ত-প্রণালী প্রদর্শনার্থ পরবর্তী গ্রন্থ আরব্ধ হইতেছে—

‘সবস্তু’ অর্থ—সংবৃতিসৎ বা ব্যবহারিক সত্যবস্তুর সহিত বর্তমান, সেইরূপ ‘সোপলন্ত’, উপলব্ধ অর্থ—উপলব্ধি বা জ্ঞান, তাহার সহিত বর্তমান, অর্থাৎ শাস্ত্রাদি সর্ব্ব ব্যবহারের বিষয়ীভূত গ্রাহ্যগ্রাহকভাবাপন্ন দ্বৈতই লৌকিক বা ‘জাগরিত’ পদবাচ্য; বেদান্তে ঈদৃশ জাগরিতা- বস্থা স্বীকৃত হইয়া থাকে। সেই সংবৃতি বা ব্যবহারিক বস্তুসত্তাও অবস্তু(জাগরিতের ন্যায় বস্তুসম্বন্ধবিশিষ্ট নহে), অথচ কোন বস্তু না থাকিলেও যে বস্তুর ন্যায় উপলব্ধির বিষয় হওয়া অর্থাৎ বস্তু বলিয়া প্রতীত হওয়া, সেই উপলব্ধের সহিত বর্তমান; শুদ্ধ অর্থাৎ সর্ব্ব- প্রাণি-সাধারণ স্থূল জাগরিতাবস্থা অপেক্ষা বিশুদ্ধ কেবলই বিবিক্ত- স্বভাব লৌকিক ‘স্বপ্ন’ বলিয়া অঙ্গীকৃত হইয়া থাকে ॥ ২০২ ॥ ৮৭

অবস্থ্যুপলম্ভঞ্চ লোকোত্তরমিতি স্মৃতম্। জ্ঞানং জ্ঞেয়ঞ্চ বিজ্ঞেয়ং সদা বুদ্ধৈঃ প্রকীর্ত্তিতম্॥২০৩॥৮৮

সরলার্থঃ

[ ইদানীং সুষুপ্তিমাহ]—অবস্তু(বস্তুসম্বন্ধশূন্যং) অনুপলন্তং(প্রতীতিরহিতং) চ[যৎ, তৎ] লোকোত্তরম্(লৌকিক-ব্যবহারাতীতং সুষুপ্তম্) ইতি স্মৃতম্ (.চিন্তিতম্)[জ্ঞানিভিঃ]।[যতঃ] বুদ্ধৈঃ(জ্ঞানিভিঃ) সদা, জ্ঞানং(অনুভবঃ) জ্ঞেয়ং(উক্তমবস্থাত্রয়ং), বিজ্ঞেয়ং(বিশেষেণ জ্ঞেয়ং পরমার্থতত্ত্বং চ) প্রকীর্তিতম্ (কথিতম্)।

বস্তুশূন্য এবং উপলব্ধি বা বস্তুবিষয়ক-জ্ঞানবর্জিত যে অবস্থা, জ্ঞানিগণ তাহাকে লোকোত্তর অর্থাৎ লৌকিক ব্যবহারাতীত সুষুপ্তি অবস্থা বলিয়া চিন্তা করিয়াছেন।

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৮১

বুদ্ধ বা জ্ঞানিগণ সাধারণতঃ জ্ঞান(বিষয়ানুভূতি), জ্ঞেয়(বিষয়—জাগ্রদাদি অবস্থাত্রয়), এবং বিশেষভাবে জ্ঞাতব্য পরমার্থতত্ত্ব আত্মবস্তু, এই তিন প্রকার ভাব বর্ণনা করিয়াছেন ॥ ২০৩॥ ৮৮

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

অবস্তু অনুপলন্তঞ্চ গ্রাহ্যগ্রহণবজ্জিতম্ ইত্যেতৎ; লোকোত্তরম্ অতএব লোকাতীতম্। গ্রাহ্যগ্রহণবিষয়ে হি লোকঃ, তদভাবাৎ সর্ব্বপ্রবৃত্তিবীজং সুষুপ্তম্ ইত্যেতৎ। এবং স্মৃতং সোপায়ম্ পরমার্থতত্ত্বং লৌকিকং, শুদ্ধলৌকিকং, লোকোত্তরং চ ক্রমেণ যেন জ্ঞানেন জ্ঞায়তে, তজজ্ঞানং, জ্ঞেয়ম্ এতান্যের ত্রীণি, এতদ্- ব্যতিরেকেণ জ্ঞেয়ানুপপত্তেঃ। সর্ব্বপ্রাবাদুককল্পিতবস্তুনঃ অত্রৈব অন্তর্ভাবাৎ; বিজ্ঞেয়ং যৎ পরমার্থসত্যং তুর্য্যাখ্যম্ অদ্বয়ম্ অজম্ আত্মতত্ত্বম্ ইত্যর্থঃ। সদা সর্ব্বদৈতৎ লৌকিকাদি বিজ্ঞেয়ান্তং বুদ্ধৈঃ পরমার্থদর্শিভিঃ ব্রহ্মবিদ্ভিঃ প্রকীর্তিতম্ ॥ ২০৩ ৷৷ ৮৮

ভাষ্যানুবাদ

অবস্তু ও অনুপলন্ত অর্থ—গ্রাহ্য-গ্রাহকভাব সম্বন্ধ-রহিত; এই জন্যই লোকোত্তর অর্থাৎ লোক-ব্যবহারাতীত; কেননা, ‘লোক’ অর্থই গ্রাহ্য-গ্রহণ-ভাবের বিষয়, তাহা না থাকায় উহা জীবের সর্ববিধ চেষ্টার বীজস্বরূপ সুষুপ্তাবস্থা। পরমার্থতত্ত্ব ও তাহার জ্ঞানোপায় এইরূপে লৌকিক(জাগরিতাবস্থা), শুদ্ধ লৌকিক(স্বপ্নাবস্থা), এবং লোকোত্তর(সুষুপ্তি অবস্থাও) যে জ্ঞানের সাহায্যে বিজ্ঞাত হয়, তাহাই জ্ঞান, পূর্ব্বোক্ত এই অবস্থাত্রয়ই জ্ঞেয়; কারণ, এতদতিরিক্ত আর কিছুই জ্ঞেয় হইতে পারে না। কেননা, সমস্ত বাক্পটুবাদিগণের পরিকল্পিত বস্তুরাশি উক্ত অবস্থাত্রয়েরই অন্তর্ভূত হইয়া থাকে। তুরীয়সংজ্ঞক যে অজ অদ্বিতীয় আত্মতত্ত্ব, তাহাই বিজ্ঞেয়। বুদ্ধগণ অর্থাৎ পরমার্থদর্শী ব্রহ্মবিদ্গণ সর্বদাই সেই লৌকিক(প্রসিদ্ধ) জাগরিত অবস্থা হইতে আরম্ভ করিয়া বিজ্ঞেয় পরমার্থতত্ত্ব পর্য্যন্ত সমস্ত বিষয় নির্দেশ করিয়া গিয়াছেন ॥ ২০৩॥ ৮৮

২৮২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

জ্ঞানে চ ত্রিবিধে জ্ঞেয়ে ক্রমেণ বিদিতে স্বয়ম্। সর্ব্বজ্ঞতা হি সর্ব্বত্র ভবতীহ মহাধিয়ঃ ॥ ২০৪ ॥ ৮৯

সরলার্থঃ

জ্ঞানে(লৌকিকাদি-বিষয়ানুভবে), ত্রিবিধে(লৌকিকাদৌ ত্রিপ্রকারে) জ্ঞেয়ে(বিষয়ে) চ ক্রমেণ(অধিকারক্রমেণ) বিদিতে(সম্যক্ অনুভূতে সতি) মহাধিয়ঃ(মহামতেঃ তস্য বেদিতুঃ) সর্ব্বত্র(বিষয়ে) স্বয়ম্ এব সর্ব্বজ্ঞতা (সর্ব্বাত্মকতা, জ্ঞানিতা চ) ভবতি(স্ফুরতি ইতি ভাবঃ)।

উক্ত জ্ঞান ও ত্রিবিধ বিজ্ঞেয় বিষয় ক্রমশঃ পরিজ্ঞাত হইলে, সেই মহামতি পুরুষের আপনা হইতেই সর্ব্ববিষয়ে সর্ব্বজ্ঞতা উপস্থিত হইয়া থাকে ॥ ২০৪ ॥ ৮৯

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

জ্ঞানে চ লৌকিকাদিবিষয়ে জ্ঞেয়ে চ লৌকিকাদৌ ত্রিবিধে, পূর্ব্বং লৌকিকং স্থূলম্, তদভাবেন পশ্চাৎ শুদ্ধং লৌকিকম্, তদভাবেন লোকোত্তর- মিত্যেবং ক্রমেণ স্থানত্রয়াভাবেন পরমার্থসতি তুর্য্যে অদ্বয়ে অজে অভয়ে বিদিতে স্বয়মেব আত্মস্বরূপমেব সর্ব্বজ্ঞতা—সর্ব্বশাস্ত্রে। জ্ঞশ্চ সর্ব্বজ্ঞঃ তদ্ভাবঃ সর্ব্বজ্ঞতা ইহ অস্মিন্ লোকে ভবতি মহাধিয়ো মহাবুদ্ধেঃ। সর্ব্বলোকাতিশয়-বস্তুবিষয়বুদ্ধিত্বাৎ এবংবিদঃ সর্বত্র সর্ব্বদা ভবতি। সকৃদ্‌বিদিতে স্বরূপে ব্যভিচারাভাবাৎ ইত্যর্থঃ। নহি পরমার্থবিদো জ্ঞানোদ্ভবাভিভবৌ স্তঃ, যথা অন্যেষাং প্রাবাদুক’নাম্ ॥ ২০৪॥ ৮৯

ভাষ্যানুবাদ

লৌকিক-বিষয়-বিষয়ক জ্ঞান এবং পূর্ব্বোক্ত লৌকিকাদি ত্রিবিধ জ্ঞেয় বিষয় বিদিত হইলে—প্রথমে লৌকিক স্থূল বিষয়, পরে অস্থুল শুদ্ধ লৌকিক বিষয়, তদনন্তর লোকোত্তর বা লোকাতীত বিষয়, এই- রূপে ক্রমে ক্রমে উক্ত অবস্থাত্রয়-রহিত পরমার্থ-সত্য তুরীয় অজ ও অভয় অদ্বৈততত্ত্ব বিদিত হইলে মহাধী অর্থাৎ মহামতি ব্যক্তির ইহলোকেইসর্বত্র সর্বদা স্বয়ং—আত্মস্বরূপ সর্বজ্ঞতা হইয়া থাকে। [ সেই বিদ্বানের লোকাতিশয় বা অলৌকিক আত্ম-বস্তুবিষয়ে জ্ঞান উৎপন্ন হয়, এইজন্য তাঁহাকে ‘মহাধী’ বলা হইয়াছে], সর্বজ্ঞতা অর্থ—

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৮৩

সর্ব্ব অর্থাৎ সর্বাত্মক এবং জ্ঞ অর্থ জ্ঞানী—সর্বজ্ঞ, তাহার ভাব বা ধর্ম্মের নাম সর্বজ্ঞতা। সর্বদা সর্ববিষয়ে তাহার সর্বজ্ঞতা থাকে। কেননা, অন্যান্য বাবদূকের ন্যায় পরমার্থতত্ত্ববিদ্ ব্যক্তির জ্ঞানের কখনই উদ্ভব ও অভিভব বা বিলয় হয় না ॥ ২০৪ ॥ ৮৯

হেয়-জ্ঞেয়াপ্য-পাক্যানি বিজ্ঞেয়ান্যগ্রাণতঃ।

তেষামন্যত্র বিজ্ঞেয়াদুপলস্ত্রিষু স্মৃতঃ ॥ ২০৫ ॥ ৯০

সরলার্থঃ

[মুমুক্ষুণা কর্তা] অগ্রযাণতঃ(প্রথমতঃ) হেয়-জ্ঞেয়াপ্য-পাক্যানি(হেয়ানি জাগরিত-স্বপ্ন সুষুপ্তানি ত্যক্তব্যানি, জ্ঞেয়ং পরমার্থসত্যং ব্রহ্ম, আপ্যানি লব্ধব্যানি পাণ্ডিত্য-বাল্য-মৌনানি, পাক্যাঃ কষায়াখ্যা রাগদ্বেষাদয়ঃ দোষাঃ পরিপাকম্ উপশমং নেয়াঃ),[এতানি] বিজ্ঞেয়ানি(বিশেষতঃ জ্ঞাতব্যানি ইত্যর্থঃ)। বিজ্ঞেয়াৎ(পরমার্থসত্যাৎ আত্মতত্ত্বাৎ) অন্যত্র ত্রিষু(হেয়াপ্যপাক্যেযু) তেষাং (হেয়াদীনাং) উপলন্তঃ(উপলব্ধিঃ অবিদ্যাকল্পনামাত্রমিত্যর্থঃ)।

মুমুক্ষু ব্যক্তির প্রথমেই পরিত্যাজ্য জাগ্রদাদি অবস্থাত্রয়, জ্ঞেয়স্বরূপ সত্যব্রহ্ম, প্রাপ্য বা প্রাপ্তিযোগ্য পাণ্ডিত্যাদি সাধনত্রয় এবং প্রশমনীয় রাগদ্বেষাদি দোষ- নিচয়, বিশেষরূপে জানিতে হইবে। উক্ত হেয়াদির মধ্যে বিজ্ঞেয় পরমাত্মা ভিন্ন আর সর্ব্বত্র—হেয়, প্রাপ্য ও পাক্য এই তিনটি বিষয়েই কেবল উপলব্ধি ব্যতীত পৃথক্ সত্তা নাই ॥ ২০৫ ॥ ৯০

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

লৌকিকাদীনাং ক্রমেণ জ্ঞেয়ত্বেন নির্দেশাৎ অস্তিত্বাশঙ্কা পরমার্থতো মাভূৎ, ইত্যাহ-হেয়ানি চ লৌকিকাদীনি ত্রীণি জাগরিত-স্বপ্ন-সুষুপ্তানি আত্মনি অসত্ত্বেন রজ্জাং সর্পবৎ হাতব্যানীত্যর্থঃ। জ্ঞেয়মিহ চতুস্কোটিবজ্জিতং পরমার্থতত্ত্বম্। আপ্যানি-আপ্তব্যানি ত্যক্তবাহ্যৈষণাত্রয়েণ ভিক্ষুণা পাণ্ডিত্য-বাল্য-মৌনাখ্যানি সাধনানি। পাক্যানি-রাগদ্বেষমোহাদয়ো দোষাঃ কষায়াখ্যানি পক্তব্যানি। সর্ব্বাণ্যেতানি হেয়-জ্ঞেয়াপ্য-পাক্যানি বিজ্ঞেয়ানি ভিক্ষুণা উপায়ত্বেন ইত্যর্থঃ। অগ্রযাণতঃ প্রথমতঃ। তেষাং হেয়াদীনাম্ অন্যত্র বিজ্ঞেয়াৎ পরমার্থসত্যং বিজ্ঞেয়ং ব্রহ্মৈকং বর্জয়িত্বা উপলন্তনম্ উপলব্ধঃ অবিদ্যাকল্পনামাত্রম্। হেয়াপ্যপাক্যেষু ত্রিষপি স্মৃতো ব্রহ্মবিদ্ভিঃ ন পরমার্থসত্যতা ত্রয়াণামিত্যর্থঃ ॥ ২০৫ ৷ ৯০

২৮৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ভাষ্যানুবাদ

পূর্ব্বোক্ত লৌকিকাদি পদবাচ্য জাগ্রদাদি অবস্থাত্রয়ের পর পর জ্ঞেয়ত্ব নির্দেশ করায় উহাদেরও পারমার্থিক অস্তিত্বের আশঙ্কা হইতে পারে, এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন—লৌকিকাদি অর্থাৎ জাগ্রৎ, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি, এই অবস্থাত্রয় আত্মাতে অবিদ্যমান(কল্পিত) বলিয়া রজ্জু- কল্পিত সর্পের ন্যায় হেয় অর্থাৎ পরিত্যাজ্য,[অস্তি নাস্তি প্রভৃতি প্রকার-] চতুষ্টয়-রহিত পরমার্থতত্ত্বই এখানে ‘জ্ঞেয়’-পদগ্রাহ্য। আপ্য অর্থ প্রাপ্তিযোগ্য, অর্থাৎ[পুত্রকামনা, বিত্তকামনা ও স্বর্গাদি লোক- কামনা] বাহ্য বস্তুবিষয়ক এই কামনাত্রয় পরিত্যাগী মুমুক্ষুর পাণ্ডিত্য, বাল্য ও মৌননামক সাধনসমূহ[আশ্রয়ণীয়]। ভিক্ষুর পক্ষে উক্ত হেয়, জ্ঞেয়, আপ্য ও পাক্য, এই চারিটি উপায়রূপে অবশ্য জ্ঞাতব্য। বিজ্ঞেয় পরমাত্মা হইতে অন্যত্র অর্থাৎ পরমার্থসত্য এক অদ্বিতীয় ব্রহ্মকে ত্যাগ করিয়া অন্য সর্ব্বত্রই সেই হেয় প্রভৃতির যে উপলব্ধ বা প্রতীতি, তাহা কেবল অবিদ্যাজনিত কল্পনামাত্র; ব্রহ্মবিদ্গণ হেয় আপ্য ও পাক্য, * এই তিন বিষয়েই[ঐরূপ উপলব্ধি স্থির করিয়া থাকেন]। অভিপ্রায় এই যে,[হেয়, আপ্য ও পাক্য] এই তিনেরই পারমার্থিক সত্যতা নাই ॥ ২০৫ ॥ ৯০

প্রকৃত্যাকাশবজজ্ঞেয়াঃ সর্ব্বে ধর্ম্মা অনাদয়ঃ।

বিদ্যতে ন হি নানাত্বং তেষাং কচন কিঞ্চন ॥ ২০৬ ॥ ৯১

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৮৫

সরলার্থঃ

সর্ব্বে ধৰ্ম্মাঃ(আত্মানঃ) প্রকৃত্যাকাশবৎ(প্রকৃত্যা স্বভাবেন আকাশতুল্যাঃ নির্লেপত্বাৎ) অনাদয়ঃ(নিত্যাশ্চ) জ্ঞেয়াঃ। তেষাং(ধর্মাণাং) কচন (কুত্রাপি) কিঞ্চন[কিঞ্চিৎ অপি] নানাত্বং(ভেদঃ) ন হি(নৈব) বিদ্যতে (অস্তি ইত্যর্থঃ)।

ধৰ্ম্ম-পদবাচ্য সমস্ত আত্মাই স্বভাবতঃ আকাশ-সদৃশ এবং অনাদি। সেই সমস্ত ধর্ম্মের কুত্রাপি কিছুমাত্রও নানাত্ব বা ভেদ বর্তমান নাই ॥ ২০৬ ॥ ৯১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

পরমার্থতস্তু প্রকৃত্যা স্বভাবতঃ আকাশবং আকাশতুল্যঃ সূক্ষ্মনিরঞ্জনসর্ব্বগতত্বৈঃ সর্ব্বে ধৰ্ম্মা আত্মানো জ্ঞেয়া মুমুক্ষুভিঃ অনাদয়ো নিত্যাঃ। বহুবচনকৃতভেদাশঙ্কাং নিরাকুর্ব্বন্নাহ—কচন কচিদপি কিঞ্চন কিঞ্চিৎ অণুমাত্রমপি তেষাং ন বিদ্যতে নানাত্বমিতি ॥ ২০৬॥ ৯১

ভাষ্যানুবাদ

প্রকৃতপক্ষে কিন্তু যাঁহারা মুমুক্ষু, তাঁহারা ধর্মপদবাচ্য সমস্ত আত্মাকেই আকাশবৎ, অর্থাৎ সূক্ষ্ম, নিরঞ্জন ও সর্বব্যাপিত্বরূপে আকাশেরই সদৃশ এবং অনাদিস্বরূপ বলিয়া জানিবেন। “ধৰ্ম্মাঃ” এই বহুবচন থাকায় কাহারও মনে আত্মার বহুত্ব-শঙ্কা উপস্থিত হইতে পারে, সেই আশঙ্কার নিরাসার্থ বলিতেছেন—কচন অর্থাৎ কোথাও(কোন অংশে) কিংচন অর্থ—কিছুও অর্থাৎ অণুমাত্রও তাহাদের নানাত্ব (ভেদ) নাই ॥ ২০৬॥ ৯১

আদিবুদ্ধাঃ প্রকৃত্যৈব সর্ব্বে ধর্ম্মাঃ সুনিশ্চিতাঃ। যস্যৈবং ভবতি ক্ষান্তিঃ সোহমৃতত্বায় কল্পতে ॥ ২০৭ ॥ ৯২

সরলার্থঃ

সর্ব্বে[এব] ধৰ্ম্মাঃ(আত্মানঃ) প্রকৃত্যা(স্বভাবেন) এব(নিশ্চয়ে) আদিবুদ্ধাঃ(নিত্যবোধস্বরূপাঃ) সুনিশ্চিতাঃ(নিত্যনিশ্চয়স্বভাবাশ্চ)। যস্য (মুমুক্ষোঃ) এবং(যথোক্তপ্রকারেণ)[আত্মনি বিষয়ে] ক্ষান্তিঃ(ক্ষমা—বোধোৎ-

২৮৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

পাদন-প্রযত্ন-নিবৃত্তিঃ) ভবতি, সঃ(ক্ষান্তিমান্ মুমুক্ষুঃ) অমৃতত্বায়(মোক্ষায়) কল্পতে(যোগ্যঃ ভবতি)।

স্বভাবতই সমস্ত আত্মা নিত্যজ্ঞানস্বরূপ এবং চিরদিনই নিশ্চিতভাব(একরূপ)। যে মুমুক্ষু পুরুষ এইরূপে আত্মাতে আর নূতন জ্ঞানোৎপাদনে যত্নপর না হন, তিনি মোক্ষলাভে সমর্থ হন ॥ ২০৭ ॥ ৯২

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

জ্ঞেয়তাপি ধৰ্মাণাং সংবৃত্যৈব, ন পরমার্থত ইত্যাহ-যস্মাদাদৌ বুদ্ধা আদিবুদ্ধাঃ প্রকৃত্যৈব স্বভাবত এব, যথা নিত্যপ্রকাশস্বরূপঃ সবিতা, এবং নিত্যবোধস্বরূপা ইত্যর্থঃ। সর্ব্বে ধৰ্ম্মাঃ সর্ব্ব আত্মানঃ। ন চ তেষাং নিশ্চয়ঃ কর্তব্যঃ নিত্যনিশ্চিত- স্বরূপা ইত্যর্থঃ। ন সন্দিহ্যমানস্বরূপা এবং নৈবং বা ইতি। যস্য মুমুক্ষোঃ এবং যথোক্তপ্রকারেণ সর্ব্বদা বোধনিশ্চয়নিরপেক্ষতা আত্মার্থং পরার্থং বা। যথা সবিতা নিত্যং প্রকাশান্তরনিরপেক্ষঃ স্বার্থং পরার্থং বা ইত্যেবম্ভবতি ক্ষান্তির্বোধকর্তব্যতা- নিরপেক্ষতা সর্ব্বদা স্বাত্মনি, সোহমৃতত্বায় অমৃতভাবায় কল্পতে মোক্ষায় সমর্থো ভবতীত্যর্থঃ ॥ ২০৭ ॥ ৯২

ভাষ্যানুবাদ

আত্মার যে জ্ঞেয়তা, তাহাও ব্যবহারিক মাত্র, পারমাথিক নহে। এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন—যেহেতু স্বভাবতই আদিবুদ্ধ—প্রথমা- বধিই বুদ্ধ; সূর্য্যদেব যেমন স্বভাবতই নিত্য প্রকাশময়, সমস্ত ধৰ্ম্ম অর্থাৎ সমস্ত আত্মাও ঠিক তেমনি নিত্যজ্ঞানস্বরূপ। আর সেই আত্মসমূহের ঐরূপ স্বরূপ নিশ্চয় করিতে হইবে, তাহা নহে; কারণ, তাহারা স্বরূপতই নিত-নিশ্চিত; অর্থাৎ ‘এরূপ, কি অন্যরূপ’ ইত্যাকারে সন্দিহ্যমান নহে। সূর্য্য যেরূপ অপর কোন প্রকাশ- নিরপেক্ষ হইয়া নিত্যই প্রকাশমান, তদ্রূপ যে মুমুক্ষু ব্যক্তির নিকট স্বার্থই হউক, বা পরার্থই হউক, আত্মার যথোক্তপ্রকার প্রকাশ সম্পাদনে ক্ষান্তি—অর্থাৎ জ্ঞানোৎপাদনে অপেক্ষার অভাব থাকে, তিনিই অমৃতত্ব বা মুক্তি লাভে সমর্থ হন ॥ ২০৭ ॥ ৯২

আদিশান্তা হনুংপন্নাঃ প্রকৃত্যৈব সুনির্ব্বতাঃ।

সর্ব্বে ধর্ম্মাঃ সমাভিজ্ঞো অজং সাম্যং বিশারদম্ ॥ ২০৮ ॥ ৯৩

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ॥ ১ ॥

সরলার্থঃ

[ আত্মনঃ শান্তিরপি নিত্যসিদ্ধা এব, ইত্যাহ]—সর্ব্বে হি(৩।৭) গায়। (আত্মানঃ) প্রকৃত্যা(স্বভাবেন) এব আদিশান্তাঃ(নিত্যমেণ শান্ত।।), অনুৎপন্নাঃ(উৎপত্তিরহিতাঃ), সুনিবৃত্তাঃ(সম্যক্ নির্বৃতাঃ বিমুক্তপশানাঃ), সমাভিন্নাঃ(সমা অভিন্নাঃ ভেদরহিতাশ্চ)[অতঃ] অজং সাম্যং চ বিশারদ (নিঃসংশয়ং সিদ্ধমিত্যর্থঃ)

স্বভাবতই সমস্ত আত্মা নিত্য-শান্ত, অনুৎপন্ন(নিত্যসিদ্ধ) নিত্যমুক্ত এবং সমান ও অভিন্নাত্মক; সুতরাং(পূর্ব্বোক্ত) অজ এবং সাম্য উক্তি নিঃসন্দিগ্ধ হইতেছে ॥ ২০৮ ॥ ৯৩

শঙ্কর-ভাষ্যম্

তথা নাপি শান্তিকর্ত্তব্যতা আত্মনীত্যাহ—যস্মাৎ আদিশান্তা নিত্যমেব শান্তা অনুৎপন্না অজাশ্চ প্রকৃত্যৈব সুনিবৃত্তাঃ সুষ্ঠু উপরতস্বভাবা নিত্যমুক্তস্বভাবা। ইত্যর্থঃ। সর্ব্বে ধৰ্ম্মাঃ সমাশ্চ অভিন্নাশ্চ সমাভিন্নাঃ, অজং সাম্যং বিশারদং বিশুদ্ধ মাত্মতত্ত্বং যস্মাৎ, তস্মাৎ শান্তিঃ মোক্ষো বা নাস্তি কর্ত্তব্য ইত্যর্থঃ। ন। নিত্যৈকস্বভাবস্য কৃতং কিঞ্চিদর্থবৎ স্যাৎ॥ ২০৮॥ ৯৩

ভাষ্যানুবাদ

সেইরূপ আত্মার শান্তিও করা যাইতে পারে না; যেহেতু সমগ্র আত্মাই আদিশান্ত অর্থাৎ নিত্যই শান্তস্বভাব(নির্বিকার), ‘অ- পন্ন অর্থাৎ জন্মরহিত এবং স্বভাবতই সুনিবৃত অর্থাৎ সম্পূর্ণরূপে নিবৃত্তিস্বভাব অর্থাৎ নিত্যমুক্তস্বভাব এবং সমান(পরস্পরের মধ্যে কিছুমাত্র প্রভেদ নাই) ও অভিন্ন(মূলতঃ একই পদার্থ)। যে, আত্মতত্ত্ব অজ, সাম্য অর্থাৎ বৈষম্য-বর্জ্জিত ও বিশারদ বা বিবাদ অতএব আত্মার শান্তি বা মোক্ষ কিছুই আর কর্ত্তব্য নাই। কারণ, নিত্যই একরূপ বস্তুর সম্বন্ধে কিছু করিলেও তাহা অর্থবৎ না হইতে পারে না ॥ ২০৮ ॥ ৯৩

বৈশারদ্যন্ত বৈ নাস্তি ভেদে বিচরতাং সদা।

ভেদনিষ্ক্রয়াঃ পৃথগ্‌বাদাস্তস্মাৎ তে কৃপণাঃ স্মৃতাঃ ॥ ২০৯ ॥. ॥

২৮৮ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

সরলার্থঃ

সদা(নিত্যং) ভেদে বিচরতাং(দ্বৈতচিন্তানিষ্ঠানাং) তু(পুনঃ) বৈশারদ্যং (উক্তম্ আত্মনৈর্মল্যং) ন বৈ(নৈব) অস্তি,(ন প্রকাশতে ইত্যাশয়ঃ)। তস্মাৎ (বৈশারদ্যপ্রতীত্যভাবাৎ হেতোঃ) ভেদনিমাঃ(দ্বৈতপ্রবণাঃ) পৃথগ্‌বাদাঃ(নানাত্ব- বাদিনঃ) তে(দ্বৈতিনঃ) কৃপণাঃ(দীনাঃ লঘুচিত্তাঃ ইত্যর্থঃ), স্মৃতাঃ(চিন্তিতাঃ) [বিবেকিভিরিতিশেষঃ]।

যাহারা সর্ব্বদা ভেদদৃষ্টিসম্পন্ন, তাহাদের নিকট আত্মার বিশুদ্ধস্বভাব প্রতিভাত হয় না; সেই কারণে ভেদময় সংসারানুরাগী ও ভেদ-সত্যতাবাদী সেই দ্বৈতবাদিগণ কৃপণ অর্থাৎ লঘুচিত্ত ॥ ২০৯ ॥ ৯৪

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যে যথোক্তং পরমার্থতত্ত্বং প্রতিপন্নাঃ, তে এব অকৃপণা লোকে; কৃপণাস্ত অন্যে ইত্যাহ—যস্মাৎ ভেদনিয়া ভেদানুযায়িনঃ সংসারানুগা ইত্যর্থঃ। কে? পৃথগ্বাদাঃ, পৃথক্ নানা বস্তু ইত্যেবং বদনং যেষাং, তে পৃথগ্‌বাদা দ্বৈতিন ইত্যর্থঃ। তস্মাৎ তে কৃপণাঃ ক্ষুদ্রাঃ স্মৃতাঃ, যস্মাৎ বৈশারদ্যং বিশুদ্ধিঃ, তৎ নাস্তি তেষাং ভেদে বিচরতাং দ্বৈতমার্গে অবিদ্যাকল্পিতে সর্ব্বদা বর্তমানানাম্ ইত্যর্থঃ। অতো যুক্তমেব তেষাং কার্পণ্যম্ ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ২০৯ ॥ ৯৪

ভাষ্যানুবাদ

যাঁহারা উক্তপ্রকার পরমার্থতত্ত্ব অবগত হইয়াছেন, জগতে কেবল তাঁহারাই কৃপণ নহেন; তদ্ভিন্ন অপর সকলেই কৃপণ; এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন—যেহেতু[তাহারা] ভেদনিম্ন অর্থাৎ ভেদানুযায়ী বা সংসারানুগত। কাহারা?[যাহারা] পৃথগ্‌বাদ, অর্থাৎ পৃথক্—নানা ‘বিভিন্নপ্রকার বস্তু আছে’—ইত্যাকার কথা বলাই যাহাদের স্বভাব, তাহারা পৃথগ্‌বাদ-পদবাচ্য, অর্থাৎ দ্বৈতবাদী। সেই হেতুই তাহারা কৃপণ, এবং ক্ষুদ্র অর্থাৎ লঘুচিত্ত। অভিপ্রায় এই যে, যেহেতু তাহারা সর্বদা অবিদ্যাকল্পিত ভেদময় দ্বৈতপথে বিচরণ করিয়া থাকে—বর্তমান থাকে; তাহাদের নিকট[আত্মার যে স্বভাবসিদ্ধ] বৈশারদ্য

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৮৯

(নিৰ্ম্মলতা), তাহা থাকে না(প্রকাশ পায় না)। অতএব তাহাদের কার্পণ্যোক্তি যুক্তিযুক্তই হইয়াছে ॥ ২০৯ ॥ ৯৪

অজে সাম্যে তু যে কেচিদ্ভবিষ্যন্তি সুনিশ্চিতাঃ।

তে হি লোকে মহাজ্ঞানাস্তচ্চ লোকো ন গাহতে ॥ ২১০ ॥ ৯৫

সরলার্থঃ

যে তু(চ) কেচিৎ(পুরুষাঃ) অজে সাম্যে(পরমার্থতত্ত্বে) সুনিশ্চিতাঃ (দৃঢ়প্রত্যয়বন্তঃ) ভবিষ্যন্তি, লোকে(জগতি), তে(অজসাম্যদর্শিনঃ) হি(এব) মহাজ্ঞানাঃ(যথার্থজ্ঞানবন্তঃ)। লোকঃ(প্রাকৃতবুদ্ধিঃ) তৎ চ(তেষাং তদপি দর্শনং) ন গাহতে(ন পরিগৃহ্লাতি)।

জগতে যাঁহারা সেই অজ ও সাম্যময় পরমার্থ-তত্ত্বে সুনিশ্চিত বা দৃঢ়জ্ঞান- সম্পন্ন হন, তাঁহারাই যথার্থ জ্ঞানসম্পন্ন; কিন্তু সাধারণ লোকে তাঁহাদের সেই জ্ঞান গ্রহণ করে না ॥ ২১০ ॥ ৯৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যদিদং পরমার্থতত্ত্বম্, অমহাত্মভিঃ অপণ্ডিতৈঃ বেদান্তবহিঃষ্ঠৈঃ ক্ষুদ্রৈঃ অল্প- প্রজ্ঞৈঃ অনবগাহ্যম্ ইত্যাহ—অজে সাম্যে পরমার্থতত্ত্বে এবমেবেতি যে কেচিৎ স্র্যাদয়ঃ অপি সুনিশ্চিতা ভবিষ্যন্তি চেৎ, তে এব হি লোকে মহাজ্ঞানা নিরতিশয়-তত্ত্ববিষয়কজ্ঞানা ইত্যর্থঃ। তচ্চ তেষাং বত্ম তেষাং বিদিতৎ পরমার্থতত্ত্বং সামান্যবুদ্ধিঃ অন্যো লোকো ন গাহতে ন অবতরতি—ন বিষয়ীকরোতীত্যর্থঃ। “সর্বভূতাত্মভূতস্য সমৈকার্থং প্রপশ্যতঃ। দেবা অপি মার্গে মুহ্যন্ত্যপদস্য * পদৈষিণঃ ॥ শকুনীনামিবাকাশে গতির্নৈবোপলভ্যতে” ইত্যাদি স্মরণাৎ ॥ ২১০ ॥ ৯৫

ভাষ্যানুবাদ

যাহারা মহাত্মা নহে, পাণ্ডিত্যরহিত, বেদবাহ্য, ক্ষুদ্রাশয় ও অল্প- জ্ঞানসম্পন্ন, তাহাদের পক্ষে, এই যে পরমার্থতত্ত্ব, ইহা বিজ্ঞেয় নহে— এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন—অজ(জন্মরহিত) সাম্য(বৈষম্যশূন্য) উক্ত পরমার্থতত্ত্ববিষয়ে ‘ইহা এই প্রকারই বটে’ এইরূপে যে কোন

১৯

২৯০ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

লোক, অধিক কি, যদি স্ত্রী প্রভৃতি(অধম অধিকারীও) সুনিশ্চিত (নিশ্চয়-বুদ্ধিসম্পন্ন) হয়, জগতে তাহারাই মহাজ্ঞান অর্থাৎ নিরতিশয় তত্ত্বজ্ঞানসম্পন্ন লোক।[কিন্তু] তাহাদের সেই পথে, অর্থাৎ তাহাদের পরিজ্ঞাত সেই পরমার্থতত্ত্ব বিষয়ে, সামান্যবুদ্ধি অপর লোকে অবতরণ করে না, অর্থাৎ তাহা বুদ্ধির বিষয়ীভূত করে না বা করিতে পারে না। যেহেতু স্মৃতিশাস্ত্রে আছে—‘সর্বভূত যাঁহার আত্ম- ভূত বা আত্মস্বরূপ, এবং যিনি সমান ও এক(অদ্বিতীয়) ব্রহ্ম পদার্থ দর্শন করিতেছেন, সেই পদাভিলাষী দেবগণও তাঁহার অবলম্বিত পথে বিশেষরূপে মোহ প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। আকাশে(অতি উচ্চে বিচরণকারী) পক্ষিসমূহের গতি যেমন উপলব্ধি করা যায় না, [মোক্ষপথে তাঁহাদের গতিও তদ্রূপ]। ইতি ॥ ২১০ ॥ ৯৫

অজেষজমসংক্রান্তং ধর্ম্মেষু জ্ঞানমিষ্যতে। যতো ন ক্রমতে জ্ঞানমসঙ্গং তেন কীর্ত্তিতম্ ॥ ২১১ ॥ ৯৬

সরলার্থঃ

অজেযু(নিত্যেষু) ধর্ম্মেষু(আত্মসু)[স্থিতং] জ্ঞানম্[অপি] অজম্(নিত্যম্) অসংক্রান্তম্(অনাত্মকং স্বাভাবিকম্) ইষ্যতে(স্বীক্রিয়তে)। যতঃ(যস্মাৎ হেতোঃ) জ্ঞানং[তত্র] ন ক্রমতে(অন্যতঃ ন আগচ্ছতি) তেন(হেতুনা)[অজং ব্রহ্ম] অসঙ্গং(নির্লেপং) কীর্তিতং(কথিতং)[জ্ঞানিভিরিতি শেষঃ]।

জন্মহীন(নিত্য) আত্মসমূহে স্থিত জ্ঞানও অজ ও অসংক্রান্ত, অর্থাৎ তাহার জ্ঞান নিত্য ও অন্য পদার্থ হইতে আগত নহে। যেহেতু জ্ঞান তাহাতে সংক্রামিত হয় না, সেই হেতুই তিনি অসঙ্গ বা নির্লেপ বলিয়া কথিত হন ॥ ২১১ ॥ ৯৬

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

কথং মহাজ্ঞানত্বমিত্যাহ—অজেযু অনুৎপন্নেষু অচলেষু ধর্ম্মেষু আত্মসু অজম্ অচলঞ্চ জ্ঞানম্ ইষ্যতে, সবিতরীব ঔষ্ণ্যাং, প্রকাশশ্চ যতঃ, তস্মাদসংক্রান্তম্ অর্থান্তরে জ্ঞানম্ অজম্ ইষ্যতে। যস্মাৎ ন ক্রমতে অর্থান্তরে জ্ঞানম্, তেন কারণেন অসঙ্গৎ তৎ কীর্ত্তিতম্ আকাশকল্পম্ ইত্যুক্তম্ ॥ ২১১ ॥ ৯৬

অনাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৯১

ভাষ্যানুবাদ

কি প্রকারে মহাজ্ঞান, তাহা বলিতেছেন—যেহেতু অজ—অনুৎ- পন্ন অর্থাৎ অচঞ্চল ধর্ম্মপদবাচ্য আত্মসমূহের জ্ঞানকেও সূর্য্যগত উষ্ণতা ও প্রকাশের ন্যায় অজ ও অচল বলিয়া স্বীকার করা হইয়া থাকে; সেই হেতুই অপর বিষয়ে অসংক্রান্ত(যাহা সংক্রামিত হয় না, এবং- প্রকার) জ্ঞানকে অজ(নিত্যসিদ্ধ) বলিয়া ইচ্ছা করা হইয়া থাকে। যেহেতু, সেই জ্ঞান অপর কোন পদার্থে সংক্রামিত হয় না—যায় না, সেইহেতু সেই জ্ঞান আকাশের ন্যায় অসঙ্গ বলিয়া কথিত হইয়াছে; অর্থাৎ আকাশ যেমন কোন বস্তুর সংশ্রবেই তাহাতে মিলিত হইয়া তাহার দোষে বা গুণে দুষ্ট বা গুণবান্ হয় না, এই আত্মজ্ঞান ঠিক তেমন ॥ ২১১ ॥ ৯৬

অণুমাত্রেইপি বৈধর্ম্ম্যে জায়মানেহবিপশ্চিতঃ। অসঙ্গতা সদা নাস্তি কিমুতাবরণচ্যুতিঃ॥ ২১২॥ ৯৭

সরলার্থঃ

অবিপশ্চিতঃ(অবিবেকিনঃ জ্ঞানস্য সসঙ্গত্ববাদিনঃ) অণুমাত্রে(অত্যল্পমাত্রে) অপি বৈধর্ম্ম্যে(বৈলক্ষণ্যে) জায়মানে(উৎপদ্যমানে সতি) সদা(সর্ব্বদা) অসঙ্গতা ন অস্তি(ন সিধ্যতি); কিমুত আবরণচ্যুতিঃ(বন্ধ ধ্বংসঃ)। [আবরণচ্যুতিস্তু দূরাপেতা ইত্যাশয়ঃ]।

যে অবিবেকী পুরুষ বাহ্যবিষয়ে জ্ঞানের সংক্রমণ স্বীকার করে, তাহার মতে, অতি অল্পমাত্র বৈলক্ষণ্য বা বিকার উৎপন্ন হইলেই যখন আত্মার সর্ব্বকালীন অসঙ্গতা সিদ্ধ হয় না, তখন[আত্মার] অজ্ঞানাবরণ-ধ্বংসের আর কথা কি? অর্থাৎ তাহা ত কখনও সিদ্ধ হইতে পারে না ॥ ২১২ ॥ ৯৭

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

ইতোহন্যেষাং বাদিনামণুমাত্রে অল্পেহপি বৈধর্ম্ম্যে বস্তুনি বহিরন্তর্ব্বা জায়মানে উৎপদ্যমানে অবিপশ্চিতোহবিবেকিনঃ অসঙ্গতা অসঙ্গত্বং সদা নাস্তি, কিমুত বক্তব্যম্ আবরণচ্যুতিঃ, বন্ধনাশো নাস্তীতি ॥ ২১২ ॥ ৯৭

২৯২ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ

ভাষ্যানুবাদ

এতদ্ভিন্ন অন্যান্য বাদিগণের মতে কোন বস্তুতে অণুমাত্র অর্থাৎ ভিতরে বা বাহিরে অতি অল্পপরিমাণে বৈলক্ষণ্য ঘটিলেই যখন অবি- বেকীর নিত্য অসঙ্গত্ব থাকে না, নষ্ট হইয়া যায়, তখন আবরণচ্যুতি অর্থাৎ বন্ধ-ধ্বংস যে হয় না, তাহা কি আর বলিতে হয়? ॥ ২১২ ॥ ৯৭

অলব্ধাবরণাঃ সর্ব্বে ধর্ম্মাঃ প্রকৃতিনিৰ্ম্মলাঃ। আদৌ বুদ্ধাস্তথা মুক্তাঃ বুধ্যন্ত-ইতি নায়কাঃ ॥ ২১৩॥ ৯৮

সরলার্থঃ

[ আবরণভঙ্গবিরুদ্ধানাং মতং খণ্ডয়ন্ তদুপপত্তিমাহ]—সর্ব্বে ধৰ্ম্মাঃ(আত্মানঃ), অলব্ধাবরণাঃ(কদাচিদপি অবিদ্যাবরণমপ্রাপ্তাঃ), প্রকৃতিনির্মলাঃ(স্বভাবশুদ্ধাঃ), আদৌ(পূর্ব্বমপি) বুদ্ধাঃ, তথা মুক্তাঃ(বন্ধরহিতাঃ)[অপি] বুধ্যন্তে(আত্মানং জানন্তি) ইতি(এবং প্রকারেণ) নায়কাঃ(নেতারঃ জ্ঞানস্বভাবাঃ)[উচ্যন্তে, ন তু জ্ঞানবন্ত ইত্যাশয়ঃ যদ্বা নায়কাঃ]। বেদান্তিনঃ[বদন্তীতিশেষঃ]

অদ্বৈতবাদী স্বমত বলিতেছেন—সমস্ত আত্মাই অলব্ধাবরণ অর্থাৎ কস্মিন্ কালেও অজ্ঞানাবরণে আবৃত হয় নাই, স্বভাবশুদ্ধ, নিত্যবুদ্ধ ও নিত্যমুক্তস্বরূপ; তথাপি, জানেন—বিজ্ঞাত হন বলিয়া, বেদান্তাচার্য্যগণ বলিয়া থাকেন ॥ ২১৩ ॥ ৯৮

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

তেষামাবরণচ্যুতিঃ নাস্তীতি ক্রবতাং স্বসিদ্ধান্তে অভ্যুপগতং তহি ধৰ্মাণাম্ আবরণম্ ন ইত্যুচ্যতে—অলব্ধাবরণা অলব্ধম্ অপ্রাপ্তম্ আবরণম্ অবিদ্যাদিবন্ধনং যেষাৎ, তে ধৰ্ম্মা অলব্ধাবরণা বন্ধনরহিতা ইত্যর্থঃ। প্রকৃতিনির্মলাঃ স্বভাবশুদ্ধাঃ আদৌ বুদ্ধাঃ তথা মুক্তাঃ, যস্মাৎ নিত্যশুদ্ধবুদ্ধমুক্তস্বভাবাঃ। যদ্যেবং, কথৎ তর্হি বুধ্যন্তে ইত্যুচ্যতে—নায়কাঃ স্বামিনঃ সমর্থা বুদ্ধাঃ বোধশক্তিমৎস্বভাবা ইত্যর্থঃ। যথা নিত্যপ্রকাশস্বরূপোহপি সন্ সবিতা প্রকাশতে ইত্যুচ্যতে, যথা বা নিত্যনিবৃত্তগত- য়োহপি ‘নিত্যমেব শৈলাঃ তিষ্ঠন্তি’ ইত্যুচ্যতে, তদ্বৎ ॥ ২১৩॥ ৯৮

ভাষ্যানুবাদ

তাহাদের মতে আবরণধ্বংস নাই বলিলে স্বমতে ত আত্মার আবরণ স্বীকার করা হয়; না—তাহা বলা হইতেছে—অলব্ধাবরণ

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৯৩

অর্থাৎ যাহারা আবরণ—অবিদ্যাদি-বন্ধন কখনও প্রাপ্ত হয় নাই, সেই আত্মসমূহই অলব্ধাবরণ, অর্থাৎ বন্ধনরহিত; প্রকৃতিনিৰ্ম্মল অর্থ— স্বভাবশুদ্ধ, অগ্রেই বুদ্ধ অর্থাৎ প্রাপ্তবোধ এবং মুক্ত, যেহেতু স্বভাবতই নিত্য শুদ্ধ, বুদ্ধ ও মুক্তস্বরূপ। ভাল, যদি এইরূপই হয়, তাহা হইলে আত্মার বোদ্ধৃত্ব বা জ্ঞানকর্তৃত্ব বলা হয় কিরূপে?[জ্ঞানই ত আর জ্ঞাতা বা জ্ঞানকর্তা হইতে পারে না?][উত্তর বোধকর্তা অর্থ—] নায়ক—স্বামী—জানিতে সমর্থ অর্থাৎ বোধশক্তিযুক্ত স্বভাবসম্পন্ন। সূর্য্য নিত্যপ্রকাশসম্পন্ন হইলেও যেমন ‘প্রকাশ পাইতেছে’ বলা হইয়া থাকে, অথবা চিরকালই গতিহীন পর্বতসমূহকেও যেরূপ ‘পর্বতসমূহ সর্বদা অবস্থিত আছে’ *বলা হইয়া থাকে, ইহাও তদ্রূপ ॥ ২১৩ ॥ ৯৮

ক্রমতে ন হি বুদ্ধস্য জ্ঞানং ধর্ম্মেষু তায়িনঃ।

সর্ব্বে ধর্ম্ম্যস্তথা জ্ঞানং নৈতদ্ বুদ্ধেন ভাষিতম্ ॥ ২১৪ ॥ ৯৯

সরলার্থঃ

বুদ্ধস্য(পরমার্থদর্শিনঃ) জ্ঞানং ধর্ম্মেষু(বিষয়ান্তরেষু) ন হি(নৈব) ক্রমতে (গচ্ছতি), তথা তায়িনঃ(অখণ্ডস্য প্রজ্ঞানবতঃ বা) সর্ব্বে ধৰ্ম্মাঃ(আত্মানঃ)[ন ক্রমন্তে]; তথা জ্ঞানম্(অপি) ন ক্রমতে(ন চলতীত্যর্থঃ)। এতৎ(যথোক্তপ্রকারং মতং) বুদ্ধেন(সর্ব্বজ্ঞেন) ন ভাষিতম্(নোক্তম্)[ঔপনিষদমেতদিত্যাশয়ঃ]।

প্রজ্ঞাবান্ জ্ঞানী বা পরমার্থদর্শী পুরুষের জ্ঞান অপর কোন বিষয়ে সংক্রামিত হয় না। সমস্ত আত্মা ও জ্ঞান[কোথাও সংক্রামিত হয় না] এই সিদ্ধান্তটি বুদ্ধদেব কর্তৃক কথিত হয় নাই, অর্থাৎ ইহা বৌদ্ধ সিদ্ধান্ত নহে; পরন্তু ইহা ঔপনিষদ সিদ্ধান্ত ॥ ২১৪ ॥ ৯৯

* তাৎপর্য্য—‘তিষ্ঠন্তি’ পদটি ‘স্থা’ ধাতু হইতে নিষ্পন্ন হইয়াছে। ‘স্থা’ ধাতুর অর্থ গতি-নিবৃত্তি; যাহার গতি আছে, তাহারই গতিনিবৃত্তি সম্ভব। পর্ব্বতের কস্মিন্কালেও গতি নাই; সুতরাং তাহার নিবৃত্তির সম্ভব নাই; তথাপি যেমন ‘পর্ব্বতসমূহ অবস্থিত আছে, বলা হয়, তেমনি স্বয়ং জ্ঞানস্বরূপ আত্মার পক্ষে অপর জ্ঞানক্রিয়া না থাকিলেও, ‘আত্মা জানিতেছে—জ্ঞান করিতেছে’ ইত্যাদি প্রয়োগ হইয়া থাকে; কিন্তু ঐ প্রয়োগবলে আত্মার সম্বন্ধে অপর কোনরূপ জন্য জ্ঞান কল্পনা করিতে হইবে না।

২৯৪ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যাপনিষৎ

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

যস্মাৎ ন হি ক্রমতে বুদ্ধস্য পরমার্থদর্শিনো জ্ঞানং বিষয়ান্তরেষু ধর্ম্মেযু ধৰ্ম্মসংস্থং সবিতরি ইব প্রভা। তায়িনঃ-তায়োহস্যাস্তীতি তায়ী, তস্য সন্তানবতো নিরন্তরস্য আকাশকল্পস্য ইত্যর্থঃ। পূজাবতো বা প্রজ্ঞাবতো বা। সর্ব্বে ধর্মা আত্মানোহপি তথা জ্ঞানাদেব আকাশকল্পত্বাৎ ন ক্রমে কচিদপি অর্থান্তর ইত্যর্থঃ। যদাদৌ উপন্যস্তং “জ্ঞানেন আকাশকল্পেন” ইত্যাদি, তদিদমাকাশকল্পস্য তায়িনো বুদ্ধস্য তদনন্যত্বাৎ আকাশকল্পং জ্ঞানং ন ক্রমে কচিদপ্যর্থান্তরে। তথা ধৰ্ম্মা ইতি আকাশমিব অচলমবিক্রিয়ং নিরবয়বং নিত্যমদ্বিতীয়ম্ অসঙ্গমদৃশ্যম্ অগ্রাহ্যম্ অশনায়াদ্যতীতং ব্রহ্মাত্মতত্ত্বম্ “নহি দ্রষ্টুদৃষ্টৈবিপরিলোপো বিদ্যতে” ইতিশ্রুতেঃ। জ্ঞান-জ্ঞেয়-জ্ঞাতৃ-ভেদরহিতৎ পরমার্থতত্ত্বমদ্বয়মেতৎ ন বুদ্ধেন ভাষিতম্। যদ্যপি বাহ্যার্থনিরাকরণং জ্ঞানমাত্রকল্পনা চাদ্বয়বস্তুসামীপ্যম্ উক্তম্। ইদন্তু পরমার্থতত্ত্বম্ অদ্বৈতং বেদান্তেষের বিজ্ঞেয়মিত্যর্থঃ ॥ ২১৪ ॥ ৯৯

ভাষ্যানুবাদ

যেহেতু বুদ্ধ অর্থাৎ পরমার্থজ্ঞানীর জ্ঞান অপর কোন বিষয়ে সংক্রামিত হয় না, পরন্তু সূর্য্যের প্রভার ন্যায় উহা আত্মাতেই অবস্থিত থাকে। তায়ী অর্থ—যাহার তায়(অবিচ্ছিন্ন ভাব) আছে, তাহার নাম তায়ী, অর্থাৎ যাহা অবিচ্ছিন্ন(ধারাবাহী) আকাশ-সদৃশ; অথবা পূজাবান্(পূজনীয়) কিংবা প্রকৃষ্টজ্ঞানবান্; তাহার সমস্ত ধৰ্ম্ম অর্থাৎ সমস্ত আত্মাও জ্ঞানেরই ন্যায় আকাশসদৃশ বলিয়া জ্ঞান হইতে অপর কোনও পদার্থে সংক্রামিত হয় না। ইতঃপূর্ব্বে “জ্ঞানেনাকাশকল্পেন” বলিয়া যে জ্ঞান উল্লিখিত হইয়াছে, আকাশসদৃশ তায়ী বুদ্ধের জ্ঞানও তাহা হইতে অন্য বা পৃথক্ নহে; এজন্য সেই জ্ঞানও আকাশকল্প; সুতরাং তাহা অপর কোন পদার্থেই সংক্রামিত বা লিপ্ত হয় না। ধৰ্ম্মসমূহও(আত্মসমূহও) সেইরূপ, অর্থাৎ আকাশেরই মত অচল, অবিক্রিয়(বিকার-হীন), নিরবয়ব, নিত্য, অদ্বিতীয়, অসঙ্গ, অদৃশ্য, অগ্রাহ্য, এবং ভোজনেচ্ছাদির অতীত ব্রহ্মাত্ম- স্বরূপ। কেননা, শ্রুতি বলিতেছেন—‘দ্রষ্টার(আত্মার) দৃষ্টির অর্থাৎ জ্ঞানের কখনই বিলোপ হয় না।’

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৯৫

যদিও বাহ্য পদার্থের অস্তিত্ব-খণ্ডন এবং একমাত্র জ্ঞানসত্তাস্থাপন অদ্বয় বস্তুরই(বুদ্ধসম্মত বিজ্ঞানেরই) খুব সন্নিকৃষ্ট কথা উক্ত হইয়াছে, অর্থাৎ যদিও আলোচ্য অদ্বৈতবাদ বৌদ্ধ বিজ্ঞানের অত্যন্ত অনুরূপ, তথাপি জ্ঞান, জ্ঞেয় ও জ্ঞাতা, এই ত্রিবিধ ভেদবজ্জিত এই অদ্বিতীয় পরমার্থতত্ত্ব বুদ্ধকর্তৃক কথিত হয় নাই,[অর্থাৎ বৌদ্ধসিদ্ধান্ত হইতে ইহা সম্পূর্ণ পৃথক্]। পরন্তু, এই অদ্বৈত পরমাত্মতত্ত্বটি বেদান্ত- শাস্ত্রোক্ত বলিয়াই জানিতে হইবে ॥ ২১৪ ॥ ৯৯

দুর্দ্দর্শমতিগম্ভীরমজং সাম্যং বিশারদম্। বুদ্ধা পদমনানাত্বং নমস্কুর্ম্মো যথাবলম্॥ ২১৮॥ ১০০ বুদ্ধা পদমনানাত্বং নমস্কুর্ম্মো যথাবলম্। ২১৫ ॥ ১০০ ইতি শ্রীগৌড়পাদাচার্য্যকৃতা মাণ্ডূক্যোপনিষৎকারিকাঃ সম্পূর্ণাঃ।

ওঁ তৎসৎ। শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ॥ ইতি অথর্ব্ববেদীয়-মাণ্ডূক্যোপনিষৎ সমাপ্তা॥ ৪॥

সরলার্থঃ

[শাস্ত্রসমাপ্তৌ পরমাত্মস্তুতিমাহ]—দুর্দ্দর্শং(দুঃখেন দ্রষ্টুং শক্যম্), অতি- গম্ভীরং(দুরবগাহং), অজং, সাম্যং(একরূপং), বিশারদং(শুদ্ধং), অনানাত্বং (সর্ব্বভেদবজ্জিতং) পদং(পরমার্থতত্ত্বরূপং) বুদ্ধা(অবগম্য) যথাবলং(যথাশক্তি) নমস্কুৰ্ম্মঃ(নমামঃ)[বয়ম্ ইতি শেষঃ]।

দুর্দ্দর্শ, অতিগম্ভীর(দুজ্ঞেয়), অজ, সমস্বভাব, বিশুদ্ধ ও ভেদবর্জিত পরমার্থতত্ত্ব অবগত হইয়া আমি যথাশক্তি তাঁহার নমস্কার করিতেছি ॥ ২১৫ ॥ ১০০

শাঙ্কর-ভাষ্যম্

শাস্ত্রসমাপ্তৌ পরমার্থতত্ত্বস্তুত্যর্থং নমস্কার উচ্যতে। দুর্দর্শং দুঃখেন দর্শনমস্যেতি দুর্দর্শম্। অস্তিনাস্তীতি চতুস্কোটিবর্জিতত্বাৎ দুর্বিজ্ঞেয়মিত্যর্থঃ। অতএব অতিগম্ভীরং দুষ্প্রবেশং মহাসমুদ্রবৎ অকৃতপ্রজ্ঞৈঃ। অজং সাম্যং বিশারদম্। ঈদৃক্ পদমনানাত্বং নানাত্ববর্জিতৎ বুদ্ধা অবগম্য তদ্ভূতাঃ সন্তো নমস্কুৰ্ম্মঃ তস্মৈ পাদয়। অব্যবহার্য্যমপি ব্যবহারগোচরমাপাদ্য যথাবলং যথাশক্তীত্যর্থঃ ॥ ২১৫ ॥ ১০০

২৯৬ কারিকোপেত-মাণ্ডূক্যাপনিষৎ

ভাষ্যানুবাদ

শাস্ত্রসমাপ্তি উপলক্ষে পরমার্থতত্ত্ব স্তুতির উদ্দেশে নমস্কার উক্ত হইতেছে—দুর্দ্দর্শ—[ দুঃখে যাহার দর্শন হয়]; অর্থাৎ ‘অস্তি নাস্তি’ ইত্যাদিরূপ চতুর্বিবধ বিকল্পাতীত বলিয়া দুর্বিবজ্ঞেয়; অতএব অতি- গম্ভীর অর্থাৎ অল্পবুদ্ধি ব্যক্তিগণের পক্ষে মহাসমুদ্রের ন্যায় দুষ্প্রবেশ [ অতিকষ্টে এবিষয়ে বুদ্ধির প্রবেশ হয়], অজ[ জন্মরহিত], সাম্য ও বিশারদ[ বিশুদ্ধ]; ঈদৃশ পদকে(পরমার্থতত্ত্বকে) অনানাত্ব (নানাত্ব-বজ্জিত) রূপে জানিয়া—তন্ময় বা তদ্ভাব প্রাপ্ত হইয়া যথা- বল অর্থাৎ নমস্কারাদি ব্যবহারের অযোগ্য পদার্থেরও শক্তি অনুসারে ব্যবহার্য্যত্ব সম্পাদন করিয়া তাঁহার উদ্দেশে নমস্কার করি ॥ ২১৫ ॥ ১০০

[ ভাষ্যকৃষ্ণমস্কারাঃ]

অজমপি জনিযোগাৎ প্রাপদৈশ্বর্য্যযোগা- দগতি চ গতিমত্তাং প্রাপদেকং হ্যানেকম্। বিবিধবিষয়ধৰ্ম্মগ্রাহি মুগ্ধেক্ষণানাৎ প্রণতভয়বিহন্ত, ব্রহ্ম যত্তন্নতোহস্মি ৷ ১ প্রজ্ঞা-বৈশাখবেধ-ক্ষুভিতজলনিধের্ব্বেদনামোহন্তরস্থং ভূতান্যালোক্য মগ্নান্যবিরতজনন-গ্রাহঘোরে সমুদ্রে। কারুণ্যাদুদ্দধারামৃতমিদমমরৈদুর্লভং ভূতহেতো- র্যস্তং পূজ্যাভিপূজ্যং পরমগুরুমমুং পাদপাতৈর্নতোহস্মি ॥ ২ যৎপ্রজ্ঞালোকভাসা প্রতিহতিমগমৎ স্বান্ত-মোহান্ধকারো মজ্জোন্মজ্জচ্চ ঘোরে হ্যসকুদুপজনোদন্বতি ত্রাসনে মে। যৎপাদাবাশ্রিতানাং শ্রুতিশমবিনয়প্রাপ্তিরগ্র্যা হ্যমোঘা তৎপাদৌ পাবনীয়ৌ ভবভয়বিনুদৌ সর্ব্বভাবৈর্মস্যে ॥ ৩ ইতি শ্রীগোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদশিষ্যস্য পরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীশঙ্করভগবতঃ কৃতৌ গৌড়পাদীয়কারিকা-বিবরণে অলাত- শান্ত্যাখ্যং চতুর্থং প্রকরণং সমাপ্তম্ ॥ মাণ্ডুক্যোপনিষৎ-কারিকাভাষ্যং সমাপ্তম্ ॥

অলাতশান্তি-প্রকরণম্ ২৯৭

ভাষ্যকারের নমস্কার—

যং ব্রহ্ম অজং(স্বরূপতঃ জন্মরহিতম্ অপি সৎ) ঐশ্বর্য্যযোগাৎ(কার্য্যে- শ্বরাদি ভাবাবলম্বনাৎ) জনিযোগেম্(উৎপত্তিং) প্রাপৎ(প্রাপ্তবৎ)।[তথা। অগতি(নিষ্ক্রিয়ং) চ(অপি) গতিমত্তাং(গমনক্রিয়াং প্রাপ্তবৎ)।[তথা] একম্[অপি] হি(নিশ্চয়ে) অনেকং(ভেদপ্রাপ্তমিব) মুগ্ধেক্ষণানাং (মুগ্ধানি মোহগ্রস্তানি ঈক্ষণানি জ্ঞানদৃষ্টয়ঃ যেষাং, তেষাং বিষয়াসক্তচেতসাং) [সমীপে] বিবিধবিষয় ধর্মগ্রাহি(বিবিধানাং বিষয়াণাং প্রকাশ্যানাং ধৰ্ম্মান্ গৃহাতি স্বীকারোতীতি, অজ্ঞদৃষ্ট্যৈব নানাত্বং, ন তু স্বরূপত ইত্যাশয়ঃ)।[তথা] প্রণতভয়বিহন্তৃ(প্রণতানাং তদেকশরণানাং ভয়ং সংসারদুঃখং বিহন্তুং শীলম্ অস্য ইত্যর্থঃ), তৎ(ব্রহ্ম) নতঃ(প্রণতঃ) অস্মি[অহমিতিশেষঃ] ॥১

যিনি জন্মরহিত হইয়াও ঐশ্বর্য্যশক্তিযোগে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, গতিহীন হইয়াও গতি স্বীকার করিয়াছেন, এবং যিনি এক হইয়াও অনেক মূঢ়দৃষ্টি লোকের নিকট নানাবিধ জাগতিক ধর্ম্মাক্রান্তরূপে প্রতীত, এবং প্রণত ভক্তগণের ভয়বিনাশক; সেই ব্রহ্মকে আমি প্রণাম করিতেছি৷৷ ১

যঃ(পরমগুরুঃ) অবিরতজনন-গ্রাহঘোরে(নিরন্তরং যৎ জননং জন্ম, তদেব গ্রাহঃ জলচরঃ হিংস্রজন্তুবিশেষঃ তেন ঘোরে ভয়ঙ্করে), সমুদ্রে(সংসার- সাগরে) ভূতানি(প্রাণিনঃ মনুষ্যান) মগ্নানি আলোক্য(দৃষ্টব্য) কারুণ্যাং (দয়য়া) বেদনাম্নঃ(বেদাখ্যাৎ) প্রজ্ঞা-বৈশাখবেধক্ষুভিত-জলনিধেঃ(প্রজ্ঞা- পরিশুদ্ধা বুদ্ধিরেব বৈশাখঃ--মন্থানদন্ডঃ তস্য বেধেন ক্ষেপণেন ক্ষুভিতঃ আলোড়িতঃ যঃ জলনিধিঃ জলনিধিরিব তস্মাৎ বেদাদিত্যর্থঃ) অমরৈঃ(দেবৈঃ) [অপি] দুর্লভম্(লব্ধুমশক্যম্) ইদম্(পরমার্থতত্ত্বরূপম্) অমৃতং (অমৃতমিব) ভূতহেতোঃ(ভূতানাং প্রাণিনাং কল্যাণার্থং) উদ্দ্দধার (উদ্ধৃতবান্)। পূজ্যাভিপূজ্যং(গুরোরপি বন্দনীয়ং) তং পরমগুরুং (গুরোগুরুং) পাদপাতৈঃ(তস্য পাদয়োঃ মম শিরসঃ পাতনৈরিত্যর্থঃ) নতঃ (প্রণতঃ) অস্মি[অহম্ ইতি শেষঃ! ॥ ২

যিনি ভূতগণকে নিরন্তর জন্মজন্মান্তররূপ হিংস্র জলজন্তুতে ভীষণ সংসার সাগরে নিমগ্ন দর্শন করিয়া, তাহাদের কল্যাণার্থ করুণাপরবশ হইয়া বিশুদ্ধ বুদ্ধিরূপ মথনদণ্ডের নিক্ষেপে আলোড়িত বেদনামক জলধির অভ্যন্তরস্থ, দেবগণেরও দুর্লভ এই(জ্ঞানোপদেশময়) অমৃত উদ্ধার করিয়াছেন, পূজ্যগণেরও পূজনীয় সেই পরম গুরুকে(গুরুরও গুরুকে) চরণে পতিত হইয়া প্রণাম করিতেছি॥২

২৯৮ কারিকোপেত-মান্ড ক্যোপনিষৎ

স্বান্ত-মোহান্ধকারঃ(হৃদয়গতাজ্ঞানন্ধকারঃ) যংপ্রভালোক-ভাসা(যস্য প্রভা এব আলোকঃ, তস্য ভাসা—দীপ্ত্যা) প্রতিহতিম(প্রতিঘাতং নিবৃত্তিম্) অগমৎ; ঘোরে[অতএব] মে(মম) ত্রাসনে(ভয়োৎপাদকে) উপজনোদন্বতি (নানাযোনিজন্মরূপে সমুদ্রে)[জগৎ] অসকৃৎ(বারংবারং) মজ্জোন্মজ্জৎ (মজ্জৎ কদাচিৎ অনতিব্যক্তম্, কদাচিৎ উন্মজ্জৎ অভিব্যক্তং চ)। ভবতি ইতি শেষঃ], যৎপাদৌ(যস্য চরণৌ) আশ্রিতানাম্(শরণাগতানাম্) অমোঘা (অব্যর্থা--সফলা) অগ্র্যা(সর্ব্বাত্তমা) শ্রুতি-শম-নিয়ম-প্রাপ্তিঃ(শ্রুতিঃ শ্রুত্যর্থ-জ্ঞানং, শমঃ অনুদ্বিগ্নতা, বিনয়ঃ সৎশীলং, তেষাং প্রাপ্তিঃ অধিগমঃ)[ভবতি]; পাবনীয়ৌ(জগৎপাবনৌ), ভবভয়বিনুদৌ (ভবভয়নিবারকৌ) তৎপাদৌ সর্ব্বভাবৈঃ(সর্ব্বপ্রকারৈঃ) নমস্যে(প্রণমামি) [ অহমিতি শেষঃ]॥ ৩

সেয়মল্ল-পদোপেতা শ্রীশঙ্করমতে স্থিতা।

মাংভূকোপনিষদ্ ব্যাখ্যা সরলা স্যাৎ সতাং মুদে॥

যাঁহার জ্ঞানালোকপ্রভায় হৃদয়গত অজ্ঞানান্ধকার প্রতিহত হইয়াছে; ভয়ঙ্কর, সুতরাং আমারও ত্রাসকর পুনঃ পুনঃ জন্মমরণময় সাগরে মগ্ন ও উন্মগ্ন সংসারও বিনষ্ট হইয়া যায়; এবং যাঁহার চরণাশ্রিত ব্যক্তিবর্গের উৎকৃষ্ট ও অমোঘ শ্রুতিজ্ঞান, ইন্দ্রিয়সংযম ও বিনয় বা ঔদ্ধত্য-পরিহার সম্পন্ন হইয়া থাকে; পবিত্রতা-সম্পাদক এবং ভবভয়-নিবারক তাঁহার সেই চরণদ্বয় সর্ব্বতো- ভাবে প্রণাম করিতেছি॥ ৩

ইতি মাণ্ড্যকোপনিষদে গৌড়পাদীয় কারিকার অনুবাদ সমাপ্ত॥